ঘটনাটা অমন বিচ্ছিরি দিকে মোড় নেবে , কেউ ভাবতে পারেনি ।
অবিশ্বাস্য রোমহর্ষক ঘটনাটা শুরু হল একদম অকস্মাৎ ।
ওরা পাঁচ জন । তিন পুরুষ , দুই মহিলা ।
চৈত্র মাস ।
গরম ।
বাইরে তারা ভরা আকাশ। রাত মাত্র আটটা ।
আড্ডা বেশ জমে উঠেছিল ।
বাড়ির কর্তা আখতার চৌধুরী মজলিসী মানুষ । আড্ডা , গল্প স্বল্প, হই চই পছন্দ করেন । বাড়িতে আড্ডার আয়োজন করেন, মাসে একবার । নিজেরাই একটা ক্লাবের মত বানিয়েছেন । বেশি লোকজন না। সদস্য, সব সময় পাঁচ ছয় জনের মধ্যেই থাকে।
তুমুল আড্ডা । পেয়ালার পর পেয়ালা চা। সামনে ফ্ল্যাক্স থাকে। যার যত খুশি ঢেলে নাও । বারণ করবে না কেউ । ভদ্রতা বোধ নিয়ে খোঁচা দেবে না কেউ । মদ্যপানের ও ব্যবস্থা আছে । সব সময় না। কখনও কখনও।
চায়ের সাথে টা থাকেই।
খানিক পর পর আসে নিমকি , জিলিপি , ফুলুরি , ঘরে বানানো সন্দেশ ,হাড়ি কাবাব , চানাচুর , বেগুনী , সিঙ্গারা এবং আরও অনেক কিছু । সব কিছুর তালিকা দেয়া সম্ভব না।
এখানে বলা দরকার , আখতার চৌধুরীর গিন্নি বিলকিস চৌধুরীর বানানো সিঙ্গারা খুব উঁচু পর্যায়ের ক্লাসিক একটা জিনিস । ভেতরে মুগের ডাল হতে শুরু করে মউসুম বদলানোর সাথে সাথে সবজি বদলে এক অভূতপূর্ব জিনিস বানিয়ে ফেলেন । এমন কি সিঙ্গারার ভেতরে বাঁধাকপির কুঁচি বা লাউ ও দেন । লুচি এবং বেগুনের ছক্কাও বেশ ফাটাফাটি জিনিস। বেগুনিগুলো প্রায় দশ নাম্বার চটি জুতার সাইজের মত বড় ।
আখতার চৌধুরী ব্যবসায়ী মানুষ । হরেক রকম ব্যবসা আছে । বেশ ধনী বলা যায় । সেকেন্ড জেনারেশন ধনী । বাপের সম্পত্তি আরও বারিয়েছেন । বয়স চল্লিশ ।
বাকি হচ্ছে, হোসেন দম্পতি । মুনীর হোসেন এবং উনার গিন্নি ফিরোজা বেগম । মুনীর হোসেন একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে । ভাল মানুষ। ইশকুল জীবন থেকেই আখতার চৌধুরীর বন্ধু। রতনজোড় না মানিকজোড় কি যেন বলে না ? সেটাই।
পাঁচ নাম্বার ব্যক্তি লতিফ সরকার এদের বন্ধু ফন্ধু না। উনি একজন অধ্যাপক । । মনোরোগ বিশেষজ্ঞ । বয়স ষাটের মত । চুল দাঁড়ি কার্পাস তুলার মত শাদা । চোখ ভারী চশমা । সূচালো, শেক্সপীয়র মার্কা দাঁড়ি গোঁপ । হেন তেন ।
তো, আজকের আড্ডাটা বেশ জমে উঠেছে । খাওয়া দাওয়া তো চলছেই ।
আখতার চৌধুরীর বসার রুমটার কথা বলার দরকার দেখি না।
কে না জানে , ধনী মানুষের কারবার অন্য রকম ।
দেয়ালে পিতলের ফ্রেমে বাঁধাই করা পেল্লাই সাইজের তেলরঙা পেইন্টিঙটার দামই আছে দশ লক্ষ টাকা । দেখার মত জিনিস ।ছবির চেয়ে বেশি সুন্দর ফ্রেমটা ।
সোফা কার্পেট দামি । ছা পোষা মধ্যবিত্তের মুখ হা হয়ে যাবে দাম শুনে । এমনকি চায়ের পেয়ালা তশতরী পর্যন্ত বাইরে থেকে কেনা । কালেকশন আইটেম। হাতে গোনা সামান্য পিস বাজারে ছেড়েছে কোম্পানি। কয়েক দশক পরই অ্যানটিক হয়ে যাবে।
অধ্যাপক -এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ লতিফ সরকার কথা বলছেন ।
বাদবাকি সবাই মন দিয়ে শুনছে ।
' সম্মোহন একটা আজব জিনিস ।' পেয়ালা হাতে বলে চলছেন উনি । উনার বাচন ভঙ্গি বেশ ভাল। ' আগে এটা জাদু বিদ্যা মনে করা হত । ভাবতো কালো জাদু বা ডাইনিদের গুপ্তবিদ্যা হয়তো । চর্চাও হত অনেক বছর আগে থেকে । কিভাবে কবে এই বিদ্যার আবিস্কার হয় সে সব জানা যায়নি । তবে সন্দেহ নেই অতি প্রাচীন বিদ্যা । সম্মোহন করে ওষুধ ছাড়াই অনেক রকম থেরাপি দিয়ে রোগীকে সুস্থ করা যায় । সম্মোহিত ব্যক্তিকে যা বলা হবে মনে প্রাণে সেটাই বিশ্বাস করবে সে । সম্মোহিত করে এক লোকের হাতে তামার একটা পয়সা চেপে বলা হয়েছিল জিনিসটা কয়লার মত গরম । কি হয়েছিল জানেন ?'
'কি হয়েছিল ?' প্রায় সবাই প্রশ্ন করলো । এক সাথেই। যেন ক্লাসের লেকচার।
‘ সম্মোহিত লোকটার হাতে ফোস্কা পরে গিয়েছিল ।' মুচকি হেসে বললেন লতিফ সরকার । ' আমি যখন কাউকে সম্মোহিত করতে যাই খেয়াল করে দেখি , বেশির ভাগ সময় সাবজেক্ট খামখাই ভয় পেয়ে যায় । নব্বই ভাগ মানুষের মনে সম্মোহন নিয়ে মারাত্নক ভয় কাজ করে । মুভি সিনেমা দেখে মানুষের ধারনা ধারনা হয়েছে সম্মোহিত হলে তার ইচ্ছাশক্তি লোপ পেয়ে যায়। তখন বেচারাকে দিয়ে যা খুশি করিয়ে নেয়া যেতে পারে ।’
একটু থেমে শ্রোতাদের ভাব সাব বুঝে বলতে লাগলেন , ‘ প্যারাসাইকলোজির ক্লাস নেয়ার সময়, ছাত্র ছাত্রীদের মধ্য থেকে ভলান্টিয়ার হিসাবে কাউকে ডাকতাম । সম্মোহিত করার জন্য আরকি । ওদের ভয়ার্ত চেহারা দেখে মায়াই লাগত । আসলে কি জানেন , কেউ যদি বুক ঠুকে বলে আমাকে সম্মোহিত করা যাবে না, বা কেউ যদি না চায় তবে তাকে কখনই সম্মোহিত করা যাবে না। একদম অসম্ভব কাজ ।'
'আপনি কি এই মুহূর্তে আমাকে সম্মোহিত করতে পারবেন ?' আসর জমানোর মত একটা ভাব করে বলে উঠলো ফিরোজা বেগম ।
এক কদম সামনে এগিয়ে গিয়ে ঝুঁকে খানিকটা নাটকীয় ভঙ্গিতে লতিফ সরকার জানতে চাইলেন , ' আপনি চাইলে অবশ্যই পারব । চান ?'
মাথা নেড়ে কৃত্রিম ভয় পাওয়ার ভান করে ফিরোজা বেগম জবাব দিল , ' না , চাই না।'
বাকি সবাই হেসে ফেলল ।
বাদ গেল না ফিরোজা বেগমও ।
‘ দেখলেন সবাই ?' সবজান্তা মার্কা একটা হাসি হেসে বলে উঠলেন লতিফ সরকার । ' অজানা ভয় সবচেয়ে বড় ভয় । সবাই ভাবে সম্মোহন করলে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে অন্যের কব্জায় চলে যাবে । হ্যাহ হ্যাহ ।'
‘ ভাবীর সাহস আছে ?' কৌতূহল না কেমন যেন উস্কানিমূলক গলায় বলে ফেলল মুনীর হোসেন । ' চেষ্টা করবেন না কি ?'
‘ উম্ম মনে হয় না ।' মুচকি হাসি দেখা গেল বিলকিসের ঠোঁটে । ' শুনেছি সম্মোহন করলে সম্মোহিত ব্যক্তির মনের গোপন যত কথা আছে সব বের হয়ে আসে । ওটাই ভয় পাই আমি । একান্ত গোপনীয় বলতে কিছু থাকে না ।'
‘ গোপনীয় কিছু আছে নাকি ভাবীর জীবনে ?' মুনীর হোসেন রসিকতার ছলে বললেও , এটাও একটা ফাঁদ ।
'কে জানে !' এখনও হাসছে বিলকিস । ' শুনেছি সবার মধ্যেই গোপন করার মত কিছু থাকে ।'
'আর আখতারের সামনে সেইসব বলে ফেললে তো শেষ ।' তালে তাল মিলিয়ে হাসছে মুনীর ।
‘ আচ্ছা ! এই প্রথম কথা বললেন আখতার চৌধুরী । হাতে পানপাত্র । ভেতরে তৃণমণি রঙের পানীয় । নরম চোখে চেয়ে আছেন গিন্নির দিকে , ' পরীক্ষা করে দেখবে না কি ?'
লতিফ সরকারের দিকে চেয়ে কৌতূহলী প্রশ্ন করলো বিলকিস , ' আপনার কী মনে হয় লতিফ সাহেব ।'
'সব ঝুঁকি আপনার ।' দুই হাত উল্টে কেমন একটা ভঙ্গী করলেন লতিফ সরকার । হাল ছেড়ে দিলে মানুষ অমন করে । ' তবে এটা সত্য, সম্মোহিত অবস্থায় মানুষ সত্য কথা বলে । অনেক পুরানো দিনের কথাও মনে করতে পারে । অবচেতন মনের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে সব গোপন কথা ।'
'আচ্ছা ? ঝুঁকিটা আমি নিচ্ছি ।' স্বামীর দিকে মায়াবী চোখে চেয়ে উত্তর দিল বিলকিস । ‘ কি ভাবে শুরু করছি আমরা ?'
প্রশ্নটা লতিফ সরকারকে করা ।
‘ আচ্ছা, ভাল কথা ।' পেয়ালাটা বইয়ের আলমারির পাশে রেখে সামনে এগিয়ে এলেন ভদ্রলোক । ' আপনি যদি সিরিয়াস হয়েই থাকেন । তবে প্রথমেই দরকার আরামদায়ক একটা চেয়ার সেটাও আবার আলোর পাশে ।‘
চারিদিকে চেয়ে বললেন , ' ওই যে ওই সাইড টেবিলের পাশের চেয়ারটা মনে হয় বেশ উপযুক্ত । আরাম কেদারা মার্কা ভাব আছে । টেবিলের উপর আবার পুরানো ধাঁচের অ্যানটিক টেবিল ল্যাম্প । সব মিলিয়ে সেরা জায়গা । চলুন ।'
সবাই বেশ হই হই করে উঠে টেবিলটার সামনে চলে গেল ।
আহামরি কিছু না । কাঠের গোল টেবিল । তেঁতুল দানার রঙের বার্নিশ । উপরে কাঁচ । টেবিলের উপর গোলাকার বেলুন টাইপের টেবিলল্যাম্প । কাচটা ঘোলাটে । ঘষা নরম আলো দেয় । ডিজাইনই অমন মনে হয় কুয়াশা লেগে ঘোলা হয়ে গেছে । মাঘ মাসে শহরতলির বাড়ি ঘরের জানালার শার্সি ঘেমে অমন দেখায় ।
পাশে আরামকেদারা । আগের দিনে বুড়ো মানুষেরা বারান্দা বা বাগানে অমন চেয়ারে বসে ঝিম ঝিম করতো ।
বিলকিস বসে পড়লো ।
বাকি সবাই নানান জায়গা থেকে চেয়ার যোগাড় করে গোল করে সাজিয়ে বসে পড়লো ।
রোমাঞ্চের স্বাদ পাচ্ছে সবাই ।
কি হয় ! কি হয় ! ভাব ।
‘ আরাম করে বসেছেন ?' হাসি মুখে প্রশ্ন করলেন লতিফ সরকার ।
'হু ।' মাথা ঝাঁকালো বিলকিস ।
' শরীরের পেশি ঢিল করে দিন ।'
'আচ্ছা।'
টেবিলল্যাম্পটা সামনে ঠেলে নিলেন তিনি ।
'এখন আমি চাই , সব চিন্তা বাদ দিয়ে এই টেবিলল্যাম্পের কাচের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। শুধু চেয়ে থাকবেন । আর কিছু না। অন্য কোন চিন্তা আপনার মনের ভেতরে আসবে না। শুধু আমার কথা শুনবেন । আর কিছু না । '
কামরার সবাই অবাক হয়ে খেয়াল করলো মুহূর্তেই লতিফ সরকারের গলার স্বর কেমন বদলে গেছে । খানিক আগের জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বর এখন বদলে গিয়ে কেমন ফিসফিস রহস্যময় শোনাচ্ছে ।যেন অচেনা কেউ ।
টেবিলল্যাম্পের আলো গিয়ে পড়ছে তার মুখের উপর । কেমন রক্তশূন্য আর অপার্থিব সেই মুখ । চোখ হয়ে গেছে বড় বড় । জ্বলজ্বলে । চুমকির মত ঝিঁকিমিকি করছে দুই চোখ ।
' শুধু আলোর দিকে চেয়ে থাকুন । এই নরম হলুদ আলো ছাড়া আর কিচ্ছু নেই কোথাও । নরম হলুদ আলো । আপনি হারিয়ে যাচ্ছেন । নরম হলুদ আলোতে …। '
ফিসফিস করে বলে যাচ্ছেন লতিফ সরকার । ' পতঙ্গ যেমন আলোর আহ্বান থেকে পালাতে পারে না। আপনিও পারবেন না। নরম হলুদ আলো । হারিয়ে যাচ্ছেন আপনি । ঘুম আসবে না । কিন্তু তন্দ্রা গ্রাস করে নেবে আপনাকে । ধীরে ধীরে । গ্রাস করে নেবে । আমার কণ্ঠ ছাড়া আর কিছু শুনতে পারবেন না।
‘ ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকান । হয়েছে । আপনি মহাকালের অতল শূন্যে হারিয়ে গেছেন । ধীরে ...ধীরে ...ধীরে । এই মুহূর্তে এই কামরায় নেই আপনি । চলে গেছেন সময়ের আর মহাকালের বাইরে । আপনি মুক্ত । এই মুহূর্তে মাত্র তিনটে জিনিস আছে এই মহাবিশ্বে । আপনি , এই হলুদ আলো আর আমার কণ্ঠস্বর । আপনি কী আমার কথা শুনতে পারছেন ?' '
খানিক চুপচাপ ।
অনেক ধীরে ঘুম ঘুম গলায় বিলকিস জবাব দিল , ' হ্যাঁ ।'
ওর চেহারায় কোন ভাব নেই ।
‘ ভাল ।' নরম গলায় জবাব দিলেন লতিফ সরকার । উনার চোখ জ্বলছে চিতার চোখের মত । ' খুব ভাল । আমরা এখন এই মহাবিশ্বে একা । আর কেউ নেই । কোথাও নেই। এখন আমি যা জিজ্ঞেস করব আপনাকে , আপনি একদম সত্যি সত্যি উত্তর দেবেন । একদম সত্যি উত্তর । মিথ্যা বলতেই পারবেন না। আপনি কি রাজি ?'
আগের মত ঘুম ঘুম তন্দ্রার চোখে বিলকিস জবাব দিল , ' দেব ।'
কামরার ভেতরে উত্তেজনা বেড়ে গেছে ।
উত্তেজনা সহ্য করতে না পেরে ফিরোজা বেগম ফিসফিস করে জানতে চাইলেন , ' তারমানে বিলকিস ভাবি সম্মোহিত হয়ে গেছে ? বিশ্বাসই হচ্ছে না । একদম সিনেমার মত । '
‘ আপনি নিজেই উনার সাথে কথা বলুন । ' শান্ত রহস্যময় গলায় বললেন লতিফ সরকার ।
‘ বিলকিস ভাবি । ভাবি আমার কথা শুনতে পারছেন ? বিলকিস ভাবি ...।' আগ্রহের চোটে খানিক সামনে ঝুঁকে গেল ফিরোজা । '
কোন ভাব নেই বিলকিসের চেহারায় । পাথরের মত বসে আছে ।
‘ উনি আপনার কথা শুনতে পাচ্ছেন না। এমনকি আপনাকে দেখতেও পাচ্ছেন না।' কেমন রহস্যময় হাসি ফুটে আছে লতিফ সরকারের ঠোঁটে ।
সন্দেহ নেই অনুষ্ঠানটা উপভোগ করছেন তিনি ।
খানিক সামনে গিয়ে বিলকিসের হাত ধরল আখতার চৌধুরী । ' বিলকিস , শুনতে পারছ আমার কথা । ওয়েক আপ ।'
আগের মতই বসে আছে বিলকিস ।
চেহারায় কোন রকম ভাব নেই । পাথর ।
' আমার মনে হয় না উনি আপনার কথা শুনতে পারছেন । এমন কি আপনার স্পর্শ, সেটাও অনুভব করছেন না । ' আগের মতই গম্ভীর লতিফ সরকার । ' ঠিক আছে ম্যাডাম বিলকিস । সময় সুরঙ্গে আপনি পিছনে যেতে থাকুন । অতীতে । আপনার ফেলে আসা অতীতে আপনি ফিরে যান । অনুভব করুন কিশোরী বেলা। আরও আগে গিয়ে ঠিক নয় বছর বয়সে চলে যান । কোন ইশকুলে পড়তেন তখন ?'
সবাই বিলকিসের চেহারায় পরিবর্তন দেখতে পেল ।
পাথুরে চেহারা থেকে সেটা উজ্জ্বল প্রাণবন্ত হয়ে গেল । চেহারায় খুশির আভা । ছোট খুকির মত ঘাড় কাত করে জবাব দিল , 'বিবি মরিয়ম বালিকা বিদ্যালয় ।'
থতমত খেয়ে গেল আখতার চৌধুরী । তিনি জানেন , গিন্নি ওখানে পড়তো ।
' কি পড়ছেন আপনি ?' একঘেয়ে শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করেই যাচ্ছেন লতিফ সরকার ।
'পড়ছি , লিখছি , অংক আর ড্রয়িং ।' বিলকিসের গলা খুশি খুশি ।
‘ বড় হয়ে কি করতে চান ?'
খানিক চিন্তা করে বিলকিস জবাব দিল , ' বিয়ে করতে চাই ।'
সবাই হেসে ফেলল ।
‘ এবার সময়ে হেঁটে বর্তমানে চলে আসুন । আজকের দিনে না। ধরুন পাঁচ বছর আগে । আপনার বিয়ে হয়েছে আখতার চৌধুরী নামে এক ধনী ব্যবসায়ীর সাথে । আপনার নাম এখন বিলকিস চৌধুরী ।'
খানিক থমকে গেল বিলকিস । কেমন ধরা গলায় বলল , ' আমার নাম রত্না । বিলকিস না । '
কামরায় সবাই জমে গেল ।
'আপনি বিলকিস না ?' সতর্ক গলা লতিফ সরকারের । ' কি নাম আপনার ?'
'রত্না হক ।'
‘ কি বলছে এই সব ?' চাপা আর্তনাদ করে উঠলেন আখতার চৌধুরী ।
ঠোঁটের উপর তর্জনী থেকে শশশ করে থামিয়ে দিলেন লতিফ সরকার । ' রত্না, আপনি থাকেন কোথায় ?'
' একুশ বাই এক গুলজার সড়ক , হক ভিলা । ভবানীগঞ্জ ।' বিলকিসের উত্তর ।
'এটা কত সাল চলছে রত্না ?'
'উনিশ শো তেপ্পান্ন । গত বছর ভাষা আন্দোলনের সময় আমার ছোট ভাইটা মারা গেছে । ' বিলকিসের করুন চেহারা ।
‘ এইসব কি ? অ্যা ?' ঢোক গিলল মুনীর চৌধুরী । ‘ কি এই সব ? হায় খোদা ।‘
‘ চুপ করুন ।' খেঁকিয়ে উঠলেন লতিফ সরকার । ' রত্না আপনি ভবানীগঞ্জের হক ভিলায় থাকেন তাই না ? এবং এটা উনিশো তেপ্পান্ন সাল । ঠিক ? তো আপনি কি বিবাহিতা ? স্বামী কি করেন ? কে উনি ?'
‘ আমি বলতে চাই না ।' চাপা উত্তেজনা দেখা দিল বিলকিসের গলায় ।
‘ অন্য কিছু জিজ্ঞেস করি ? আপনার বাড়ির সামনে কি আছে ?'
'নদী আছে । রোজ রাতে ইস্টিমারের শব্দ পাই । পাশে একটা মন্দির। রামসীতা মন্দির । সন্ধ্যায় আরতি হয় । '
‘ কি করেন আপনি ?'
‘ একটা টিয়া পাখি আছে । ছোলা খাওয়াই ।
‘ বাড়ির সামনে কোন বাগান আছে ?'
‘ আছে , অনেক বড় বাগান । গাঁদা ফুল আর হাস্নাহেনা ভর্তি । '
‘ আপনার বাগানটা আমাকে দেখাতে পারবেন ?'
‘ পারব ।' বলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো বিলকিস । ঘুম ঘুম চোখে হেঁটে গেল জানালার দিকে । ' দেখুন বাইরে আমার বাগান । ভরা পূর্ণিমার রাতে কি সুন্দর লাগে । নতুন চারা এনেছি বার্মা থেকে । ওই যে উল্টা দিকে বড় রাস্তা চলে গেছে রানির বাজারে ।'
হেঁটে কামরার এক কোনে চলে গেল বিলকিস ।
সামনে টেবিল । উপরে সাজানো নীল রঙের পুরানো আমলের রোটারি ডায়াল টেলিফোন । খবরের কাগজ । পাশে বেতের ঝুড়ি ভর্তি আপেল । সাথে একটা চাকু ।
'এখানে দাঁড়িয়ে কাজ করছিলাম আমি।' ফিসফিস করে বলল বিলকিস । আমার স্বামী সিরাজুল হক মনে করেছে আমি কিছুই জানি না। আচমকা চলে আসতেই দেখি চাকরানীর সাথে প্রেম করছে । আমাকে দেখতে পায়নি। তখন আমার জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম ।'
আচমকা উত্তেজিত হয়ে চাকুটা তুলে নিল বিলকিস । ‘ আমার স্বামীর পিঠে চাকুটা ঢুকিয়ে দিলাম ।‘
কথা শেষ করেই চাকুটা তুলে এনে গায়ের সর্ব শক্তি দিয়ে ফলাটা ঢুকিয়ে দিল আখতারের পিঠে ।
মরণ চিৎকার দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন আখতার চৌধুরী ।
খসে গেছে হাত থেকে কাচের পানপাত্র । শব্দ করে ভাঙ্গল সেটা ।
ব্যাথায় চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে উবু হয়ে পড়ে গেলেন কার্পেটের উপর ।
দৌড়ে গিয়ে লতিফ সরকার আর মুনীর চৌধুরী হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো দুই পাশে ।
খানিক ছটফট করলেন আখতার চৌধুরী । কার্পেট আঁকড়ে ধরে উঠার চেষ্টা করলেন । পারলেন না ।
নিয়তি আর কাকে বলে !
মারা গেলেন আখতার চৌধুরী ।
তারই ড্রয়িঙ রুমের আড্ডায় । তারই স্ত্রীর হাতে । প্রিয় মানুষদের সামনে ।
তখনও হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে বিলকিস ।
তিন মাস পর ।
ড্রয়িং রুমে বসে ব্যবসার কাগজপত্র দেখছিল বিলকিস ।
জামিনে বের হয়ে এসেছে ।
এই তিন মাস খুব ধকল গেছে । শহরের সব জায়গায় , বাসে- ট্রেনে- ফুটপাথের চায়ের দোকানে , সব জায়গায় আখতার চৌধুরীর নাটকীয় মৃত্যু নিয়ে আলোচনা , সমালোচনা , বিতর্ক হয়ে এসেছে ।
আদালতের রায় দেয়ার আগেই মানুষ পক্ষ বিপক্ষ নিয়ে গরম করে ফেলেছে পরিবেশ ।
তদন্ত চলছে ।
বিষয়টা জটিল এবং নাটকীয়। অমন অদ্ভুত ধরনের মামলা আদালতে এই প্রথম । কাজেই কে জানে কতদিন লাগবে ।
দারোয়ান লেবু মিয়া এসে সালাম ঠুকে জানালো, ' ম্যাডাম , লতিফ সরকার সাহেব এসেছেন । আপনার সাথে দেখা করতে চান ।'
‘ ভেতরে আসতে বল উনাকে ।' ম্লান মুখে জবাব দিল বিলকিস ।
খানিক পরেই হাসিমুখে ভেতরে চলে এলেন লতিফ সরকার । বেশ চনমন করা ভাব উনার আচরণে , ' হ্যালো মিসেস বিলকিস । আশা করছি বিরক্ত করছি না আপনাকে ? আপনার উপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে । তাই দেখা না করে পারলাম না। '
' বসুন।' ভাবাবেগ বর্জিত কণ্ঠ বিলকিসের ।
'আপনি কিছু মনে না করলে আমি কি একটা ড্রিঙ্ক নিতে পারি ?' দেয়ালের মিনি বারের দিকে ইঙ্গিত করলেন লতিফ সরকার ।
তারপর অনুমতির তোয়াক্কা না করেই এগিয়ে গিয়ে স্নিফটার গ্লাস নিয়ে আপেলের সৌরভওয়ালা ক্যালভাদোস ঢেলে নিলেন ইঞ্চিখানেকের মত ।
' আর বলবেন না। ' গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে উৎফুল্ল গলায় বললেন তিনি , ' আপনি যখন পুলিশের হেফাজতে ছিলেন তখন আমি আর আপনার উকিল সাধন হাওলাদার মিলে ভবানীগঞ্জে গিয়েছিলাম । আর খোঁজ নিতেই অদ্ভুত ঘটনা সামনে চলে এলো । আপনার উকিল সাধন হাওলাদার বলেনি আপনাকে ?'
‘ না বলেনি ।কি সেটা ?'
‘ ভবানীগঞ্জের সেই ঠিকানায় হক ভিলা আজও আছে । সেখানে রত্না হক নামে একজন সত্যিই ছিল । অনেক আগের কথা। এবং সত্যি সত্যি সেই রত্না হক উনার স্বামীকে ছুরি মেরে খুন করেছিলেন । চাকরানী সাক্ষী দিয়েছিল । পুলিশ রত্না হককে গ্রেফতার করেছিল । কিন্তু জেলের ভেতরে আত্নহত্যা করে মেয়েটা ।'
'এই মুহূর্তে এই সব গল্প বলার কারণটা কি শুনি ?' সামান্য সময় চুপ থেকে খানিক কর্কশ গলায় প্রশ্ন করলো বিলকিস ।
‘ আপনি বলতে চাইছেন এইসব ঘটনার কিছুই আপনি জানেন না ?' খুব অবাক হয়েছেন অমন একটা মুখের ভঙ্গী করে বললেন লতিফ সরকার ।
'একেবারে খেজুরে আলাপ করার জন্য আপনি আমার বাড়িতে এসেছেন সেটা আমি বিশ্বাস করি না। আপনার কথায় বুঝা যাচ্ছে আপনি কোন মতলবে এসেছেন ।' বিলকিসের কাটা কাটা গলা ।
'তা তো বটেই ।' অমায়িক হাসি হেসে পচা গুঁড়ের রঙা পানীয়তে চুমুক দিলেন লাতিফ সরকার । ভাল মানুষী ভাবটা নেই চেহারায় । ' আমি আসলে পুরো ঘটনার শেষ পর্যন্ত আপনার সাথে থাকতে চাই ।'
‘ ঘটনার শেষ পর্যন্ত ! মানে কি ?’ অবাক হয়ে গেছে বিলকিস ।
' দেখুন খামাখা বোকার মত ভান করছেন আপনি । আমাকে এই মুহূর্তে আপনার সব চেয়ে বেশি দরকার ।'
‘ আপনাকে ? কেন ?’
‘অযথাই তর্ক করবেন না মিসেস বিলকিস, প্লিজ । আমিই হিপনোটিশ মনে নেই ? একজন পেশাদারি দক্ষ সম্মোহনকারী । আমি যদি সাক্ষী দেই , ঘটনায় আপনার কোন হাত নেই। নিছক একটা দুঃখজনক দুর্ঘটনা ওটা। আসলেও অবচেতন মনের প্ররোচনার জন্য হয়েছে অমনটা , সেটা কতো ভাল হবে না ? নইলে দেখুন এই স্বামী হত্যার জন্য আপনার ফাঁসী পর্যন্ত হতে পারে । আজীবন জেল তো ডাল ভাত। তো আমার সাথে যদি আপনি সামান্য চুক্তি করেন । আখেরে মালাই আপনি ভালই...।'
‘ ব্ল্যাকমেইল করতে চাইছেন আমাকে ?' লাফ দিয়ে সোফা থেকে উঠে গেল বিলকিস । রাগে দুই চোখ ড্রাগনের চোখের মত হয়ে গেছে ।
' অনেকটা ও রকমই । বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করুন ম্যাডাম । একমাত্র আমি আপনার গল্প সত্য প্রমাণ করতে পারব । সবাই বিশ্বাস করবে । খুনটা আপনি করেননি । আমার বক্তব্য সবাই গ্রহণ করবে। সেই রকম সামাজিক অবস্থান আর মর্যাদা আছে আমার । নইলে ভাবুন । এই সব সম্পত্তি বারো ভুতে খাবে। আপনি থাকবেন জেলে। ফাঁসির কথাটা মন থেকে ফেলে দেয়া ঠিক না।'
কয়েক মুহূর্ত শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বিলকিস ।
দরজার সামনে দুই কদম এগিয়ে চেঁচাল , ' লেবু। লেবু মিয়া ।'
আড়ালেই ছিল মিস্টার লেমন । ' জি ম্যাডাম ?'
‘ লতিফ সাহেবকে বাড়ি বের হওয়ার দরজা দেখিয়ে দাও ।' চিবিয়ে চিবিয়ে বলল বিলকিস ।
তখনও হাসিমুখে পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন লতিফ সরকার ।
চেঁচিয়ে উঠলো বিলকিস , ' গেট আউট মিস্টার । জীবনেও আমার বাড়ির ভেতরে পা রাখবেন না। গেট আউট ।'
'কাজটা ভাল করলেন না।' এখনও খোশ মেজাজে আছেন ভদ্রলোক । হাসছেন বেহায়ার মত ।
পরের মাস।
জর্জ আব্দুল্লাহ এনাম রাউ বসে আছেন চেয়ার দখল করে।
মোটা মানুষ । চেহারা প্রায় বাঘের মত । শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরায় বসেও ঘামছেন । দামি ক্যান্ডি স্টেইপ জামার বগল ঘেমে হাস্যকর দেখাচ্ছে। দেশের সবাই এক নামে চেনে তাকে । রায়ের জন্য অপেক্ষায় থাকা আসামীরা যমের মত ভয় পায় । সামান্য কারনে ফাঁসির রায় দিয়ে বসে, অমন গুজব আছে বাজারে। যদিও উনার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ সেটা বলতে পারবে না।
উনার বাসায় ঘরোয়া একটা আসর বসেছে ।
বেশ লোকজন ।
আছে বিলকিস , মুনীর চৌধুরী , ফিরোজা বেগম । আরও আছেন অধ্যাপক লতিফ সরকার । ক্রাইম ব্রাঞ্চের দুঁদে অফিসার গাউস চৌধুরী । ক্রাইম রিপোর্টার সুধাময় কর । সরকারী পক্ষের উকিল সৈয়দ কবির । বিলকিসের উকিল সাধন হাওলাদার । দুইজন কনস্টেবল । এবং আরও বেশ কয়েকজন মান্যগণ্য লোক।
গলা খাঁকারি দিয়ে বলা শুরু করলেন আব্দুল্লাহ এনাম রাউ , ' ব্যাপারটা আসলেও জটিল ।আমার জীবনে হাজার কেস দেখেছি । কিন্তু অমন সম্মোহিত অবস্থায় কাউকে খুন করা ? নাহ একদম প্রথম । আমি আদালতের বাইরে ব্যাক্তিগত ভাবে জিনিসটা আপনাদের সামনে তদন্ত করতে চাই। কারণ লোক হাসাতে পছন্দ করি না আমি। মৃত আখতার চৌধুরী আমার বন্ধুর ছেলে ছিল । ছোট বেলা থেকেই ওকে আমি চিনতাম । তাই পুরো ব্যাপারটায় আগ্রহ আমার অনেক বেশি ।'
সামান্য থেমে সবার মুখের ভাব দেখলেন ।
সবাই চুপ ।
সামনে রাখা ফাইল থেকে কাগজ তুলে বাড়িয়ে দিলেন তার ব্যক্তিগত আর্দালি রুহুল আমিনের হাতে । আমিন সেটা নিয়ে পড়া শুরু করলো , ' এই বছর মার্চের তেরো তারিখে নিজের বাড়িতে ছুরির আঘাতে মারা যান শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আখতার চৌধুরী । মারা যাওয়ার সময় রাত আটটা পনের থেকে ষোল মিনিট । ডাক্তার সিকান্দার বিল্লাহ মৃত দেহ পরীক্ষা করে ডেথ সার্টিফিকেট প্রদান করেন । ডেথ সার্টিফিকেটে উনি সাইন করেন সেই রাতে, সময় একটা এগারোতে ।'
হর হর করে আরও অনেক কথা বলে গেল আর্দালি ।টানা তিন মিনিটের বেশি লাগল ।
শেষ হতেই আব্দুল্লাহ এনাম রাউ গম্ভীর মুখে লতিফ সরকারের দিকে ফিরে বললেন , 'জনাব লতিফ সাহেব আপনার বিবৃতি আমি পড়েছি । যা আমার বোধের বাইরে । কিছুটা যুক্তি আর ইয়ে কি বলে আইনের আওতার বাইরে বোধ হয় । আপনি ঘটনা স্থলে ছিলেন একজন মেটাফিজিকশিয়ান হিসাবে । বাংলায় যাকে বলে একজন অধিবিদ্যাবিদ , তো আপনার কথা হিসাবে সেই সময় বিলকিসের ভেতরে মৃতা রত্না হকের চিন্তা চেতনা অনুপ্রবেশ করেছিল তাই তো ? এটা কি সম্ভব ?'
' শুধু সম্ভবই না । এটা একদম সাধারণ একটা ব্যাপার ।' বেশ একটা পেশাদারী ভাব নিয়ে বলা শুরু করলেন লতিফ সরকার । ' আমার ক্যারিয়ারে অমন অনেক মানুষ দেখেছি সম্মোহিত অবস্থায় অমন সব কাণ্ড করে যুক্তি দিয়ে সেটার ব্যাখা সম্ভব না। একবার পরিচিত একজনের ভেতরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মা পর্যন্ত চলে এসেছিল । এখন আপনি আত্মা শব্দটার প্রতি আপত্তি দেখালে বলতে পারেন তার চিন্তা চেতনার প্রবেশ । এমন অনেক মানুষ পেয়েছি সম্মোহিত অবস্থায় দাবি করেছে সে মঙ্গল গ্রহ থেকে এসেছে । বর্ণনা দিয়েছে তার বিচিত্র জীবন যাপনের । বিদঘুটে লাগলেও এটাও বিজ্ঞান । আপনাদের বোধের বাইরে ।'
ক্রাইম ব্রাঞ্চের দুঁদে অফিসার গাউস চৌধুরী উসখুস করছিলেন । শেষে থাকতে না পেরে জর্জ আব্দুল্লাহ এনাম রাউ -এর দিকে চেয়ে বললেন , ' স্যার আপনি অনুমতি দিলে আমি সাক্ষী লতিফ সরকারকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই ।'
‘ অনুমতি দেয়া হল ।' জলদ গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলেন জর্জ ।
উঠে দাঁড়িয়ে লতিফ সরকারের সমনে চলে গেলেন গাউস চৌধুরী। উনার হাতেও কয়েকটা কাগজ । সেইসব দেখে বলতে লাগলেন , ' জনাব লতিফ , আপনার সুবিশাল জীবনের হরেক অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনার আগে আপনাকে বলতে চাই , বছর দশেক আগে গুলশান থানায় আপনার নামে একটা অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল । মোখলেসুর রহমান নামে এক ভদ্রলোক আপনার নামে প্রতারণা আর অসৎ আচরণের অভিযোগে মামলা করেন ।'
সামান্য চঞ্চল হয়ে উঠলেন লতিফ সরকার । রাগি গলায় জবাব দিলেন , ' মিথ্যা অভিযোগ । প্রমাণ হয়নি সেটা । আমি পেশাদারী ভাবেই কাজ করেছিলাম ।'
'হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে প্রমাণ আছে , আমি সবার সামনে প্রমাণ করে দিতে পারব আপনি সম্মোহনের কিছুই জানেন না। খামাখাই বিজ্ঞ একজন মানুষ সেজে সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন । দেশের সবচেয়ে সফল সম্মোহন কারী ব্যক্তি হিসাবে গত চল্লিশ বছর ধরে খ্যাতি উপভোগ করছেন। কিন্তু আসলেও কিছু জানেন না । এবং সেইদিন বিলকিস যখন তার স্বামীকে চাকু দিয়ে খুন করে তখন ভদ্রমহিলা মোটেও সম্মোহিত অবস্থায় ছিল না। '
' কথা সত্য নয় ।' রেগে গেলেন লতিফ সরকার । ' উনি তখন সম্মোহিত অবস্থায় ছিলেন । আমি নিজে উনাকে সম্মোহন করেছি । '
' আপনি তো আর নিজের দোষ স্বীকার করবেন না , সেটাই স্বাভাবিক।' কাগজগুলো জর্জের টেবিলের উপর রেখে গাউস চৌধুরী বললেন , ' এই লোক সম্মোহনের কিছুই জানে না। সম্মোহন নিয়ে বাজারে ছয় সাতটা বই আছে উনার। সেইসব বই ভাড়াটে লেখকরা সামান্য মজুরির বিনিময়ে উনাকে লিখে দিয়েছে । আমি চাই উনাকে নিয়ে তদন্ত করা হোক , এই হচ্ছে উনার পুলিশ রিপোর্ট । উনার নামেও মামলা করার ব্যবস্থা আমি নিজে করব ।'
কামরার ভেতরে সবাই গুঞ্জন করে উঠলো ।
হায় হায় !
ঘটনা কোন দিকে যাচ্ছে ?
‘ থামুন।' লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন লতিফ সরকার । ' যা জানেন না তা নিয়ে বড় বড় কথা বলবেন না। সম্মোহন নিয়ে আমার চেয়ে ভাল আর কেউ জানে না। আগেই বলেছি এই বিদ্যা আপনাদের আইনের বিদ্যার মত মুখস্ত কিছু না। এই ভদ্রমহিলা বিলকিস সেই রাতে সম্মোহিত অবস্থায় ছিলেন । একশো ভাগ নিশ্চিত আমি । আপনারা যদি বিশ্বাস না করেন , তবে এই মুহূর্তে এই কামরায় সবার সামনে আমি আবার মিসেস বিলকিসকে সম্মোহিত করতে পারব । অবশ্যই উনি যদি অনুমতি দেন আমাকে ।'
'ওয়েল । আমার মনে হয় না বিলকিস রাজি হবে ...।' মাথা নেড়ে জবাব দিলেন জর্জ এনাম রাউ ।
'আমার আপত্তি নেই ।' নরম গলায় এই প্রথম কথা বলল বিলকিস । ' আমাকে কি করতে হবে বলুন লতিফ সাহেব ?'
সন্দেহ নেই, সবাই বিনা পয়সায় নাটক দেখার লোভে নড়ে চড়ে বসলো ।
'ঠিক আছে , আপনি কামরার ওই কোনার চেয়ারটায় বসুন। আর দয়া করে সবাই একটু চুপচাপ থাকুন। কোন রকম শব্দ করবেন না।' কড়া গলায় উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বললেন লতিফ সরকার ।
দেখিয়ে দেয়া চেয়ারে গিয়ে বসলো বিলকিস।
সবাই চুপচাপ হয়ে গেছে ।
এদের মধ্যে কেউই এর আগে বাস্তবে সম্মোহন করতে বা হতে দেখেনি । সবার দৌড় টিভি-- সিনেমা বা কল্প উপন্যাসের পাতা পর্যন্ত ।
বিলকিসের মুখের উপর ঝুঁকে পড়লেন লতিফ সরকার । পকেট থেকে বের করে এনেছেন ইঞ্চি তিনের মত লম্বা একটা টর্চ লাইট । ' আপনার বাসার ড্রয়িং রুমের সেই আলোটার কথা মনে আছে ?'
'আছে ।'
টর্চটা জ্বেলে আলো ফেললেন বিলকিসের চোখে । ' এই আলোর ভেতরে আপনার মনোযোগ ঢেলে দিন । নরম , স্থির অতল আলো । উষ্ণ আলো । উজ্জ্বল এই আলোতে আপনি ভেসে যাচ্ছেন দূরে কোথাও। সময়ের বাইরে। সীমানার বাইরে । আপনি মুক্ত। এই কামরার মধ্যে আপনি বন্দি নেই । চলে গেছেন মহাকালের বাইরে । আপনি , এই উজ্জ্বল আলো আর আমার কণ্ঠস্বর ছাড়া আর কিছু নেই জগতে ।'
কেমন একঘেয়ে সুরে বলে যাচ্ছেন লতিফ সরকার । আর ঘুমঘুম তন্দ্রা হয়ে যাচ্ছে বিলকিসের চেহারা ।
'আপনি কি আমার কথা শুনতে পারছেন ?' রহস্যময় ফিসফিসে শোনাচ্ছে লতিফ সরকারের কণ্ঠ ।
'হ্যাঁ।‘ ঘুমঘুম আমেজ বিলকিসের কণ্ঠ ।
' ফিরে যান সময়ের বাইরে। ফিরে যান অতীতে । পিছনে। কি নাম আপনার ?'
'আমার নাম রত্না ।' ফিসফিস করে জবাব দিল বিলকিস । শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সামনে । কিন্তু কিছু দেখছে না। ' আমি বাগান পছন্দ করি । ভবানী গঞ্জে আমার বাড়ি । ওই যে আমার বাগান । আমার বাগানের ছাতিম গাছ । কি মিষ্টি সৌরভ। গোলাপের চারা আনাব সামনের মাসে। এই এইখানে দাঁড়িয়ে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ।'
সবাই চোখ বড় বড় করে দেখছে এইসব অশৈলী নাটক ।
বিলকিসের চোখে টর্চের উজ্জ্বল আলো ফেললেন লতিফ সরকার ।
চোখের পাতা পড়ছে না। মণি নড়ছে না। স্থির। অচঞ্চল ।
ঝট করে সোজা হলেন লতিফ সরকার । গট গট করে হেঁটে গিয়ে দাঁড়ালেন জর্জ এনাম রাউয়ের সামনে , ' আমি একশো ভাব গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি বিলকিস এখন গভীর ভাবে সম্মোহিত । এখন আপনার দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ডাক্তার এনে দেখাতে পারেন। পরীক্ষা করতে পারেন সত্য কি না। এই মুহূর্তে বিলকিসের চিন্তা চেতনা বলতে কিচ্ছু নেই ওর ভেতরে । নড়াচড়া করতে পারবে না । সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না । কিন্তু কোন ভাবে উনি রত্নার ঘটনাটা জানেন । সেটা প্রবল রেখাপাত করেছে উনার অবচেতন মনে। সম্মোহিত অবস্থায় উনি রত্নার চিন্তা চেতনা দিয়ে চালিত হন ।'
ঘুম ঘুম চোখে উঠে দাঁড়ালো বিলকিস। এগিয়ে এলো কয়েক পা ।
আধো আধো বোলে তন্দ্রা জড়ানো গলায় বলল, ' আমি দোতলায় উঠেই চাকুটা পাই। ওটা তুলে নিয়ে আমার স্বামীকে খুন করি ।'
বলা শেষ করেই জর্জ এনাম রাউয়ের টেবিল থেকে পেপার নাইফটা তুলে নিয়ে গায়ের জোরে বসিয়ে দিল লতিফ সরকারের পিঠে।
বিদঘুটে এক মরণ চিৎকার করে উবু হয়ে পড়ে গেলেন লতিফ সরকার ।
কামরার ভেতরে নরক ভেঙ্গে পড়লো ।
আট দশজন মানুষের চিৎকার । চেঁচামেচি । সবাই এক সাথে কথা বলছে । চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর শব্দ । সবচেয়ে বেশি উচু গলায় চেঁচাচ্ছেন জর্জ এনাম রাউ , ' ডাক্তার ডাকো কেউ । হাসপাতালে ফোন দাও । এই কে কোথায় ...।'
হেন তেন ।
শান্ত ভাবে এক পাশে দাঁড়িয়ে দরদর করে ঘামছেন ক্রাইম ব্রাঞ্চের তুখোড় অফিসার গাউস চৌধুরী ।
রুমাল বের করে মুখ মুছতে মুছতে ভাবছেন , এখন ? কিভাবে সাজাবেন কেসটা ? কে তাকে বিশ্বাস করবে ?
শেষ কথা
সেই সন্ধ্যায় মারা গেছেন লতিফ সরকার ।
মামলাটা সাজাতে পারেনি গাউস চৌধুরী ।
জর্জ এনাম রাউয়ের বাসার ভেতরে হওয়ায় পরিস্থিতি আরও বিচ্ছিরি হয়েছে ।
মাত্র তিন মাস পর আদালত থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে বের হল বিলকিস ।
বাইরে গাড়ি অপেক্ষা করছিল ।
আদালতের চত্বর থেকে উকিল সাধন হাওলাদার আর বান্ধবী ফিরোজা বেগম ওকে সসম্মানে নিয়ে আসছিল গাড়ির দিকে।
আচমকা কোত্থেকে এসে পথ রোধ করে দাঁড়ালেন গাউস চৌধুরী । ' এক মিনিট , যদি আপত্তি না থাকে তবে সামান্য কথা ছিল ।'
'উনি ইন্টার্ভিউ দিতে পারবেন না। ' খেঁকিয়ে উঠল উকিল সাধন হাওলাদার । কেস জিতে যাওয়ায় চর্বি এসে গেছে উনার ।
‘ আপনারা গাড়িতে গিয়ে বসুন । আমি আসছি ।' শান্ত গলায় বলল বিলকিস ।
তাই করলো দুইজন।
একা হতেই গাউস চৌধুরী বললেন , ' আপনি এখন মুক্ত । আমার হাত থেকে তো বটেই আইনের হাত থেকেও। ভাল থাকবেন । কেসটা আমি সাজাতে পারিনি । দুঃখ নেই। শুধু সামান্য কৌতূহল রয়ে গেছে । জবাব পেলে ভাল হয় । দেখুন আমি গোপনে আপনার কথা রেকর্ড করছি না। ভয় নেই। বিশ্বাস না হলে জবাব দেবেন না।‘
খানিক চুপ থেকে গাউস চৌধুরী বললেন ,’ কেন যেন মনে হচ্ছে এই সবই আপনার একটা বিরাট প্ল্যান । অনেক সময় নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় তিলে তিলে করেছেন প্ল্যানটা । হয়তো প্রফেসর লতিফ সরকারও সাথে ছিল ।আপনি কোন ভাবে ভবানীগঞ্জের রত্নার কথা শুনতে পেয়েছিলেন। হয়তো ছুটিতে বেড়াতে গিয়ে বা পুরানো খবরের কাগজে পেয়েছেন । বা হয়তো কাজের বুয়ার মুখে শুনেছেন । ঠিক জানি না ।
‘ আপনার ধূর্ত মগজে আইডিয়ার বীজ রোপণ হয় তখন ।
‘ লতিফের সাথে মিলে প্ল্যান করেন । স্বামীকে মেরে সব সম্পত্তি ব্যবসা অঢেল টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য এই সম্মোহনের নাটক আর সেই কায়দায় খুন । স্বামীর সাথে তেমন বনিবনা ছিল না আপনার। পরনারীতে আসক্ত ছিল আখতার , আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি । লতিফের সাথে আপনার পরিচয় কলেজ লাইফে । সেটাও আমি জেনেছি । যদিও কল রেকর্ডে আপনাদের যোগাযোগের কোন চিহ্ন পাইনি আমরা । কিন্তু লাইব্রেরি থেকে সম্মোহনের উপর কয়েকটা বই ইস্যু করেছেন আপনি । সেটাও অনেক বছর আগে । লফিত আপনার টিম মেম্বার , সন্দেহ নেই ।
‘ পরে হয়তো লতিফ আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করবে অমন একটা ভয় ছিল । জর্জ এনাম রাউয়ের বাসায় আবার কায়দা করে তাকেও মেরে ফেললেন। অবশ্য আমি উনাকে চ্যালেঞ্জ করে আপনার সুবিধেই করে দিয়েছিলাম ।তো এই হচ্ছে আমার থিউরি।‘
একটু ও ভয় পেল না বিলকিস । দুই চোখের মণি নাচিয়ে বলল , ' সব প্রশ্নের উত্তর জানতে হয় না ।‘
মুচকি হেসে হাঁটতে লাগল গাড়ির দিকে ।
পারফিউমের মিষ্টি একটা সৌরভ রয়ে গেল তারপরও ।
Lawrence Treat এর ছোট গল্প Murder Me Twice অবলম্বনে

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন