দশ
কে জানে আসলে কি হত অ্যাটল্যান্টিকের সেই এলাকায়।
গত চল্লিশ বছরে নানান মুনির নানান মতের মত হাজার রকম তত্ব পেলাম আমরা।
হয়তো সত্যিই ভিন গ্রহবাসিদের আস্তানা ছিল।
হয়তো সামাজ্যবাদী দেশগুলোর নোংরা পরিকল্পনার একটা অংশ ছিল।
হতে পারে সবগুলো ঘটনাই ছিল সুচতুর একদল অপরাধীর কাজ। যারা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্রেফ ডাকাতি আর লুটতরাজ চালিয়েছিল। সব ঘটনাই ছিল অপহরণ আর দস্যুতা।
অমন একটা প্লট নিয়ে ক্লাইভ ক্লাসলার লিখেছেন -প্যাসিফিক ভোরটেকস । রোমাঞ্চ উপন্যাস।
অথবা সত্যি সত্যি হয়তো ইন্টার ডাইমেনশনাল ডোর দিয়ে প্যারালাল জগতে চলে যেত ওরা।
অথবা বাইরের জগতের চতুর প্রাণীদের কাজ। যারা আজও আমাদের উপর নজর রেখেছে। এনখের পুঁথিতে যাদের পাহারাদার বলা হয়েছে। পাহারাদারেরা কিন্তু দেবতা বা দেবদূত না। এরা নাকি ঈশ্বরের সন্তান। সৃষ্টির শুরুতে পৃথিবীতে আসত। দেখে যেত সৃষ্টি রক্ষার কাজ কেমন চলছে । আবার চলে যেত।
তাঁরা আসতো স্বর্গীয় রথে চেপে। যেসবের বর্ণনা প্রাচীন কালের পুরোহিতরা বা নির্বাচিত কিছু লোক লিখে রেখেছিল তাঁদের মহাকাব্যের শ্লোকের পংতিমালায় । হয়তো তাদের বর্ণনা অতিরঞ্জন ছিল। কিন্তু মূল কাহিনি সত্যের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল, সন্দেহ নেই ।
সেই স্বর্গীয় রথ ছিল ইউএফও ।
আমরা সভ্যতা সিঁড়ি দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলাম। আকাশ পথ জয় করলাম। পরমাণুর বোমার ব্যবহার শিখলাম স্বজাতির উপর৷
তারপর মহাকাশ যুগে প্রবেশ করলাম। আমাদের তৈরি কৃত্রিম উপগ্রহ আজ পাক খায় পৃথিবীর কক্ষপথে। চাঁদে পৌঁছে গেছি। যাত্রা এখন মঙ্গলে।
আর সেই জন্যই কি আজ কাল দূর নক্ষত্রের অতিথিরা আসে না ? পৃথিবীতে আকাশে দেখা যায় না ওদের গোল ঝকঝকে ধাতুর তৈরি উজ্জ্বল বিচিত্র বাহন ।
গ্রহান্তরের সব সভ্যতা একই রকম ছকে তৈরি হতে পারে না। অন্য গ্যালাক্সির সেই আগন্তুকেরা হয়তো শূন্য থেকে শক্তি তৈরি করতে পারে। ইলেকট্রোম্যাগনেটিকের বলয় তৈরি করতে পারে। অথবা মুহূর্তেই মহাশূন্যর কোটি কোটি মাইল দূরত্ব পাড়ি দিতে পারে।
কিন্তু পরমাণু শক্তি ব্যবহার করে আমরা যেমন ধ্বংসলীলা করতে পারি, সেটা ওদের কাছে অবিশ্বাস্য ছিল।
উড়ন্ত সসার নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেছেন, তাঁরা একটা ব্যাপারে একমত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সব দেশের আকাশে ফ্লাইং সসারের আনাগোনা বহু গুণে বেড়ে গিয়েছিল। যেন ওরা নিরাপত্তার অভাবে ভুগছে।
বারমুডায় হারিয়ে যাওয়ার আগে বিমানে আর জাহাজ থেকে যে মেসেজ গুলো এসেছিল, বা যারা বারমুডায় বিপদে পড়তে পড়তে বেঁচে ফিরে এসেছে তাদের অভিজ্ঞতাগুলো বিশ্লেষণ করলে অবাক হতে হয়। সবার অভিজ্ঞতা এক ।এবং এ এক অজানা অদ্ভুত শক্তি।
অচেনা ঘটনা।
এমন কিছু আর কিন্তু কোথাও হয় না।
সবার জন্য এ এক নতুন ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা।
জাহাজ হারিয়ে যায়। কিন্তু সৈকতে কোনও মৃতদেহ বা ভাঙা কাঠের টুকরো, তেলের গ্যালন এসে ভিড়ে না । এমন ট্রেস বিহীন গায়েব হয়ে যাবার ঘটনা আগে পরে হয়েছে কিনা সন্দেহ ।
হয়তো সেই ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক ফিল্ডের ভেতরে গিয়ে বস্তুর রুপান্তর হয়ে যায়। তরঙ্গ বা ফ্রিকোয়েন্সির মতো বদলে গিয়ে অন্য রকম হয়ে যায়। বেমালুম অদৃশ্য হয়ে যায় জাহাজ আর বিমান।
এমনটা বলেন আইভান স্যান্ডারসন এর মতো বিজ্ঞান।
কেউ যদি কৃত্রিম ভাবে তৈরি করে থাকে সেই ম্যাগনেটিক ফিল্ড , তবে দীর্ঘ সময় ধরে সেই শক্তির বলয় কাজ করছে কীভাবে ? কীভাবে শক্তির রিচারজ হয়েছে ?
কৃত্রিমভাবে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক তৈরি করা হলেও একই রকম সবুজ কুয়াশা, অস্বাভাবিক রঙিন আলোর নাচন আর সমুদ্রের বুকে রহস্যময় বাস্প দেখা যায়। যা কিনা বছরের পর বছর হয়ে আসছে বারমুডায় ।
কানাডিয়ান বিজ্ঞানী জন হাচিনসন , দীর্ঘ গবেষণায় প্রমাণ করেন অত্যন্ত শক্তিশালী ইলেকট্রোম্যাগনেটিক যে কোনও কঠিন পদার্থকে রূপান্তর করে স্বচ্ছ এবং অদৃশ্য বানিয়ে ফেলতে পারে।
কী সাংঘাতিক।
তাঁর এই তথ্য আজ কাল হাচিনসন অ্যাফেক্ট সংক্ষেপে এইচ এফেক্ট নামে পরিচিত। আর এই শক্তিশালী ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক ফিল্ড এর জন্য কি সময়সীমার দরজা খুলে যেতে পারে? যেমনটা বহু বছর আগে আঠারোশো পচানব্বই সালে এইচ জি ওয়েলেস , টাইম মেশিন নামের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস বলেছিলেন।
আজ যেটা টাইম ট্রাভেল হিসেবে চিনি আমরা।
হারানো জাহাজ বিমান আর সাবমেরিন গুলো চলে গেছে ভিন্ন কোনো সময়ে ?
জন হাচিনসনের গবেষণায় বহু আগে দুনিয়া কাঁপানো এক গবেষণা হয়েছিল। তবে সেটা ছিল গোপন গবেষণা। ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট নামে পরিচিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খানেক আগের কথা । আমেরিকার পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়া শহরে ইউএস নেভির ঘাঁটি ।
সময়টা অক্টোবর২৮, ১৯৪৩।
যুদ্ধজাহাজ এলড্রিজ ( D- 173) কে দিয়ে বিচিত্র এক পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। বিশ্ব যুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছিল নৌ বাহিনী। আর এই গবেষণার মূল নায়ক ছিলেন এড ক্যামরন । তিনি নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট হিসাবে যোগদান করেছিলেন। নতুন একটা আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন।
আলবার্ট আইনস্টাইনের ইউনিফাইড ফিল্ড থিউরি অনুকরণ করে অদ্ভুত রকমের একটা পরীক্ষা চালাতে চাইছিলেন তাঁরা। কোনও বস্তুুর চারিদিকে কৃত্রিম ভাবে যদি শক্তিশালী ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করা যায় , তবে সেই বস্তু কিছু সময়ের জন্য অদৃশ্য হয়ে যাবে।
আর এই পরীক্ষা সফল ভাবে করতে পারলেন তাদের বিজয় সুনিশ্চিত । যুদ্ধজাহাজগুলি অদৃশ্য হয়ে গিয়ে আচমকা আক্রমণ করে বসবে প্রতিপক্ষকে ।
রাডারে ধরা পরবে না।
কেউ জানতে পারবে না, সমুদ্রর বুকে অদৃশ্য হয়ে তুমুল বেগে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এক ঝাঁক যুদ্ধজাহাজ।
ব্যাপারটা রোমাঞ্চকর , নয় কি?
যদিও আলবার্ট আইনস্টাইনের এই থিওরি শুধুমাত্র থিউরি। বাস্তবে প্রমাণ বলতে কিছু নেই। কিন্তু তারপরও তাঁরা গবেষণাটা করল । প্রজেক্টের নাম রাখা হয়েছিল প্রোজেক্ট রেইনবো।
নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা শুরু হল ।
বন্দর ছাড়ল জাহাজ এলড্রিজ।
যন্ত্রপাতির সাহায্যে জাহাজের চারিদিকে কৃত্রিমভাবে ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করা হল। ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে, এই জাহাজটা কিন্তু খালি ছিল না। ক্যাপ্টেন আর ক্রু সহ পরীক্ষা চালানো হয়েছিল।
প্রথম কয়েকটা মুহূর্ত কিছুই হয়নি। তারপর আশ্চর্য রকম সবুজ রঙের কুয়াশায় ঢাকা পড়ে গেল এডড্রিজ জাহাজটা। সবার চোখের সামনে ঝাপসা হতে হতে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল আস্ত জাহাজটা।
অদৃশ্য হয়ে গেল এক সময়।
অদৃশ্য অবস্থায় দুইশ মাইল দূরে ভার্জিনিয়ার নরফোকে পৌঁছে গেল জাহাজটা। নরফোকে তখন এস এস এন্ডু ফুরসেই নামের একটা জাহাজ ছিল । সেই ফুরসেই জাহাজের সবাই দেখতে পায় চোখের সামনে ভোজবাজির মতো হাজির হয়েছে এলড্রিজ ।
মাত্র মুহূর্ত পর আবারও অদৃশ্য হয়ে যায় এলড্রিজ । ফিরে আসে ফিলাডেলফিয়া। পুরো ঘটনাটি ঘটেছিল মাত্র দশ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে।
পুরো এই প্রজেক্টের নামই হচ্ছে ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেনট ।
আমেরিকান নেভির সবচেয়ে বুনো , অসুস্থ আর পাগলামি পরীক্ষা ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট । তারা কোনো বস্তু অদৃশ্য করার কায়দাটা তো করলই সাথে আবিষ্কার করল টেলিপোর্ট করার পদ্ধতি।
কিন্তু জাহাজের নাবিকদের জন্য পুরো পরীক্ষাটা ছিল এক জ্যান্ত দুঃস্বপ্ন।
কিছু নাবিক আর ক্রু পরীক্ষা শেষে অদৃশ্য অবস্থা থেকে আর ফিরে আসেনি। কয়েকজন নাবিকের দেহের অংশ গলে লেপটে গিয়েছিল জাহাজের কাঠামোর নানা জায়গাতে। কয়েকজন পাগল হয়ে গিয়েছিল। বাকি যারা বেঁচে ছিল তারা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।
ওদের অনেকেই নাকি অদ্ভুত অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে গিয়েছিল । যখন তখন অদৃশ্য হয়ে যেতে পারত৷ আবার ফিরে ও আসত।
হঠাৎ হঠাৎ নাকি অনেক লোকজনের সামনে স্বচ্ছ হয়ে যেত তাদের শরীর। ভয়ে আঁতকে উঠত লোকজন।
হয়তো কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টা অদৃশ্য থাকার পর আবার ফিরে আসতো সেই বেঁচে যাওয়া নাবিকেরা। কঠিন দেওয়াল ভেদ করে হেঁটে যেতে পারত ওরা ।
লোকমুখে ছড়িয়ে পড়তে থাকে ঘটনাটা । কারণ একবার ব্যস্ত একটা রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েছিল সেই নাবিকদের একজন। খাওয়া শেষ করে সোজা হেঁটে গিয়ে দেওয়ালের ভিতর ঢুকে পড়ে।
এবার সরকারি কর্তৃপক্ষ মাঠে নামে। বাদবাকি নাবিকদের গোপনে নিয়ে ব্রেনওয়াশ করে। ফলে তারা ভুলে যায় অতীতের সেই গোপন প্রজেক্টের কথা। আর তারপর একে একে সবাই রহস্যময় দুর্ঘটনা মারা যেতে একজন একজন করে। সবাই মারা যায় ।
এক সময় থিতিয়ে যায় প্রজেক্ট রেইনবো বা ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট এর কথা৷ অ্যামেরিকান সরকার কখনওই এই অশৈলী এক্সপেরিমেন্টের কথা স্বীকার করেনি। আজ পর্যন্ত না। পুরো ব্যাপারটি ভিত্তিহীন অপপ্রচার বলে দাবি করেন তাঁরা।
কয়েক বছর পর মরিস কে জেসাপ নামের এক ভদ্রলোক বেশ আঁটঘাট বেঁধে ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেনটের তদন্তে নামেন। উনি বেশ বিখ্যাত লোক। কেস ফর দ্যা ইউএফও নামে একটা বই লিখে বেশ আলোচনা তৈরি করেছিলেন ১৯৫৫ সালে।
সারা দুনিয়ার অব্যাখ্যাত রহস্য , বারমুডা ট্রায়াঙ্গল, উড়ন্ত সসার এই সব বিষয়ে দারুণ রকম আগ্রহী ছিলেন জেসাপ ।
ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টে ব্যাপারে অনেক কিছু জেনে ফেলেন তিনি । সন্দেহ নেই, খুব বেশিই জেনে ফেলেছিলেন । ১৯৫৯ সালের ২০ এপ্রিল ফ্লোরিডাটে নিজের গাড়ির ভেতর মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় ভদ্রলোককে ।
পুলিশি তদন্তে জানা যায়, আত্মহত্যা করেছেন । গাড়ির একজসট পাইপের সাথে অন্য একটা পাইপ দিয়ে গাড়ির ভিতরে ধোঁয়া টেনে নেওয়া হয়েছে। গাড়ির সব জানালার কাচ টেনে তোলা ছিল। পরিষ্কার আত্নহত্যা। যদিও অনেকে বিশ্বাস করে না সে কথা। খুন করা হয়েছিল জেসাপকে।
নিজের নোট বুকের মধ্যে তিনি লিখেছিলেন - বারমুডা আর ফ্লাইং সসারের ব্যাপারে অনেক তথ্য গোপন করে যাচ্ছে আমেরিকান সরকার।
জেসাপের বন্ধু ডক্টর ম্যানসন ভ্যালেইনটাইন বিশ্বাস করেন , খুন করা হয়েছে তাঁর বন্ধুকে। কারণ , তদন্ত করে ফিলাডেলফিয়ার ব্যাপারে অনেক কিছু বের করে ফেলেছিলেন জেসাপ।
আর একটা তথ্য জানা যায়, কার্লস মিগুয়েল এলেনড নামের এক লোকের কাছ থেকে রহস্যময় একটা চিঠি পেয়েছিলেন জেসাপ ।
১৯৫৬ সালের ১৩ জানুয়ারির কথা । এই চিঠিতে কার্লস মিগুয়েল ফিলাডেলফিয়ার ঘটনা নিয়ে তদন্ত করতে বারণ করে দেয় জেসাপকে। তাতে নাকি ভয়ংকর বিপদ হতে পারে।
কার্লস মিগুয়েল ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের যুদ্ধ জাহাজে নাবিক । পরবর্তীতে কী কারণে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন নাবিক মিগুয়েল ।
আর জেসাপের মৃত্যুর পর পুরোপুরি আড়ালে চলে যায় ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেনটের কাহিনি ।
আজ সবাই ভুলে গেছে।
কিন্তু ফিলাডেলফিয়ার ঘটনা যে সম্ভব তার প্রমাণ জন হাসিনসনের এইচ এফেক্ট। কোন বস্তুর চার দিকে প্রতি উচ্চমাত্রার ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করলে, সেই বস্তু অদৃশ্য হয়ে যায়।
আর একথা মনে রাখতে হবে বারমুডার কাছাকাছি বিমিনি দ্বীপে এমন কি অ্যানজেস দ্বীপে সেই সময় আমেরিকার বিমানবাহিনীর নানা রকম মহড়া চলত। নতুন নতুন সাবমেরিন, সোনার আর বিদঘুটে অস্ত্রের পরীক্ষা চালাত । তাদের গোপন প্রজেক্টের নাম ছিল AUTEC অর্থাৎ অ্যাটল্যান্টিক আন্ডার সি টেস্ট অ্যান্ড এভুলেশন সেন্টার।
ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেনটের মত নতুন কিছু করেনি তো ওরা ?
আর সেইজন্যই কি অতগুলো বিমান - জাহাজ - আর সাবমেরিন হারানোর পরও চুপ ছিল আমেরিকান সরকার ?
পুরো ব্যাপারটা একদল অতি বুদ্ধিমান জলদস্যুর কাজ নয়তো ?
সেসময় ক্যারাবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এবং বারমুডার পুরো এলাকাটা ছিল জলদস্যুদের ঘাঁটি। চারিদিকে অসংখ্য দ্বীপ , কুয়াশা আর হাবিজাবি মিলিয়ে লুকিয়ে থাকার জন্য আদর্শ জায়গা। ভয়াল সব জলদস্যু চরিত্র ছিল সে সময়। নীল সাগরে আতঙ্ক। তাঁদের নিয়ে কত কল্পকাহিনীি না ছড়িয়ে আছে আজও।
কোনও ভাবে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির ব্যবহার করে একদল জলদস্যু তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে গিয়েছিল বছরের পর বছর। যুগের পর যুগ।
আর একটা ব্যাপার। কিছু সৌভাগ্যবান ব্যক্তি অসম্ভব ধরনের ভাগ্যের জোরে বেঁচে গিয়েছিল বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ফাঁক থেকে । তাদের অভিজ্ঞতাগুলো ও হুবহু প্রায় একই রকম।
প্রথম ঘটনাটা ১৯৪৪ সালের শেষ দিকে। সাতটা বোমারু বিমান যাচ্ছিল ইতালিতে। তার একটায় ছিল ডিক স্টার্ন নামে অভিজ্ঞ এক পাইলট। বারমুডা থেকে তিনশ মাইল দূরে থাকতেই সবগুলো বিমান রহস্যময় ভাবে কাঁপতে লাগল।
আকাশ ছিল পরিষ্কার। মেঘের চিহ্ন নেই। আকাশের তারা দেখা যাচ্ছে। তারপর ও অভিজ্ঞ পাইলট বুঝতে পারলেন না কেন এমন হচ্ছে। ভয় পেয়ে বিমান ঘুরিয়ে উল্টো দিকের পথ ধরে বন্দরে ফিরে আসলেন। দেখাদেখি অন্য একটা বিমান ও তাঁকে অনুসরণ করল।
ফিরে এসে ডিক স্টান জানতে পারলেন, বাকি পাঁচটা বিমান কখনও ইটালিতে যায়নি। আর কখনও ওদের কোনও রকম খোঁজ পাওয়া যায়নি। হারিয়ে গিয়েছিল সেই পাঁচ বিমান।
ভয় পেয়ে ফেরত আসা বিমান দুটি বেঁচে গেছে । এই ঘটনার কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়নি । এটা হয়েছিল ডিসেম্বর মাসে। মনে রাখা দরকার, পরের বছর ঠিক এই সময়টাতেই ঘটেছিল বিখ্যাত ফ্লাইট নাইনটিনের ঘটনা।
ভদ্রলোকের নাম জিম রিচার্ডসন। অবসরপ্রাপ্ত নেভি পাইলট। বর্তমানে একটা এয়ার ফেরি সার্ভিস কোম্পানির প্রেসিডেন্ট। মায়ামি আর বিমিনি দ্বীপের মধ্যে যে স্থানীয় বিমানগুলো যাতায়াত করে সেগুলোর একটা কোম্পানি। নাম - চাক এয়ার ফেরি সার্ভিস।
এক সকালে নিজের ছেলেকে নিয়ে ফ্লোরিডা থেকে টার্ক দ্বীপে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ করে কম্পাসের উপর চোখ পড়তে অবাক হয়ে গেলেন। বাম থেকে ডানে নাচানাচি করছে কম্পাসের কাটা।
ক্যাম্পাসের সমস্যা কি ? ছেলেকে প্রশ্ন করলেন জিম রিচার্ডসন।
আমরা এই মুহূর্তে অ্যানডেসের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছি। গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে জবাব দিল ছেলে । যতবার আমরা মডেল রিফের সামনে দিয়ে গভীর সমুদ্রের দিকে উড়ে গেছি প্রত্যেক বার এ রকম অদ্ভুত আচরণ করে ক্যাম্পাস ।
এলাকাতে নতুন এলেও জিম রিচারডসন এই ব্যাপারটা শুনেছেন। গভীর রাতে এই রিফের আশেপাশে রহস্যময় আলো জ্বলতে দেখেছেন তিনি। আশেপাশে কোনও জনবসতি নেই। বিমিনি দ্বীপের সব জেলের এটাকে ভূতের আলো বলে । এই এলাকা দিয়ে যে সব জাহাজ বিমান যায় সবাই দেখেছে ওই আলো।
তবে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল এলাকাতে নতুন ।. আগে কারও মুখে এই জায়গার ভূতুরে গল্প শোনেনি। তাঁর নিজের নোট বই থেকে ঘটনাটা শুনুন
‘… ১৯৬৪ সালের নভেম্বরের কথা। ন্যাসো এয়ারপোর্ট থেকে কিছু যাত্রী নামিয়ে দিয়ে ফিরছিলাম। অন্ধকার হয়ে গেছে। আবহাওয়া দারুণ। আকাশভর্তি তারা । রাত সাড়ে নয়টা। সমুদ্র সমতল থেকে আট হাজার ফুট উপর দিয়ে যাচ্ছিলাম। রেগুলার ফ্লাইট। আন্দ্রোস দ্বীপ থেকে ৫০ মাইল ছড়িয়ে এসেছি। বিমানের নাক সোজা বিমিনি দ্বীপ বরাবর ।
এমন সময় বিমানের ডানার উপর হালকা অদ্ভুত আলো দেখতে পেলাম। প্রথমে পাত্তা দিইনি। ভেবেছিলাম ককপিটের ভিতরের উজ্জ্বল আলো বিমানের ডানায় লেগে প্রতিফলিত হচ্ছে। কারণ বিমানের ডানা দুটি উজ্জ্বল সাদা রং করা।
তখনই মনে পড়ল বিমানের ডানা উজ্জ্বল সাদা রঙের হলেও ফ্যাকাশে নীল সবুজ রঙের আলো প্রতিফলিত হচ্ছিল। ধীরে ধীরে সেই প্রতিফলিত আলোর উজ্জ্বলতা এতই বেড়ে গেল যে বিমানের ইনস্ট্রুমেন্ট গুলো ও দেখতে পাচ্ছিলাম না। কম্পাসের কাঁটা ঘুরছে উল্টাপাল্টা।
ফুয়েল গেজের দিকে তাকালাম, বিমান টেক অফ করার আগে হাফ ছিল। এখন দেখাচ্ছে ফুল। মাত্র কয়েক মুহূর্তেই পুরো বিমানটি উজ্জ্বল আলোতে ভরে গেল। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম ।
বিমানের ডানা গুলো নীলচে সবুজ রঙের আলোতে শুধু জ্বলছেই না। ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
কোথায় যাচ্ছে জানি না। দিগন্তের উপরে উঠছি না নীচে নামছি তাও জানি না। কৃত্রিম আলোকিত দিগন্তের দিকে উড়ে যাচ্ছে বিমান । হাল ছেড়ে দিলাম। বিমানই নিয়ে যাক আমাকে যেখানে ওর মর্জি । উপায় কি ? কোনও যন্ত্রপাতিই তো কাজ করছে না ।
ঠিক পাঁচ মিনিট রইল এই অবস্থায়। ধীরে ধীরে বিমানের ভিতরের যন্ত্রপাতি সব স্বাভাবিক হয়ে গেল।কমে এলো আলোর উজ্জ্বলতা। বুঝতে পারলাম যন্ত্রপাতি বা কম্পাস কোনটাই নষ্ট হয়নি।
সব কিছুই ঠিক ঠাক কাজ করছে।
ফুয়েল গেজ আগের মতই নির্দেশ করছে ট্যাংকের তেল অর্ধেক আছে। কম্পাস দেখাচ্ছে আমার লাইন থেকে কয়েক ডিগ্রি দূরে চলে এসেছি।
অটোপাইলট চেক করে দেখি স্বাভাবিক । কাজ করছে ।
এবং এরপর প্রত্যেকটা যন্ত্রপাতি চেক করে নিশ্চিত হয়ে ল্যান্ড করলাম। নিরাপদে নেমে এলাম বিমিনি এয়ার পোর্টে।’
পরে চাক ওয়েকলিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনার কী মনে হয় আপনার এই অভিজ্ঞতা বারমুডার সাথে যুক্ত?
আরে না। এই ঘটনার আগে জীবনও বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের নাম শুনিনি আমি । জবাব দিয়েছিলেন চাক। পরে আমার অভিজ্ঞতা সব পাইলটকে বললাম । জানতে চেয়েছিলাম ওদের ভাগ্যে এমন কিছু হয়েছে কি না। সবাই শুনলো কিন্তু কোনও মন্তব্য করল না। পরে অনেক শুনেছি বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের কথা। প্রচুর অযৌক্তিক ঘটনা ঘটে এই এলাকায়। তার মানে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
আরও অসংখ্য ঘটনা রয়ে গেছে , যারা কপাল গুণে বেঁচে ফিরে এসেছে সেই অভিশপ্ত ত্রিভুজের ভেতর থেকে।
শেষ ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৭০ সালে।
কলম্বাস থেকে শুরু হয়েছিল বারমুডার কাহিনি। শেষ হয়েছে পাইলট ব্রুস গারননকে দিয়ে। পাইলট ব্রুস গারনন আর তার বাপ মিলে বিমানে করে অ্যাঞ্জেস দ্বীপ থেকে বিমিনি দ্বীপে ফিরছিলেন। ডিসেম্বরের চার তারিখ।
বিমান টেক অফ করার খানিক পরই ব্রুস অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, তার সামনে দিগন্ত জুড়ে আছে ডিম্বাকৃতি মেঘের দলা। সমুদ্রের ঠিক ৫০০ ফিট উপরে। সাধারণ দুই স্তর বিশিষ্ট মেঘের দলা। কিন্তু এত নিচে এর আগে কখনও এমন মেঘ স্তর দেখেননি পাইলট ব্রুস।
মায়ামি ফ্লাইট সার্ভিস থেকে রেডিও মারফত রিপোর্ট পাওয়া গেছে, আবহাওয়া ভাল। কাজেই নিশ্চিন্তে বিমান চালাতে লাগলেন। মেঘের
দলার কাছাকাছি আসতেই মনে হল মেঘগুলি যেন রং পাল্টাচ্ছে।
এক সময় মেঘের এই গোলমুখে ঢুকে পড়ল বিমানটা। চারিদিকে ঘন মেঘ। কিছু দেখা যায় না। নিজের দঙ্গল যেন গিলে ফেলবে বিমানটা।
ব্রুস আবিষ্কার করলেন, এটা একটা কুয়াশা সুড়ঙ্গ। চারিদিকে ঘন কুয়াশা, শেষ মাথায় আলো দেখা যাচ্ছে। আবিষ্কার করলেন বিমানের কোনও যন্ত্রপাতি ঠিক মতো কাজ করছে না। কম্পাস ঘুরছে বনবন করে। চেষ্টা করে বিমান নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। উড়ে যাচ্ছে নিজের ইচ্ছামতো। কন্ট্রোল টাওয়ারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করতে লাগলেন। আবিষ্কার করলেন রেডিও বিকল হয়ে গেছে।
চারিদিকে শুধু ধূসর রঙের কুয়াশা । নীচে সমুদ্র অথবা মাটি অথবা আকাশ। কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। ভাগ্যের হাতে নিজেদের ছেড়ে দিলেন। এক সময়ে শেষ হল সুড়ঙ্গ। খোলা নীল আকাশে বের হয়ে পড়ল ব্রুসের বিমান। মাত্র তিন মিনিট কুয়াশার সুড়ঙ্গে ছিল ওদের বিমান।
আবিষ্কার করলেন বিমিনি দ্বীপ থেকে ৯০ মাইল দক্ষিণ- পশ্চিমে পৌঁছে গেছে বিমানটা।
খানিক বাদেই বিমিনি দ্বীপে ল্যান্ড করলেন ব্রুস। আবিষ্কার করলেন পুরো যাত্রার সময় লেগেছে ৪৭ মিনিট। অথচ পথ বাড়িয়ে দিয়েছেন দ্বিগুণের বেশি। মোট দুইশ পঞ্চাশ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছেন মাত্র ৪৭ মিনিটে।
সরাসরি মায়ামি থেকে বিমিনি যেতে সময় লাগে কমপক্ষে হলেও ৭৫ মিনিট কী ভাবে সম্ভব হল এটা?
বেশ ভয় পেয়ে গেলেন ব্রুস । নেমেই বিমান বন্দরে রিপোর্ট করলেন তিনি। কেউ তার কথা বিশ্বাস করেনি। অবিশ্বাস্য ও করেনি। ফালতু গালগল্প করা মানুষ না ব্রুস গারনন। তারপরও তেমন একটা পাত্তা পায়নি ব্রুস।
দীর্ঘ অনেকগুলো বছর পর হঠাৎ করে এ বিষয়ে উৎসাহী হয়ে উঠেছেন কিছু বিজ্ঞানী। তাঁদের ধারণা সত্যি সত্যি টাইম ট্র্যাভেল সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল ব্রুসের বিমান। আজকে লোকজন তার কথা পাত্তা দিচ্ছে না। অদূর ভবিষ্যতে তাঁর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে হয়তো বদলে যেতে পারে বিজ্ঞানের পুরনো ধ্যান ধারণা । নতুন কোনও সভ্যতার প্রকাশ করতে পারি আমরা । ব্রুস গ্যাননের যুগ শুরু হতে পারে।
তো সেই বৈদ্যুতিক কুয়াশা বা সময় সুড়ঙ্গ কি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হতে পারে ? না ওগুলো তৈরি হওয়ার জন্য দায়ী ভিনগ্রহের কোনও বুদ্ধিমান প্রাণী বা এই পৃথিবীর নোংরা একদল মানুষ যাঁরা সাম্রাজ্যবাদী কোনও রাষ্ট্রের পক্ষে আড়াল থেকে কলকাঠি নেড়েছিল এক সময়।
ভালো কথা সবই সম্ভব বিচিত্র এই পৃথিবীতে।
বারমুডা ট্র্যায়াঙ্গেলের ঘটনাগুলো কি সত্যিই এক অমীমাসিত রহস্য নাকি সবই বানানো গালগল্প ?
এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ছেড়ে দিলাম আপনার উপর। তবে এ কথা বলতেই হয়। ওখানে একটা রহস্য সত্যিই ছিল।
সাগর তার সব রহস্য নিজের কাছেই রেখে দিয়েছে।
আজও ফাঁস করেনি।
শেষ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন