এক
ভোর পাঁচটা সাতান্ন মিনিটে শিশিরের ঘুম ভেঙে গেল। একদম কোন কারণ ছাড়াই।
বাইরে গরম।
হালকা ঘেমে গেছে সে।
শিশিরে বয়স আটত্রিশ। লম্বা। শ্যামলা । বেশ মজবুত শরীর। ব্যায়াম ট্যায়াম করে । যে কারও নজর কাড়তে পারে এক দেখায় । তারপরও অটোগ্রাফ শিকারীরা চট করে ধরতে পারে না এটাই সেই শিশির চৌধুরী ।
ওর চেহারার সাথে ঢাকাই সিনেমার এক অভিনেতার সাথে এত মিল , বেশির ভাগ সময় অটোগ্রাফ শিকারিরা ওকে সেই অভিনেতা হিসাবে ভুল করে।
ব্যাপারটা শিশির পছন্দ করে না। ওর নিজের একটা পরিচয় আছে।
গত দশ বছর ধরে শিশির বিখ্যাত।
বছরে মাত্র একটা উপন্যাস লেখে । যাই লেখে, বাজারে হিট হয়। বই মেলাতে পাঠক লাইন ধরে বই কিনে । নাম আর টাকা কামানো শুরু করেছে লেখালেখির তিন নম্বর বছর থেকে। সেই বছর শিশিরের একটা বইয়ের কাহিনি নিয়ে সিনেমা বানানো হয়েছিল। ধুম ধারাক্কা খুন খারাবি মার্কা কাহিনি। তাতেই নাম ছড়িয়ে যায়।
সেই সিনেমাটা হিট হওয়ার পর প্রতিবছর ওঁর বই বের হওয়া মাত্র আবারও সিনেমাওয়ালারা ওর কাহিনি নিয়ে সিনেমা বানাতে শুরু করে। নাম এবং কড়ি দুটোই কামায় শিশির। চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি লেখায় নেমে পড়ে।
সফলতা আর টাকা-কড়ি মাথা ঘোলা করে দেয়নি ওর। বিনয় আর নরম মনের মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে নিয়েছে। লেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকে । মাঝখানে ধুম করে আটাশ বছরের সুন্দরী মেঘাকে বিয়ে করে ফেলেছে। আর হ্যাঁ, দশ মাসের তুলতুলে একটা বাচ্চাও রয়েছে ওদের।
আজ ভোরের এই ভয়াল কাহিনি শুরুর দুই মাস আগে সিদ্ধান্ত নেয় শিশির, কিছুদিন নিরিবিলিতে কাটাবে। ফোন ধরবে না। ফোনের শব্দ মাথায় যন্ত্রণা দেয়। বিকেলে বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডার নামে সময় নষ্ট করবে না। ই-মেলের উত্তর দেবে না। রাত জেগে মুভি দেখবে না।
একদম বিচ্ছিন্ন থাকবে সবার কাছ থেকে ।
সেই সময়টাতে দম খিঁচে লেখালেখি করে ফাটাফাটি হাতির সাইজের একটা রোমাঞ্চ উপন্যাস নামিয়ে ফেলবে। দারুণ চনমন করা একটা প্লট মাথায় ঘুরছে। লিখে না ফেললে ওটা গায়েব হয়ে যাবে।
বন্ধু বান্ধবদের আড্ডাই যত নষ্টের গোড়া। ওদের জন্য লেখালেখি হচ্ছে না। বাসায় চলে আসলে বিদায়ও করা যায় না।
পরিচিত কয়েকজনের সাথে কথা বলে বুদ্ধিটা পেল।
বেশ কয়েকজনকে লাগিয়ে দিয়েছিল- তিন মাসের জন্য কোথাও বাসা ভাড়া নিতে পারে কি না?
শর্ত একটাই, নির্জন- নিঝুম জায়গা হতে হবে। দূরে কোথাও।
মাত্র দুইদিন পর খবর পাওয়া গেল - আছে ! এমন একটা জায়গা আছে। নবীগঞ্জ। ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ ছাড়িয়ে আরও বেশ কয়েক মাইল দূরে । গ্রাম ও না আবার মফস্বল ও না - দুইয়ের মাঝামাঝি কেমন একটা জায়গা। হঠাৎ করেই যেন সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
হাতে গোনা কয়েকটি মুদি দোকান । কলা পাউরুটি ঝুলে থাকা বিচ্ছিন্ন চায়ের দোকান। আর নিঃসঙ্গ একটা তেলের পাম্প ছাড়া আর কিছু নেই।
সব ছাড়িয়ে আরও ভেতরে গেলে বাংলো কিসিমের একটা বাড়ি। বাড়ির নাম- নির্জনবাস। বাড়িটার মালিক বুড়ো এক দম্পতি। শখের বশে বানিয়েছিল। কিন্তু আজকাল ঢাকায় থাকেন তাঁদের বাচ্চাকাচ্চাদের সাথে।
বুড়ো বুড়ি আনন্দের সাথেই শিশিরকে বাড়ি ভাড়া দিয়েছে । বিখ্যাত একজন লোক তাদের বাড়িতে তিন মাস থাকবে। ভাগ্য আর কাকে বলে !
পরে সবাইকে বলে বেশ একটা ভাব নেয়া যাবে।
সমস্যা হল -নির্জনবাস বাড়িটা মূল রাস্তা থেকে আরও অনেক ভিতরে পড়ে গেছে। পুরো পথটা ধুলায় ভর্তি৷ চারিদিকে চিকচিকে হলুদ বালি। নদী ছিল আগে। মরে শুকিয়ে গেছে ৷ এখন বালির স্তূপ। প্রায় মাইল পনের জায়গা জুড়ে শুধু বালি আর বালি। মাঝে মাঝে বগলের চুলের মতো ঝোপ ঝাড় । বেত আর শেয়াল কাঁটা।
এত কিছু বাদ দিয়ে গেলে তবেই মূল রাস্তা ।
আক্ষরিক অর্থেই বিচ্ছিন্ন জায়গা।শিশির যেমনটা চায়।
ভাড়া নেওয়ার আগে মেঘাকে নিয়ে এসেছিল , জায়গাটা জরিপ করতে। পছন্দ হওয়ার পর কোন রকম দর কষাকষি না করে কাগজপত্রে তিন মাসের জন্য এগ্রিমেন্ট করে নিয়েছে । বাড়িটায় বড় একটা লিভিং রুম, ডাইনিং রুম- বই পড়া রুম- তিনটি বেড রুম, তিনটে বাথরুম। একদম গোছানো, রান্নাঘর । এমন কী কাজ চালানোর মত শৌখিন একটা সুইমিং পুলও আছে বাড়ির সামনে।
চারটি গাড়ি ঢুকে যাবে এমন সাইজের গ্যারেজ। পিছনে টেনিস খেলার কোর্ট। এবং দুইশ গজ দূরে পাঁচ রুমের কোয়ার্টার টাইপের বাসা আছে। কাজের লোকদের জন্য।
নির্জনবাসের ভাড়া অনেক বেশি। কিন্তু শিশির প্রচুর কামায় ।আর জায়গাটা ওর পছন্দ হয়েছে দারুণ রকমের। সেটাই আসল কারণ। ভাড়া নিয়ে তর্ক করেনি।
পরিচিত কাছের লোকজন অবশ্য শিশিরের আইডিয়াটা পছন্দ করেনি । তিন মাস সবাইকে ছেড়ে বিচ্ছিন্ন থাকার চেয়ে ঢাকা শহরে নিজের ফ্ল্যাটে বসে লিখলে ভাল হতো।
কিন্তু শিশির আসলে ছুটি চায়।
বাড়ি দেখতে এসে মেঘাকে বলেছিল, তোমার আসার দরকার নেই। যতদিন লেখা শেষ না হবে আমি এখানেই থাকব । ব্যাপারটা তোমার জন্য একঘেয়ে হয়ে যাবে। লোকজন নেই। প্রতিবেশী নেই। বাজার দূরে। তুমি ঢাকাতেই থাকো।’
মেঘা রাজি হয়নি।
যুক্তি দেখিয়েছে, শিশিরকে ছেড়ে একা থাকা মানেই হয় না। মেঘা এই সময়টাতে পিচ্চির দেখাশোনা করবে । রান্না করবে। এমন কী বাকি সময়টা তেল রঙের কিছু ছবি আঁকা শেষ করতে পারবে। ছবি আঁকার হাত ভালো মেঘার৷ হলুদ আর কমলার মিকচার দারুণ করে। দেখার মত । ফুলদানি ভর্তি বুনো গোলাপ ঝাড়ের একটা ছবি আঁকছিল। সেটা না হয় শেষ করবে এই ফাঁকে !
কাজের লোক থাকবে সাথে। সিদ্ধান্ত নিল । কাজে ছেলেটার নাম দুঃখীরাম । এক বছরের বেশি হল ওদের সাথে আছে । প্রায় ছোকরা বলা যায় । বিশ্বস্ত। জুতা সেলাই থেকে ইলিশ মাছের পাতুরি রান্নার মত কাজ দুঃখীরাম কে দিয়ে করানো যায়। ছোকরা একটা সম্পদ।
দুই মাস আগে শিশির আর মেঘা এসেছে নবীগঞ্জে।
তুমুল গতিতে লিখছে । লেখাটা নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট। রিভিশন দিতে গিয়ে বুঝতে পারল, দুই এক সপ্তাহের মধ্যে উপন্যাসটা শেষ হবে। বারবার কাটাকাটি করতে হচ্ছে। নতুন করে সংলাপ বসাচ্ছে।ওর বিশ্বাস , আগের লেখাগুলোর চেয়ে ভালো হবে। পাঠক পছন্দ করবেই । আর সিনেমাওয়ালারা তো অগ্রিম টাকা দিয়েই রেখেছে- চিত্রনাট্যের জন্য ।
নির্জনবাস এসে লাভই হয়েছে। ফোনে আড্ডা দেওয়ার বদঅভ্যাসটা দূর হয়ে গেছে চিরতরে। মেঘার সঙ্গ নতুন করে উপভোগ করতে পেরেছে। হানিমুনের পর এই প্রথম মেঘার সাথে এতটা আবেগি সময় কাটাতে পারল। শহরে থাকলে তো সিনেমাওয়ালা আর প্রকাশকদের ফোন রিসিভ করতে করতেই মেঘার অর্ধেক দিন চলে যেত।
এখানে এসে বেচারা দুঃখীরাম কয়েক দিন বেশ মন খারাপ করে বসেছিল।
ওর একটা বদভ্যাস ছিল। হলে গিয়ে সিনেমা দেখতো প্রতি শুক্রবারে। যত অখাদ্য সিনেমাই হোক , দেখবেই। এখানে এসে বেচারা গভীর সমুদ্রে পড়ে গেল যেন। এর মধ্যে ফাঁকতালে একবার শহরে গিয়ে নতুন সিনেমা ‘নাগ নাগিনীর অনন্ত প্রেম’ দেখে এসেছে। কিন্তু ত্রিশ মাইল দূরে গিয়ে সিনেমা দেখে আবার বাসে করে ফিরে আসা মস্ত বড় হ্যাপা, সেটা বুঝে গেছে বেচারা। আর বিরক্ত করেনি।
অবশ্য এই তিন মাসের জন্য দুঃখীরামকে বোনাস দেওয়া হবে।ওকে দেখলেই বোঝা যায়, বেচারা শহরের চকমকে জীবন ভীষণ মিস করছে। চেহারায় উদাসীন বাউলের ভাব।
ভয়ঙ্কর এই ঘটনার শুরু হল চৈত্র মাসের ভোরে।
আজ ।
ভোর সাড়ে পাঁচটার একটু পরে যখন শিশিরের ঘুম ভেঙ্গে আবিষ্কার করল ঠাণ্ডা ঘামে শরীর ভিজে গেছে। হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে , কোনও কারণ ছাড়াই । জিনিসটা বুকের খাঁচার ভেতরে এত দ্রুত ধুকপুক করছে , শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ওর।
চুপচাপ শুয়ে রইল কিছুক্ষণ ।
ঘড়ির কাঁটার শব্দ শুনতে পাচ্ছে। ফ্রিজের গুড় গুড় শব্দ ভেসে আসছে রান্নাঘর থেকে। নিজে নিজেই চালু আর বন্ধ হয় ওটা। এয়ার কন্ডিশনের হালকা গুঞ্জন। এ ছাড়া পুরো বাড়ি নিঝুম।
মনে করার চেষ্টা করল, কোনও দুঃস্বপ্ন দেখেনি তো ?
এক ঘুমে রাত পাড় করে সে। কখনোই জাগে না।
মাথা তুলে দেখল। পাশে ঘুমিয়ে আছে মেঘা । নিশ্চিন্তে। খানিক দূরে ছোট্ট বিছানাতে পিচ্চি বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। দুজনকে খানিকটা সময় নিয়ে দেখলো । বালিশের তলা থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছে নিল শিশির।
নিঝুম কামরা , পরিচিত দৃশ্য দেখে ওর হৃৎকম্পন স্বাভাবিক হয়ে গেল। সব ঠিক আছে।
দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম বোধ হয়।
ভাবল ।
কিন্তু কী দেখেছে মনে পড়ছে না। মন থেকে অস্বস্তি বোধ দূর হচ্ছে না। উঠে বসল বিছানার পাশে। ঢোলা টি শার্ট গায়ে চাপাল নিঃশব্দে। পায়ে নরম তলার স্যান্ডেল। মেঘা আর পিচ্চি যাতে না জেগে ওঠে , সে রকম হালকা পায়ে বেডরুমের দরজা খুলে বাইরে চলে এলো।
বাইরে চারকোণা বিশাল হলরুম।
এখন ওর হৃৎপিণ্ডের কম্পন স্বাভাবিক। কিন্তু মনের অস্বস্তি দূর হচ্ছে না কেন ? অবচেতন মন কিসের যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে। হলরুমটা ঘুরে দেখল। সবকিছু স্বাভাবিক। গত রাতে যেমন রেখে গিয়েছিল তেমনই।
বারান্দার দিকের কাচের জানালাগুলি ভাল করে বন্ধ করল। বাইরে ঝর্ণা থেকে টিপটিপ করে জল ঝরছে। কয়েকটা চেয়ার সুন্দর করে সাজানো। একটা চেয়ারের উপর ম্যাগাজিন পড়ে আছে। মেঘা পড়ছিল বিকেলে। এখন বাতাসে পাতা ওলটাচ্ছে।
পুরো বাড়িটা ঘুরে এল । স্টাফ কোয়ার্টারের দিকে তাকাল জানালা দিয়ে । দুইশো গজ দূরে স্টাফ কোয়ার্টার একদম সুনসান। প্রাণের কোন চিহ্ন নেই। কারণ আছে। দুঃখীরাম সকাল সাড়ে সাতটার আগে ঘুম থেকে ওঠে না।
অস্বস্তির কারণটা ধরতে না পেরে নিজের উপরই খানিক বিরক্ত হয়ে কিচেনে গেল শিশির। এই মুহূর্তে বিছানায় ফিরে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। এক পেয়ালা কফি খেয়ে কাজে লাগা যেতে পারে। কফি পারকোলেটরে প্লাগ ইন করে ঠোঁট গোল করে শিষ দিল । বাইরে ওদের পোষা এলসেশিয়ান কুকুর টিংকু ঘুরে বেড়াচ্ছে। সারারাত বাড়ি পাহারা দেয়। ভোরের দিকে কোয়ার্টারের পিছনে ছোট্ট কুকুরের বাসায় ঘুমিয়ে পড়ে।
টিনের বাউলের টিংকুর জন্য খাবার নিল শিশির। বাউলটা দরজার বাইরে রেখে আবার শিষ দিল।
তারপর বাথরুমে চলে গেল । দশ মিনিট পর দাড়ি গোঁফ কামিয়ে , শাওয়ার শেষ করে সাদা টি- শার্ট , নীল সুতির প্যান্ট আর সাদা স্নিকার্স, পরে আবার রান্নাঘরে চলে এল।
কফি পারকোলেটরের সুইচ অফ করে দরজা খুলে বাইরে আসতেই ভ্রু কুঁচকে গেল ওর । বাউল ভর্তি। টিংকুর খাবার ধরা হয়নি। আশেপাশে কোথাও কুকুরটার কোনও চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। কুকুরটার খাবার বাউলের দিকে তাকাতেই আবার ভয়টা ফিরে এলো। শিরশির করে মেরুদণ্ড দিয়ে ভয়ের স্রোতটা ঢুকে পড়ল শরীরের ভেতর।
আগে কখনও হয়নি এমনটা। যতদিন ধরে ওরা নির্জনবসে আছে, হালকা শিষের শব্দ পেলেই টিংকু দৌড়ে চলে চলে আসে।
আজ এমন হচ্ছে কেন ?
বাইরে চলে এলো শিশির। সোজা এসে থামল কাঠের তৈরি টিংকুর ঘরের সামনে । উঁকি দিল। ভেতরে কুকুরটা নেই।
খুব সকাল সকাল খোঁজ নিচ্ছি নাকি?- ভাবল। কুকুরটা এ সময় হয়তো বাইরে দৌড়ঝাঁপ করে। এর আগে জলখাবার তো এত জলদি দেওয়া হয়নি।
তারপরও ব্যাপারটা কেমন বেখাপ্পা লাগছে । আরও কয়েকবার শিস দিল। দূরের পাতলা ঝোপ ঝাড় আর বালিয়াড়ির দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। কুকুরটার কোন চিহ্ন নেই।
কিচেনে এসে পেয়ালাতে কফি নিয়ে ক্রিম ঢেলে লেখার কামরাতে ফিরে এল। লেখার টেবিলে বসে এক চুমুক কফি খেয়ে সিগারেট ধরাল।
পাণ্ডুলিপি পড়তে লাগল। খানিক পর আবিষ্কার করতে পারলো পড়ায় মন বসছে না। একই লাইন বারবার পড়ছে । বারবার আগে লাইনে ফিরে যাচ্ছে। মনের ভেতরে টিংকুর কথা ঘুরছে। গেল কোথায় কুকুরটা?
পাণ্ডুলিপি পড়া বাদ দিয়ে কফি শেষ করল। আবার ফিরে এল বাইরে। টিংকুর ব্রেকফাস্ট আগের মতোই পড়ে আছে। কুকুরটার ঘুমানোর জায়গাতে খোঁজ নিল।
নেই।
শিস দিল আরও কয়েক বার । কোনও ফল না পেয়ে ফিরে এল রুমে। সোফায় বসে খানিক রিল্যাক্স হবার চেষ্টা করলো। পূর্ব দিকে মুখ করে বসেছে। খানিক পরে দেখতে পেল লাল উলের বলের মতো সূর্য উঠছে। আকাশের রং গোলাপি। গোলাপির কয়েকটা শেড। সাথে খানিকটা আবীরের মত রঙ।
সারাজীবন সূর্য উঠার দৃশ্য ওকে মুগ্ধ করে। আজ করল না।
এই প্রথম আবিস্কার করল জায়গাটা অতিরিক্ত বিচ্ছিন্ন। বড্ড বেশি অনিরাপদ।
হঠাৎ করে পিচ্চির কান্না শুনতে পেল ।
দ্রুত বেডরুমে ফিরে এল। পিচ্চিটা ওর রুটিন মেনে সকালের প্রথম চেঁচামেচি শুরু করেছে। মানে খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। মেঘা বিছানায় বসা। ওকে দেখে হাসলো।
‘এত জলদি যে ?’ হাই তুলতে তুলতে জিজ্ঞেস করল মেঘা। ‘বাজে কটা ?’
‘সাড়ে ছয়।’ জবাব দিয়ে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে পিচ্চিকে কোলে তুলে নিল। পরিচিত স্পর্শ আর বাবার চেহারা দেখে দাঁতবিহীন মুখে ফোকলা হাসি হাসল পিচ্চি।
‘ভাল ঘুম হয়েছে তোমার ?’ আবারও মেঘার প্রশ্ন।
‘ভালই।’
মেঘা বাথরুমে গেল ফ্রেশ হওয়ার জন্য । ওর দিকে চেয়ে পুলক অনুভব করল শিশির । পাতলা নাইট ড্রেসের জন্য মেঘার শরীরটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে । আকর্ষণীয়। লম্বা সুন্দর পা।
পনের মিনিট পর।
মেঘা পিচ্চিকে দুধ খাওয়াচ্ছে । বিছানায় শুয়ে শুয়ে দৃশ্যটা দেখছে শিশির । এই দৃশ্যটা দেখতে খুব ভাল লাগে ওর।
‘কাল রাতে মোটর সাইকেলের শব্দ পেয়েছ ?’ আচমকা প্রশ্ন করে বসল মেঘা।
দুধ খাওয়ানো অনুষ্ঠানটা দেখায় এতই মগ্ন ছিল শিশির যে খানিক আগের সব ভয় ভীতি গায়েব হয়ে গিয়েছিল ওর মন থেকে। মেঘার প্রশ্নে এক লহমায় বাস্তবে ফিরে এল।
‘ মোটরসাইকেল ? কিছু শুনতে পাইনি আমি ।’
‘ কাল রাতে কেউ মোটর সাইকেল করে এসেছিল।’ পিচ্চিকে বিছানা রাখতে রাখতে বলল মেঘা । ‘রাত দুটোর সময়। আর ফিরে যাওয়ার শব্দ পাইনি।’
‘মানেটা কী?’ নিজের মাথা চুলে হাত চালাতে চালাতে বলল শিশির।
‘মোটরসাইকেলের শব্দ পেয়েছি রাতে।’ বিছানার পাশে বসে বলল মেঘা । ‘মোটর সাইকেলটা বাড়ির কাছে এলো। ইঞ্জিন বন্ধ হল। ব্যস আর কোন শব্দ পাইনি ।’
‘ওটা হাইওয়ে পেট্রল পুলিশের মোটরবাইকের শব্দ ।’ পকেট হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেট খুলতে খুলতে বলল শিশির । ‘ প্রতি রাতে একবার করে ঘুনটি দিয়ে যায়। মনে নেই ?’
‘কিন্তু এই মোটরসাইকেল আর ফিরে যায়নি।’
‘অবশ্যই চলে গেছে। তুমি শুনতে পাওনি । ঘুমিয়ে পড়েছিল। আর লোকটা যদি না গিয়ে থাকে তবে
কি এখন আমাদের বাড়িতে আছে নাকি?’
মেঘা চেয়ে রইল ওর দিকে।
‘তোমার কেন মনে হচ্ছে লোকটা বাড়িতে নেই ?’ মেঘার গলা শান্ত।
‘ দেখো।’ খানিক বিরক্ত হল শিশির। ‘ বাড়িতে অন্য লোক এসে ঘাপটি মেরে থাকবে কেন ? টিংকু আছে না ?ও চিৎকার করবে না?’
কথা শেষ করেই থেমে গেল শিশির। ‘ ইয়ে টিংকুকে সকাল থেকেই দেখছি না। আমি ওঁকে শিস দিয়ে ডাকলাম। আসেনি।’
উঠে বাইরে চলে এলো শিশির। দরজার বাইরে টিনের বাউলের খাবার আগের মতোই পড়ে আছে। আবার শিস দিয়ে ডাকল ।
সারা নেই।
‘কোথায় গেল খুব কুকুরটা ?’ মেঘার প্রশ্ন ।
বেডরুমে ফিরে এসেছে শিশির।
‘সম্ভবত বিড়াল ফিরাল ধাওয়া করতে করতে দূরে চলে গেছে। আমি খোঁজ নিচ্ছি।’
আবার বাইরে চলে এলো শিশির।
সকাল সাতটা।
এখনও ওঠেনি দুঃখীরাম । আরও আধা ঘণ্টা পর উঠবে।
যতক্ষণ হাঁটল লাগাতার শিস দিতে লাগল । স্টাফ কোয়াটার সহ পুরো বাড়িটা চক্কর কেটে বাড়ির মেইন গেটের সামনে এসে দাঁড়াতেই বেশ ধাক্কা খেল।
নরম বালিতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে শিশিরের গাড়ির টায়ারের দাগ। তার পাশে হালকা হলেও মোটর সাইকেলের টায়ারের দাগ দেখা যাচ্ছে। দাগগুলো মেইন রাস্তা থেকে সোজা চলে এসেছে ওদের নির্জনবাস বাড়ির মূল গেইটে। তারপর গেইটের কাছ থেকেই একেবারে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
একদম ভৌতিক ব্যাপার যেন।
দিশেহারা বোধ করল শিশির।
মাথার ভেতর বিপদের ঘণ্টা বাজছে ওর। পা বাড়ালো স্টাফ কোয়াটারের দিকে। তখনই দেখতে পেল মেঘা বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ওর দিকে চেয়ে হাত নাড়ছে।
‘শিশির , বন্দুকগুলো নেই ।’ ফ্যাকাসে মুখে বলল মেঘা।
‘বন্ধুক ? নেই? কি বল ?’
‘হ্যাঁ , স্টাডি রুমে তোমার বন্দুকগুলি নেই।
ব্যস্ত পায়ে দুজনেই স্টাডি রুমে চলে এলো।
প্রচুর বইতে ঠাসা এই রুমটা। দেওয়ালে কাছের গান র্যাকে পয়েন্ট ফোরটি ফাইভ শটগান আর একটা পয়েন্ট টু-টু রাইফেল ছিল।
এখন নেই।
শূন্য গান র্যাকের দিকে তাকিয়ে শিশির আবিষ্কার করল - ওর ঘাড়ের পেছনের চুলগুলো সর সর করে দাঁড়িয়ে গেছে
ঘুরে দেখলো, মেঘা চেয়ে আছে ওর দিকে।
‘জিনিসগুলো কাল রাতেও ছিল।’ কাঁপা গলায় বলল মেঘা।
‘ ঠিক।’ মাথা ঝাঁকাল শিশির। এগিয়ে লেখার টেবিলের ড্রয়ার খুলল । ওর নিজস্ব পয়েন্ট থার্টি ফোর অটোম্যাটিক পিস্তল থাকার কথা।
নেই।
‘তোমারটাও নেই ?’ দ্রুত পাশে এসে দাঁড়াল মেঘা।
জোর করে ফ্যাকাসে হাসি হাসলো ‘ শিশির। কাল রাতে বাড়ির ভেতরে কেউ ঢুকেছিল। আর বন্দুকগুলো সব চুরি করে পালিয়ে গেছে। আমি বরং পুলিশকে ফোন করি।’
‘আমার মনে হয় লোকটা এখনও এই বাড়িতেই আছে।’ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল মেঘা । ‘ মোটরসাইকেল ফিরে যাওয়ার শব্দ পাইনি কাল রাতে।’
টেলিফোন হাতে নিয়ে চমকে উঠল শিশির। ডায়াল টোন নেই। ফোন ডেড।
‘ফোন কাজ করছে না।’ রিসিভার নামিয়ে রাখতে রাখতে রাখতে বলল শিশির।
‘ কিন্তু কাল রাতেও ঠিক ছিল। আমরা ফোন করেছি ঢাকায়।’ ফ্যাঁকাসে মুখে বললো মেঘা। ‘আর এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক নেই। সবসময় তো ল্যান্ড লাইন দিয়েই ফোন করি।’
‘জানি। কিন্তু ফোন এখন কাজ করছে না।’ চিন্তিত মুখে বলল শিশির। ‘ কাল রাতে যেই আসুক বন্দুক চুরি করেছে সে। টেলিফোন লাইন কেটেছে। এবং সম্ভবত টিঙ্কুর কোন ক্ষতি করেছে।’
‘ আমার ভয় করছে।’ শিশিরের হাত শক্ত করে ধরে ফেলল মেঘা।
‘ ভয় পেয়ো না। তুমি পিচ্চির দিকে খেয়াল রাখ। আমি দেখি দুঃখীরামের কী অবস্থা।’
বেডরুমে ফিরে এল দুজন। পিচ্চি ওর দোলনায় শুয়ে মোটা মোটা পা শূন্যে তুলে লাথি মারছে অদৃশ্য কিছুকে। মুখ দিয়ে লাগাতার অর্থহীন শব্দ করেই যাচ্ছে।
‘তুমি এখানে থাকো। আমি কয়েক মিনিটের মধ্যে ফিরে আসছি।’
‘ না।’ চেঁচিয়ে উঠল মেঘা। ‘আমাকে একা রেখে কোথাও যাবে না তুমি।’
‘ঠিক আছে। ঠিক আছে। তুমি তোমার কাজ করো। নার্ভাস হবে না।’
জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল শিশির । পাল্লা খুলে উঁচু গলায় হাঁক দিল, ‘দুঃখীরাম শুনতে পাচ্ছো ?’
এখান থেকে আগেও হাক দিয়ে দুঃখীরামকে প্রয়োজনে ডেকছে ওরা।
প্রত্যেকবার জবাব পেয়েছে। আজ হল না। ব্যাটা মড়ার মতো ঘুমোয়।
‘ আমার সাথে চলো তুমি।পিচ্চিকে সাথে নাও।’
তিন জনের দলটা বাড়ির পেছনের কোয়াটারের দিকে চলে এলো।
দুঃখী রামের কামরার দরজায় নক করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল ওরা। বাইরে সাংঘাতিক গরম। গরমের জন্য চোখ পিটপিট করছে পিচ্চি । ওর দুই হাতের মুঠো আরও শক্ত হয়ে গেছে।
‘আমি ভেতরে গিয়ে দেখছি , তুমি এখানে দাঁড়াও।’
হাতল ধরে টান দিতেই বিনা প্রতিবাদে খুলে গেল দরজা। জোড়ে হাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল সে।
ভেতরে কেউ নেই। রান্নাঘরের সিঙ্কের উপর একটা ট্যাঁপ খোলা। ওখান থেকে টুকটুক করে নিয়মিত ছন্দে জল ঝরছে।
কয়েক মুহূর্ত দোনামোনা করল সে। তারপর দুঃখীরামের বেডরুমে ঢুকে পড়ল। ভেতরে অন্ধকার। সুইচে চাপ দিতেই আলোয় ঝলমলে হয়ে উঠল। কামরাটা ছোট। কিন্তু দারুন করে সাজানো। বিছানার চাদর কুঁচকে আছে। কিন্তু দুঃখীরাম নেই। পাশের সবগুলো কামরা চেক করে ফিরে এলো মেঘার কাছে।
‘সে নেই।’
‘মানে দুঃখীরাম বন্দুক আর টিঙ্কুকে চুরি করে চলে গেছে ?’ পিচ্চিকে শক্ত করে কোলের সাথে চেপে ধরে জানতে চাইল মেঘা।
‘হতে পারে।’ জবাব দিল শিশির। মনে মনে ব্যাপারটার পাজল মেলাতে চাইছে। ‘ দুঃখীর জন্য ব্যাপারটা একদম সহজ। টিঙ্কুকে যত্নআত্তি দুঃখী নিজেই করত। কাজেই টিংকু কোন রকম ঘেউ মেউ করবে না। কাল রাতে পালিয়ে গেছে বন্দুক চুরি করে।’
‘হঠাৎ করে বন্দুক চুরি করতে যাবে কেন?’
নিজের মাথায় চুলে আঙুল চালাতে চালাতে শিশির বলল , ‘আরে এই সব চাকর বাকর কিসিমের মানুষগুলোকে বিশ্বাস করা ঠিক না। উজবুকটা বোধহয় কোন আন্তঃজেলা ডাকাত দলে যোগ দিয়েছে। ডাকাতি করবে কোথাও। তাই বন্দুকগুলো নিয়ে গেছে। যাওয়ার আগে বুদ্ধি করে ফোনে লাইনও কেটে দিয়েছে। আর কিছু না হলেও ডাকাতদলের কাছে বন্দুকগুলো বিক্রি করতে পারবে তো?’
‘কিন্তু কেউ যদি মোটরসাইকেলে করে ওকে নিয়ে যায়, তবে দুজন মানুষ বন্দুক আর কুকুর সবাই এক মোটরসাইকেলে যাবে, সম্ভব সেটা ?’
জানতে চাইল মেঘা।
‘অত মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। আমরা বরং গাড়িতে করে মেন রোডে যাই। নবীগঞ্জে একটা পুলিশ স্টেশন আছে। ওখানে গিয়ে রিপোর্ট করি। তুমি পিচ্চিকে নিয়ে রেডি হও। আমি গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করছি।’
এতক্ষণে যেন মেঘার ধরে প্রাণ ফিরে এল। প্রায় দৌড়ে বাড়ির ভিতরে চলে গেল।
কী মনে করে শিশির আবার ঢুকে পড়ল দুঃখীরামের বেডরুমে। আলনাতে দুঃখী জামাকাপড় সব রয়েছে। টেবিলের উপর দাঁড়ি কামানোর সরঞ্জামগুলো ও রয়েছে। ঢাকাই সিনেমার নায়িকার ছবি সাঁটানো সস্তা আয়না। রেজার। সেভিং ব্রাশ। ক্রিম।
পাশে দামি রেডিওটা দেখে থমকে গেল সে। শিশির উপহার দিয়েছিল জিনিসটা। দুঃখীরামের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস। বালিশের তলায় পেল দুঃখীরামের মোবাইল ফোনটা। সস্তা ধরনের বাঁটুল ফোন।
এই প্রথম ব্যাপারটা নিয়ে নতুন কিছু ভাবতে লাগলো শিশির। দুঃখীরাম যাই করুক অন্তত মোবাইল বা রেডিও না নিয়ে ভাগতে পারে না। অনেক প্রিয় জিনিস ছিল এ দুটো । বিশেষ করে রেডিওটা সারাদিনই কানের গোড়ায় ধরে থাকতো।
কেন যেন মনে হচ্ছে দুঃখীর কপালেও খারাপ কিছু হয়েছে।
গ্যারেজের ভেতরে নীল রঙের ক্যাডিলাক গাড়িটা পার্ক করা ।
মনের ভেতরে আবার স্বস্তির ভাব ফিরে পেল। ইগনিশনে চাবি ঢুকিয়ে চাপ দিয়ে একইসাথে গ্যাস প্যাডেলে পা দিল - ইঞ্জিন চালু করার জন্য।
হাঁপানি রোগীর মতো শব্দ করল গাড়িটা । কিন্তু চালু হল না।
কারণ কী ?
কাল রাতেও গাড়িটা ভাল ছিল । দুঃখীরামকে নিয়ে শহর থেকে বাজার সওদাই করে ফিরেছে৷।
ঠিক সেই অর্থে গাড়ির দক্ষ মেকানিক না । তারপরেও দরকারি প্রায় সব কিছুই মোটামুটি জানে।
নেমে বনেট তুলে পরীক্ষা করল।
সবগুলো স্পার্কিং প্লাগ টেনে খুলে ফেলা হয়েছে।
আবারও দিশেহারা অনুভূতি হল ওর। কপাল থেকে ঠান্ডা ঘাম নেমে এলো ফোঁটায় ফোঁটায়।
পুরো ব্যাপারটা আতঙ্কজনক।
একা হলে অতটা ভয় পেত না। পিচ্চি আর মেঘার কথা মনে হতেই দুর্বল মনে হল নিজেকে।
টিঙ্কুকে পাওয়া যাচ্ছে না ।
দুঃখীরাম নেই।
বন্দুকগুলো নেই।
টেলিফোন নষ্ট।
গাড়ি নষ্ট।
কেন যেন মনে হল- সাংঘাতিক কিছু হতে যাচ্ছে । মস্ত বড় বিপদে পড়তে যাচ্ছে ওরা। হঠাৎ করে মনে পড়ল, বাড়ির ভেতরে মেঘা আর পিচ্চি একা রয়েছে। ঝড়ের বেগে ছুটলো সে।
ছোট্ট একটা ব্যাগ গোছাচ্ছে মেঘা। পিচ্চির দুধের বোতল আর হাবিজাবি সহ। শিশিরের ভাব ভঙ্গি দেখে বুঝতে পারল, মস্ত কোন ভজকট হয়েছে। ‘কি ব্যাপার?’
‘মনে হয় কোন সমস্যায় পড়েছি।’ জবাব দিল শিশির। ‘ গাড়ি নষ্ট। কায়দা করে আমাদের বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে কেউ।’
ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ল মেঘা। ‘গাড়ির আবার কি হয়েছে?’
‘প্ল্যাগ টেনে খুলে ফেলেছে কেউ। দুঃখীরাম ওর দামি জিনিসপত্র যেমন- রেডিও আর মোবাইল, সেভ করার জিনিসপত্র রেখে গেছে। তোমাকে ভয় দেখাতে চাইছি না৷ কিন্তু মন বলছে, কোন বড় রকমের কোন সমস্যায় পড়তে যাচ্ছি আমরা। কেউ একজন বাড়িতে এসে...।’
বলতে গিয়েও থেমে গেল সে। মনে হচ্ছে বেশি কথা বলছে। ভয় পাবে মেয়েটা ।
‘তোমার মনে হয় দুঃখীরাম এ সব করেনি ?’ অনেকক্ষণ পর বলল মেয়েটা।
‘না। কারণ ওর সব জিনিসপত্র আগের মতোই আছে।’
‘তবে দুঃখী কোথায় গেল?’
‘জানি না।’
‘আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকব না।’
‘এখান থেকে হাইওয়ে তিন মাইল দূরে । পিচ্চি আর তোমাকে নিয়ে এত দূর হেঁটে যেতে পারব না। গরম দেখেছ ? আর এই তিন মাইলের মধ্যে একটা টং এর দোকান পর্যন্ত নেই৷’
‘ আমি কিছু শুনতে চাই না। এই বাড়িতে আর এক মুহূর্তও থাকব না। তুমি পিচ্চিকে কোলে নেবে । আমি ওর জিনিসপত্র ব্যাগে ভরে নেবো। কিন্তু এ বাড়িতে থাকব না।’
কয়েক মুহূর্ত ভেবে মাথা ঝাঁকালো শিশির । ‘ ঠিক আছে। তবে অনেকটা পথ হাঁটতে হবে । জল দরকার হবে। আমি ভ্যাকুয়াম ফ্ল্যাক্স ভর্তি ঠান্ডা জল নিয়ে নিই । কয়েক ঘন্টার মধ্যেই জায়গাটা নরকের মতো গরম হয়ে উঠবে । জানোই তো।’
‘যা খুশি করো। তবে জলদি।’
কিচেনে এসে বরফ ঠান্ডা জল দিয়ে ফ্ল্যাক্সটা ভরে নিল শিশির। লেখার রুমে গিয়ে ড্রয়ার থেকে দুই প্যাকেট সিগারেট, ক্রেডিট কার্ড আর ব্যাঙ্কের চেকবইটা তুলে নিল। নগদ টাকা সব মেঘার কাছেই। ওর ব্যাগে ভরে নিয়েছে।
বেডরুমে মেঘা ব্যাগ গোছাচ্ছে তখনও।
‘হাতে করে ছাতা নিও একটা।’ বলল শিশির। ‘ পিচ্চিকে ঢেকে রাখতে পারবে। গয়নাগুলো মনে করে ব্যাগে ভরে নাও। আর গোল টুপিটা মাথায় পরে নিও।’
আচমকা ওঁকে চমকে দিয়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল মেঘা। সোজা চেয়ে আছে শিশিরের পায়ের দিকে ।
বোকার মতো নীচের দিকে তাকাল শিশির। ওর ডান জুতায় কোণার দিকে লালচে দাগ দেখা যাচ্ছে। মেরুন লাল । বাইরে হাঁটাহাঁটির সময় কখন যেন জমাট বাঁধা রক্তে পা দিয়েছিল সে।
দুই
নবীগঞ্জে নির্জন বিচ্ছিন্ন এই বাড়িতে কী হচ্ছে?- জানতে হলে একটু পিছনে ফিরে যেতে হবে ।
তিন মাস আগের কথা।
তখন প্রায় সব কয়টা দৈনিকে খবরটা ছাপা হয়েছিল।
বিখ্যাত উকিল শিবশঙ্কর চাকলাদার বাবু তার নিজের মুখে পিস্তল ঠেকিয়ে টাক মাথাটা উড়িয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করেন। চাকলাদার বাবু উকিল হিসেবে যত না বিখ্যাত ছিলেন, তার চেয়ে বেশি ছিলেন স্টক মার্কেটের দালাল হিসাবে। তার চেয়ে বড় কথা, বিখ্যাত অপরাধী এবং গ্যাংস্টারদের নেতা কেশু হাওলাদারের ম্যানেজার ছিলেন তিনি ।
এই বার কেশু হাওলাদারের কথা দরকার । মূল কাহিনি উনাকে নিয়েই।
কেশু হাওলাদার অপরাধ জগতের নক্ষত্র। কম বেশি সবাই তাঁর নাম শুনেছে। বর্তমান বয়স ষাট । সব কিছু থেকে অবসরে আছে সে।
কারণ ?
যৌবনে দুই হাত ভরে প্রচুর কামিয়েছে। গত ত্রিশ বছর ধরে সে ছিল অপরাধ জগতের মুকুটহীন সম্রাট। বাংলাদেশে অমন মেধাবী কোনো লোক এর আগে অপরাধ জগতে এসেছিল কিনা সন্দেহ। আর আসবে কি না, সেটাও সন্দেহ।
কেশু হাওলাদার জীবন শুরু করেছিল কালা সিরাজ ভাইয়ের বডি গার্ড হিসাবে। কালা সিরাজ ভাই ছিল উঠতি অপরাধী এবং চট্টগ্রাম শহরে বড় সড় একটা অপরাধী দলের নেতা। ভাড়াটে হিসাবে বেশ কয়েকটা রাজনৈতিক খুন করে নাম কামায় কালা সিরাজ ভাই ।
হোটেল , গারমেনটস মালিক, কারখানার মালিক হতে শুরু করে শহরের অন্যান্য ছোট বড় সব ধরনের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করত কালা সিরাজ ভাই । মাসিক চুক্তি। মোটা অঙ্কের।
না দিলে?
লোকটা হারিয়ে যেত । লাশ পাওয়া যেত নদীতে। বা নির্মাণধীন কোন বাড়ির বালি আর সিমেন্টের মধ্যে ।
ক্ষমতায় টিকে থাকতে আর আইনের হাত থেকে বাঁচতে কালা ভাই রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন । এইসব লাইনে সময় লাগে না কারও । ট্রাক ড্রাইভার এবং ডক শ্রমিকদের নেতা হয়ে যায় এক সময়।
ধাপে ধাপে ভালই যাচ্ছিলেন কালা সিরাজ ভাই। হয়তো সংসদ সদস্য হয়ে যেত । আর ঠিক সেই সময় পুলিশের হাতে খুন হয়ে যায় কালা সিরাজ। নিজের এলাকার বাইরে গিয়ে চাঁদা তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু পুলিশের ভাগ হজম করে দিতে চাওয়ায় এই দুর্ঘটনা। থানায় ডেকে নিয়ে আলোচনার কথা বলে ওখানেই হজম করে ফেলা হয়।
কালা সিরাজ মারা যেতেই দলের হাল ধরে ফেলে কেশু হাওলাদার।
সিরাজের বডি গার্ড হিসাবে ছায়ার মত পাশে থেকে থেকে এই লাইনের সব অলি গলি চিনে ফেলেছিল এতদিনে । একদম দ্বিতীয় কালা সিরাজ হয়ে গেল সে। বলতে গেলে আরও নিখুঁত। আরও ধূর্ত। আরও ক্ষুরধার ।
এবং ত্রিশ বছর ধরে এই লাইনে থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেল সে।
পুলিশ, সাংবাদিক আইনের রক্ষক সবাই জানত কেশু একজন ঘাঘু অপরাধী। এবং মস্ত বড় গডফাদার। গত বছরগুলোতে তিনটে মস্ত বড় ব্যাঙ্ক ডাকাতি এই লোকের পরিকল্পনা মত হয়েছে। সব ধরনের মাদক আর জুয়ার ব্যবসা আড়াল থেকে এই লোক নিয়ন্ত্রন করে। তারপরও কেশুকে গ্রেফতার করার জন্য কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে কোন রকম প্রমাণ ছিল না।
আশ্চর্য রকমের গভীর জলের মাছ এই কেশু হাওলাদার।
ভাগ্যের ফেরে সোনায় সোহাগার মত তার পাশে জুটে গিয়েছিল শিবশঙ্কর চাকলাদারের মত ধুরন্ধর এক ক্রিমিনাল ল-ইয়ার। সারা জীবন আড়াল করে রেখেছে কেশু হাওলাদারকে।
পঞ্চান্ন বছর বয়সে কেশু ঠিক করল, এই লাইন থেকে সরে যাবে সে। কিন্তু কাজটা মোটেও সহজ না। চাইলেই কেউ এই লাইন থেকে সরে যেতে পারে না। বাচ্চাদের খেলা না এটা। পছন্দ হল খেললাম। ভাল লাগল না থুক্কু বলে খেলা ছেড়ে দিলাম।
যেই মাত্র সে অপরাধ লাইন ছেড়ে দেবে তক্ষুনি ভাড়াটে খুনি বা কাছের কোন বন্ধুর হাতে মারা পড়বে সে।
কাছের মানুষটা হয়ে যাবে দলের মাথা।
কিন্তু কেশু হাওলাদার তো বোকা না।
প্রথমেই সব টাকা ক্যাশ করল সে। চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে এলো নারায়ণগঞ্জে। প্রচুর টাকা দিয়ে বাড়ি কিনল একটা। কেউ জানতেই পারল না, কেশু কোথায় এসেছে ।
বিশ কোটি টাকা হাসি মুখে বিলিয়ে দিল প্রিয় সাগরেদদের মধ্যে। চাঁদা তোলা, ড্রাগ, আর জুয়ার আড্ডা সমান ভাগে ভাগ করে দিল দলের সবার মধ্যে।
প্রতিপক্ষ, যারা কেশুকে পছন্দ করতো না তাদের মধ্যেও বিলিয়ে দিল অনেক কিছু। ফলে কারও মনে কেশুর উপর কোন রকম রাগ, ক্ষোভ বিদ্বেষ রইল না এক চিমটি ও।
বাকি সব নগদ টাকা তুলে দেওয়া হল শিবশঙ্কর চাকলাদারের হাতে। শেয়ার ব্যবসা লাগানো হল সেই টাকা।
সেই রকমের মাখন মার্কা একটা আয়েশি জীবন পেয়ে গেল কেশু । ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও রকম চিন্তা নেই। নারায়ণগঞ্জের কিল্লারপুলের ওখানে এক একর জায়গার ওপর বিশাল বাগানবাড়ি মার্কা বাড়ি কিনে ফেলেছে। স্থানীয় অভিজাত সমাজে কেশু হাওলদারকে সবাই সম্মান করে। আক্ষরিক অর্থেই ভদ্রলোক সে।
দলের সর্দার থাকাকালীন সময়ে কেশু বিয়ে করে ফেলেছিল । মেয়েটার নাম - হেলেন। গহন ঘন কালো চুল , দারুণ রকমের চোস্ত একহারা ফিগার আর টানা টানা চোখ। বয়সের তুলনায় একটু বয়স্ক দেখায় - এই যা খুঁত।
হেলেন ভাল করেই জানত, কেশু কী করে। আয়ের উৎস কী। তারপরও কিশুকে সে বিয়ে করে। না, কেশুর টাকা বা ক্ষমতার জন্য নয়৷ হতভাগিনী বেচারি আসলে কেশুর প্রেমে পড়ে গিয়েছিল।
অপরাধ জগৎ ছেড়ে দেওয়ার পর কেশু কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই ভদ্র জীবনযাপন করত। বেশিরভাগ সময় প্যারাডাইস ক্লাবে গিয়ে গলফ খেলত । তাস খেলত । ব্রিজ। কখনও বিলিয়ার্ড। মদ খেত সামান্য। খেয়াল রাখত যেন মাতাল হয়ে না যায়। মাতাল ব্যক্তি কিন্তু ভদ্রলোক হতে পারে না।
শহরের কেউ ভুলেও কল্পনা করতে পারত না - একশো ভাগ নিপাট ভদ্রলোক কেশু হাওলাদারের অতীত কী ছিল? অভিজাত সমাজে ভীষণ রকম জনপ্রিয় এই দম্পতি। সামাজিক অনুষ্ঠানে পিয়ানো বাজিয়ে হেলেন গান টান গায়। যদিও খানিকটা মোটা হয়ে গিয়েছিল হেলেন , তারপরও গলার স্বর দারুণ মিষ্টি । ভুলেও হেলেনের সাথে তরল রসিকতা করার চেষ্টা করে না কেউ। সম্মান করে সবাই। হেলেনের ব্যক্তিত্বই সেই রকম।
দিনের কিছু সময় কেশু একা থাকে। আলাদা আর একদম একা। যখন হেলেন কেনাকাটার জন্য শপিং মলে গিয়ে ঘোরাঘুরি করে অথবা বৃষ্টি দিনে কেশু যখন গলফ খেলতে যেতে পারে না । বা ক্লাবে যাবার মুড থাকে না। ঠিক সেই সময়গুলোতে মনে মনে কেশু গ্যাংস্টারদের সর্দার হয়ে যায় ।
তবে ফেলে আসা জীবনের জন্য মোটেও আফসোস করে না ।
সেইসব ভাগ্যবানদের একজন সে৷ যাঁরা অপরাধ ছেড়ে সুন্দরভাবে ভদ্র জীবনযাপন কাটাতে পারছে। সবাই পারে না। আরও বড় কথা, কোন রকম দাগ নেই কেশুর । ফুট প্রিন্ট নেই। পুলিশ লেগে নেই ওর পিছনে। অতীত জীবন নিয়ে কেউ ঘাঁটছে না । ডিবি অফিস বা ক্রাইম ব্রাঞ্চের আফিসে কোন ফাইল নেই ওর নামে।
সব মুছে রেখে এসেছে।
শিবশঙ্কর চাকলাদার মশাই বুদ্ধি করে কেশুর সব টাকা নানা জায়গায় খাটাচ্ছে।বেনামে। তিন মাস পর পর লাভের মোটা টাকা তুলে দিচ্ছে কেশুর হাতে। নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দেয় কেশু ।
অবসর সময়ে বসে মাথা খাটায় সে। ভয়ঙ্কর সব ব্যাঙ্ক ডাকাতি, অপহরণ আর নিষিদ্ধ সব কাজের প্ল্যান পরিকল্পনা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টার মাথা ঘামায় । দাবা খেলার মত। প্ল্যান বানায়। সেখান থেকে খুঁত বের করে আবার নতুন করে পরিকল্পনা করে। শেষে ফাইনাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে গিয়ে আবিষ্কার করে একদম নিখুঁত ছক ছিল ওটা।
এভাবে একা একা অপরাধ নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে মনে মনে উত্তেজিত হয়ে যায় । আবিস্কার করে সময়টা দারুণ কাটছে । অবসর সময়ে অপরাধ নিয়ে ভাবতে ভালবাসে প্রাক্তন এই সর্দার। আবিষ্কার করে, মগজ আগের মতোই আছে। রেজরের মত ধার। এটা ওর মগজের ব্যায়াম। মন সতেজ থাকে। আনন্দ পায়।
গত কালই চিন্তা করে দেখতে পেলো, মাত্র পাঁচ জন লোক নিয়ে সিটি ব্যাংক ডাকাতি করে পুরো ব্যাংক খালি করে দিতে পারে সে। এবং ধরা পড়া কোনও চান্সই নেই।
আজ সকালে যখন হেলেন বাইরে গেল। তখন বসে বসে আবিষ্কার করল দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ীর একমাত্র আদরের মেয়েটাকে সহজেই অপহরণ করা যায়। এবং বেশ বড় অঙ্কের মুক্তিপণও আদায় করা যায়।
হেলেন মাঝে মাঝেই দেখে স্বামী একা- একা চুপচাপ বারান্দায় বসে কী যেন চিন্তা করে। অনেক সময় নিয়ে- ঘণ্টার পর ঘণ্টা। জিজ্ঞেস করে না কখনও। বেচারি কল্পনাও করতে পারে না , স্বামী মানে কী সব ভয়ঙ্কর চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।
শিবশঙ্কর চাকলাদার যে সকালে আত্মহত্যা করল, সেই সকালে কেশু হাওলাদার প্যারাডাইস ক্লাবে গলফ খেলছিল। খেলার শেষে বারে বসে অতিরিক্ত লেবুর ফালি দেয়া ডাবল জিনের অর্ডার দিল। ভাল মতো গ্লাসে চুমুক দেওয়ার আগেই ওয়েটার এসে বলল, ‘স্যর আপনার একটা ফোন এসেছে। চিটাগাং থেকে।’
কেশু বুঝল কার ফোন। শিবশঙ্করের ফোন । কোন এক অদ্ভুত কারনে লোকটা ল্যান্ডলাইনে কথা বলতে বেশি পছন্দ করে। ল্যান্ডলাইনের নাকি কম রেকর্ড থাকে ! মোবাইল সহজেই ট্রেস হয়।
উঠে গিয়ে ফোনটা ধরল কেশু । খুশিতে গুণগুণ করছে। শিবশঙ্করের ফোন মানেই টাকা পয়সা।
কিন্তু আবু বক্কর সিদ্দিকী ফোন করেছে , শিবশঙ্কর চাকলাদারের কেরানি । সালাম দিয়ে খবরটা জানাল।
‘নিজের মাথায় গুলি করেছে ?’ আবু বক্করের কথাটাই রিপিট করল কেশু। তলপেটের ভিতরটা কেমন খালি খালি লাগছে। ত্রিশ বছর ধরে চাকলাদার বাবুকে চেনে। ভালো করেই জানে সব। উকিল মশাই ঘাঘু উকিলই ছিল। ছিল শেয়ার বাজারের দুর্ধর্ষ দালাল। কিন্তু সেই সাথে আরও কিছু গুণ ছিল ভদ্রলোকের। মেয়েমানুষ আর জুয়া। এই দুইয়ের প্রতি বেশুমার টাকা ওড়াত চাকলাদার।
উকিলবাবু আত্মহত্যা করেছে ! ব্যাপারটাতে বোঝা যায় আর্থিক অবস্থার হাল এমন করেছিল যে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।
হঠাৎ করেই কেশু হাওলাদারের মনে হল , কপালে ঠাণ্ডা ঘাম জমে গেছে।
নিজের ত্রিশ কোটি টাকার জন্য বুকটা হাহাকার করে উঠল। শিবশঙ্করের কাছেই ছিল টাকাগুলো।
পরের দু সপ্তাহের মধ্যে সব জানা গেল।
মোট ছয় মক্কেলের টাকা খেয়ে হজম করে ফেলেছে চাকলাদার বাবু । কেশু তাদের মধ্যে একজন। ওই ছয়জনের সাথে চাকলাদারের দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক ছিল। সবাই বিশ্বাস করত তাঁকে। মোটা অঙ্কের টাকা রেখেছিল সবাই চাকলাদার জিম্মায়। উকিল বাবু সেই টাকা সুদে খাটাত আর নানা শেয়ারে বিনিয়োগ করত।
সেই সাথে... চাকলাদার জুয়া খেলত। অনলাইনের জুয়া।
তার চেয়ে বড় কথা, ক্লায়েন্টের টাকা তুলে নিয়ে জুয়া খেলা শুরু করেছিল। দীর্ঘদিন ধরে। হারছিল ক্রমাগত। নিজের বাড়ি ঘর পর্যন্ত বিক্রি করে জুয়া খেলেছে । এক সময় পৌঁছে যায় তলানি পর্যন্ত । বহু আগেই খেয়ে ফেলেছে কেশুর টাকা। জানে, কেশু তাকে জ্যান্ত রাখবে না। তাই কেশুকে কষ্ট না দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করল ক্রিমিনাল লইয়ার । পরিশ্রমের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল কেশুকে ।
নগ্ন সত্যটা হজম করতে বেশ সময় লাগল কেশুর ।
গত ত্রিশ বছর ধরে চাকলাদার বাবুর সাথে হাত দিয়ে চলেছে সে। এবং শেষ পর্যন্ত কেশুকে প্রায় রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে গেছে শূয়রের বাচ্চাটা।
বাড়ি- হেলেনের গয়না, দুটো গাড়ি আর ব্যাঙ্কে রাখা সামান্য লাখ দশেক টাকা ছাড়া এই মুহূর্তে কিছু নেই কেশুর । বণ্ড, শেয়ার আর নগদ টাকা সবই ছিল শিবশঙ্করের কাছে। এবং এই মুহূর্তে সব গায়েব। শিবশঙ্করের গোপন সিন্দুক কোথায় সেটাই বা কে জানে !
চাকলাদারের অফিসে গিয়ে কেরানি আবু বক্করের মুখোমুখি বসেছিল কেশু । আবু বক্কর লোকটা তালগাছের মতো লম্বা। মাথাটা ইন্ডিয়ান বেগুনের মতো বড়। গোল গোল চোখ দুটো পাক্কা বাটপার চোখ।
শুকনো তোম্বা মুখে আবু বক্কর বলল , ‘স্যার ব্যাপারটা জন্য আমি আসলেই দুঃখিত। অফিসে আমরা পাশাপাশি থাকলেও কোনও ধারণাই ছিল না উনি কী করছেন । চেহারা দেখে কি আর মনের খবর জানা যায় ? আমাকে কিছুই জানতেন না। আপনার একার নয়। আরও অনেকের টাকা হজম করে আরও অনেককেই তিনি ফতুর বানিয়েছেন। জুয়া খেলে কেউ কি কখনও কোটি কোটি টাকা হারে ? মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল বেচারার ।’
ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালো কেশু। জীবনে এই প্রথম তাঁর মনে হল , সে বুড়ো হয়ে গেছে।
শান্ত গলায় বলল, ‘ একটা উপদেশ দেই বক্কর মিয়া, সাংবাদিক বা পুলিশ ভুলেও যেন না জানে তোমার উকিলের কাছে আমার টাকা ছিল বা আমার টাকা খোয়া গেছে। যদি জানে তবে বুঝব তুমিই তাদের বলেছ। তখন নারায়ণগঞ্জ থেকে আবার ফিরে এসে এই অফিসেই তোমাকে খুন করব আমি।’
ক্লান্ত পায়ে চাকলাদারের অফিস থেকে বের হয়ে গেলো কেশু।
বাইরে গনগনে রোদ।
গাড়িতে উঠে ড্রাইভিং সিটে বসে রইল অনেকটা সময়। মুখে চোখে অন্ধকার দেখছে৷ টাকা পয়সা ছাড়া সামনের দিনগুলো কাটবে কি করে ? বাড়ি বিক্রি করতে হবে ? হেলেনকে সব জানাবে ?
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল হেলেন কিছু জানাবে না।
কিন্তু কী করবে ?
বাকি জীবনটা কাটাবে কী করে ?
নতুন একটা গাড়ির অর্ডার দিয়েছে গত সপ্তাহে । হেলেনকে নিয়ে ছুটি কাটাতে যাবে, কথা দিয়েছে। সামনেই হেলেনের জন্মদিন । ইউরোপে যাবার কথা ছিল । ওখানের একটা হোটেল বুকিং দেওয়া হয়েছে। এই মুহূর্তে কী করে হেলেনকে বলে ওর হাতে টাকা নেই ! ব্যাঙ্কে যা আছে বছর খানেক যাবে না হয়তো।
সিগারেট ধরিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করতে লাগল। ভাবছে। মাথা খাটাচ্ছে পুরোদমে। আচ্ছা খুব বেশি কি বয়স হয়ে গেছে ওর ? নতুন করে কিছু করা যায় না আবার ? কীভাবে ?
আর এই অল্প সময়ে কয়েক কোটি টাকা বানানো যায় কী ভাবে ? কোনও ঝামেলা আর ঝুঁকি ছাড়া !
ভাবছে কেশু।
সে যখন বাড়িতে ফিরল, হেলেন তখন বাইরে বেরুচ্ছিল শপিং করার জন্য। মুখ তুলে প্রশ্ন করল,
‘ভদ্রলোক আত্মহত্যা করলেন কেন?’
‘অতি চালাকের গলায় দড়ি ।’ বিষণ্ণ হেসে জবাব দিল কেশু । ‘ এইসব লোকদের শেষ পর্যন্ত এমন দশাই হয়।’
‘ দেনায় ডুবে গিয়েছিল ?’ দু চোখ বড় বড় করে বলল হেলেন । তাঁর কাছে চাকলাদার বাবু একজন জাদুকর। যেখানে হাত দেবে সেখান থেকে টাকা বানাবে। এই লোক নর্দমায় হাত দিলেও সেখান থেকে হীরা তুলে আনবে। এমন লোক ফতুর হয়ে যাবে ? ভাবতেও পারে না।
মাথা ঝাঁকাল কেশু । ‘একদম ফতুর।’
‘বেচারা।’ দুঃখী ভঙ্গিতে হাত নাড়ল হেলেন। ‘ আমাদের কাছে এলেই তো পারত। তুমি টাকা ধার দিতে পারতে। হয়ে যেত। বেচারা ।’
‘তুমি বেরোচ্ছ নাকি?’
‘হ্যাঁ । কিছু গয়নার অর্ডার দিয়েছিলাম। দেখি কতটুকু হল। সামনে স্বর্ণের ভরির দাম বাড়তে পারে। একটু বেশি অর্ডার দিয়ে রাখি।’
কথাটা প্রায় গলা পর্যন্ত চলে এসেছিল। তারপর নিজেকে সামলে নিল কেশু । শান্ত গলায় বলল, ‘আচ্ছা যাও।’
নিজেকে কামরায় এসে বসল।
হেলেনের ফিরতে কমপক্ষে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগবে। গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ পেল। চলে গেছে হেলেন । সিগারেট ধরিয়ে চিন্তা করতে লাগলো। কামরার ভেতরে ঘড়ির টিকটিক আর ওর ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া অন্য কোনও শব্দ নেই।
মাঝে একবার উঠে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। বাগানের মেরুন রঙের ঝকঝকে গোলাপগুলো দেখলো কয়েক মুহূর্ত। হেলেনের বাগান।
ফিরে এসে ডেস্কের ড্রয়ার থেকে পেট মোটা বাদামি কাগজের ফাইল বের করল। খবরের কাগজের কাটিং দিয়ে ভর্তি ফাইলটা।
দরজা খুলে বাইরে এলো একবার। রান্নাঘরে কাজের বুয়া মর্জিনার মা আর বাড়ির চাকর গোঁসাই কী যেন নিয়ে জমজমাট আড্ডা মারছে। বিষয়বস্তু খানিকটা আদিরসাত্নক । দুইজনেই বেশ রসে কষে আছে ।
ফিরে এসে ডেস্কের ড্রয়ার থেকে বাদামি রঙের ম্যানিলা ফাইল বের করলেন। হরেক খবরের কাগজ থেকে কাটিং কেটে ফাইলটা ভর্তি। সাথে ছোট্ট একটা নোট বই । তুলে নিল। এই ধরনের নোট বইতে ঠিকানা, ফোন নাম্বার এ সব লিখে রাখার কাজে ব্যবহার করা হয়। জিনিসটা নতুন না। বেশ পুরানো।
কারও আসল নাম লেখা নেই। ফোন নাম্বারগুলোও উল্টা পাল্টা করে লেখা।
পৃষ্ঠা খুলে নজর ঘোরাতে লাগল। নাম্বারটা পেয়ে গেল , যেটা খুঁজছিল। ল্যান্ড নম্বর । ডায়াল করতেই অচেনা এক মহিলা বাজখাঁই গলায় জানতে চাইল , ‘কাকে চাই ?’
‘মানিক আছে ?’
‘ওহ। মানিক ভাইয়ের নাম্বার জানেন না আপনে ?মেলা দিন ধইরা তো এই নাম্বর আর ব্যবহার করেন না উনি। কাগজ কলম আছে ? লেখেন। ওনার নাম্বার দিতাচ্ছি।’
নতুন নাম্বার পাওয়া গেল। মোবাইল। ওপাশে রিঙ হচ্ছে। থমথমে মুখে বসে আছে কেশু। দুই চোখ ঠাণ্ডা।
আচমকা অন্য পাশে পুরুষ গলা বলে উঠল - ‘হ্যালো কে বলছেন ?’
‘মানিক বাবুকে পাওয়া যাবে ?’ সকৌতুকে বলল কেশু । ঠোঁটের কোণে হাসি জমে গেছে।
‘মানিক বলছি। আপনি কে?’
‘ তোমার গলার স্বর দেখছি একদম পাল্টে গেছে মানিক । আমি চিনতেই পারিনি। অবশ্যই সময়টাও কম না । সাত বছর পর তাই না?’
‘কে আপনি?’ ওপাশে কণ্ঠস্বর ধারালো হয়ে গেল।
‘কল্পনা করো।’ হাসল কেশু । ‘ অনেক দিন তাই না।’
‘ওস্তাদ আপনি ?’ চিৎকার করে উঠল মানিক । বিশ্বাস হচ্ছিল না ওর । ওস্তাদের সাথে কথা বলছে ? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যদি ওকে ফোন করতো তাহলেও এতটা চমকে যেত না।
টানা পনের বছর কেশুর ডান হাত হিসাবে কাজ করেছিল মানিক ।
জড়িত ছিল এক কুড়ি ডাকাতির সাথে । মূল পরিকল্পনা আর ছক করেছে কেশু । সেটা বাস্তবায়ন করেছে মানিক । অপরাধ জগতের লোকজন আর পুলিশের কাছে মানিক ছিল শীর্ষ কারিগরদের একজন। সবাই বলত-- মানিকের হাতে জাদু আছে। যে কোনও জটিল সিন্দুকের তালা নিমেষে খুলে ফেলতে পারে। ভিড়ের মধ্যে চোখ বন্ধ করে পকেট মারতে পারে। ডলার- টাকা- রুপির সব নোট একদম নিখুঁত ভাবে জাল করতে পারে । যে কোনও অ্যালার্ম বিকল করতে পারে। সব ধরনের গাড়ি চালাতে পারে। দৌড়াতে দৌড়াতে পনের গজ দূর থেকে পয়েন্ট থার্টি এইট অটোম্যাটিক পিস্তল দিয়ে খেলোয়াড়ের হাতের তাস ছিদ্র করে ফেলতে পারে।
এত কিছুর পরও লোকটার মাথা ছিল না। কেশু প্ল্যান করে দিলে নিখুঁতভাবে করতে পারত। কিন্তু নিজের মেধা বা যোগ্যতা কিছুই করতে পারত না। ধারালো বুদ্ধি, সূক্ষ্ম পরিকল্পনা, কূটচাল এসব বিষয়গুলো মানিকের সাথে যায় না।
ব্যাপারটা বুঝতে পারে যখন কেশু অপরাধ জগৎ থেকে অবসর নেয়। নিজের মাথা থেকে সহজ একটা নীল নকশা বানিয়ে ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়ে। ছয় বছর কাটায় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে।
পুলিশের সন্দেহ ছিল , আগেও বহু অপরাধ করেছে মানিক । কাজেই বেচারা উপর দিয়ে বেশ ভালোই ডলাই মলাই চলে জেলের ভেতর। থার্ড ডিগ্রি থেরাপি হতে নগ্ন করে গরম পাথর শরীরের উপর রেখে দেয়া । বিজলির শক । সব ।
জেল থেকে হতাশ আর বিধ্বস্ত অবস্থায় বের হয়ে আসে মানিক । তখন বয়স চলছিল ওর আটচল্লিশ। পথের ফকির বলতে যা বোঝায় তাই হয়েছিল মানিক অবস্থা। অপরাধ জগতে থাকাকালীন টাকা পয়সা ভালোই কামিয়েছিল কিন্তু দরাজ দিল আর সাগরের মত দানের হাত ছিল। হরিলুটে বাতাসের মতো দুই হাতে উড়াতো। যাকে তাকে টাকা ধার দিত। মদ জুয়া তো ছিলই।
জেলের বাইরে এসে আবিষ্কার করল সারা দুনিয়ায় সে একা। টাকা নেই । আক্ষরিক অর্থেই একটা অচল পয়সাও নেই । যাবার কোনও জায়গা নেই । পেশা নেই । বন্ধু নেই। কারও কাছ থেকে এক পয়সা পায়নি সে। এক পেয়ালা চা খাওয়ানি ওকে পুরানো অপরাধীরা।
একজনই ওকে বুকে টেনে নিল। মানিকের মা।
মানিকের মা-কে সবাই ডলি পিসি নামে চেনে । বয়স বাহাত্তর চলছে পিসির। চট্টগ্রাম শহরে অভিজাত এলাকায় দুটো ছিমছাম বাড়ি ভাড়া নিয়ে এক দঙ্গল বুকে চাক্কু মারা সুন্দরী মেয়েদের দিয়ে ব্যবসা চালায়।
ছয় বছর পর ডলি পিসি নিজের ছেলেকে দেখে বড় রকম ধাক্কা খেল। সুদর্শন- পুরুষালি- লম্বা আর অভিজাত মার্কা চেহারা ছিল মানিকের । সিনেমার নায়কদের চেয়ে কোন অংশে কম না।
এখন ?
ছেলেকে দেখেই বুঝতে পারল ডলি পিসি- তাঁর ছেলে জীবনে আর নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। খুব যত্ন করে নিজের পাশেই রাখতে হবে।যখন খোকা ছিল যেমন যত্ন করেছে, এখনও তাই করতে হবে।
তিন কামরার ছোট্ট একটা এ্যাপয়েন্টমেন্ট এনে রাখল মানিককে ।
দরদ মাখা গলায় বলল, ‘ বিশ্রাম নাও বাবা । কাজ করতে হবে না তোমার। আমি আছি না ?’
মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল মানিক ।
জানালার পাশের চেয়ারে সারাদিন বসে থাকত মানিক । দূরেই বন্দর। সারাক্ষণ চোখ মেলে দেখে। কিছুই করে না। শুধু বসে বসে দেখে। কত দূর দূর দেশ থেকে কত রকমের জাহাজ বন্দরে এসে ভিড়ে। আবার চলে যায়। ঠিক জীবনের সম্পর্কগুলির মতো না ?
নিজেকে প্রশ্ন করে- আগের মতো পুরনো পেশায় ফিরে যেতে পারবে ?
নিজেই আবিষ্কার করে, শরীরে রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেছে ওর। পুরনো পেশায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবলেও ভয় পায়।
আঠারো মাস অলস বসে রইল মানিক । মনে মনে ওস্তাদের কথা ভেবেছে অনেকবার । কিন্তু ওস্তাদের কাছে হাত পাতার কথা একবারও ভাবেনি। যোগাযোগ ও ছিল না। উকিল চাকলাদার বাবুর কাছে গিয়ে ওস্তাদের নাম্বার জোগাড় করবে সেই বুদ্ধি ও মাথায় আসেনি। জেলের মার খেয়ে খেয়ে ওর মোটা ব্রেন আরও মোটা হয়ে গেছে।
ওর চোখে আজও কেশু হাওলাদার সুপারহিরো । মগজ বটে লোকটার । বাপরে !
দিনগুলি হয়তো এই ভাবেই যেত। কিন্তু যায় না তো।
হঠাৎ করে পুলিশের পুরানো বড় বড় কিছু কর্মকর্তা বদলি হয়ে যায়। যাদের প্রত্যেক সপ্তাহে মোটা টাকা ঘুষ দিয়ে ডলি পিসি তাঁর মেয়েদের দিয়ে ব্যবসা চালাত।
নতুন অফিসার এসেই শক্তভাবে মাঠে নামে।
শহরের সবগুলো পতিতালয় আর রেল লাইট এরিয়া বন্ধ করে দেয়। ডলি পিসির দুটো ও। পিসির সবগুলো মেয়েদের ধরে জেলে ঢোকানো হয়।
ডলি পিসির উপর দিয়ে বেশ ধকল গেল। লম্বা আর দীর্ঘ সময় তাঁকে থানা আর আদালতে দৌড়ঝাঁপ করতে হল। সব টাকা খরচ হয়ে গেল জলের মতো । শেষ পর্যন্ত অসুস্থ হাসপাতালে গেল ডলি পিসি। প্যারালাইজড হয়ে পা অবশ হয়ে গেছে। হাঁটতে পারে না।
মায়ের বিপদে আরও দিশেহারা হয়ে গেল মানিক । কোনও উপার্জন নেই। তিন কামরার ফ্ল্যাট ছেড়ে, কয়েক ব্লক দূরে বন্দরের কাছাকাছি সস্তা- ময়লা এক কামরার ঘর ভাড়া নিয়ে - পাগলের মতো চাকরি খুঁজতে লাগল। অবস্থা এতই খারাপ হল যে- হাতের ঘড়ি, দামি জুতা পর্যন্ত বিক্রি করে ফেলল।
পুরানো অপরাধীকে চাকরি দেবে কে?
কয়েক দিন না খেয়ে থেকে শেষে সস্তা ধরনের একটা ভাতের হোটেলে ওয়েটারের কাজ পেল মানিক । সারাজীবনে একটাই বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেছে সে, পুরনো সোনালি দিনগুলোতে যে বাড়িতে ভাড়া থাকত সেই বাড়িওয়ালীর কাছে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে রাখল।
আশা ছিল কেউ যদি ওকে খোঁজে !
যদি !
এটাই হয়তো নিয়তি।
আর সেই জন্যই মানিককে খুঁজে পেয়েছে ওস্তাদ ।
নিজের কানের উপর ভরসা হারিয়ে ফেলল।
আবারও চিৎকার করে উঠল - ‘ ওস্তাদ, বিশ্বাস করুন আপনার গলা আবার শুনতে পারব জীবনেও ভাবিনি । কিন্তু আপনার কথা রোজ ভেবেছি।’
ফোনের স্পিকারে কেশুর হাসি শোনা গেল। ‘ কেমন আছো তুমি মানিক ? সব ঠিকঠাক চলছে তো ?’
চোখ ফিরিয়ে ভাতের হোটেলটা দেখল মানিক।
সরু এক চিলতে জায়গা। বাইরে বেতের ঝুড়ি ভর্তি ভাত আর অ্যালুমিনিয়ামের গামলা ভর্তি তরকারি রাখা। ময়লা মেঝে। দেওয়ালে পানের পিক আর তরকারির ঝোলের দাগ।
প্রত্যেকটা টেবিল তেলতেলে । জানালার কাচ এত ময়লা যেন বাইরে কুয়াশা জমেছে। কয়েকটা টেবিলে এঁটো বাসনপত্র। নীলচে মাছি উড়ছে ভনভন করে । টেবিলগুলো ওকেই পরিষ্কার করতে হবে। ময়লা বেসিনের উপরে ভাঙ্গা আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে পেল- মোটা বেঁটে একটা লোক। মুখটা ঘামে থই থই করছে। মোটা গোঁফ। মোটা ভুরুর নীচে এক জোড়া ভীতু চোখ।
ক্যাশিয়ারের সামনে থলথলে ভুড়ি নিয়ে মহাজন বসে বসে পিঠের ঘামাচি গালছে । সতর্ক চোখে ওকেই দেখছিল লোকটা।
‘জমজমাট আছি ওস্তাদ।’ মিথ্যা কথা বলল মানিক । সিদ্ধান্ত নিল, নিজের করুণ অবস্থার কথা ভুলেও উস্তাদকে জানাবে না । ব্যর্থ লোকদের পছন্দ করে না কেশু । গলায় আনন্দের ভাব এনে বললো, ‘ নিজের ছোটখাটো একটা ব্যবসা চালাচ্ছি। ভাতের হোটেল। ফাটাফাটি চলছে।’
চেষ্টা করল ওর কথা যেন মহাজন লোকটা শুনতে না পায়।
‘শুনে ভাল লাগল মানিক ।’ খুশি মাখা গলায় বলল কেশু। ‘ আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই। অবশ্যই যদি তোমার আগ্রহ থাকে আর কি। বেশ বড় অঙ্কের ব্যাপার। একদম পাটি গণিত বুঝলে ? আমি যদি বলি মোটা টাকা তবে টাকাটা মোটাই হবে। তুমি যদি ভাগে পঞ্চাশ লাখ টাকা পাও ? কেমন লাগবে?’
শরীর ঘেমে গেলো মানিকের ।
‘ লাইনটা ঠিক ক্লিয়ার না ওস্তাদ । কী বললেন বুঝতে পারিনি।’ ঢোঁক গিলে বলল মানিক ।
‘ পঞ্চাশ… লাখ … টাকা।’ ধীরে ধীরে প্রলম্বিত সুরে সময় নিয়ে বলল কেশু। ‘তোমার ভাগ।’
চোখ বন্ধ করলো মানিক ।
কল্পনায় দেখতে পেল থানার ছোট্ট অন্ধকার কামরাটা। নাকের সর্দি আর কফ থু- থু মাখা নোংরা দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে বসে আছে ও ৷
হাসি হাসি মুখে ওর সামনে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে চার জন গাট্টা গোটটা কালো ধুমসো পুলিশ। হাতে চামড়ার বেল্ট। পুলিশের মারের কথা মনে হতেই সারা শরীর থর থর করে কেঁপে উঠল।
‘লাইনে আছো ?’ কেশুর কণ্ঠ শোনা গেল । খানিক বোধ হয় ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছে।
‘আছি ওস্তাদ। কাজটা কী?’
‘ ফোনে এত কথা বলা যাবে না। বাসায় এসো । সামনে বসে কথা বলব। নারায়ণগঞ্জে থাকি আমি। কবে আসতে পারবে ?’
নিজের জামা কাপড়গুলো দেখলো মানিক । ময়লা।ইস্তি করা হয়নি অনেকগুলো মাস। কুঁচকে আছে। অমন জামা কাপড় পরে ওস্তাদের সামনে গেলে মান ইজ্জত আর থাকবে না। সবচেয়ে বড় কথা নারায়ণগঞ্জ যাবার ভাড়াও নেই। চাইলে ওর মহাজন ছুটি দেবে না। শুক্রবার সহ সপ্তাহে সাত দিনেই কাজ করে।
কিন্তু পঞ্চাশ লাখ টাকা !
ওস্তাদ কখনও ফাউ কথা বলে না । মিথ্যা তো না- ই। যাই ঘটুক না কেন , প্রজেক্ট সফল হোক বা না হোক পঞ্চাশ লাখ টাকা ওর ভাগে আসবেই - এই ব্যাপারে একশো ভাগ নিশ্চিত সে।
‘ শনিবার আসি ওস্তাদ ? ব্যবসা নিয়ে একটু বিজি আছি।’ তারপরও নিজের ভাবটা ধরে রাখতে চাইল সে ।
‘ আজ কী বার ? মঙ্গলবার । শনিবার তো অনেক দূর। ব্যাপারটা আর্জেন্ট। বৃহস্পতিবার কেমন হয় ?’
‘ পারব ওস্তাদ।’ কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল মানিক ।
‘ এক্সপ্রেস ট্রেন আছে না ? চিটাগাং টু নারায়ণগঞ্জ। চলে এসো। স্টেশনে নেমেই ফোন দেবে । আমি স্টেশন থেকে তোমাকে তুলে নেব।’
সস্তা বাটন ফোনটার সুইচ কেটে দিয়ে ঘামে ভেজা ময়লা প্যান্টের পকেটের ভিতর রেখে দিল মানিক । ওস্তাদের সাথে কাজ করার সুযোগ হারাতে চায় না সে।
ঘাম- মশলা আর মাছ ভাঁজার তীব্র গন্ধে বাস্তবে ফিরে এলো।
তুড়ি মেরে মহাজন বারেক মিয়া ডাকল ওকে। ‘ কাম ফালাইয়া মোবাইল কার লগে পীরিত মারাও মানিক সাহেব ?’
‘আরে নাহ।’ ময়লা এপ্রনে হাত মুছতে মুছতে বেহায়ার মতো হাসল মানিক । ‘ এক মাতাল ফোন দিয়েছিল। চিনি লোকটাকে। অনেক আগের পরিচয়। তাই ফোন কাটতে পারিনি। ফোনই ধরতাম না। অচেনা নাম্বারে ফোন দিয়েছিল। ব্যাটা একটা উল্লুক ।’
‘হুম। তোমার দোস্ত তোমার লাহানই তো হইব।কাউয়া কাউয়ার লগে উড়ে। কইতর উড়ে কইতরের লগে । ’ বিরক্ত প্রকাশ করলো বারেক মিয়া। ‘যাও কাম করো। খাম্বার লাহান খারাইয়া থাইকো না।’
কিচেনে গিয়ে কাচের গ্লাসগুলি মাজতে লাগল মানিক । সারাটা দিন খুব একঘেয়ে কাটল। মাথার ভিতর ‘পঞ্চাশ লাখ’ শব্দটা ঘুরপাক খাচ্ছে বারবার।
পঞ্চাশ লাখ !
বিকেল চারটায় ছুটি পেয়ে মানিক ফিরে এল নিজে নিরানন্দ বিবর্ণ বাড়িতে।
উঁচু ভলিউমে রেডিও ছেড়ে দিয়ে স্নান করে দাড়ি কামাল । মোড়ের লন্ড্রি দোকানে ওর সবচেয়ে ভাল জামা আর প্যান্টটা জমা দিল। ভাল করে কেচে ইস্ত্রি করে দেবে ওরা । অন্য একজোড়া শার্ট প্যান্ট পরে বাইরে বের হল।
মায়ের সাথে দেখা করতে হবে।
ঠাসাঠাসি করা বাসটা ওকে নামিয়ে দিল হাসপাতালের সামনে । ফুটপাত থেকে মায়ের জন্য আঙুর কিনে নিল সামান্য। বুড়ি আঙুর পছন্দ করে।
ফিনাইলের কুৎসিত ঘ্রাণ শুঁকতে শুঁকতে হাসপাতালে লম্বা করিডোর পার হয়ে শেষ মাথায় নিঃসঙ্গ একটা রুমে গেল মানিক । ওখানে বিছানার ওপর শুয়ে আছে অসুস্থ এবং প্রায় যম দুয়ারে পৌঁছে যাওয়া বুড়ি মা- ডলি পিসি।
যতবার মা -কে দেখে ততবার ভেতর ভেতর কেঁপে উঠে মানিক ।
মায়ের মুখটা পুরনো আইভরির মতো হলুদ হয়ে গেছে ।যন্ত্রণা বেচারির মুখ আর চোখের কোণে দাগ ফেলে গেছে। বিছানার পাশে শূন্য চেয়ারে বসে মায়ের শীর্ণ হাতটা ধরল মানিক । গত সপ্তাহে মা ওকে কথা দিয়েছে। শরীর ভালো হলে সে আবার দেনদরবার করবে। সংসদ সদস্য আর বদলি হয়ে আসা নতুন পুলিশ সুপারের সাথে কথা বলে নিয়মিত মাসোহারা এবং এক কালীন টাকা দিয়ে তাঁদের ম্যানেজ করে আবার ব্যবসা চালু করবে।
এখনও আশার জ্বলজ্বল করে ওঠে ডলি পিসির দুচোখ।
কিন্তু মানিক বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে । কেন যেন মনে হয় ওর মা আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না। এই হাসপাতাল থেকে বের হলেও বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে পারবে না বাকি জীবন।
ওস্তাদের ফোনের ব্যাপারটা মা-কে জানাল সে।
‘পুরো ব্যাপারটা আসলে কি ঠিক জানি না।’ সত্য কথাই বলল মানিক । ‘কিন্তু ওস্তাদকে তো তুমি চেনো। আমাকে ভুল পথে গাইড করেনি তিনি। কখনই না।’
ধীরে ধীরে লম্বা করে শ্বাস নিলো ডলি পিসি।
সারা শরীরে ব্যথা চিনচিন করে ছড়িয়ে পড়ছে। নতুন কিছু না। সারাক্ষণ ব্যথা নিয়ে বেঁচে আছে সে। কেশুকে খুব সম্মান করে বুড়ি। কয়েকবার এসেছিল ওর বাড়িতে । সবচেয়ে সুন্দরী আর দুর্দান্ত মেয়েটাকে নিয়ে বেশ ডলাই মলাই করে কাহিল করে ফেলত । পরে হাফ বোতল স্কচ মেয়েটাকে সাথে গিলত ৷ যাবার আগে মোটা বকশিস দিয়ে দিয়ে যেত সুন্দরীটাকে।
বাপের ব্যাটা এই কেশু। বিচক্ষণ- ধূর্ত এবং অনেক বেশি করিৎকর্মা। এত অল্প সময়ে আর কোনো অপরাধী এত টাকা আর নাম কমাতে পারেনি। আর কি সুন্দর কায়দা করে সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে শান্ত ভদ্রলোকের জীবন বেছে নিয়েছে !
এখন সেই লোক তাঁর ছেলেকে চাইছে !
‘ যাও বাবা ।’ ডলি পিসি বলল নরম গলায়। ‘ তোমার ওস্তাদের সাথে দেখা করো। উনি কখনও ভুল করেন না। মনে রেখো পঞ্চাশ লক্ষ টাকা । কোনও কোনও মানুষ সারা জীবনেও এই টাকাটা চোখে দেখে না।’
‘হ্যাঁ ,মা।’ মাথা ঝাঁকাল মানিক । ‘ ওস্তাদ কখনও ভুল করেন না। পঞ্চাশ লাখ টাকার কথা বলেছেন তার মানে পঞ্চাশ লাখই দেবেন। কিন্তু মা আমি এই অবস্থা ওনার সামনে যেতে পারব না। এমন কি ভাড়ার টাকাও নেই আমার কাছে। আমি... আমি মিথ্যে বলেছি। বলেছি, আমার নিজের হোটেল ব্যবসা আছে। আমাদের করুণ অবস্থার কথা ওস্তাদকে বলতে পারিনি মা।’
বুড়ি হাসল। মায়ের হাসি। ‘ আমার কাছে টাকা আছে বাবা । তুমি একদম ফিটফাট হয়েই ওখানে যাবে।’
বিছানা পাশে ছোট্ট একটা লকার । হাত বাড়িয়ে লকারের ভেতর থেকে কুমিরের চামড়ার কালো একটা ব্যাগ তুলে নিলো ডলি পিসি। ভেতর থেকে একটা মোটা খাম বের করে তুলে দিল মানিক হাতে।
‘এই টাকা তোমার । খরচ কর বাবা। ভাল জামাকাপড় কিনে নাও। দামি একটা টাই লাগাবে গলায়। আমার ছেলেকে টাই পরলে বেশ লাগে। স্যুট কিনবে সুন্দর দেখে। পাতলা একটা ব্রিফকেস নিয়ে যাবে। তোমার ওস্তাদ স্টাইল পছন্দ করে।’
খাম খুলে ভেতরটা দেখে হতভম্ব হয়ে গেল মানিক । এক হাজার টাকার নোট। পঞ্চাশটা।
‘টাকা কোথায় পেলে মা?’
‘অনেক দিন ধরে লুকিয়ে রেখেছিলাম বাবা। আমার ইমার্জেন্সি মানি। এখন তোমার। খুব সাবধানে খরচ করে টাকাগুলো।’
‘কিন্তু মা টাকাগুলো তোমার বেশি দরকার৷ ওষুধ, হাসপাতালের বিল...।’তখনও সম্মোহিতের মত টাকাগুলোর দিকে চেয়ে আছে ।
নড়ে চড়ে শোয়ার চেষ্টা করল ডলি পিসি। ব্যাথায় মুখ বিকৃত হয়ে গেছে। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গেছে কপালে। ‘ আরে বোকা ছেলে তুমি লাখ লাখ টাকা বানাতে যাচ্ছ। বাকি জীবন চলে যাবে আমাদের। যাও কেশুর সাথে কথা বলো। টাকাটা নাও।’
টাকা নিয়ে মানিক ফিরে এল বারেক মিয়ার ভাতের হোটেলে।
সাফ জানিয়ে দিলো কাজ ছেড়ে দিচ্ছে। বারেক মিয়া চেহারাটা ভাতের ডেকচির তলার মত কালো করে বসে রইল । বিড়বিড় করে বলল, ভাত ছিটাইলে কাউয়ার অভাব হয় নি ? কামের মানুষের অভাব আছে নাকি দুইন্নায় ? এক ফুন দিলে লাইন ধরব আমার দুকানে।
বুধবার কেনাকাটা করল মানিক । নিজের কামরায় ফিরে সদ্য কেনা বাছুরের চামড়ার স্যুটকেসে নতুন কেনা স্যুট আর জামা প্যান্ট সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখল ।
দীর্ঘ দিন পর দামি সেলুন থেকে চুল কেটেছে। বাসার বাথরুমে অনেক সময় নিয়ে দাঁড়ি গোঁপ কামালো। নতুন কেনা জুতা আবার পালিশ করলো।
শেষ মেষ পরিপাটি হয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই খুশি হয়ে গেল। চেহারার মধ্যে বেশ একটা চেকনাই দেখা যাচ্ছে।
আজও এক পোঁটলা আঙুর কিনে হাসপাতালে চলে এলো মানিক । তরুণী নার্স জানালো, আজকে ডলি পিসির সাথে দেখা করতে পারবে না সে।
‘খুব খারাপ নাকি মায়ের অবস্থা ?’ ভয় পেয়ে গেল মানিক ।
‘আরে না । আসলে ব্যথা অনেক বেড়ে গেছে।’ নিজের ইউনিফর্মটা টেনে
টুনে ঠিক করতে করতে বলল রোগা মতো নার্সটা। ? আপনি কালকে উনার সাথে দেখা করতে পারবেন।’
ছন্নছাড়ার মতো হাঁটতে হাঁটতে বের হল মানিক । রাস্তায় বেরিয়ে আবিষ্কার করল এখনও হাতে আঙুরের পোঁটলা ধরে রেখেছে।
ফুটপাথের কোণায় শুয়ে থাকা এক ফকিন্নির হাতে তুলে দিল আঙুরের পোঁটলাটা ।
ফিরে এল নিজের বিবর্ণ ধূসর কামরাতে।
বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নামা পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে রইল চিত হয়ে। অনেকক্ষণ চেষ্টা করল। কিন্তু ভুলে গেছে কী ভাবে প্রার্থনা করতে হয়।
জীবনেও কখনও প্রার্থনা করেনি। বারবার ফিসফিস করে বলতে লাগল , ‘ভগবান মায়ের দিকে খেয়াল রেখো ৷ মায়ের পাশে থেকো তুমি। মা-কে আমার খুব দরকার।’
পাশের বাসায় কারা যেন বিকট শব্দে গান বাজাচ্ছে।
রাত আটটার দিকে হাসপাতালে ফোন দিলে একবার। রিসিপশনের এক মহিলা ফোন ধরে বলল, ডলি পিসি এখনও ঘুমাচ্ছে। ব্যথা কমেনি। না, কোনও ডাক্তারের সাথে কথা বলা যাবে না।
ফোন কেটে বাইরে হাঁটতে বের হল সে। মাঝারি মাপের কম দামি একটা বারে বসে পরপর দুই বোতল দেশী মদ শেষ করে যখন বাড়ি ফিরল, তখন পুরোদস্তুর বেহেড মাতাল সে।
তিন
বৃহস্পতিবার।
সকাল।
টেবিলে বসে জলখাবার সারছিল কেশু আর হেলেন।
টোস্ট করা পাঁউরুটি- মাখন আর ডিম ভাজা শেষ করে দ্বিতীয় দফা কফি নিয়ে কেশু সহজ গলায় ঘরোয়া আলাপের ভঙ্গিতে বলল , ‘মানিক আসছে আজ। দুপুরে এখানেই খাবে।’
‘কে? কার নাম বললে ? ’ পেয়ালাতে কফি ঢালতে গিয়ে থমকে গেল হেলেন।
‘আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সাগরেদ ।’ মাখনে কোটা নাড়তে নাড়তে বলল কেশু।
‘সেই জালিয়াতটা? মাত্র না জেল থেকে বের হল ?’
‘ দু-বছর আগে। মাত্র না।দুই বছর তো অনেক সময়।’ নরম গলায় বলল কেশু । ‘ছেলেটা ভাল। তুমিও তো ওকে বেশ পছন্দ করতে একটা সময়।’
হেলেনের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
‘কিন্তু কী চায় তোমার কাছে ?’
‘ কিছু না। কিছু চাইলেই যে একজন আরেকজনের সাথে যোগাযোগ করবে এটা কোন কথা না।’ পেয়ালা ঘুরিয়ে কফি নাড়তে নাড়তে বলল কেশু । ‘ কাল ফোন করেছিল আমাকে। এখানে একটা হোটেল খুলতে চায়। নিজের ব্যবসা চালাচ্ছে। দেখা করতে চাইল। না করলাম না। ছেলেটা ভালো ।’
‘ লোকটা পেশাদার ক্রিমিনাল। থানায় ওর ফাইলগুলো বেশ ভারি।’ থমথমে গলায় বলল হেলেন। ‘ তুমি আমাকে কথা দিয়েছিলে, এসব ঝামেলা থেকে দূরে থাকবে। আমাদের মান সম্মান দিকে খেয়াল রাখবে।এই শহরের কেউ যদি দেখে, তুমি একজন পুরানো চাল ঘাগু অপরাধীর সাথে কথা বলছ , তখন কী হবে?’
অনেক কষ্টে রাগ সামলাল কেশু।
‘আহ, হেলেন। থাম তো। ছেলেটা আমাদের পুরনো লোক ৷ জেলে গেছে মানে না আমরা ওকে এড়িয়ে চলব । ছোকরা একদম সিধে হয়ে গেছে । বললাম না, ব্যবসা করে।’
‘ কীসের ব্যবসা ?’
‘জানি না। দেখা হলে তুমি নিজেই জিজ্ঞেস করে নিও।’
‘ আমি ওর সাথে দেখা করতে চাই না। বাসায়ও আনতে চাই না। তুমি এ সবের বাইরে থাকবে।’
অনেক সময় নিয়ে জলখাবার আর কফি শেষ করে সিগারেট ধরাল কেশু । কাটা কাটা গলায় বলল, ‘ কারও উপদেশ কানে ঢুকিয়ে আমি চলি না। তুমিও জানো সেটা। মানিক আমাদের বাড়িতে দুপুরের খাবার খাবে। ও আসছে। কারন আমার পুরোনো বন্ধু। ব্যস আর কিছু না৷ কাজেই শান্ত হও।’
ভেতর ভেতর বেশ ভয় পেয়ে গেল হেলেন।
চেহারা দেখে বুঝতে পেরেছে, রেগে গেছে ওর স্বামী।
লোকটাকে যমের মতো ভয় পায় । এটাও জানে, দিন দিন ওর বয়স বেড়ে যাচ্ছে। শরীরে মেদ জমেছে। প্রত্যেক সকালে আয়নায় তাকিয়ে আবিষ্কার করে চেহারা দিন দিন ঘষা পয়সার মত জৌলুসহীন হয়ে যাচ্ছে। কেশুর বয়স যদিও ষাট। এখনও সবল আর তেজি। যদিও ও অন্য মেয়ের দিকে নজর দেয় না । তারপরও রাশ টেনে না ধরলে নজর দিতে কতক্ষণ ? বিগড়ে যাওয়া পুরুষের ধর্ম।
‘ঠিক আছে ।’ জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল হেলেন। ‘ আমি ভালো কিছু রান্না করে রাখব। আসলে আমি ভেবেছিলাম...।’
উঠে দাঁড়াল কেশু। ‘ স্টেশনে যাচ্ছি। ওকে আনতে। সাড়ে বারোটার মধ্যে চলে আসব৷।’
হেলেনের ঘাড়ে আলতো করে আদর করে বের হয়ে গেলো কেশু ।
ধপাস করে চেয়ারে বসে পড়ল হেলেন। পা কাঁপছে।
মানিক আসছে ?
তার মানে সাংঘাতিক কিছু হতে যাচ্ছে।
চায়ের পেয়ালাতে আয়েশ করে চুমুক দিলেন ক্রাইম ব্রাঞ্চের ঘাঘু অফিসার গাউস চৌধুরী। এই দোকানের চায়ের সুনাম আছে। কিন্তু আজ চায়ের মধ্যে দুধের সর ভাসছে। তাই বিরক্ত। কিন্তু কোন শূয়রের বাচ্চা যেন মালাই চা নাম দিয়েচ্ছে এটার। মুখে দিলেই বমি আসে।মানুষের রুচি বলে কথা !
গাউস চৌধুরীর বয়স আটচল্লিশ । বিশাল শরীর। নাকের নীচে পেল্লায় একজোড়া গোঁফ। অপরাধীরা তাঁর চোখের দিকে তাকাতেই ভয় পায়। বাঘের মতো চেহারা ।
পাশে বসে আছে তরুণ অফিসার আবদুল হাই । চৌধুরীর ডান হাত। আবদুল হাইয়ের হাতেও চায়ের পেয়ালা।
‘লোকটাকে দেখেছ।’ আচমকা ফিসফিস করে বলে উঠলেন গাউস চৌধুরী। ‘ঐ যে। দুই নম্বর গেট দিয়ে মাত্র নামল। হাতে নতুন স্যুটকেস। গলায় টাই। পার্কিং এরিয়ার দিকে হেঁটে যাচ্ছে মোটা মতো লোকটা।’
‘না স্যার, চিনি না।’ জবাব দিল আবদুল হাই।
‘ তা অবশ্য চেনার কথাও না।’ চিন্তিত স্বরে বললেন গাউস চৌধুরী । ‘ লোকটার নাম মানিক । জেল খাটা দাগি আসামি।একদম পুরানো চাল। কিন্তু এই ব্যাটা এখানে কেন?’
‘এবার বোধহয় চিনেছি স্যার।’ জবাব দিল আবদুল হাই । ‘বেশ কয়েকটা ফাইলে ওর ছবি দেখেছি। পুরনো ডন কেশু হালদারের ডানহাত ছিল লোকটা। তাই না ?’
‘ওহ খোদা। সর্বনাশ। ’ চিড়বিড় করে উঠলেন গাউস চৌধুরী। ‘ঐ দেখ, বাইরে পার্কিং এরিয়ায় ওই লোকটাই কেশু ।’
দুই অফিসার দেখতে পেল কেশু আর মানিক হাতে হাত মেলাচ্ছে। তারপর সামনে এগিয়ে গেল। যেখানে একগাদা গাড়ি পার্ক করা।
‘কেশু আর মানিক ।’ চিন্তিত স্বরে বললেন গাউস চৌধুরী। ‘ সেই মানিকজোড় । তার মানে ঝামেলা হতে যাচ্ছে। আন্ডারগ্রাউন্ডে একটা কথা চালু আছে, কেশু আর মানিক যেখানে, সেখানে কিছু না কিছু হবেই।’
‘কিন্তু কেশু তো অপরাধ জগৎ থেকে অবসর নিয়েছে স্যার। অনেক বছর ধরে কোন মুভমেন্ট নেই।’ মন্তব্য করল আবদুল হাই।
‘ এই ধরনের লোকেরা অবসর কখনো নেয় না। অপরাধ এদের মজ্জার অংশ। এদের বিশ্বাস করা ঠিক না। উপযুক্ত আবহাওয়া পেলেই এরা ডানা মেলে।’ চিন্তিত সুরে বললেন গাউস চৌধুরী । ‘ চট্টগ্রামের বিখ্যাত উকিল চাকলাদার আত্মহত্যা করেছে, এটা জানি। আর এ- ও জানি চাকলাদার ছিল কেশুর পরামর্শদাতা । কেশুর টাকাপয়সা রক্ষণাবেক্ষণ করত। আইনি দিক দেখভাল করত। দেখো আমার বিশ্বাস কিছু একটা হতে যাচ্ছে। চোখ কান খোলা রাখতে হবে। কেশুকে গত ত্রিশ বছরে কেউ ফাঁসাতে পারেনি। কেন যেন মনে হচ্ছে প্রমাণসহ এই বার ব্যাটাকে ধরতে পারব আমরা।’
সম্ভবত এটাই ওদের নিয়তি।
অপরাধী দুজনের কারও খেয়াল আসেনি, স্টেশনের উল্টা দিকের সস্তা চায়ের দোকানে ঠিক এই সময়ে বসে থাকবে ক্রাইম ব্রাঞ্চের সেরা এবং ভয়াল দুই অফিসার।
কল্পনারও বাইরে।
হাসিমুখে মুখোমুখি হল ওস্তাদ -সাগরেদ। খুঁটিয়ে একে অপরকে দেখতে লাগল। শেষবার দেখার পর কার চেহারার কতটুকু পরিবর্তন এসেছে?
মানিকের মনে হল , ওস্তাদের চেহারা খানিক বাদামি হয়ে গেছে। আরেকটু মোটা হয়েছে। হাঁটাচলাও মনে হয় একটু ধীরে করে। অবশ্য এটাও মনে রাখতে হবে, ওস্তাদ বয়স এখন ষাট। এই বয়সে আর কতটুকু চটপটে হাঁটা যায়? তারপরও কালো রঙের গলফ টিশার্ট আর মেরুন গাবাডিনে দারুণ লাগছে ওস্তাদকে।
কেশু লক্ষ্য করল, মানিক অনেক মোটা হয়ে গেছে। চেহারা ফ্যাকাশে। শারীরিক ভাবে যেন খানিকটা আনফিট। কিছুটা যেন কাবু হয়ে গেছে সময়ের আক্রমণে।তারপরও কালো রঙের স্যুটে বেশ চৌকস লাগছে মানিককে।
‘তোমাকে দেখে খুব ভাল লাগছে মানিক ।’ হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল কেশু । ‘ আছো কেমন ?’
কেশুর লোহার মত শক্ত হাতে নিজের তুলতুলে হাত তুলে দিয়ে মানিক জানাল, সে ভালো আছে।
তারপর দূরে পার্ক করে রাখা কালো রঙের গাড়িটার দিকে এগুলো দুজনে।এত কিছুর মধ্যেও ওস্তাদের গাড়ি দেখে মুগ্ধ হল মানিক।
‘আপনার গাড়ি ওস্তাদ ?’বোকার মত বলে বসল মানিক।
‘হু।বাড়ি চল আগে। তোমার হেলেন বৌদি দুপুরে তোমার জন্য রান্না করেছে।’
কথা শেষ করে কেমন একটা হাসি হাসল কেশু।
মানিক নার্ভাস হয়ে গেল। হেলেনকে একসময় মনে মনে পছন্দ করত।
গাড়িতে বসেই ডলি পিসির কথা জানতে চাইল কেশু । সব শুনে দুঃখ প্রকাশ করলো।
চলতে লাগল গাড়ি ।
পরবর্তী ত্রিশ মিনিট লাগাতার অতীত দিনের কথা বলে গেল পোড়খাওয়া
এই দুই মানুষ। দুই শক্তপাল্লা। এক সময়ের অপরাধ জগতের দুই রত্ন। সেই সব লোকদের কথা বলল, যাদের তারা চিনত। একসাথে কাজ করেছে, ওঠাবসা করছে৷ কিছু জায়গার কথা বলল যেখানে দুজন একসাথে গেছে। কিন্তু মানিককে কেন ডেকে এনেছে সে প্রসঙ্গ কেউ তুলল না৷
দুপুরের খাওয়াটা মোটামুটি ভালই হল ।
খাওয়া দাওয়ার আয়োজন ভালোই করেছিল হেলেন। গলা পর্যন্ত খেলো মানিক । অনেক অনেক দিন পর অমন ভাল খাওয়া ওর পাতে পড়েছে। যদিও বাড়িতে ঢোকার কয়েক মিনিটের মধ্যে বুঝে গেছে হেলেন ওকে সহ্য করতে পারছে না।বেশ বিরক্ত। খাওয়ার মাঝখানেই দুম করে প্রশ্ন করে বসল, ‘আজকাল কি করছ তুমি ?’
মানিক আগের মিথ্যাটাই বলল , একটা হোটেল চালাচ্ছে।ভালই চলছে সেটা।
‘তাহলে কী ব্যাপারে এখানে এসেছ ?’
এতই আচমকা বেশ থতমত খেয়ে গেল মানিক । কী জবাব দেবেন বুঝে উঠতে পারল না।
কেশু চট করে বলল, ‘ নতুন একটা হোটেল খুলতে চায় মানিক । আমি ওকে জায়গা বেছে নিতে সাহায্য করব। নিতাইগঞ্জের ওখানে হোটেল খুব ভাল চলে।নাকি মানিক?’
খাওয়া শেষে হেলেন জানাল ও বাইরে যাচ্ছে । শপিং শেষ করে প্যারাডাইস ক্লাবের যাবে। জিমে ভর্তি হয়েছে নাকি !
দুই পুরুষ একা হয়ার পর সোজা স্টাডি রুমে চলে এলো।
মানিক কিন্তু ওস্তাদের বাড়ি দেখে মুগ্ধ। বাগান, ফার্নিচার, গাড়ি, সবকিছু চোখ বড় করে দেখছে । স্টাডি রুমে বসে যখন বাইরে গোলাপ বাগানটা দেখল তখন ওর দম বন্ধ হয়ে গেল প্রায়।এই না হলে ওস্তাদ ?
সিগারেট নিয়ে মানিক অফার করল কেশু ।
‘ শিবশঙ্কর চাকলাদারের কথা মনে আছে ?’ সিগারেট ধরিয়ে সোজা কাজের কথা চলে গেল কেশু ।
‘ মনে থাকবে না কেন ? কী করে আজকাল ? আপনার সাথেই আছে না ?’
‘নিজের মাথায় গুলি করেছে কয়েক সপ্তাহ আগে।’ মুখটা সামান্য কঠিন হয়ে গেল কেশুর । ‘আমিই করতাম।আমার খাটুনি আর বুলেট বাঁচিয়ে দিয়েছে।’
পাথরের মত চেয়ে রইল মানিক ।
বরাবর মাথা কম কাজ করে ওর।
‘ আমার সব টাকা হাপিস করে দিয়েছে হারামজাদা ।’ বলে চলল কেশু । ‘ কথাগুলো যেন শুধু আমাদের মধ্যেই থাকে। এইসব ঘটনা হেলেন পর্যন্ত জানে না। এই মুহূর্তে ধরতে গেলে পথের ফকির আমি। আমার চেয়ে বেশি টাকাপয়সা বোধহয় তোমার কাছে আছে।’
মনে মনে হতাশ হল মানিক । কিন্তু ওস্তাদ ওকে ডেকেছে ? টাকা ধার চাইবে ? হায় হায়।
‘আরেকটা কিস্তি খেলতে হবে।’ ওর মনের ভাব বুঝতে পেরে শান্ত গলায় বলল কেশু । ‘ টাকার বড় একটা পোঁটলা বানাতে হবে। আমি পারব। কিন্তু সাহায্য লাগবে ।আর তোমার কথাই প্রথমে মনে হল।’
চুপ করে রইল মানিক ।
‘আমার মাথায় দারুণ একটা প্ল্যান আছে।’ দম নিয়ে বলতে লাগল কেশু । ‘ নিরাপদ । সহজ। আবারও বলছি মানিক , ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি। কোনও রকম ঝুঁকি নেই কাজটায় । তোমাকে বিপদে ফেলব না মানিক । জানি অনেক লম্বা একটা সময় ধরে জেল হাজতে কাটিয়েছ তুমি। বিশ্বাস করো, আমার বয়সটা যদি কম হত তাহলে তোমাকে এই ঝামেলা জড়াতাম না।’
বুকের ভেতর থেকে হঠাৎ করে সব ভয় চলে গেল মানিক ।
পঞ্চাশ লাখ টাকা !
এবং ওস্তাদ বলছে, কোনও ঝুঁকি নেই।
এ কথা তো সত্য, টানা পনের বছর কাজ করছে কেশুর সাথে। একটুও ঝামেলা হয়নি। ওস্তাদের উপর ষোল আনা বিশ্বাস আছে । এক লহমায় যৌবনের কোষগুলো শরীরে ফিরে পেল সে।
‘কাজটা কী?’ আগ্রহ প্রকাশ পেল মানিক কণ্ঠে।
‘তৈমুর আলম খন্দকারের নাম শুনেছ ?’ সিগারেটের ধোঁয়ার দিকে চেয়ে প্রশ্ন করল কেশু ।
মাথা ঝাঁকাল কিছু মানিক ।
মানে, শুনেছে।
‘ টপ লেভেলের তেল ব্যবসায়ী।’ বলতে লাগল কেশু । ‘ এবং দেশের সেরা ধনীদের একজন। খন্দকারের বাপ সামান্য ছোট- খাট একটা তেলের পাম্প দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিল। বুড়ো অবস্থায় অবিশ্বাস্য রকমের পাত্তি রেখে পটল তুলেছে৷ ঢাকা শহরে কমপক্ষে দশটা বাড়ি করেছে।সাভারে বিঘার পর বিঘা জমি। তেলের ট্যাঙ্কার, ওয়েল শিপ , হাবিজাবি কিনে বিচ্ছিরি অবস্থায় চলে গিয়েছিল । বুড়ো মরার পর ব্যবসার হাত ধরে আমাদের এই খন্দকার । বাবার এক টাকা ছেলে একশো টাকা বানায়, নিজের ব্যবসা বুদ্ধি দিয়ে। এই মুহূর্তে খন্দকার নিজেও জানে না ঠিক কত টাকা আছে ওর কাছে।’
‘নাম শুনেছিলাম । তবে এতকিছু জানতাম না।’ জবাব দিল মানিক ।
‘ এক বছর ধরে লোকটা ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছি। বেশ আকর্ষণীয় চরিত্র। লোকটা আমাকে মুগ্ধ করেছে। ’ ড্রয়ার থেকে ফাইলটা বের করে তুলে দিল মানিক হাতে । ওটা ভর্তি একগাদা খবরের কাগজের কাটিং।প্রত্যেকটা কাটিং খন্দকার সাহেবের নামে যত সব খবর ছাপা হয়েছে সেই ব্যাপারে ।
‘ উনার সব খবর আমার কাছে আছে। খন্দকারের ব্যাপারে আমি একজন বিশেষজ্ঞ বলতে পার। তার সম্পর্কে আমি যা জানি সে নিজেও ততটুকু জানে না। খন্দকার সাহেবের বউ মারা গেছে ...ক্যানসারে। তাদের মেয়ে আছে একটা। নাম সাবিহা। এই মেয়ে খন্দকার সাহেবের সবকিছু। আবারও বলছি... সব কিছু।’
কয়েকটা মুহূর্ত দুই পুরানো পয়সা দুইজনের দিকে চেয়ে রইল।
‘ খন্দকার সাহেবের টাকার অভাব নেই। প্রচুর টাকা আছে ।দরকারের চেয়েও বেশি আছে। ’ বলল কেশু। ‘তো… মেয়ে কিন্তু একটাই আছে।’
মানিক কিছু বলল না। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে। ধুকপুক করে।
‘তো আমরা সাবিহাকে তুলে নিয়ে নিরাপদ কোনও জায়গায় রাখতে পারি। তারপর সাহেবকে ফোন করে ভদ্রভাবে দশ কোটি টাকা চাইতে পারি। নাকি ?’ ঝিকমিক করে উঠল কেশুর দুই চোখ।
মানিক হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
তারপর আবার দ্বিগুণ গতিতে চলতে লাগল।
‘কিন্তু ওস্তাদ এটা তো অপহরণের কেস। ধরা পড়লে কী হবে, জানেন ?কিডন্যাপের কেস আগের মত সহজ না। আইন কানুন বেশ পোক্ত হয়ে গেছে গত কয়েক বছর ধরে।’ মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বলল মানিক।
‘ তোমার কি মনে হয় এই সব হাবিজাবি ব্যাপারগুলো চিন্তা করিনি ? আবারও বলছি একদম নিরাপদ প্ল্যান বানিয়েছি। খন্দকার ওর মেয়ে সাবিহাকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালবাসে । দশ কোটি টাকা ওনার কাছে বাদামের খোসার মতো । ধরা যাক তোমার মেয়েকে দুই গুন্ডা তুলে নিয়ে গেল । বললো বিশ টাকা দিলেই ছেড়ে দেবে। তুমি কি কুড়ি টাকা দিয়ে মেয়েকে বাড়ি ফিরিয়ে আনবে? নাকি পুলিশকে ফোন করে ঝামেলায় যাবে ? খন্দকারের ব্যাপারটা হুবহু এইরকম। তোমার কাছে কুড়ি টাকা যা খন্দকার কাছে দশ কোটি টাকা তাই।’
এত বড় লেকচারটা কোনও কাজেই এল না । মানিকের চোখে সামনে জেলখানার গরাদ ছাড়া আর কিছুই ভেসে উঠলো না। জেলখানার পিটুনির কথা মনে হতেই আতঙ্কে বুক কেঁপে গেল ওর।
‘ কিন্তু ওস্তাদ টাকা পেয়ে মেয়েকে ছেড়ে দিলাম আমরা। তারপর ? খন্দকার সাহেব ওনার সমস্ত ক্ষমতা নিয়ে আমাদের পিছনে লাগবেন না ?’ ঢোঁক গিলে বলল মানিক ।
‘ভুল।’ মুচকি হাসল কেশু । ‘ ভদ্রলোকের মনে সুন্দর করে ভয় ঢুকিয়ে দেবো আমি । ভাল করে বুঝিয়ে বলব, আপনি যদি ওরকম কোন কাজ করতে চান, বিপদে পড়বেন৷ সারা জীবন আপনার মেয়েকে বাড়ির ভিতর রাখতে পারবেন না। হাজারটা বডিগার্ড দিয়েও আড়ালে রাখতে পারবেন না। হয়তো কয়েক মাস একটু সতর্ক থাকবেন। হয়তো এক বছর বা দুই বছর । আর একটু ঢিলে পেলেই আমাদের ভাড়াটে বন্ধুকবাজ লোক দূর থেকে স্নাইপার রাইফেল দিয়ে আপনার মেয়ের মাথায় গুলি করে দেবে।’
লম্বা সময় নিয়ে চিন্তা করল মানিক ।
বরাবর মাথাটা কাজ কম করে ওর।
শেষে হাসি মুখে বলল, ‘ওস্তাদ সারা জীবন আপনার উপর নির্ভর করে পথ চলেছি। শেষকালে আরেকটা খেলা হোক। এখন বলুন তো আমাকে ঠিক কি করতে হবে?’
‘তোমার কাজটা জলের মত সোজা ।’ বলল কেশু । ‘ একটু খবরদারি কাজ। জিম্মিকে পাহারা দেবে। সব কাজ তদারক করবে। তবে একা না। আরও দুজন লোক লাগবে। সেই দুজন লোক ও তুমি জোগাড় করবে। আমি ফোন দিলে মানুষের অভাব হবে না। কিন্তু কতগুলো বছর সব থেকে দূরে ছিলাম। সবার কনটাক্ট হারিয়ে ফেলেছি । তাছাড়া চাই না লোকজন জানুক, আমি আবার মাঠে নেমেছি। একদম টাটকা লোক নিয়ে কাজ করতে হবে। বয়স কম হলে ভালো হয়৷ ভালো কথা খুব বেশি টাকা কথা বলবে না। দেখো , পাঁচ লাখ করে দিয়ে রাজি করাতে পার কিনা এক একজনকে।’
মনস্থির করতে সময় নিল না মানিক । ভাল করে ওস্তাদকে চেনে। একটু ইতস্তত করতে দেখলেই ওকে ফেলে অন্য লোকের খোঁজ করবে কেশু। যত পুরনো সাগরেদই হোক, কোনওরকম সহানুভূতি দেখাবে না। এই মুহূর্তে যদি বলে কাউকে সে চেনে না, তবে সব শেষ।
‘ আমার হাতে তেমন লোক আছে। পাকা লোক।’ নরম গলায় বলল মানিক । ‘লোকে ওঁদের পোকা গ্রুপ বলে।’
‘পোকা গ্রুপ ?’
‘ হ্যাঁ, আমার অ্যাপার্টমেন্টে পাশে থাকে ওরা। বেশ মারকুটে দল।মাত্র দুজন মিলে দলটা বানিয়েছে। যমজ ভাই বোন। ভাইটার নাম পোকা, বোনের নাম রুইতন। সাংঘাতিক হিংস্র। অনেকেই, অনেক ছোটখাটো আর বড় গ্রুপ ওদের দলে টানতে চেয়েছে। লাভ হয়নি।’
হাসল কেশু । সারা জীবন কত ঘাঘু মাল আর চিড়িয়া সামাল দিয়েছে সে। পোকা গ্রুপ নামটা শুনেই হাসি আসছে।
‘আমি ওদের সামাল দেব।’ ছাইদানিতে সিগারেট গুঁজে বলল কেশু। ‘পোকা গ্রুপের ব্যাপারে আরও খানিক খোশ খবর দাও, শুনি।’
‘ তেমন কিছু বলার নেই। কিছুই করে না ওরা। আবার সবই করে । যেমনটা আমি বললাম, মারকুটে দুই চরিত্র । ওদের বাপ ছিনতাই করত। সুযোগ বুঝে নির্জন মুদির দোকানে বা সুনসান রাস্তায় চাকু বা দেশি পিস্তল দেখিয়ে ডাকাতি করত। এক রাতে পেট্রল পাম্পে ডাকাতি করে খুশি মনে মদ খেয়ে বাড়ি ফিরে দেখে প্রতিবেশী ফুচকাওয়ালার সাথে বিছানায় শুয়ে আছে ওর বউ । মাতাল বাপ দুটোকেই খুন করে ফেলে। জেলে যায় পনের বছরের লম্বা সফরের জন্য।
তিন মাস পর জেলখানার বাথরুমে গলায় গামছা পেঁচিয়ে ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করে।
‘ বস্তির এক বুড়ি দাদি পোকা আর রুইতনকে নিয়ে যায় নিজের কাছে ৷ এই বুড়ি দাদি ছিল একটা রত্ন। বড় মাপের চোর । পকেট মারতো। কাজের বুয়া সেজে মানুষের বাসায় চুরি করত। বাড়ির ভেতরের তথ্য ডাকাত দলের কাছে বখরার বিনিময়ে বিক্রি করতো।
দাদি বেশ ভাল করেই পালাতে থাকে ওদের। পোকা রুইতনের যখন দশ বছর তখনই মারা যায় বুড়ি। নিষ্ঠুর পৃথিবীতে একদম একা হয়ে যায় ওরা। শুরু হয় ওদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। খাবারটা পর্যন্ত চুরি করে জোগাড় করত দুই ভাই বোন।তবে বাচ্চাদুটো ছিল শেয়ালের মত চালাক। কারও হাতে কখনও ধরা পড়েনি। পুলিশের কাছে কোনও তথ্য নেই। রেকর্ড নেই।
‘দল খুলেছে নিজেরাই। ওই যে বললাম পোকা গ্রুপ। দুজনেই সদস্য । না কোনওরকম মাদক ব্যবসা বা ভায়োলেন্স করে না। ব্ল্যাকমেইল করে। আমাদের এই রুইতন অপূর্ব সুন্দরী । সেই ফাঁদ পাতে । সুন্দরী একা মেয়ে দেখে অনেক বেকুব সেই ফাঁদে পা দেয়। তখন ভাইবোন মিলে বেকুবটাকে ছোট খাট একটা কোর্স দিয়ে ডিপ্লোমা করিয়ে ছেড়ে দেয়। পোকা খুবই নিষ্ঠুর মানুষ । এতদিনে ভাইবোন ভালই পেকে গেছে। ভয়ডর বলতে কিছুই নেই ওঁদের মধ্যে। চোখ বন্ধ করে কাজে লাগাতে পারি ওদের।’
কিছুক্ষণ ভাবল কেশু। ‘হ্যাঁ। লাগাও। আমি কথা বলব ?’
‘আপনাকে দেখলে পয়সা বেশি চাইব ওঁরা।’
‘ঠিক আছে। তবে পুরো প্ল্যান ওদের জানাবে না। শুধু এটুকু জানাবে পুরানো চাল কেশুর সাথে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে ওরা। ভবিষ্যৎ ফকফকা।’
চার
ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি।
ল্যাম্পপোস্টের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রুইতন। ঠোঁটে সিগারেট। বড় বড় কালো চোখ দুটো স্থির রাস্তার উল্টো দিকে। ওখানে হোয়াইট হাউস ক্লাব। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল ওকে। পছন্দ মতো মক্কেল পেল রাত তিনটার দিকে । লোকটা মাতাল। মাতাল বা আধ মাতাল খদ্দের ওর পছন্দ।
সাধারন বাঙালি মেয়েদের চেয়েও রুইতন খানিকটা লম্বা। লোভনীয় শরীর। সরু কোমর। লম্বা পা। চামড়ার কালো প্যান্ট পরে আছে। উপরে টাইট কালো টি শার্ট।বৃষ্টির জন্য আজ গায়ে চাপিয়েছে কালো চামড়ার একটা উইন্ডচিটার। মুখের গড়ন লম্বাটে। চোয়ালের হাড় উঁচু। চোখ দুটো বড় বড়।ঘন কালো মনি । নাকটা বড্ড মিষ্টি।
ওকে সুন্দরী বলবে না কেউ। সেই অর্থে না। মনোহরা, সেটাও না। তারপরও শুধুমাত্র ওর দু চোখ দেখেই যে কোনও পুরুষ ওর প্রেমে পড়ে যাবে । চুম্বকের মতো অদ্ভুত রকমের একটা আকর্ষণ আছে মেয়েটার মধ্যে।
কিন্তু লাভ নেই।
রুইতনও ওর ভাই পোকার মতো নিষ্ঠুর । মায়া- দয়াহীন। জন্মগত ভাবেই ওরা মিথ্যুক, অসৎ আর বিশ্বাসঘাতক। তবে একটা জিনিস ভাল, মস্ত বড় একটা গুণ আছে ওদের। আপনি যদি সেটা গুণ হিসাবে ধরেন আর কি ! ওরা ভাইবোন, একে অপরের জন্য জান দিয়ে ফেলতে পারে ।
সারাক্ষণ প্শুর মত নিজেদের মধ্যে নিজেরা ঝগড়া করে। কিন্তু বিপদে পড়লে এক হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রুর উপর ।
একে অপরের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। যা উপার্জন হয় দুজনে সমান ভাগ করে নেয়। টাকাটা যেই কামাক না কেন ।
এই মুহূর্তে রাস্তার অন্য পাশে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পোকা। বোনের চেয়ে কয়েক ইঞ্চি লম্বা সে। দেখতে বোনের মত হলেও নাকটা ভাঙ্গা। ছোটবেলার মারামারি করতে গিয়ে ভেঙেছে । চোখের নীচ থেকে চোয়াল পর্যন্ত লম্বা কাটা দাগ আছে একটা।
মাস কয়েক আগে , অসতর্ক অবস্থায় আক্রমণ করে ক্ষুর বসিয়ে দিয়েছিল পুরানো এক শত্রু। দাগ শুকিয়ে চেহারাটা ভয়ংকর করে তুলেছে। লোকজন দেখলে চমকে যায়। ব্যাপারটা ভীষণ উপভোগ করে পোকা।
আর যে ব্যাটা ক্ষুরের দাগ রেখে গেছে ?
ছেড়ে দেয়নি দুই ভাই বোন। মেরে ল্যাংড়া বানিয়ে দিয়েছে। চোখেও দেখে না ভালমত। বাকি জীবন রাস্তার মোড়ে বসে ভিক্ষা করতে হবে।
হোয়াইট হাউজ ক্লাবের ভেতর থেকে রোগা মত একটা লোক বের হয়ে এলো। অস্থির ভাবে ডানে বামে তাকাতেই চোখাচোখি হল রুইতনের সাথে। পকেটে হাত রেখে গট গট করে হাঁটতে লাগল লোকটা।
অপেক্ষা করতে লাগল রুইতন।
কেউ না কেউ ওর কাছে আসবেই। সময় যতই লাগুক।আসবেই। এ এক অচিন মাকড়সার জাল।
একে একে লোকজন বের হচ্ছে ক্লাব থেকে। গাড়ি বা রিকশায় উঠে চলেও যাচ্ছে।
রুইতন অপেক্ষা করছে।
তখনই ছোট খাট বেঁটে ধরনের একটা লোক বের হয়ে এলো। গায়ে রেইন কোট। মাথায় কাপড়ের তোবড়ানো টুপি।
নতুন সিগারেট ঠোঁটে দিয়ে ক্লিক করে লাইটার জ্বালাল রুইতন। লোকটা যাতে ওর দিকে ফিরে তাকায়। লাইটারের আলোতে দেখতে পায় ওর মার কাট চেহারাটা।
কাজ হয়েছে।
কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে রাস্তা পাড় হয়ে ওর দিকেই এল লোকটা।
অভিজ্ঞ চোখে রুইতন জরিপ করে ফেলল- লোকটার জুতা আর রেইন কোট দামি। সোনার বেল্ট লাগানো ঘড়ি ।
লোকটার চেহারা হুবহু শেয়ালের মত লম্বাটে। রোদে পোড়া। বেঁটে। কেমন গ্যাল গ্যালে হেসে বলল - ‘ কি ব্যাপার ডার্লিং ? বন্ধু কালাচানের জন্য অপেক্ষা করছ নাকি ?’
পেশাদারী একটা হাসি বিলিয়ে রুইতন বলল, ‘কালাচান লাগবে না। সামনে শ্যামসুন্দর দাঁড়িয়ে আছে। চল।’
হাসল বাঁটুল। ‘ যেই বৃষ্টি হচ্ছে । একটু নিরিবিলি আর প্রাইভেট জায়গা না হলে রসিক নাগর হওয়া যায় না। চল যাওয়া যাক। সারারাত রস- কষ- সিঙ্গারা আর বুলবুলি মার্কা আলোচনা করব আমরা।’
রুইতন হেসে আড়মোড়া ভাংল । যাতে ওর শরীরের উপরের অংশ লোকটার চোখে পড়ে ভাল করে। ‘কোথায় যাওয়া যায় বলতো ?’
‘কোন হোটেলে হলে ভাল হয়।’ হাসল বাঁটুল । ‘ তোমাকে খুশি করার মতো যথেষ্ট টাকা আছে পকেটে । তা তোমার পরিচিত কোনও হোটেল আছে নাকি? একটু নির্জন জায়গায় হলে ভাল হয়। লোকজন যাতে না দেখে আর কি। ’
ঘটনা খুবই সহজে এগোচ্ছে ।যেমনটা ওরা চায়।
একটু ইতস্তত করার ভান করে রুইতন বলল, ‘ আমার পছন্দের পরিচিত একটা জায়গা আছে। একদম নিরাপদ । চলো।’
সিগারেটে টোকা দিয়ে দূরে ছুড়ে মারল রুইতন। এটা ইঙ্গিত ৷ রাস্তার উল্টাদিকে অন্ধকারে দাঁড়ান পোকা যেন বুঝতে পারে , ওরা কোথায় যাচ্ছে।
খদ্দের লোকটার গাড়ি আছে। কালো রঙের বুইক । দুজনে বসল। মক্কেলের পকেটে কেমন টাকা থাকতে পারে সেটা নিয়ে ভাবছিল রুইতন। ঘড়িটার দাম নিয়েও বেশ
আশাবাদী।
মাত্র পাঁচ মিনিটেই নদী পাড়ের সস্তা ভাঙ্গা ছায়াময় একটা হোটেলে হাজির হল ওঁরা৷।
রিসেপশনের বসে থাকা দাড়িওয়ালা, ময়লা বুড়ো লোকটা রুইতনের দিকে চেয়ে চটকদার ভাবে চোখ টিপল । জবাবে পাল্টা চোখ টিপে জবাব দিল রুইতন । ওরা দুইজনে এর মানে জানে, কয়েক মিনিটের মধ্যে পোকা এসে হাজির হবে।
বুড়োকেও সামান্য ভাগ দিতে হয়।
দোতলার একটা কামরা ওদের। এইসব কাজ চলবে টাইপের সাইজ। ডাবল বেড। কাঠের খটখটে দুটো চেয়ার। কমোড হলুদ হয়ে যাওয়া টয়লেট। আর মামুলি রঙ জ্বলা কার্পেট মেঝেতে।
হাসিমুখে বিছানায় বসল রুইতন।
বাঁটুল ওর রেইনকোট খুলে দরজায় গাঁথা পেরেকে ঝুলিয়ে রাখছে।
‘ আমার গিফট চাই ডার্লিং।’ হাত পাতলো রুইতন। ‘ তৈরি তো ? ঘণ্টায় তিন হাজার টাকা নিই আমি ।’
দাঁত বের করে মজাদার ভঙ্গিতে হাসল বাঁটুল। সোজা গিয়ে দাঁড়াল জানালার পাশে । রংজ্বলা পর্দা সরিয়ে নীচের বৃষ্টি ভেজা পথঘাট দেখছে। রাস্তার উল্টো দিকে তখন হোন্ডা থামিয়ে সতর্কভাবে নামছে পোকা। এই দিক ঐদিক চেয়ে রাস্তা পাড় হয়ে হোটেলের দিকে আসছে।
‘কী দেখছ ওখানে ? আমি তো এখানে।’ তীক্ষ্ণ গলায় বলল রুইতন। ‘এখানে এসো। আমার গিফট চাই।’
‘কোনও গিফট নেই তোমার জন্য ।’ মজাদার ভঙ্গিতে হাসল বাঁটুল। ‘গিফট তোমার ভাইকে দেব ডার্লিং।’
চমকে গেল রুইতন। ‘ আমার ভাই ? কী আবোলতাবোল বলছ ?’
‘ গত সপ্তাহে আমার জিগরি দোস্ত আতিকুল্লাহকে তুলে এনেছিল তোমরা ।ওর সব টাকা পয়সা রেখে দিয়েছো। তাতে ও সমস্যা ছিল না। তোমার হারামজাদা ভাই পোকা মারধর করে আমার দোস্তের হাড়গোড় ভেঙে দিয়েছে। এবার দেনা শোধের পালা।’
বাঁটুল লোকটাকে আগ্রহের সাথে নতুন করে দেখল রুইতন । ভঙ্কুর শরীর। তেমন পোক্ত না। সমস্যা হবে না । এক ঘুষিতে কাজ শেষ করে ফেলবে পোকা।
‘এই বুড়ো বয়সে ফালতু ঝামেলায় যাবেন না বাঁটুল দাদা।’ বলল রুইতন। ‘ আমরা ঝামেলা চাই না। ঘড়ি আর মানিব্যাগ আমাদের হাতে দিয়ে কেটে পড়ুন।’
বাঁটুল লোকটার চেহারায় হাসি উপচে পড়ছে। ভাব দেখে মনে হচ্ছে পরিস্থিতি উপভোগ করছে সে।
‘ পোকা গ্রুপ, আমার চোখে তোমার বাচ্চা পোলাপান।’ বলল বাঁটুল । ‘ বহুদিন ধরে একই খেলা খেলেছ । আজ শেষ। খানিকটা সবক দেয়া দরকার তোমাদের।’
তখনই ধিরিম করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল পোকা।
সাধারণত সে যখন কামরাতে ঢোকে তখন রুইতনের জামা কাপড় খোলা থাকে। আর বিছানায় শিকারের সাথে শুয়েই থাকে। মঞ্চ সাজানো থাকে । রাগি ভাই হিসাবে পোকার পক্ষে সুবিধা হয় তর্জন গর্জন করার।
এইবার ভিতরে ঢুকে যখন দেখল , রুইতন পরিপাটি পোশাক পরে বিছানায় বসা , বেঁটে লোকটা ঘরের মাঝখানে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে, তখন বেশ থতমত খেয়ে গেল।
‘এসো পিতলা ঘুঘু… নাকি পিতলা পোকা ?’ বাঁটুল লোকটা বলল, ‘ তোমার সাথে পরিচয় হওয়ার জন্য আইটাই করছে মনটা।’
একে অপরের দিকে তাকালো পোকা আর রুইতন।
‘ঠিক আছে চান্দু।’ কামরার দরজা বন্ধ করে মুঠি পাকিয়ে সামনে এগোতে এগোতে বলল পোকা। ‘ ঘড়ি আর মানিব্যাগ বের কর জলদি । বাসায় গিয়ে ঘুমাতে হবে আমাকে।’
‘ আমার অবশ্য অত তাড়া নেই।’ হাসিমুখে বলল বাটুল। এত কিছু হচ্ছে কিন্তু মোটেও নার্ভাস হয়নি লোকটা। মনে হচ্ছে পুরো ব্যাপারটা উপভোগ করছে। ‘মানিব্যাগ চাও ? দিচ্ছি।’
পকেটে হাত ঢুকিয়ে ঝট করে রিভলভার বের করে সোজা পোকার কপালের দিকে তাক করল।
‘এটা মনে হয় আশা করনি পোকা ?’ হাসল বাটুল ।
নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে রইল পোকা । ‘খামখাই নাটক করছেন আপনি। পরে কিন্তু সামাল দিতে পারবেন না। ’
ধীরে ধীরে লোকটা পিছন দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছিল রুইতন । লক্ষ্য রাখছে, পোকাও তৈরি হচ্ছে ।
আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল পোকা । তখনই গুলি করলো লোকটা। কিন্তু গুলির বদলে পিস্তলের ভেতর থেকে বের হল তরল অ্যামোনিয়া।
হাঁটু ভেঙে মেঝেতে পড়ে গেল পোকা । যন্ত্রণা পশুর মতো কাতরাচ্ছে।
রুইতন দাঁড়ানোর আগেই ওর দিকে অ্যামোনিয়ার রিভলবার তাক করে ট্রিগার চাপল বাঁটুল। দুহাত দিয়ে চোখ দুটো বাঁচালো মেয়েটা। কিন্তু হাত দুটো অ্যামোনিয়ার ঝাঁঝে পুড়ে গেল। বিছানা থেকে মেঝেতে পড়ে চিতকার করতে লাগল রুইতন ।
সারা ঘর ভর্তি অ্যামোনিয়ার তীব্র গন্ধ। আর ধোঁয়া।
নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা উপভোগ করল বাঁটুল। অ্যামোনিয়ার বিদঘুটে রিভলবারটা পকেটে ভরে দরজার গেঁথে রাখা পেরেকটা উপর থেকে রেইনকোট তুলে গায়ে চাপাল।শান্ত ভাবে টুপিটা বাতাসে ঝেড়ে মাথায় দিয়ে ফুর্তিবাজ মানুষের মত হাসিমুখে পোকা গ্রুপের দুই সদস্যকে কাৎরাতে দেখল কিছুক্ষণ। তারপর গুনগুন করতে করতে নীচে চলে গেল। শান্ত ভাবে গাড়িতে উঠে হারিয়ে গেল বাদলা ভরা রাতের আঁধারে।
বেঁটে লোকটা কে ? কার শোধ তুলেছিল ওদের উপর ? সেই সব কখনই জানতে পারেনি পোকা গ্রুপের দুই সদস্য।তবে অনুমান করে নিয়েছিল ওদের শিকারদের মধ্যে কেউ ভাড়াটে লোক দিয়ে কাজটা করিয়েছিল।
বা সবই হয়তো প্রকৃতির প্রতিশোধ।
পাঁচ
হোটেল মধুমিতা।
লবিতে বসে আছেন গাউস চৌধুরী। চেহারার কোনও ভাব নেই। খানিক দূরে তাঁর সহকারী আবদুল হাই। খবরের কাগজে পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনগুলো খুঁটিয়ে পড়ছে। কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শোনার ভান করছেন গাউস চৌধুরী। আসলে কথা শুনছেন কারও।
অন্যপক্ষের কথা শেষ হতেই বললেন , ‘ ঠিক আছে স্যার। আমি এবার আট ঘাঁট বেধেই নেমেছি। চব্বিশ ঘণ্টা আমাদের দুইজন ইনফরমার পালা করে কবুতরের উপর নজর রাখছে । দানা খেতে গেলেই ধরব। দুই কোয়েল পাখি হোটেল মধুমিতার। আমরা লবিতে।’
লাইন কেটে দিল অপর পক্ষ। এখন আবার হেডফোনে গান বাজছে !
সতর্ক চোখে চার দিকে নজর বুলিয়ে নিলেন।
এখনও সন্দেহজনক কোনও চরিত্র আসেনি হোটেলে। কিন্তু কেউ না কেউ আসবে। হোটেলে এসে নির্জন কামরাতে বসে দাবা খেলছে না ওই দুই শয়তান।কিছু না কিছু ঘটবেই।
ঘড়িতে সময় দেখলেন। এগারোটা বিশ। ইচ্ছা করলে এখানে টানা এক সপ্তাহ বসে থাকতে পারবেন। জানেন, আগে বা পরে কিছু একটা ঘটতে বাধ্য।
মাঝে দুইজন মোটা সোটা বয়স্কা মহিলা ট্যাক্সি থেকে নেমে হোটেলে ঢুকল।
মধ্যাহ্নের কয়েক মিনিট আগে ,অল্প বয়স্ক একটা মেয়ে আর এক যুবক হাঁটতে হাঁটতে এলো হোটেলের সামনে । ভাই বোন নাকি ? মেয়েটা চুলে রং করছে। দুইজনেরই জামা কাপড় বেশ সস্তা দরের। পায়ে কাপড়ের সাদা জুতো। দুইজনেরই চোখে সানগ্লাস।
অদ্ভুত ঢোলা বোতল সবুজ রঙের পাজামা আর সাদা জামা পরে আছে ছেলেটা। কাঁধের উপরে
রেখে দিয়েছে চড়ুই পাখির পালকের রঙের জ্যাকেট।
শকুনের চোখে জরিপ করলেন তিনি। কলেজের স্টুডেন্ট হবে। না, এত ছোট পুচকে আণ্ডা বাচ্চাদের সাথে কেশুর মতো ঘাঘু ক্রিমিনাল কিছুতেই খাপ খায় না।
হোটেলের লবিতে পা দিয়ে সতর্ক হয়ে গেল রুইতন। এত লোক লবিতে তারপরও রুইতন বুঝে গেল বিপদজনক কেউ আছে। বিপদের ঘ্রাণ পায় মেয়েটা।
‘ঠোলা আছে।’
‘হুম ।’ সায় দিল পোকা। ‘ বিষয়টা মানিকদাকে জানাতে হবে।’
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় চলে গেল ওরা। মানিকদা বলে দিয়েছিল রুম নাম্বার 149 - এর দরজায় নক করতে হবে।
মাত্র একবার নক করার সাথে সাথে খুলে গেল পেল্লাই কাঠের দরজা। দরজার পাশেই দাঁড়িয়েছিল মানিক ।
সার্কাসের জানোয়ারেরা মঞ্চে যে ভাবে হেঁটে আসে ঠিক সেইভাবেই কামরার ভেতরে ঢুকল পোকা গ্রুপের দুই সদস্য।
আর ঠিক জানলার পাশে বিশাল এক সোফায় সিংহের মতো বসে আছে কেশু । মুখে সিগার। সোজা চেয়ে আছে পোকাগুলোর দিকে। তবে রুইতন ওর নজর কেড়ে নিয়েছে প্রথমেই। কী সাঙ্ঘাতিক মেয়ে রে বাবা !নিজের বয়সটা আর পাঁচটা বছর কম হলে মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা যেত।
‘বাইরে সম্ভবত পুলিশ আছে।’ কেশুকে পাত্তা না দিয়ে মানিকের দিকে চেয়ে দম নিতে নিতে বলল পোকা ।
মুহূর্তেই চেহারা সাদা হয়ে গেল মানিকের । ঝট করে ফিরে তাকাল ওস্তাদের দিকে।
‘ভুলে যাও ওদের কথা।’ নরম গলা কেশুর। ‘ মানিক আর আমাকে এক সাথে দেখলে যে কোনো ঘুঘু পিছু লাগতে পারে। লাগতে বাধ্য। সময় মত খসিয়ে ফেলব।গত চল্লিশ বছর ধরে আমার পিছু লেগে রয়েছে ওরা ।’
কেশুর কথা শুনে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেল রুইতন । এই না হলে ওস্তাদ। ছোটবেলা থেকেই কেশুর নাম শুনে এসেছে ওরা । পেপারে তখন কত কথা লেখা হত ! অপরাধ জগতের রাজা ছিল লোকটা।
তারপরও কেশুর দিকে ভালো করে তাকিয়ে বেশ হতাশ হল ভাই বোন । মোটা স্থুল মোষের মত একটা লোক বসে আছে চেয়ারে। গায়ের রঙটা রোদে পুড়ে হুইস্কির মত হয়ে গেছে। রোমাঞ্চকর কোন চরিত্র বলে মনে হচ্ছে না।
‘তোমরা বসো ।’ ভারি গলায় বলল কেশু । এখনও চেয়ে আছে পোকার দিকে । ওর মুখে কয়েকটা কাঁচা ফোসকা। যেখানে দুই সপ্তাহ আগে অ্যামোনিয়া পুড়িয়ে ফেলেছিল । ‘ মুখটায় কী হয়েছে তোমার ? কিসের দাগ ?’
‘কুত্তায় কামড় দিয়েছিল।’ সোফায় বসতে বসতে উত্তর দিল পোকা।
সময়টা যেন ঝুলে রইল ।
কেশুর মুখটা কাঁচা গরুর মাংসের মত টকটকে লাল হয়ে গেল এক লহমায়। দুই চোখ হয়ে গেছে বড় বড়।
‘ শোন হে নাবালক ছোকরা ।’ গর্জে উঠল কেশু। ‘আমি প্রশ্ন করলে ভদ্রভাবে জবাব দেবে। মনে থাকবে ?’
‘ ওহ, অবশ্যই।’ উদাস ভাবে জবাব দিল পোকা। ‘ আসলে মুখটা আমার । কাজেই আমার মুখে কিসের দাগ সেটা নিয়ে আপনার মাথা না ঘামালেও চলবে।’
বিব্রতবোধ করল মানিক ।
আগেরকার দিন হলে , ওস্তাদের সামনে ভুলেও কেউ এ ভাবে কথা বলতে পারত না। প্রশ্নই উঠত না। সামান্য হালকা পাতলা স্থুল রসিকতা যারা করেছে তাদেরকে এক ঘুষিতে মেঝেতে ফেলে দিয়েছে কেশু ।
কিন্তু এই মুহূর্তে সে রকম কিছুই হল না। শান্ত গলায় কেশু বলল, ‘ বেহুদা খেজুরে আলাপ করার মত সময় নেই আমার হাতে । দুজনেই কান পরিষ্কার করে শোন । তোমাদের জন্য কাজ ঠিক করছি একটা । একদম ঝুঁকি নেই। পাঁচ লাখ করে পাবে এক- একজন।
রাজি কিনা বলো ?’
ততক্ষণে রুইতন বুঝে গেছে ওর রূপ দেখে কেশু বেশ খানিকটা তরল হয়েছে। পুরুষের চোখের ভাষা ওর চেয়ে ভাল করে এই দুনিয়ার কেউ বুঝে না।একদম ছোট বেলা থেকেই পুরুষের চোখের সব আলো ছায়া পড়তে পারে ও।
বলল , ‘ কোনও রকম ঝুঁকি না থাকলে বাইরে পুলিশের লোক কেন ? রাস্তার উল্টা দিকে পুলিশের গাড়িও দেখেছি।’
‘ আমার নামই একটা ব্র্যান্ড । আমি আর মানিক এই মুহূর্তে একসাথে আছি, এটাই শহরের সবচেয়ে বড় খবর । আন্ডারওয়ার্ল্ড সবচেয়ে বড় ঘটনা । পুলিশ জীবনেও আমার চুল ছিঁড়তে পারেনি ।পারবেও না। রাজি হলে বলো। পাঁচ লাখ করে নিয়ে বাড়ি চলে যাও । রাজি না হলেও বলো। মানিক দরজা খুলে দেবে । সোজা বাড়ি। ’
‘কাজটা কী সেটা জানতে পারি ?’ এতক্ষণে কথা বলল পোকা ।
‘ যদি রাজি হও তবেই জানাবো ।’ বলল কেশু । ‘ সব শুনে যদি বলো, না খেলব না। তাহলে আমার প্ল্যান আর একজন জেনে গেল যে কিনা আবার আমার দলের না। অমন ব্যাপার আবার আমার পছন্দেরও না।’
পোকা গ্রুপের দুই পোকা একে অপরের দিকে তাকালো। গত দুই সপ্তাহ ধরে ওদের ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে। সেই বাটুল লোকটা ওদের শিক্ষা দিয়ে যাওয়ার পর এলাকাতে ওদের মান সম্মান ধুলোয় মিশে গেছে । অন্য গ্রুপের কেউ পাত্তা দেয় না। এখন অন্য দলের ঢুকতেও পারবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা কেশুর মতো পুরাতন এক সর্দার মার্কা লোকের সাথে কাজ শুরু করাই জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ। টাকা পরিমাণ ও খুব খারাপ না।
‘আছি।’ বলল পোকা। ‘কাজটা কী?’
সাবিহা আর তৈমুর আলম খন্দকার এই নাম দুটি ছাড়া সবই বলল কেশু । সাথে যোগ করল - লোকটা বেশ ধনী। মেয়ের জন্য কোন রকম ট্যাঁ ফো না করে টাকা দিয়ে দেবে।
‘বড় ছক্কা মারতে যাচ্ছেন আপনি।’ সব শুনে অনেকক্ষণ পর নরম গলায় বলল পোকা। ‘ঝুঁকিও আছে বহুত।কিডন্যাপ আগের মত অত সহজ কাজ না। পাঁচে হবে না । দশ করে দিতে হবে এক একজনকে।’
আবারও কাঁচা মাংসের মতো লাল হয়ে গেল কেশুর মুখ। ‘বললাম তো। কোনো ঝুঁকি নেই।’
‘উহু ।’ পোকা মাথা নাড়ল । ‘ এটা মঞ্চনাটক না। যে কোনও সময় পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। নতুন সব ঝামেলা আসতে পারে। দশ করে না হলে কাজে হাত দেবো না।’
মানিকের মনে হল রাগে বুড়ো কেশু বোধহয় বোমার মতো ফেটে যাবে।মুখের শিরাগুলো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।
‘ বের হয়ে যাও তোমরা।’ গর্জে উঠল কেশু । ‘ মাত্র দুই লাখ টাকায় তোমাদের চেয়ে তুখোড় আর চমচম মার্কা মানুষ পাব আমি। । বের হও আমার সামনে থেকে।’
রুইতন অস্বস্তিতে ভুগছে। ভাই রাজি হয়ে গেলে বোধ হয় ভাল হত।
‘ আপনার টাকা না এটা ।’ কড়ে আঙুল দিয়ে কান চুলকাতে চুলকাতে বলল পোকা। ‘ রাগ দেখাচ্ছেন কেন? মুক্তিপণের টাকা থেকেই তো আমাদের দিচ্ছেন । নিজের পকেট থেকে চামড়ার মানিব্যাগ বের করে তো গুণে দিচ্ছেন না। মজুরি ঠিকমতো দিন। গরম গরম সার্ভিস পাবেন। চমচম না রসগোল্লা মার্কা সার্ভিস।’
‘ একটু কথা আছে ওস্তাদ।’ তীক্ষ্ণ গলায় বলল মানিক । ‘পাশের রুমে চলুন।’
ওস্তাদ সাগরেদ চলে গেল পাশের কামরায় ।
‘আমার কথা শুনুন বস।’ শান্তভাবে বলল মানিক । ‘ এই দুই পোকা দশ লাখ করেই পাওয়ার যোগ্য। ওদের কাজ যে ভালো সেটার গ্যারান্টি আমি দিচ্ছি । তাছাড়া এক টাকার একটা কয়েন ও অগ্রিম দিচ্ছি না। কাজ শেষ হলে পয়সা পাবে। আমাদের প্ল্যান জানে ওরা। এখন সারা শহর ঘুরে বলে বেড়াবে আমরা কী বিরিয়ানি রান্না করতে যাচ্ছি । নিজেরা দল বানিয়েও এই রান্নাটা করে ফেলতে পারে। ওদের কোনও ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই এটা চোখে পড়ছে না আপনার ?’
কয়েক মুহূর্ত লাগলো কেশুর শান্ত হতে। দুই হাতের মুঠো শক্ত করে রাগি গলায় বলল, ‘ আমাদের প্ল্যান ফাঁস করলে ফকিন্নির বাচ্চা দুটোকে আমি খুন করব।’
‘ভাল আইডিয়া। কিন্তু কাকে দিয়ে করাবেন শুনি ?’ বিরক্ত হল মানিক । ‘ অমন টাকাপয়সাও আমাদের নেই যে ভাড়াটে খুনি লাগিয়ে দেবেন। অথচ ওরা এখন বের হয়ে গিয়ে ফোন করে থানায় সব বলে দিতে পারে।’
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল কেশু। বুকের বাম পাশে চিন চিন করে ব্যাথা হচ্ছে। এমন হচ্ছে কেন আজকাল ? বুড়ো হয়ে গেল নাকি? দম নিতেও বেশ কষ্ট হল খানিকটা সময়।
‘ আমি রাজি ৷’ অনেক সময় পর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল সে। ‘তবে বেশি টেণ্ডাই মেনডাই করলে খুন করে ফেলব ওদের।’
সমঝদার মানুষের মত মাথা ঝাঁকাল মানিক । বুঝল, ওস্তাদ ওর সামনে নিজের মান সম্মান রাখার জন্য কথাটা বলেছে। আসলে কিছুই করতে পারবে না।
‘একটু ও চিন্তা করবেন না ওস্তাদ। পোকাদুটো ওদের কাজ ঠিকমতই করবে। আমি গ্যারান্টি দিলাম।’
পাশের কামরায় ফিরে এলো মানিকজোড়।
অলস ভাবে বসে নাকের ময়লা বের করছে পোকা। রুইতন চোখ বন্ধ করে সোফায় বসা। ইচ্ছে করে পায়ের উপর পা তুলে বসেছে। যাতে ওস্তাদ ভাল করে ওর ‘সম্পদ’ দেখতে পারে।
‘আমরা রাজি।’ ওস্তাদ মুখ খোলার আগেই বলল মানিক । ‘ দশ করেই পাবে। কিন্তু সেরা কাজ দেখাবে। একদম সেরা কাজ চাই।’
পোকার কালো দুই চোখ জ্বলে উঠল ।কিন্তু মুখের ভাব রইল নির্বিকার।
‘আমার কথা হুবহু ফলো করবে সবাই।’ সোফায় বসতে বসতে বলল কেশু।
রুইতন তখনও অপলক চেয়ে আছে ওর দিকে। মেয়েটার রূপ ওকে আকর্ষণ করছে বুঝতে পেরে মনে মনে বিরক্ত হল কেশু।
‘চিন্তা করবেন না। আপনার কাজ ঠিকমতই হবে।’ ভাবলেশহীন গলায় বলল পোকা।
পোকার ক্ষত বিক্ষত চেহারার দিকে চেয়ে কেশুর মনে হল সাংঘাতিক বিরল প্রজাতির বিষাক্ত একটা সাপ নড়াচড়া করছে সে।এটাকে সাবধানে ঝাঁপির ভিতর ভরতে হবে ।সারাজীবন কত মানুষের সাথে লেনদেন করেছে। কিন্তু এই ছোকরা হিসাবের বাইরে।
সিগারেট ধরাতে ধরাতে কেশু বলল , ‘ভালো করে শোন। প্ল্যানটা একদম সহজ । প্রত্যেক শুক্রবার সকালে মেয়েটা পার্লারে যায়। চুল কাটাতে বা রঙ করাতে বা চামড়া ঘষতে । একাই যায়। বাড়ি ফেরার আগে কান্ট্রি ক্লাবে গিয়ে দুপুরের খাবার খায়। গত দু বছর ধরে একই রুটিন মেনে চলছে। মেয়েটা বাপের সাথে থাকে। হাতির ঝিলের পাশে ওদের বাসা। বাড়ির চারিদিকে ইলেকট্রিফায়েড তার আছে। দারোয়ান আছে সেটা বলার দরকার দেখি না । কেউ দেখা করতে গেলে গেটের দারোয়ান ফোন করে ভিতরে জানায়। মেইন গেইটের সামনে সিসি ক্যামেরা আছে।’
‘সকাল নয়টা বাসা থেকে বের হয় মেয়েটা।’ এইবার রুইতনের দিকে ফিরে বলল সে। রুইতন দুই হাঁটুর উপর দুই হাত রেখে হাতের তালুতে থুতনি রেখে মন দিয়ে কথা শুনছিল। ‘ এখানে তোমার ভূমিকা বেশি। গেইটের বাইরে সিসি ক্যামেরার রেঞ্জের বাইরে গাড়ি নিয়ে থাকবে তুমি। গাড়ির হুড তুলে দাঁড়িয়ে থাকবে। ভাব দেখাবে, গাড়ি নষ্ট হয়েছে। খানিক দূরে মানিক গা ঢাকা দিয়ে থাকবে। জায়গাটা আমি আর মানিক খুঁটিয়ে দেখে এসেছি । গা ঢাকা দেওয়ার মতো প্রচুর গাছপালা আছে। মেয়েটা গেটের বাইরে এলেই তুমি সাহায্য চাইবে ওঁর কাছে । বলবে, গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে । সামনে পরিচিত এক মেকানিকের দোকানে তোমাকে নামিয়ে দিলে যারপরনাই কৃতজ্ঞ থাকবে। মেয়েটা তোমাকে নিরাশ করবে না,কোন রকম সন্দেহ ও করবে না। একা একটা মেয়ে তুমি। তোমরা চোখের আড়াল হওয়া মাত্রই মানিক ঝোপ থেকে বের হয়ে তোমার গাড়িতে চেপে তোমাদের অনুসরণ করবে।’
থামল কেশু। চেহারা কঠিন করে বলল, ‘ টাকাটা তোমাদের কামাতে হবে বুদ্ধি আর শক্তি প্রয়োগ করে । মেয়েটা যাতে ভয় পায় সেই ব্যবস্থাও আছে।’
জ্যাকেটের পকেট থেকে কাচের শিশি বের করল কেশু । ‘ এটা সালফিউরিক অ্যাসিড। ছিপিতে চাপ দিলেই এসিড বেরিয়ে আসবে। ভয় দেখাবে মেয়েটাকে। বলবে, কথা না শুনলে ওর মুখে এসিড ছুড়ে দেবে। ভয় দেখানোর জন্য খানিকটা অ্যাসিড গাড়ির সিটে ফেলে দিলে কাজ হবেই হবে।’
‘ মেয়েটাকে আমি সামলাতে পারব ।’ অ্যাসিডের শিশিটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে বলল রুইতন ।
‘ এরপর গাড়ি চালিয়ে সোজা সিটি পার্কের ওখানে যাবে।’ বলল কেশু। ‘ ওখানে অপেক্ষা করবে মানিকের জন্য । মানিক মেয়েটাকে গাড়িতে তুলে নেবে । বাকি কাজ মানিকের । সোজা চলে যাবে নবীগঞ্জে ।’
‘ তাহলে আমার কাজ কী?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল পোকা।
‘ নবীগঞ্জের একটা নির্জন বাড়িতে মেয়েটাকে আঁটকে রাখব আমরা। তোমার কাজ পাহারা দেওয়া। আমরা কেউ মেয়েটার বাপের সাথে দেখা করে টাকা আনব না। মাঝে একটা লিংঙ্ক কাজ করবে। শিশির রায় নামটা শুনেছ তোমরা ?’
‘ সিনেমা নাটক বানায় ? সেই লোক ?’ প্রশ্ন করল রুইতন।ও সিনেমার পোকা। এইসব খবর বেশ রাখে।
‘হ্যাঁ, সেই। মেয়েটার বাপের সাথে যোগাযোগ করে আমাদের জন্য টাকা নিয়ে আসবে শিশির বাবু।’
‘সে কেন আপনার কাজ করবে ?’ বিরক্ত হয়ে তিরস্কারের সুরে প্রশ্ন করলো পোকা। ‘ সে ও আপনার দলের লোক নাকি?’
‘কারণ বেচারা সুন্দরী বউ আর বাচ্চা নিয়ে সুখে আছে তাই।’ আস্ত একটা শয়তানের মতো হাসল কেশু । ‘ তোমাদের কাজ হবে ভদ্রলোকের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া , যাতে আমাদের কথা মতো কাজ করে সে।’
‘ ও। লেখক তাহলে আপনার দলের লোক না !’ অবাক হল পোকা।
‘ না।’ ব্যাখ্যা করল কেশু- শিশির আর মেঘা কেন ওখানে গেছে? কেন কেশু জায়গাটা ব্যবহার করতে চায়। কয়েক বছর আগে ওখানে গিয়েছিল কেশু । একদম নিরাপদ জায়গা।ভয়ংকর নিঃসঙ্গ আর বিচ্ছিন্ন। ওটাই মূল ব্যাপার।
‘তার মানে কুত্তা আর কাজের লোকটাকেও সামলাতে হবে ?’ প্রশ্ন করলো পোকা।
‘ঠিক।’ সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল কেশু। ‘ দুটোকে চোখে চোখে রাখার সমস্যা হবে। স্টাফ কোয়াটারে ওদের বন্দি করে রাখবে। গাড়ি নষ্ট করবে। টেলিফোনের লাইন কেটে দেবে। মোবাইল সিগন্যাল পাওয়া যায় না। কাজেই নিরাপদ। সবচেয়ে বড় কথা মোবাইল ফোন জ্যামার । অর্ডার করে কিনেছি আমি। অনলাইন থেকে। সেটা ব্যবহার করবে। ও হ্যাঁ, ওদের কাছে বন্দুক আছে। ভালো হয় আগের রাতে ওখানে গিয়ে সব নিরাপদ করে রাখো যদি।’
‘নীচে পুলিশ দুটোকে এখন কী করি ?’
‘কিছু না। প্রথমে মানিক যাবে । তখন ওকে অনুসরণ করবে দুই ফাজিলের একটা। । মানিক ওটাকে খসিয়ে দিতে পারবে । তোমরা দুই ভাই বোন এরপর বেড়িয়ে গিয়ে বারে বসবে। দুটো ড্রিঙ্কস খাবে আধা ঘণ্টা ধরে। তারপর বাড়ি যাবে। মনে হয় না কেউ তোমাদের পিছু নেবে। নিলেও সন্দেহ করার মতো কিছু নেই । অনেক দেরি করে নীচে নেমে দুপুরের খাওয়া শেষ করে আমি বের হবো । এবং কেউ না কেউ আমার পিছনে যাবে। লাভের বেলায় জাম্বুরা। সারা জীবন আমার পিছু লেগে আছে ওরা।’
স্যুটকেস খুলে মোটা বাদামি খাম বের করে পোকার হাতে তুলে দিল কেশু । ‘ ওখানে ম্যাপ- সময়সূচি- আর প্ল্যানের খসড়া লেখা আছে। বাসায় গিয়ে মুখস্থ করো। তারপর সব কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলবে। কাজটা সামনের সপ্তাহে ধরব। আগের রাতে মানিক তোমাদের বাসা থেকে গাড়িতে করে তুলে নেবে। ফাইনাল একটা ক্লাস দেবে তোমাদের।’
‘কিছু খরচাপাতি দিলে ভাল হয় ।’ নীরস গলায় বলল পোকা। ‘ খালি হাতে ঠিক জমে না।’
‘খামের ভেতর বিশ হাজার টাকা আছে।’ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল কেশু। ‘ যাও ভাগো এখন । মনে রেখো আমার সাথে ঝামেলা করলে পুলিশ তোমাদের ছেড়ে দিলেও আমি ছাড়ব না। মরে গেলেও কবর থেকে তুলে এনে আবার মারব। ভাগ।’
ছয়
বৃহস্পতিবার রাতে কাজে লাগল পোকা।
মগবাজারের ময়লা একটা গলিতে সস্তা বাসায় ও আর রুইতন থাকত।
মোটরসাইকেল নিয়ে সোজা রওনা হল।
চাঁদনী রাত। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে হু হু করে চলে এলো। প্রথমে গাজীপুরে । হাজারে বিজারে ময়লা গলি আর বড় বড় রাজপথ শেষ করে সোজা নবীগঞ্জে।
নির্জনবাস খুঁজে পেল সহজেই। ম্যাপ দিয়েছিল কেশু । সবচেয়ে বড় কথা আশেপাশের বিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে কোনো বাড়িঘর নেই।ফাঁকা।
মূল ফটকের সামনে অনেকটা সময় ঘাপটি মেরে বসে রইল সে।
চৈত্র মাসের গরম। দরদর করে ঘামছে। আকাশে ভরা চাঁদ।
দুই ভাইবোন সারা সপ্তাহ আলোচনা করে নিশ্চিত হয়েছে , কাজটায় সফল হতেই হবে ওদের। টুকটাক কাজ করে পোষাচ্ছে না আর।হাত একদম খালি। আক্ষরিক অর্থেই দুই ভাই বোন একদম বেকার।
গেট খুলে বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়ল পোকা । সতর্ক। কুকুরটা কোথায় ?
আচমকা ঘেউঘেউ করে উঠলে কিন্তু বিপদে পড়ে যাবে। ভাগ্য ভাল ।ওকে দেখার আগেই কুত্তা হারামজাদাটাকে দেখতে পেল । বাতাসের উল্টা দিকে ছিল বলে রক্ষে ।
উপুর হয়ে ঘাসের মধ্যে শুয়ে পড়ল পোকা। পলিথিনের একটা ব্যাগ নিয়ে গেছে সাথে। ওটা ভেতর থেকে বিষ মাখানো মাংসের টুকরো বের করে ক্রিকেট বল ছোঁড়ার মতো করে ছুড়ে দিল কয়েকটা টুকরো।
তারপর আবার মাথা গুঁজে শুয়ে রইল।
বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে। রাতের বেলা কাজের সুবিধে হবে, ভেবে কালো জিন্সের প্যান্ট, কালো টি- শার্ট আর উপরে হাতা কাটা কালো লেদারের জ্যাকেট চাপিয়ে এসেছে।এখন মাত্রারিক্ত ঘামছে।তাছাড়া মানসিক চাপ তো আছেই। রাস্তা ঘাঁটে গুণ্ডামি করা আর মহাপরিকল্পনা করে মস্ত কোন ক্রাইমে অংশ নেয়া সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার।
মাথা গুঁজে শুয়ে আছে এখনও। সময় কাটছেই না।
কয়েক হাজার বছর পর , আসলে পাঁচ মিনিট পর মাথা তুলে দেখল ,দূরে কুকুরের আকৃতির একটা কালো বিন্দু পরে আছে। আরও খানিকটা সময় ঘাপটি মেরে শেষে উঠে সামনে চলে গেল পা টিপে টিপে। মড়ে পরে আছে কালো বিশাল অ্যালসেশিয়ান কুকুরটা। দশ মিনিট লাগল, নরম বালি খুঁড়ে ওটাকে দাফন করতে। ব্যাগে করে ক্ষুদে সাইজের বেলচা এনেছিল সঙ্গে করে।
অন্ধকারে বিশাল একটা বাদুরের মত একপাক ঘুরে এলো পুরো বাড়িটা ।
টেলিফোনের লাইন পেয়ে কেটে দিল। কালো সুতা দিয়ে এমন ভাবে বেঁধে রাখল যাতে খুব কাছ থেকে দেখলে মনে হয় লাইন ঠিকই আছে।বাড়ির বাম দিকে ফ্রেঞ্জ উইন্ডো ছিল একটা। সেটা খুলে বাড়ির ভিতর ঢুকতে মোটেও সময় লাগল না। তবে জীবনের এই প্রথম একটু নার্ভাস লাগছে। এর আগে চোরের মত কোন বাড়িতে ঢোকেনি।
বন্দুকগুলো হাপিশ করতে বেশি সময় লাগল না। এমন কী কপালগুণে ড্রয়ারের ভেতরে শিশিরের পিস্তলটাও পেয়ে গেল। পেল্লাই একটা তোয়ালের মধ্যে সব রেখে পোঁটলা করে চাঁদের আলোয় ভিজতে ভিজতে বালির মধ্যে পুঁতে ফেলল সব।
শুধু শিশিরের পয়েন্ট থার্টি পিস্তলটা প্যান্টের পেছনে গুঁজে রাখল।জিনিসটা পছন্দ হয়েছে।
কাজ শেষ করে গ্যারেজের গিয়ে গাড়ির স্পার্কিং প্লাগগুলো সব খুলে রুমালে প্যাচিয়ে অন্য আরেকটা জায়গায় নরম বালির তলায় পুঁতে রাখল।
ততক্ষণে পুরোপুরি আত্মবিশ্বাস এসে গেছে পোকার ভিতরে। মানিক দাদার কথামতো সব কাজ হয়েছে - এটা ও একটা স্বস্তির ব্যাপার।
শুরু ভাল মানে সবই ভাল যাবে- বিশ্বাস করে ও।কুত্তাটা গেছে। বন্ধুকগুলো কবর দেয়া হয়েছে। গাড়ি অচল। টেলিফোন ডেড। বাকি রইল শুধু চাকর দুঃখীরাম।
কোমরের বেল্টের সাথে জড়ান সাইকেলের চেইন খুলে হাতে নিল । পোকার প্রিয় অস্ত্র৷ সব মারামারিতে এটাই ব্যবহার করে। সেই ছোটবেলা থেকে । ডান হাতের তালুর মধ্যে ব্যান্ডেজের মত ভাল করে পেঁচিয়ে নিল চেইনটা।কয়েকবার মুঠো খুলে - বন্ধ করে দেখে নিল চেইনটা শক্ত হয়ে এঁটে আছে কি না।
*************************
দুঃখীরাম চিংড়ির মতো রোগা ভোগা ছোটখাটো মানুষ।
রাত দুটোর সময় কারণ ছাড়াই বেচারার ঘুম ভেঙে গেল। স্বচ্ছ এক ঘুমে রাত কাবার করে সকালে উঠে যায়। কিছুক্ষণ অন্ধকারেই শুয়ে রইল। ভাবছে- আজ কেন ঘুম ভাঙল?
ঘুম ঘুম চোখে উঠে ফ্রিজ খুলে ঠাণ্ডা বোতলটা পেয়ে মনটা ভাল হয়ে গেল।তেষ্টা পেয়েছে। ছিপি খুলে চুমুক দিতে দিতে বাইরে চলে গেল।
ঘন হলুদ চাঁদের আলো। গরম বাতাস । গহন জ্যোৎস্না।
বোতলটায় চুমুক দিয়ে নামাতে যাবে, তখনই আড়াল থেকে সামনে এসে দাঁড়াল পোকা। দুজন একে অপরের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। চাঁদের উল্টো দিকে ছিল দুঃখীরাম। ওকে ভাল করেই দেখতে পেল পোকা।কিন্তু দুঃখী শুধু দেখল- পেল্লাই একটা কালো ছায়া।
আতঙ্কে প্রথমেই দুঃখীর হাত থেকে জলের বোতলটা খসে পড়ল। সেই বোতল পড়ার শব্দটা ট্রিগার সুইচ হিসাবে কাজ করল পোকার শরীরে।
দুঃখী চেঁচিয়ে ওঠার আগেই সাপের মতো লাফ দিল পোকা । সাইকেলের চেইন প্যাঁচানো ডান হাত দিয়ে গায়ের জোরে ঘুষি মারল ক্ষুদে ভৃত্যের ঘাড়ে।
মাটিতে পরে যাওয়ার আগেই ক্যাচ ধরে ফেলল দুঃখীর শরীরটা। টানতে টানতে নিয়ে এল সারভেনট কোয়াটারের ভিতরে । ছোটখাটো পটকা শরীরের লোকটার জন্য মায়াই লাগলো পোকার। বাইরে আসার আর সময় পেল না ? আঘাতটা অনেক জোরে হয়ে গেছে। উপায় ছিল না আঘাত না করে। চিৎকার করতে পারত লোকটা। ফাঁকা জায়গায় চিৎকারের শব্দ বহু দূর দুরান্ত পর্যন্ত যাবে।
হাতের চেইনটা ভেজা ভেজা লাগছে। বালিতে ঘষে পরিষ্কার করে জিনিসটা আবার কোমরে পেঁচিয়ে রাখল। অনুশোচনায় ভুগছে-রোগা লোকটাকে এত জোড়ে মারা ঠিক হয়নি।মরে টরে গেলে মস্ত বিপদে পড়ে যাবে। তখন হয়তো পুলিশ নামবে। কেশু আর মানিকদা ওর পক্ষে থাকবে না।
টর্চের আলো ফেলল দুঃখীর চেহারায়। লাফ দিয়ে উঠল পোকার কলজে ।
মারা গেছে দুঃখী।
সাত
কপাল ভাল সাবিহার, কোটিপতি তৈমুর খন্দকারের মেয়ে ও। নইলে হয়ত গার্মেন্টসে কাজ করত। বা কোনও বাড়ির কাজের বুয়া হত। লেখাপড়া শিখলে বড় জোর টাইপিস্টের চাকরি পেত এবং প্রচুর বানান ভুল করত এক পাতা টাইপ করতে গিয়ে।
কিন্তু কপাল ভালো । তৈমুর খন্দকারের একমাত্র মেয়ে ও।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাথরুমে নগ্ন হয়ে নিজের শরীর দেখে দেখে সাবিহা আবিষ্কার করছে, ও মোটেও সুন্দরী না । ফ্যাকাশে জৌলুসহীন চেহারা । রুক্ষ পাথরের মত চামড়া। বিড়ালের মত বাদামি বড় বড় চোখ দুটো বড্ড অস্বস্তিকর । ফিগারটাও যাচ্ছে তাই।লাকড়ির মত। আকর্ষণীয় মেদ নেই।তবে ওর পা দুটো সরু আর লম্বা লম্বা। এটাই যা শুধু সান্তনার।
জন্ম থেকে লাই পেতে পেতে নষ্ট হয়ে গেছে ও। এখন বয়স চলছে আঠারো। দিন দুনিয়ার উপরে মহাবিরক্ত । মেজাজ সব সময় খিটখিটে । ক্লান্ত। একটা জিনিস ভাল করেই বুঝে, রাজ্যের যত হালি হালি সুদর্শন যুবক ওর পিছে ঘোরাঘুরি করে সবই ওর বাপের টাকার লোভে করে। ভালোবাসা বা প্রেম ট্রেম কিছু না।
ছেলেদের বিশ্বাস করে না ও। সারাদিন ম্যাগাজিন আর সিনেমা দেখে সময় কাটায়। যেসব ম্যাগাজিনগুলোতে খালি গায়ের সুদর্শন পুরুষের ছবি ছাপা হয় সেগুলি ওর প্রিয়।
টাকার অভাব নেই। বাপ দুই হাত ভর্তি টাকা দেয় ওকে। খরচ করে বেশুমার। সপ্তাহে চারবার পার্টি দেয় । এক গাদা বান্ধবী নিয়ে মাল্টিপ্লেক্সে গিয়ে সিনেমা দেখে । পার্টিতে অফুরন্ত দামি খাবার আর মদ সরবরাহ করে। মাগনা খাবারের লোভে প্রচুর যুবক ওর পার্টিতে আসে।বিনামূল্যে খাওয়া পানীয় পাবার লোভ বড্ড সাংঘাতিক। আর কিছু না। আড়ালে ওকে নিয়ে সবাই হাসে।
দিনগুলি সাবিহার এক ঘেয়ে যাচ্ছিল।
চৈত্র মাসের সেই সকালের কথাই বলছি।
সকালের জলখাবার খেয়ে গাড়ি নিয়ে বের হলো সাবিহা। পার্লারে যাবে। চুলে রঙও করাবে। ভাবছে জিমে ও ভর্তি হবে। জিম করলে যদি ফিগারটা খোলতাই হয় !আর কোন গুণ না থাকলেও গাড়ি ড্রাইভ করার গুণটা আছে ওর। ইচ্ছে করলে রেসিং কারের ড্রাইভার হতে পারত। গেটের বাইরে বের হয়েই রুইতনকে দেখতে পেল। বাপরে ! কী সুন্দর ফিগার মেয়েটার !
আহা , আমার ফিগারটা যদি এমন হতো। ভাবল সাবিহা ।
গাড়ির বনেট খুলে সামনে ঝুঁকে আছে রুইতন। বিশ গজ দূরে ঝোপের আড়ালে হিসু করার ভঙ্গিতে বসে আছে মানিক । মায়ের কথা ভাবছে, এই সময়েও । গত রাতে নার্সকে ফোন দিয়ে বলেছে, মায়ের দিকে খেয়াল রাখতে। কয়েক দিন পর ফিরবে ও।
নীল রঙের মধ্যে সাদার বল প্রিন্ট শাড়ি পরে আছেন রুইতন । পণী টেইল করা চুলগুলো বেঁধেছে নীল ফিতা দিয়ে। অপূর্ব লাগছে।
সাবিহার চোখে চোখ পড়ামাত্র হাত নেড়ে মিষ্টি হেসে বলল, ‘ আপনি কি আমাকে একটু সাহায্য করতে পারবেন? আমার গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেছে।’
মেয়েটার সহজ সরল আচরণে মুগ্ধ হল সাবিহা।
ঈশ, কী একটা মেয়ে রে বাবা। একদম সাবলীল। যে কোন মডেল ফেল ।
‘ সামনেই মোটর গ্যারেজ আছে। এসো, আমি তোমাকে নামিয়ে দেবো।’ বলল।
আড়াল থেকে সবই শুনছিল মানিক । বাহ। ব্যাপারটা অত সহজ হল ?
গাড়িতে বসার মতো গ্যাস প্যাডেলে চাপ দিয়ে গতি বাড়িয়ে দিল সাবিহা। স্পীড তুলে অন্যকে ভয় দেখাতে পছন্দ করে।
‘ তোমার গাড়ি ছিল ওটা ?’ সাবিহাই প্রথম কথা শুরু করল । ‘খুব সুন্দর তো।’
‘আপনার পছন্দ হয়েছে ?’ কথা চালানোর জন্য কথা বলছে রুইতন। বিরক্ত হচ্ছে মনে মনে । এত জোড়ে গাড়ি চালালে তো মানিকদাদা ওদের অনুসরণ করতে পারবে না।
তাড়াতাড়ি দু হাতের তালু দিয়ে মুখ ঢেকে চিৎকার করে বলল, ‘আরে, আরে এত জোরে চালাবেন না। আমার ভয় করে।’
আত্মতৃপ্তির হাসি হাসল সাবিহা।
লুকিং গ্লাসের পিছনটা খেয়াল করল রুইতন । দেখা যাচ্ছে না মানিক মোটকুটাকে । ব্যাটা ঠিক মতো অনুসরণ করতে পারবে তো?
‘ভয় পেয়েছিলে ?’ হাসি মুখে প্রশ্ন করল সাবিহা।
‘ হ্যাঁ, ভীষণ। আপনি কোথায় যাবেন ম্যাডাম?’
‘ আমি যাব পার্লারে । গুলশানের দিকে।’
‘আমাকে ওখানে নামিয়ে দিন না ।’ অনুনয় করল রুইতন। ‘ খুব জরুরি কাজ আছে ওখানে ।কাজ শেষ করে আবার ট্যাক্সি নিয়ে গাড়ির মেকানিকের কাছে যেতে পারব৷’
‘সমস্যা নেই।’ হাসি মুখে বলল সাবিহা। সাথে সাথে চেঁচিয়ে উঠলো। ‘হায়, হায় সর্বনাশ।আবার?’
‘কী হয়েছে?’ তীক্ষ্ণ গলায় বলল রুইতন।
‘পুলিশ।’ সাবিহার গলায় হতাশা। ‘ওভার স্পিডে গাড়ি চালিয়েছি।’
হাত পা জমে বরফ হয়ে গেল রুইতনের।পলক ফেলতে না ফেলতেই ওদের গাড়ির পাশে চলে এল পুলিশের মোটরসাইকেলটা ।ইয়া মোটা আলকাতরার মত কালো অফিসারের মুখ দেখা গেল। হাসছে।
‘গাড়ি থামান ম্যাডাম। আপনি বেশি স্পিডে গাড়ি চালিয়ে ফেলেছেন।’ তেলতেলে হাসি উপহার দিল কালো অফিসার।
পথের এক পাশে সাবিহা গাড়ি থামাতেই নেমে এল পুলিশের ইউনিফর্ম পরা কালো অফিসার।গরমে বগল ঘেমে গেছে বেচারার।
‘জাহান্নামের চৌরাস্তায় যান আপনি।’ খেঁকিয়ে উঠল সাবিহা।
‘আপনার আব্বু কেমন আছেন ম্যাডাম?’ আগের মতোই তেলতেলে হাসি হাসছে অফিসার।
‘সেটা উনাকেই জিজ্ঞেস করবেন দেখা হলে।’ রাগী গলায় বলল সাবিহা।
খসখস করে লিখে ফাইনের রিসিটটা সাবিহার হাতে ধরিয়ে দিল অফিসার । হাসি দুই কানের লতিতে গিয়ে ঠেকেছে। সাবিহাকে ভাল করেই চেনে। প্রত্যেক সপ্তাহে একবার করে ফাইন ধরিয়ে দেয় মেয়েটাকে।বেশ লাগে ওর। মুম্বাই সিনেমা মার্কা একটা ভাব আছে না ? এই মেয়েটাকে যদি পটাতে পারত !
হাসতে হাসতেই অফিসারের চোখ পড়ল রুইতনের উপর। সতর্ক চোখে চেয়ে রইল বাড়তি কয়েকটা মুহূর্ত।
আতঙ্কে গলা শুকিয়ে গেল রুইতনের।হাত দুটো হাঁটুর উপর শক্ত করে চেপে ধরে মুখটা পাথুরে করে অন্যদিকে চেয়ে রইল।
সাবিহাকে লক্ষ্য করে লম্বা স্যালুট ঠুকল অফিসার। তোষামুদে স্বরে বলল, ‘ স্যরি ম্যাডাম, গাড়ি থামানোর জন্য। আপনি তো জানেন ডিউটিতে আছি।অনেক বেশি স্প্রিড তুলেছেন আজকেও।’
‘ জাহান্নামের চৌরাস্তায় যান আপনি।গলায় কলসি বেঁধে ডুবে মরতে পারেন না ?’ আবারও খেঁকিয়ে উঠল সাবিহা।
অমলিন হাসি বিলিয়েই যাচ্ছে অফিসার।ডিউটি শেষ হলে আফিসে বসে কেমন রসিয়ে রসিয়ে ঘটনাটা বর্ণনা করবে সেটা আগাম ভেবে বেশ পুলকিত।
কথা শেষ করেই এক টানে গাড়ি বড় রাস্তায় তুলে ফেলল সাবিহা । গজগজ করছে।
তখনই পিছন থেকে হুশ করে কমলা রংয়ের একটা গাড়ি চলে গেল।
‘আরে ওটা তোমার গাড়িটা না ?’ উঁচু গলায় অবাক করা সুরে বলল সাবিহা।
ঢোক গিলল রুইতন। মানিক গাড়ি নিয়ে গেছে। পরিষ্কার দেখেছে।
‘আরে না আমার গাড়ী হবে কেন?’
‘কী জানি! আমার তো মনে হল তোমার গাড়ি !’ বোকার মতো বলল সাবিহা। ‘ যাকগে তোমাকে নামিয়ে পার্লারে ফিরে যাই। ব্যাটা পুলিশ অনেক দূর থেকে আমাকে অনুসরণ করবে। আমি জানি হাঁদাটা আমার প্রেমে পড়েছে।’
দ্রুত ভাবছে রুইতন। পুলিশের গাড়িটা দেখা যাচ্ছে না।কিন্তু সাবিহা যখন বলছে তখন নিশ্চয়ই পিছন পিছন আসবে। দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে। নতুন কোনো ঝামেলায় ফেঁসে যেতে পারে যে কোনও মুহূর্তে।এটাই সবচেয়ে নির্জন রাস্তা। বড় রাস্তায় উঠলেই সব সুযোগ শেষ।
ব্যাগ খুলে কাচের বোতলটা বের করে আনল রুইতন । চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘শোনো মেয়ে , কোন রকম চালাকি করলেই বিপদে পড়বে তুমি।’
আট
‘তোমার পায়ে এটা রক্তের দাগ, তাই না?’ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল মেঘা।
‘ মনে হয় না।’ খানিকটা থতমত খেয়ে জবাব দিল শিশির। ‘ চলো দ্রুত বের হয়ে পড়ি, বাড়ির ভেতরটা কেন জানি না , নিরাপদ লাগছে না একটুও ।’
মেঘা কিছু বলত । থেমে গেল।
নিচতলা থেকে ফ্রিজ খোলার শব্দ পেয়েছে দুজনে।
‘শুনেছো?’ চোখ বড় বড় করে বলল সে। ‘ রান্নাঘরে কেউ আছে।’
‘ তুমি এখানে থাকো ।আমি দেখেছি।’ জুতার ফিতে বাঁধতে বাঁধতে চাপা স্বরে বলল শিশির।
‘ না, না, তুমি যাবে না । আমার সাথে থাকো।’
‘ শান্ত হও। তুমি পিচ্চির সাথে থাক। আমি আসছি।দুঃখী হয়তো ফ্রিজ খুলেছে।’
নিঃশব্দে নীচে নেমে এসে শিশির।
বৈঠকখানা পার হয়ে কিচেনে আসতেই ধাক্কাটা খেল। আতঙ্কে শরীর অবশ হয়ে গেল ওর।
উস্কোখুস্কো চেহারা আর ময়লা পোশাক পরা কুৎসিত চেহারার পোকা ডাইনিং টেবিলে বসে ঠাণ্ডা মুরগির ঠ্যাঙ চিবোচ্ছে। শিশিরের চোখে চোখ পড়ামাত্র শেষ কামড় দিয়ে হাড়টা ছুঁড়ে মারল দূরে, কার্পেটের উপর। ভেংচি কেটে বলল, ‘ কী খোকা ভয় পেয়েছ ? ভয় পেও না ভয় পেও না তোমায় আমি মারব না।’
এক লহমায় ভয় পরিণত হল ক্রোধে। কঠিন গলায় শিশির বলল , ‘তুমি কে ? কী করছো এখানে ?’
কোমর থেকে সাইকেলের চেইনটা বের করল পোকা।শূন্যে কয়েক পাক ঘুরিয়ে সেটা দারুণ একটা কায়দা করে মুঠোর মধ্যে পেঁচিয়ে ফেলল। ‘আমি কয়েকটা দিন তোমাদের বাসায় থাকব। কোনওরকম ট্যাঁ ফোঁ করবে না। তাহলে সমস্যা হবে না কারও? তোমার পুতুল মার্কা বউকে বল আমাকে কফি বানিয়ে দিতে । কড়া কফি। চিনি একটু বেশি। আমি চিনি বেশি খাই।মিষ্টি মনের মানুষ তো তাই। ’
‘বের হয়ে যাও এখনই।’ চেঁচিয়ে উঠল শিশির। ততক্ষণে মেঘা চলে এসেছে শিশিরের পাশে। পোকার চেহারা সুরুত দেখে ফুঁপিয়ে উঠল।
‘আরে বউদি যে।’ কুৎসিত হাসি হাসল পোকা। ‘কফি বানিয়ে দিন না । এক কাপ। না এক কাপ না। এক মগ। না দিলে আপনাদের বাবুটাকে কিন্তু মারব। ছোট ছোট বাচ্চা মারতে আমার খুব ভাল লাগে।’
আর সহ্য করতে পারব না শিশির। তেড়ে সামনে এগিয়ে গেল। নিয়মিত ব্যায়াম করে শিশির। কিন্তু মারামারি করে না। কলেজ জীবনে শখের খেয়ালে বালু ভর্তি বস্তাতে গ্লাভস হাতে নিয়ে ঘুষাঘুষি করেছে। ব্যস। অতটুকই।
পোকার ব্যাপারটা আলাদা৷ সেই ছোটবেলা থেকেই বস্তির পোলাপানদের সাথে মারামারি করে বড় হয়েছে। পেশার খাতিরে আজও পেশী ব্যবহার করে। শিশির ওর কাছে ঘাস ফড়িঙের মতই।
গায়ের জোড়ে ঘুষি মারল শিশির। আশ্চর্য একটা ভঙ্গিতে বাউলি কেটে সরে গিয়ে সাইকেলের চেইন প্যাঁচানো হাতে শিশিরের চোয়ালে মেরে বসল পোকা। শিশিরের মনে হল হাতুড়ি দিয়ে কেউ মেরেছে ওর মুখে। চিৎ হয়ে পড়ল পোকার পায়ের সামনে। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ওর বুকে বুট দিয়ে লাথি মারল পোকা।
চিৎকার করে উম্মাদিনীর মত পোকার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল মেঘা ।মেয়েটার চুলের মুঠি ধরে পোকা ওকে আছড়ে ফেলল মেঝেতে। সাইকেলের চেইন উঁচু করে হিসহিস করে বলল, ‘কফি। শুনেছেন? কফি। নইলে আপনার ভাতারের চেহারা আলু ভর্তা বানিয়ে দেব।’
****************************************
রিনরিন করে টেবিলের টেলিফোনটা বেজে উঠল ।
রিসিভার ঠেকিয়ে উনি বললেন- ‘ক্রাইম ব্রাঞ্চ। গাউস চৌধুরী বলছি।’
‘ স্যার, আমি আব্দুল হাই বলছি। কেশু হারামজাদাকে অনুসরণ করেছিলাম। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কী ভাবে যেন গায়েব হয়ে গেছে লোকটা। একদম ম্যাজিকের মত।’ ওপাশ থেকে বোকা বোকা গলায় বলল আবদুল হাই।
কয়েকটা মুহূর্ত চুপ করে রইলেন গাউস চৌধুরী।
আবিষ্কার করলেন রাগে ভিতরটা টগবগ করছে ।
‘ ঠিক আছে।’ শান্ত গলায় বললেন তিনি। ‘মটু মানিকের পিছনে যে দুই অফিসার সেঁটে ছিল। ওরা ?’
‘সরি স্যার। ওরাও মানিক হারিয়ে ফেলেছে।’ লজ্জিত গলায় বলল আব্দুল হাই ।
‘জানতাম।’ তিক্ত গলায় বললেন গাউস চৌধুরী। ‘তার মানে সত্যিই কিছু হতে যাচ্ছে।’
‘স্যরি স্যার। শয়তানটা এমন ভাবে অদৃশ্য গেল যে… আমি।’ লজ্জিত ভাবে তখনও সাফাই গাইছে আবদুল হাই। বেচারা মরমে মরে যাচ্ছে।
‘বাদ দাও। তুমি কোথায় আছো বল। তোমাকে পিক করব । এক জায়গায় যেতে হবে।’
‘ কোথায় স্যার ?’
‘কেশু হাওলাদারের বাড়িতে।’
বিশ মিনিট পর।
‘আমি বাজি ধরে বলতে পারি, শূয়রের বাচ্চাটা বাড়িতে নেই ।’ গাড়ি থেকে নামতে নামতে বললেন গাউস চৌধুরী। ‘কিন্তু ওর বৌকে পাবো । অনেক আগে এই মহিলা চিটাগাং- এর একটা নাইট ক্লাবে গান গাইত। বেশ কয়েক বছর আগে একবার দেখেছিলাম। এখন অবশ্য বেশ ভদ্রমহিলা হয়ে গেছেন। দেখি, আমাদের পরিচয় দিয়ে ভয় দেখিয়ে কোন খবর বের করতে পারি কিনা।’
‘মাখনের মত স্টাইলে আছে ব্যাটা।’ বাড়িটা দেখতে দেখতে আক্ষেপ করল আবদুল হাই।
‘এক সময়ে ডন ছিল।’ তিক্ত গলায় বললেন চৌধুরী। ‘ ঘাস পাতার মতো পয়সা কমিয়েছে। আমরা এক টাকা কামালে ওরা কামার এক হাজার টাকা।’
ঝকঝকে পালিশ কড়া লোহার গেইটের বাইরে গাট্টাগোটটা দারোয়ানটা চেয়ে আছে দুই অফিসারের দিকে ।সতর্ক আর সন্দেহ ভরা চোখে ওদের দেখছে।
কেশু হাওলাদার বাড়ি আছে কি না জিজ্ঞেস করায় সাফ বলে দিল মালিক বাসায় নেই।
‘তোমার ম্যাডামকে গিয়ে বল ক্রাইম ব্রাঞ্চের ইনস্পেক্টর গাচৌ মানে গাউস চৌধুরী দেখা করতে চায়।’
কয়েক মিনিট পর।
ড্রইং রুমে বসে আছে দুই অফিসার ।
দোতলা থেকে হেলেন নেমে এলো । ভয়ে শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে। মস্ত কিছু ঘটতে যাচ্ছে, বুঝে গেছে ।
‘কেশু বাসায় নেই বোধহয়।’ আসর জমানোর মতো একটা ভঙ্গিতে বললেন চৌধুরী। ‘ সমস্যা নেই। কোথায় গেছে জানেন ?’
‘ঠিক জানি না। ব্যবসার কাজে ঢাকা গেছে শুনেছি।’ নার্ভাস গলায় বলল হেলেন।
দীর্ঘ সময় ধরে হেলেনকে দেখলেন গাউস চৌধুরী। পনের বছর আগে এই মহিলাকে দেখেছিলেন। নাইট ক্লাবে গান গাইত । একটু বিবর্ণ হয়ে গেছে। তবে আজও সুন্দরী। গানের গলা ছিল অপূর্ব। আচ্ছা , মহিলা এত ভয় পাচ্ছে কেন?
‘মানিক নামের একজন ঘাঘু অপরাধী কয়েক সপ্তাহ আগে আপনাদের বাড়িতে এসেছিল। মনে আছে নিশ্চয়ই ? কেন এসেছিল ফটকাটা ?’ তীক্ষ্ণ চোখে হেলেনের উপর নজর ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলেন চৌধুরী ।
‘ এসেছিল।’ সতর্কতার সাথে শব্দ বাছাই করে কথা বলছিল হেলেন। ‘উনি আমার স্বামীর পরিচিত। অনেক পুরনো বন্ধু। নারায়ণগঞ্জে একটা রেস্টুরেন্ট খুলতে চায় মানিক সাহেব।’
‘রেস্টুরেন্ট !’ এই প্রথম হেসে ফেললেন গাউস চৌধুরী। ‘ মানিক রেস্টুরেন্ট খুলতে চায় ? দারুণ জিনিস শোনালেন ম্যাডাম। মানিক নিজেই থার্ড ক্লাস একটা ভাতের হোটেলে ওয়েটারের কাজ করে। নিজের বলতে শয়তানটার পকেটে এক হাজার টাকা আছে কিনা সন্দেহ।’
‘এতকিছু আমি জানি না।’ শান্ত গলায় বলল হেলেন। ‘ আমি যা শুনেছি তাই বললাম।’
‘ দেখুন ম্যাডাম আপনার স্বামীর সাথে আমার কোনও শত্রুতা নেই। অতীতে সে কী করত সে ব্যাপারেও আমার কোনও আগ্রহ নেই। তবে নতুন করে যদি খেলায় নামতে চায় আমি উনার পিছু লাগবে। ইচ্ছে হলে আপনি কিন্তু ব্যাপারটা সামাল দিতে পারেন। ভাল করে ভদ্রলোককে বুঝিয়ে শুনিয়ে বলুন। আচ্ছা গেলাম আমরা। আরেক দিন এসে চা খেয়ে যাব।’
গট গট করে দুই অফিসার চলে গেল।
একা হতেই হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগল হেলেন ।
নয়
দুই অফিসার যখন হেলেনের সাথে কথা বলে বের হচ্ছিল , কেশু তখন ঢাকায়। হোটেল ব্লু স্টারের দারুণ ছিমছাম কামরাতে বসে জিন টনিক গিলছিল। আর মনে মনে নিজের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছিল।
কত সুন্দর করে পিছনে লেগে থাকা টিকটিকি দুটোকে ফাঁকি দিয়েছে। উফ! তারমানে এখনও মরচে ধরে যায়নি !
ব্যালকনিতে বসে অনেক সময় নিয়ে আয়েশ করে ড্রিংক শেষ করে হোটেলের ল্যান্ডলাইন থেকে ফোন করল মানিককে। হোটেলে উঠেছে ভুয়া নাম পরিচয় দিয়ে ।
মানিকের নাম্বার চোরাই। পুরানা পল্টনের রাস্তা থেকে সিম সহ চালু একটা ফোন কিনে নিয়েছে। পুলিশ আর ছিনতাইকারিরা ভাগে বিক্রি করে।
সংকেতে কথাবার্তা বলল। পুরোনো দিনের মানুষ ওরা। নিজেদের কথা শুধু নিজেরাই বুঝতে পারবে।
‘শুটকির প্যাকেট ঠিক মত পেয়েছি স্যার।’ বলল মানিক । ‘ শুধু প্যাকেট নেওয়ার সময় একটা বাচ্চা গাড়ি থামিয়ে ছিল। জোরে গাড়ি চালাচ্ছিল ডেলেভারি বয় । তাই। বাচ্চাটা আমাদের রুই মাছটা দেখে ফেলেছে।’
‘ব্যাপারটা মনে ভাল হল না।’ অস্বস্তি নিয়ে বলল কেশু । ‘ এই গরমে দই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বাচ্চাটা রুই মাছের সাইজ চেহারা মনে রাখতে রাখবে বলে মনে হয় না। রিল্যাক্স । কেমন আছে বড় লোকের বেটি ?’
‘ওর মাথায় লাল গেন্ধা ফুল গুঁজে দিয়ে কব্জায় রেখেছে রুই মাছ। শর্ষের তেলের বোতল দেখাতেই ভয়ে একদম খিঁচে গেছে।’
‘সব ঠিক আছে ৷ একঘণ্টা পর নবীগঞ্জের দিকে যাত্রা শুরু করব।’
ফোন কেটে নীচে গিয়ে ভরপেটে খাবার খেল কেশু । নিজের কামরার বারান্দায় ফিরে এলো হুইস্কির পেটমোটা একটা বোতল নিয়ে।
লম্বা সময় ধরে ধীরে ধীরে মদ খেল। কার্নিশে কাকদের ঝগড়া আর পায়খানা করতে দেখল।
আবার পুরো ব্যাপারটা নিয়ে আগাগোড়া ভাবল। ধাপে ধাপে সব ঠিকই যাচ্ছে।
আচ্ছা পুলিশ অফিসার কি রুইতনের চেহারা মনে রাখবে ? সাবিহা কিডন্যাপ হওয়ার আগে সাথে একটা মেয়ে ছিল - এই তথ্যটা পুরো ব্যাপারটা জটিল করে তুলবে না ?
ব্যাপারটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইল কেশু ।
যে পুলিশ সাবিহার পিছনে পিছনে অনুসরণ করছিল সেই গাধাটা হেডকোয়ার্টারে গিয়ে রিপোর্ট করেনি , যে ওদের সে হারিয়ে ফেলেছে ? পার্লারের ওরা অবাক হয়নি ? প্রতি সপ্তাহে সাবিহা আসে । এই সপ্তাহে এলো না যে ! মানিক পারবে পুরো ব্যাপারটা সামাল দিতে ?
পকেট থেকে নোট বইটা বের করল কেশু। অসংখ্য দরকারি নাম্বারের সাথে খন্দকারের বাড়ির নাম্বার জোগাড় করেছে , বহু কাঠখড় পুড়িয়ে।
নাম্বারটা ডায়াল করতে গিয়ে থমকে গেল। ইশ কি করতে যাচ্ছিল সে ! হোটেল থেকে ফোন করা একদম বোকামি হয়ে যাবে। মাত্র এক মিনিট তদন্ত করলেই বের হয়ে আসবে ফোন করা হয়েছিল কোত্থেকে।
হোটেলের বেশ খানিকটা দূরে রাস্তার পাশের একটা ওষুধের দোকানে ফোন করার জায়গা আছে। টাকা দিলেই মিনিট হিসাবে ফোন করা যায়।
ওখান থেকে খন্দকারের বাড়িতে ফোন করল কেশু ।
মিহি গলায় ফোনের ওপাশে কেউ বলল, ‘খন্দকার ভিলা। কে বলছেন ?’
‘খন্দকার সাহেবের সাথে কথা বলতে চাই। খুব জরুরি।’
‘কে বলছেন ?’
‘রুস্তম আমার নাম । ওনাকে বলুন উনার মেয়ের ব্যাপারে কথা বলব আমি।’
‘একটু ধরুন।’
খন্দকার মাত্র বাড়ি ফিরছিলেন। এক গাদা ফাইল দেখছিলেন স্টাডি রুমে বসে । ব্যবসা সংক্রান্ত কাজ। হাতে ডাবল মার্টিনর গ্লাস। জলপাই সহ।
তৈমুর আলম খন্দকার বেঁটে গাঁট্টাগোট্টা মানুষ । চেহারা দেখে মনে হয় সারা দুনিয়ার সবার প্রতি বিতৃষ্ণা নিয়ে বেঁচে আছেন । চোখ দুটো কালোজামের মতো কুঁতকুতে। মুখের চোয়ালটা ব্যারাকুডা মাছের কথা মনে করিয়ে দেয় খামাখাই । চেহারা দেখলে বোঝা যায় এই লোক দুনিয়া এসেছে এক টাকাকে একশো টাকা বানানোর জন্য।
কয়েকটা মুহূর্ত কটমট করে কাজের লোকটা দিকে চেয়ে রইলেন। ফোন তোলার আগে বাম হাতে ফোনের সাথে অ্যাড করা কল রেকর্ড করার লাল সুইচটা অন করে দিলেন।
‘হ্যালো, কে বলছেন ?’
‘খন্দকার সাহেব ?’
‘বলছি।’
‘মন দিয়ে শুনুন। অস্থির হওয়ার কিছু নেই। আপনার মেয়ে আমাদের হাতে আছে।’ শান্ত মাপা পেশাদারি গলায় বলতে লাগল কেশু । ‘ একদম নিরাপদে আছে। যদি পুলিশকে এইসব জানান তবে আর নিরাপদে থাকবে না। বাকি জীবনে দেখতে পাবেন না মেয়ের চেহারা । এতি পেতি দল না আমরা। ইন্টারন্যাশনাল পেশাদারি পুরনো দল। ঠিক এই মুহুর্তে আপনার বাড়ির উপর নজর রাখা হচ্ছে। আপনার ফোন ট্যাপ করা হচ্ছে। কাকে ফোন দেখেন, কী বলবেন সব শুনতে পারব আমরা। অপেক্ষা করুন। আবার ফোন দিয়ে বাকিটা বলব।’
ফোন কেটে দিয়ে অলস পায়ে রাস্তা পাড় হয়ে উল্টা দিকে এলো কেশু । ট্যাক্সি নিল, হোটেলে ফিরবে।
**************************************************
কয়েকটা মুহূর্ত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন খন্দকার। চেহারা খানিকটা লাল হয়ে গেছে।
ফোন রেখে চিৎকার করে বললেন, ‘আমজাদকে খবর দাও জলদি।’
আমজাদ কয়েক মিনিটের মধ্যেই এলো।
পেটানো তাগড়া শরীর। নীল জিনস আর সাদা স্পোর্টস শার্ট পরনে। খন্দকার সাহেবের সেক্রেটারি। মহা ধুরন্ধর লোক। ঠান্ডা মাথার জন্য বিখ্যাত।
গম্ভীর মুখে অডিও রেকর্ডটা বাজিয়ে শুনল কয়েকবার।
শান্ত ভাবে মোবাইল নিয়ে দ্রুত কয়েকটায় ফোন করল । শেষে বসের দিকে ফিরে বলল, ‘ রাস্তার ফোন বুথ থেকে ফোন দিয়েছিল স্যার। আর স্যার, ম্যাডাম আজকে পার্লারে বা কান্ট্রি ক্লাবে খেতে যায়নি। আমি কি ক্রাইম ব্রাঞ্চে ফোন করবো স্যার ? ওখানে পরিচিত লোক আছে আমার।’
জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন খন্দকার সাহেব।
‘না।’ ফিসফিস করে বললেন । ‘কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। তুমি যাও। খানিকটা সময় একা থাকতে দাও আমাকে।’
**********************************
নির্জনবাসের বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে পোকা।
গাড়িটা দেখা যাচ্ছে । অনেক দূরে। এ দিকে আসছে।
প্যান্টের পকেটে রাখা শিশিরের পয়েন্ট থার্টি এইট পিস্তলটায় আলতো করে হাত বুলিয়ে নিল। বাড়ির ভেতরে শিশির মেঘা আর পিচ্চিকে আটকে রেখে বাইরে থেকে লক করে রেখেছে পোকা। পালাতে পারবে না। ওদের মোবাইলগুলো পর্যন্ত জব্দ করেছে। দুঃখীর রুমে মোবাইল জ্যামার রেখে অন করে দিয়েছে। সব মিলিয়ে অবস্থা ভালো৷
অন্য সময় হলে মৌজে থাকত পোকা। এখন পারছে না । বারবার দুঃখীরামের চেহারাটা ভেসে উঠছে চোখের সামনে। কাজ শুরু করার আগে একটা লাশ পড়ে গেছে। সন্দেহ নেই , খুব খারাপ হয়েছে ব্যাপারটা। নিজেকে সান্ত্বনা দিল পোকা- ইচ্ছে করে খুন করেনি সে চিংড়ি মাছের মতো রোগা কাজের লোকটাকে। আঘাত করে অজ্ঞান করতে চেয়েছিল। কিন্তু ব্যাটা দুঃখীরাম আসলেই দুঃখী। মরেই গেল ?
গাড়িটা এসে থামল।
মানিক চালাচ্ছিল।
পিছনের সিটে রুইতন আর জিম্মি মেয়েটা বসে আছে। মেয়েটাকে দেখে বেশ হতাশ হল পোকা৷ আরও চকমকা সুন্দরী আশা করছিল। বড়লোকের মেয়ের এমন কুৎসিত হয় নাকি?
প্রায় দৌড়ে গাড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়াল পোকা।
‘সব ঠিক আছে ?’ কুশলাদি জানতে চাইল মানিক ।
মাথা ঝাঁকাল পোকা।ডান হাতের বুড়ো আঙুল তুলে দেখাল। ইংরেজি মুভি দেখে শিখেছে।
‘গাড়িটা কোথায় লুকিয়ে রাখা যায় ?’
‘গ্যারেজে নিয়ে যান প্রচুর জায়গা আছে ৷’
মানিক চলে গেল ওদের নামিয়ে রেখে। সাবিহা কৌতূহলের সাথে পোকাকে লক্ষ্য করছিল ।নোংরা পোশাক পরা মারকুটে পোকাকে বেশ পছন্দ হয়েছে । আসার পথে গাড়িতে মানিক ওকে বুঝিয়ে বলেছে, ওর বাবা টাকা দিলে দিলেই ওর কোনও ক্ষতি হবে না।
‘হ্যালো, আমার নাম পোকা।’ আগ বাড়িয়ে কথা বলল লোকটা । ‘ খুকি তোমার নাম ক কী ?’
এহহে। এটা যদি একটু সাফসুতরো হত , কী যে লাগত না । ভাবলো সাবিহা। কী ফিগার ব্যাটার। মুম্বইয়ের মারদাঙ্গা নায়কগুলোর মতো লাগছে।
‘তুমিও কী এদের লোক না কি ?’ জানতে চাইল ।
‘নিশ্চয়ই।’ মধুর হাসি হেসে পোকা হাত বাড়িয়ে দিল সাবিহার দিকে। বুঝতে পেরেছে মেয়েটার মনে ও লাডডু ফুটিয়েছে। খপ করে সাবিহার হাত ধরে ফেলল।
কাছে আসতেই পোকার ময়লা জামাকাপড়ের দুর্গন্ধ সাবিহার নাকে আঘাত করল ।গা ঘিন ঘিন করে উঠল নোংরা কালো নখ আর হলুদ দাঁত দেখে । ঠাস করে চড় কষে বসল পোকার গালে।
চড় খেয়ে থমকে গেল পোকা।
পোকা সেই ধরনের মানুষ যারা সাপের মতো। আঘাত পেলে হুঁশ জ্ঞান হারিয়ে ছোবল মারতে চায়। তাছাড়া মেয়েটার কাছ থেকে প্রত্যাখান আশা করেনি। ভেবেছিল মেয়েটা ওর ছক্কাবাজ ইমেজ দেখে মজে গেছে।
রাগে দিশাহারা হয়ে পোকা এক কদম সামনে এগিয়ে গেল। মারবে মেয়েটাকে।
‘সামলে নাও পোকা।’ ভাইকে খোলস ছাড়তে দেখে সামনে চলে এলো রুইতন। ‘মানিক দাদা আসছে এইদিকে।’
থমকে গেল পোকা। বিষ মাখানো চোখে চেয়ে রইল সাবিহার দিকে। তারপর সহজ গলায় বলল, ‘ব্যাপারটা, মনে রাখব সোনামণি। আমাদের এক সাথে অনেকটা দিন এখানেই থাকতে হবে।’
‘কী হচ্ছে এখানে ?’ পেছন থেকে মানিকের শান্ত গলা শোনা গেল।
‘কিছু না।’
‘বন্দিরা সবাই ঠিক আছে ?’ময়লা রুমালে মুখের ঘাম মুছে সতর্ক গলায় প্রশ্ন করল মানিক ।
‘ঠিক আছে মানিক দা।’
‘কুকুর আর চাকর ?’
‘কুকুরটা মরে গেছে। বিষ মাখান মাংস খেয়েছিল। আর চাকরটার হাত পা বেঁধে কোয়াটারে রেখে এসেছি। পালাতে পারবে না।’
মানিক কেন যেন মনে হলো মিথ্যে কথা বলছে পোকা।
দশ
বিছানায় আধা অচেতন অবস্থায় শুয়ে ছিল শিশির। মাথার ভিতরে যন্ত্রণা। যেন মাথার ভেতরে হাতুড়ি দিয়ে নিয়মিত ছন্দে আঘাত করছে কেউ।
গাড়ির শব্দ শুনে মেঘা দৌড়ে গেল জানলার সামনে। চোখ বড় বড় করে বলল, ‘ আরও তিনজন এসেছে। দুটো মেয়ে । আর মোটা মধ্যবয়স্ক একটা লোক। কিন্তু কারা এঁরা?’
টালু মালু করে জানালার সামনে চলে এল শিশির। চোখ কুঁচকে বাইরের দৃশ্য দেখল কয়েক মুহূর্ত।
‘এই মেয়ে এখানে কেন?’ বিড়বিড় করে বলল, ‘ এ তো বিখ্যাত ধনী ব্যবসায়ী আলম খন্দকারের মেয়ে। এখানে কী করছ?’
এক লহমায় ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল ওর কাছে। ‘ মেঘা ওরা মেয়েটাকে কিডন্যাপ করেছে। আমি শিওর। আর নিরাপদে লুকিয়ে রাখার জন্য আমাদের বাড়িটা ব্যবহার করবে গুন্ডারা। কঠিন আইডিয়া। পুলিশ সারা ঢাকা শহর তন্ন তন্ন করে খুঁজবে। সারা দেশ তন্ন তন্ন করে খুঁজবে। কিন্তু এই জায়গার কথা ভুলেও ভাববে না। কারও মাথায়ই আসবে না এই জায়গার কথা।’
***************************************
দুপুর তিনটের খানিকটা পর হোটেল ছাড়ল কেশু। দারুণ রকম বখশিস দিল দারোয়ান আর রুম সার্ভিস ছেলেটাকে।
বাইরে গনগনে রোদ। চৈতালি বাতাসে ধুলো উড়ছে। গাড়ি চালাচ্ছে নবীগঞ্জের দিকে ।
পুরো ব্যাপারটা নিয়ে আবারও ভাবছে। অনেক বছর অ্যাকশনে নেমেছে । কেমন যেন চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে বুকের বাম দিকে । জীবনে প্রথমবার মতো নিজের ভেতরে আত্মবিশ্বাসের অভাব অনুভব করল। বুকের বাঁ দিকটা চেপে মনে মনে ভাবল - বুড়ো হয়ে গেছ তুমি কেশু। কিন্তু এখন পিছিয়ে যাওয়ার আর কোন উপায় নেই। মানিকের উপরে পুরোপুরি ভরসা রাখা যায়। সুন্দরভাবে সব সামাল দিতে পারবে।
নির্জনবাস বাড়ির সামনে যখন গাড়ি থামল, পোকা এগিয়ে এল কেশুকে রিসিভ করার জন্য।
‘সব ঠিক আছে ?’ জানতে চাইল কেশু। ‘প্রথমেই আমার গাড়িটা লুকিয়ে ফেলার ব্যবস্থা কর।’
তখনই নীচতলার দরজা খুলে গেল । বাইরের গরম রোদের আলোর মধ্যে চলে এলো মানিক। মানিককে দেখে পুরনো মেজাজে ফিরে গেল কেশু । পাশে পুরোনো দিনের একটা লোক থাকলে যেমন লাগে আর কি !
‘সব ঠিক আছে ওস্তাদ । তবে শিশির বাবু খানিকটা অসুস্থ।’
‘কেন কী হয়েছে?’
‘পোকা মেরেছিল।’
দুই চোখ জ্বলে উঠল কেশুর। পোকার দিকে কটমট করে চেয়ে বলল- ‘মেরেছ কেন ?’
‘সাহেব বউয়ের সামনে হিরো হবার চেষ্টা করেছিল। বাধ্য হয়েই দাওয়াই দিতে হয়েছে।’ মিনমিন করে বলল পোকা।
‘কী অবস্থা এখন ?’
‘আগের চেয়ে ভাল’
‘উনার কাছে নিয়ে চলো আমাকে।’
নিচতলার ড্রয়িং রুমের সোফায় সবাই বসে আছে । দরজার সামনে পিস্তল হাতে পাহারা দিচ্ছিল রুইতন । আক্ষরিক অর্থেই একটা সিংহের মতো কামরার ভিতরে ঢুকল কেশু ।
ভেতরের আবহাওয়া আরামদায়ক । নিঃসঙ্গ সোফায় বসতে বসতে শিশিরের দিকে চেয়ে পাক্কা ব্যবসায়ীদের মত বলল, ‘ আমার শুভেচ্ছা নিন। আমার এক লোক আপনার সাথে বাজে ব্যবহার করেছে, সেজন্য ক্ষমা চাইছি আমি।’
‘কে আপনি?’ জানতে চাইল শিশির। ‘এই মানুষগুলো কী করছে আমার বাড়িতে ?’
‘নাম ধাম আপাতত বাদ থাকুক।’ হাসি মুখে বলল কেশু। ‘আমাকে শুধু একটু সাহায্য করবেন আপনি।’
‘কী ধরনের সাহায়্য চাইছেন ? তাছাড়া আপনার ভাব চক্কর দেখে তো মনে হচ্ছে না কোন রকম সাহায়্য দরকার।’
‘দরকার। এই খেলায় আপনি মোটেও দুধভাত না। আপনার রোল অনেক বড়। আমি অনেক বেশি ভাগ্যবান যে দেশের সবচেয়ে ধনী লোকের একমাত্র মেয়েটাকে অপহরণ করতে পেরেছি। আপাতত আপনার বাড়িতে থাকব আমরা। আর আপনি দয়া করে মেয়েটা বাবার সাথে যোগাযোগ করবেন এবং ভদ্রলোকের কাছ থেকে দশ কোটি টাকা মুক্তিপণ হিসাবে তুলে এনে আমার হাতে দেবেন।’
হতভম্ব শিশির তাকিয়ে রইল কেশুর মুখের দিকে।
‘আপনার একটা বাচ্চা আছে তাই না?’ শয়তানের মতো হাসল কেশু। ‘ আণ্ডা বাচ্চা আমিও পছন্দ করি । শিশু মানেই যীশু । কৃষ্ণ। বাচ্চাদের বিপদে ফেলতে চাই না বুঝলেন। কিন্তু আমার একটা ত্যাঁদড় লোক আছে। পোকা । ও বেচারা বাচ্চা -মহিলা কিছুই কেয়ার করে না। সব সমান ওর কাছে। মানুষকে মারতে পছন্দ করে। সাইকো না কি বলে না ইংরেজিতে ?- সেটাই । আপনার মত লেখকের ভাষায় পোকা হচ্ছে নরকের কীট।’
‘কিন্তু তৈমুর খন্দকার সাহেব এত সহজে টাকা দেবেন না।’ হতাশ গলায় বলল শিশির।
‘এটা যে খন্দকার সাহেবের মেয়ে সেটা আপনাকে কে বলল ?’ গলার স্বর কয়েক ধাপ চড়ে গেল কেশুর। দুই চোখ কুঁচকে গেছে।
‘সবাই চেনে মেয়েটাকে।’ ক্লান্তির ছাপ শিশিরের গলায়। ‘বিখ্যাত বাপের মেয়ে। আপনি এত সহজে পার পাবেন না সাহেব।’
‘কোনও সমস্যা হবে না।’ কেশু বলল । ‘আপনি মেয়েটার বাপের সাথে কথা বলবেন। বোঝানোর দায়িত্ব আপনার। যদি টাকা না দেয় ধরে নেব আপনি ভদ্রলোককে ভালো মতো পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলতে পারেননি। টাকা দিতে হবে ক্যাশ। আমি জানি খন্দকার সাহেব কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলতে পারবেন। হয়তো উনার বাড়িতেই নানান জায়গায় পাঁচ দশ কোটি টাকা পড়ে আছে। ট্যাক্স মেক্স দেয় না এই দেশের বড় লোকেরা। আর কালো টাকার তো অভাব নেই । টাকার পোঁটলা আমার হাতে তুলে দিলেই আপনার খেলা শেষ। একদম সহজ একটা কাজ তাই না ? ’
‘একদম। মুদির দোকান থেকে পাঁচ টাকার ধনিয়ার গুঁড়া কেনার মত সহজ।’ এত বিপদের মধ্যেও টিটকারিটা না মেরে পারল না শিশির।
এবার চেহারাটা ভয়ঙ্কর করে তুলল কেশু। ‘ যদি খন্দকার সাহেব টাকা না দেয়। কিংবা পুলিশে খবর দেয় ।আর পুলিশ যদি গন্ধ শুঁকে শুঁকে এই বাড়ি পর্যন্ত চলে আসে তবে আপনার বউ বাচ্চা আর খন্দকারের মেয়েকে খুন করে আমরা বাতাসে গায়েব হয়ে যাব।’
উঠে দাঁড়াল কেশু। লাল চোখে কয়েক মুহূর্তে চেয়ে রইল মেঘার দিকে।
তারপর বের হয়ে গেলো বাইরে।
এগারো
বাইরে অনেক রাত।
নির্জনবাস বাড়িটা থমথমে । দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই , ভিতরে কত বড় নাটক চলছে।
নিচতলার ড্রয়িং রুমের সোফায় শুয়েছে মানিক । এখান থেকে পুরো বাড়ি নিয়ন্ত্রন করা যায়। মনে শান্তি নেই। মায়ের কথাই ভাবছে। দুই সপ্তাহ ধরে মাকে দেখতে পাচ্ছে না। আশা করছে এই সপ্তাহের মধ্যে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে ।
এখানে আসার আগে নানান পাবলিক প্লেস থেকে হরেক নাম্বার দিয়ে কয়েকবার ফোন করেছিল হাসপাতালে।নার্স সব সময় বলল, মা ঘুমাচ্ছে বা অসুস্থ, ফোন দেওয়া যাবে না।
কাজ ঠিকমত শেষ হলে ওস্তাদ ওকে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা দেবে।ওস্তাদের মুখের জবান কখনও নড়চড় হয় না। টাকাটা পেলে মা যতই অসুস্থ হোক না কেন সব ঠিক করে ফেলবে মানিক । বাড়িতে চব্বিশ ঘন্টার জন্য নার্স রেখে দেবে মায়ের জন্য।
তারপরেও পুলিশের ব্যাপারটা মাথায় আছে।সেটা পরে দেখা যাবে।ঝামেলা পোকাও করতে পারে।সাবিহার দিকে কেমন করে যেন নজর দিচ্ছিল । সাবধানে থাকতে হবে।
পাশের রুমের শুয়ে আছে সাবিহা। একটু ভয় পায়নি। পুরো ব্যাপারটা উপভোগ করছে।হ্যাঁ, রুইতন যখন অ্যাসিডের বোতল বের করেছিল তখন সাংঘাতিক ভয় পেয়েছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে একদম অ্যাডভেঞ্চার মার্কা মুডের মধ্যে আছে মেয়েটা।
নিজেদের কামরায় শুয়ে আছে পিচ্চি, শিশির আর মেঘা।
সাথে জমাট বাঁধা আতঙ্ক। দুশ্চিন্তা। উদ্বেগ।
‘তোমার কী মনে হয় ?’ বহু বার জিজ্ঞেস করার পর আবারও জানতে চাইল মেঘা।
‘ পুলিশের কাছে গিয়ে লাভ নেই।’ শান্ত গলায় জবাব দিল শিশির। ‘ ওদের কথা মতই কাজ করতে হবে। স্বার্থের জন্য সবই করতে পারবে ওরা। আমার স্থির বিশ্বাস দুঃখীরাম বেঁচে নেই।বাকি অন্য সবার কথা জানি না। কিন্তু পোকা…ও সবই করতে পারবে।’
বাড়ির বাইরে বারান্দায় বসে আছে দুই পোকা। শিশিরের ফ্রিজে পাওয়া বোতল গায়েব করে মদ গিলছে দুই ভাই বোন। বাড়ি পাহারার কাজও করছে একসাথে।
অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর দুম করে প্রশ্ন করে বসল রুইতন, ‘চাকরটার নাম যেন কী ? সুখীরাম না দুঃখীরাম, ওকে রাতের খাবার দিলে না যে। আমরা সবাইওর কথা ভুলে গেছি। ব্যাটার নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে?’
‘ওর একটুও খিদে পায়নি।’ দায়সারা জবাব দিল পোকা। ‘মারা গেছে লোকটা।’
চমকে ফিরে তাকাল রুইতন । ‘ কীভাবে?’
‘চিৎকার করতে যাচ্ছিল। আমি ভয় পেয়ে আঘাত করছিলাম ওকে। থামাতে চেয়েছিলাম। হাত থেকে ডিম পড়ে যেমন ভেঙে যায়, তেমনই মারা গেল লোকটা।আসলে হায়াত মউত সব উপরওয়ালার হাতে।’
‘লাশটা?’ঢোক গিলে বলল রুইতন ।
‘দূরে, বালির তলায় পুঁতে রেখেছি।’ আঙুল তুলে কোয়াটারের পেছনটা দেখাল পোকা।
‘কেশু যখন জানবে?’ কাটা কাটা গলায় বলল রুইতন। ‘মার্ডার যখন হয়ে গেছে মনে হয় না পুলিশ দূরে থাকবে। প্রথমে কিডন্যাপ পরে খুন। ভালো। খুব ভালো।’
মুখোমুখি বসে আছে কেশু আর শিশির।
কেশুর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মানিক ।
ড্রয়িং রুম । সকাল নয়টা হয়ে বেশ কিছু মিনিট।
বাইরে শিশিরের গাড়িটা মেরামত করছে পোকা। স্পার্ক প্লাগ লাগানোর পর ভুয়া নাম্বার প্লেট লাগাচ্ছে । কেশুই সাথে করে নাম্বার প্লেটটা নিয়ে এসেছিল।
‘খন্দকার সাহেবকে কি বলতে হবে মনে আছে নিশ্চয়ই ?’ বলল কেশু । ‘ভাল মত বুঝিয়ে বলবেন, টাকা পেলে উনার মেয়ের কোন ক্ষতি হবে না। যদি কোন রকম অং বং দেখি তবে আপনাকে প্রণাম জানিয়ে পোকার হাতে আপনার বউ আর বাচ্চাকে ছেড়ে আমি চলে যাব।বুঝেছেন ?’
‘ বুঝেছি।’ মাথা নাড়ল শিশির।
‘আপনাকে অনুসরণ করে পুলিশ যদি এখানে আসে, তবে বুঝতে পারবে আপনি ওদের নিয়ে এসেছেন। তখন প্রথমেই আপনার বাচ্চা আর বউকে মোরব্বা করা হবে। খন্দকারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সোজা চলে যাবেন নারায়ণগঞ্জ। ক্রিসেন্ট হোটেলে মামুন হাসান নামে উঠবেন। আমি উঠব পিঙ্ক রোজ হোটেলে। ফোন দিলে আমি আপনার সাথে দেখা করব। দুজন মিলে একসাথে ফিরে আসব এই বাড়িতে। ব্যস, আপনাদের সবাইকে সসম্মানে ছেড়ে চলে যাব আমরা। কিন্তু আপনি কোনও রকম চালাকি করলে বা আমি যদি বুঝতে পারি আপনি কোন রকম কূটকৌশল করছেন তবে...।’
‘ থাক, থাক। আর বলতে হবে না।’ শক্ত মুখে বলল শিশির।
‘আপনার গাড়ি তৈরি।’ উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল কেশু । ‘গিন্নি আর বাচ্চার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হয়ে যান। সাথে আমিও যাব।’
‘চাপা মারার আর জায়গা পান না মিয়া ?’ খেঁকিয়ে উঠলেন তৈমুর খন্দকার। ‘আপনি ওদের একজন। এখানে এসে ভং ধরছেন।’
শিশির আর খন্দকার বসে আছে মুখোমুখি। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে আমজাদ। অন্য সময় খন্দকার সাহেবের ড্রয়িং রুমটা দেখে মুগ্ধ হতো শিশির । চারদিকে ঢাউস সব কাঠের আলমারি ভর্তি বই আর দামি সব শো- পিস।
‘বিশ্বাস করুন, স্যার ।’ শান্ত গলায় বলল শিশির। ‘ আমাদের দুজন অবস্থা হুবহু এক। আপনার মেয়ে জিম্মি। আর আমার বউ - বাচ্চা। আপনার চেয়ে আমার অবস্থা বেশি খারাপ। আমি আপনার কাছ থেকে টাকা নিয়ে ওদের দিলেই আমার বউ আর বাচ্চা মুক্তি পাবে।’
‘আপনার বাড়িটা কোথায়?’
‘ কোনও রকম তথ্য দিতে পারব না স্যার। এমনকি আমার পরিচয় ও দিতে পারব না। টাকাটা দিয়ে দিন স্যার। দুই কিস্তিতে দিতে হবে। এক হাজার টাকার নোট।’
‘আপনি নিজেও কিন্তু এই ক্রাইমে জড়িয়ে যাচ্ছেন।’ সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন খন্দকার।
‘কিছু কেয়ার করছি না স্যার। আমার মাথায় আমার বাচ্চা আর স্ত্রীর নিরাপত্তা ছাড়া আর কিছু নিয়ে ভাবছি না।’
‘টাকা দিলেই যে আমার মেয়েকে আমি ফেরত পাব তার নিশ্চয়তা কী?’
‘কোনও নিশ্চয়তা নেই স্যার। ফিরে গিয়ে আমার বউ আর বাচ্চাকে দেখতে পাবো কিনা তাও জানি না। আপনার তো টাকার অভাব নেই স্যার। নিজের মেয়ের জীবন নিয়ে জুয়া খেলবেন কেন?’
‘ওরা কতজন আছে ? দেখতে কেমন ?’
‘বললাম তো, কোন তথ্য দিতে পারব না।’ অসহায় ভাবে বলল শিশির । ‘তবে আপনার মেয়ে এখন পর্যন্ত নিরাপদে আছে।’
‘ঠিক আছে।’ খানিক ভেবে বললেন খন্দকার। ‘আপনি একটু বসুন । ভয় পাবেন না। পুলিশকে ফোন দেবো না।’
পাশের কামরাতেও চলে এলেন খন্দকার আর ম্যানেজার আমজাদ খান।
‘লোকটাকে পাঁচ কোটি টাকা দিয়ে দাও।’ চিন্তিত সুরে বললেন খন্দকার সাহেব। ‘কালকের মধ্যে তুলে দেবে।’
‘কিন্তু স্যার...।’ কিছু বলতে চাইল আমজাদ ।
‘উহু, লোকটা অপরাধী না বা কিডন্যাপারদের কেউ না। বেচারাকে ফাঁদে ফেলে ব্যবহার করছে ওরা৷ চেহারা দেখো। মারধর করা হয়েছে। আর টাকা নিয়ে ভেগে যাবে তাও না৷ এখন পর্যন্ত অন্য কেউ জানে না সাবিহাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। এই লোক জানে। বেচারাকে বেশ কায়দা করে ফাঁসানো হয়েছে। লিঙ্ক হিসাবে ব্যবহার করার জন্য।’
‘স্যার, লোকটা চেহারা কেমন যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে আমার কাছে।’ বলল আমজাদ চিন্তিত সুরে। ‘ মনে হচ্ছে কোথায় যেন দেখেছি উনাকে । মনে হয় পত্রিকায় ছবি দেখেছি।’
দু চোখ কুঁচকে ফেললেন খন্দকার। ‘চিন্তা কর, আমজাদ। মনে করার চেষ্টা করে কোথায় দেখেছ। তাহলে পুরো জট খুলে যাবে।’
বারো
মানিকের অবস্থা খুবই খারাপ।
দুই পোকা পুরো ব্যাপারটা উপভোগ করছে।
ফ্রিজের সব বিয়ার মদ শেষ করে পিকনিক মার্কা মুডে আছে ওরা। ওদের সাথে যোগ দিতে পারছে না মানিক ।
বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসে আছে একা। মায়ের কথা ভাবছে। এক মিনিট... না আসলে মাত্র কয়েক সেকেন্ড যদি মায়ের সাথে কথা বলতে পারত ! কেমন আছে বুড়িটা। সারাটা জীবন পাখির মতো ডানা দিয়ে আড়াল করে রেখেছে ওকে। অথচ মায়ের জন্য কিছুই করতে পারেনি।
এখান থেকে ফোন করলে সমস্যা হবে। কেউ ওরা মোবাইল ব্যবহার করছে না। কেশুর কড়া হুকুম। হাসপাতালে মানিকের মায়ের কাছে কোত্থেকে থেকে ফোন আসছে, সেটা জানলেই লোকেশন ধরতে পারলেই তো সব শেষ। বাড়ির ছবি পর্যন্ত এসে যাবে পুলিশের হাতে।
এখান থেকে গাড়ি নিয়ে যদি বেরিয়ে যায় তবে মাইল ছয় গেলেই একটা দোকান পাবে। ওখানে পয়সা দিলে ফোন করা যাবে ফুটপাত থেকে। সহজে ধরতে পারবে না কেউ। গাড়ি নিয়ে গেলে এক ঘণ্টার মধ্যে ফোন করে আবার ফিরে আসতে পারবে।
ঘামতে ঘামতে উঠে দাঁড়াল মানিক ।
‘শোন আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।’ দুই পোকার সামনে দাঁড়িয়ে বলল সে। ‘ জরুরী কাজ আছে । এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসব।’
‘সমস্যা নেই।’ বাঁকা হাসি হেসে বলল পোকা । ‘ফিরে এসে আমাদের এখানেই পাবেন মানিকদা। আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।’
অবাক হয়ে মানিক চেয়ে রইল পোকার দিকে। এমন ভাবে কথা বলছে কেন ছোকরা ? মনে পড়ল, অতীতে কেউ এমন করে কথা বললে এতক্ষণে সবগুলো দাঁত ফেলে দিত সে।
‘ঠিক আছে। এই জায়গায় বসে বাড়ি পাহারা দেবে। কোন ঝামেলা যেন না হয়।’
‘ঝামেলার কথা আসছে কেন বড়ভাই ?’ বিরক্ত মুখে বলল পোকা । ‘ যান আপনার জরুরি কাজ শেষ করে ফিরে আসুন।’
রেগে উঠতে গিয়ে ও সামলে নিল মানিক । মনের ভিতর কেমন যেন কু- ডাক দিচ্ছে। অস্বস্তি বোধ লাগছে। পোকার চোখে অশুভ কী যেন ঝিকিমিকি করে দেখল সে মুহূর্তের জন্য।
ধুলো উড়িয়ে মানিক গাড়ি চলে যেতেই উঠে দাঁড়াল পোকা অলস ভাবে।
‘যাচ্ছো কোথায় ?’ কড়া গলায় বলল রুইতন।
‘একটু মৌজ মস্তি করে আসি। বোরিং লাগছে।’ নোংরা দাঁত বের করে হেসে ফেলল পোকা।
***************************************
সাবিহা বাচ্চা পছন্দ করে না। একদমই না ।
বসে বসে দেখছিল মেঘা কীভাবে পিচ্চির ন্যাপি বদলে দিচ্ছে। বমি আসছে ওর ।মেঘাকে পছন্দ করে। মেয়েটা সুন্দরী। কিন্তু টোপলা তুলতুলে ক্ষুদে বাচ্চাটা একদম না পছন্দ।
পিচ্চিকে দোলনায় রেখে মেঘা বলল , ‘বাবু এখন ঘুমিয়ে থাকবে। রান্না করা দরকার। তুমি কি আমাকে একটু হেল্প করবে?’
সাবিহার বিশ্বাস হচ্ছিল না নিজের দুই কানকে।
‘আমাকে কাজ করতে বলছেন আপনি?’ চেঁচিয়ে উঠল। ‘ আমি কাজের বুয়া নাকি? কাল আব্বু টাকা দিলেই আমি চলে যাব এখান থেকে।’
‘নিশ্চয়ই।’ তিক্ত গলায় বলল মেঘা। ‘তা খাওয়া তো গিলবে নাকি ? না কি উপোস থাকবে ?’
‘নিশ্চয়ই খাব। আমি ঝাল বেশি খেতে পারিনা। খেয়াল রাখবেন।’
তখনই বেডরুমের দরজা খুলে বাইরে গেল।
বাইরে ঘামে ভেজা চকচকে মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পোকা। মেঘা- সাবিহা দুজনেই চমকে উঠল।
‘চলো জানেমান।’ নোংরা হাসি হাসল পোকা। ‘তুমি আর আমি একটু ফুর্তি করি পাশের রুমে গিয়ে।’
তড়াৎ করে উঠে দাঁড়াল মেঘা।
‘বেড়িয়ে যাও এখান থেকে।’তর্জনী তুলে পোকাকে শাঁসাল।
‘সরে যান বউদিমণি।’ খিক খিক করে হাসল পোকা। ‘ না হলে আপনাকে দিয়ে শুরু করব।’
গায়ের জোরে মেঘাকে ধাক্কা দিলে পোকা। উড়ে গিয়ে কামরার শেষ প্রান্তে পড়ল মেঘা। ঝটকা মেরে সাবিহাকে কাঁধের ওপর তুলে নিল পোকা, যেন কোলবালিশ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সাবিহা চেঁচিয়ে দুই পা ছুঁড়ছে।
পাশের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল পোকা।
বারান্দায় বসে সবই শুনল রুইতন। ভাইকে ভাল করেই চেনে। এই মুহূর্তে পোকাকে বাধা দিতে গেলে ওকে খুনও করে ফেলতে পারে পোকা।
***********************************************
ফোন বুথের সামনে দাঁড়িয়ে ঘামছে মানিক । দোকানদার যাতে সন্দেহ না করে, একটা কোকের বোতল কিনে সহজ ভঙ্গিতে চুমুক দিতে দিতে বুথের ভিতর ঢুকে ফোন করলো।
রিসিপশনে মেয়েটা ওকে অপেক্ষা করতে বলল।
খানিকপর অন্য একটা মেয়ের গলা শোনা গেল, ‘ মানিক দাদা আমি নার্স মল্লিকা বলছি । খুব খারাপ লাগছে খবরটা দিতে। আপনার মা গত রাতে স্বর্গ লাভ করেছেন। কোনও রকম যন্ত্রণা পায়নি বেচারি।’
কথাটা ঠিক মতো বুঝতে পারল না মানিক ।
আসলে ওর অবচেতন মন বুঝতে চাইছে না ।
‘কী বললেন আপনি ?’ ফোনের রিসিভার কানের সাথে জোড়ে চেপে ধরে বলল মানিক । ‘মানে আমার মা মারা গেছে ?’
‘হ্যাঁ, গত রাতে। আমরা খুব দুঃখিত...।’
রিসিভার নামিয়ে ধীরে ধীরে গাড়িতে গিয়ে বসল মানিক ।
প্রথমেই মনে হল, এখন আর টাকা দিয়ে কী হবে ? সে একা। মা নেই। মারা গেছে। মায়ের জন্যই তো টাকা কামাতে চেয়েছিল। ওর একার পেট চালাতে কত টাকা আর লাগবে ? এখনও সময় আছে, সে সব ছেড়ে চলে যেতে পারে। বেঁচে যাবে এই মহা ঝামেলা থেকে। কিন্তু ওস্তাদের কী হবে? উস্তাদ ওর ভরসায় এই কাজে নেমেছিল।
জেলের দিনগুলোর কথা ও মনে পড়ল। তবে এখন চলে গেলে আবার সেই ভাতের হোটেলে দৈনিক বারো ঘন্টা করে কাজ করতে হবে। মালিকের চামারের মত ব্যবহার। আবার সেই জীবনে ফিরে যেতে চায় না। টাকাটা পেলে একটা হোটেল নিজেই দিতে পারবে। কোনও মেয়ে ও জুটে যেতে পারে বউ হওয়ার জন্য। চুমকি মেয়েটা পছন্দ করত ওকে। হয়তো এখনও বিয়ে হয়নি চুমকির।
সবচেয়ে বড় কথা, ওস্তাদকে বিপদে ফেলে মানিক ভাগতে পারবে না। কখনোই না।
নির্জনবাসের দিকে গাড়ি হাঁকাল মটকু মানিক ।
তেরো
বাদামি রঙের বড় ক্যানভাসের ব্যাগভর্তি টাকা।
টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছে শিশির।
‘এখনও মনে পড়ছে না লোকটা কে কোথায় দেখেছ ?’ চিন্তিত সুরে জানতে চাইলেন তৈমুর খন্দকার।
‘না, স্যার।’ লজ্জিত গলায় বলল আমজাদ। ‘কিন্তু আমি নিশ্চিত খবরের কাগজে দেখেছি লোকটাকে। হয়তো সাংবাদিক বা কলাম টলাম লেখে। এমন কিছু।’
‘চিন্তা করতে থাকো।’ তাগাদা দিলেন খন্দকার। ‘ শোন, হারামজাদারা যদি মনে করে আমি টাকা দিয়ে বসে বসে বাদাম ভাজা খাব তো সেটা মারাত্মক ভুল হবে। পুলিশকে জানাব না ঠিক আছে। কিন্তু ক্রাইম ব্রাঞ্জে এক বন্ধু আছে আমার। নাম, গাউস চৌধুরী। উনার সাথে যোগাযোগ করো । ফোন করবে না । হয়তো তোমার নাম্বারটাও ট্যাপ করে সব শুনছে ওরা। নিজের গাড়ি নিয়ে একা চলে যাও।’
দেড় ঘণ্টা পরের কথা।
খন্দকার সাহেবের স্টাডি রুমে গম্ভীর মুখে বসে আছেন গাউস চৌধুরী। আর আবদুল হাই। রেকর্ড করা ভয়েস মেসেজটা বাজিয়ে শুনলেন , পর পর কয়েক বার। এর মধ্যে খন্দকারের মুখ থেকে বার তিনেক ঘটনাটা শুনে ফেলেছেন।
‘তাহলে এই ব্যাপার ?’ মন্তব্য করলেন গাউস চৌধুরী। ‘ টাকা যে কালেক্ট করতে এসেছিল , তাঁর চেহারার বর্ণনা করুন।’
আমজাদ বলল।
‘সিসি ক্যামেরায় যে ছবি এসেছে লোকটার সেটা স্পট না।’ খানিক রেগে বললেন গাউস চৌধুরী। ‘মাথায় ক্যাপ পরে এসেছে । তারমানে চালু পয়সা।’
‘আব্দুল হাই , আপনি সব কটা বিখ্যাত পত্রিকা অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখুন তো এই রকম চেহারার কোনও সাংবাদিক বা অন্য কোনও কর্মচারী আছে কিনা।’ হুকুম দিলেন গাউস চৌধুরী । ‘ তার আগে সিসি ক্যামেরার ছবি আর আমজাদের বর্ণনা শুনে স্কেচ আঁকিয়ে নিন আমাদের আর্টিস্টের কাছ থেকে। সূত্র একটা ঠিকই পাব।’
‘স্যার আমরা ওই লোকের গাড়ির নম্বর টুকে রেখেছি।’
এতক্ষণে তথ্য দিল আমজাদ।
নাম্বার দেখেই হাসলেন গাউস চৌধুরী। ‘ ওটা ভুয়ো নম্বরপ্লেট। চালু গ্যাং । তা আপনার কি মনে হচ্ছে যে আসল নম্বর প্লেটের গাড়ি নিয়ে আপনার বাড়ির সামনে গাড়ি পার্ক করবে? অ্যাঁ ? আর কোনো তথ্য ?’
‘যে লোকটা টাকা নিয়ে গেছে ওর চেহারায় মারের দাগ ছিল। কথা প্রসঙ্গে বলেছিল, হাতে সাইকেলের চেন প্যাঁচানো এক গুন্ডা নাকি ওঁকে মারধর করেছে। এটা কোন তথ্য হতে পারে?’ বললেন খন্দকার।
‘এমন কাউকে চেনেন নাকি?’ আব্দুল হাইয়ের দিকে ফিরে প্রশ্ন করলেন গাউস চৌধুরী।
‘এটা খুব পুরনো স্টাইলের।’ মুখ গোমরা করে বলল আবদুল হাই। তার পরেও প্রায় একশোর বেশি হারামজাদাকে চিনি। বেশ কিছু চ্যাংড়া মাস্তান সাইকেলের চেন দিয়ে মারামারি করে তৃপ্তি পায়। পিস্তলে ঝামেলা থাকে। সবসময় যোগাড় করা ও যায় না। সাইকেলের চেইন বহন করলেও আইনত সেটা অস্ত্র না। তাই আর কী ।’
‘টাকার পরিমাণ অনেক বেশি ।’ চিন্তিত সুরে বললেন গাউস চৌধুরী। ‘রেকর্ডের যে গলা শুনতে পেলাম সেটা বেশ বয়স্ক বুড়ো মানুষের গলা । বাচনভঙ্গি পুরনো দিনের অপরাধীদের মতো। অনেকটা পুরানো দিনের ডন ইমদাদুল , হাজি সুফিয়ান, আঙুল কাটা আজাদ , বগা নজরুল , আকবর শেঠ, টোকাই মিজান এদের মত। একদম পেশাদার। একদম নতুন কোনও টিম বলে মনে হচ্ছে না। আর আমার কেন যেন বারবার কেশু হাওলাদার কথা মনে পড়ছে। অবসর নেওয়ার আগে শয়তানটা বড় কোনও খেলা খেলতে চাইতে পারে৷ যাতে বাকি জীবনটা আরাম আয়েশে কাটাতে পারে। কাকতালীয় হলেও সত্য আমরা কিন্তু মানিক আর কেশুকে একসাথে দেখেছি। আবার এই দুই নিস্পাপ ভদ্রলোক একই সাথে গায়েব হয়ে গেছে। কোনও খোঁজ- খবর নেই। বড্ড বেশী কাকতালীয়। ওদের ব্যাপারে ও খোঁজ নাও।’
পিচ্চির ট্যাঁ ট্যাঁ কান্নার শব্দে জ্ঞান ফিরে পেল মেঘা। প্রথম কয়েক মিনিট বুঝতে পারল না কী হয়েছিল আসলে। সব মনে পড়তেই দৌড়ে বারান্দায় গেল। রুইতন বসে বসে পুরনো সিনে ম্যাগাজিন পড়ছে।
‘সর্বনাশ হয়ে গেছে।’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল মেঘা। ‘তোমার ভাইকে থামাও।’
‘আমার অত ঠ্যাকা নেই ।’ নিলিপ্ত ভাবে বলল রুইতন । মন দিল ম্যাগাজিনে।
অনেক অনুনয় করে বুঝল , লাভ হবে না । দৌড়ে চলে গেল পাশের কামরাতে। যেখানে পোকা সাবিহাকে নিয়ে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। গায়ের জোরে দরজায় আঘাত করতে লাগল সে। চিৎকার করে বলছ, ‘সাবিহা তুমি ঠিক আছো ?’
ভিতরে নীরবতা।
ভয় পেয়ে গেল মেঘা। পোকা হারামজাদা মেয়েটাকে খুন করে ফেলে নি তো ?
বেশ খানিক নীরবতা। ভেতর থেকে অস্বাভাবিক শান্ত গলায় সাবিহা বলল, ‘সব ঠিক আছে। আপনি চলে যান।’
প্রথমে মনে হল ভুল শুনেছি মেঘা।
পর মুহূর্তে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে স্তম্ভিত হয়ে গেল।
পরপর কয়েকটা ফোন পেলেন গাউস চৌধুরী।
যে পুলিশ অফিসার সাবিহার পিছন নিয়েছিল সে রুইতনের চেহারার বর্ণনা দিল৷ এবং জানালো পরে দেখে চিনতে পারবে। আর আমজাদ খান ফোন দিয়ে বললো, পুরনো খবরের কাগজে আর ইন্টারনেটে ছবি সে শিশিরকে চিনতে পেরেছে। ব্যাটা একজন লেখক।
‘ঠিক আছে, ওর প্রকাশকদের কাছে খোঁজ নিয়ে বাড়ির ঠিকানা বের করো।’ হুকুম দিলেন গাউস চৌধুরী। ‘আর খন্দকারের বাড়ির আশপাশে দশ মাইলের মধ্যে যত হোটেল আছে, চোখ রাখো। মাছ ধরা পড়তে পারে।’
‘এক কাপ কফি দেবেন ?’ রান্না ঘরে ঢুকে বলল সাবিহা।
চমকে ফিরে তাকাল মেঘা। ‘তুমি ঠিক আছো?’
লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসল সাবিহা।
অদ্ভুত নরম স্বরে বলল, ‘ভাবী আসলে দুই কাপ কফি দিন। আমার জন্য আর পোকার জন্য। পোকা গোসল করছে। ঠিক করছি আমরা বিয়ে করব।’
‘তোমার মাথা ঠিক আছে ?’ বোকা বোকা ভাবে বললে মেঘা। কিছুই মাথায় ঢুকছে না ওর।
‘আর কী সব আবোল তাবোল বলছ তুমি ?’ পরিস্থিতি ভুলে চেঁচিয়ে উঠল মেঘা। ‘লোকটা একটা পশু। আমাকে মারধর করেছে। তোমাকে অপমান করছে। আর তুমি কি না...।’
‘না ভাবি।’ স্বপ্নিল ভাবে বলল সাবিহা। ‘পোকা আমার স্বপ্নের পুরুষ । সারাজীবন চেয়েছি অমন দুর্দান্ত মারকুটে একটা লোককে বিয়ে করব । পোকা আমার বোরিং জীবনে রাজপুত্রের মতো এসে হাজির হয়েছে। ধূমকেতুর মতো...।’
‘ব্যাপার বউদি মণি ?’ বাথরুমের দরজা খুলে বের হয়ে এল পোকা । কোমরে তোয়ালে জড়ানো। খালি গা। ‘কেন আমার প্রেমিকার মনে বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছেন ? নাকি চান আপনার মাথা টয়লেটের কমোডে ঠেসে ধরি ? বাবুটাকেও করতে পারি...।’
আতঙ্কে কামরার বাইরে দৌড়ে চলে গেল মেঘা।
ও ঈশ্বর কী হচ্ছে এ সব?
শিশির কোথায় তুমি ?
চৌদ্দ
বাইরে বসে ছিল রুইতন।
ধপাস করে পাশে গিয়ে বসলো পোকা। আঙুল দিয়ে মাথার ভেজা চুল ঠিক করছে।
‘বোন জব্বর একটা খবর দিতে পারি তোকে।’ ষড়যন্ত্র করছে মুখে ভাব ভঙ্গি অমন করে নিচু গলায় বলল পোকা। ‘আমাদের জিম্মি সাবিহা বেগম আমার প্রেমে পড়েছে। আর আমরা দু জন বিয়ে করতে যাচ্ছি।’
‘কী বললি তুই ?’ দম আটকে গেল রুইতনের। ‘কিছুই বুঝতে পারছি না তোর কথা।’
‘আরে রিলাক্স ।’ ফুর্তিবাজের মতো ভাব করে বলল পোকা । ‘ আমার লটারি লেগে গেছে রে। একদম সিনেমার মত। জানিস মেয়েটা কে ? খানিক আগে ওঁর মুখেই শুনলাম। তৈমুর আলম খন্দকারের একমাত্র মেয়ে। বাংলাদেশের সেরা ধনীদের একজন ওর বাবা । তাই তো বলি কেশু হারামজাদা আর মেয়ে পেল না কিডন্যাপ করার জন্য। যাক বাকি জীবন ঘরজামাই হয়ে থাকতে পারব । নো চিন্তা। একদম পুরানো দিনের হিন্দি সিনেমার মত কপাল আমার।’
‘আরে গাধা তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি?’ চেঁচিয়ে উঠল রুইতন। ‘
কোটিপতি খন্দকার তোর মতো দুই পয়সার এক গুণ্ডার কাছে নিজের মেয়ের বিয়ে দেবে ? আরে ছাগল মেয়েটা তোর সাথে প্রেমের অভিনয় করছে । বাপের সামনে দাঁড়িয়ে পলটি দিয়ে ফেলবে। তখন বোঝা যাবে ওর আসল চেহারা।’
সাপের মতো লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল পোকা। দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে কষে লাথি মারল বোনের পাঁজরে।
‘আর একটা কথা বললে মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলব তোকে।’ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল পোকা । ‘কেশু আমাদের দিয়ে কত দিতে চেয়েছে রে ? মাত্র দশ লাখ করে। আরে চায়ের পাতা আর চিনি কেনার পয়সাও না। এক্ষুনি আমি আর সাবিহা বের হয়ে যাচ্ছি। মানিক মটকু শূয়রের বাচ্চাটা ফেরার আগেই। খন্দকার সাহেবের হাতে মেয়েকে তুলে দিলেই ভদ্রলোক কৃতজ্ঞতা নরম হয়ে যাবে। পুলিশের ঝামেলা যাবে না। আর আমি পাচ্ছি রাজকন্যা সহ অর্ধেক রাজত্ব। হে হে।’
‘আমার কী হবে ?’ অসহায় ভাবে বলল রুইতন।
‘তুই চলে যাবি তোর মতো।’ দরাজ একটা ভঙ্গি করে বলল পোকা। ‘তোকে হাত খরচের পয়সা দেবো মাসে মাসে।’
‘কিন্তু সেই ছোটবেলা থেকে না আমরা একসাথে বড় হয়েছি।’ করুণ সুরে বলল রুইতন। ‘ভাল মন্দ সুখ দুখ সব একসাথে শেয়ার করেছি আমরা ৷ অথচ আজ এত বড় সিদ্ধান্ত নিলি আমাকে কিছু না বলেই।’
‘আহা, নাটক করিস না তো?’ পোকা বিরক্ত ।
‘আমরা কখন যাচ্ছি পোকা ?’ ভেতর থেকে বের হল সাবিহা। দেখেই বোঝা যায় চলে যাওয়ার জন্য তৈরি সে। ব্যাগটা পর্যন্ত হাতে।
কেউ কিছু বলার আগেই পিছন থেকে মেঘার নীরস কণ্ঠ শোনা গেল -’মানিক দাদা ফিরে আসছেন।’
মুখ শক্ত হয়ে গেল পোকার। এইবার বড্ড ঝামেলা হবে। সমস্যা নেই। মোটা বাঁটুল ভূতটাকে সামাল দিতে পারবে সে।
কোমরে হাত দিয়েই চমকে উঠল।
শিশিরের পিস্তলটা থাকার কথা।
নেই।
**************************************
‘কী ব্যাপার?’ মুখ তুলে বললেন গাউস চৌধুরী।
‘স্যার, লেখক ভদ্রলোকের নাম ঠিকানা পেয়েছি। শিশির রায় উনার নাম। উনার সব প্রকাশকের সাথে দেখা করেছি। ঠিকানা চাইতেই সবাই না করল। বলল উনি নাকি প্রাইভেসি পছন্দ করে । শেষে বাধ্য হয়ে এক প্রকাশককে হাল্কা রোলারের গুতা দিয়ে খবর পেয়েছি। উনি এখন নবীগঞ্জে ছুটি কাটাচ্ছে। বাড়ির নাম নির্জনবাস ।’
হব হব করে বলল আব্দুল হাই।
‘আর ?’
‘আর স্যার। হোটেলে ভুয়া নাম নিয়ে কেশু উঠেছে। আমাদের একজন ইনফরমার দারোয়ান হিসাবে কাজ করে ওখানে। দুজন লোক লাগিয়ে রেখেছি পুরানো ফসিলটার উপর নজর রাখার জন্য।’
‘দারুন কাজ ।’ খুশি না হয়ে পারলেন না গাউস চৌধুরী । ‘ তো আরেকটা
কাজ করুন। নবীগঞ্জ চেনেন তো ? চলে যান সেখানে। ছদ্মবেশ নিয়ে যাবেন । গিয়ে দরজায় ঘণ্টা বাজিয়ে জিজ্ঞেস করবেন, এই বাড়িটা তিন মাসের জন্য ভাড়া নিতে চান- এমন কথা হয়েছে৷ বাড়িওয়ালার সাথে। তাই দেখা করতে এসেছেন বাড়ি খালি কিনা। তবে সাবধান , ওরা যেন টের না পায় , আপনি গোয়েন্দাগিরি করছে। এই সুযোগের পুরো বাড়িটা জরিপ চালাবেন। পালানোর পথ কোন দিকে বা কোন দিক দিয়ে কৌশলে বাড়ির ভিতরে ঢোকা যায় । ঐসব। সাবধানে কিন্তু।’
‘সাথে দুই তিন জন লোক নিয়ে যাব স্যার ?’
‘কেন? আপনি কি নবীগঞ্জে পিকনিক করতে যাচ্ছেন না কি?’
পনেরো
সারাটা পথ গাড়ি চালাতে চালাতে হাউমাউ করে কাঁদছিল মানিক ।
নিজেকে পথের ফকির মনে হচ্ছে। তবে সেই সাথে অদ্ভুত রকমের বিচ্ছিন্ন একটা অনুভূতি হচ্ছে। সেটা হল, মায়ের জন্য সারাক্ষণই চিন্তা করতে হবে না ওকে। পিছু টান বলতে আর কিছু রইল না এই জীবনে।
আটচল্লিশ বছর বয়স চলছে। বিয়ে করতে পারেনি৷ যত মেয়ে ওর জীবনে এসেছে কাউকেই ওর মা পছন্দ করত না। সারা জীবন মা আর ওস্তাদ কেশু ওর জীবন নিয়ন্ত্রণ করেছে।
এখন টাকা নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে। দূরে কোথাও গিয়ে। নামধাম পালটে। একদম নতুন জীবন।
গাড়িটা যখন নির্জনবাস বাড়ির সামনে থামল মানিক অবচেতন ওকে সতর্ক করে দিল।
হাজার হোক, অপরাধ নামের প্রাচীন দিঘির জলের পুরনো মাছ সে। ওর মন বলছে, মস্ত কোন ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। সবাই বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে কেন? জিম্মির হাতে ব্যাগ কেন ?
সামার কোটের বগলের কাছে রাখা পয়েন্ট থার্টি এইট পিস্তলটায় হাত বুলিয়ে নিল মানিক । পুরানো দিনের মত।
‘সব ঠিক আছে ?’ গাড়ি থেকে নামতে নামতে প্রশ্ন করল মানিক ।
কেউ জবাব দিল না।
‘আপনি চলে এসেছেন মানিক দা ?’ দেঁতো হাসি হাসল পোকা । ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসছে আন্তরিক ভঙ্গিতে ।
‘আমি চলে যাওয়ার পর সব ঠিকঠাক ছিল এখানে ?’ জানতে চাইল মানিক ।
অবাক হয়ে খেয়াল করল পোকা ওর একটা হাত পিছনে লুকিয়ে রেখেছে। আর রুইতন ধীরে ধীরে মানিক পিছন দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
একটা লোক যদি খ্যাতি অর্জন করে তবে তার পিছনে যথেষ্ট কারণ থাকে৷
মানিক বাতাস খেয়ে এমনিতেই নাম করেনি আন্ডারওয়ার্ল্ডে। পুলিশের কাছে আজও মানিক একটা সুপার হিরো। ওস্তাদ আর মায়ের কাছে মানিক বোকা।
কিন্তু যখন কাজে নামে তখন চিতাবাঘের মতো ।ওর সময়ে উঠতি গুন্ডাদের শক্ত হাতে দমন করত মানিক ৷ সারা শহরে গ্যাংস্টারদের নাকে দড়ি দিয়ে পোষ মানাত মানিক ।
আজও পুরনো অপরাধীরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে গেলে ফিসফিস করে স্বীকার করে, পিস্তলে মানিক হাত কত ভাল ছিল ! সেই সময় বড় বড় পুলিশ অফিসাররা মানিক পিছনে লাগার আগে চাকরিতে রিজাইন দেওয়ার কথা ভাবত ।
পোকা আর রুইতনের হাজার জন্মের ভাগ্য- মানিক সাথে আগে দেখা হয়নি। যৌবনের মানিক সাথে টক্কর লাগেনি ওঁদের।
উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে দেখল মানিক ওর ডান হাতটা উঁচু করে ধরে রেখেছে। ওখানে চকচক করছে পিস্তলটা। এমন একটা পজিশনে দাঁড়িয়েছে, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সবাইকে কাভার দিতে পারছে। আর পিস্তলটা যেন ভোজবাজির মত ওর হাতে চলে এসেছে। এরকম আগে কেউ কখনও দেখেনি৷ পুরনো দিনের ওয়াইল্ড ওয়েস্টের পিস্তলবাজেরাও লজ্জা পাবে।
‘আরে মানিক দা এসব কি ?’ ফ্যাকাসে হেসে বলল পোকা ।
‘ সাইকেলের চেইনটা প্রথমে ফেলে দাও। ঠিক তোমার পায়ের সামনে । কোন রকম চালাকি করবে না। মাত্র যেমনটা দেখে তুমি বোধাই হয়ে গেলে এমন হাজারটা জাদু আমি জানি।’ হিস হিস করে বলল মানিক । ‘বিশ্বাস করো, তুমি মরে গেলে কান্না করার মতো লোক দুনিয়াতে নেই। আর কারো কাছে সাফাই দিতে হবে না আমি কেন তোমাকে মেরেছি।’
এ এক অন্য মানিক ।
চেহারা থেকে বোকা বোকা ভাবটা দূর হয়ে গেছে । দু চোখ জ্বলছে কয়লার মতো।
সাইকেলের চেইন ফেলে দিল পোকা। বেহায়ার মত হেসে বলল, ‘আরে বড় ভাই আমি শুধু একটু মজা করছিলাম। আপনি এত সিরিয়াস হয়ে যাবে কে জানত ?’
‘পিছাও। নইলে গুলি করব।’ হুকুম দিল মানিক ।
গজগজ করতে করতে পোকা পিছিয়ে গেল। ওদের সবার উপর চোখ রেখে নিচু হয়ে সাইকেলের চেইনটা তুলে নিল মানিক ।
এই বার সাবিহার দিকে চেয়ে বলল, ‘এই মেয়ে, আসলে কি হয়েছে বল তো আমাকে?’
কয়েকটা মুহূর্ত অস্বস্তিকর নিরবতা জমে রইল।
তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় সাবিহা বলল, ‘দাদা আপনি পোকাকে মারবেন না দয়া করে। আমরা একে অপরের পছন্দ করি। বিয়ে করতে চাই। এখান থেকে এখনই চলে যাব। আপনি হেল্প করুন আমাদের। আব্বু আপনাকে অনেক টাকা দেবে।’
মানিক মনে হল সস্তা ধরনের ঢাকাই সিনেমা দেখছি ও। দেলোয়ার জাহান ঝন্টু বা শামসুদ্দিন টগর পরিচালিত সপরিবারে দেখার মত পুরোনো দিনের সাদাকালো ধামাকা ছবি।
‘মানিক দা আশা করি আপনি খামখা কোন রকম পেজগি খেলবেন না ।’ বিজয়ীর ভঙ্গিতে বলল পোকা। মুখে প্রাণবন্ত হাসি। ‘কেশু হারামজাদা আমাদের বা আপনাকে কত দিত ? চলে আসুন আমাদের দলে। পুলিশের ঝামেলা থেকে বেঁচে যাবেন। সাবিহা আপনাকে প্রোটেকশন দেবে। আমি কথা দিচ্ছি।’
মানিক মনে হচ্ছে এখন ও সে সস্তা চিত্রনাট্যের কোন নাটক বা সিনেমা দেখছে।
এই পোকা গ্রুপকে সে নিজে হায়ার করেছিল। আর এখন এই বাড়িতেই তিন জন চলে গেছে ওর বিপক্ষে।
মেঘা ?
বেচারি কারও পক্ষে না। দু পক্ষই ওর কাছে শত্রু ।
ওস্তাদ আর শিশির ফিরে আসার আগ পর্যন্ত কীভাবে সামাল দেবে এই তিন তিনটা বজ্জাতকে ?
এমন সময়, বিকেলের কমলা রঙের আলোতে সবাই দেখতে পেল। দূর থেকে ধুলার মেঘ উড়িয়ে একটা গাড়ি আসছে। অচেনা গাড়ি।
**************************************
আব্দুল হাই বুঝতে পারলেন, খানিকটা নার্ভাস লাগছে ।
বাইরে গরম। সূর্য ডুবে যাচ্ছে, তারপরও তন্দুরের মত গরম বাতাস।
নির্জনবাস বাড়ির পরিবেশটাই কেমন থমথমে। সদর দরজার কাঁচা লোহার বড় গেইট ঠেলা দিয়ে ভিতরে ঢুকলেন। অস্ত্র ছাড়া ভেতরে ঢোকা বোধহয় ঠিক হয়নি। আবিষ্কার করলেন , প্রয়োজনের তুলনায় বড্ড বেশি ঘামছেন তিনি ।
বস গাউস চৌধুরী ঠিকই বলেছেন, ভিতরে আছে ক্রিমিনালরা। সংখ্যা অনেক হবে। প্রত্যেকটা কামরার জানলা বন্ধ। পর্দা টেনে দেওয়া । একটা লাইট ও অন করেনি ।
সন্দেহ নেই ভেতরে যারা আছে আড়াল থেকে ওকে দেখছে৷ এবং সামান্য বেচাল দেখলেই খুন করে ফেলবে আবদুল হাইকে। পুরনো অভিজ্ঞতা থেকে জানেন কিডন্যাপারারা কোণঠাসা হয়ে গেলে মরিয়া হয়ে যায়।
স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটার চেষ্টা করছেন আবদুল হাই। হতাশ হয়ে আবিষ্কার করলেন, রাতের বেলাও চুপিচুপি বাড়ির ভেতর ঢোকা যাবে না । ছাদের উপর চুপচাপ কেউ বসে থাকলে আধা মাইল পর্যন্ত নজর রাখতে পারবে। আশেপাশে বহু দূর পর্যন্ত বড় কোনো গাছপালা নেই৷ চারিদিকটা একদম থালার মতো সমতল।
দরজায় নক করার সময় লজ্জিত হয়ে আব্দুল হাই আবিষ্কার করলেন হৃদপিণ্ডের গতি বেড়ে গেছে তাঁর।
কে দরজা খুলবে ? খুলেই কি কেউ গুলি করবে?
লম্বাটে মুখের এক মেয়ে দরজা খুলে দিল । চোখ দুটি ভারি সুন্দর ওর।
‘ইয়ে ...আমি দিদারুল হক সরকার।’ বিনয়ের সাথে বললেন আবদুল হাই। ‘আসলে এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। হাকিম ভাইয়ের সাথে একটু দেখা করার দরকার ছিল ৷ উনার গিন্নি থাকলেও চলবে । আপনাকে ঠিক চিনলাম না তো ।’
‘আমি এখানে কাজ করি।’ ঠান্ডা গলায় বলল রুইতন। ‘ উনারা কেউ বাড়ি নেই। তিন চার দিন পর ফিরবে।’
‘এক গ্লাস পানি দিতেন যদি। যা গরম পড়েছে।’ গলায় হাত বুলিয়ে তৃষ্ণার্ত মানুষের ভূমিকায় অভিনয় করতে চাইলেন আবদুল হাই।
‘পানি নেই গতকাল থেকে।’ আগের চেয়ে কঠিন গলায় বলল রুইতন ।
‘কী আর করা ।’ হতাশ গলায় বললেন আবদুল হাই। ‘হাকিম ভাই আমার কাছ থেকে একহাজার টাকা পেতেন। এই নিন, টাকাটা উনাকে দেবেন। আর আপনি কাগজে সাইন করে দেন যে টাকা বুঝে পেয়েছেন ।’
পকেট থেকে পাঁচশ টাকার দুটি নোট বের করে রুইতনের হাতে দিলেন আবদুল হাই। কলম আর একটা নোট বই ও এগিয়ে দিল।
সাইন করে ফেরত দিতেই রুমালে জড়িয়ে কলমটা নিয়ে নিলেন আবদুল হাই। যত্ন করে বুক পকেটে রেখে তেলতেলে হাসি দিয়ে বললেন, ‘যাই তাহলে। আর হাকিম ভাইকে সালাম দেবেন।’
ফিরে হাঁটতে লাগলেন আব্দুল হাই। প্রতি মুহূর্তে আশা করছে একটা বুলেট এসে গুঁড়িয়ে দেবে মেরুদণ্ড অথবা মাথা । দরদর করে ঘামছেন।
সরল সহজ পথে হাঁটতে লাগলেন। দুই চোখ ব্যস্তভাবে জরিপ করছে চারিদিকটা। গাড়িতে বসা মাত্রই যেন ধরে প্রাণ পেয়ে প্রাণ ফিরে পেলেন।
বাপরে। কপাল ভাল গাড়িতে এসে বসতে পেরেছেন। যে মেয়েটা দরজা খুলেছে তার সাথে ট্র্যাফিক পুলিশ দেওয়া বর্ণনা হুবহু মিলে গেছে । বাড়িতে থাকে শুধু শিশির তার বউ মেঘা । আর মেয়েটা বলল নাকি হাকিমের চাকরানী।
ফোন করতে গিয়ে বুঝতে পারলেন নেটওয়ার্ক নেই এখানে। কারণ ? বোধ হয় সিগন্যাল জ্যামার বসিয়েছে ওরা।
খানিক দূর পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে গিয়ে যখন সিগন্যালে পেলেন তখন ফোন করলেন বসের কাছে । বর্ণনা করলেন, সদ্য লাভ করা অভিজ্ঞতার কথা । বাড়িটার নিখুঁত বর্ণনা দিলেন।
‘চমৎকার কাজ ।’ নির্জলা প্রশংসা করলেন গাউস চৌধুরী। ‘ বাড়ির ভেতরেই আছে সবাই। আপনি ওখানেই থাকুন। ঢাকা থেকে আরও দুজন অফিসার পাঠাচ্ছি। সাথে অস্ত্র আর দূরবিন সহ। দূর থেকে ওদের উপরে নজর রাখবেন। আগামী চব্বিশ ঘন্টা পালা করে নজর রাখবেন বাড়িটার উপর । আমি জানতে চাই, ভিতরে কে বা কয়জন আছে। আর কী কী করতে হবে বলার দরকার নেই নিশ্চয়ই ? পরিস্থিতি বুঝে যা খুশি করবেন আপনি। সেই ক্ষমতা দিলাম। ঠিক আছে ? শুধু শত্রুপক্ষ যেন টের না পায়, ওদের উপর নজর রাখা হচ্ছে। ক্লিয়ার ?’
পুরো সময়টা সবাই বেডরুমে ঘাপটি মেরে বসে দরদর করে ঘামছিল।
কারণ মানিক সব জানলা বন্ধ করে রেখেছে। পর্দাও ফেলে রেখেছিল।
এমন ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল যাতে একই সাথে বাড়ির ভেতরের সবাইকে চোখে রাখতে পারে আবার জানালা দিয়ে অচেনা অতিথির উপরেও নজর রাখতে পারে।
আব্দুল হাই চলে যেতেই মানিক বলল, ‘এবার সব জানলা খুলে দাও। আর আমার কথা শোনো সবাই। বিশেষ করে নতুন লাভার পোলাপান। ওস্তাদ এবং শিশির বাবু মুক্তিপণের টাকা নিয়ে ফিরে আসা পর্যন্ত কাউকে বাড়ি ছেড়ে বের হতে দেব না আমি। তারপর তোমরা গিয়ে বিয়ে করো বা লিভিং টুগেদার করো যার যেমন মর্জি । সারা জীবন তোমাদের মতো পুঙটা বাচ্চা কাঁচা সামাল দিয়েছি আমি। বিশ্বাস না করলে চালাকি করে দেখো। সোজা গুলি চালিয়ে দেব।’
পোকা চোখ দিয়ে যেন গিলে ফেলছিল মানিক ।
কিন্তু সাহসে কুলাচ্ছিল না কিছু করার জন্য। খানিক আগেই মানিক হাতের জাদু দেখেছে। ভেলকি একেই বলে।
‘আপনি একটা আস্ত জাম্ব সাইজের বেকুব মানিক দা।’ টিটকারি দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল পোকা। সেই সাথে গা জ্বালানো একটা হাসি দিয়েই যাচ্ছে অকাতরে। ‘এই মুহূর্তে ঘটনা থেকে বের হয়ে গেলে আমরা সবাই বেঁচে যাব। মুক্তিপণ নিলেই আইনের চোখে ফেঁসে যাব সবাই ।’
‘কেউ ফাঁসবে না।’ শান্ত গলায় বলল মানিক । ‘সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন এই মুহূর্ত থেকে তুমি আর রুইতন চাকরদের কোয়ার্টারে গিয়ে থাকবে। বাড়ির পনের গজের মধ্যে তোমাদের পোকা ভাই বোনদের দেখলে আমি গুলি করব। আর সাবিহা তুমি সারাক্ষণ মেঘা দিদির সাথে থাকবে। বাইরে গেলেই... না জানে মারব না। গুলি করে ল্যাংড়া করে দেব।’
‘এখানে ঝামেলা শেষ হোক মানিক দা।’ ঠোঁট বাঁকা করে হাসল পোকা । ‘সময়মতো সব উশুল করে ফেলব। পোকা কারও পাওনা বাকি রাখে না।’
গুলির শব্দে পুরো রুমটা কেঁপে উঠল ।
এক ঝলক আগুন দেখা গেল মানিক পিস্তলের নলে।
চিৎকার করে উঠল সাবিহা।
লাফ দিয়ে পিছন চলে গেল পোকা। হাত দিল কানে । রক্ত গড়িয়ে নামছে। ঘাড় পর্যন্ত ভিজে গেছে গরম রক্তে। রক্তমাখা আঙুলের দিকে বোকার মতো চেয়ে রইল পোকা ।
অটল একটা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে মানিক । পিস্তলের নল দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। বারুদের ঘ্রাণ।
‘পরেরবার কানের লতি না । পুরো মাথা উড়িয়ে দেব পোকা। এবারই করতাম। কিন্তু দেওয়ালটা নতুন করে রং করাতে হবে। রংমিস্ত্রি খরচ অনেক বেশি। সেটা আবার ওস্তাদ হয়তো আমার পকেট থেকে কেটে রাখবে । যাও বের হও বাড়ি থেকে ৷’
শান্ত গলায় বলল মানিক ।
প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল পোকা। ময়লা একটা রুমাল চেপে রেখেছে কানের লতিতে।
ওই দিকে গুলির শব্দে পিচ্চি কান্না শুরু করেছে। মেঘা দৌড়ে গিয়ে বাচ্চা কোলে নিল । জানালা দিয়ে মানিক দেখল, পোকা ভাইবোন হনহন করে হেঁটে চাকরদের কোয়াটারের দিকে যাচ্ছে।
মেঘার দিকে ফিরে তাকাল মানিক ।
নরম গলায় বলল, ‘সাবিহার দিকে খেয়াল রাখবেন দিদি৷ মেয়েটা ভুলে ও যেন বাইরে যেতে না পারে। আরও দুই দিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। মুক্তিপণ হাতে না আসা পর্যন্ত। পোকা আর রুইতন খুবই খারাপ চিজ। আমার কথা শুনলে আপনি আর খোকা নিরাপদে থাকবেন। ভেবে দেখুন আপনি আমার সাইডে থাকবেন না পোকা গ্রুপের সাইডে ?’
এতগুলি জানোয়ারের মধ্যে মানিক আচরণই ভদ্রলোকের মত মনে হয়েছে মেঘার। সেই প্রথম থেকেই।
‘আমি আপনার পাশে আছি মানিক দা।’ মেঘা বলল।
পিস্তলটা সরিয়ে নিয়ে স্বস্তির হাসি হাসল মানিক । পিচ্চি তখনও কাঁদছে।
‘খোকাকে আমার কোলে দিন তো ।’ হাত বাড়াল মানিক । ‘আমি বাচ্চা খুব পছন্দ করি।’
মেঘার মন সায় দিচ্ছে না৷ তারপরও কী মনে করে পিচ্চিকে তুলে দিল মানিক হাতে।
ভয়ঙ্কর অপরাধী মানিক আর দেবশিশুর মত পিচ্চি একে অপরের দিকে চেয়ে রইল খানিকটা সময়। মানিক গাল ফুলিয়ে চোখ গোল্লা গোল্লা করে খানিক বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করল পিচ্চিকে।
পিচ্চি খানিকটা সময় নিয়ে ব্যাপারটা বিবেচনা করল । শেষে দাঁতবিহীন মাড়ির বের করে হাসতে লাগল । সেই সাথে মানিক কোলে প্রসাব করে দিল খানিকটা।
‘তাহলে আপনি, আমি আর খোকা এক দলে। ঠিক আছে ?’পিচ্চিকে মেঘার কোলে ফিরিয়ে দিতে দিতে বলল মানিক । ‘আমি সারা রাত বারান্দায় বসে পাহারা দেবো । সাবিহা আপনার সাথে থাকবে । কোনও ট্যাঁ ফোঁ করলে আমাকে ডাকবেন। থাপ্পড় মেরে দাঁত ফেলে দেব।’
ষোল
বারান্দায় চলে এলো মানিক । বেতের চেয়ারটা টেনে নিয়ে এমন একটা জায়গায় বসল যেখান থেকে চাকরদের কোয়াটারের দিকে নজর রাখতে পারবে - যেখানে পোকা মানিক আছে । আবার বাড়ির ভেতরটায় লক্ষ্য রাখতে পারবে। সেই সাথে বাইরের মূল ফটকের দিকে খেয়াল রাখতে পারবে।
বসে বসে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছে মানিক ।
বরাবর চিন্তা শক্তিতে দুর্বল সে। তারপর ও জীবনে কিছু সময় নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে হয়। কী করবে এখন ?
বাড়ির ল্যান্ড ফোন থেকে কল দেবে ওস্তাদের নাম্বারে ? ফোন করে এখানের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করবে ? কিন্তু ফোন করাটা বিপজ্জনক হয়ে যাবে । সন্দেহ নেই পুলিশ বহু আগে থেকেই ওদের ফোন ট্যাপ করে বসে আছে। আর এখন ফোন করলে লোকেশনও জেনে যাবে। ওর নাম্বার চোরাই, কিন্তু ওস্তাদ নতুন নাম্বার ব্যবহার নেয় নি ।ওস্তাদ বার বার ফোন করতে বারন করে দিয়েছে।
পোকা গ্রুপের উপর চোখ রাখতে হবে। ওরা সাপের মতো। যে কোনও মুহূর্তে ছোবল মারতে পারে। ওকে মেরে ফেললে আর কোনও বাধা থাকবে না । আরও দুটো দিন সতর্কভাবে ওদের উপর নজর রাখা এক কথায় অসম্ভব।
আমি বরং অপেক্ষা করি। দীর্ঘক্ষণ চিন্তাভাবনার পর সিদ্ধান্ত নিল মানিক । ওস্তাদ পাবলিক ফোন দিয়ে এই বাড়ির ল্যান্ডলাইনে ফোন করতে পারে যখন তখন। পুরো পরিস্থিতি তখন বুঝিয়ে বলতে পারব। হয়তো ওস্তাদ নিজেই চলে আসবে । বা অন্য কোনও বিশ্বস্ত লোক পাঠাবে ।
অতীতে যেমন করত।
চাকরদের কোয়াটারের দিকে তাকাল একবার। গোটা জায়গাটা ঘুঁট ঘুঁটে অন্ধকারে ঢাকা । জানলা দরজা সব বন্ধ । ওরা ভাই বোন কোন রকম ফন্দি আঁটছে না তো?
দুঃখীরাম যে টয়লেট ব্যবহার করত, এখন সেটা পোকা ব্যবহার করছে। ঠান্ডা জল ঢালছে নিজের কানের লতিতে। মাঝে মাঝে অভিশাপ দিচ্ছে মানিককে ।
খানিক দূরে রুইতন বসে আছে। রেগে বোম হয়ে আছে পোকার উপর।
‘ওখানে চুপচাপ বসে আছিস কেন ?’ খেঁকিয়ে উঠল পোকা। ‘খুঁজে দেখ ,
কোন মলম টলম পাস কি না।’
জবাব দিল না রুইতন।
জীবন প্রথম বার ভাইয়ের বিপদে পাশে দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না।
সাবিহা। এই কুত্তীটা এসে ওদের দুই ভাই বোনের মধ্যে বিভেদ তৈরি করেছে। পোকা থাকুক সাবিহাকে নিয়ে।
কল্পনা সাগরে ভাসছে পোকা। ওর কোনও ধারণা নেই , সাবিহার মতো মেয়েরা কতটা পল্টিবাজ হতে পারে। এই মুহুর্তে পোকা শুধু নিজের আয়েশি জীবনের কথা ভাবছে । আর কিছু না। অথচ বেকুবটা জানে না আরেকটা সুদর্শন বড়লোকের ছেলে পেলেই পোকাকে লাথি মারবে সাবিহা ।
বিছানার চাদর ছিঁড়ে ফালি করে কানের ক্ষত ব্যান্ডেজ করল পোকা । গজগজ করে তখনও মানিককে অভিশাপ দিচ্ছে। রাজ্যের সব নোংরা ভাষায়।
‘খাওয়ার ব্যবস্থা কী হবে রাতে?’ বোনের দিকে ফিরে বলল পোকা। ‘আর মানিক মালাউনের বাচ্চাটা যখন গুলি করল তুই কিছু করলি না কেন?’
তখনও চুপ করে রুইতন।
পোকা বুঝতে পারল বোন রেগে আছে। তবে এর আগে এমন মুখে কুলুপ এঁটে থাকেনি।
জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল পোকা। মটকু মানিক শালা বসে আছে বারান্দায়। পিস্তল হাতে।
নিজের পিস্তলটা কথা আবার মনে পড়ল।
গেল কোথায় ওটা ? অদ্ভুত তো !
‘আমার পিস্তলটা দেখেছিলি ? নিয়েছিলি তুই ?’ বোনের দিকে ফিরে সরাসরি প্রশ্ন করল পোকা।
‘পিস্তল ? তোর পিস্তল আমি নিতে যাব কেন?’ চোখ বড় বড় করে পাল্টা প্রশ্ন করল রুইতন।
‘আমার মনে হয় তুই নিয়েছিস।’
‘দাঁত ফেলে দিবো আর একবার বললে।’
থতমত খেয়ে চুপ হয়ে গেল পোকা। ভাবতে লাগলো । কে নিল ওর পিস্তলটা?
রাত একটা।
ক্রিসেন্ট হোটেলের রিসেপশনে সামনে এসে দাঁড়ালেন গাউস চৌধুরী।
পকেট থেকে শিশিরের ছবি বের করে রিসিপশনের ছোকরার সামনে ছবিটা ঝুলিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘মুরগিটা এখানে আছে ?’
বিশালদেহী গাউস চৌধুরীর সাথে দুজন পুলিশ দেখে যা বোঝার বুঝে গেছে ছোকরা। নতুন চাকরি নিয়েছে। ঝামেলায় যেতে চান না।
ঢোক গিলে বলল, ‘জ্বি স্যার। মামুন হাসান নামে উঠেছে।’
‘চাবি দাও রুমের। লোকটার সাথে কথা বলব।’
তর্ক না করে চাবি দিয়ে দিল ছোকরা। নতুন চাকরি নিয়ে কী বিপদে যে পড়লাম- মনে মনে ভাবছে ছোকরা।
অন্ধকার কামরায় শুয়ে আছে শিশির। চিন্তায় ঘুম আসছে না। মেঘা আর পিচ্চির মুখ সারাক্ষণ চোখের সামনে ভাসছে। কত কিছুই না হতে পারে ওই বাড়িতে।
মনে হল দরজা কেউ খোলার চেষ্টা করছে। শব্দ শুনতে পেল শিশির।
ধড়মড় করে উঠে বেড সাইডের আলো জ্বেলে দিল।
পাহাড়ের মতো শরীর নিয়ে নিঃশব্দে ভিতরে ঢুকে পড়েছে লোকটা। হাতের সামনে ফোটো আইডি ধরে রেখেছে।
দুজন দুজনের দিকে কিছু ক্ষণ চেয়ে রইল ।
‘আমি গাউস চৌধুরী। গাচৌ বলে সবাই। ক্রাইম ব্রাঞ্জে আছি। আপনি নিশ্চয়ই শিশির রায় ?’
শান্ত গলায় বলল পাহাড়ের মতো লোকটা ।
শিশিরের মনে হল অনেক বছর পর মন প্রশান্ত করা কোনও কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। কোটি বছর বধির থেকে কানে শুনতে পাচ্ছে সে।
লোকটা চেহারা বেশ দয়ালু। আইনের কাঠখোট্টা অফিসারদের মতো চিত্রি বিত্রি মার্কা চেহারা না।
‘আমিই শিশির। কী হচ্ছে একটু বলবেন ?’ খানিক ইতস্তত করে বলল সে।
‘ভয় পাবেন না। আমি আপনাকে সাহায্য করতে এসেছি। দুজনেই জানি কারা কি বিরিয়ানি রান্না করছে।’
বিছানার পাশে বসতে বসতে বললেন গাউস চৌধুরী।
বাইরে অন্য দুই পুলিশ দাঁড়িয়ে রইল। সতর্ক।
‘আমি জানি আপনার গিন্নি আর খোকা জিম্মি। এবং আপনি যদি আমাকে সাহায়্য করেন , ওদের আমি মুক্ত করতে পারব। কথা দিচ্ছি মুক্তিপণ তুলে দেওয়ার পর যখন আপনার গিন্নি আর বাচ্চা নিরাপদ থাকবে তখন আমি মাঠে নামব। একটা ভালো খবর দিতে পারি। এই মুহূর্তে আমার তিন জন যোগ্য অফিসার নির্জনবাস বাড়ির উপর নজর রাখছে। খারাপ কিছু হতে দেখলে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়বে।’
শিশিরের মনে হল শরীর ভিতর থেকে জ্বর উঠে আসছে প্রবল বেগে।
‘আপনি ওদের এ সবের বাইরে রাখতে পারলেন না।’ রাগি গলায় বলল শিশির। ‘কিডন্যাপাররা যদি টের পায়, কেউ ওদের উপর নজর রাখছে তবে সাথে সাথেই খুন খারাবি শুরু করবে। এর মধ্যে আমার কাজের লোকটা খুন...।’
’আপনি বলছেন একজন ইতোমধ্যে মারা গেছে ।’ লম্বা দম নিয়ে বললেন গাউস চৌধুরী।
‘লাশ দেখিনি। কিন্তু ওর কামরার সামনে রক্ত দেখেছি আর... ওকে আর খুঁজেও পাইনি।’
’
‘আরে না, কাউকে খুন করেনি ওরা। মারধর করেছে। আর নিশ্চয়ই বন্দি করে রেখেছে । শুনুন আমি আপনার অবস্থা বুঝতে পারছি। শুধু একটু ভেবে বলুন তো আমাকে সাহায্য করবে কি না। কথা দিচ্ছি একদম নিরাপদে আপনার বউ বাচ্চাকে উদ্ধার করব আমরা।
চুপ করে রইল শিশির।
’আচ্ছা আপনি শুধু বলু্ন দলের নেতার বয়স কি প্রায় ষাট বছর? আর বেশ মোটা গাঁট্টাগোট্টা শরীর । ঠিক না ?’
হা -সূচক মাথা নাড়ল শিশির।
’আর ,লোকটার একটা সাগরেদ আছে । বেঁটে মোটা কালো কুচকুচে।’
অবাক হয়ে মাথা নাড়ল শিশির।
সাফল্যের হাসি হাসলেন চৌধুরী। ‘ সাথে যমজ ভাই বোন আছে। ভাইটা সাইকেল চেইন নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ওদের একটু নিখুঁত বর্ণনা দিন তো।’
শিশিরের বলা শেষ হতেই উঠে দাঁড়ালেন চৌধুরী । পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে হাতে দিয়ে বললেন, এটা আমার ফোন নাম্বার। মুখস্ত করে ফেলুন নাম্বারটা। তারপর পুড়িয়ে নষ্ট করে ফেলুন৷ আসলে কিডন্যাপাররা তৈমুর আলম খন্দকারকে চেনে না। সারা জীবনের অর্জন করা ক্ষমতা নিয়ে ওদের পিছনে লাগবে খন্দকার। আপনার বউ বাচ্চা নিরাপদ হওয়ার পরেই মাঠে নামব আমি। দরকার হলে ফোন দেবেন আমাকে। আপনার পাশের রুমে আমার তিনজন অফিসারকে ফিট করে যাচ্ছি আমি। ওরা নজর রাখবে আপনার উপর। অবশ্যই ছন্মবেশে। একটুও ভয় পাবেন না। টাকা নিয়ে নবীগঞ্জে ফিরে যান। দেখা হবে। আর এইভাবে বিচ্ছিরি স্টাইলে আপনার রুমের ভিতর ঢুকে পড়ায় দুঃখিত।
চৌধুরী চলে গেলেন।
বিছানায় অসহায় ভাবে শুয়ে রইল শিশির। চেয়ে আছে সামনের দেওয়ালের দিকে ।
সতেরো
সাবধানে বালিশ থেকে মাথা উঁচু করল সাবিহা।
জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসে লুটিয়ে পড়ছে কামরার ভিতর। মরার মতো ঘুমাচ্ছে মেঘা আর পিচ্চি। নিঃশব্দে ভূতের মতো বাইরে চলে এল সাবিহা।
কালু মানিক জেগে আছে কিনা কে জানে। ঝুঁকিটা নিতে হবে। কোনও ভাবে পোকার কাছে যেতে পারলেই হল। পোকা ওকে রাজকুমারের মতো উদ্ধার করে বাড়িতে পৌঁছে দেবে।
পুরো বাড়িটা নিঝুম৷ থমথমে ।
ফ্রিজের গুঞ্জন আর ঘড়ির টিকটিক ছাড়া কোনও শব্দ নেই। রান্নাঘরের দরজা খুলে বাইরে চলে এল সাবিহা। এখান দিয়ে চাকরদের কোয়াটারে যেতে সুবিধা। পথ সংক্ষিপ্ত।
গলা উঁচু করে বারান্দার দিকে চাইল। মানিক বসে আছে।
রাত একটা পর্যন্ত জেগে ছিল মানিক । সারাদিনে দৌড়ঝাঁপ আর মায়ের মৃত্যু শোক ওকে ক্লান্ত করে তুলেছিল। বেতের নরম সোফাটা বেশ আরামদায়ক। মধ্য রাতের পর গরম কমেছে একটু।
পিস্তলটা উরুর উপর রেখে ঘুমিয়ে গেছে বেচারা। হাল্কা নাক ডাকছে।
বিড়ালের মতো নিঃশব্দে পেছনের কোয়ার্টারে চলে এল সাবিহা।
কোয়াটারের ভেতরে দুই ভাইবোন আদৌ ঘুম আধো জাগরণে ছিল। উৎ পেতেই ছিল পোকা। খানিক পর পর জানালার ফাঁক করে মানিককে দেখছিল । মানিক ঠায় বসে আছে।
মাঝরাতের পর হঠাৎ করেই চাঁদটা উল্টো দিকে চলে গেছে।
পুরো বারান্দা ছায়া ছায়া অন্ধকার হয়ে গেছে। এত দূর থেকে বোঝার উপায় নেই, মানিক জেগে না ঘুমিয়ে । সাহসে কুলাচ্ছে না পোকার। কয়েকবারই ভেবেছিল কোন একটা অজুহাতে বাইরে বের হবে নাকি? কানের ব্যথাটা বারবার মনে করিয়ে দিল, দ্বিতীয়বারে মানিক মাথায় গুলি না করলেও পায়ে গুলি করে ল্যাংড়া বানিয়ে দেবে।
আধো ঘুমের মধ্যে রুইতন শুনতে পেলো, ওদের দরজা খুলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। কে যেন ভূতের মত ভেতরে ঢুকে পোকার বিছানার সামনে দাঁড়াল।
সাবিহার ফিসফিসে গলা শুনতে পেল, ‘পোকা আমি এসেছি।’
বিছানা থেকে উঠে সাবিহাকে কাছে টেনে নিল পোকা। ‘মানিক ঘুমিয়ে গেছে নাকি ?’
‘হ্যাঁ।’ ফিসফিস করে লোভনীয় গলায় বলল সাবিহা। ‘ চলো, আমরা পালিয়ে যাই।’
বাইরে তাকালো পোকা । মানিক পিস্তলের জাদুর কথা আবার মনে পড়ে গেল । ওকে ঠিকই খরগোশের মত ধরে ফেলবে মানিক ।
‘হারামজাদার কাছে পিস্তল আছে।’ ঢোক গিলে পোকা। ‘দেখনি তখন কী অবস্থা করেছে আমার।’
কামরা চারদিকে তাকাল সাবিহা। ‘রুইতন কোথায় ?’
‘ পাশের রুমে ঘুমাচ্ছে। আস্তে কথা বল।’
সাবিহাকে জড়িয়ে ধরল পোকা। অন্ধকারে মিশে গেল দুই শরীর ।
পাশের কামরাতে দাঁড়িয়ে সব শুনল সব দেখল রুইতন। সাবিহার উপর যুক্তিহীন ক্রোধে অন্ধ হয়ে গেল সে। ওর ভাইকে কেড়ে নিয়েছে হারামজাদি মাগি। এই মুহূর্তে যতটা কষ্ট হচ্ছে ঠিক ততটাই কষ্ট দিতে হবে মেয়েটাকে। সেই সাথে আলাদা করে ফেলতে হবে দুজনকে।
জানালার পাশে চলে গেল রুইতন। কাচের ফালিগুলো আস্তে করে খুলে নিতেই ফাঁকা হয়ে গেল জানালা। বের হয়ে এল বাইরে। আস্তে আস্তে এগিয়ে ঢুকে পড়ল গাড়ির গ্য্যারেজের ভিতর। কয়েক মুহূর্ত খুঁজতেই পেয়ে গেল - যা খুঁজছিল।
বেলচা।
জিনিসটা নিয়ে সাবধানে বাইরে চলে এলো ।
এক ঘণ্টা সময় লাগল দুঃখীরামের কবরটা খুঁজতে। আরও আধা ঘণ্টা লাগল বালির তলা থাকে লাশটা বের করে আনতে।
ততক্ষণে রাত দুটো বেজে গেছে। চাঁদ মাথার উপরে। মানিক নাক ডাকছে । মেঘা ঘুমিয়ে আছে। স্বপ্ন দেখছে শিশিরকে। পিচ্চি ঘুমের মধ্যে হাসছে।
পোকা আর সাবিহা বিছানায় শুয়ে আছে । ক্লান্ত।
নির্জনবাস বাড়ির বারোশো ফুট দূরে বালির উপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে আব্দুল হাই। পাশে দুজন অফিসার । বদরুল আর মনোজ। ঘুমোচ্ছে ওরা। সাথে রাইফেল। ঢাকা থেকে একটা পেরিস্কোপ পাঠিয়েছেন গাউস চৌধুরী। ওতে চোখ রেখে বাড়ির উপর নজর রাখছে আবদুল হাই
বালির সাথে মিশে শুয়ে আছে আবদুল । নির্জনবাস থেকে কেউ দেখতে পাবে না ওদের।
রুইতন প্রায় ভূতের মতোই নিঃশব্দে নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে রইল। কেউ জানল না, দেখল না। এমনকি আব্দুল হাই ও না৷
অভিমান নিয়ে অন্ধকারে শুয়ে রইল রুইতন। পাশে কামরাতে ফিসফিস করে কথা বলছে পোকা আর সাবিহা ।
‘এবার তুমি তোমার রুমে চলে যাও।’ ফিসফিস করে বলল পোকা। ‘সূর্য উঠে যাবে খানিক পরেই। মানিক কাউলা দেখলে খবর আছে।’
‘আমি ভেবেছিলাম চুপি চুপি দুজনে ঢাকা চলে যাব। তোমার তো হোন্ডা আছে।’ পোষাক পরতে পরতে বলল সাবিহা।
‘গুলি খেতে চাও না কি?’ বিরক্ত হয়ে বলল পোকা। ‘মানিক কুত্তার হাত ভালো। মাথা ফুটো করে ফেলবে।’
‘মোটা বাঁটুল একটা মানুষকে অত ভয় পাও তুমি ?’ অবাক হল সাবিহা।
‘বান্দির পোলাকে ভয় পাই না।’ খেঁকিয়ে উঠল পোকা। ‘ওর পিস্তলের জন্য কিছু করতে পারছি না। চলে যাও তুমি । দেখি কী করা যায়। মাথাটা খাটাতে দাও আমাকে।’
খুব কষ্ট পেল সাবিহা। সারা জীবন মানুষকে তোয়াজ করে চলেছে। এমন ভাবে কথা বলেনি কেউই।
‘তুমি আমাকে ভালোবাসো না বাসো না।’ কাঁদো কাঁদো গলায় বলল সাবিহা ।
‘নিশ্চই। নিশ্চই।’ যাও তো এখন। দেঁতো হাসি হাসল পোকা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে ঘন ঘন।
রতনে ভয় এখন আজরাইলের ভয়ের চেয়ে বড় ভয় ওর কাছে ।
দরজা খুলে বাইরে চলে এল সাবিহা । চারিদিকে থইথই চাঁদের আলো। জ্যোৎস্না । চৈতালি হাওয়া আর চাঁদের আলো সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক পরিবেশ। স্বপ্নপুরীর মতো।
দ্রুত হাঁটতে লাগল।
এগিয়ে গেছে মাত্র কয়েক কদম । তখনই বালির উপর পড়ে থাকা জিনিসটা দেখতে পেল । কলজে হিম করা চিৎকার করে উঠল সাবিহা।
তারপর চেঁচাতে লাগল একটানা। ট্রেনের হুইসেলের মত।
আঠারো
একটু পর হোটেল ছেড়ে চলে যাবে কেশু ।
এখন পর্যন্ত সব ঠিকঠাক আছে।তবে হঠাৎ করেই হেলেনের কথা খুব মনে পড়ছে। ফোন করেনি এই কয়েক দিন। ভয়ে। নিশ্চিত ভাবে জানে বাড়ির ফোন আর হেলেনের মোবাইলে আড়ি পাতা হয়েছে।
চিন্তায় নিশ্চয়ই মরে যাচ্ছে হেলেন। বেচারি জানে না , হঠাৎ করে কোথায় গায়েব হয়ে গেছে ওর স্বামী।
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।
প্যারাডাইস ক্লাবে ফোন করল। পরিচিত বারটেন্ডার হাতেম আলী ফোন ধরলো ।
‘আরে স্যার আপনি ?’ অবাক হল হাতেম আলী। ‘এতদিন পর ? কোথায় ছিলেন?’
‘একটু ব্যস্ত আছি।’ হাসি মুখে বলল কেশু। ‘তুমি আমার জন্য একটা কাজ করো ভাই । ভাল বকশিস দেব তোমাকে। আমার গিন্নিকে একটু ফোন কর ওর মোবাইলে। বলো প্যারাডাইস ক্লাবে গিয়ে অপেক্ষা করতে। ঠিক তোমার সামনে যেন বসে থাকে।’
‘কিন্তু আপনি কেন ফোন দিচ্ছেন না স্যার ?’ অবাক হয়ে বলল হাতেম আলী।
‘আমাদের মধ্যে একটু ঝগড়া হয়েছে আর কী । নাম্বার নাও।’
নার্ভাস বোধ করছে কেশু । ওর অবচেতন মন বলছে, গোয়েন্দা লেগেছে পিছনে। একদম ধারে কাছে চলে এসেছে। কী করা যায় ?
শিশিরের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভেগে যাবে ? কেন যেন মনে হচ্ছে নবীগঞ্জে ফিরে গেলে আরও বড় ঝামেলা হবে।
আধ ঘণ্টা পর আবার ফোন করলো ক্লাবে। হাতেম আলীর সামনেই ছিল হেলেন । ফোন ধরলো।
‘কোথায় তুমি?’ হাহাকার ভরা গলা হেলেনের। ‘কী হয়েছে বলতো ? বাড়িতে পুলিশ এসেছিল আর আমাকে ক্লাবে আনলে কেন ? ফোন দিলে না কেন বাসায়?’
বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যথাটা আবার অনুভব করল কেশু । ‘শান্ত হও ডার্লিং। আসলে ফোনে নজর রাখা হয়েছে।’
‘কেন? কী করছো তুমি ?’
‘বউ প্লিজ একটা কথা শোন। বাড়ি গিয়ে একটা স্যুটকেসে দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে বের হয়ে পড়। তুমি আমি সব ছেড়ে চলে যাবো দূরে কোথাও। পাঁচ কোটি টাকা আছে আমার কাছে । নতুন করে জীবন শুরু করব। রোজ হোটেলে আছি আমি।’
লাইনের ওপাশে নীরবতা।
অনেক সময় পর হেলেন বলল, ‘জানতাম, আবার তুমি পাপের পথে পা বাড়াবে। এত টাকা থাকার পরেও এমন বোকামি কেউ করে ?’
‘আমাকে বোকা বলবে না।’ চিৎকার করে উঠল কেশু। ‘কিছু জানো তুমি। শিবশঙ্কর চাকলাদার আমাদের সব টাকা জুয়া খেলে উড়িয়ে দিয়েছে । এক পয়সাও নেই আমাদের । একদম ফতুর হয়ে গেছি আমরা। চলে এসো তুমি হেলেন।’
আবার অনেকটা সময় চুপ রইলো লাইনের ওপাশটা।
‘তুমি আসছ হেলেন ?’
অনুনয় করল কেশু ।
‘না গো আমি আসব না। আমরা বুড়ো হয়ে গেছি কেশু। এই বয়সে পুলিশের সাথে লুকোচুরি খেলতে পারব না। তুমি বাড়ি ফিরে এসো । আমাদের টাকার দরকার নেই । যা আছে তাই দিয়ে ডাল ভাত খেয়ে সংসার চালিয়ে নেব।
‘গত পনের বছর ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের সময়। এই নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে কঠিন দুনিয়ায় আর নামতে চাই না। পনের বছর আগে হলে এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়তাম। বাসায় চলে এসো কেশু ।’
‘বোকা মেয়ে আমার কথা বুঝে না।’ হাহাকার করে উঠল কেশু । ‘ আমাদের আর কিছু নেই। বাড়িটাও আমাদের নেই। একদম পথে ফকির হওয়ার পর ও বুদ্ধি দিয়ে টাকাটা জোগাড় করেছি।তুমি চলে এসো হেলেন।’
‘আমি আসব না।’ অভিমানী কিশোরী মতো বলল হেলেন। ‘ তোমার অপেক্ষায় রইলাম। দিন আমাদের চলে যাবে খেয়ে না খেয়ে । মন যদি বদলে যায়, তবে সব ফেলে চলে আসবে আমার কাছে । অপেক্ষায় থাকব সারা জীবন।’
লাইন কেটে গেল।
রিসিভার হাতে নিয়ে বোকার মতো। দাঁড়িয়ে রইল কেশু।
বিশ্বাস করতে পারছে না। হেলেন ফোন কেটে দিয়েছে ?
অবিশ্বাস্য !
এই সেই হেলেন যাকে নর্দমা থেকে তুলে এনে বিত্ত , সম্মান আর সামাজিক মর্যাদা দিয়েছিল সে। শিবশঙ্কর আত্মহত্যা করার পর যখন জানতে পেরেছে , পথের ফকির হয়ে গেছে সে, তখনও এতটা খারাপ লাগেনি। আজ এই মুহূর্তে তার চেয়ে বেশি পরাজিত মনে হচ্ছে।
শরীর কাঁপছে কেশুর। হুইস্কির বোতল খুলে গলায় ঢেলে দিল তরল আগুনের মতো পানীয়।
হেলেন, কী করে সে পারল অমনটা করতে। বেচারি কতদিন ওখানে থাকতে পারবে ? বাড়িতে ফুটো একটা পয়সা নেই । কোনও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই৷।
গ্লাসে বরফ আর হুইস্কি মেশাতে সাথে যাবে তখন টেলিফোনটা আবার পিনপিন করে বেজে উঠল ।
কে হতে পারে? শিশির ছাড়া এই ঠিকানা আর কে জানে ?
রিসিভার তুলতেই লাইনের ওপাশ থেকে বিনয়ী গলা শোনা গেল, ‘স্যার আমাদের হোটেলের ১৩৫ নম্বর রুমের গেস্ট মামুন হাসান আপনাকে দেখা করতে বলেছেন।’
কয়েক মিনিটে তৈরি হয়ে নিল অবসরপ্রাপ্ত গড ফাদার । ভাবছে।
শিশিরের কাছ থেকে পাঁচ কোটি টাকা নিয়ে এখান থেকেই চম্পট দিলে কেমন হয়?
খারাপ হয় না ব্যাপারটা।
পাঁচ কোটি অনেক টাকা। বাকি জীবন চলে যাবে। জাল পাসপোর্ট বানিয়ে জামাইকা বা দুবাই চলে যেতে পারবে। পরে গোপনে হেলেনকে নিয়ে যেতে পারবে নিজের কাছে।
আরেকটা ড্রিংক শেষ করে বের হলে কেশু । নিচতলায় ১৩৫ নম্বর রুম।
বাথরুমে হাত মুখ ধুছিল শিশির। দরজা নক হতেই তোয়ালে হাতে ছুটল দরজার কাছে। সামান্য ফাঁক হতেই স্যাত করে ভিতরে ঢুকে পড়ল কেশু ।
’মালপানি এনেছেন ?’ সোজা কাজে কথায় চলে গেল কেশু।
আঙুল তুলে বিছানার উপরে রাখা কাপড়ের ঢাউস ব্যাগটা দেখিয়ে দিল শিশির। ‘পুরো পাঁচ কোটি আছে ওখানে।’
’ব্যাগ খুলুন।’ হুকুম দিল কেশু।
’আপনার টাকা আপনিই খুলে দেখুন।’ কাটাকাটা ভাবে জবাব দিল শিশির। মনমেজাজ খিঁচড়ে আছে ওর।
লম্বা সময় ঠান্ডা চোখে শিশিরের দিকে চেয়ে রইল কেশু । তারপর এগিয়ে গেল বিছানার দিকে। যেখানে টাকা ভর্তি ব্যাগটা রাখা।
ব্যাগটা খুলতে সামান্য সামনে ঝুঁকে এল কেশু। হঠাৎ মনে হল বুকের বাম দিকে গরম লোহার ফলা ঢুকিয়ে দিয়েছে কেউ। ততক্ষণে চেইন খুলে ফেলেছে ব্যাগের । ভিতরে খুব সুন্দর করে সাজানো টাকার বান্ডিল।
কিছু যেন বলতে চাইছিল কেশু । ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল সারা মুখে। কোন রকম নোটিশ ছাড়াই উপুড় হয়ে পড়ে গেলে টাকার ব্যাগের উপর। যে টাকার আর কখনওই খরচ করতে পারবে না।
চোখের সামনে প্রাক্তন গডফাদারের অসহায় পরিণতি দেখল শিশির। ওর সামনে মেঝেতে পড়ে আছে বিশাল শরীরটা। তখনও পিচ্চি আর মেঘার কথা ভাবছে ও। কী করবে বুঝতে পারছে না। পরক্ষণে মনে পড়ল গাউস বলেছেন, আশপাশে তার লোকজন থাকবে সবসময় ।
দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে বাইরে তাকাল। কেউ নেই।
তবে করিডরের শেষ মাথায় একটা লোক মেঝের ময়লা পরিষ্কার করছিল লম্বা এক ঝাড়ু দিয়ে। শিশির সাথে চোখাচোখি হতেই লোকটা ভুরু নাচাল।
’একটু ভেতরে আসবেন। সে মারা গেছে । স্ট্রোক।’ বলল শিশির।
এক ঘণ্টার মধ্যে গাউস চৌধুরী তার লোকদের নিয়ে চলে এলেন।
’লাশটা গোপনে সরিয়ে ফেলো।’ নির্দেশ দিলেন তিনি। ‘ কেউ যেন না জানে ডন কেশু মারা গেছে। আর আপনি শিশির সাহেব, এখান থেকে হাফ টাকা নিয়ে চলে যান নবীগঞ্জে। কিডন্যাপারদের হাতে তুলে দিন। বলবেন কেশু হোটেলেই আছে। কিডন্যাপাররা টাকা পেয়ে অসতর্ক হয়ে যাবে বা বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। তখন আমরা আক্রমণ করব।’
’ওদের কেউ যদি হোটেলে ফোন দেয় ?’ জানতে চাইল শিশির।
’সেই ব্যবস্থাও আছে।’ হাসলেন চৌধুরী । ‘হোটেল মালিক আমাদের পক্ষে কাজ করছে। যেই ফোন করুক , কেশুকে চাইলে জানানো হবে - উনি মাত্র বাইরে গেছেন। ভালো কথা আপনাকে কি কোনও পিস্তল ফিস্তল দেব ?সাথে নেবেন ?’
’না ।’ বলল শিশির। ‘ফিরে যাওয়ার পর সার্চ করবে ওরা। আমি জানি। বিশেষ করে মোটা কালো লোকটা। খুবই প্রফেশনাল সে।’
’গাড়িতে লুকিয়ে রাখেন যদি ?’
’ঝুঁকি নিতে চাই না। স্যার বাকি টাকাগুলোর কী হবে?’
’খন্দকারের অ্যাকাউন্টে জমা দিচ্ছি। আর বাকি পাঁচ কোটি টাকার টাকার যে চেক দেওয়া হয়েছে আলাদা পাঁচ ব্যাংকের নামে, সব ক্যানসেল করা হয়েছে ।’
’আমি তাহলে বাড়ি ফেরার জন্য তৈরি। বলল শিশির।’
***********************************
আবদুল হাইয়ের বেশ ঘুম পাচ্ছিল। ভাবল, বদরুল বা মনোজ কাউকে ঘুম থেকে তুলে পাহারার দায়িত্ব দিয়ে খানিকটা ঘুরিয়ে নেবে কিনা৷।
এমন সময় সাবিহার চিৎকার শুনতে পেল সে।
বাকি দুই অফিসার মনোজ আর বদরুল ও জেগে গেল।
‘বাড়ির ভিতরে নিশ্চয়ই কোনও ভায়লেন্স শুরু হয়েছে।’ বলল আবদুল হাই । ‘ আমি ভিতরে যাচ্ছি।’
‘স্যার আমি যাই।’ বলল মনোজ। এর আগে কিডন্যাপের কেস সামলেছে বেশ কয়েকটা। মনোজ ছোটখাটো মানুষ। বেশ কয়েকটা প্রজেক্টে কাজ করেছে আগে। পিস্তলে হাত ভালো।
প্রায় বানরের মতো দ্রুত ছুটল নির্জনবাসের দিকে।
বদরুল ছুটল ওদের গাড়ির দিকে। গাড়িতে রেডিও আছে। ঢাকায় যোগাযোগ করবে।
ভয়াল সেই চিৎকরে ঘুম ভেঙে গেছে মানিকের । বেশ কয়েকটা মুহূর্ত কেটে গেল কোথায় আছে সেটা বুঝে উঠতে। কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়াতে শরীর টলমল করছে। এর মধ্যে দেখল চাকরদের কোয়াটারের সামনে দাঁড়িয়ে সাবিহা। চিৎকার করছে আর মাথার চুল ধরে টানছে।
কেবিন থেকে বের হয়ে সাবিহার মুখে ঠাস করে চড় মেরে বসল পোকা। চিৎকার থেমে গেল মেয়েটার।
মেঘা ওর কামরার জানলা খুলে বাইরে উঁকি দিল । এত দূর থেকেও পচা গন্ধ পেল মেঘা।
চড় খেয়ে ঝেড়ে দৌড় দিল সাবিহা। পাগলের মতো চিৎকার শুরু করেছে আবার।
‘ধরো ওকে।’ বারান্দা থেকে দৌড়ে নামতে নামতে পোকার উদ্দেশ্যে চেঁচাল মানিক ।
পোকা পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে চেয়ে আছে দুঃখীরামের লাশটার দিকে । এক লহমায় বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে গেল সে । সাবিহাকে বিয়ে করা, ঘরজামাই থাকা , বড়লোক হওয়া সবই অবাস্তব স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই না।
ততক্ষণে মানিক ও দেখেছে লাশটা। ঘাড়ের সব লোম সরসর করে দাঁড়িয়ে গেল।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পুরো নাটকটা উপভোগ করছেন রুইতন । পৈশাচিক আনন্দে মনটা ভরে গেছে ওর।
হামাগুড়ি দিয়ে ওদের একশ গজের মধ্যে চলে গেছে মনোজ। আবিষ্কার করলো একটু সামনে গেলেই ধরা পড়ে যাবে। চাঁদের আলোয় সব থই থই করছে।
সবাইকে দেখল সে।
মানিক আর পোকা কীসের সামনে যেন দাঁড়িয়ে আছে। বালিতে লম্বা মত কী যেন পড়ে আছে একটা। আর একটা মেয়ে পাগলীর মত দৌড়ে ওর সামনে আসছে ।
মেয়েটাকে চিনতে পারল। সাবিহা। চিৎকার করছে কেন ? বিপদ?
গুণ্ডারা বোধহয় একজনকে মেরে ফেলেছে। লাশের সামনে দাঁড়িয়ে আছে না ?
লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল মনোজ। ‘ ম্যাডাম এই দিকে।’
থাবা দিয়ে সাবিহার হাত ধরল সে। ‘আমি ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসার। দৌড় দিন আমার সাথে।’
মানিক দেখল হঠাৎ করে মাটি ফুঁড়ে যেন একটা লোক উঠে দাঁড়িয়েছে। ভয়ে আর পুরনো রিফ্লেক্সের জন্যই গুলি করল মানিক । উবু হয়ে বালিতে মুখ গুঁজে পড়ে গেল লোকটা।
সাবিহা তখনও সামনে দৌড়ে যাচ্ছে। উন্মাদিনীর মতো ।
‘কে লোকটা? কী হচ্ছে বাড়িতে।’ বোকার মত বলল মানিক । ওর মাথা আর কাজ করছে না ঘটনার ঘনঘটায়।
পোকা দৌড়ে গিয়ে মনোজের লাশ চিৎ করে শোয়াল। পকেট হাতড়ে বের করে আনল আইডি কার্ড আর ব্যাচ।
‘শালা ভোদাই। এটা পুলিশের লোক।’ চিৎকার করে উঠল পোকা। ‘ পুলিশ খুন করে ফেলেছিস তুই।’
ওদিকে সাবিহা তখনও দৌড়ে পালাচ্ছিল। ওর সামনে এসে দাঁড়াল আবদুল হাই । ঝাঁপিয়ে পড়ল সাবিহার উপরে।
‘ম্যাডাম ভয় পাবেন না ।আমি পুলিশের লোক। বদরুল উনি খন্দকার সাহেবের মেয়ে । জলদি ঢাকায় নিয়ে যান আপনি।’
‘কিন্তু স্যার আপনি একা ?’ প্রতিবাদ করল বদরুল । মনোজের মৃত্যু দুজনেই দেখেছে। ‘ভেতরে আর বাচ্চা মহিলা আছেন উনাদের কী হবে?’
‘যা বলছি করুন। এটা আমার অর্ডার ।’ চেঁচিয়ে উঠল আবদুল হাই । রাগে শরীর জ্বলছে ওর। সদ্য পরিচিত হওয়া সহকর্মীর জন্য বুক ভর্তি শোক।
নির্জনবাসের দিকে ফিরে তাকাল। এত দূর থেকেও দেখতে পেল তিনটি ছায়ামূর্তি দৌড়ে ঢুকে পড়েছে বাড়ির ভিতরে। ভিতরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল। এত দূর থেকে ও ধরাম ধরাম করে দরজা বন্ধের শব্দ শুনতে পেল দুই অফিসার।
তারপর সব আলো নিভে গেল।
একটা একটা করে।
বদরুল সাবিহাকে নিয়ে জিপে ফিরে রেডিওতে ঢাকায় মেসেজ দিচ্ছে দ্রুত।
সবাই দেখতে পেল এই সময়।
দূর থেকে একটা গাড়ি আসছে। শিশির ড্রাইভ করছে ।
উনিশ
জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে মানিক আর পোকা।
ওদের দিকে চেয়ে রুইতন বুঝতে পারল বড় বড় খেলাগুলি তাহলে এমনই হয় ?
দরদর করে ঘামছে ওর দুর্দান্ত ভাই আর বিখ্যাত গুন্ডা মানিক ।
নিজ এলাকা কুকুরও বাঘ। বাইরে গেলেই জারিজুরি খতম।
’লাশটা কার ছিল ? তোমাদের সামনে যেটা দেখলাম।’ মোটা কর্কশ গলায় জানতে চাইল মানিক ।
‘কার আবার ? চাকরটার। বাধ্য হয়ে খুন করতে হয়েছে। আপনি তো গাধার মতো পুলিশের লোক মেরে ফেলেছেন।’ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল পোকা।
’ওটা একটা দুর্ঘটনা।’ বিব্রত গলায় বলল মানিক । ‘আসলেই মারতে চাইনি লোকটাকে।’
’থানায় গিয়ে সেটা বলবেন। উনারা ঠিকই বুঝবে। চা বিস্কুট খাওয়াবে।’ নরম গলায় বিদ্রুপ করল রুইতন।
দ্রুত মেঘার কামরাতে চলে গেল মানিক ।
বড় বড় চোখে ওর চলে যাওয়া দেখল রুইতন।
’ভয় পাবেন না। আমরা বিপদে পড়েছি। চারিদিকে পুলিশ আমাদের ঘিরে ফেলেছে। আর বোকা মতো একজন অফিসারকে মেরে ফেলেছি আমি । বিশ্বাস করুন , মারতে চাইনি৷ সামনে বিপদ। সম্ভবত পোকা আর ওর বোন ঝামেলা করবে। আপনি কি এখনও আমার পক্ষে আছেন?’ হব হব করে বলে গেল মানিক ।
’হ্যাঁ।’ শান্ত গলায় মেঘা বলল । ‘আপনার পাশে আছি।’
’ঠিক আছে। আমি যাই বলব তাই করবেন। এখানে থাকুন । চেষ্টা করব আপনাদের নিরাপদে রাখতে।’
মানিক ফিরে এল ড্রইংরুমে।
রুইতন আর পোকা এখনও জানলার ফাঁক দিয়ে বাইরে নজর রাখছে।
’আমরা এখন করবটা কী ?’ আতঙ্কিত স্বরে জানতে চাইল পোকা।
’গ্যারেজে গাড়ি আছে।’ শান্ত গলায় বলল মানিক । ‘বাড়ির পিছন দিয়ে আমরা ভাগতে পারি।’
ব্যাপারটা বোকামি হয়ে যাবে । তবুও মানিক চাচ্ছে ঘটনাটা যত দ্রুত শেষ হয় ততই ভাল । পালাতে গিয়ে যদি গুলি খেয়ে মারা যায় তবে আরও ভাল । কিন্তু ধরা পড়ে জেলে ফেরত যেতে চায় না। এই মুহূর্তে মাত্র দুটো চাওয়া আছে মানিক । এক, দ্রুত সবকিছু শেষ হোক৷
আর দুই, পিচ্চিটা বেঁচে থাকুক। নিরাপদে থাকুক।
’আপনি পাগল হয়ে গেছেন নাকি ?’ রেগে গেল রুইতন। ‘গাড়ি নিয়ে পালাতে পারবে নাকি ? গুলি খেয়ে মরবেন।’
’এটাই সেরা উপায়।’ বলল মানিক । ‘ওরা হয়তো ভাবতেও পারবে না। হঠাৎ করে যদি গাড়ি নিয়ে বের হয়ে যাই তবে ঠিকই ভেগে যেতে পারব। খানিক পর আরও বেশি অফিসার চলে আসলে তখন আর পারব না।’
’কথার মধ্যে যুক্তি আর লজিক দুটোই আছে।’ একমত হল পোকা। ‘নাহ, মানিক ভাই আপনি আসলেও বস পাবলিক।’
’পোকা।’ হিম হিম গলায় বলল রুইতন। ‘আরে গাধার বাচ্চা । বাইরে বের হলেই গুলি চালাবে পুলিশ । শুধু একটা কাজ করলে পুলিশ আমাদের চুলও ছুঁতে পারবে না।’
’কী ?’
’জিম্মি হিসেবে যদি শিশিরের বউটাকে সাথে নিয়ে যাওয়া যায়।’
কয়েক মুহূর্ত উজবুকের মতো দাঁড়িয়ে রইল পোকা। ধীরে ধীরে খুশির হাসিতে ভরে গেল ওর কুৎসিত মুখ। ‘ না রে বোন জীবনে প্রথমবার তোর কাছে হার মানলাম। ব্রেইন আর মগজ দুটোই আছে তোর। বউদি মণিকে সাথে নিয়ে যাই। দেরি করছিস কেন?’
মেঘার কামরার দিকে পা বাড়াল পোকা।
থেমে গেল মানিকের গলা শুনে।
‘ দাঁড়াও পোকা। আমরা এখনই বের হয়ে যাবো। কিন্তু ওই মহিলাকে সাথে করে নিয়ে যাবো না।’
পোকা ফিরে দেখলে ওর কপাল বরাবর পিস্তল ধরে আছে মানিক।
নির্জনবাস বাড়ির ফটকের বাইরে।
দূরে । পুলিশের জিপের সামনে তর্ক করছে আবদুল হাই আর শিশির।
‘দেখুন শিশির বাবু। আপনাকে কিছুতেই বাড়ির ভিতর যেতে দিতে পারি না। তিন জন পেশাদার অপরাধী আছে ভেতরে । আমাদের এক জনকে মেরে ফেলেছে ইতিমধ্যে। ভিতরে কারও লাশ আছে। পরিস্থিতি খুবই খারাপ। অপেক্ষা করুন। ঢাকা থেকে এক দল অফিসার আসছে।’ উত্তেজিত ভাবে বললেন আবদুল হাই ।
’স্যার আমার বউ আর বাচ্চা ভেতরে।’ অসহায় ভাবে বলল শিশির। ‘ মুক্তিপণের টাকা পর্যন্ত নিয়ে এসেছে আমি। টাকা ওদের হাতে দিলে আমার ফ্যামিলিকে ছেড়ে চলে যাবে। তখন আপনারা ওদের পিছু ধাওয়া করবেন।’
’আপনার কেন মনে হচ্ছে টাকা পেলেই সবাইকে ছেড়ে দেবে ? জিম্মি হিসেবে আটকে রাখতে পারে তো। তাই করবে। আমি নিশ্চিত।’
বদরুল জিপের ভেতর থেকে আব্দুল হাইয়ের উদ্দেশে চেঁচিয়ে উঠল,
’স্যার লাইনে গাউস চৌধুরী আছেন। আপনাকে চাইছেন।’
শক্তিশালী ওয়ারলেস সেট রয়েছে জিপের ভিতরে ।
জিপের দিকে দৌড় দিল আবদুল হাই।
কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল শিশির। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। দৌড়ে গিয়ে বসল ওর সাদা ক্যাডিলাক গাড়িতে। ঝড়ের বেগে গাড়ি নিয়ে চলতে লাগল বাড়ির দিকে।
পিছন থেকে পাগলের মতো চেঁচাতে লাগল বদরুল আর হাই । ততক্ষণে বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়েছে শিশিরের গাড়িটা।
হাঁপাতে হাঁপাতে রিপোর্ট করল আবদুল হালিম।
’কাহিনিটা জটিল হয়ে গেল।’ বিরক্ত হয়ে বললেন গাউস চৌধুরী। ‘আপনারা ওখানেই থাকেন । আক্রমণ করতে যাবেন না। একদল অফিসার চলে আসছে। আমিও রওনা হয়ে গেছি।’
বাড়ির ভেতরের পরিস্থিতি জটিল। বেশ জটিল ।
পিস্তল হাতে মানিক । সামনে দুই পোকা ভাইবোন।
’আপনি আসলে মস্ত বড় উল্লুক আর গাধা।’চিবিয়ে চিবিয়ে বলল পোকা । ‘মহিলাকে সাথে নিলে আমরা নিরাপদ থাকব।’
’কতক্ষণ?’ বলল মানিক। ‘সাথে মহিলাকে নিয়ে গেলেই বরং সারা দুনিয়ার পুলিশ আমাদের পিছু নেবে।’
‘যদি যাই এই মাতারিকে সাথে করে নিয়েই বাইরে যাব। নইলে এখানেই থাকব।’ তীব্র ঝাঁঝের গলায় বলল রুইতন।
তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। হেড লাইটের উজ্জ্বল আলো এসে পড়ল জানলা পর্দায়।
ঘাড় ফিরিয়ে জানালার দিকে ফিরে চাইল মানিক ।
আবার কে এল ? একটার পর একটা ঘটনা ঘটছেই।এ কেমন কাণ্ড ?
পাহাড়ি চিতার মত লাফিয়ে মানিকের উপর পড়ল রুইতন। তাল হারিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল দুইজন। মানিকের হাত থেকে খসে গেল পিস্তলটা । ছোঁ মেরে অস্ত্রটা তুলে উঠে দাঁড়ালো রুইতন ।
‘শালা কাউলা এখন থেকে নাটক আমরা সামাল দেব৷’ হিস হিস করে বলল রুইতন।
জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালো পোকা। ‘আরে শিশিরবাবু ফিরে এসেছে রে । হাতে ব্যাগ । রুই পিস্তলটা আমাকে দে ।’
পিস্তল হাতে জানালার সামনে গিয়ে পোকা চিৎকার করে বলল, ‘ওই যে সাহেব। ব্যাপার কী ?’
‘আমি মুক্তিপণের টাকা নিয়ে এসেছি।’
হাতের ব্যাগটা তুলে দেখাল শিশির ।
‘চালাকি করবেন না। আস্তে আস্তে বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়ুন। সাথে অস্ত্র থাকলে ফল ভাল হবে না। আমার হাতে পিস্তল আছে।’
এক হাতে ব্যাগ ধরে অন্য হাত উপরে তুলে বাড়ির ভিতর ঢুকল শিশির।
পাগলের মতো চারিদিকে তাকাচ্ছে মানিক । যে কোন একটা অস্ত্র দরকার।
টেবিলের উপর পিতলের ভারী শো পিসটা দেখল। নগ্ন নারীমূর্তি। একটু একটু করে ওখানে যাবার চেষ্টা করল সে।
‘নড়লেই মাথা ফাটিয়ে দেব কালু।’ হুঙ্কার দিল রুইতন ।
‘কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই মারা যাব আমরা। পুলিশের গুলি খেয়ে ।’ হাসল মানিক ।
‘চুপ থাক কাউলার বাচ্চা ।’ খেকিয়ে উঠল পোকা। শিশিরের দিকে ফিরে পোকা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘ঢাকায় গিয়ে পুলিশ আব্বুদের পাঠিয়ে দিয়েছ মামদার পোলা ?’
‘পুলিশ তোমাদের মতো বেকুব না।’ বলল শিশির। ‘ এই নাও টাকা। নিয়ে ভেগে যাও এখান থেকে।’
‘কেশু বুড়ো কোথায়?’
‘উনি ওনার ভাগ নিয়ে গায়েব হয়ে গেছেন। আর তোমাদের ভাগ পাঠিয়ে দিয়েছেন।’
‘কত দিয়েছে ?’
‘জানি না। ব্যাগ খুলে দেখো।’
‘তুই খোল হামারজাদা।’
সোফার উপর ক্যানভাসের ব্যাগটা রেখে জিপার ধরে টান দিল শিশির।
কামরার সবাই দেখল ওটা ভর্তি পেল্লাই সব টাকার বাণ্ডিল।
পোকা আর রুইতন চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে। এর আগে কখনও ওরা এত টাকা একসাথে দেখেনি।
সুযোগটা নিল মানিক । টেবিল থেকে পিতলের মূর্তিটা নিয়ে গায়ের জোরে আঘাত করলো পোকার কব্জিতে। হাড় ভাঙার কুৎসিত মট শব্দ শুনতে পেল সবাই।
পোকার হাত থেকে পিস্তলটা মেঝেতে পড়ে ব্যাঙের মতো লাফাতে লাফাতে মানিক পায়ের সামনে চলে এলো।
থাবা মেরে পিস্তলটা তুলে দুই ভাইবোনকে কাভার দিল মানিক ।
‘শিশির বাবু বাইরে কতজন অফিসার আছে ?’ প্রশ্ন করল মানিক ।
‘দুইজন।’
‘ডাকুন ওদের। আমি সেরেনডার করব। আর এই দুই শয়তানকেও ধরিয়ে দেবো। ডাকুন ওদের।’
পরিস্থিতি স্বাভাবিক বুঝেই মেঘা ওর রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এল। ‘শিশির তুমি... তোমার গলা শুনেছি আমি।’
‘সব ঠিক আছে সোনা।’ হাসলো শিশির। ‘দাঁড়াও আমি বাইরের অফিসারদের ডাকছি।’
গুড়ুম করে পিস্তলের গুলির শব্দে সবার কানে তালা লেগে গেল।
আবারও বারুদের গন্ধে ভরে গেছে ঘরটা।
সোফার তলায় পোকার পিস্তলটা চুরি করে লুকিয়ে রেখেছিল রুইতন। গোলে মালে সেটা বের করে গুলি চালিয়েছে মানিক পিঠে।
আশ্চর্য ! সত্যিই কোনও রকম ব্যথার অনুভূতি হল না মানিক । শুধু মনে হচ্ছে হাতুড়ি দিয়ে জোরে আঘাত করেছে কেউ। সামনের কাঁচের টেবিল ভেঙে মেঝেতে পড়ে গেল মানিক । হাত থেকে পিস্তলটা খসে গেছে । টপ করে পোকা তুলে নিল সেটা।
আহত বুনো মোষের মতো উঠে দাঁড়াতে চাইল মানিক ।
শান্ত ভাবে খুব কাছ থেকে মাথার মধ্যে দ্বিতীয় গুলিটা করল রুইতন।
মরার আগে মায়ের কথা মনে হল মানিকের । মা কষ্ট পেয়েছিল মরার সময় ?
শান্তি পেল এই ভেবে, আবার জেলে যেতে হচ্ছে না ওকে। মনে হল ওস্তাদের সাথে দেখা করে ভালোই হয়েছে । মা মরে গেলে সারাজীবন থালা বাটি মেজে জীবন চালাতে হত। চলত না। কষ্ট হত। এখন দায় শূন্যভাবে দুনিয়া ছেড়ে চলে যাচ্ছে। মৃত্যু জিনিসটা এত খারাপ কিছু না আসলে ।
তৃতীয় গুলিটা খেয়ে মরল মানিক ।
ওর শেষ চিন্তা ছিল, শিশিরের বাচ্চাটা। পিচ্চি না ওর নাম ? এমন নামও রাখে কেউ ? বেশ তো !
বিশ
চোখের সামনে মানিককের মৃত্যু দেখে চিৎকার করে উঠল মেঘা। ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।
‘ কালু হারামজাদা আমার হাতের কব্জি ভেঙে ফেলেছে ।’ বিলাপ করে উঠল পোকা।
‘চিল্লাচিল্লি থামাও ।’ খেঁকিয়ে উঠল রুইতন। পিস্তলটা সোজা ধরল মেঘার কপাল বরাবর। ‘তোমাকে আমাদের সাথে যেতে হবে ম্যাডাম।’
গুলির শব্দ শুনতে পেল বাইরে অফিসার দুজন।
‘ স্যার গোলাগুলি শুরু হয়ে গেছে ।’ রেডিওতে জানাল আবদুল হাই।
‘বাড়ির ভিতর ঢোকার দরকার নেই। আর কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি আমরা।’ রেডিওর স্পিকার থেকে জবাব দিলেন গাউস চৌধুরী।
বোনের হাতে পিস্তল আর মেঝেতে মানিক লাশ দেখে পোকার আত্মবিশ্বাস চনমন করে উঠল। পুরো ব্যাপারটা এখন ওদের হাতে৷ আর এই পরিস্থিতি যদি কেউ সামাল দিতে পারে তো বোন রুইতন পারবে।
‘আমরা তোমার বউকে নিয়ে যাচ্ছি। জিম্মি হিসাবে ।’ বলল রুইতন। ‘পোকা টাকার ব্যাগটা নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বস। শিশির বাবু দেখুন। আমার হারানোর কিছু নেই। লাশ মাত্র একটা ফেলেছি। আরও দশটা ফেলতে আপত্তি নেই।’
‘তোমাকে ওকে নিয়ে যেতে পারবে না।’ বাঁধা দিল শিশির।
‘সরে যান।’ পিস্তল উঁচিয়ে চেঁচাল রুইতন। ‘আর একবারও অনুরোধ করব না। সোজা গুলি করব।’
‘জিম্মি যদি নিতে হয় আমাকে সাথে নাও । কিন্তু আমার গিন্নি আর বাচ্চাকে রেখে যাও।’ বলল সে।
পোকা ততক্ষণে নিঃশব্দে শিশির পিছন চলে গেছে। পিস্তলের বাঁট দিয়ে সজোরে গায়ের জোরে আঘাত করলো শিশিরের মাথায়। মাথা ধরে হাঁটু ভেঙে মেঝেতে পড়ে গেল শিশির। জ্ঞান হারিয়েছে নিঃশব্দে।
মেঘার চুল ধরে টানতে টানতে গাড়িতে নিয়ে তুলল পোকা।
টাকার ব্যাগটা পিছনে রেখে গাড়ি স্টার্ট দিল রুইতন।
গাউস চৌধুরীর সামনে ম্যাপ। নবীগঞ্জের চারিদিকে কাঠ পেন্সিল দিয়ে বৃত্ত আঁকলেন। মার্ক করলেন সবগুলি রাস্তাও ।
রেডিওটা খ্যার খ্যার করে উঠল- ‘স্যার শিশির বাবুর গাড়িটা চলে গেল । ভেতরে মাত্র দুটো মেয়েমানুষ দেখলাম। একটা অবশ্য সেই অপরাধী দলের মেয়েটা। আমার জন্য দরজা খুলছিল । পুরুষ কাউকে দেখলাম না।’
‘বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ুন সাবধানে।’ বললেন চৌধুরী । ‘একদম সাবধানে।’
হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করে বাড়ির দিকে রওনা হল আব্দুল হাই। দরজা পর্যন্ত মাত্র গেছে বাড়ির ভিতর থেকে হুড়মুড় করে বের হয়ে এলো শিশির।
‘স্যার আমার বউকে জিম্মি করে নিয়ে গেছে। কিছু একটা করুন।’
‘কোথায় গেছে বলতে পারবেন ?’
‘না।’
‘কী হয়েছে এখানে ? গুলির শব্দ শুনেছি আমরা।’
‘ভেতরে দেখুন ।ওদেরই একজন মারা গেছে ।’
লাশটা ভালো মতো পরীক্ষা করলো আব্দুল হালিম। আবার দৌড়ে চলে গেল গাড়ির সামনে। রিপোর্ট দিল ।
‘চিন্তা করবেন না।’ চিন্তিত সুরে বললেন গাউস চৌধুরী । ‘পুরো এলাকাটার চারিদিক ঘিরে ফেলা হয়েছে । প্রতিটা রাস্তার চেকপয়েন্টে খবর দেওয়া হয়েছে। ওদের গুলি করে থামাতে পারব না। কারণ মিসেস শিশির রয়েছে ওদের সাথে। কিন্তু পালাতেও পারবে না। গাড়ির তেল শেষ হবেই। তখন...।’
গাড়ি স্টার্ট দেয়ার শব্দে চমকে গেল আবদুল হাই ।
’স্যার, সর্বনাশ হয়ে গেছে।’ চেঁচিয়ে উঠল আবদুল হালিম। ‘শিশির বাবু সম্ভবত পাগল হয়ে গেছেন। গাড়ি নিয়ে পাগলের মতো কোথায় যেন যাচ্ছেন। আর বাড়ির ভেতরে বাচ্চাটা কাঁদছে।’
’খুঁজে দেখুন ফ্রিজে দুধের বোতল বা শিশি আছে কি না। ওরকম কিছু থাকলে বাচ্চাটা মুখে ধরুন । তার পর সবাই মিলে হেড কোয়াটারের ফিরে আসুন।’ শান্ত গলায় বললেন গাউস চৌধুরী।
একুশ
তুফান গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে রুইতন।
কাঁপছে উত্তেজনায় । এই হল জীবন । যেমনটা ও সব সময় কল্পনা করেছে। ব্যাগভর্তি টাকা আছে। সাথে দুই পিস্তল। নতুন করে গ্যাং বানিয়ে অপরাধ জগতে নামা যাবে। কিছু দিন অবশ্য গায়েব হয়ে থাকতে হবে।
পিছনে সীটে বসেছিল মেঘা। শেষ পর্যন্ত কী হবে?- ভাবছে সে। গাড়ি থামার পর ওরা কি মেরে ফেলবে ওকে ? শিশির কি বেঁচে আছে ? পিচ্চি জেগে কাঁদছে না তো? ওদের কিছু হয়ে গেলে পিচ্চির দেখাশোনা কে করবে ?
’কোথায় যাবি?’ কব্জি ডলতে ডলতে বলল পোকা।
’কাঁচা রাস্তা ধরে গাড়ি চালাতে থাকি।’ বলল রুইতন। ‘কোনও ভাবে সীমান্তের কাছে যেতে পারলেই হল । সোজা ইন্ডিয়া চলে যাব।’
মানিককের গাড়িটা নিয়ে ধাওয়া করছে শিশির। ওর গাড়িতে তেল নেই। জানে। যে কোনও সময় তেল শেষ হয়ে গেলেই গাড়ি থেমে যাবে। কিন্তু কোন দিকে যাচ্ছে ওরা? আন্দাজে কোথায় যাবে শিশির ?
অনুমান করতে পারছে, হাইওয়ে ধরে যাবে না ওরা। এতক্ষণে প্রত্যেকটা বড় রাস্তার মোড়ে পুলিশের টহল বেড়ে গেছে । পোকা ভাইবোনও সেটা জানে। সবচেয়ে বড় কথা, ওদের মুখোমুখি হলে কী করবে সে। মেঘাকে বাঁচাবে কেমন করে ? ওদের দু জনের কাছে পিস্তল আছে। কিন্তু মেঘার কথা মনে হতেই সব ভয় দূর হয়ে যাচ্ছে।
সামনেই ছোট্ট মুদির দোকানটা পেল শিশির। ‘ ভাই সাদা রঙের কোন গাড়ি যেতে দেখেছেন ? ভেতরে দু জন মহিলা আর অল্প বয়স্ক এক যুবক ছিল।’
’দেখছি তো।’ হাসি হাসি মুখে জবাব দিল দোকানদার। মাততর পাঁচ মিনিট আগেই গেছে । ‘কিন্তু হেরা বড় রাস্তায় না গিয়া কাঁচা রাস্তা দিয়া ওই দিকে গেছে তো। ক্যান ? হেরা আপনের দোস্ত?’
এত দুঃখের মধ্যেও হাসি পেল শিশিরের। দোস্ত !
কাঁচা রাস্তা ধরেছে ওরা। অনুমান করল শিশির , কোথায় যাবে ওরা । আবার গাড়ি ছাড়ল।
রাস্তার অবস্থা তেমন ভাল না। উঁচু নীচু। পাথর ভর্তি । শেষ মাথায় একটা মোটর গ্যারেজ। নষ্ট গাড়ি মেরামত করা হয়। গ্যারেজের মালিক আব্দুল গনি ওসমান মাত্র দেশি মদের বোতল খুলে বসেছেন। সামনে ময়লা গ্লাস। আর কয়েক ফালি লেবু ।খানিক বরফ হলে ভাল হত। নেই। তাই শাগরেদ বিল্লাল মিয়ার বাপ মা তুলে গালিগালাজ দিচ্ছিলেন।
ঠিক তখনই বেঢপ পিস্তল হাতে একটা মেয়ে দাঁড়াল দরজার সামনে। মেয়েটার হাতে পিস্তল না থাকলে নেশার মৌতাত জমে উঠত আরও। এই মুহূর্তে সেটা হল না।
’ঝামেলা করবেন না।’ শান্ত গলায় বলল রুইতন। ‘ আমাদের শুধু একটা গাড়ি লাগবে। তেল ভর্তি । আরেকজন ড্রাইভারও লাগবে।’
’কিন্তু কেন? মানে...?’ বোকার মতো বলতে লাগলেন আব্দুল গণি ওসমান।
’কোনও কথা নয়৷ দুজনের মোবাইল ফোন দিয়ে আমার হাতে । কোনও রকম চালাকি করবেন না।’
ততক্ষণে পোকা হাজির হয়েছে দরজার সামনে । থাবা মেরে আব্দুল গনি ওসমান আর বিল্লাল মিয়ার কাছ থেকে মোবাইল ফোন দুটো কেড়ে নিল। কামরার এক কোণে টেবিলে উপরে ছিল পুরনো আমলের টেলিফোন। টেনে তাঁর খুলে নষ্ট করে ফেলল সেটা।
’তোরা দুই বান্দর যদি প্রানে বাঁচতে চাস তবে কোনও রকম ট্যাপ ট্যাঁপি করবি না।’ হিম গলায় বলল পোকা। ‘আমাদের সাথেই গাড়ি চালিয়ে যাবি।’
’ভদ্রভাবে কথা বলুন৷’ শান্ত গলায় বললেন আব্দুল গণি ওসমান। ‘কোথায় যাবেন?’
‘চট্টগ্রাম।’
‘অত দূর যাওয়া যাবে না ।’
’মাগনা করবেন না।’ বলল রুইতন। ‘টাকা দেওয়া হবে। আর রাজি না হলে বলুন । মাথায় গুলি ঢুকিয়ে সমস্যা শেষ করে দিই।’
মুখ শুকনো করে উঠে দাঁড়ালেন আব্দুল গণি ওসমান। বিল্লাল মিয়া বহু আগেই মাথার উপরে দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে ফণীমনসা গাছের মত ।
’পোকা তুই খেয়াল রাখ। আমি বড় শয়তানটাকে নিয়ে গ্যারেজের পিছনে যাচ্ছি।’
বলল রুইতন।
ময়লা বিচ্ছিরি রাস্তার অর্ধেক যাবার পরই গ্যারেজটা দেখতে পেল শিশির। গ্যারাজের বাইরে থাকা গাড়িটাও দেখে চিনতে পারল।
গ্যারেজ থেকে বেশ দূরে গাড়ি পার্ক করেছে ওরা। তারপর নিঃশব্দে হেঁটে ঢুকেছে ভিতরে। যাতে ভেতরে থাকা মানুষগুলোকে চমকে দিতে পারে।
ঝোপের ধারে গাড়ি পার্ক করে নেমে পড়ল শিশির। পেছনের বুট খুলে দেখল টুল বক্সটা আছে কি না। আছে।
টায়ার খোলার একটা লিভার মুঠো করে তুলে নিল অস্ত্র হিসেবে। ভালোই কাজ দেবে। তখনই অফিসের দরজা খুলে গেল। মাঝবয়েসি এক লোক ধাক্কা খেয়ে বের হলো। পিছনে রুইতন। হাতে পিস্তল।
‘হাঁটুন।’ খেঁকিয়ে উঠল রুইতন। ‘ল্যাংড়া নাকি ? ভালো মতো হাঁটুন । চালাকি করলে খুলি উড়িয়ে দেব। পিছনের গ্যারেজের গাড়িগুলি দেখান।’
লোকটা তোম্বা মুখে হাঁটতে লাগল। তিন ফুট পিছনে পিস্তল হাতে সতর্ক অবস্থায় রুইতন। দুজনে চলে গেল অফিসের পিছনে। যেখানে গাড়ি মেরামত করা হয়।
সতর্ক পায়ে এগিয়ে গিয়ে অফিসের ভিতর উঁকি দিল শিশির। কর্মচারী মার্কা এক লোক দেওয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। ঘামছে লোকটা। হাঁটু কাঁপছে থরথর করে। টেবিলের উপর পিস্তল হাতে বসে আছে পোকা। দরজার সামনে বড় বড় চোখে ফ্যাকাসে চেহারা করে দাঁড়িয়ে আছে মেঘা।
কয়েকটা মুহূর্তে পুরো দৃশ্যটা দেখল সে।
অক্ষম অদ্যম রাগ অনুভব করল নিজের ভিতরে । মনে হল দৌড়ে গিয়ে পোকাকে আক্রমণ করে বসে । সাথে এও বুঝল পোকাকে সামাল দেওয়া ওর কাজ নয়, পিস্তল আছে ওর হাতে।
বাইরে ছায়ার মধ্যে মিশে দাঁড়িয়ে রইল । বুদ্ধিটা তখনই পেয়ে গেল । দৌড়ের পোকাদের গাড়ির কাছে চলে এলো। ব্যাকসিটেই ক্যানভাসের ব্যাগটা। এই ব্যাগ ভাল করেই চেনে । টাকাভর্তি করে নিজেই এনেছিল ঢাকা থেকে।
থাবা মেরে ব্যাগটা তুলে নিয়ে দৌড়ে অন্ধকারে ঝোপের আড়ালে চলে গেল। অপেক্ষা করবে সে। নাটকের শেষ পরিনিতি ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু টাকার ব্যাগ না পেয়ে ওরা যদি আরও খেপে ওঠে ?
অফিসের পিছনে গ্যারেজ।
বেশ কয়েকটা গাড়ি পার্ক করে রাখা ।ভালই চলে এদের ব্যবসা, বোঝা যায় ।
‘শুনুন, আপনাকে দিয়ে ফ্রি কাজ করাব না ।’ বলল রুইতন। ‘এত টাকা দেব ভাবতেই পারবেন না। প্রচুর টাকা। শুধু চিটাগাং পর্যন্ত আমাদের নিয়ে যাবেন।’
’অপরাধ করে পালাচ্ছেন নিশ্চই ?’ চোখ পিটপিট করে বললেন আব্দুল গণি ওসমান।
‘না, বাড়ি থেকে পালাচ্ছি। আপনাকে বিয়ে করব বলে।’ ভেংচি কাটলো রুইতন।
বিলাল মিয়া দুই হাত মাথার ওপর তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবছে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে। চোখ কান খোলা । ঘটনা ভালো যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। ওদের কিডন্যাপ করা হয়েছে।সন্দেহ নে্ কাজ শেষ করলে নিশ্চয়ই মেরে ফেলবে। গত মাসেই এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল। পত্রিকায় পড়েছে ।
জিম্মি হিসাবে ওদের কোনও দাম নেই। কারণ ওরা আগে থেকেই সুন্দরী এক মহিলাকে কিডন্যাপ করে রেখেছে। নিশ্চয়ই এখান থেকে মুক্তিপণের টাকা পাবে।
বিল্লাল মিয়া খেয়াল করল, পোকার হাতের কবজি ফুলে আছে । ন্যাকড়া বাঁধা । সেই হাত দিয়ে কিছু করতে পারছে না। অকেজো। বিদ্যুৎ চমকের মতো বুদ্ধি এল - কোনও ভাবে পোকার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারলে কাবু করতে পারবে। পিস্তলটা কেড়ে নেওয়া তখন কোনও ব্যাপারই না।
‘স্যার বাইরে যে গাড়িটা আছে সেটা ঠেলা না দিলে চলবে না। অতিরিক্ত মানুষ লাগবে ওটা ঠেলতে।’
সতর্কভাবে বলল বিল্লাল মিঞা।
‘সেটা আগে বলিস না কেন ফকিন্নির পোলা?’ খেঁকিয়ে উঠল পোকা।
‘বলার আর সময় পেলাম কোথায় ? ঢুকেই তো আপনারা অ্যাকশন দেখাতে শুরু করেছেন।’
অসহায় একটা ভঙ্গি করে বলল বিল্লাল মিঞা ।
’ঠিক আছে, আগে বাড়ো সবাই।’ পিস্তল নাচিয়ে ইঙ্গিত করল পোকা। ‘ম্যাডাম আপনি আগে । মাঝে তুই মেকানিক শালা। যাও সবাই গাড়ির গ্যারেজের পেছনে।’
দরজা মাঝামাঝি দলটা আসতেই বিল্লাল মিয়া ঝাঁপ দিল পোকার উপরে। কয়েক মুহূর্তের জন্য বিল্লাল মিয়ার মনে হল, সফল হয়েছে সে।
দুজনে ধস্তাধস্তিতে পোকার পিস্তল থেকে বুলেট বের হয়ে মেঝেতে লাগল। শক্ত বুট দিয়ে বিল্লালের পায়ের গোড়ালিতে আঘাত করল পোকা।
অসহ্য ব্যথায় প্রাণ বের হয়ে দশা হল বিল্লাল মিয়ার। নিজের অজান্তেই পোকার পিস্তল ধরে হাতটা ঢিলে করে দিল সে। সেই সুযোগে শক্ত ঘুষিতে দুর্ভাগা বিল্লাল মিয়াকে মেঝেতে ফেলে দিল পোকা।
গুলির শব্দে কেঁপে উঠল অফিস রুমটা।
কোন রকম প্রতিবাদ না করেই মারা গেল বিল্লাল মিঞা। ঠিক সেই সময় পিছনের গ্যারেজে বড় একটা ট্র্যাকের ইঞ্জিন চালু করল করছেন আব্দুল গনি। ইঞ্জিনের শব্দে পিস্তলের শব্দ শুনতে পেল না রুইতন আর আবদুল গনি।
‘কোনও রকম বেচাল দেখলে আপনারও একই অবস্থা হবে।’ মেঘার দিকে কটমট করে চেয়ে বলল পোকা। ‘ পিছনের গ্যারেজে চলুন।’
কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে থমকে দাঁড়াল পোকা। ‘আরে…। সামনের গাড়িতে না টাকা রয়ে গেছে। মাথাটা গেছে আমার। আর একটু হলেই টাকা পয়সা ফেলে গাড়িতে উঠে বসলাম। তারপর মাইল দশেক গিয়ে মনে পড়ত। ততক্ষণে গুলির শব্দ শুনে পুলিশ এসে বসে থাকতো এই জায়গায়।’
পিস্তল তুলে মেঘাকে হুমকি দিল। ‘ আপনি এখানেই থাকবেন। নড়বেন, চড়বেন না।’
দৌড়ে গাড়ির পাশে চলে এল পোকা। পিছনের দরজা খুলে বোকা বোকা ভাবে দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। দ্রুত সামনের দরজা খুলে আরও একবার পাগলের মতো ভেতরটা দেখতে লাগল।
ব্যাগটা নেই। টাকা ভর্তি ব্যাগটা নেই।
খাম্বার মতো কয়েকটা মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলো পোকা। মাথা কখনও ভাল মতো কাজ করে না ওর। এখনও করছে না ।
মোট কত টাকা ছিল এখানে ক্যানভাসের ব্যাগে ? কে নিল টাকা গুলো ? কে ?
দরদর করে ঘামছে পোকা ।
দূর থেকে পোকাকে দেখছিল মেঘা৷ ওর দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে ঝেড়ে দৌড় দিল মেঘা। অফিস রুম থেকে বিশ গজ দূরে ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকার। ঝোপ ঝাড়ে ভর্তি। সেই দিকে ছুটছে মেঘা। ভূতের মতো নিঃশব্দে দৌড়াচ্ছে মেয়েটা। জীবনে এত দ্রুত ছোটেনি কখনও।
পোকা তখনও গাড়ির পাশে পাগলের মতো দাঁড়িয়ে আছে। কে নিল ওর টাকা ? টাকাগুলো হাপিস করতে পারে কে ?
উত্তরটা পেয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। রুইতন।
বিশ্বাসঘাতকতা করছে রুইতন। আগেও জটিল চাল দিয়েছিল কে ? রুইতন। পিস্তল পেয়ে নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছিল কে ? মাটি খুঁড়ে চাকরটা লাশ তুলে সাজিয়ে রেখেছিল কে ?
বিয়ে করার সময়ই তো বাধা দিচ্ছিল। এখন টাকা গায়েব করে পালিয়ে যাচ্ছে হয়তো । সে জন্যই তো গাড়ির খোঁজে নিজে গেছে। আফিসে ওকে রেখে দিয়ে। পালিয়ে যাবে টাকা নিয়ে- চিটাগাং । সেখান থেকে ইন্ডিয়া। তারপর যেখানে খুশি।
দৌড়ে গ্যারেজের কাছে চলে এল পোকা। ঐতো বিশাল একটা ট্রাক স্টার্ট দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আব্দুল গণির ড্রাইভিং সিটে বসা । আর রুইতন দরজার পা-দানিতে পা রেখে উপরে উঠছে। মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত পরই গতি পাবে ট্র্যাকটা। ওদের সবাইকে ফেলে টাকা নিয়ে পালিয়ে যাবে নিরাপদ জায়গাতে ওর বোন।
ট্রিগারে আংগুল পেঁচিয়ে ধরল পোকা। ওদের দূরত্ব অনেক বেশি। আরও কাছে যেতে পারলে ভাল হত। কিন্তু আরও কাছে গেলেই রুইতন ওকে দেখে ফেলবে। আর রুইতনের কাছেও পিস্তল আছে।
এক মুহূর্তও ইতঃস্তত করল। চাপ দিলে ট্রিগারে । আঙুল ফুলকি দেখা গেল পিস্তলের নলে। বিকট শব্দ।
গুলির শব্দ শুনে মেঘার কলজে শুকিয়ে গেল।
প্রথমে ভেবেছিল ওকে গুলি করেছে পোকা শয়তানটা । যখন দেখল ব্যথা পাচ্ছে না দ্বিগুণ বেগে দৌড় দিল। ঠিক তখনই ঝোপের আড়াল থেকে শয়তান মতো একটা লোক উঠে দাঁড়াল ওকে ধরার জন্য।
আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল মেঘা।
শয়তান লোকটা চাপা গলায় বলছে, ‘মেঘা । এটা আমি। শিশির।’
থমকে দাঁড়াল মেঘা। অন্ধকারে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে না শিশিরকে । চিনতে পেরে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল। পুরো ব্যাপারটা মেঘার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে।
শিশির সেখানে এল কী করে ? নাকি সব কিছু স্বপ্ন ? এখনও ঘুম ভেঙে দেখবে ওরা সেই বাড়িতেই বন্দি আছে।
শিশির ভয় পেয়েছিল। ভেবেছিল টাকা না পেয়ে মেঘার কোনো ক্ষতি করে বসবে না তো পোকা ? এত দূর থেকে ও পরিষ্কার দেখতে পেল ট্র্যাকে উঠতে গিয়ে পিঠে গুলি খেয়ে ময়লা কাদা মাটিতে পড়ে গেছে রুইতন ।
‘চলো। পালাই এখান থেকে।’ উত্তেজিত ভাবে বলল শিশির। ‘এই জায়গা মোটেও নিরাপদ না ।’
ওরা দুজনেই দৌঁড় দিল উল্টো দিকের পথটাতে।
মাত্র কয়েক গজ দৌড়ে যেতেই অন্ধকারে কে যেন বলে উঠল- ‘থামুন আপনারা।’
থমকে গেল ওরা ।
পথের সামনে দুই জন পুলিশ অফিসার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আবদুল হাই ।
রুইতন মাটিতে পড়ে যেতেই আচমকা তীব্র শোক আকুল করে তুলল পোকাকে।
মনে হচ্ছে ধারালো চাকু দিয়ে ওর শরীরটা দু টুকরো করে ফেলেছে কেউ । নিজেকে বড্ড অসহায় আর ভয়ঙ্কর নিঃসঙ্গ মনে হল পৃথিবীর বুকে।
ময়লা কাঁদা মাখা মেঝেতে অসহায় ভাবে পড়ে আছে ওর বোন !
দৌড়ে গেল বোনের দিকে।
রুইতন গুলি খেয়ে পড়ে যেতেই ওসমান গণির মনে হল ট্রাকটা জোরে চালিয়ে পালিয়ে যান তিনি। কিন্তু । সাথে সাথেই সহকারি বিল্লাল মিয়ার কথা মনে হল । না । পুরানো কর্মচারীটাকে একলা খেলে পালাবেন না। যাই ঘটুক তার কপালে।
বোনের পাশে হাঁটু গেড়ে বসল পোকা। হাঁপাচ্ছে পোকা। ঘন ঘন। ঘামে ভিজে গেছে শরীর।
পিঠ দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হয়ে আসছে রুইতনের। পিস্তলটা পাশে রেখে বোনের শরীরটা ধরে ঘুরিয়ে দিল। চোখ মেলে ভাইয়ের দিকে তাকাল রুইতন।
যন্ত্রণায় চোখ মুখ কুঁচকে গেছে রুইতনের । হাঁপাতে হাঁপাতে বলল , ‘ পালা এখান থেকে । পুলিশ এসে গেছে । আমার কথা চিন্তা করতে হবে না। পালা।’
‘টাকাগুলো কই ?’ মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বলল পোকা। ‘তুই টাকা নিয়ে ভাগছিলি কেন ? আমার সাথে বেইমানি করলি কেন?’
চোখ দুটো বুজে আসছিল রুইতনের । কাশিতে মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হয়ে এল।
‘টাকাগুলি কই রুইতন ?’ গলা চড়িয়ে বলল পোকা। ‘ কেন এমন করলি আমার সাথে?’
অনেক কষ্টে চোখ মেলে তাকাল রুইতন। নিস্তেজ গলায় বলল , ‘টাকাগুলো গাড়িতেই আছে । ব্যাক সিটে। নিয়ে পালা। পুলিশ ঘিরে ফেলেছে আমাদের। বুঝতে পারছিস না কেন? ওরা গুলি করেছে আমাকে।’
পাথর মত কয়েক মুহূর্ত বসে রইল পোকা। মনে হচ্ছে পাগল হয়ে যাবে ও।
‘তুই টাকা নিস নি ?’ চিৎকার করে বলল পোকা। ‘ওগুলো নেই গাড়িতে । আমি ভেবেছি তুই নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিস। শুনতে পাচ্ছিস ? টাকাগুলো নেই।’
‘আমি নেব কেন?’ ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে বলল রুইতন । ‘এগুলো আমাদের টাকা না ? দুজনের টাকা। কত কষ্ট করে উপার্জন করেছি আমরা- আমি একা নিতে যাব কেন?’
নিজের মাথায় নিজেই ঘুসি মারল পোকা
হাহাকার করে উঠল। ‘ আমি ভেবেছি টাকা নিয়ে তুই পালিয়ে যাচ্ছিস । আমি... আমি তোকে গুলি করেছি বোন। মাফ করে দে , দাঁড়া তোকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি । সব আমার উপর ছেড়ে দে বোন। আমি আছি না ? সব ঠিক হয়ে যাবে।’
মুখ দিয়ে গলগল করে আরও রক্ত বের হয়ে এল রুইতনের । বিষাদমাখা সুরে বলল, ‘পালা তুই। আমার সময় শেষ হয়ে আসছে ।পালা।’
হু হু করে কেঁদে উঠল পোকা। ‘ তোকে ফেলে যাব। না। সোজা হাসপাতাল। ভাল হয়ে যাবি তুই। গোল্লায় যাক টাকা। আমরা আবার আগের মত জীবন শুরু করব।’
বোনকে জড়িয়ে ধরে তুলতে গেল পোকা । খিঁচুনি উঠে গেল রুইতনের শরীরে । মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরুল আরেক দফা। উলটে গেল দুই চোখ ।
রক্তে পোকার পিঠ ভিজে গেল। কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল বোনের প্রাণহীন মুখের দিকে । বেশ কয়েকটা মুহূর্ত লাগল সরল কথাটা বুঝতে। ওর বোন মারা গেছে।
মনের পর্দায় ভেসে উঠল অতীত দিনের স্মৃতি। বস্তিতে একসাথে বেড়ে ওঠা... কত সংগ্রাম করেছে ভাইবোন মিলে। কত জায়গা থেকে খাবার চুরি করে এনে ওঁকে খাইয়েছে রুইতন । কত মারামারি করেছে নিজেরা। বোনকে ছাড়া এই কঠিন দুনিয়ায় কী ভাবে থাকবে ? বোন মারা গেছে। বুনো পশুর মতো চিৎকার করে কেঁদে উঠলো পোকা। বুকের ভেতর থেকে বের হয়ে এলো জন্মান্তরের হাহাকার।
ট্রাকের ড্রাইভিঙ সিটে বসে সবই দেখলেন আর শুনলেন ওসমান গনি। ম্লান গলায় বললেন , ‘উঠে পড়ুন গাড়িতে। আপনি যেখানে চান সেখানেই নামিয়ে দেব। কেউ জানবে না ।’
‘আপনারা ঠিক আছেন তো ?’ জানতে চাইলে আবদুল হাই ।
‘টাকার ব্যাগটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রেখে এসেছি।’বলল শিশির।
হাসল আব্দুল হাই।
‘টাকা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আমার সাথেই এই দুই অফিসার আপনাদের নিরাপদে পৌঁছে দেবে। আরও পুলিশের গাড়ি আছে সামনে । আপনাদের খোকা নিরাপদে আছে। । ভাগ্য ভাল আমি আপনাকে অনুসরণ করেছিলাম। বাকি কাজটা আমরা দেখছি। যান বাড়ি চলে যান।’
আবদুল হাই যখন গ্যারেজের সামনে গেলো দেখতে পেল বোনের লাশের পাশে গোল হয়ে ঘুরছে আর কাঁদছে পোকা। আচমকা দুই হাত আকাশের দিকে তুলে বন্য জানোয়ারের মত চিৎকার করে উঠল পোকা।
সেই চিতকারে আবদুল হাইয়ের ঘাড়ের পিছনের চুল সড়সড় করে দাঁড়িয়ে গেল।
ধীরে ধীরে সতর্কতার সাথে আরও সামনে গেল দলটা। পোকার হাতে পিস্তল আছে।
‘হাত দুটো উপরে তুলে দাও দাও পোকা।’ উঁচু গলায় বলল আবদুল হাই। পুলিশ চারিদিক থেকে তোমাকে ঘিরে ফেলেছে।’
পোকার মাথা কাজ করছে না। বুকের ভিতরে সব হারানোর শোক।
পুলিশ শব্দটা শুনে কটমট করে ফিরে চাইল ।
আচমকা ঝেড়ে দৌড় দিল বড় রাস্তার দিকে। ওই দিক থেকেই আসছিল একটা ভারি ট্রাক।
সবাই দেখতে পেল। দৌড়ে গিয়ে পোকা ঝাঁপিয় পড়ল গাড়িটার সামনে। এত দূর থেকেও হাড় ভাঙ্গার শব্দ শুনতে পেল সবাই। মুহূর্তেই মাংসের পিণ্ড হয়ে গেল পোকা।
শেষ
বিদেশি কাহিনির ছায়া অবলম্বনে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন