শীত আসতো বেশ কায়দা করে।
বরই গাছে যখন রোজি আপার নাক ফুলের মত ছোট ছোট ফুল ধরত তখন বুঝতে পারতাম শীতের আর দেরি নেই।
কালি পূজা শেষ হত কাত্তিক মাসে।
বাড়ির চল্লিশ কদম দুরেই রামসীতা মন্দির।পুরানো বিবর্ণ। মন্দিরের চারিদিকে মান্দার আর ফনি মনসার ঝাড়। ফনি মনসাগুলো লম্বা মেক্সিকান রুটির মত।শ্যামা ঘাস আর বন তেজপাতার দঙ্গল চারিদিকে।মন্দিরের ভেতরে কাচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে মস্ত এক বেল গাছ। সোনার বলের মত বেল গাছ ভর্তি।
কালি পূজা হয় বেশ রাতে। অন্তত আমার মনে হত গহীন রাত। মোমবাতি আর ঘিয়ের প্রদীপ দিয়ে মা বাড়ি সাজাতো। মন্দিরের দেয়ালেও পিট পিট করে জ্বলত ডিমের খোসার রঙের মত কয়েক ডজন সাদা মোম।
কালি পূজার রাতে মজার জিনিস দেখতাম । নারকেলের শুকনো মালার অর্ধেকটার মধ্যে কায়দা করে মোম জ্বালিয়ে সেটা দড়ি বেঁধে হাতে করে ঘুরে ফচকে কিছু ছোকরা। মোমের আলো লণ্ঠনের মত লম্বা হয়ে এক দিকেই পড়তো।গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে ওরা ঘুরে বেড়াত শয়তানের মত ।
কালি পূজার রাতেই মনে হত শিশির পড়েছে।পরের দিন সকালে উঠানের বাক্সা ঘাস পেতাম ভেজা । আবার সন্ধ্যায় যখন হাত মুখ ধুয়ে পড়তে বসতাম দেখতাম বাইরে দরজায় সামনে রাখা স্যান্ডেল শিশিরে ভেজা।
বুঝতাম শীত এসে গেছে।
তখন অনেক নিঝুম রাতেই ঘুম ভেঙ্গে যেত। টিনের চালের উপর থেকে টুপ টাপ করে ঝরে পড়তো নীল রঙের শিশির । প্রতিবেশী রোজি আপার আম্মা টিনের চালের উপর পুঁই শাক, লাল শাক আর পালং শাক রেখে দিতেন। শিশিরে ভিজে শাক টাটকা থাকবে নাকি।অমন অদ্ভুত জিনিস আমি দেখিনি বা শুনিনি জীবনে।
শীত কালে আমার কাজ বেড়ে যায়।
বাসায় ইটের মত বড় পাউরুটি আনা হয়। মিষ্টি একটা ঘ্রান, পাউরুটির উপরের অংশ টিনের চালের মত। আর বাদামী রঙের। পাউরুটির টুকরোতে ভাল করে কমলার জেলি মাখিয়ে দিলে ওটা যে দারুন একটা খাবার হয়ে যায় সেটা তো তোমাদের বলার দরকার দেখি না। মধুর বড় শিশি সারা বছর থাকে। মধু নিয়ে আমার ছোট ভাইটার মুখে ইচ্ছা মত ঠেসে দিই। ও সব মধু একবারে খেতে পারে না।আমি ওকে বুঝাই বেশি করে মধু খা। নইলে শক্তি পাবি কোত্থেকে ?ও শক্তি পেয়ে চেঁচায়।
সকালের জল খাবার হয়ে গেলে আমি পিঁপড়াদের ব্রেক ফাস্ট খাওয়াই।
ওরা আমার পরিচিত পিঁপড়া। আমাদের বাসায়ই থাকে। কাজেই কাছের পিঁপড়া। দূরের কেউ না। বিস্কুটের গুঁড়া বা পাউরুটির মিহি টুকরো অথবা লাল চিনির দানা ছড়িয়ে দেই।পিঁপড়ারা কতটুকু খায় ঠিক বুঝি না। সবাই যার যার মাথায় খাবারের টুকরো নিয়ে নিজেদের বাসার দিকে হাঁটা ধরে।সম্ভবত পরিবারের সবাই মিলে খাবে। এটা একটা ভাল লক্ষণ। ওরা পরিবারের কথা চিন্তা করে।
এই সময় রান্না ঘরে রেডিও বাজে। রেডিওটা প্রায় ইটের মত বড়। মায়ের প্রিয় জিনিস। ম্যালেট মাছের মত রুপালী ঝিকিমিকি রঙের। আমাদের যেমন কান আছে রেডিওর কান আছে। ওটা মুচড়ে দিলেই হরেক ইষ্টিশন ধরা যায়। মা যে ইষ্টিশনটা বেশি ধরত সেটা হল- আকাশ বানী।সুন্দর গলায় একটা গান বাজত-
যারে যারে উড়ে যারে পাখি
ফুরালো প্রাণের মেলা
শেষ হয়ে এলো বেলা
আর কেন মিছে তোরে বেঁধে রাখি।।
গায়িকা ভদ্রমহিলার নাম লতা মুঙ্গেশকর। মুঙ্গেশকর মানে কি আমি ঠিক জানি না। উনি আমার পিসীর মত।
জলপাই তেলের রঙের হয় শীতের দুপুরগুলো ।আর বেশ ছোট। বাসায় পিছনের বাগানে হলুদ রঙের শসা ফুল হয়ে আছে। উত্তুরে হাওয়ায় থর থর করে কাঁপে ওরা । দুপুরের পর রোদ নেমে যায়। বিকেলটা হয় আরও কমলা রঙের।
তখন এক গাদা পাখি এসে বসে পিছনের বাগানে। ঘাসের দানা খাওয়ার লোভে।
আরও কিছু বিস্কুট বরাদ্দ রাখতে হয়। পাখিদের খাওয়াই। একটা মোটা খাতায় লিখে রাখি মোট কয়টা পাখি এলো।পরের দিন আবার গুণে দেখি পাখির সংখ্যা বেশি না কম। যদি বেশি হয় তবে বুঝি আমার দেয়া বিস্কুট ওদের ভাল লাগে তাই বন্ধুদের ডেকে নিয়ে এসেছে। আর কম পাখি হলে বুঝি ওরা দূরে কোথাও বেড়াতে গেছে। ওদেরও বন্ধু বা আত্মীয় স্বজন আছে,
শীতের আগেই পাখিরা ওদের বাসা বানিয়ে ফেলে।
বেশির ভাগ পাখির বাসা পেয়ালা বা বাউলের মত দেখতে হয়। শুকনো ঘাস, খড়,গাছের ডাল , তুলা, মুরগির বা পাখির পালক, পাতা আর কাঁদা মাটি দিয়ে ওরা বাসা বানায়।
চাইনিজরা পাখির বাসার সূপ খায়, অমন একটা কথা শুনেছিলাম।শুনে মেজাজ টং হয়ে গিয়েছিল । কল্পনায় দেখতে পেলাম ফর্সা, নাক বোচা আর বেত ফলের মত পিচ্চি চোখওয়ালা এক বুড়ো চিনা ভদ্রলোক রেস্টুরেন্টে বসে আছেন।উনার সামনে গরম জলের ভেতরে ভাসছে আস্ত একটা পাখির বাসা। উনি গোল মরিচ আর লবণ ছিটিয়ে সূপ স্পুন দিয়ে ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে সেই সূপ খাচ্ছেন। আবেশে উনার চোখ আরও ছোট হয়ে গেছে। সূপের চামচ দেখতে ডাইনিদের নাকের মত ।
পরে জানলাম সব পাখির বাসা দিয়ে সূপ বানায় না চাইনিজরা। সুইফটলেটস নামে কালচে বাদামী এক পাখি আছে। লেজটা দুই ভাগ করা। ওরা পাহাড়ের গুহার বাসা বানায়। খড় কুটো বা গাছের ডাল পালা দিয়ে না। নিজেদের থুতু দিয়ে বাসা বানায়। আর সেই থুতু শুকিয়ে নারকেলের ফোঁপরার রঙের কেমন একটা জিনিস হয়।সেটাই সংগ্রহ করে চাইনিজরা। দামও মেলা। ২৫০০ ডলার এক কেজি থুতু...ইয়ে মানে পাখির বাসা।সেটা গরম জলে ফুটিয়ে আদা আর ভিনেগার দিয়ে দারুন একটা সূপ বানিয়ে খায় ওরা।গত ৪০০ বছর ধরেই অমন পাখির বাসার সূপ বানাচ্ছে ওরা। স্বাস্থ্যের জন্য নাকি ভাল।
বড় হয়ে আমি অমন সূপ খাব না।
তিন সত্যি।।
পাখিদের ব্যাপারে খোঁজ নিতে গিয়ে অনেক মজার মজার জিনিস জানলাম।যেমন মুরগীও এক ধরনের পাখি । ওরা আবার সেই টাইনোসরাক্স রেক্স নামের ডাইনোসরদের আত্মীয়।
সর্বনাশ।
মুরগী মোট ২০০ ধরনের শব্দ করতে পারে নিজেদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য।ভালই তো।সব চেয়ে ছোট্ট ডিম দেয় হারমিং বার্ড। ওদের ডিম মটর দানার সমান বড় হয়।আর সবচেয়ে বড় হয় উটপাখির ডিম। ফুটির সমান বড় হয়। ফুটি চেন না ?আরে অনেকে তোমরা বাঙ্গি বল। সাহারা মরুভূমির অনেক যাযাবর জাতি উট পাখির ডিমের খোসা দিয়ে জলের কলস বানায়।একটা উট পাখির ডিম নাকি টানা দুই ঘণ্টা সিদ্ধ করতে হয়।
পাখিদের ক্ষেত্রে ছেলে পাখিদের পালক বেশি রঙিন আর চকচকে হয়।মেয়ে পাখি মানে পাখিনিদের পালক একটু ফ্যাকাসে হয়। মানুষ যে পাখিটা প্রথম পোষ মানিয়েছিল সেটা হচ্ছে হাঁস।সারা দুনিয়ায় প্রায় ৯৫০০ ধরনের পাখি আছে।একটা তোতা পাখি পঞ্চাশটির মত শব্দ শিখতে পারে। তবে আফ্রিকান ধূসর তোতা পাখি ৮০০ শব্দ শিখতে পারে।
ওজনের তুলনায় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত জিনিস হচ্ছে পাখির পালক।
শীতের দুপুরটা পাখিদের সাথেই কাটে।মোট কয়টা পাখিকে খাওয়ালাম সেটা নোট বইতে লিখে রাখার পর কাজ শেষ।নোট বইটা বেশ সুন্দর। নীল রঙের পিচ্চি পিচ্চি ছক আছে। যাতে সংখ্যা বসাতে পারি। পাকড়াশিদের দোকানে গিয়ে অংক খাতা বললেই চেনে ওরা।
শীতের দুপুর গাঁদা ফুলের মত হলুদ হলেও বিকেলটা পাকা কুমড়োর মত কমলা রঙের হয় সেটা কিন্তু আগেই বলেছি।
বিকেলে একটু বাঙলার মাঠে যেতে হয়।
বাঙলার মাঠ পৃথিবীর সব চেয়ে সুন্দর জায়গা। মাঠ পাড়ি দিলেই কালো পিচের রাস্তা। আর সেই রাস্তা পেরুলেই নদী। নদীর দুই পাশে শেয়াল কাঁটার দঙ্গল। আরেকটা কি যেন লতা আছে। চিনি না। শর্ষের পাতার মত। ঝাঁকড়া বাঁটুল এক গাছে কামরাঙ্গার মত ফল হয়।
বাঙলার মাঠের এক কোনে এক ফালি জমিতে শালগম, বীট আর মূলার আবাদ করে বাংলোর দারোয়ান।মৌসুম শেষ হলে মাঠ থেকে শালগম তুলতে দেখেছি। মনে হয় অচেনা কোন দানবের দাঁত। একই কথা মূলার ব্যাপারে। মধ্য আফ্রিকার কিবিরা গ্রামের হাতির দাঁতের মত।
শীতের সবজী বড্ড মায়াবী হয়। বরবটি, শিম, কলাইশুঁটি, ফুল কপি বাঁধাকপি, টমেটো। সারা রাত শিশিরের জল দিয়ে স্নান করে ওরা।অনেক সকাল পযন্ত কুয়াশায় চাদরে ঘুমিয়ে থাকে।
মাঠে বিকাল নেমে আসে। সব পাখী ঘরে ফেরে। সাই সাই করে উত্তুরে হাওয়া বইতে থাকে ।
হিম বাতাসে মনটা হারিয়ে যায় দূরের দেশগুলোতে। যেখানে সন্ধ্যায় বরফ পরে। বাড়ির চিমনি আর লাল টালি বরফে ঢেকে যায়। কামরার ভেতরে ফায়ার প্লেসে পাইন আর ওক কাঠের আগুন জ্বলে। টেবিলে থাকে পাকা আপেলের পিঠা। এই সব ভাবতে ভাবতে হাঁটতে থাকি। বাড়ির কাছা কাছি আসতেই চায়ের পাতা ফোটানোর ঘ্রান পাই।
এক গাদা উলের বল নিয়ে শীতের কাপড় বানাতে বসে মা।
কত বিচিত্র আর রঙিন উলের বল থাকতো আমাদের বাড়িতে।জ্বলন্ত কয়লার মত লাল, দুপুরের রোদের মত হলুদ , দুর্লভ পাথরের মত ফিরোজা রঙের ,কয়লার মত কালো, বরফের মত সাদা। দুটো অ্যালুমিনিয়ামের কাঁটা দিয়ে কি এক অদ্ভুত কায়দায় সুন্দর সোয়েটার আর মাফলার বানায় মা। কাজ চলতে থাকতো আর উলের বলটা গড়াগড়ি খেত মেঝতে।
অবাক হতাম । কে কবে এই উল বানাতে শিখল ?কি করে জানল উলের কাপড়ে উম লাগে।অনেক আগে, মানুষ যখন গুহাতে থাকতো আর পাথরের অস্ত্র থেকেই নাকি ভেড়ার চামড়া ব্যবহার করতো পোশাক বানানোর জন্য।কবে উলের ব্যবহার শুরু করলো মানুষ ?
বিজ্ঞানীদের মতে আজ থেকে দশ হাজার বছর আগে আজ যেখানে তুরস্ক সেই এলাকার মানুষ জন ভেড়ার লোম থেকে উল বানানো এবং ব্যবহার করা শুরু করে।
মানুষ যখন দেশান্তরী হত সেই পুরানো সময়ে তখন থেকেও উলের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়।এবং আজও উল সেরা।আর যে কোন শীতের পোশাকের চেয়ে উল ভাল কারন মানুষের চামড়ার উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া করে না।শুধু যে বুড়ো মানুষের মাফলার, সান্তাক্লজের মোজা, আর পিচ্চি বাবুদের সোয়েটার বানানোর জন্য উল দরকার অমনটা না কিন্তু।কার্পেট, পুল টেবিল, পাপোশ , টেনিস বল , অমন বহু দরকারি জিনিস বানাতে ও উল দরকার।
একটা বুড়ো ভেড়ার শরীর থেকে যে পরিমাণ উল পাওয়া যায় তা দিয়ে ৭০ জোড়া মোজা বানানো যায়।পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি উল হয় অস্ট্রেলিয়াতে।
আমার পিচ্চিবেলার শীত মানেই মায়ের বানানো নতুন কোন উলের সোয়েটার যেটা আমি জাম্পার ও বলতাম।একবার উলের একটা দস্তানা বানিয়ে দেয়ার জন্য আবদার ধরেছিলাম। ইংরেজি সিনেমার ভিলেনকে দেখেছিলাম অমন দস্তানা পরে খুন খারাবি করে।
সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার।
তখন বাড়ি বাড়ি ফেরি করে উল বিক্রি করতো কিছু মানুষ।পুরানো উল বিক্রি হত ফুটপাতে। নিউ মেট্রো সিনেমা হলের ওখানের রাস্তাটায় পুরানো এক গির্জা ছিল। চিংড়ি মাছের মত রোগা এক লোককে দেখতাম। অনেক গুলো বছর ধরে।
শীত এলেই চটের কাপড় বিছিয়ে বসে থাকতো । সামনে উলের গুলি। লম্বাটে ছড়ার মত যেন বরবটির আঁটি।
শীতর শেষে হারিয়ে যেত সে। রোদ উঠলে কুয়াশা যেমন হারিয়ে যায়, তেমন ।পরের বছর শীতের শুরুতে আবার আসতো।রঙিন উলের গোলা নিয়ে।
এক শীতে আর দেখলাম না।পরে আর কখনই দেখিনি।
কত কাল মা শীতের সোয়েটার বানায় না।কমলা রঙের দুপুরে ফেরিওয়ালা হেকে যায় না - উল রাখবেন নি ...উল ।
কত কাল!
আহা, কত কাল !!
কত কাল ! কত কাল !

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন