সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

দিদার জন্য মুরগির ছানা

 কার্তিকের দুপুর  হলুদ রঙের হয়। বেশ ঘন হলুদ।

হাঁটছিলাম।

গরম নেই।

 পোস্ট অফিসে কিছু কাজ আছে। কয়েকটা বই পোস্ট করতে হবে। দরকারি কাগজ পাঠাতে হবে

 

 চিঠি ? না চিঠি   লিখি না অনেক বছর। লিখতে পারলে ভাল হত।  কাকে লিখব ? আমার জন্যও  কেউ চিঠি  লেখে না।

 

 মোড়ের সামনে জটলা।

 রঙ চঙ্গা একটা  বাস থামতেই এক গাদা নানান ধরনের  মানুষ নেমে গেল বাস থেকে। যেন বস্তা থেকে গড়িয়ে পড়লো এক গাদা আলু।

 

  মানুষ আর  আর আলুর মধ্যে অদ্ভুত মিল। সবাই আলাদা। কেউ কারও মত না। বিশ্বাস না করলে এক বস্তা  আলু নিয়ে  ভাল করে দেখ। একই রকম দুটো আলু পাবে না।

 

    কমলা রঙের  ধূলায়  ভরে গেল চারিদিকটা।

গুড়ের শরবত বিক্রি করছে একজন । মনে হয় কাচের  গ্লাস ভর্তি আলকাতরা। সাথে লুডুর ছক্কার সাইজের এক ফালি সবুজ লেবু।

 

 

     বুড়ো এক লোক বোতাম বিক্রি করে। একগাদা কাঁচের আর   প্ল্যাস্টিকের  বয়াম সামনে। বয়াম  ভর্তি  হরেক রঙের বোতাম ।

লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, সাদা, কালো।

 

 কত করে বিক্রি করে জানতে হবে।

 

 পাশে একজন তাবিজ  বিক্রেতা।   কড়ি,পিতলের পুরানো পয়সা ,  সোলেমানি জাদুর নকশাওয়ালা ছবি বিক্রি করেন।

     বসে বসে খাবনামা পড়ছেন। কে জানে কী ধরনের   স্বপ্ন দেখেন উনি !

রাস্তার উল্টা দিকে দমকল বাহিনির লাল আপিস।ওখানে অনেকগুলো   পিপুল গাছের চারা লাগিয়েছে কারা যেন। বেশ বড় হয়ে উঠছে চারা গুলো। একদম বড় হয়ে গেলে  দেখার মত সুন্দর  হবে। একবার এসে দেখে যাব তখন ।  

 ছেলেটাকে তখনই দেখলাম।

রঙ জ্বলা  জিনসের হাফ প্যান্ট আর ইয়া ঢোলা একটা টি  শার্ট  পনের। একসময় সাদা ছিল হয়তো টি শার্টটা । এখন কী   রঙ হয়ে গেছে  বলা মুশকিল।কতদিন কাচা হয় না সাবান দিয়ে। দেখেই বুঝা যায় গরীব।  খুব  গরীব। বয়স দশ বার হবে, কম বেশি হতে পারে।

খালি পা।  নাকে শিকনি। হাতে পলিথিনের ব্যাগ। ভেতরে খুদ-কুড়ো। আর হলুদ রঙের দুটো মুরগীর ছানা। জ্যান্ত। উলের বলের মত।

কত দিয়ে কিনলি ?’ কৌতূহল হল।

ত্রিশ টাকা। একটা পনের  টাকা  কইরা নিছে।জবাব দিল পিচ্চি। যে দুটো হলুদ মুরগীর মালিক।

 

পালবি নাকি ?’

 

হু।

 

‘কী   খায় ওরা ?’

যা দিবেন। চাল,গমের দানা, বাসি ভাত রুটির টুকরা।নিজেরা তো পোকামাকড়  খুইজ্জা  খায়  । জল বেশি দিতে লাগব ।বাচ্চা তো পিপাসা বেশি পায়। সারাক্ষণ চিক্কুর পারে আর দৌড়া দউরি করে না  তো।  গলা হুগাইয়া যায়।

 

টাকা পেয়েছিস কোথায় ?মা দিয়েছে ?’

 

‘  হ । মায় রোজ  দুই   টেকা কইরা   দেয় ইস্কুলে  যাওনের সময়। কিছু মিছু  কিন্না খাইতে কয়।  দুই টেকায় কিছু পাওন যায়  কন ? হেই টেকা  জমাই।আইজ  তিরিস টেকা  অইছে , কিন্না  আনলাম।

মুরগী পেলে বড় করে বিক্রি করবি ?’

বেচুম না। আরেক টু বড় অইলে  দিদারে দিমু।

দিদা কই থাকে ?’

অনেক দূরে। বাস লাগে যাইতে। রিক্সাও লাগে। মেলা দূর। গেরাম তো।

এখন দিবি না কেন ?’

আরে বাসে কইরা নিলে ঝাঁকানিতে মুরগীর  বাচ্চা মইরা যাইব তো। তহন আরেক ঝামেলা।

দিদাকে দিবি কেন ?’

দিদায় পালব। মুরগীর ডিম অইলে বেচব। আমরা গেলে দিদা বাবার লিজ্ঞা মুরগীর মাংস রানব।দিদার তো পয়সা নাই।বাবারে সমাদর করব কেমনে ?আমি দিদারে হেল্প করি।

‘কী   করিস ?’

হেল্প। মানে বুঝলেন না ? সাইজ্জ। মানে উবগার।

হাসলাম।

সামনে পোস্ট আপিস। যেতে হবে।কত কাজ ।  

পিচ্চির সাথে আরও কথা বলতে ইচ্ছা করছিল।  উপায় নেই।কাজ শেষে বাসায় যেতে হবে । মা  অপেক্ষা করছে।

গেলাম রে ।বললাম। হাত নেড়ে বিদায় নিলাম।

 

পিচ্চি  ও নাকের শিকনি টানতে টানতে বিদায় নিল। হাতে দিদার জন্য মুরগীর ছানা।

 

বুক ভর্তি  ভালবাসা।


মন্তব্যসমূহ