সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

প্রজাপতির ডানায় রক্ত

 প্রজাপতির ডানায় রক্ত

-----------------------------------

 

 

খুব বেশি রাত বলা যাবে না

অনেকেই অমন সময় অপিস থেকে বের হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মউসুমি ফল দাম দস্তুর করে  বাড়ির পথ ধরে

তারপরও , মহিলা সমিতির নাটক দেখা শেষ করে শাহানা বেগম যখন  বাইরে বের হলেন,

 মনে হচ্ছিল জায়গাটা বড্ড বেশি নিঝুম ।    

কবজির ঘড়ির ডালায় চেয়ে বান্ধবী আরতি লাহিড়ী  চেঁচিয়ে উঠলেন ,’ দেখ দেখি কাণ্ড ! রাত সাড়ে আটটা ! ওদের সামাজিক  নাটকগুলো ফালতু সংলাপ দিয়ে  বিচ্ছিরি রকমের বড়  করে  তার উপর আজ শো আরম্ভ করেছে পৌনে এক ঘণ্টা দেরি করে অমন করলে মানুষ কেন আসবে টিকিট কেটে এই সব মঞ্চ নাটক ফাটক দেখতে ?.

যুক্তিতে ধার বেশি

কলেজ জীবনে শখ, থিয়েটারে নাটক দেখা

আজও ছাড়তে পারেনি দুই বান্ধবী এখনও সময় পেলে দেখে

আজ ছিল হ্যামলেট এত বার মঞ্চায়িত করার পরও এই নাটকের আবেদন কখনই ফুরাবে না শোনা যায় ইংল্যান্ডের স্ট্রাটফোর্ডের রয়্যাল শেক্সপীয়ার থিয়েটারে আজও এই নাটক সবচেয়ে বেশি সময় ধরে মঞ্চায়িত হচ্ছে !    

আজ লোভে পড়ে দেখে ফেলল  দুই বান্ধবী কিন্তু সত্যি সত্যি বেশ দেরি  করে ফেলেছে থিয়েটারের লোকজন ।            

দর্শক  হয়েছিল  ভালই

এক সাথে সব দর্শক বের হতেই খালি রিক্সাগুলো ঝপ ঝপ করে সওয়ারী নিয়ে ভেগে গেল

তোমাকে খানিক সামনে এগিয়ে দিয়ে আসব নাকি ?. বান্ধবীকে জিজ্ঞেস করলেন আরতি লাহিড়ী

আরে না '   প্রতিবাদ জানালেন  শাহানা বেগম কয়েক কদম হেঁটে গেলেই রিক্সা পেয়ে যাব তুমি বরং সামনের রিক্সাটা নিয়ে বাড়ি চলে যাও আমার সমস্যা হবে না সামনের মিনি  মার্কেট থেকে চা পাতা আর চিনি কিনে বাড়ি ফিরব ।  রবিবার সময় পেলে বাসায় এসো কাশ্মীরি পোলাও রান্না করব।  আলুর দম দিয়ে

'থাক,  থাক লোভ দেখাতে হবে না চলে আসব তুমি কিন্তু সাবধানে যেও'  খুশি খুশি গলায় জবাব  দিলেন আরতি লাহিড়ী

দুই বান্ধবীর বিচ্ছেদ হয়ে গেল সাময়িকের জন্য রাস্তার পাশের  বুড়ো এক  রিক্সাওয়ালা পেয়ে উঠে গেলেন লাহিড়ী উনার বাড়ি নিমতলি আসলেও দূরে ।  

হাঁটতে লাগলেন শাহানা বেগম

এই এলাকা যে রাতের বেলা এত দ্রুত শুনশান হয়ে যায় সেটা  অবশ্য আগে জানতেন না

আশ্বিন মাস

ভাদ্রের তাল পাকা গরম নেই তারপরও গরম

ভাগ্য ভাল হালকা বাতাস দিচ্ছে রাস্তার ছেঁড়া পলিথিনের টুকরো জেলিফিশের মত উড়ছে ।   

ফুটপাথের দোকানগুলো উঠে গেছে একটা ল্যাংড়া ভিক্ষুক সারাদিন ভিক্ষা পাওয়া ময়লা-. ছেঁড়া-  স্বচ্ছ টেপ সাঁটা টাকাগুলো ক্লান্ত মুখে গুনছে

রাস্তায় হালিম বিক্রি করতো এক ঠ্যালাঅয়ালা চলে গেছে সেহাড্ডি গুড্ডি নিয়ে চার পাঁচটা কুকুর কেমন একটা জলসা বসিয়ে দিয়েছেযত না খাচ্ছে তার চেয়ে বেশি ঝগড়া করছে

হন হন করে হেঁটে যাচ্ছেন শাহানা বেগম

একটা রিক্সা ও চোখে পরছে না

অদ্ভুত কাণ্ড

এটা  সত্যি ,  দরকারের সময় রিক্সা পাওয়া যায় নাএটারও কোন লজিক নিশ্চয়ই আছেযেমন দেখা যায় যে বইটা,  আপনি হন্যে হয়ে  খুঁজছেন সেই বইটা পাবেন পেল্লাই স্তূপের  সব বইয়ের একদম তলায়

হেঁটে পার হয়ে গেলেন রাস্তাটা একটা তারকাটা , পেরেক নাট বল্টুর দোকান  পার হয়ে চিত্ররেখা’   ছবি বাঁধাইয়ের দোকান ডানে রেখে বড় রাস্তায় উঠলেন

এখানের আবার ল্যাম্পপোস্টের আলোটা তিড়িং বিরিং করে লাফাচ্ছে যেন মঞ্চ নাটকের বিজলি চমকাচ্ছে

কোত্থেকে ছেলেটা এসে  ঝাঁপিয়ে পড়লো বুঝতেই পারলেন না

লক্ষ্য শাহানা বেগমের হাতের ব্যাগটা

চমকে উঠলেও   সহজে ছেড়ে দিলেন না শাহানা বেগম টানা হেঁচড়া করতে লাগলেন যুবকের সাথে ।  তেমন টাকা পয়সা নেই কিন্তু ব্যাগটা দামি শখের জিনিস অনেক স্মৃতি !

ফর্সা অল্প বয়স্ক যুবক চেহারা দেখেই বুঝা যায় ভদ্রঘরের ছেলে হয় নেশার টাকা জোগাড়ের জন্য বা  প্রেমিকার দামি উপহার কেনার জন্য এই পথে নেমেছে

গায়ের জোরে পারবেন কেন ?

 সাহায্যের আশায়   চেঁচিয়ে উঠতে যাবেন তখনই চোয়ালে ধিরিম করে ঘুষি মেরে বসলো ছিনতাইকারী যুবক   

আলগা হয়ে গিয়েছিল হাত

টান দিয়ে ব্যাগটা নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল তস্কর রাস্তার উল্টা দিকের অন্ধকার গলিতে

ব্যাথায় অভিমানে চোখে জল চলে এলো শাহানা বেগমের কষ্ট পেলেন এই ভেবে পঞ্চান্ন বছরের বয়স্কা মহিলার গায়ে কি ভাবে হাত তুলল ছেলেটা  ?   

 

 

 

সকাল এগারো

অফিসার গাউস চৌধুরী  আরাম করে  বসে খবরের কাগজের বকোয়াজ কিসিমের খবরগুলোতে চোখ বোলাচ্ছিলেন সেই যানজট , ফসলের নায়্য দাম পাচ্ছে না হেকমতগঞ্জের কৃষকরা রাশিফল - দিনটা কেমন যাবে বিদেশ গমন ফর্সা পাত্রী চাইজমি বিক্রয়

হেন তেন

বাদুর দরজার ফাঁক দিয়ে রোগা গোঁফওয়ালা কনস্টেবল উকি দিল , ' স্যার একজন মাতারি দেখা করতে চান আপনার সাথে '

' আসতে বল শব্দটা মাতারি না বলে ভদ্রমহিলা বল ইডিয়েট ক্যাহিকে ' জবাব দিলেন গাউস চৌধুরী

মুহূর্ত খানেক পর ভেতরে চলে এলেন শাহানা বেগম

ভাল দামি রুচিশীল বেশ ভূষা

' বসুন ম্যাডাম ' সম্মান দিয়েই বললেন গাউস চৌধুরী

থানায় নতুন এসেছেন শহরের সবাইকে চেনেন না কাজেই ছটাক খানেক বিনয় বেশি দেখান , সবার সাথেই

' কাল রাত্রে ফোন করে অভিযোগ করেছিলেন তাই না ?' শাহানা চৌধুরী চেয়ারে বসতেই সোজা কাজের কথায় চলে গেলেন গাউস চৌধুরী

উনার মটো - কম কথায় লাইফ ইজি সবাই থাকুক বিজি

'জি স্যার আমি শাহানা বেগম মিনা বাজারের ওখানের  হংস থিয়েটারের বাইরে ব্যাগ ছিনতাই হয়েছে '

আশা করছি ছিনতাইকারী খুব বেশি আঘাত করেনি আপনাকে ' ভদ্রমহিলার মুখের এক পাশে নীলচে কালো দাগ দেখে জানতে চাইলেন তিনি

'ব্যাথার চেয়ে মানসিক আঘাতটা বেশি লেগেছে ট্রমা না ফ্রমা বলে না আজকাল, সেটা ব্যাগ ধরে টান দেয়ায় হাতে একটু ব্যাথা পেয়েছিসামান্য দাগ রয়ে গেছে ওখানে '

' সামান্য ভয় পেয়েছিলেন বোধ হয় ?' পেশাদারি একটা ভাব ধরে কথা চালিয়ে যাচ্ছেন গাউস চৌধুরী

আগ্রহ পাচ্ছেন নামোবাইল আর ব্যাগ ছিনতাই নিয়ে পড়ে  থাকলে চলবে ? বড় কিছু করতে না পারলে প্রমোশন ...

' সেটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই ' লজ্জিত ভাবে বললেন শাহানা বেগম ' মুখের দাগটাই বেশি খারাপ লাগছে জানেন , জীবনেও আমার গায়ে কেউ আঘাত করেনি '

' এটা হচ্ছে ভাগ্যের কিল কথায় বলে না ভাগ্যের কিল বাপেও কিলায় সরি আপনি নিশ্চয়ই সেই ব্যাটার চেহারাটা পরিষ্কার দেখেছেন ?'

' নিশ্চয়ই ' আত্নবিশ্বাস ভরা গলায় জবাব দিলেন শাহানা বেগম ' আলো তেমন ছিল নাতারপরও দেখেছি সারা জীবনে ভুলব না শয়তানটার চেহারা আবার দেখলেই চিনতে পারব '

খুব খুশি হলাম ' চেয়ার থেকে উঠে  গালিভার সাইজের একটা দেরাজের সামনে যেতে যেতে মন থেকেই বললেন গাউস চৌধুরী ' চাক্ষুষ  সাক্ষীর অভাবে বেশির ভাগ ছিনতাই কেস দফারফা করতে পারি না আপনাকে অনেক ধন্যবাদভাল কথা , আমার আরও কিছু প্রশ্ন আছে সেই সাথে আপনাকে একটা ছবির এ্যালবাম দেখাব বেশ কিছু দাগী অপরাধী আর চোর চোট্টার ছবি একটু মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে আপনি কি একাই থাকেন ? '

' না , সাথে আমার মেয়ে লিজা আর ওর স্বামী ইকবাল থাকে '

' কিন্তু আপনার ভোটার আইডি আর ঠিকানা দেখে আমরা খোঁজ পেয়েছি বাড়িটা আপনার নামে ' মহাভারতের সমান ধেড়ে  একটা ফাইল হাতে নিয়ে ফিরে আসতে আসতে বললেন গাউস চৌধুরী

' হ্যাঁ,  হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন ' মলিন হাসি দেখা গেল শাহানা বেগমের মুখে বাড়িটা আমার স্বামীর উনার নাম আজমল হুদা অনেক বছর আগে লিজার বয়স যখন দশ এগারো মাস হবে, উনি মারা গেছেন আমার নামেই উইল করা ছিল পেয়েছি'

' বুঝতে পেরেছি ' সবজান্তার মত মাথা ঝাঁকালেন গাউস চৌধুরী ' এখানে একটা সাইন করুন তারপর দয়া করে পাশের রুমে গিয়ে ছবির এ্যালবাম দেখুন একটু সময় নিয়ে ওখানে পেলেও পেতে পারেন মানিক রতন অবস্থা গত দশ বছর ধরে যারা শহরে অপরাধ করে বেড়াচ্ছে সবার ছবি পাবেন সব ধরনের ক্রিমিনাল আছে ওখানে ছবি দেখে যদি চিনতে পারেন , চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে হারামজাদাকে আপনার সামনে হাজির করব গাউস চৌধুরীর জবান '

লোকটার ভাব ভঙ্গী দেখে এত কষ্টের মধ্যেও হেসে ফেললেন শাহানা বেগম

দরজার পাল্লা  ঠেলে  পাশের কামরায় নেয়া হল

মাঝাঁরি মাপের কামরা  তিন দেয়াল জুড়ে বড় বড় দানবদের ব্যবহার উপযোগী ফাইল ক্যাবিনেট

টেবিলের উপর ইনকাদের আমলের টেবিল ফ্যান লোহার জিনিস ঘট ঘট শব্দ করে ডানে বামে মাথা নেড়ে চলছে যে টুকু বাতাস দেয়া দরকার, দিচ্ছে নাফাঁকিটা পুষিয়ে দিচ্ছে বিকট শব্দ করে যেন চিৎকার করে বলছে , এর চেয়ে বেশি পারব না

ভেতরে   ইউনিফর্ম গায়ে দুই অফিসার একজন কানে হেডফোন  সেঁটে  কার সাথে যেন কথা বলছে অন্য জন গালে হাত দিয়ে বসে ফাইল দেখছে

এক কোনে নীলচে রঙের  আধ স্বচ্ছ  জলের গ্যালন পাশে  কাগজের দেড় ডজন   কাপ

পনের মিনিট পর মহাকাব্যের সাইজের ফাইলটা ঝপাস করে বন্ধ করতে করতে হতাশ গলায় শাহানা বেগম বললেন , ' না স্যার খুবই দুঃখিত,  লোকটার মত দেখতে কোন ছবি পেলাম না '

 

হতেই পারে ' দুই হাত উল্টে আসর জমানোর মত একটা ভঙ্গী করে বললেন গাউস চৌধুরী ' ক্রিমিনালদের ফাইল খুলেই কাঙ্ক্ষিত চোর চোট্টা পেয়ে যাবেন সেটা একদম আশা করছি নাহতে পারে পুরাতন কোন ক্রাইম রেকর্ড নেই একদম  ফ্রেশ  ব্যাকগ্রাউনড পুলিশ ওর কোন ছবি তোলার সুযোগই পায়নি ।  হয়তো  অল্প দিন হল লাইনে নেমেছে হতে পারে ড্রাগ এড্রিকট  আচমকা টাকার দরকার হয়েছিল আপনাকে পেয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছে '

' আপনার আনুমান ঠিক হতে পারে' হতাশ গলায় জবাব দিলেন শাহানা বেগম ' একদম অল্প বয়স্ক ছেলেটাভয়ংকর চেহারা ভাগ্য ভাল চাকু মাকু ছিল না সাথেখুবই কম বয়স ইস্কুল শেষ করেছে হয়তো '

'এই ধরনের ছোকরাগুলো আসলে বেশি বিপদজনক ' মুখ  কুঁচকে  শান্ত গলায় বললেন গাউস চৌধুরী ' সময় মত টিট করতে না পারলে পরে আরও বড় মাপের  ক্রাইম করে বসবে আপনার আপত্তি না থাকলে আর যদি ক্লান্ত না হয়ে থাকেন তবে আরেকটা ফাইল দেখাতে পারি কষ্ট করে যদি একটু দেখতেন '

গাউস চৌধুরীর কণ্ঠে অনুরোধের ছোঁয়া চোখে আবেদন

'নিশ্চয়ই' হেসে ফেললেন শাহানা বেগম ' এমনিতেও বাসায় কোন কাজ নেই '

ফাইলটা সরিয়ে নিয়ে টেবিলের ড্রয়ার থেকে আরেকটা মহাভারত বের করলেন ভদ্রলোক ধূলা ঝেরে সামনে দিলেন

পাতা উল্টাতে লাগলেন শাহানা বেগম

বাকি দুই অফিসার একঘেয়ে চোখে চেয়ে আছে তার দিকে এক জন ঘন ঘন হাই তুলছে

হাইয়ের শব্দ বিচিত্র বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া প্রাণীর  আর্তনাদের মত ।  

প্যান্টের দুই পকেটে হাত ভরে অলস ভাবে পায়চারি করতে লাগলেন গাউস চৌধুরি ফিরে গেলেন জলের গ্যালনের দিকে খানিক ঝুকে কাগজের কাপে জল নিলেন প্ল্যাস্টিকের ট্যাব খুলে

পাতা উল্টে যাচ্ছিলেন শাহানা বেগম

আচমকা একটা ছবি দেখে কেমন যেন থমকে গেলেন

দুঁদে অফিসার গাউস চৌধুরীর নজর এড়ালো না সূক্ষ্ম ব্যাপারটা ' কিছু পেলেন মনে হচ্ছে ?'

জবাব দিলেন না শাহানা বেগম চোখ বড় বড় করে দেখছেন অ্যালবামটা মগ্ন কথা যেন কানেই যায়নি

পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন গাউস চৌধুরী ' চেনা চেনা লাগছে ?'

ভীষণ ভাবে চমকে উঠলেন ভদ্রমহিলা , ' কিছু বললেন আমাকে ?'

' মনে হল ছিনতাইকারীর চেহারার সাথে মিল আছে অমন কোন ছবি দেখেছেন এ্যালবামে , তাই জানতে চাইছি ' নরম গলা গাউস চৌধুরীর

' না না' হব হব করে বললেন শাহানা বেগম ' আমি তো আপনাকে বলেছিই ছনিতাইকারী ছেলেটার বয়স অনেক কম , আর বেশ রোগা মাথার চুল পাতলা এখানে তেমন কাউকে পেলাম না '

শাহানা বেগম বললেন না কিছু

ক্রিমিনালদের ছবি দেখতে গিয়ে তিনি চমকে গেছেন কারন একটা ছবি তার অনেক চেনা ভুল হবার প্রশ্নই উঠে না

মেয়ে লিজার স্বামী ,  ইকবালের ছবি ওটা

 

 

বাড়ি ফিরে শাহানা বেগম দেখলেন বরাবরের মত সোফায় আধ শোয়া হয়ে বসে আছে লিজা অনেক সময় নিয়ে নখে নেইল পলিস দিচ্ছে এই একটা কাজ করতে গিয়ে  ঘণ্টা দুই শেষ করতে পারে মেয়েটা

পাশে দাঁড়িয়ে দামি একটা লিলেনের স্যুট গায়ে চাপাচ্ছে ইকবাল

' মা ফিরলে ?' ফিরে চাইল লিজা ' গিয়েছিলে কোথায় ?'

ডাক্তারের কাছে ' ডাহা মিথ্যা বললেন তিনি

' আম্মাজান আমি একটু বাইরে যাচ্ছি ' মিষ্টি হেসে বলল ইকবাল ' শেয়ারের এক দালাল আছে আমার দোস্ত কিছু টাকা লাগবো ভাবছি '

চোস্ত সুদর্শন যুবক ইকবালের দিকে আজ নতুন করে নজর দিলেন শাহানা বেগম

কেমন যেন অচেনা লাগছে না ?

'আম্মাজান' মিহি হেসে সামনে চলে এলো ইকবাল ' কতদিন আপনাকে বললাম ব্যাঙ্কে টাকা ঘুম পাড়িয়ে না রেখে শেয়ার মার্কেটে খাটান আপনি চাইলে আমি ব্যবস্থা করতে পারি করব নাকি ? বেশি না মাত্র দশ লাখ দিলেই হবে।  '

 

'আম্মাজান' কে অভিভূত করে দেয়ায় জন্য মুখ ভর্তি হাসি নিয়ে সামনে চলে এলো ইকবাল

' ইকবাল ' চিবিয়ে চিবিয়ে বলল লিজা ' কতবার তোমাকে বলব ? আমার  মায়ের টাকা  ছাড়া আর কিছু মাথায় আসে না ?'

ধাতানি খেয়ে কেমন থতমত খেয়ে গেল ইকবাল

নিজেকে সামলে নিয়ে বেহায়ার মত হেসে বলল , ' সরি সরি ভুল হয়ে গেছে সোনার ময়না পাখি আচ্ছা আমি যাই রাতের খাবার এক সাথেই খাব '

তারপর প্রায় পালিয়ে গেল

মায়ের দিকে ফিরল লিজা ' তোমাকে অমন দেখাচ্ছে কেন মা ? সব ঠিক আছে তো ?'

'সব ঠিক মামণি আমার ' দুই হাত কচলাতে কচলাতে মন খারাপের গলায় জবাব দিলেন শাহানা বেগম ' আমি শুধু ইকবালের কথা ভাবছি '

'ইকবালের আবার কী হল ?' লিজা অবাক ' আমাদের বিয়ের পাঁচ বছর চলছে জানি ওকে পছন্দ করে বিয়ে করায় রাগ করেছিলে কিন্তু সে সব তো কবেই চুকে বুকে গেছে '

' না মা সেই সব না' তাড়াতাড়ি বললেন শাহানা বেগম মেয়ের মাথায় সস্নেহ হাত বুলিয়ে দিলেন ' আমি চাই তুমি খুব  সুখী হও মাদুনিয়ার সব মা যেমনটা  চায় আর ইকবালকে আমি সত্যি সত্যি পছন্দ করি খুব ভাল ছেলে ও'

থ্যাংকইউ মা' খুশি হল লিজা ' সত্যি বলছ ?'

' তিন সত্যি ' সতর্ক ভাবে কথা চাল দিলেন শাহানা বেগম ' তবে আমার মনে হয় অচেনা শহরে খাপ খাওয়া ওর জন্য একটু কঠিন ঢাকায় ছেড়ে এই শহরে এসেছে পাঁচ বছর হল এখনও রুজি রুটির জন্য কিছু করে উঠতে পারেনি শেয়ার ছাড়া অন্য কিছুতে আগ্রহ দেখলাম না তো ...'

'তুমি যেন কায়দা করে কিছু বলতে চাইছ মা ' সোজা হয়ে সোফায় বসলো লিজা

' কায়দা করছি না মা গো পাঁচ বছর তোমরা আমার সাথে আছ সময়টা আমি সত্যি উপভোগ করেছি কিন্তু মা আমি চাই জামাই কিছু করুক নারীর রুপ আর নরের উপার্জন দুনিয়ায় আসল জিনিস আমার মনে হয় , ছোট্ট এই বাড়িটা তোমাদের জন্য যথেষ্ট না নিজেদের একটা বাড়ি আর বাচ্চা কাচ্চা ...'

' তুমি চাইছ আমরা বাসা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাই ?' উঠে দাঁড়ালো লিজা রাগে চেহারা থমথমে হয়ে গেছে

' না গো মা সেই রকম কিছু না'

' সেটাই তো বললেতুমি চাইছ আমরা অন্য কোথাও গিয়ে উঠি সোজা বাংলায় বল বাড়ি পাওয়া খুব কঠিন কিছু না মোটেও জাস্ট মুখ ফুটে বল আজই চলে যাব '

মেয়ের পাশে চলে এলেন শাহানা বেগম চোখে জল ' মা , ভুল বুঝবে নাতুমি ছাড়া আর কে আছে আমার ? তুমি তো জানো ? জানো না ?'

সামনে গিয়ে মা কে জড়িয়ে ধরল লিজা ' জানি মা '

' আসলে গত রাতের ব্যাপারটার পর থেকে মনটা কেমন খারাপ হয়ে আছে সেই জন্য অমন আবোল তাবোল বকছি '

' আরে সামান্য একটা ব্যাগ গেছে সেটা নিয়ে এখনও পড়ে আছ ?'

'আসলে ধাক্কাটা ভুলতে পারছি না' অন্যমনস্ক সুরে জবাব দিলে শাহানা বেগম

' বাদ দাও তো ' মায়ের কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসি মুখে বলল লিজা ' আর শোন ইকবালকে নিয়ে মোটেও চিন্তা করতে হবে না একদমই নাঢাকায় থাকতে প্রচুর টাকা কামিয়েছে ও অনেক অনেক টাকা বেশ চলে যাবে আমাদের '

লিজা চলে গেল স্নানঘরের দিকে

মনে মনে ভাবছেন শাহানা বেগম

 

 

 

'আজ আবার চলে এলেন যে ?' বিস্ময় মাখা সুর গাউস চৌধুরীর গলায় 

' গতকাল আপনাদের ফাইলে একটা ছবি দেখেছিলাম' আমতা আমতা করে বললেন  শাহানা বেগম  'আমার পরিচিত একজনের সাথে ভীষণ মিল  তাই আজ আবার এসেছি মনে শান্তি পাচ্ছি না'

'কার সাথে মিল ?'

'আমার মেয়ের  জামাইয়ের সাথে বেশ খানিকটা আর কি'

উঠে গিয়ে আগের দিনের ফাইলটা নিয়ে এলেন অফিসার 

গভীর মনোযোগ এবং বেশ সময় নিয়েই ছবি দুটো মিলিয়ে দেখলেন গাউস চৌধুরী

বাড়ি থেকে একটা ফটো নিয়ে এসেছেন শাহানা বেগম কাউকে না জানিয়ে

পাশাপাশি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে ইকবাল আর লিজা

পাশে রেখেছেন থানার সেই অ্যালবামের ছবিটা যেটা দেখে গতকাল চমকে গিয়েছিলেন শাহানা বেগম

'জানি ছবিটা ততটা পরিষ্কার না তারপরও...' মিন মিন করলেন ভদ্রমহিলা 

চোখ মুখ কুঁচকে চেহারাটা প্রায় হনুমানের মত বানিয়ে শাহানা বেগমের দিকে ফিরে চাইলেন দুঁদে অফিসার ' চেহারায় বেশ মিল আছে তারপরও একশো ভাগ নিশ্চিত হয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না দুম করে কাউকে দোষী বানানো ঠিক না  আপনি কি দয়া করে খানিক অপেক্ষা করবেন ? আমি একটু খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি '

সম্মতি সূচক মাথা নাড়তেই ছবি দুটো নিয়ে ভেতরের  কামরায় চলে গেলেন গাউস চৌধুরী

একা বসে রইলেন শাহানা বেগম

দরদর করে ঘামছেন দুশ্চিন্তায় বুকটা কেমন  ধড়ফড় করছে

নতুন কেনা ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে সুগন্ধি মাখা নরম রেশমি  রুমাল বের করে মুখের ঘাম মুছে নিলেন

সামনে রাখা ফাইলের কাগজটা তুলে পড়তে লাগলেন - ঢাকা শহরের বেশ কয়েকটা এটিএম বুথ থেকে টাকা চুরি , মাদক বিক্রি এবং ব্ল্যাকমেইলিং করার অভিযোগে এই যুবককে খুঁজছে পুলিশ

 যার সাথে আবার কি না ইকবালের চেহারার মিল রয়েছে !

অহ খোদা !

লিজা কী    করে অমন বদমায়েশ ছোকরার ফাঁদে পড়লো ?

ও কি কিছুই জানে না !

তখনই দরজা খুলে হাসি মুখে ফিরে এলেন গাউস চৌধুরী

ভদ্রলোকের হাসি দেখে কলজে শুকিয়ে গেল শাহানা বেগমের

'আপনি কিছু পেয়েছেন ?' গলা কেঁপে গেল প্রশ্নটা করতে গিয়ে

'কিচ্ছু না' আসর জমানোর মত একটা ভঙ্গী করে বললেন গাউস চৌধুরী ' চিন্তার কোন কারন নেই '

'মানে কি ?' আরও যেন ভয় পেলেন তিনি

' ছবির দুইজনের চেহারার মধ্যে বেশ মিল আছেব্যস , আর কিছু নাকিন্তু দুইজন আলাদা মানুষ জানেনই তো ক্যামেরা খুব প্রতারণা করে কথায় বলে ছবি মিথ্যা বলে না কিন্তু দেখুন ভোটার আইডি আর পাসপোর্টের ছবি কি বিচ্ছিরি হয় নিজেকে নিজেই চিনতে পারি না আমি দুনিয়ার সব ক্রিমিনালদের সাথে নিজের চেহারা মিল পাই হ্যাহ হ্যাহ ভেতরে গিয়ে যন্ত্রপাতি দিয়ে ভাল করে পরীক্ষা করলাম ভয়ের কিছু নেই দুইজন আলাদা মানুষ '

'মানে আপনি বলতে চাইছেন আমার মেয়ের জামাই ...'

'সেটাই বলছি উনার সাথে সেই ক্রিমিনালের চেহারার মিল  বেশ  একটা ঢাকাই সিনেমার গল্পের মত কাকতালীয় ব্যাপার একদম চৌদ্দ ক্যারেট কাকতালীয় ব্যাপার এই ভাবেই ভাল আর সৎ মানুষ ফেঁসে যায় একদম হালকা মনে বাড়ি যান জামাইকে যত্ন করে সেমাই রান্না করে খাওয়ান , হ্যাহ হ্যাহ হ্যাহ '

কৃতজ্ঞতায় চোখে জল চলে এলো শাহানা বেগমের ' কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব অফিসার আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না কি পরিমাণ দুশ্চিন্তায় ছিলাম '

সেটা আপনাকে দেখেই বুঝেছি ' মরমী বন্ধুর মত মাথা ঝাঁকালেন গাউস চৌধুরী যেন কত হাজার বছরের পরিচয় মুখ কুঁচকে হনুমানের মত করে ফেলেছেন

মুদ্রাদোষ

খটখটে চেয়ার টেনে শাহানা বেগমের পাশে বসতে বসতে বললেন , ' একটা ব্যাপার বেশ খটকা লাগল আপনার মেয়ের হাসব্যানড জাফর ইকবাল না সৈয়দ ইকবাল কি যেন নাম উনার ব্যাপারে মনে হয় আপনিও তেমন কিছু জানেন না '

'কি বলতে চাইছেন আপনি ?' খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন শাহানা বেগম

'দেখুন আমি কুড়ি বছর আছি পুলিশের লাইনে মানুষের আচরণ দেখে অনেক কিছুই বুঝতে পারি দুশ্চিন্তাগ্রস্থ বা বিপদে পড়া  মানুষদের সাথে প্রচুর কথা বলি কেন যেন মনে হচ্ছে আপনি নিজেও আপনার মেয়ের জামাইয়ের ব্যাপারে তেমন কিছু জানেন নাজানলে কোথাকার কোন এক ছবি দেখে অমন বাজে সন্দেহ করতেন না তাই না ? আবার নাকি ওদের বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছরের চেয়েও বেশি সময় ধরে '

সত্যি সত্যি ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেলেন শাহানা বেগম ' আসলেও খানিক ছেলে মানুষী করে ফেলেছি '

আসলে কে সে ?' শান্ত গলায় জানতে চাইলেন গাউস চৌধুরী

' আমার মেয়ের হাসব্যানড ইকবাল ' খুশি খুশি গলায় জবাব দিলেন শাহানা বেগম আনন্দে  কাঁদছেন ' কিভাবে যে আমি অমন বাজে চিন্তা করলাম নিজেকেই ধিক্কার দিচ্ছি আমার মেয়ে লিজা কিছুতেই অমন বাজে কোন ছেলেকে নিজের জীবন সঙ্গী হিসাবে পছন্দ করবে না সেই রকম বিশ্বাস থাকা দরকার ছিল '

 

সেই  সন্ধ্যায়

ডাইনিং টেবিলের চামচ আর চাকু তোয়ালে দিয়ে মুছে রাখছিল ইকবাক

কমলা রঙের সিফনের শাড়ি আর ম্যাচিং করা ব্লাউজ পরে ভেতর রুম থেকে এলো লিজা

ওকে দেখেই ঠোঁট সরু করে শীষ দিয়ে উঠলো ইকবাল

 

তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে ময়না পাখি একেবারে কমলা সুন্দরী ' ভাল লাগা চোখে চেয়ে বলল ইকবাল

চোখের ভাষা সহজেই বোঝা যায়

শাড়ির কুঁচিটা ঠিক হয়েছে কি না দেখ তো ?' সামনে এগিয়ে এলো লিজা

ঝুঁকে বসলো ইকবাল

কোথায় যাচ্ছি আমরা ?' জানতে চাইল

' অনেক দিন শপিং করা হয় না বাইরে কোথাও খাব '

দরজা খোলার শব্দ পাওয়া গেল ভেতরে  ঢুকে পড়লেন  শাহানা বেগম চোখে মুখে আনন্দের দ্যুতি ঝিঁকমিক করছে

' কোথায় ছিলে মা ? এত খুশির কারন কী   ?' জানতে চাইল লিজা

' একটু বাইরে গিয়েছিলাম বাচ্চারা আর খুশি তো কত কারনেই হয়  মানুষ তোমাদের দুইজনকেই খুব সুন্দর লাগছে বাইরে যাচ্ছ বোধ হয় ? কোথায় যাবে ?'

'কিছু শপিং করব তোমার জামাইকে ভাল একটা ক্যান্ডি স্তেইপ জামা গিফট করব '

'আপনিও চলুন না আমাদের সাথে আম্মাজান ' মার্জিত ভাবে প্রস্তাব দিল ইকবাল ' আমি আপনাকে দারুন দেখে ব্র্যান্ডের একটা ভ্যানিটি ব্যাগ কিনে দেব পছন্দ হবেই গত দুইদিন ধরে থানা পুলিশ করে আপনার উপর দিয়ে অনেক ঝক্কি গেছে '

' খুবই খুশি হলাম বাবা ' আনন্দে ডগমগ করে বললেন শাহানা বেগম ' আমার তরফ থেকেও কিছু হয়ে যাক 'এরাবিয়ান নাইট ' ক্যাফেতে তিনজনের জন্য একটা টেবিল রিজার্ভ  করলে কেমন হয় ? ওদের হাড়ি কাবাব আর পেঁপের সালাদ নাকি খুবই ভাল শুধু শুনেই গেছি আজ হয়ে যাক '

বাকি দুইজন হই হই করে উঠলো

রাজি

'আল্লাহর কসম দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা আম্মাজান পেয়েছি আমি ' খুশির ঠেলায় বলে বসলো ইকবাল

আমি ফোন করে বুকড করছি ' আনন্দে আবারও চোখে জল এসে গেছে শাহানা বেগমের জীবন কত সুন্দর !  

দৌড়ে চলে গেলেন টেবিলের উপর ঘুমিয়ে থাকা পুরানো দিনের কয়লা রঙা  টেলিফোনের কাছে

রিসিভার তুলে ডায়াল   শুরু করেছেন মাত্র,  তখনই দরজার বেল ঘ্যান ঘ্যান করে বেজে উঠলো

কে এলো আবার এই  অচিন সন্ধ্যায়  ?

প্রায় দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন শাহানা বেগম

 বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন গাউস চৌধুরী সাথে দুইজন উর্দি পরা গাঁট্টা গোঁটটা পুলিশ দুইজনের হাতেই গুচ্ছ গুচ্ছ কালো লোম গোঁফ দেখে মনে হয় রাবণের ভাই টাই হবে

'এই সময়ে কি মনে করে অফিসার ?' খুশি খুশি গলায় বললেন শাহানা বেগম ' আমাকে আবার দরকার কেন ? বুঝেছি সেই ছিনতাইকারীকে ধরে আমার ব্যাগ পেয়েছেন তাই না ? '

'ব্যাপারটা আসলে তেমন না ম্যাডাম শাহানা ' মুখ কুঁচকে চেহারাটা প্রায় হনুমানের মত করে ফেলেছেন গাউস চৌধুরী মূদ্রাদোষ ' আপনার মেয়ের জামাই সৈয়দ ইকবাল না শাহেদ ইকবাল উনি কোথায় ?'

'ওই তো ভেতরেই বসে আছে কিন্তু কেন ? কি হয়েছে ?'

'বিষয়টা খানিক জটিল আর কুটিল '

চেয়ার ছেড়ে উঠে দ্রুত সামনে চলে এলো ইকবাল ঝাঁঝাঁলো গলায় বলল , ' কী   হচ্ছে এখানে,  জানতে পারি ?'

' নিশ্চয়ই আপনাকে গ্রেফতার করতে এসেছি আমরা ' জবাব দিলেন গাউস চৌধুরী

পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা দুই গাঁট্টা গোঁটটা পুলিশ উনার বগলের তলা দিয়ে স্যাৎ  স্যাৎ  করে ভেতরে ঢূকে আক্ষরিক অর্থেই ঝাঁপিয়ে পড়লো ইকবালের উপর পকেট থেকে হ্যান্ডকাফ বের করে সুন্দর ক্লিক শব্দ করে পড়িয়ে দিল হাতে

' আমি সত্যি দুঃখিত ' তোম্বা  গলায় বললেন গাউস চৌধুরী

' কিন্তু ...কিন্তু আপনি বলেছিলেন ইকবাল সেই লোক না ' চেঁচিয়ে উঠলেন শাহানা বেগম

'মিথ্যা বলে ফাঁদ পেতেছিলাম আরও বেশি খোঁজ খবর নেয়ার জন্য সময় দরকার ছিল আমাদের নইলে আপনি বাসায় ফিরেই আপনার জামাইকে সতর্ক করে দিতে পালিয়ে যেত ব্যাটা '

'কেউ বলবে কি এখানে কি হচ্ছে ?' এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল লিজা এইবার এগিয়ে গেল সামনে

' আমার দুঃখিনী মেয়েটা কিছুই জানে না স্যার ' হাহাকার করে উঠলেন শাহানা বেগম

'লিজা ম্যাডাম আপনাকেও গ্রেফতার করা হল' আগের মত তোম্বা গলায় বললেন গাউস চৌধুরী যেন  কয়েক  গ্লাস  চিরতার জল গিলে ডিউটিতে নেমেছেন আজ

' না স্যার এইবার ভুল হচ্ছে আপনার ' চিৎকার করে উঠলেন শাহানা বেগম এগিয়ে গেলেন গাউস চৌধুরীর সামনে ' আমার মেয়েটা কিছুই জানে না এমন কি ইকবালের অতীত আর অপকর্ম নিয়েও বেচারি কিছুই জানে না

' আমি খুবই দুঃখিত ম্যাডাম' জবাব দিলেন গাউস চৌধুরী যদিও চেহারায় দুঃখের কোন ছাপ নেই ' আপনার মেয়ে সবই জানে শুধু তাইই না,  ও ছিল ইকবালের ক্রাইম পাটনার গত পাঁচ বছরে ঢাকা শহরে পনেরোটার বেশি অপরাধ করেছে এরা এক সাথে টিম বানিয়ে অপকর্মগুলো করতো দুইজন প্ল্যান পোগ্রাম হতে একশন নেয়া এমনকি টাকার ভাগও দুইজনে সমান পেত পুলিশ যখন হন্যে হয়ে ওদের খুঁজছিল তখন দুইজনে ঢাকা ছেড়ে এই মফস্বল শহর বিষ্ণুগঞ্জে হাজির হয়েছে '

টল মল করা পায়ে মেয়ের দিকে এগিয়ে গেলেন মা বিড়বিড় করে বললেন , ' মা আমার বল অফিসার যা বলছেন সব মিথ্যা তাই না ? উনি মিথ্যা বলছেন আমার মেয়ে অমন হতেই পারে নাতাই না মা ?'

'ভাল ব্যাপার হচ্ছে , আপনার ব্যাগ  ছিনতাইকারী একজন পুরুষ সেইদিন আপনি পুরুষ অপরাধীদের ফাইল দেখেছিলেন ' শান্ত গলায় বললেন গাউস চৌধুরী মুখটা কুঁচকে হনুমানের মত হয়ে গেছে মুদ্রাদোষ ' যদি নারী অপরাধীদের ফাইল দেখতেন তবে প্রথম পাতায় আপনার মেয়ের ছবিটা দেখতে পেতেন '

এই প্রথম নিয়ন্ত্রন হারাল লিজা

দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো

 

(হেনরি স্লেসারের গল্প অবলম্বনে )

 

 

 

 

 

 

 


মন্তব্যসমূহ