সাহেব শিকারি
---------------
মোটা টিনের একটা তোরঙ্গের মধ্যে বেশ কিছু বই ছিল।
পারিবারিক সম্পত্তি।
ওখানেই পেয়েছিলাম বইটা। নাম - বাঘের আত্নহত্যা। লেখক রামেন্দ্র দেশমুখ্য ।১৯৬৪ সালের ছাপা। কোলকাতার কোন এক প্রকাশনী থেকে। ঠিক মনে পড়ছে না কোন প্রকাশনী। ভেতরে কাঠের ব্লকে ছাপা দারুন কিছু ছবি ও ছিল।
পাতাগুলো ধূসর । তেজপাতার মত হয়ে গেছে। অলস দুপুরে বইটা নিয়ে বসলাম।
এবং হারিয়ে গেলাম দফলার জঙ্গলে। ডুয়ারসের বনে।
কি মনমাতানো বর্ণনা।
শীতের রাতে জঙ্গলের জোসনায় ভেসে যায় চারি দিক।জলের পিপাসায় বাঘ চলে আসে বাড়ির উঠানের কুয়ার কাছে। শাল বনের ভেতর থেকে নেমে আসে পাগলা হাতি।
বন- জঙ্গল আর বুনো জীবজন্তু লেখা কোন বই এই প্রথম পড়লাম।
বাইরে তখন হলুদ রঙের গাঢ় রোদ।
দূরের বন পাহাড়ে হারিয়ে গেছে আমার মন। সব ছেড়ে ছুড়ে আমারও চলে যেতে ইচ্ছা করছিল দফলার জঙ্গলে।
যেখানে পথের ধারে এমনিতেই হয়ে থাকে গাব গাছ। কোন এক মৌসুমে রক্ত চুনির মত লাল আর পান্নার মত সবুজ কাঁচা পাকা গাব ধরে থাকে। সাপের মাথার মণির খোঁজে চলে আসে সাপুড়ে।
কুট্টি মামা শীতের সন্ধ্যায় বসে লেখককে আফ্রিকার গল্প শোনায়।
ক্লাস সিক্সের লাস্ট বেঞ্চির ছাত্র আমি।
এই সব বই পড়ে বুকের ভেতরে কেমন এক উসকো খুশকো অনুভূতি জন্মায়।
কিছু বই আমার ভেতরে দাগ কেটে যায়। বদলে দেয় চিন্তা চেতনা আর পছন্দ।
বাঘের আত্নহত্যা বইটা তেমন একটা বই। সেই একই বছর পড়লাম ‘বাঘের মন্তর’ বইটা। কোন এক ফকির হেঁতাল ঝোপের আড়ালে বসে হেঁতাল ফল খাচ্ছিল। সে নাকি মন্ত্র পড়ে বাঘ ডেকে আনতে পারে।
এর পর আগাড়ে বাগাড়ে যত শিকার কাহিনি আর জঙ্গলের জার্নাল টাইপের বই পেয়েছি সব পড়েছি। বিভূতিভূষণের আরণ্যক পড়ে ভাল লাগায় মন আছন্ন হয়ে গেছে।
জিম করবেট আর কেনেথ অ্যান্ডারসনের সবগুলো শিকার কাহিনি বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অথচ আরও অনেক শিকার কাহিনি রয়ে গেছে ক্লাসিক সাহিত্য হিসাবে। যেগুলোর বেশির ভাগই আজ কাল আর বাজারে পাওয়া যায় না।
জিম করবেটের লেখায় প্রকৃতির বর্ণনা কম ।
কিন্তু উনার লেখায় , আদিবাসিদের জীবন যাত্রার প্রতি গভীর মমতা আর আগ্রহ রয়েছে সেটা কিন্তু বুঝতে পারবে ।
শিকার করার সময় কয়েক জায়গায় জিম করবেট বিপদে পড়লেও আমি হেসে ফেলেছি অজান্তেই ।
যেমন , পানারের মানুষখেকো মারার সময়কার ঘটনা ।
কোন এলাকায় বাঘ যখন মানুষখেকো হয়ে একটার পর একটা মানুষ মেরে টপাটপ করে খেতে থাকে তখন বাঘটার নাম সেই এলাকার সাথে জুড়ে দেয় সবাই । চিহ্নিত করার সুবিধার জন্য ।
অন্য কিছু না ।
যেমন ধরা যাক, গুলিস্তানের ওখানে কোন মানুষখেকো যদি একটার পর একটা মানুষ মারতে থাকে , তবে ওটাকে আমরা বলব - গুলিস্তানের মানুষখেকো ।
ব্যাপারটা বুঝা গেল ?
তো করবেট সাহেব পানারের উদ্দেশে রওনা হলেন । জায়গাটা তিনি চেনেন না । আগে কখন যাননি ।
পানারের আগে আলমোড়া নামে একটা জায়গায় তার ইয়ারি দোস্ত স্টিফ থাকে ।ওখানে আগে গেলেন । দুপুরের খাবার শেষে স্টিফ, পানার এলাকার একটা ম্যাপ বের করে দাগ দিয়ে দেখিয়ে দিলেন বাঘটা কোন কোন জায়গায় মানুষ মেরেছে ।
পথের দিশা জেনে আবার রওনা হলেন করবেট ।
সাথে চারজন কুলি নিলেন। মালপত্র বয়ে নেয়ার জন্য । আর একজন চাকর কিসিমের লোক । রান্নাকরা বনাম ফাইফরমায়েশ খাটার জন্য ।
হেঁটে গেলেন টানা চৌদ্দ মাইল।
কেমন অদ্ভুত একটা বাড়ি দেখতে পেলেন সন্ধ্যায় পর । একতলা বিশাল বাড়ি । টানা বারান্দা । বাড়ির সব কটা দেয়াল ভর্তি হিজিবিজি আঁকা আঁকি । এখানে ওখানে ছেঁড়া কাগজ ।
নমুনা দেখে বুঝতে পারলেন বাড়িটা একটা ইস্কুল ।
ঠিক করলেন রাতটা এই স্কুলেই কাটাবেন ।
পরদিন যা হবার হবে।
তখন আকাশে গোল্লা সাবানের মত চাঁদ উঠে গেছে । প্রায় আস্ত বলা যায় । একটুও ক্ষয় হয়নি । চারিদিক ফকফকা । আকাশে অমন একটা আস্ত গোল্লা সাবান থাকলে চারিদিক পরিষ্কার তো হবেই ।
হিসাবে পানার এলাকা বা মানুষখেকোর এলাকা তখনও শুরু হয়নি । তাছাড়া ইস্কুলের তিন দিকে উঁচু বড় দেয়াল । একদম নিরাপদ জায়গা ।
সাথে তাবু নেই । আনতে ভুলে গেছেন ।
ঐদিকে ইস্কুলের সব ক্লাসরুমে আবার তালা দেয়া । হয়তো চোর এসে টুল বেঞ্চি নিয়ে যাবে সেই ভয়ে অমন করেছে হেডস্যার ।
ঠিক আছে , বারান্দায় রাত কাটাবেন ।
ইস্কুলের পিছনে জঙ্গল । লাকড়ির অভাব নেই । ঐ দিয়েই রান্নার আয়োজন হবে । খারাপ কি ?
চাকরটা রান্নার আয়োজন করতে লাগল ।
বারান্দায় বসে চুপচাপ দেখতে লাগলেন করবেট । বাক্স পেঁটরা থেকে খবরের কাগজে প্যাঁচানো আস্ত একটা ভেড়ার পা আর তাওয়া - কড়াই- খুন্তি বের করে ব্যস্ত হয়ে পড়লো চাকরটা ।
খশখশ শব্দ শুনে বিরক্ত হয়ে চাকরটা ফিরে দেখল পেল্লাই সাইজের একটা কুকুর এসে ভেড়ার ঠ্যাঙটা মুখে কামড়ে ছুটে পালাচ্ছে ।
হই হই করে ছুটে গেল চাকরটা । হাতে লাকড়ি । চেঁচাচ্ছে- এই দাঁড়া কুত্তার বাচ্চা । হেন তেন ।
দৌড়ে প্রায় কুকুরটা ধরে ফেলবে তখন আবার কি মনে করে উল্টা দৌড়ে ফিরে এলো।
চাঁদের আলোতে কুকুরটার গায়ের চক্রা বক্রা দাগ দেখে সন্দেহ হয়েছিল । এখন বুঝতে পেরেছে ওটা একটা চিতাবাঘ !
ওর অবস্থা দেখে হেসেই খুন জিম করবেট ।
সাহেবের হাসি দেখে মেজাজ খিঁচরে গেল ওর । সাহেব কেমন শিকারি ? চিতা এসে ওদের রাতের খাবার নিয়ে পালিয়ে যায় । আর সাহেব বসে বসে সেটা দেখে ?
মেজাজ দেখিয়ে চাকরটা বলল - আজ রাতে কিন্তু না খেয়ে থাকতে হবে ।
শুনে আবারও হেসে ফেলেন শিকারি ।
না খেয়ে অবশ্য থাকতে হয়নি ।
একটা মুরগি ছিল সাথে ।
করবেট কিন্তু সেইবার পানারের মানুষখেকোটাকে মারতে পারেনি । তৃতীয়বারের চেষ্টায় পেরেছিলেন ।
মাঝে সময় গিয়েছিল এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পাঁচ মাস । এই অল্প সময়ের মধ্যে বাঘটা আরও চল্লিশজন মানুষ মেরেছিল ।
হিসাবে সেই রুদ্রপ্রয়াগের চিতার চেয়ে বেশি ভয়ংকর ছিল পানারের চিতাটা ।
আবারও চারজন কুলি আর একজন চাকর বা মাকড় কিসিমের এক লোক নিয়ে করবেট রওনা দিলেন ।
চিতাটা শেষ যেখানে মানুষ মেরেছিল সেখানেই আগে যাবেন । ওরকম করাই নিয়ম । নইলে জানবেন কি করে কোথায় আছে চিতাটা ?
সবাই মিলে খুব ধীরে ধীরে চলছিল ।
এক একটা গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম বেশ দূরে দূরে । চলাচলের পথ খুব খারাপ । তার উপর মানুষখেকোর ভয়ে লোকজন তেমন চলাচল করে না রাস্তা ঘাটে । পায়ে চলা পথগুলোতে ঘাস জন্মে একেবারে বিচ্ছিরি হয়ে গেছে ।
সন্ধ্যাবেলায় চাকতি নামে একটা গ্রামে পৌঁছলেন ।
গ্রামের মোড়ল অনুরোধ করলেন আজ রাতে তার বাড়িতেই সবাই যেন থাকে । পাশের গ্রামে যেতে হলে মাঝে পানার নদী । রাতের বেলা নদী পাড় হওয়া বেশ ঝক্কির কাজ । গত কয়েকদিন ধরে মউসুমি বৃষ্টি হওয়ায় পানার নদীতে জল টই টুম্বুর হয়ে উপচে পড়ছে ।
অন্ধকারে নদী পাড় হতে গেলে স্রোতের টানে সবাই কোত্থেকে কোথায় ভেসে যাবে সেটা একদম হিসাবের বাইরে ।
মোড়লের বাড়িটা দোতলা ।
দোতলায় করবেটের লোকজন ঘুমাবে । করবেট ঘুমাবেন নীচ তলায় ছোটমত একটা রুমে।
সমস্যা একটাই ।সেই বাড়ির নীচতলাইয় কোন দরজা নেই ।
হায়! হায়!
তাতে অবশ্য সমস্যা নেই । এইসব এলাকায় চোর তস্কর নেই । আর চিতাটা পাশের গ্রাম সানোউলিতে মানুষ মেরেছে । তখন থেকেই পানার নদীতে কড়া স্রোতের বান নেমেছে ।
কোন ভাবেই চিতাটা নদী পাড় হয়ে এই গ্রামে আসতে পারেনি ।বিপদ নেই।
কামরাটায় কোন আসবাবপত্র নেই । মেঝেতে শুধু কিছু সোনালী রঙের খড় বিচালি । মেঝে পরিষ্কার করে নিজের মোটা সূতলির চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়লেন করবেট ।
বাইরে রান্নার ব্যবস্থা করলো চাকর বা মাকড় লোকটা ।
খেয়ে দেয়ে সবাই দোতলায় ঘুমাতে চলে গেল ।
করবেট রইলেন নীচতলার সেই কামরায় । নিজের চাদরে শুয়ে ঘুমানোর মজা বেশ খাসা ধরনের । সবাই সেটা জানে না । টানা বারো ঘণ্টা হেঁটে এসেছেন । গা এলিয়ে দেয়া মাত্র গভীর ঘুম নেমে এলো দুই চোখে ।
কেমন একটা শব্দ কানে যেতেই ঘুম ভেঙ্গে গেল শিকারির ।
খোলা দরজা দিয়ে কি বাঘটা ঢুকে পড়লো ?
নাহ ।
সকাল হয়ে গেছে । খোলা দরজা দিয়ে বাঘ না, কাঞ্চন রঙা সকালের রোদ ঢুকে পড়ছে । জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে অপরাজিতা ফুলের মত আকাশ ।
আর কাণ্ড দেখ !
জিম করবেটের পায়ের সামনে হাসি হাসি মুখ করে বসে আছে কেমন একটা খ্যাঙটা চেহারার লোক । বয়স হবে ...উম্মম... পঞ্চাশের উপর ।
লোকটার সারা শরীর ভর্তি ঘিন ঘিনে লাল গোলাপি ঘা । সেই ঘা দিয়ে বেয়ে বেয়ে নামছে রস কষ সিঙ্গারা বুলবুলি ...না ও সব না ।
মোট কথা খুব বিচ্ছিরি ঘা ।
করবেটকে চোখ মেলে তাকাতে দেখেই গোলাপি ঘা-ওয়ালা লোকটা মিহি হেসে কফ জড়ানো গলায় জানতে চাইল - সাহেবের নিদ্রা ভাল হয়েছে নাকি ? নিদ্রা কি ঘন নাকি পাতলা ?
করবেট কোন জবাব দিলেন না। জবাব দেয়ার মুড নেই তার ।
লোকটা অবশ্য কিছু মনে করলো না ।
হাব ভাব দেখে মনে হল , অনেক বছর হল কেউ তার কথার জবাব দেয় না । কেউ পাত্তা দেয় না ।
তবে নিজেই বকবক করে তথ্য দিতে লাগলো ।
গত দুই রাত সে ছিল বন্ধুর বাসায় । বেড়াতে গিয়েছিল । আজ ফিরে দেখে তার শোয়ার রুমে সাহেব ঘুমিয়ে আছে । বিরক্ত না করে পাশেই বসে ছিল ।
কেমনটা লাগে ?
নিজের উপরই মেজাজ খিঁচরে গেল করবেটের ।
সারারাত এক কুষ্ঠ রোগীর ঘরে ঘুমিয়েছে । এই সব এলাকায় কুষ্ঠ রোগের প্রকোপ অনেক বেশি । ভীষণ ছোঁয়াচে। মোড়ল বেকুবটা পর্যন্ত তাকে বলেনি এইসব !
একটু ও দেরি না করে জামা কাপড় পরে বাইরে চলে গেলেন । লোকজন নিয়ে সানউলি গ্রামের পথ ধরলেন।
সামান্য যেতেই সুন্দর একটা ঝর্ণা পড়লো ।
ওখানেই বড় বড় কয়েকটা পাথরের মাঝে জল জমে আছে । সব জামা কাপড় খুলে কার্বলিক সাবান ঘষে ঘষে পরিষ্কার করলেন । সেই মোটা সূতলির চাদরটাও । পাথরের উপর রেখে শুকাতে দিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা নিজের শরীরে সাবান ঘষলেন ।
স্নান শেষ করে শুকনো জামা কাপড় পরার পর মনে হল জানে বেঁচে গেলেন এই যাত্রায় ।
মনে মনে মোড়লের পিণ্ডি চটকে দিলেন অনেক ক্ষণ ।
বেশ শান্তি পেলেন ।
আমি কিন্তু বইটা পড়ার সময় খুব হেসেছিলাম ।
আরেকবারের ঘটনা।
কারটকনৌলা গ্রামের ধারে ছোট্ট একটা জায়গার নাম মোহন। এখানেই আশ্রয় নিয়েছে বাঘটা।
কাজেই বাঘটাকে সবাই মোহনের বাঘ নাম দিয়েছে। খুবই দুষ্টু বাঘ । বেশ কয়েকজন মানুষকে খেয়ে শীতকালে দূরের পাহাড়ের গুহায় গিয়ে ঘুম দিয়েছিল।
শীত শেষে আবার পেট ভর্তি খিদে নিয়ে ফেরত এসেছে।
মে মাসের আগুনের মত গরমে দুইজন চাকর আর নৈনিতাল থেকে ভাড়া করা ছয়জন লোক নিয়ে রামনগরের রেল ইষ্টিশনে নেমে পড়লেন জিম করবেট ।
সেখান থেকে পচিশ মাইল পায়ে হেঁটে গেলেই তবে মোহন নামে জায়গায় পৌঁছবেন ।
অর্ধেক পথ যেতেই হয়ে গেল রাত। কয়েকশো ফুট উঁচু একটা পাহাড়ের পাশ দিয়েই একে বেঁকে চলে গেছে কোশী নদী। তো ওখানেই রাত কাটানোর আয়োজন করলেন।
মাঝ রাতে করবেটের ঘুম ভেঙ্গে গেল কেমন অদ্ভুত শব্দে।
যেন পাথরের সাথে পাথর ঠোকাঠুকি হচ্ছে । পাহাড় থেকে গড়িয়ে নামছে ছোট ছোট পাথর।
সাবধানে উঠে তাবুর বাইরে চলে গেলেন। প্রাকৃতিক সব শব্দ ভাল করেই চেনেন তিনি। বুঝতে পারছেন, এটা স্বাভাবিক শব্দ না।
আকাশে আস্ত বাকরখানির মত চাঁদ। জোছনা গলে গলে পড়ছে । সেই ঘন হলুদ আলোতে বন পাহাড় সব ধুয়ে মুছে যাচ্ছে। সাপের ভয় আছে। সাবধানে পা ফেলে হাঁটতে লাগলেন।
আবার শুনলেন সেই শব্দ।
অথচ চারিদিকে কিছু নেই।
শব্দটা কোত্থেকে এসেছে অনুমান করে সেইদিকে পা বাড়ালেন।
শব্দটা এসেছে সামনের ছোট্ট ডোবার জলের কাছ থেকে। চলে গেলেন সেখানে।
ডোবার ধারে যেতেই চাঁদের আলোতে দেখেন, ছোট ছোট পাথর খামাখাই লাফ দিয়ে জলে পড়ছে। করবেটের পায়ের শব্দ শুনে ওরা আবার লাফ দিল। আচমকা অমন দৃশ্য দেখলে যে কেউ ভয় পাবে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে অবাক হয়ে গেলেন । ওগুলো আসলে এক ধরনের ব্যাঙ।
কত জায়গায় ঘুরে কত প্রজাতির ব্যাঙ দেখেছেন তিনি। ব্যাঙের ডাক শুনেছেন । কিন্তু অমন পাথরের সাথে পাথর ঠোকাঠুকির মত শব্দ করে ব্যাঙ ডাকে আগে, কক্ষনো শোনেননি।
হেসে ফেললেন।
হাসির শব্দে ভয় পেয়ে আরও পাথরের সাথে পাথর ঠোকাঠুকির মত শব্দ করে ব্যাঙেরা লাফ দিয়ে ডোবায় নেমে গেল।
নৈনিতাল !
শব্দটা কেমন মাথার ভেতরে গেঁথে গিয়েছিল ।
কি মিষ্টি একটা জায়গার নাম ।
ঠিক যেমন বুড়ি গোয়ালিনীর ষ্টেশন বললেই সুন্দরবন ভেসে উঠে , তেমনই।
নৈনিতালে ‘গারনি হাউজ’ ' নামে সুন্দর বাংলো টাইপের বাড়ি আছে । আজও ।
মায়াবী হলুদ রঙের দেয়াল । জানালায় শার্সি পুরানো দিনের মত । দরজার উপরে জ্যামিতি বক্সে থাকা চান্দার আকৃতি কাচের খোপ ।স্কাই লাইট ।
রাতের বেলা কামরার ভেতরে মাখন রঙা আলো জ্বললে কেমন স্বপ্নের মত লাগে ।
বাইরে গাছপালায় ঠাসা । একটা পিচ্চি কেমন ধরনের তালগাছ । হিজিবিজি পাতাওয়ালা আরেকটা নিঃসঙ্গ গাছ । ডাল পালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে । অচেনা লতাপাতা । শিশুর মুখের মত সূর্যমুখী ফুল ।
টিনের চাল । টানা বারান্দা । বেতের চেয়ার আর টেবিল পাতা। বসার জন্য । যে কোন মউসুমে ওখানে বসলেই মন ভাল হয়ে যাবে । বারান্দায় উঠার জন্য চার পাঁচ ধাপ সিঁড়ি। বাতিল টিনের বালতিতে ঘুম ঘুম চেহারার গোলাপ চারা । ফুটে আছে হাওয়াই মেঠাই রঙের গোলাপ ফুল ।
এই বাড়ির মালিক ক্রিস্টোফার গার্নি। ।
এখনেই জন্ম নেয় জিম করবেট ।
নৈনিতাল থেকে পনের মাইল দূরে কালাধুঙ্গি নামে পিচ্চি একটা গ্রাম আছে । ওখানে খানিক জমিজমা আছে করবেটদের । চাষ -আবাদ হত । খাবারের অনেকটা আসতো সেই ফসল থেকে ।
পড়াশুনা শেষ করে করবেট ১৮৯৫ সালে বেঙ্গল এন্ড নর্থ ওয়েস্টার্ন রেলওয়েতে কাজ নেন । হরেক রকম কাজ করেন তখন । সহকারী ষ্টেশন মাস্টার। গুদামরক্ষক। মালগাড়ির গার্ড ।তখন কয়লার বদলে কাঠ পুড়িয়েও রেলগাড়ি চলত । সেই কাঠ কাটার জন্য গভীর জঙ্গলে চলে যেতেন তিনি ।
বিচিত্র জীবন । সন্দেহ নেই ।
যেন আমিও দেখতে পাই, স্টেশনের গুমটি ঘরে বসে আছেন করবেট । কমলা রঙের আলোয় ট্রেনের টাইম টেবিল পড়ছেন তিনি। টিনের পেয়ালাতে চা। বাইরে কনকনে শীত । নীল অন্ধকার। বাতাসের ধাক্কায় খসে পড়ছে পিপুল গাছের বাদামি পাতা । দূরে ঘুম ঘুম পাহাড় ।
প্রথম শিকার করেন ১৯০৭ সালে । চম্পাবতের বাঘিনী ।
লেখার ইচ্ছা ছিল না।
বন্ধু- বান্ধবদের অনুরোধে লেখেন - কুমায়ুনের মানুষখেকো । এই বইয়ের জন্য সারা পৃথিবীতে নাম ছড়িয়ে পড়ে । পরে একের পর এক লিখেন বাকি বইগুলো । বই বিক্রির এক পয়সাও নেন নি তিনি । অকাতরে দান করে গেছেন ।
ভারতবর্ষের মানুষ আর নৈনিতালের প্রতি ছিল তার অকৃত্রিম ভালবাসা । তার লেখা - ‘মাই ইনডিয়া’ বইতে আছে সেইসবের মায়াবী বিবরণ।
কালাধুঙ্গি বা নৈনিতাল এলাকায় চাষবাস করা ছিল বেশ কষ্টের । মাটি শক্ত পাথুরে । মানুষজন বেশ খেটে পিটে ফসল ফলায় । কালো স্লেট পাথরের বানানো কেমন একতলা কুটির মার্কা বাড়িতে থাকে ।
প্রকৃতি প্রেমিক বলতে যা বলা যায় করবেট ছিলেন তাই ।
সব রকম পাখির ডাক চিনতে পারতেন । পায়ের ছাপ দেখে হরিণ , গাউর , শম্বর , কাকর সবাইকে শনাক্ত করতে পারতেন ।
জলাভূমিতে জল পানের শব্দ শুনে বুঝতে পারতেন ওটা ভাল্লুক না বন বিড়াল ।
শৌখিন শিকারি ছিলেন না করবেট। মানুষকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য হাতে রাইফেল তুলে নিতেন । অনেকে তাকে গোরা সাধু বলতো ।
কোন এলাকায় বাঘের উপদ্রব ?
সাহেবকে একটা টেলিগ্রাম করে দাও ।
বেশির ভাগ সময় গ্রামের সবাই চাঁদা তুলে টেলিগ্রাম করার পয়সা জোগাড় করতো । এক একটা টেলিগ্রাম করবেটের হাতে পৌঁছতে পৌঁছতে এক সপ্তাহ সময় লেগে যেত । যত জরুরী টেলিগ্রাম হোক না কেন । হাজার মাইল পথ ট্রেনে চেপে , গরুর গাড়িতে করে এবং পায়ে হেঁটে ঠিকই হাজির হতেন সাহেব ।
আনাড়ির কাণ্ড বলতে একটা কথা আছে । যে যেটা ভাল মত জানে না সেটা করতে গেলে কি মুসিবত ই না হয় ।
একবার এক গ্রামে ঠিক দুপুর বেলা বাঘ এসে আক্রমণ করে বসলো ।
গমের খেতে মা-মেয়ে কাজ করছিল । গমের মউসুম । গোছা ভর্তি করে কাটছিল ওরা । মেয়েটার বয়স মাত্র বারো । ঝোপের মধ্যে বাঘ দেখেই দৌড়ে মায়ের কাছে যাবার চেষ্টা করলো । ভাবল মা ওকে বাঁচাতে পারবে ।
তেমন কিছু হল না । বাঘটা থাবা মেরে মেয়েটার মুণ্ডু ফেলে দিয়ে শরীরটা কামড়ে চলে গেল ।
মাথাটা গড়াতে গড়াতে গিয়ে পড়লো মায়ের পায়ের কাছে ।
কত করুণ একটা ব্যাপার ।
সবাই মিলে চাঁদা তুলে টেলিগ্রাম করলো সাহেব মানে জিম করবেটের কাছে ।
আগেই বলেছি যত জরুরী টেলিগ্রাম হোক সেটা করবেটের কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে কমপক্ষে এক সপ্তাহ হয়ে গেল ।
কিন্তু এই এক সপ্তাহ তো বাঘটা উপোষ করে থাকবে না ।
পাহাড়ের উপরে চমৎকার দীঘল ঘাস জন্মে । এইবার এক মহিলা আরও কয়েকজনের সাথে ঘাস কাটছিল । বাঘটা এসে সবার সামনে মহিলাকে কামড়ে ধরতেই বাকি সবাই ভয়ে হল্লা মল্লা করে দৌড় দিল ।
উপায় কি ?
তাদের চিৎকার সেই পাহাড় থেকে গ্রাম পর্যন্ত চলে গেল । আর গ্রামের লোক সবাই মিলে এক জোট হয়ে বাঘটাকে তাড়িয়ে দিল ।
ওরা তখনও অপেক্ষা করছে করবেটের জন্য ।
সবাই মিলে মহিলার মৃতদেহটা কম্বল দিয়ে পেঁচিয়ে পেল্লাই সাইজের একটা রডোড্রেনডন গাছের একদম উঁচুতে বেঁধে রেখে দিল । যাতে লাশটা 'মড়ি' হিসাবে সাহেব ব্যবহার করতে পারেন ।
সবাই মিলে করবেটের বাড়ি গিয়ে তার বোন ম্যাগির কাছে সব জানালো । সাথে সাথে সবাই ঠিক করলো সেই গাছে একটা মাচা বানাবে যাতে করবেট বসে বাঘটাকে মারতে পারেন।
যেমন ভাবা তেমন করতে গিয়ে দেখে চালাক বাঘটা সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সেই গাছে উঠে কম্বল ফুটো করে মহিলার লাশটা নিয়ে ভেগে গেছে ।
মরেও শান্তি নেই ।
তবে গ্রামের লোক হাল ছাড়ল না । তাদের কোন অস্ত্র নেই । তারপরও সবাই মিলে সেই লাশ টেনে নেয়ার দাগ অনুসরণ করে আধা মাইল দূরে বাকি লাশটা পেল ।
বাঘে অর্ধেক খেয়ে ফেলেছে সেটা ।
সেখানেই বড় একটা গাছের উপর মাচা বাঁধল ।
আজকেই এসে পড়বে করবেট ।
মাচা বানানো শেষ হয়েছে তখন শহর থেকে ফিরে এলো এক শিকারি । সবাইকে বললেন - তিনি করবেটের বন্ধু মানুষ ।
এই ' দোস্ত' প্রচুর শূয়র , হরিণ , শম্বর , নীলগাই মেরেছেন । কাজেই ভাব দেখানোর একটা সুযোগ পেয়ে গ্রামের সবাইকে বললেন , ' তোমরা চলে যাও । আমিই আজ রাতে মাচায় বসে থাকব । বাঘটা এলে একটা ক্লাস দিয়ে দেব ।ব্যাটা আমাকে চেনে না। '
গ্রামের লোকজন সবাই করবেটের বাড়ির দিকে চলে গেল ।
দোস্ত ইয়ে মানে... শিকারি সাহেব সেই মাচায় গিয়ে উঠলেন । সাথে আবার দুই সহকারী । একজন বন্দুক বহন করবে । আরেক জন খাবারের ঝুড়ি আর কাঁচের লন্ঠন বহন করবে। ঝুড়ি থেকে মাঝে সাঝে সে স্যান্ডউইচ , চা বের করে শিকারিকে দেবে ।
ভাবই আলাদা ।
সেই রাতে আকাশে চাঁদ ছিল না ।
অন্ধকার নামার এক ঘণ্টা পর বন্দুকবাহক লোকটা ফিসফিস করে শিকারিকে প্রশ্ন করলো , 'স্যার বাঘটা এসে লাশটা নিয়ে গেল আপনি কিচ্ছু করলেন না কেন ?'
শিকারি ভোম্বল হয়ে গেল ।
তাই নাকি ? কখন হল এমন ? হায় হায় ।
লন্ঠনওয়ালাকে বললেন লন্ঠন জ্বালাতে ।
জ্বলন্ত লন্ঠন দড়ি দিয়ে বেঁধে মাচার উপর থেকে নিচে নামালেন । যাতে নিচের দৃশ্য ভালমত দেখতে পারেন।
হায়রে কপাল । হাত ফস্কে লন্ঠন গেল নিচে পড়ে । কাচ ভেঙ্গে কেরোসিনে ভিজে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো ।
সেটা ছিল মে মাস ।
শুকনো মউসুম । চারিদিকে লম্বা শুকনা ঘাস আর লতাপাতার অভাব ছিল না। রোদের তাপে শুকিয়ে ভাঁজা ভাঁজা হয়ে ছিল । জ্বলে উঠলো সব। হিন্দুরা যেমন যজ্ঞ করে না ? তেমনই ।
শিকারি ভদ্রলোক তার চাকর বাকরের সামনে বাহাদুরি দেখানোর জন্য লাফ দিয়ে গাছ থেকে নেমে গায়ের দামী টুইডের কোট খুলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেন ।
তখনই আবার মনে হল বাঘটা কিন্তু আশেপাশেই আছে । ওটার কথাও ভাবতে হবে কিন্তু ।
হাচরে পাছড়ে আবার উঠে গেলেন গাছের উপর ।
আর কোটটা নিচে পড়ে রইল । পুড়ে গেল চোখের সামনে । আহা !
আগুনের কমলা হলদে আলোতে আবিস্কার করলেন , আসলেও লাশটা নেই ।
কিন্তু শিকার করার সমস্ত আগ্রহ শেষ হয়ে গেছে ভদ্রলোকের । জ্যান্ত পুড়ে মরার হাত থেকে বাঁচবেন কি ভাবে সেই চিন্তায় অস্থির হয়ে আছেন । আর সরকারী জঙ্গল পোড়ানর শাস্তি কি হবে সেটা ভেবে মরে যেতে ইচ্ছা করছে তার ।
সব মিলিয়ে বিচ্ছিরি একটা অবস্থা ।
প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে আগুনটা নেচে নেচে বন গিলতে থাকে ।
তারপর নামে সুন্দর গহন বৃষ্টি ।
আগুন নিভে যায় । কিন্তু কয়েক বর্গ মাইল জঙ্গল পুড়ে একদম ছাই হয়ে গেছে । সেই ছাই দিয়ে অনেক বছর থালা বাসন মাজা যাবে ।
শিকারি সাহেবের অবস্থা নিদারুণ কাহিল ।
আগুনে পুড়ে গেছে তিনি । কোট না থাকায় শীতে জমে ঠর ঠর করে কাঁপছেন । সকালের আলো ফুটতেই ক্লান্ত ভাবে হেঁটে চলে যান বাড়ির দিকে।
ওটাই ছিল ভদ্রলোকের প্রথম আর শেষ মানুষখেকো বাঘ শিকারের চেষ্টা ।
আহা রে !
করবেট, বাঘ অনেক মারলেও চিতা মেরেছিল দুটো । রুদ্রপ্রয়াগের আর পানারের । দুটো চিতাই ছিল ভারি বজ্জাত । প্রয়াগের চিতাটা মেরেছিল ১২৬ জনকে । আর পানারের চিতাটা মেরেছিল ৪০০ জন ।
করবেটের একটা জিনিস খুব অদ্ভুত লাগে - শিকার করার পর উনার মধ্যে কখনই আনন্দের আবেগ দেখা যেত না।
উনার যুক্তি, বেচারা মানুষ খেকো না হলে মরতে হত না। আর কে না জানে বিপদে না পড়লে বাঘ মানুষখেকো হয় না ।
যাই হোক , ১৯৪৭ সালে সেই গারনি হাউজ বিক্রি করে চলে যান কেনিয়ার নাইরোবিতে । জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন ।
সাহেব হয়তো ভেবেছিলেন, ভারতবর্ষ স্বাধীন হবার পর সাদা চামড়ার মানুষ হওয়ায় অন্যের বাজে ব্যবহারের শিকার হবেন তিনি ।
দেশান্তরিত হবার আগে গভীর বনের ভেতরে রাইফেল আর বন্দুকগুলো মাটি চাপা দিয়ে গিয়েছিলেন । কেউ জানে না কোথায় সেইগুলো।
স্মৃতি চিহ্ন হিসাবেও সাথে করে নিয়ে যাননি।
আজব এক লোক এই জিম করবেট।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন