সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

জাদুকরের ফাঁদ

 এক

 

দিনটা ভালই 

মাত্র  ঘণ্টা দুই হল মাছ ধরতে এসেছে হায়দার 

কিন্তু এর  মধ্যেই  বিশাল সাইজের  আটটা নানান ধরনের মাছ ধরে ফেলেছে  মিক্স ক্যাচ যাকে বলে।  

ব্যাপারটা অসম্ভবই বটে

কোন দিনই এত দ্রুত আর এত বেশি  ধরতে পারেনি আগে 

আজকে অমন হচ্ছে কেন ?

নতুন বানানো মাছের চারটা এর একটা কারণ হতে পারে 

প্রত্যেকবার মাছ ধরার চার হায়দার নিজেই বানায় অথবা মোড়ের কাছে মানিক মিয়ার দোকান থেকে কিনে আনে

মানিক মিয়ার চারটা খারাপ না বেশ হিট একটা  জিনিস দোকানে নানান সাইজের ছিপ, বড়শি, হুইল, নাইলনের শক্ত সূতা, ফাৎনা , হাবিজাবি জগা খিচুড়ি অনেক কিছুই বিক্রি করে   মানিক মিয়া সেই সাথে মাছের চারও 

কিন্তু সেই চার দিয়ে এত দ্রুত টপাটপ  আর এত মাছ এর আগে কখনই ধরতে পারেনি হায়দার  

এইবারের মাছের চারটা বানিয়ে দিয়েছে হায়দারের বাসার দারোয়ানের ছেলে ফটিক ফটিকের বয়স মাত্র বারো কিন্তু এই সব কাজে একদম উজ্জ্বল স্ফটিক চারটাতে পিঁপড়ের ডিম, পাউরুটি, বাসী  ঝোলাগুড়, মৌমাছির চাক আরও কি কি দিয়েছে কে জানে ?

তবে জিনিসটা বড্ড কাজের 

আয়েস করে বট গাছের গুঁড়িতে জুত করে বসলো হায়দার বটের লাল টুকটুকে ফলগুলো মাঝে মাঝে টুপ টাপ  করে ওর মাথার উপরে পড়ছে 

সাথে করে আনা ফ্লাক্সের  গলাটা মোচড় দিতেই সেটা খুলে গিয়ে প্ল্যাস্টিকের একটা  পেয়ালা  হয়ে গেল    

অনেক সময় নিয়ে  চা ঢালল দুধ চা সাথে সেলোফেনের কাগজে মোড়া হাতে বানানো স্যান্ডউইচ  আছে ভেতরে শুধু মায়নেজ আর হলদে- সাদা ডিম  ভাঁজা দেয়া 

শীতের বিকেল

মাঝে মাঝেই ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে 

হায়দারের অবশ্য খারাপ লাগছে না 

মাছ ধরার নেশা বড্ড কড়া নেশা  গত দশ বছর ধরে নিয়ম করে প্রত্যেক  সপ্তাহের  ছুটির দিনে     চলে আসে  শহরতলীর এই জলাভূমির কাছে 

জলাভূমিটা দারুণ

স্থানীয় লোকেরা বলে দুধসাগর এই সব নামের সাথে একটা না একটা কাহিনি  থাকে

অনেক আগে কোনও এক জমিদার ছিলেন এই এলাকাতে সেই জমিদারের বুড়ি মা- একবার ইচ্ছে হল ,  তিনি দুধের মধ্যে সাঁতার কাটবেন আর কমলা খাবেন 

কি অদ্ভুত ইচ্ছা !

সাইকো টাইপের ফ্যান্টাসিতে ভোগা বুড়ি।

 জমিদার বাবু  বিশাল একটা গর্ত খুড়ে  গ্রামের সব গোয়ালার কাছ থেকে দুধ এনে ভর্তি করেন দুধের পয়সা দিয়েছিলেন কিনা তা অবশ্য যানা যায়নি

তারপর সেখানে সেরে সেরে গোল্লা গোল্লা সব দার্জিলিঙের, কারো কারো  মতে  সিলেটের,  কমলা  এনে  ছেড়ে দেন ,   খোসা ছাড়িয়ে বুড়ি মা মনের আনন্দে সাঁতার কাটে আর কমলা খায় খুশি হয়ে জমিদার ছেলেকে আশীর্বাদ করেন

ব্যস, এই হচ্ছে দুধ সাগরের গল্প

গল্পের ছাতামাথা না থাকলেও সত্যি কথা বলতে কি মাছ ধরার জন্য এই জলাশয়টা তুলনাহীন

চারিদিকে ঘন শটিবন  বঁইচির ঝোপ আর মাঝখানে ফ্রেমে বাঁধানো কাচের আয়নার মত জলাভূমিটা 

ভাগ্যিস বেশি লোক এই জায়গাটা চেনে না 

শহুরে লোকের মধ্যে হায়দার  শুধু একা  অন্য দুইচার জন যারা আসে,   সম্ভবত স্থানীয় লোকজন  ময়লা লুঙ্গি আর ছেড়া ফতুয়া পরা 

কয়েকটা বাচ্চা ছেলে মেয়ে কখনও কখনো আসে সবুজ জলজ ভেজা কলমি শাক সংগ্রহ করে  ঝোপের আড়ালে জংলি বেগুন গাছ আছে সবুজ রঙের গোল গোল বেগুন হয়  একটু তেতো স্বাদের  সেগুলো  নিয়ে যায়

 নয়  নাম্বার মাছটা যেটা ধরল সেটা , চ্যাপ্টা বড় ফলুই মাছ অ্যালুমিনিয়ামের  নতুন একটা টুকরোর মত মনে হচ্ছে

ঠিক সেই সময় লোকটাকে দেখতে পেল হায়দার

লোকটা বিচ্ছিরি রকমের রোগা  তালগাছের মত লম্বা এক মাথা চুল, বাউলদের মত  সাদা মুখ ভর্তি দাঁড়ি গোঁপ তাও হাতির দাঁতের মত সাদা এক টুকরো হলুদ কাপড় লুঙ্গির মত করে পরা আর তেঁতুল দানার রঙের একটা চাদর গায়ে জড়ানো 

লোকটা বুড়ো বয়স কত হবে কে জানে ? মুখে হাসি খালি পা 

লোকটা এসে ঝুপ করে হায়দারের পাশে বসলো যেন তারা লেঙটা কালের বন্ধু 

কটা মাছ ধরেছ ? চাঁছাছোলা ভাবে প্রশ্ন  করলো বুড়ো  যেন আলাপ জমানোর জন্য এটা খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন

এখানকার চৌকিদার নাকি তুমি ? বিরক্ত হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো  হায়দার

 

না , তা না অবশ্য

 

তো ?

 

না মানে,  রোজ তো দুই তিনটার বেশি ধরতে পার না,  তাই জিজ্ঞেস করছিলাম আর কি

 

জবাব না দিয়ে চুপ করে রইল হায়দারচোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে ফাৎনার দিকেঅল্প অল্প নড়ছেলাল টুকটুকে একটা ফড়িঙ উড়ে বসার চেষ্টা করছে ফাৎনার উপরবারবার

এইবারেরটা ধরতে পারলে দশটা হবে ,না ?

সবজান্তার ভঙ্গিতে মিটি মিটি হাসতে হাসতে বলল বুড়ো

রেগে উঠতে গিয়েও সামলে নিল নিজেকেতারমানে বুড়ো অনেকক্ষণ ধরে নজর রেখেছে ওর উপরকই, তাহলে এতক্ষণে হারামজাদাটাকে দেখতে পায়নি কেন ?

কোথায় ছিল ?

দূরের কামরাঙা গাছ গুলোর আড়ালে ?

তুমি আমাকে বড় দেখে দুটো মাছ দেবে , ঠিক আছে ? কথাবার্তা পাকা করার ভঙ্গিতে বলল বুড়ো মাছ খেতে আমার খুব ভাল লাগে

 

কি বললে ? স্থান কাল পাত্র ভুলে চেঁচিয়ে উঠল হায়দারএকবার ভাবল ভুল শুনছে কি না !

 

বললাম , আমাকে ভাল দেখে দুটো মাছ দেবে আবারও একই ভঙ্গিতে বলল বুড়ো

রাগে দিশেহারা বোধ করল হায়দারএকবার ভাবল বুড়োর পাছায় লাথি মেরে জলাভূমির ঠাণ্ডা জলে ফেলে দেবে নাকি 

কিন্তু এতে বাকি  মাছগুলো সব পালাবে

সূর্য ডুবে আসছেআর সময় বেশি নেই

হালকা ফিকে নীল রঙ্গা কুয়াশা পড়া শুরু করবে একটু পরইসন্ধার আলোটা চায়ের পাতা ভেজান জলের মত

বাড়ি ফিরতে হবে

 

ঠিক সেই সময়েই টান পড়ল ফাৎনাতে কায়দা করে ছিপে মোচড় দিল হায়দার শক্ত ফাইবারের ছিপ  বড়শিতে ঠোঁট  গেঁথে জলাভূমির বরফ ঠাণ্ডা জল  থেকে উঠে এলো মাছটা 

 

আরে এ তো কালিবাউস মাছ খুশি খুশি গলায় বলল বুড়ো  যেন মস্ত বড়  আনন্দের কোন ঘটনা ঘটে গেছে   মাছটা খেতে ভাল এই মাছের কাটাতে প্রচুর ফসফরাস আছে

 

হুইল ঘুড়িয়ে নানান কসরত করে মাছটা হাতে তুলে  নিল হায়দার ছটফট করছে মাছটা মুখ থেকে যত্ন করে বড়শিটা খুলে    আস্তে করে মাছটা রেখে দিল প্লাস্টিকের  ঢাকনাওয়ালা বড় নীল পাত্রের মধ্যে যেখানে অপেক্ষা করছে অন্য মাছগুলো 

নিজের জিনিস পত্র গুছাতে শুরু করলো হায়দার

বাড়ি ফিরতে হবে এইবার একটু পরেই ঝুপ করে নেমে আসবে অন্ধকার  শীতের  বাতাসে কাঁপছে দীঘল সবুজ নরম ঘাসগুলো  জায়গাটা খুবই নিঝুম   আর কোনও লোকজন   নেই

কী হল , আমাকে দেবে না দুই একটা মাছ ? অনুরোধ  করলো বুড়ো 

ফাজলামো করবে  না খেঁকিয়ে উঠলো হায়দার ভাগো এখান থেকে বললাম তো কোন মাছ পাবে না

 

এতগুলো মাছ একাই খাবে ? বাড়িতে তো মাত্র তিনজন সবগুলো মাছ লাগবে তোমার ?

 

খাওয়ার জন্য  মাছ ধরি না আমি মাছ ধরার  সরঞ্জাম আর নীল প্লাস্টিকের কন্টেনার,  যেটার মধ্যে মাছ গুলো আছে,   নিয়ে  হাঁটতে শুরু করল  হায়দার

 

তাহলে  প্রত্যেক সপ্তাহে  মাছ ধরতে আসছ কেন?   হায়দারের সাথে সাথে   তাল মিলিয়ে  হাঁটতে হাঁটতে  জিজ্ঞেস করলো বুড়ো

 রিল্যাক্স করার  জন্য সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করি একদিন ছুটি দিনগুলো যাতে একঘেয়ে না হয়ে যায় সে জন্য মাছ ধরতে আসি  এতে বৈচিত্র্য   পাই   দার্শনিক ভঙ্গিতে বলল   হায়দার অন্যকে জ্ঞান দিতে কার না ভালো লাগে  ?   

 

 

তাহলে আমাকে একটা মাছ ও দিতে চাইছ না কেন ?

 

কারন ইচ্ছা করলে তুমি নিজেও মাছ ধরে নিতে পারসেটা না করে ভিক্ষা চাইছ এই ভিক্ষা জিনিসটা আমি ঘৃণা করি

 

কিন্তু আমাকে মাছ না দিলে তুমি কিন্তু বিপদে পড়বে প্রায় শোনা যায় না অমন ভাবে ফিস ফিস করে বলল বুড়ো

 

কি বললে ? প্রায় হোঁচট খেয়ে যেন থমকে দাঁড়াল হায়দার বুড়ো শূয়রের বাচ্চাটা বলে কী ! কটমট করে ফিরে তাকাল বুড়োর দিকে

 

তুমি আমাকে ভয় দেখাতে চাছ নাকি  ? চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করল হায়দারসতর্ক হয়ে উঠছে সেকোনও রকম ঘাপলা আছে নাকি ?

 

না, নাভয় দেখাব কেন ? দ্রুত বলল বুড়ো

 

যদি না দেই কী করবে তুমি ?

 

বুড়োর সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালো হায়দার

অবস্থা বেগতিক দেখলে বুড়োর নাকে ধিমাই করে একটা ঘুসি মেরে ঝেড়ে দৌড় দেবেওই তো সামনে হায়দারের হলুদ রঙের টয়োটা গাড়িটা

কিছুই করব না আমতা আমরা করে বলল বুড়ো  তবে অভিশাপ দেব

 

কি দেবে ?

 

অভিশাপ

 

কেন, তুমি কি পীর ফকির নাকি ?অ্যাঁ ? নাকি মাছ বাবা ? অ্যাঁ ?

 

আমি জাদুকর

 

কি কর ?

 

জাদুকর

 

ভালআচ্ছা দিলাম না মাছদাও দেখি অভিশাপ

 

 

মাছ তা হলে দেবে না ? বিড়বিড় করে বলল বুড়ো

 

নাহ

 

দেবে না ?

 

না

 

দেবে না ?’

 

বললাম তো না।

 

 

ঝট করে উবু হয়ে বসে মাটি থেকে কয়েকটা সবুজ কচি নরম ঘাস, আর অচেনা গুল্ম তুলে নিল বুড়োবিড়বিড় করে কী যেন বলল কয়েকবারতারপর সেগুলো শূন্যে ছুড়ে দিয়ে বিড়বিড় করে বলল , কলেরা হবে তোমার গুঁটি বসন্ত হবে

 

হেসে ফেলল হায়দার আঙ্কেল ঐসব রোগ বালাই পুরানো হয়ে গেছে

 

তাই নাকি ? যেন অবাক হয়ে গেছে অমন একটা ভঙ্গিতে চোখ পিট পিট করল বুড়ো

 

ঠিক আছেতা হলে টাইফয়েড হবেতড়কা রোগ হবে অনিদ্রা  হবে...

 

জোড়ে জোড়ে হেসে উঠলো হায়দারবুড়োর নাটক ভালই লাগছে

এসে গেছে সে হলুদ গাড়ির কাছে পেছনের বুট খুলে ফেলল চাবি দিয়েসুন্দর করে সাজিয়ে রাখতে লাগল হাতে ধরা জিনিসগুলোবোঝা গেছে পাগলের পাল্লায় পড়েছে সেভদ্র পাগল

বুড়ো তখন  লাগাতার অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছে, শিলা বৃষ্টি পরে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে তোমারআখের লাল পচা রোগ হবেমুরগির জণ্ডিস হবে...

 

দেখ বুড়ো মিয়া হাত তুলে ট্রাফিক পুলিশের মতো করে থামিয়ে দিল বুড়োকেএ সব অভিশাপ টভিশাপ আমি বিশ্বাস করি নাতাছাড়া ফসলের ক্ষেত নেই যে শিলাবৃষ্টিতে নষ্ট হবে বা আখের লাল পচা রোগ হবেঠিক আছে ?

 

তাহলে উম্মম... একটু ভেবে বলল বুড়োতোমার জীবনটা একঘেয়ে হয়ে যাবেমনে হবে জীবনটা একটা ফাঁদ

 

তাহলে ঠিক আছে হেসে   ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল হায়দার সামনের শুক্রবারে দেখা হবে বুড়ো মিয়া

 

গাড়িটা পুরনো হলেও ইঞ্জিনটার বেশ যত্ন নেয় হায়দারহলুদ গাড়িটা  মাখনের মত মসৃণ গতিতে চলতে লাগল পেছনে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল মাছের জন্য কাঙ্গাল বুড়োটা

চেহারায় দুঃখী মানুষের মত একটা ভাব

 

দুই

 

শহরতলির অভিজাত  এলাকাতে হায়দারের বাড়ি

এলাকাটা বেশ শুনশানমানুষজন কমভদ্রলোকেরাই থাকে এখানেহায়দার যখন বাড়ি ফিরল তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই

কুয়াশার জন্য সব কিছু কেমন রহস্যময় লাগছেবাড়ির সামনে ঝাঁকড়া মত একটা গাব গাছপাশেই গাড়ির গ্যারেজল্যাম্পপোস্টের আলোর সামনে বিন বিন করে উড়ছে কয়েকটা পোকাওরা রাতে বাড়ি ফেরে না

বাতাসে মিষ্টি শীতের ঘ্রাণ

গাড়ির শব্দ পেয়ে ছুটে এলো টুকলুহায়দারের খোকাবয়স দশ

মাজলদি এসোবাবা এসেছে গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগল টুকলুতারপর বাপকে সাহায়্য করতে লেগে পড়ল জিনিস পত্র ধরার কাজে

রান্নাঘরের ভেতর থেকে শাড়ির আঁচলে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে বের হয়ে এলো মিলিমানে টুকলুর মাম্মান

অস্কার পুরস্কার পেয়েছে অমন একটা ভঙ্গি করে মাছের নীল পাত্রটা নিয়ে বাসায় ঢুকল হায়দার

হায়দারের পোষা কুকুরটা পর্যন্ত ঘেউ ঘেউ করে আহ্লাদ প্রকাশ করতে লাগলভাবখানা,  কিছু একটা  না করলে কেমন দেখায় !

 

এত মাছ নিয়ে  কখনোই  বাড়ি ফেরে না হায়দার বড়জোর দুটো বা তিনটে মাছ ধরতে পারে প্রত্যেক সপ্তাহেকিন্তু আজ সে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলেছেকাজেই মনটা বেশ ফুরফুরে

মিলিও বেশ খুশিঠিক  হল,  বড় রুই মাছ দুটো  কেটে রান্না করা হবে আজ রাতেবাকিগুলি যাবে ফ্রিজে

প্রতিবেশী নৃপেন বাবু আর জগলুল সাহেবকে রাতে খাওয়ার জন্য বলা যেতে পারে

নৃপেণ বাবুকে অবশ্য নিমন্ত্রণ দিতে হয় নামাছ ভাজার গন্ধ পেলেই বিড়ালের মতো শুঁকতে শুঁকতে চলে আসবে

হলও তাই

কিছুক্ষণ পরেই নৃপেণ বাবু এসে হাজির হলেনরোগা চিমসে ধরনের চেহারাচেহারাতেই কেমন একটা হাড়গিলে অভাবি  ধরনের ভাব মনে হয় জন্মের পর থেকেই না খেয়ে আছেনচোখে ভারী পাওয়ারের চশমাভদ্রলোক বিপত্নীকঅখ্যাত একটা কলেজে বাংলা সাহিত্য পড়ান

জগলুল সাহেব বেঁটে- মোটা- টাকঅয়ালাবাদাম বিক্রেতাদের মতো চক্রা বক্রা ছাপা জামা কাপড় পরেনছুটির দিনের নিয়মিত মেহমানতার মূল আগ্রহ তরল পদার্থেযেটার আয়োজন  মাঝে মাঝে হায়দার করে থাকেযেদিন মিলি বাপের বাড়িতে যায়

 

বেশ আড্ডা জমে উঠল

জগলুল সাহেব বলছিলেন, রংপুরে মানুষেরা নাকি -র শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না-য়ের জায়গায় অ বলে

বাড়ি কোথায় জিজ্ঞেস করলে বলে অংপুর রাতের বেলা বলতে পারে নাবলে আইতের বেলাতো জগলুল সাহেব নৃপেণ বাবুকে বলছিলেন, রংপুরে হিন্দুরা কি রামকে আম বলে নাকি ? অথবা রামায়ণকে কি আমায়ণ বলে নাকি?

নিপেন বাবু বেশ রেগে গেলেনকারণ তাঁর আদি বাড়ি রংপুরে৷ রাগে চিড়বিড় করতে লাগলেন তিনি

জগলুর সাহেব আর হায়দার ঢাকার ছবি ভিলেনদের মতো ড্রইং রুমের জানালার কাচ কাঁপিয়ে ঠা ঠা ঠা করে হাসতে লাগল

রাতের খাবারটা বেশ জুতসই হলচমৎকার মশলা দেওয়া ভাজা মাছের টুকরোটমেটো আর মটরশুঁটি দেওয়া মাছের ঝোলফুলকপি ভাজা  ধনে পাতা দেওয়া ডাল

খাওয়ার টেবিলে বসে বুড়ো পাগলটার কথা কেন যেন হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল হায়দারের

বুড়োর চোখ দুটো ছিল বেশ বড় বড় , উজ্জ্বল আর নিষ্পাপ

 

কি মনে করে গল্পটা খাওয়ার টেবিলে বলে ফেলল হায়দার

জগলুল সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন , এ আবার কী ধরনের ফাজলামো ? কী মনে হয় আপনার ?

নৃপেণ বাবু হাভাতের মত খাচ্ছিলেনএকটা ভাত তার গোঁফের উপর ঝুলে আছেএই রকম প্রায়ই হয় এত উপরে দুই একটা ভাত যায় কী করে একমাত্র উপরওয়ালাই জানেনভাজা মাছ মুখে ঢুকাতে ঢুকাতে বললেন, কোন সাধু টাধু না তো ?

 

আপনি পাগল হয়েছেন ? বিরক্ত হলেন জগলুল সাহেবসাধু বাবারা মাছ ভিক্ষা করে নাকি ?

 

দিনকাল বদলাচ্ছে না ? মিন মিন করে বললেন নৃপেণ বাবু  সাধু সন্ন্যাসীরা তো আজকাল হরদম মাছ মাংস খায়আগের দিনে শুধু কাপালিকেরা খেতআমার পরিচিত এক কাপালিক শেয়ালের মাংস খেতভালই নাকি খাসির মাংসের চেয়ে ভালবেশ তেলতেলে। মশলা ফশলা দিয়ে ভাল মত রান্না করলে

 

মজার ব্যাপার কী জানেন ? নিজের থালায় ডাল নিতে নিতে বলল হায়দারলোকটা কথা বলছিল খুবই শুদ্ধ ভাষায়মফস্বলের গেঁয়ো ভূত বলে মনেই হয় নাতা ছাড়া বেশ পরিষ্কার পরিছন্ন ও ছিলমানে ফকির মিসকিন কিসিমের লোক বলে মনে হয়নি আমারলোকটার পুরো আচরণে অদ্ভুত কি যেন ছিল ! ঠিক মনে করতে পারছি না

 

তাহলে একটা মাছ দিলেই পারতে গ্লাসে জল ঢালতে গিয়ে বলল মিলিসবচেয়ে ছোট যে গ্রাসকার্পটা ধরেছ সেটা দিয়ে দিলেই ঝামেলা চুকে যেত

 

ঝামেলা হয়নি তো হায়দারের জবাবলোকটা বুড়ো অর্থব হলে ঠিকই দিতামকিন্তু বেশ তাগড়া শরীরতাছাড়া অমন ভাবে মাছ চাইছিল যেন , কি বলে, ইয়ে হ্যাঁ ওর বাপের সম্পত্তিআমার অভিজ্ঞতা বলে, একবার দিলে প্রত্যেক ছুটির দিনে গিয়ে দেখব ব্যাটা বসে আছে ঘুঘুর মত

 

টাক মাথার জগলুল সাহেব এবং চিরক্ষুধার্ত নৃপেণ একমত হলেন এই ব্যাপারে

 

শীতের রাত

এলাকা নিঝুমরাত নয়টায় আড্ডা ভেঙ্গে দিল হায়দারমিলিও ইশারা করছিলপরদিন আপিস আছেবাচ্চার ইস্কুল আছে

রাত এগারোটায় বিছানায় গেল হায়দার

টুকলু ঘুমিয়ে গেছে দশটাতেই

পরদিন খুব সকাল সকাল উঠতে হবে বেচারাকে

ঘুমানোর আগে যখন কেমন একটা ঘুম ঘুমি ভাব চলে আসে তখনই ঝাঁ করে ব্যাপারটা মনে পড়ল হায়দারেরবিজলির চমকের মতই ব্যাপারটা ঝলসে উঠলো ওর মাথায়আরে, বুড়ো ভামটা কী ভাবে জানলো ওরা পরিবারে মাত্র তিনজন ?

বুড়ো বলছিল, এতগুলো মাছ একাই খাবে ? বাড়িতে তো মাত্র তিনজন !

তাই তো !

ই ব্যাপারটা    কিন্তু  বুড়োর  জানার কথা নয় 

হয়ত  বুড়ো ওকে দীর্ঘদিন খেয়াল করে দেখেছে,  সেজন্য বলতে পেরেছে প্রতি সপ্তাহ  ছুটির দিনে মাছ ধরতে আসে কিন্তু পরিবারের সদস্য সংখ্যা জানবে কী করে?  মিলি  আর  টুকলুকে   নিয়ে তো কখনও সে মাছ ধরতে যায়নি

 মখমলের বিছানায় শুয়ে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল হায়দার মিলির  খোলা চুলে নাক মুখ গুঁজে

 অদ্ভুত  একটা  স্বপ্ন দেখল হায়দার   সে রাতে

  ফাঁকা তেপান্তরের  মাঠে একা দাঁড়িয়ে আছে  হায়দার লম্বা সবুজ ঘাসে মাঠ   ভর্তি  কোত্থেকে যেন ঠান্ডা বাতাস আসছে হিলহিল করে আকাশভর্তি কালো মেঘ  দিগন্ত জোড়া সেই  মেঘের রঙ  কাকের পালকের মতো 

হঠাৎ বৃষ্টি নামল রিমঝিম বৃষ্টি অবাক হয়ে হায়দার খেয়াল করল,  বৃষ্টি ফোঁটাগুলি সাধারণ   নয় অন্য কিছু জলের  বদলে  ছোট ছোট মাছ পড়ছে মাছ বৃষ্টি বড্ড অদ্ভুত তো

 তারপর তলিয়ে গেল অতল ঘুমের অন্ধকারে

 

তিন

 

ক্রিং   ক্রিং ক্রিং

একটানা কর্কশ শব্দে  বেড সাইডের  টেবিলের অ্যালার্ম ক্লকটা বেজে উঠল সকাল সাতটা মরার মতো ঘুমাচ্ছে হায়দার শীতের সকালে ঘুমটা বড্ড বেশি আরামদায়ক মনে হল

 

 এই উঠছো না কেন ?আপিস  যেতে হবে না ?  পিঠে এসে ধাক্কা দিল  মিলি   মরার  মতো ঘুমাচ্ছে দেখি 

 

শুয়ে    আড়মোড়া ভাঙল হায়দার   ,  কুকুরের মতো তারপর  তড়াক  করে উঠে   বাথরুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখল দরজা ভেতর  থেকে বন্ধ

 তারমানে টুকলু  শাওয়ার করছে

 

 বাবা তুমি কী    একটু যদি  জলদি  বেরোতে পারবে  ? বাইরে থেকে ছেলেকে জিজ্ঞেস করল সে

 টুকলু কী একটা     জবাব দিল

 বেসিনের ক্যাবিনেট থেকে  টুথপেস্ট   নিয়ে ব্রাশে লাল জেলির মতো  পেস্ট  লাগালো হায়দার   হাত ফস্কে ছিপিটা পড়ে গেল মেঝেতে তারপর  নাচতে নাচতে সেটা  চলে গেল বিছানার নীচে 

ধ্যাত

  বিরক্ত হয়ে বাজে  কয়েকটা  গালি দিয়ে দাঁত মাজা শুরু করল  সে  হাতে  সময় নেই

 রান্নাঘরে রুটি টোস্ট করছে  মিলি  অন্যমনস্ক থাকায়   একজোড়া পাউরুটির  স্লাইস  পুড়িয়ে ফেলল বেচারি 

তারপর  ছ্যাক ছ্যাক  করে শব্দ হতে লাগল  ডিমের ওমলেট বানাচ্ছে জলখাবার করতে বসে বিরক্ত হল  হায়দার  আজকে রুটিগুলো   টোস্ট  করতে গিয়ে বেশি পুড়িয়ে ফেলেছে মিলি   ডিমের ওমলেটে  লবণ  নেই  কিছু বলল না  সচরাচর   কখনও এমন হয় না

 

আটটার মধ্যে নাস্তা শেষ করে টুকলুকে নিয়ে গাড়িতে বসল  হায়দার  টুকলুকে  স্কুলে নামিয়ে সোজা আপিস  সপ্তাহের প্রথম  আপিস  আজ সবার মধ্যে  কেমন  ঢিলেঢালা  ভাব দু একজনের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে   শুধুমাত্র  একটা  বালিশ পেলেই আবার নাক ডেকে  ঘুমিয়ে  যেতে পারবে গেটের দারোয়ান  ওর থুতনিটা   হাতে ধরা বিশাল গজারী কাঠের লাঠির উপর  রেখে ঘুমোচ্ছে এই  সাতসকালেই !

  অফিসে  হায়দার অবস্থান  আর সবার চেয়ে একটু উঁচু তাই দু পাশের সবার  আদাব,  সালাম,  নমস্কার আর  গুড মর্নিঙের  বস্তা নিয়ে  নিজের  ডেস্কে  এসে বসল

 চেয়ারে বসে  ড্রয়ারের  দিকে হাত বাড়াল দরকারি কিছু ফাইল আর  কাগজপত্র আছে 

 কী মনে হতে হায়দারের  হাতটা থেমে গেল  ভুরু জোড়া কুঁচকে উঠলো   আপনা  আপনিই  কেমন বিচ্ছিরি  ফোঁস ফোঁস  শব্দ  হচ্ছে   ড্রয়ারের    ভেতর থেকেযেন    বিশাল আর   বিষাক্ত একটা কেউটে সাপ   কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে  ওখানে   ড্রয়ারটা    খোলামাত্রই   ফোঁস করে  ছোবল মেরে বসবে ওর হাতে

 কিন্তু কী করে এটা সম্ভব?

 সাত সকালে অফিসের ভেতর ওর টেবিলের ড্রয়ারের  ভিতর সাপ রেখে যাবে কে? কোন দুঃখে ?

 অথচ পরিস্কার অনুভব করতে পারছে,  সাপটার মসৃণ নড়াচড়া আর  ফিস ফিস  শব্দ কল্পনার পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে,   কালো কুচকুচে কেউটে  সাপটা নড়ছে  তিন কোণা  মাথাটা উঁচু করে  দুই ফালি করা  চেরা জিভটা  বারবার ঘনঘন মুখের  মধ্যে ঢোকাচ্ছে আর বের করছে 

 শীতের সকালে   কপাল ঘেমে গেল  হায়দারের   সারা শরীর যেন অবশ  হয়ে  আসছে 

 স্যারের শরীর খারাপ নাকি ?  পাশ থেকে দাঁড়িয়ে কৌতূহলের সাথে জিজ্ঞেস করল রামগোপাল  অফিসের পিওন   চ্যাঙরা বয়সের     কালো  কুচকুচে  মোটা গোঁফ পান চিবুছে    মুখের   রঙ্গিন রস  যাতে বাইরে না পড়ে সেদিকে সবসময় খেয়াল রাখছে সতর্ক ভাবে

 

নাহ না আমি ঠিকই আছি  হর হর করে বলল হায়দার ড্রয়ারটা খুলতে পারছি না

 

বলেই অবাক হয়ে গেল সে মিথ্যা বলতে গেল কেন ?

 

কন কি? পান চিবানো এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ করে বলল রাম গোপালদেহি দেহি বলেই সামনে এগিয়ে গেল সে

 কী মনে করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে একটু পিছনে চলে গেল হায়দার

হ্যাঁচকা টানে ড্রয়ারটা খুলে ফেলল রামগোপাল

নাহ, কিছু নেই

থাকার কথাও নাতাহলে এমন ভয় পেল কেন হায়দার ?

কই সার ড্রয়ের তো কোনও সমস্যা নাইক্কা  বিরস মুখে বললো পান খেকো রামগোপাল

 

তাই তো দেখছি ফ্যাকাশে মুখে হাসল হায়দারস্বাভাবিক লাগছে এখন বোকার মতো ভয় পেয়েছে  কারণ ছাড়াই

রামগোপাল চলে গেল

চেয়ারে বসে কাজ শুরু করল হায়দার আর সব দিনের মতোইদুপুরের একটু আগে অর্থাৎ , লাঞ্চ ব্রেকের আগে বিব্রতকর ঘটনাটা ঘটে গেল, যার জন্য লজ্জায় পড়তে হল হায়দারকে

আবার রামগোপাল এসে হাজির হলজানাল, বড় সাহেব নাকি হায়দারকে ডাকছেন

চটজলদি বড় সাহেবের কামরাতে হাজির হল সে

মুখটা  হাঁড়ি কাবাব বানিয়ে বসে আছেন বড়সাহেবহাতে সাদা একটা কাগজতাতে কী সব লেখা

 

বসুন হায়দার সাহেব শান্ত গলায় হায়দারকে বসতে বললেন বড় সাহেব   নিন,  পড়ুন এটা  হাতে ধরা কাগজটা এগিয়ে দিলেন তিনি

 

কাগজটা হাতে নিয়েই পিলে চমকে গেল হায়দারেরওর নিজের হাতের লেখা-

 

আমাদের বস বাংলাদেশ অফিস জগতের সবচেয়ে ফালতু অভদ্র বসগোপন বান্ধবীদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায় হোটেলে রিসোর্টে

কলুষিত তার জীবন

অদ্ভুত লাম্পট্যময় তার গতিবিধি

কর্মচারীদের জন্য নিষ্ঠুর কঠোর এক অন্তর

চরিত্রহীন

ফাইলগুলো আটকে রাখে...

লেখাটা অনেক বড়অশ্লীলমারাত্নক সেখানে আবার পেন্সিলে আঁকা একটা কার্টুন। কার্টুনটা কেমন বিচ্ছিরি ভাবে বড় সাহেবের সাথে মিলে যায়।

 হাত পা অবশ হয়ে গেল হায়দারেরসর্বনাশ এই সব কী ? ওর নিজের হাতের লেখা ? কিন্তু ঐসব কবে লিখেছে ? কখন ?কিভাবে?

 

কী মনে করে এই সব লিখেছেন হায়দার সাহেব ? চিবিয়ে চিবিয়ে জানতে চাইলেন বড় সাহেবচোখ দুটো সীয়ামিজ বিড়ালের চোখের মতো জ্বলছে

 

আমি লিখিনি স্যার ঢোঁক গিলে বলল হায়দার

 

তাই নাকি? হাতের লেখা তো আপনার ?

 

জ্বি স্যার

 

এবং আপনি লিখেন নি ?

 

জ্বি স্যার

 

অর্থাৎ আপনার দাদুর সাথে আপনি ফুটবল খেলতেনযখন আপনার দাদুর বয়স মাত্র দশ বছর ব্যাপারটা এরকম ?

 

জ্বি স্যার

 

উজবুক পেয়েছেন আমাকে ? অ্যাঁ ? এত জোরে চিৎকার করে উঠলেন বড় সাহেব যে কার্নিশে বসা জংলী কবুতরগুলো ঝটপট করে ডানা ঝাপটে উড়ে পালাল

ভয় পেয়ে গেছে ওরাও।

 

পরের আধা ঘণ্টা হায়দারের জীবনের কালো অধ্যায় হয়ে রইলবড় সাহেব শুধু মারতে বাকি রাখলেনবাইরের আর সব কর্মচারীরা অবশ্য বিনে পয়সায় একটা  সামাজিক সিনেমা দেখে ফেলল

অনেকে  বেশ খুশিদাঁত দেখা যাচ্ছে বড় সাহেবের কামরার ভেতর থেকেওমানুষের দাঁত এত বড় হয় ?

আধা ঘণ্টা পর ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত হয়ে নিজের ডেস্কে ফিরে এলো হায়দার

মনটা তেতো হয়ে গেছে

তবু ভাগ্য ভাল চাকরিটা এখনও টিকে আছে

 কিন্তু এই লেখাটা কবে লিখল হায়দার ?

অনেক চিন্তা করেও মাথায় কিছু এলো নাআপিসের সবাই সহানুভূতির চোখে দেখছে ওকেএমন কী হাড় কেপ্পন আজিজুল হক  সাহেব বললেন, চলেন ভাই , ক্যান্টিন থেকে এক কাপ গরম দেখে চা খেয়ে আসি, দুধ চা হলে ভাল হয় , কি বলেন ? তারপর শুনি আপনার ঘটনার হিস্টোরিটাখুবই অবাক হয়েছি বুঝলেন

সারাদিন চুপ মেরে রইল হায়দার

চেষ্টা করলো যতটুকু  ব্যস্ত থাকা যায় ফাইলের ভেতরে মুখ গুঁজে

আপিস আওয়ার শেষ হতেই যেন পালিয়ে বাঁচল হায়দার

বাড়ি ফির  ক্লান্ত হয়ে টুকলুকে ইস্কুল থেকে মিলিই বাড়ি নিয়ে আসে

সন্ধ্যা বেলায় বারান্দায় বসে পরিবারের তিনজনে একটা খুচরা আড্ডা দেয়সাথে চা আর হালকা খাবার চলে

অফিসের ঘটনাটা হায়দারের মুখে শুনে অবাক হল মিলিকিন্তু দুইজনে মিলে হাজার ভেবেও কোন দিশা পেল না, বসের নামে লেখাটা কে লিখেছে, তাও আবার হুবহু হায়দারের হাতের অক্ষরের মত করেকে  অমন করে হায়দারকে ফাঁসাতে চায় ? 

 

পরদিন অবশ্য সব ঠিক ঠাক

আপিসে এসে হায়দার জানতে পারল , বড় সাহেব এক সপ্তাহের জন্য দেশের বাইরে গেছেনশুনে বেশ খুশিই হল সেযাক, এক সপ্তাহে ঘটনাটা অনেক খানিই মরচে পড়ে যাবেপরেরটা পরে দেখা যাবে।

বড্ড বাঁচা বেঁচে গেছে সে

শুধু কাজের ফাঁকে একবার হায়দারের মনে হল, কাল রাতে অদ্ভুত সেই স্বপ্নটা আবার দেখেছে সেসেই মাছ বৃষ্টি !

অমন অদ্ভুত স্বপ্নও হয় ?

কী মানে এর ?

বাসায় খাবনামা আছে নাকি ?

থাকলে দেখতে হবে

 

 

বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় ছোট খাট একটা অ্যাকসিডেন্ট ঘটিয়ে ফেলল হায়দার

বুড়ো এক ডাব বিক্রেতা এসে দাঁড়িয়েছিল হায়দারের গাড়ির পাশেট্রাফিক সিগন্যালে লাল আলো জ্বলছিল তখনজিজ্ঞেস করছিল বুড়ো - স্যার ডাব খাইবেন ? কচি ডাব

ব্যাটা মিথ্যুক

ঝুনো নারকেলটাকে বলছে কচি ডাব

 মাথা নেড়ে না করলো হায়দার

ঠিক তখুনি পেছন থেকে অন্য একটা গাড়ি এসে ধিরিম করে লাগিয়ে দিল হায়দারের গাড়িটাকে

আর অদ্ভুত ভাবে ধাক্কা খেল কচি ডাবওয়ালালাট্টুর মতো এক পাক  ঘুরে পড়ে গেল ফুটপাথের উপর হাত থেকে কচি ডাবটা (!) গিয়ে পড়ল   পথের ধারে বসা ল্যাংড়া ফকিরটার মাথায় এক লাফে উঠে দাঁড়া  ফকিরওর পা ভাল হয়ে গেছে মেশিনগানের মতো গালি গালাজ ছাড়ছে ওর মুখ  একটা গালি কমপক্ষে সত্তর হাজার বার দিল - সেটা হচ্ছে,  তর মারে আমি...

 

চারিদিকে হই চই চিল্লাচিল্লি

 কিছু না বুঝেই এক্সেলারে পা দাবিয়ে পালিয়ে চলে এল হায়দারএ সব ক্ষেত্রে দোষ কার সেটা বড় কথা নাপাবলিক গাড়ি ভাঙার সুযোগ খোঁজেপুলিশ খুঁজে টাকা কামানোরসাংবাদিকগুলো   ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে বেরিয়ে আসে কোত্থেকে, কে জানে !

স্থানীয় রাজনৈতিক মস্তান গুলি পর্যন্ত এসে হাজির হয় টং এর চায়ের দোকানগুলো থেকে এরা আরও অনেক কিছুই করে

তাড়া খাওয়া  কুকুরের মতো পালিয়ে হায়দার

 উফ কী ঘটনা হচ্ছে আজকাল?

 

বিকেলবেলা বাগানে বসে চা খাচ্ছিলতখনই নৃপেন বাবু এলেনহাতে পাণ্ডুলিপি আজকাল লেখালেখিতে ঝুঁকে পড়েছেন তিনি৷ কোথাও অবশ্য ছাপা হয় না তাঁর লেখা তাতে তিনি দুঃখ পান নানিয়মিত লিখে যাচ্ছেনইচ্ছে,  সামনে বইমেলাতে নিজের টাকা দিয়ে  নিজেই বই বের করবেনকবিতার বই- বাতাসে তারপিন তেল  গন্ধ

 

ইদানীং টুকটাক  সায়েন্স ফিকশন লেখার চেষ্টা করছেনবাংলাদেশে নাকি সায়েন্স ফিকশনের প্রচুর পাঠক দিন দিন সংখ্যা বাড়ছেই

চা খাবেন কিনা জিজ্ঞেস করতেই নৃপেন বাবু বিরস মুখে জানালেন - সন্ধ্যাবেলা অতিথিকে শুধু চা দিতে নেইতাতে গৃহস্থের নাকি  অমঙ্গল হয়চায়ের সঙ্গে ডাবল ডিমের অমলেট আর কিছু নিমকি ভাজা হলে  ভাল হয়

 

ডাবল ডিমের অমলেট আর নিমকির অর্ডার দেয়া হল মিলির কাছেপ্রসঙ্গটা তখনই তুলল হায়দার

আচ্ছা নৃপেন বাবু স্বপ্নে মাছ দেখার অর্থ  জানেন ?

 

জানি তো জবাব দিলেন নৃপেন বাবুমাছ তো শুভ জিনিসঅর্থাৎ ভাল কিছুই হবে আপনার জীবনেপৃথিবীতে অনেক আদিবাসীরাও মাছকে শুভ জিনিস মনে করেপ্রাচীন মিসরে, ব্যাবিলনে, মেসপটিমিয়ার কাব্যে মাছের বিবরণ পাওয়া যায়আমার একটা কবিতাও আছে মাছ নিয়েকবিতাটা হল-

হায় মাছ

তুমি বারো মাস

থাকো জলে

এ কথা অনাদিকাল থেকে সবাই বলে আরেকটা কবিতা হচ্ছে

 

বৃষ্টিতে জলের বদলে মাছ পড়েছে কখনও কোথাও ? নৃপেন ভদ্রকে অভদ্র ভাবে  বাধা দিয়ে বলল হায়দার

 

অবশ্যইজার্মানির এসেক্স শহরে ১৮৯৬ সালে একবার প্রচণ্ড শিলা বৃষ্টি হয়েছিলতখন বিশাল এক টুকরো শিলার ভেতরে বিচ্ছিরি রকমের বড় একটা রুই মাছ পাওয়া গিয়েছিল

 

 সে  রকম না । আমি বলছিলাম মাছ বৃষ্টি হয়েছিল কখনও ?

 

তাও হয়েছিল  অনেক বারচার্লস ফোর্ট এর লেখা- বুক অভ দ্যা ডিমান্ড,  বইতে এই ব্যাপারে বিস্তারিত  আছেপৃথিবীর অনেক দেশে অনেক বার এই ঘটনা ঘটেছেকথা নেই  বার্তা নেই হঠাৎ করেই সেরে- সেরে, কেজিতে কেজিতে  নানান সাইজের মাছ  পড়তে লাগল আকাশ থেকেকিছু তাজা  কিছু মরাশেষ বৃষ্টিটা হয়েছে ১৮৬১ সালে সিঙ্গাপুরেকিন্তু কয়েক দিন আগে ডিসকভারি চ্যানেলে দেখলাম মাত্র বছর খানেক আগে ফ্লোরিডাতে  এ রকম মাছ বৃষ্টি হয়েছিলমাছের সংখ্যা খুব কমআর পিচ্চি পিচ্চি মাছ

 

পিচ্চি পিচ্চি মাছ মানে ?’

 

মানে ক্ষুদে ক্ষুদে ছোট সাইজের মাছ ।

 

এর কোন ব্যাখ্যা আছে বিজ্ঞানীদের কাছে ? নাকি এটা অতিপ্রাকৃতিক কোন ব্যাপার ?

 

নারে দাদা, এই মহাবিশ্বে সব কিছুই প্রাকৃতিকএটা হয় আপনার ধরুন - সাগরের বুকে বড় বড় বিশাল ঘূর্ণি ঝড় হয়তখন প্রচুর পরিমাণে সাগরের জল আর মাছ ঝড়ের টানে শূন্যে চলে যায়সেগুলোই আপনার দূরের কোন দেশে গিয়ে টুপ টাপ ঝরে পড়ে

 

ব্যাপারটা অদ্ভুত মন্তব্য করল হায়দার

তবে স্বাভাবিক  সায় দিলেন নৃপেন ভদ্র আগের দিনের মানুষেরা খুব ভয় পেত এ রকম হলে ভাবত মহাপ্রলয় বোধ হয় এসে গেছেনস্ত্রাডামুসের একটা কবিতায়ও মাছ বৃষ্টির ব্যাপারটা আছেআগের মানুষেরা অনেক কিছুই জানত রে ভাইএমন কী ভবিষ্যতে যে মানুষজন স্পে স্টেশন বানিয়ে মহাশূন্যে বসবাস করবে আগের দিনের মানুষজন সেটাও জানত

 

তাই নাকি ? অবাক হল হায়দার

অবশ্যই জোর দিয়ে বললেন নৃপেন বাবু কেন আপনি হাসন রাজার গানে শোনেনি ? তিনি বলেছেন - কি ঘর বানাইমু আমি শূণ্যেরও মাঝার...অর্থাৎ তিনি জানতেন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মহাশূন্যে বসবাস করবে

হায়দার হেসে ফেলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল 

চা, নিমকি আর ডাবল ডিমের অমলেট এসে গেছে

নৃপেন বাবু ক্ষুধার্তের মত সুলুপ সুলুপ শব্দ করে অমলেট খাচ্ছেন

তার গোঁফের মধ্যে হলুদ কুসুম লেগে ভ্যান গগের রঙের ব্রাশ হয়ে গেছে

 

চার

 

সম্ভবত হায়দারের জীবনে শনির দশা চলছে

পরদিন আপিসে যাবার সময় বড্ড বিচ্ছিরি এক জায়গাতে এসে নষ্ট হল ওর গাড়িটা

একদম পাগল হবার দশা হল ওর চারিদিকে বীভৎস যান্ত্রিক কোলাহল বাসগুলো ওদের পেট ভর্তি করে মানুষ ঠেসে নিয়ে দানবের মত দৌড়ে যাচ্ছে

বাসের হেল্পারগুলো জলদস্যুদের মত বাসের দরজা ধরে ঝুলে আছেঘন ঘন চটাস চটাস করে চড় থাপ্পড় মারছে বাসের গায়ে  সত্যিকার অর্থেই মোষের মত দেখতে একজন ট্রাফিক পুলিশ রাস্তার ঠিক মাঝখানে বিশাল এক ট্রাকের পথ রোধ করে  ড্রাইভারের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেসম্ভবত ধারপরে ফেরত দেবে

টোকাই কিসিমের একটা কিশোর ফুটপাথের এক কোনে দাঁড়িয়ে হাফ প্যান্টের কোণা তুলে হিসু করছেজিপার খোলার ঝামেলায় যায়নিব্যস্ত জীবন।

পাশের রাস্তায় মধ্যে কতগুলো লোক লোহার রড নিয়ে বসে ধাঁই ধাঁই করে পিটাচ্ছে দালান হচ্ছ কয়েকটা

হায়দারের দুরবস্থা দেখে সবাই দাঁত বের করে হাসছে

ট্রাফিক পুলিশটা গোপাল ভাঁড়ের মত আধ মণি ভুরি নিয়ে হেলতে দুলতে অলস ভাবে এসে দাঁড়ালো হায়দারের গাড়ির পাশেহায়দারকে মাপছে

তারপর বিরস মুখে বলল , ভাইজান আইহানে গাড়ি  পার্ক  করন জাইত না

পার্ক করিনিনষ্ট হয়ে গেছে বিরক্তি চেপে বলল হায়দার

 

 মহাবিশ্বের যাবতীয় জটিল ব্যাপারগুলো এক মুহূর্তেই বুঝে গেছে এমন একটা ভাব ভঙ্গি দেখাল ট্রাফিক পুলিশটা

তারপর লোম ভর্তি মোটা হাতটা বাড়িয়ে দিল হায়দারের গাড়ির ভেতরেদ্যান দেহি দেরাআইবিং লাইসেনসটা

পকেট থেকে একশো টাকার একটা নোট বের করে ট্রাফিকটার হাতে গুঁজে দিল হায়দারদাঁত মুখ খিচিয়ে বলল- ফাজলামো না করে গাড়িটা ধাক্কা দিনসামনে একটা ওয়ার্ক শপ আছে

 টাকায় কথা বলে

মোষের মত ট্রাফিকটা ধাক্কা দিতে লাগল হায়দারের গাড়িতে

সন্ধ্যা বেলায় রিক্সায় করে বাড়ি ফিরছিল হায়দার

বাড়ির একদম সামনে আসতেই রিক্সার পিছনের একটা চাকা গিয়ে পড়ল খোলা ম্যানহোলেকার্টুন ছবির মত উল্টে গেল পুরো রিক্সাটা কিছু বুঝে উঠার আগেই হায়দার নিজেকে আবিস্কার করলো রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা পৌরসভার ময়লার ডিপোর মধ্যে

চিৎ হয়ে পড়ে আছে সেপাশেই চিৎ হয়ে পড়ে আছে একটা মরা বিড়াল

 

 মুদির দোকান থেকে   চায়ের পাতা ,  দুটো  সাদা মোমবাতি আর এক বাক্স দেশলাই নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন জগলুল  সাহেব   হায়দারকে নিয়ে হাসপাতালে চলে যান  পরিচিত এক ডাক্তারকে ধরে মাথায় ব্যান্ডেজ করিয়ে  বেশ   রাতে বাড়ি ফেরে দুজনে  মিলি  দুজনকে চা বানিয়ে দেয়   জগলুল   ভুলে হাসপাতালে তাঁর চায়ের পাতা এবং অন্য সব জিনিসপত্র হারিয়ে এসেছেন 

বারবার  আফসোস   করলেন  জগলুল   রিকশাওলাকে  খানিক মারধর কড়া দরকার ছিল এই ভাবে কেউ রিক্সা চালায় ?

 তা ছাড়া দুর্ঘটনার পরও ওই হারামিটার  কিছু হয়নি

 হায়দার কিছু না বলে চুপচাপ বসে রইল  ভাবছে 

 পরদিন আপিসে যেতে হল না  অবশ্য 

 সারাদিন বাসায় বসে রইল  মিলি  সেবা  যত্ন করলো  বেশ

  ভাগ্যিস  খুব বড় চোট লাগেনি   অন্তত ডাক্তার সাহেব তো তাই বললেন 

আজকাল ডাক্তারদের উপর ভরসা করা যায় না  অবশ্য  রোগীর পেটের ভিতর ছুরি কাঁচি ব্যান্ডেজের  টুকরো  সবকিছু রেখে সেলাই করে দেয়  বলে একদম চিন্তা করবেন না সব ঠিক হয়ে যাবে

বিকেলবেলা বাগানে বসে চা এবং আড্ডা হল আবার

 শীতের বিকেলগুলোতে এই বাগানি আড্ডা জিনিসটা    খুবই ভাল লাগে হায়দারের বাইরে মায়াবী রোদ  শীতের হাওয়া এসে শিরীষ গাছের  ডালগুলিতে কাঁপন তুলে দিচ্ছে গোলাপ ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ 

 খুব চমৎকার  সব ভালো লাগার অনুভূতিহর হামেশা পাওয়া যায় না।  

 আড্ডা শেষ করে ঘরে ফেরার  সিঁড়িতে আছাড় খেল হায়দার  সিঁড়ির মধ্যে দু তিনটি মার্বেল পড়ে আছে কোত্থেকে এসেছে কে জানে পরে জানা গেল  দারোয়ানের  ছেলে ফটিকের মার্বেল এইগুলো    অবশ্য ফটিক দাবি করল গত  দুই বছর ধরে মার্বেল খেলে না  সে

 বড় হয়ে গেছে আজকাল  ঘুড়ি  উড়াতে বেশি ভালবাসে

ফটিককে মারধর করলো ওর বাপফটিকের নাকশা বরাবর কয়েকটা চড় বসিয়ে দিল

 লাভের মধ্যে এই হল, পড়ে গিয়ে শরীরের সব কয়টা হাড্ডি গুড্ডি ঝাঁকানাকা হয়ে গেল হায়দারের 

 

ভাইরে আমার মনে হয় আপনার উপর রাহুর দশা চলছে  উত্তেজিত ভাবে বললেন নৃপেন বাবু  ঢাউস সাইজের একটা পঞ্জিকা নিয়ে বসে আছেন তিনি  এই যে পরিষ্কার লেখা- বায়ু কোণে নাস্তি গতে কুলিক রাত্রি দোষ মঙ্গলে বিংশোত্তরী  কেতুর দশা চন্দ্র দগ্ধা  তিথ্যমৃতযোগ মাত্র  আপনার উচিত এখন মাষকলাই  , তেল , কৃষ্ণ তিল ,    নীলকান্তমণি না থাকলে মূল্য  এক টাকা  সব একত্রে গরিবদের দান করা  তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে

 

আমি অবশ্য  একমত না  বাধা দিলেন  জগলুল    সাহেব  বরাবরের মতো আজও তিনি হলুদ আর সবুজ পাতাবাহার মার্কা   জামা পরে আছেন    চ্যাঙরা পোলাপানদের জামা   কে তাঁকে বোঝাবে  ?

 

 আমার মনে হয় ভাইকে নিয়ে   শিশু  হুজুরের  কাছে যাওয়া উচিত  নিজের মত প্রকাশ করলেন  জগলুল   সাহেব

 

শিশু  হুজুরটা আবার   কী  ?’  অবাক হলো হায়দার

 

বড় কামেল  মানুষ ভাই   জগলুল সাহেব   ব্যাখ্যা করেন হুজুরের মাত্র সাত বছর বয়স।কিন্তু  এরই মধ্যে  কোরআনে হাফেজবাতেনি কাজ কর্মে সেরা।  আপনার চেহারা দেখে  ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান এমনকি আপনার সব সমস্যার কথা বলে দেবেন  তার উসিলার সব সমস্যার গায়েবি সমাধান হয়ে যাবে

 

  জগলু সাহেব বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করতে লাগলেন  শিশু  হুজুরের  চরিত্রনামা   কত মন্ত্রী  মিনিস্টার  তার মুরিদ একথা   বলে দিলেন 

হায়দার  অবশ্য  কিছুই শুনছে না   ড্রয়িং রুমের  সোফাতে চিত হয়ে   শুয়ে  ভাবছে  অলৌকিক ব্যাখ্যাতীত কিছুর উপর বিশ্বাস নেই  ওর  

পরের দিন বাসায় রইল 

ফাটা মাথা আর জ্বর নিয়ে আপিসে যাবার কোন কারণ দেখল না কেউ 

সারাদিন ধরে বই পড়ে, শুয়ে, কফি খেয়ে আর টুকলুর সাথে  ইস্কুলের পড়াশোনা নিয়ে কথা বলে সময়টা পার করলো  তবে  বিকেলে   দাঁড়ি কামাতে  গিয়ে গাল কেটে ফেলল অনেক খানি সেফটি রেজর ব্যবহার করার পরও !

পরের দুটো দিন এক ঘেয়ে কাটলো

তবে এর মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠল হায়দার আগামী কাল সাপ্তাহিক ছুটিযে যাই বলুক কাল ঠিকই মাছ ধরতে যাবে সে

জলাভূমিটা ওকে টানছে চুম্বকের মতফ্ল্যাটের অভিজাত কামরাতে বসেও জলজ ঘাসের ন্ধ পাচ্ছে সেতাছাড়া সেই বুড়ো হারামজাদার সাথেও খানিকটা বোঝাপড়া দরকার আছে

রাতে ঘুমের মধ্যে আবার সেই স্বপ্নটা দেখল হায়দার

দীঘল সবুজ ঘাসের অরন্যবাতাসে ঘাস দুলছে ফিস ফিস করে

মাথার উপরে মেঘের দলকাকের গলার পালকের রঙ সেই মেঘেরতারপর এলো ছোট ছোট রুপালি মাছের বৃষ্টি

ঘুমের মধ্যে একবার মনে হল বাইরে বোধ হয় সত্যি সত্যি বৃষ্টি হচ্ছে

 

পাঁচ

পরদিন সাপ্তাহিক ছুটি

অবাক হয়ে হায়দার দেখল সকাল থেকেই ঝুম ঝুমি বৃষ্টি হচ্ছেআকাশ ভর্তি মেঘআর শীতটা বেড়ে গেছে বৃষ্টির সাথে তাল মিলাতে গিয়েশীতকালে অমন বৃষ্টি ইহ জিন্দেগিতে আগে কখন  দেখেনি সে

আজকে আর   মাছ ধরতে যাওয়া যাবে না

তাতে অবশ্য লাভই হল

নৃপেন বাবু আর জগলুল সাহেবের সাথে আড্ডা মারা গেল অফুরন্তদফায় দফায় চা সাপ্লাই দিল মিলি

নৃপেন বাবুর মতে শীতকালে বৃষ্টি হওয়া নাকি ভাল প্রবাদে আছে-

যদি বর্ষে মাঘের শেষ

ধন্য রাজার পুণ্য দেশ

এত প্রাণবন্ত আড্ডার মধ্যেও বারবার মাছ ধরার কথা মনে হতে লাগল হায়দারেরঠিক হ্যায়সামনের ছুটির দিনে হবে শরীরটা ভাল লাগছেকাল আপিসে যেতে হবেঅনেক ছুটি নেয়া হয়ে গেছেবাসায় আর ভাল লাগছে না

 

 

ক্রিং ! ক্রিং! ক্রিং !

একটানা কর্কশ শব্দে বেড সাইডের টেবিলের অ্যালার্ম ঘড়িটা বেজে উঠলো

সকাল সাতটা

মড়ার মত ঘুমাচ্ছে হায়দারশীতের সকালের ঘুমটা সব সময় আরও বেশি আরামদায়ক লাগে ওর কাছে

 

এই উঠছো না কেন ?আপিস যেতে হবে না ? পিঠে এসে ধাক্কা দিল মিলি মরার মতো ঘুমাচ্ছে দেখি 

শুয়ে  কুকুরের মতো আড়মোড়া ভাঙল হায়দার   তড়াক করে উঠে  বাথরুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখল দরজা ভেতর থেকে বন্ধ

তারমানে টুকলু শাওয়ার করছে

বাবা তুমি কী একটু যদি জলদি বেরোতে পারবে ? বাইরে থেকে ছেলেকে জিজ্ঞেস করল সে

টুকলু কী একটা জবাব দিল

বেসিনের ক্যাবিনেট থেকে টুথপেস্ট নিয়ে ব্রাশে লাল জেলির মতো পেস্ট লাগালো হায়দার হাত ফস্কে ছিপিটা পড়ে গেল মেঝেতেতারপর নাচতে নাচতে সেটা চলে গেল বিছানার নীচে

 

ধ্যাত

 

 বিরক্ত হয়ে বাজে কয়েকটা গালি দিয়ে দাঁত মাজা শুরু করল সে হাতে সময় নেই

রান্নাঘরে রুটি টোস্ট করছে মিলি অন্যমনস্ক থাকায় একজোড়া পাউরুটির স্লাইস পুড়িয়ে ফেলল বেচারি

তারপর ছ্যাক ছ্যাক করে শব্দ হতে লাগলডিমের ওমলেট বানাচ্ছেজলখাবার করতে বসে বিরক্ত হল হায়দারআজকে রুটিগুলো টোস্ট করতে গিয়ে বেশি পুড়িয়ে ফেলেছে মিলিডিমের ওমলেটে লবণ নেইকিছু বলল না

আটটার মধ্যে নাস্তা শেষ করে টুকলুকে নিয়ে গাড়িতে বসল হায়দার টুকলুকে স্কুলে নামিয়ে সোজা আপিস গেটের দারোয়ান ওর থুতনিটা হাতে ধরা বিশাল গজারী কাঠের লাঠির উপর  রেখে ঘুমোচ্ছেএই সাতসকালেই

নিজের ডেস্কে এসে বসল

চেয়ারে বসে ড্রয়ারের দিকে হাত বাড়ালদরকারি কিছু ফাইল আর কাগজপত্র আছে

হঠাৎ চমকে উঠলো হায়দার

পরিষ্কার অনুভব করতে পারছে ড্রয়ারের ভেতরে বিশাল আর বিষাক্ত একটা কেউটে সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছেফোঁস ফোঁস শব্দও শুনতে পারছে সে

 

স্যারের শরীর খারাপ নাকি ? পাশ থেকে দাঁড়িয়ে কৌতূহলের সাথে জিজ্ঞেস করল রামগোপাল

অবাক হয়ে গেল হায়দার

আশ্চর্য !

একেবারে গত সপ্তাহের মত ঘটনা ঘটছে দেখি !

নাহ নাআমি ঠিকই আছি হর হর করে বলল হায়দারড্রয়ারটা খুলতে পারছি না

 

বলেই অবাক হয়ে গেল সেআরেগত সপ্তাহেও ঠিক এই কথাই বলেছে সে

 

কন কি? পান চিবানো এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ করে বলল রাম গোপালদেহি দেহি বলেই সামনে এগিয়ে  হ্যাঁচকা টানে ড্রয়ারটা খুলে ফেলল রামগোপাল

 

কই সার ড্রয়ের তো কোনও সমস্যা নাইক্কা  বিরস মুখে বললো পানখেকো রামগোপাল

আর কিছু ভাবতে পারছে না হায়দার

শীতের সকালেও ঘেমে গেছে ওর শরীর 

প্রতিটা ঘটনা সংলাপ ওর পরিচিত মনে হচ্ছে  মনে হচ্ছে আগে  দেখা কোন সিনেমা আবার দেখছে 

ঠিক দুপুরের একটু আগেই বড় সাহেব  ডেকে  নিয়ে গেল হায়দারকে তার নিজের কামরাতে হাতে ধরা একটা সাদা কাগজ কী সব লেখা তাতে 

এক লহমায় সব বুঝে গেল হায়দার প্রায় চিৎকার করে বলল, স্যার এইবারের লেখাটাও আমি লিখিনি 

মানে ? ভুরু কুঁচকে গেল বড় সাহেবের  আগেও কিছু লিখেছিলেন নাকি আমার নামে ?

চুপ করে রইল হায়দার 

বড় সাহেবের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে পড়ল বাংলাদেশ আপিস জগতের এক ফালতু বস অভদ্র বস সেই কার্টুন ।

ঘটনা ঘটে গেল হুবহু আগের সপ্তাহের মত 

আধা ঘণ্টা পর  ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত হয়ে ফিরে এলো নিজের ডেস্কে   কিছুই ভাবতে পারছে না সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে যেন 

হাড় কেপ্পন আজিজুল সাহেব বললেন, চলেন ভাই , ক্যান্টিন থেকে এক কাপ গরম দেখে চা খেয়ে আসি,  দুধ চা  হলে ভাল হয় , কি বলেন ? তারপর শুনি আপনার ঘটনার হিস্টোরিটা  খুবই অবাক হয়েছি বুঝলেন 

সারাটা দিন একটা ঘোরের মধ্যে রইল হায়দার  কিছু  একটা ঘটে গেছে ওর জীবনে বা কিছু একটা ঘটছে 

পরিষ্কার করে বুঝতে পারছে না

পরদিন বিকেল ।  বাড়ি ফেরার সময়  গাড়ি নিয়ে   অপেক্ষা করছিল  ট্রাফিক সিগন্যালের সামনে  লাল হয়ে যাওয়া আলোটা দেখছিল  

 

স্যার ডাব খাইবেন ? কচি ডাব  বুড়ো একটা ডাবওয়ালা এসে দাঁড়ালো ওর গাড়ির পাশে 

হায় হায় !  গত সপ্তাহে এই লোকটাই এসে দাঁড়িয়েছিল 

 

ভয়ে চোখ বড় বড় হয়ে গেল হায়দারেরতখনই ধিরিম করে পিছন থেকে একটা গাড়ি এসে ধাক্কা লাগিয়ে দিল হায়দারের গাড়িটাকেলাটুর মত পাক খেয়ে ফুটপাতের উপর চিত হয়ে পড়ে গেল কচি ডাবওয়ালা

এক লাফে উঠে দাঁড়ালো ল্যাংড়া ফকির  মেশিন গানের মত গালিগালাজ ছাড়ছে

তাড়া খাওয়া কুকুরের মত পালিয়ে এলো হায়দার

বাড়ি ফিরে বাগানে চুপচাপ বসে রইলএকা

ভাবছে

যতই ভাবছে ততই অন্য রকম একটা আতঙ্ক চেপে ধরেছে ওকে

সত্যি কি এই রকম ঘটনা ঘটেছিল ওর জীবনে ? গত সপ্তাহের ঘটনাগুলো আবার ঘটছে ?

কি করে সেটা সম্ভব ?

নন ফিকশন একটা বইয়ে পড়েছিল - দেজাভু  বলে একটা ব্যাপার আছেমস্তিষ্কের সমস্যা ভিকটিমের মনে হয় এই রকম ঘটনা আগেও ঘটেছেকোনও অপরিচিত জায়গায় প্রথম বার গেলেও মনে হয় এর আগেও এই জায়গায় এসেছিল

সেই রকম নয়তো ?

নাকি সত্যিই কিছু হচ্ছে ?

 

ছয়

 

পরদিন বিচ্ছিরি একটা জায়গাতে এসে নষ্ট হয়ে গেল হায়দারের গাড়িটা

এবং হায়দার নিশ্চিত , গত সপ্তাহে ঠিক এই  জায়গাতে এসেই নষ্ট হয়েছিল ওর গাড়িটা 

এবং গত  বৃহস্পতিবারে  ওয়ার্কশপের লোকেরা  ওর গাড়িটা মেরামত করে ডেলিভারি দিয়েছিল

ওই তো মোষের মত তাগড়া ট্রাফিক পুলিশটা রাস্তার মাঝ খানে দাঁড়িয়ে আছে ট্রাক ড্রাইভারের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে 

টোকাই কিসিমের একটা বালক পথের ধারে দাঁড়িয়ে হাফ প্যান্টের কোনা তুলে হিসু করছে 

ট্রাফিক পুলিশটা গোপাল ভাঁড়ের মত আধমণি ভুঁড়িটা নিয়ে  অলস ভাবে এসে দাঁড়ালো হায়দারের পাশে বিরস মুখে বলল, ভাইজান এহানে গাড়ি পারক করন জাইত না

 

পার্ক করিনি নষ্ট... বলতে গিয়ে থেমে গেল হায়দার  আরে গত  সপ্তাহেও তো সে এই কথাগুলো   বলেছিল  সত্যিই কোন গোলমাল আছে

আচ্ছা ভাই , গত সপ্তাহেও কি আমার গাড়ি  জায়গায় এসে নষ্ট হয়েছিল ?  জিজ্ঞেস করলো হায়দার

 

কেমতে কমু , কত মাইনসের গাড়িই তো এই রাস্তায় লস্ট অয়  উদাস ভাবে বলল মোষ মানে ট্রাফিক পুলিশ  যেন জগৎ সংসারের প্রতি তার  চরম অনীহা  যে কোনও একদিন  এক কাপড়ে বনে জংলে চলে যাবে বেছে  নেবে   সন্ন্যাস জীবন  কোনও একটা ন্যাংটা পাগল এসে ট্রাফিক কন্ট্রোলের দায়িত্ব নেবে 

 

দেন দেহি দেরাইবিং লাইসেন্সটা লোম ভর্তি কুৎসিত হাতটা সরীসৃপের মত এগিয়ে দিল হায়দারের গাড়ির ভেতরে

পকেট থেকে একশো টাকার  বের করতে করতে দ্রুত ভাবছে হায়দার  তারমানে কি আজ বিকেলে রিক্সা থেকে পড়ে আহত হবে আবার ?

ময়লার স্তূপ থেকে ওকে তুলে হাসপাতালে  নিয়ে  যাবে জগলুল সাহেব ?

ঠিক আছে দেখা যাবে

মেকানিক শপে গাড়ি জমা রেখে রিকশায় উঠতে গিয়ে থমকে গেল হায়দার    পরিষ্কার মনে আছে, গত সপ্তাহে এই ছোকরাই ওকে ফেলে দিয়েছিল ময়লার স্তূপে 

অ্যাই ব্যাটা খেঁকিয়ে উঠলো হায়দার চিনতে পেরেছিস আমাকে ?

 

না স্যার ভয় পেয়ে গেল বেচারা রিকশাওয়ালা 

  

তুই না আমাকে গত সপ্তাহে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলি 

 

কন কী স্যার ?আমি তো  হপায় মাত্র দুই দিন ধইরা শহরে আইছি আমাগ   গেরামের চদুর বাপ আমারে লইয়া আইছে বউরে হান্দায়া দিছে গারমেনসে  আর আমারে কইছে রিকশা ...

ঠিক আছে. ঠিক আছে  বাধা দিল হায়দার একবার ভাবল অন্য রিকশায় উঠবে  তারপর নিয়তির অমোঘ টানে লাফ দিয়ে উঠে বসল হপায় আসা রিকশাওয়ালার রিকশাতে 

এবং বাড়ির সামনে আসতেই দুর্ঘটনাটা ঘটলো 

রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা ময়লার ডিবির মধ্যে আবিস্কার করলো নিজেকে 

পাশেই চিৎ হয়ে পড়ে আছে একটা মরা বিড়াল 

ওই  তো দূরে জংলী ছাপার জামা পরে হেঁটে আসছেন জগলুল সাহেব হাতে দুটো সাদা মোমবাতি দেশলাই আর চা পাতার  গুঁড়ো , বাদামি কাগজে মোড়ানো 

ফোঁস করে দীর্ঘ শ্বাস ফেলল হায়দার

মাথায় ব্যান্ডেজ করে বাড়ি ফেরার পথে খুব সাবধানে জগলুল সাহেবকে জিজ্ঞেস করলো, গত সপ্তাহের মত আবার মাথা ফাটালাম তাই না ?

 

মানে ? বোকার মত তাকিয়ে রইলেন জগলুল সাহেব

মানে গত সপ্তাহেও তো আমার মাথায় চোট পেয়েছিলামঠিক এই ভাবেইআপনিই না আমাকে হাসপাতাল নিয়ে গেলেন ?

চোখ বড় বড় করে চুপচাপ হায়দারের দিকে চেয়ে রইলেন জগলুল সাহেববিড়বিড় করে কী যেন বললেন তারপরঠিক বোঝা গেল না আর কোন কথা না বলে চুপচাপ বাড়ির দিক চলে এলো দুই জনে

শুধু মাঝে মধ্যেই আড় চোখে জগলুল সাহেব দেখে নিচ্ছিলেন হায়দারকে

বাড়ি ফিরতেই মহা হই চই

মিলি রাগ ঝাড়ল রিকশাওয়ালার উপরতারপর চা বানাতে কিচেনে চলে গেল

জগলুল সাহেব চায়ের পাতা আর অন্য সব জিনিস পত্র ভুলে ফেলে এসেছেন হাসপাতালে

জগলুল সাহেব বারবার আফসোস করলেনতার মতে , রিকশাওয়ালাকে মারধর করার দরকার ছিল

শুধু বিদায় নেয়ার সময় আড়ালে মিলিকে বলল , ভাবী হায়দার সাহেবের দিকে খেয়াল রাখবেনমাথায় চোটটা বোধ হয় বেশিই পেয়েছেনউল্টা পাল্টা কথা বলছেনগত সপ্তাহেও নাকি মাথা ফাটিয়ে ফেলেছিলেন এ রকম কি সব যেন বললেন আমাকে

 

প্রায় সারারাত জেগে রইল হায়দার

অচেনা অন্যরকম একটা ভয় এসে বাসা বেঁধেছে ওর মনে  তার মানে গত সপ্তাহে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোই আবার ঘটছে ওর জীবনে   কি  সম্ভব ?  তাই বা হয় কেমন করে ? তাহলে অন্য সবাই বুঝতে পারছে না কেন ?

নাকি পুরো ব্যাপারটা বিচ্ছিরি কোনও স্বপ্ন ?

পরদিন বাসায় রইল হায়দার বিকেল বেলা নৃপেন বাবুর সাথে  বাগানে আড্ডা দেয়ার সময় হায়দার  জানতে চাইল , আচ্ছা নৃপেন বাবু , আপনার কি মনে হয় ? মানুষের জীবনে একই ঘটনা কি আবার ঘটতে পারে মানে একবার হয়েছিল আবার সেই ঘটনা হুবহু হয় ? মানে জানেন এই রকম কিছু ?

শুকনো কাঁঠাল পাতার রঙের   ঢাউস এক টুকরো কেক  মুখে দিয়ে নৃপেন বাবু বললেন,   হ্যাঁ, ইয়ে আউ আউ আউ...

 

ঠিক আছে আপনি আগে কেকটা খেয়ে শেষ করুন , তারপর বলুন বাধা দিল হায়দার

একটু লজ্জিত হাসি হাসলেন নৃপেন বাবু তারপর ধীরে সুস্থে সময় নিয়ে কেক শেষ করে চায়ের পেয়ালাতে চুমুক দিয়ে বললেন ,  বিদেশি কিছু ফিকশন বইতে অমন কিছু পড়েছিলাম একবার  টাইম  লুপ বা অমন কিছু তবে বুঝলেন না , সবই ফক্কা লেখকদের পয়সা কামানোর ধান্ধা  আরকি  

ব্যাপারটা  রকম,   মহা বিশ্বের  সব কিছুই গোলাকার  আমাদের গ্রহ, উপগ্রহ, এমন কি এদের কক্ষপথগুলোও গোলাকার আমাদের এই  গ্যালাক্সি ছায়াপথ সবই গোলাকার  বস্তুর ক্ষুদ্র  অ্যাটম  ফ্যাটমের  কক্ষপথ   গোলাকার  এক অদ্ভুত  চক্র সব কিছুই কিছু না কিছুকে কেন্দ্র করে ঘুরছে 

বলা হয় ইতিহাস পর্যন্ত পুনরাবৃত্তি হয়   একই ধরনের ঘটনা ঘটে একশো , পাঁচশো বা হাজার বছর পরে   রকম প্রচুর উদাহরণ আছে  তেমনই  সাধারণ মানুষের জীবনে  কিছু কিছু ঘটনা আবারও ঘটে যেতে পারে তারা নিজেরাও বুঝতে পারে অনেক সময়

 

আমার তো  মনে হয়  আমারও   রকম কিছু হচ্ছে শান্ত গলায় বলল হায়দার 

সেকি কি রকম ভাই ?

 

কিছু না বলে চুপ করে রইল হায়দার

আড্ডা শেষ করে ফেরার পথে সিঁড়িতে আছাড় খেল হায়দার  সিঁড়ির মধ্যে দু তিনটে  রঙ্গিন  কাচের  মার্বেল পড়ে আছে  

বিড়বিড় করে হায়দার শুধু  বলল ,  আমি জানতাম এমনটা হবে

পরের দিনগুলো বাসায় রইল সে জ্বর তবে আগামী কাল ছুটির দিন  সপ্তাহের শেষ আগামী কাল সে মুখমুখি হবে চরম  সত্যের কাল মাছ  ধরতে গিয়ে বুড়োকে খুঁজতে হবে 

সব  রহস্যের চাবি ওই বুড়ো হারামজাদা

 

ছুটির দিনে সকালে উঠে আবিস্কার করলো বাইরে  ঝুম বৃষ্টি বেত ফলের মত কালো মেঘে ঢাকা আকাশ আর ঠাণ্ডাও পড়েছে প্রচুর অকস্মাৎ  এই রকম দিনে মাছ ধরতে যাবার কথা কোনও পাগলেও চিন্তা করবে না

দিনটা কেটে গেল আড্ডা আর পেয়ালার পর পেয়ালা চা দিয়ে

জীবন কত সুন্দর 

তাই  কী ?

 

সাত 

 

ক্রিং   ক্রিং ক্রিং

একটানা কর্কশ শব্দে  বেড সাইডের  টেবিলের অ্যালার্ম ক্লকটা বেজে উঠল সকাল সাতটা মরার মতো ঘুমাচ্ছে হায়দার শীতের সকালে ঘুমটা বড্ড বেশি আরামদায়ক মনে হল

 এই উঠছো না কেন ?আপিস  যেতে হবে না ?’   পিঠে এসে ধাক্কা দিল  মিলি  মরার  মতো ঘুমাচ্ছে দেখি 

শুয়ে    আড়মোড়া ভাঙল হায়দার   ,  কুকুরের মতো তারপর  তড়াক  করে উঠে দাঁড়াল বাথরুমের সামনে গিয়ে  দেখল দরজা ভেতর  থেকে বন্ধ

 তারমানে টুকলু  শাওয়ার করছে

 বাবা তুমি কী    একটু...  বলত গিয়ে থেমে গেল হায়দার 

চরম আতঙ্কে উপলব্ধি করল , আরও একটা নতুন সপ্তাহ শুরু হয়েছে ওর জন্য  দুঃস্বপ্ন নিয়ে কী যেন বলেছিল বুড়ো শয়তানটা ? বলেছিল, তোমার জীবনটা একঘেয়ে হয়ে যাবে মনে হবে জীবনটা একটা ফাঁদ

ত্যি সত্যি একটা ফাঁদে  আটকে গেছে হায়দারের জীবন কখনই মুক্তি পাবে না সে এই ফাঁদ থেকে 

চলতেই থাকবে

টুথপেস্ট   নিয়ে ব্রাশে লাল জেলির মতো  পেস্ট  লাগালো হায়দার   হাত ফস্কে ছিপিটা পড়ে গেল মেঝেতে তারপর  নাচতে নাচতে সেটা  চলে গেল বিছানার নীচে 

ছ্যাক ছ্যাক  করে শব্দ হতে লাগল  ডিমের ওমলেট বানাচ্ছে  মিলি পুড়িয়ে ফেলেছে বেচারি একজোড়া পাউরুটির স্লাইস

 

 

কী ব্যাপার ? খেঁকিয়ে উঠলো হায়দারপ্রত্যেক শনিবার সকালে তোমার টোস্ট পুড়ে যায় কেন ? অ্যাঁ ? আর ডিম ছাড়া আর কিছু নেই ঘরে ? 

অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মিলিযেন এই প্রথম হায়দারকে দেখছে  বেচারি কিছুই বুঝতে পারছে না

চট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল হায়দারদ্রুত শেষ করল জল খাবারতারপর টুকলুকে গাড়িতে করে নিয়ে ইস্কুলে নামিয়ে দিল আপিসে  আজ আর  যাবে না

সোজা চলে গেল মাছের বাজারে

অনেক বেছে আর পছন্দ করে কিনে ফেলল চমৎকার একটা শোল মাছবেশ টাটকাহীরার মত বরফের কুঁচিতে শুয়ে আছে মাছটা

 গাড়ি চালিয়ে সোজা চলে গেল দুধসাগর জলাশয়ে পরিষ্কার বুঝতে পারছে,   কোন দিনই ছুটির দিন  আসবে না ওর জীবনে

সত্যি সত্যি ভয়াল এক ফাঁদে আটকে পড়েছে ওজাদুকরের অভিশাপে

সকাল মাত্র এগারোজায়গাটা বড্ড বেশি নিঝুমকয়েকটা ছাগল ঘুরে বেড়াচ্ছেলতাপাতা আর কচি সবুজ ঘাস খাচ্ছেএক মুঠো প্রজাপতি উড়ছে- যার যেমন ইচ্ছে মতবাতাসে জলজ ঘাসের ঘ্রাণদূরে একটা নিম পাখি ডাকছে অলস সুরে

গাড়ি থেকে নেমে কয়েক ক  হেঁটে গেল হায়দারবা হাতে ধরে রেখেছে পলিথিন ব্যাগটাভেতরে শোল মাছ

হেই বুড়ো চেঁচিয়ে ডাকল হায়দারকোথায় তুমি ? আমি জানি তুমি এখানেই আছ সামনে এসো।

 

কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ

শুধু একটা ভোমরা গুঞ্জন তুলে হায়দারের কানের পাশ দিয়ে চলে গেল

আবার সব শুনসান

তারপরই পিছনের ঘাসের মধ্যে খস খস একটা শব্দ শুনে পাই করে ঘুরে দাঁড়ালো সে

দীঘল লম্বা ঘাস আর শটিবনের ভেতর থেকে বের হয়ে এলো সেই বুড়োটাচোখ দুটো শিশুদের মত সরল আর নক্ষত্রের মত উজ্জ্বলহাতির দাঁতের মত সাদা চুল- দাঁড়ি- গোঁফ

এই নাও তোমার মাছ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল হায়দার

কারণ ছাড়াই  হাঁপাচ্ছে 

অদ্ভুত এক টুকরো হাসি ফুটল বুড়োর মুখেহাত বাড়িয়ে হায়দারের কাছ থেকে মাছটা নিল

দুই হাতে এমন ভাবে মাছটা ধরল যেন সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া মানব শিশুকে আদর করছে ধাইমা

 

কী মাছ এটা ? মাছটার গায়ে আদর করে হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করল বুড়ো

শোল মাছ

ভালআমি পছন্দ করিএগুলোকে জিয়ল মাছ বলেযেমন- কৈ , মাগুর, শিঙ খুশি খুশি গলায় বলল বুড়ো

কে তুমি ? ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করল হায়দার

 

আমি জাদুকর

কোত্থেকে এসেছ ? থাকো কোথায় ? 

অন্য জায়গা থেকেঅন্য সময় থেকে

কেন মাছ চাও ?

খেতে ভাল লাগেআমাদের ওইখানে মাছ পাওয়া যায় নাকোন  জলাভূমিই  নেইসেইজন্য মাছ ও ধরতে পারি না আমিআমি তো সব সময়ই আসতামআগের দিনের মানুষজন আমাকে চিনতআজকাল অত বেশি কেউ চেনে নাআগের দিনের মানুষজন বট আর অশ্বত্থ গাছের ডালে জিয়ল মাছ পুড়িয়ে ঝুলিয়ে রাখতআমার জন্যইবলতো অপদেবতার ভোগশনির ভোগও বলতো কেউ কেউ

আচ্ছা ব্যাপারটা কিছুটা বুঝতে পারল হায়দারতুমি তা হলে...

 

বললাম না , আমি জাদুকরঅন্তত এই নামেই ডাকতো পুরানো দিনের লোকজনঅপদেবতাও বলে অনেকে।

 

কী করেছ তুমি আমার ? 

তেমন কিছু না শুধু সময়ের একটা  চক্র বানিয়ে ফেলেছি সময়ের ফাঁদে আটকে গেছ তুমি পেঁয়াজের স্তরের মত ।

কী ভাবে করলে ? 

চর্চা  তোমাদের বিজ্ঞান আরেকটু উন্নতি হলে এর ব্যাখ্যা তোমরাও দিতে পারবে আরও ভয়াল অশৈলী ব্যাপার তোমরাও করতে পারবে।  জাদু তো আসলে একরকম বিজ্ঞানই  বা বিজ্ঞান এক রকম জাদু

 

দুইজনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইল চোখে চোখ রেখে

রোদের তাপে গাছপালার ঠাস বুনট থেকে  ঝাঁঝাল একটা গন্ধ আসছে জলাভূমির ঠাণ্ডা কালো জলে ঘাই দিয়ে উঠলো নাম না  জানা একটা মাছ

তুমি পারলে মাঝে মধ্যে এক আধটা মাছ দিয়ো  আমাকে অনেকক্ষণ পর নরম গলায় বলল বুড়ো এতে তোমার ভালই হবে

পাব কোথায় তোমাকে ?

আমাকে খুঁজতে হবে না। শালপাতায় মুড়িয়ে ওই বট গাছটার তলায় রেখে দিও আমি ঠিকই পেয়ে যাব 

মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল হায়দার হাসি মুখে বিদায় নিল বুড়োর কাছ থেকে 

কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে কি মনে করে পিছন ফিরে চাইল বুড়ো নেই 

গাড়িতে বসে স্টার্ট দিয়ে  ফিরে চলল আপিসের দিকে

মনটা হালকা লাগছে কার্পাস তুলার মত 

ওর অবচেতন মন বলছে সব কিছুই স্বাভাবিক হয়ে যাবে

চমৎকার একটা সপ্তাহ কাটল হায়দারের  কোনও রকম দুর্ঘটনা ছাড়াই প্রতিটা মুহূর্তে অনুভব করল জীবনের প্রতিটা পল-ক্ষণ  দারুণ রকম উপভোগের 

ছুটির দিনে আবহাওয়া রইল  খুবই সুন্দর  নরম রোদে মাখা মাখা 

ছুটির দিনে মাছে ধরতে গেল হায়দার  কোনও কারণ ছাড়াই প্রচুর মাছ ধরতে পারল কলা পাতায় মুড়িয়ে একটা  মাছ রেখে এলো গাছতলায় 

রাতে মিলির  মাছ ভাঁজার সৌরভে ক্ষুধার্ত নৃপেন বাবু এসে হাজির হলেন বিড়ালের মত

 

ক্রিং! ক্রিং ! ক্রিং!

শনিবারের সকাল  

অ্যালার্ম ঘড়ির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেছে হায়দারের  শক্ত হয়ে উঠলো ওর শরীর 

মিলি এসে অ্যালার্ম বন্ধ করল তারপর হাত দিয়ে  এলোমেল করে দিল হায়দারের চুল

ঘুমাও তুমি ফিস ফিস করে বলল মিলি আজ থেকে সপ্তাহে দুইদিন করে  ছুটি  তোমার আপিস 

দুপুর পর্যন্ত ঘুমাল হায়দার

দুপুরে ঘুম ভাঙল বিরিয়ানি  আর , খাসির রেজালার ঘ্রানে  

 

 

বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে


 

মন্তব্যসমূহ