মাধব ঠনঠনিয়ার সার্কাস যারা না দেখেছে, তাদের কিন্তু ব্যাপারটা সহজে বোঝানো যাবে না ।
অদ্ভুত সব খেলার সমাহার।
তার দলের নাম - স্টার সার্কাস।
গত দশ বছর ধরে এরা খেলা দেখিয়ে এত নাম করেছে বলার মত না।
এদের কারনে ছোট খাট সার্কাস দলের মালিকেরা কোন মতে সকাল বেলা এক লোটা জল আর একটা বাতাসা খেয়ে বেঁচে আছে।
যে কোন দিন, না খেয়ে শুটকি হয়ে মারা যাবে ।
হেমন্তের শেষে যখন সোনার কুঁচির মত পাকা ফসল কেটে, কৃষকেরা ঘরে তুলে, মাঠ ঘাট থাকে ফাঁকা।
হালকা তির তিরে শীতের হাওয়া বইতে থাকে উত্তর দিক থেকে ।
তখন বিশাল ফাঁকা মাঠের মধ্যে, মাধব ঠনঠনিয়ার স্টার সার্কাস এসে তাবু গাড়ে ।
ছাতার মত গোলাকার পেল্লাই সাইজের তাবু। দূর থেকেই সবার চোখে পরে ।
রঙ বেরঙের কাপড় দিয়ে বানানো সেটা ।
শহর ঘুরে, দুইজন আধ হাত লম্বা বেঁটে মানুষ , পোস্টার সেঁটে দিয়ে যায়।
মানুষ দুইজনের মুখে রঙ মাখা। ঢোলা রঙ্গিন রেশমি পায়জামা পরনের। খালি গা। শরীরে রঙ্গিন হাত কাটা ফতুয়া।
কালাই করা হলুদ টিনের চোঙ ফুকে চিল্লানি দিয়ে ওরা বলে যায় –
‘’এসেছে স্টার সার্কাস। সপরিবারে দেখার মত। প্রবেশ মূল্য এক টাকা । শিশুদের প্রবেশ মূল্য নেই।‘’
সেইসব পোস্টার দেখলেই গা ছম ছম করে।
সিংহের মুখের ভেতরে মাথা দিয়ে আছে কেমন একটা রোগা পটকা মানুষ। মাথা ঢুকিয়ে সেই অবস্থায় আবার হাসছে !
ভাল্লুক সাইকেল চালাচ্ছে।
আগুনের গোল্লা খাচ্ছে একটা মেয়ে !
হেন তেন।
টানা এক মাস থাকতো ঠনঠনিয়ার সার্কাস।
ভিড় হত বেশুমার।
গোলাকার জায়গায়, মানে মঞ্চে সার্কাস দেখান হত । সেইজন্য মঞ্চের নাম রিঙ। আর পুরো অনুষ্ঠান ঠনঠনিয়া বাবু সম্পাদনা করতেন দাঁড়িয়ে। তাই তাকে বলা হত রিঙ মাষ্টার।
আলো ব্যবহার হত ঝাঁ চকচকে । বিজলির আলো জ্বলত বেশুমার ।
দলের সদস্য সবাই , জরি আর চুমকির কাজ করা জামা পরে সার্কাস দেখাত ।
লাল , নীল , সবুজ , হলুদ বিজলির আলোতে মধ্য রাতের তারার মত জ্বলত সবাই।
প্রথম প্রথম গতানুতিক খেলা দেখালেও ঠনঠনিয়া বেছে বেছে সেরা খেলোয়াড় নিতে থাকে।
সারা দেশ থেকে বেছে বেছে খেলোয়াড় নিত।
দেখা গেল, তার দল বেশ পোক্ত হয়ে গেছে।
একজন খেলোয়াড়, সে কি না মুখের ভেতরে তিন চারটে, দুই ফলা ধারওয়ালা তলোয়ার পুরে দিতে পারে।
চারটে হাতি পেল্লাই এক রঙ্গিন বল নিয়ে ফুটবল খেলে।
শরীর ভর্তি হলুদ ডোরা কাটা দাগওয়ালা দুটো বাঘ এসে সব দর্শককে সালাম ঠুকে গম্ভীর মুখে চলে যায়।
কেশরওয়ালা ঘোড়া এসে লোহার নাল পরা পা ঠুকে ঠুকে, টগবগ শব্দ করে বাজনার তালে তালে নাচ দেখায় ।
ফ্লায়িং ট্রাপিজের খেলা দেখায় সজনের মত হিল হিলে দুটো লোক।
এরা চোখের উপর কালো কাপড়ের পট্টি বেঁধে তাবুর এক মাথা থেকে শূন্যে উড়ে গিয়ে লোহার ডাণ্ডা ধরে বাদুরের মত ঝুলতে থাকে। কোন ভয় ডর নেই !
আবার কাণ্ড দেখ, রিঙ্গের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় দড়ি টানানো হয় টান টান করে।
সেটার উপরে চোখে পট্টি বেঁধে এক লোক সাইকেল চালিয়ে নিয়ে যায় হাসি মুখে।
জ্বলন্ত রিঙের ভেতরে লাফ দিয়ে পার হয় এক হালি লোক। রিঙের চারিদিকে চাকু গাঁথা।
হাত পা বেঁধে সিন্দুকের ভেতরে পুরে দেয়া হয় একজন অন্ধ বাদককে।
ভেতরে বসে বিউগল বাজায় লোকটা।
সিন্দুকের চাবি থাকে এক দর্শকের পকেটে।
দর্শকদের ফরমায়েশ মত বাজনা শেষ করে পর্দার আড়াল থেকে কি করে যেন বের হয়ে আসে সেই অন্ধ বাদক।
সব মিলে মিশে সে এক অশৈলী ভোজবাজির আসর যেন।
দিনে দিনে সার্কাসের নাম যত হচ্ছিল , ততই কেমন যেন অহংকারী হয়ে যাচ্ছিল মাধব ঠনঠনিয়া।
আরও ভাল লোক চাই তার।
আরও বড় দল বানাবে।
শহরের বাজারগুলোতে পোস্টার সেঁটে বিজ্ঞাপন দিল –
‘জাদুকর চাই।‘
আশ্চর্য , অদ্ভুত , বিচিত্র আর রহস্যময় খেলা দেখাতে পারবে অমন জাদুকর চাই। বেতন দেয়া হবে জাদুকর যা চাইবে তাই !
ঠনঠনিয়ার স্টার সার্কাসে কাজ পেতে চায় অমন লোকের কিন্তু অভাব নেই।
পোস্টার দেখে অনেকেই দৌড়ে গেল।
দিনটা ছিল ছুটির দুপুর ।
শালগমপুরের বিশাল মাঠের মধ্যে তাবু ফেলে নিজের আপিসে বসে ছিল মাধব ঠনঠনিয়া।
আপিস মানে, তাবুর ভেতরে পর্দা ঘেরা ছোট্ট একটা জায়গা। সামনে শিশু কাঠের টেবিল। টেবিলের উপর রাখা হিসাবের কাগজ পত্র। টিকিট বিক্রি আর কর্মচারীদের মাইনের হিসাব। সাথে, ঘোড়া , হাতি , বাঘ এইসব জন্তু জানোয়ারদের খোরাকীর হিসাব।
দরকারি সব কাগজের উপর কাচের গোলগোল্লা একটা পেপার ওয়েট রাখা । বাতাসে যেন উড়ে না যায় !
পাশে দাঁড়িয়ে ম্যানেজার -সেনাপতি লস্কর ।
একজন- একজন করে আসছে চাকরির জন্য আবেদন করতে।
খানিক পরই মাধব ঠনঠনিয়ার ধমক খেয়ে নিজেদের মুখটা পচা আতা ফলের মত কাচু মাচু করে বের হয়ে আসছে।
দুপুর গড়িয়ে আসছে।
মাধব ঠনঠনিয়ার হাতে পিতলের গ্লাস ভর্তি ছাতুর শরবৎ।
তখন এলো শেষ চাকরি প্রার্থী।
বয়স কম এর। লম্বা । কালো। রোগা ।
গায়ে ছিট কাপড়ের রঙ্গিন জামা। চারিদিকে জামার ঝুল নেমে ত্রিভুজ আকৃতি হয়ে। জামাটা বানানো হয়েছে রুইতন আকৃতির রঙ বেরঙের অনেকগুলো কাপড়ের টুকরো দিয়ে।
চোষ পায় জামা পরেছে। সেটাও একই রকম রুইতন কাপড়ের টুকরো দিয়ে বানানো। পায়ে নাগড়া। নাগড়া জোড়া সুন্দর। ওখানে বরফি কাট কাচের টুকরা বসানো। লোকটার মাথায় তেকোনা ত্রিভুজ একটা টুপি ।
টুপির চারিদিকে ঝুলছে পিতলের কতগুলো পিচ্চি পিচ্চি ঘণ্টা।
লোকটা সামান্য নড়াচড়া করতেই টুং টাং করে শব্দ করছে সেইসব ঘণ্টাগুলো।
'এটা আবার কেমন একটা নমুনা !' মনে মনে বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বলল না ঠনঠনিয়া।
' নাম কি তোমার ?' বেশ ভারিক্কি চালেই প্রশ্ন করল ঠনঠননিয়া।
‘ নামে কি আসে যায়।' কেমন একটা মুচকি হাসি হেসে বলল নতুন লোকটা। ' আপনি আপাতত আমাকে নয়া বাজীকর বলতে পারেন। ফুস মন্তর ও বলতে পারেন।'
' শুধু পাকনা পাকনা কথা বলতে পারো ? না সার্কাসের খেলা বা যাদু তাদু কিছু শিখেছ ?'
ছাতুর শরবৎ গিলে প্রশ্ন করলো ঠনঠনিয়া।
' সামান্য যাদু জানি।'
'দেখাও ।'
সাথে সাথেই আগন্তুক নতুন জাদুকর, যে নিজের নাম বলেছিল ফুস মন্তর বা নয়া বাজীকর খেলা দেখাতে শুরু করলো।
প্রথমে সে মাথার টুপির ভেতর থেকে টান দিয়ে বের করে আনল পেল্লাই সাইজের একটা খরগোশ। খরগোশের মাথায় আবার জ্যাক দ্যা রিপারের টপ হ্যাট টুপির মত লম্বা টুপি। লাফ দিয়ে খরগোশটা চলে গেল সামনের গাজরের ঝোপে। অথচ খানিক আগেও ওখানে কোন গাজরের চারা বা গাছ ছিল না।
ওখানে গিয়ে একগাদা গাজর নিয়ে মিকচার মেশিনে ভরে গাজরের জুস বানাতে লাগল সেই খরগোশটা !
অমন কী হয় নাকি ?
একে একে দেখাল সে, অদ্ভুত সব মায়াবী খেলা। বিস্ময়কর !
মুঠোর ভেতর থেকে বের করে আনল ঘুড়ি। ফু দিতেই ঘুড়ি উড়ে গেল । একটা ঘুড়ি থেকে হয়ে গেল এক ডজন ঘুড়ি। সবার রঙ আলাদা। সবচেয়ে বড় ঘুড়িটার মুখে দেখা গেল হাঙরের মত দাঁত।
চপ চপ করে খেয়ে ফেলল বাদ বাকি সব ঘুড়ি।
শূন্যে হারিয়ে গেল সেটা ।
পকেট থেকে বের করে আনল টিনের তৈরি চায়ের কেতলি ।
ফুস মন্তর বলে ছেড়ে দিতেই সেই কেতলিটা হয়ে গেল একটা হাতি।
শুঁড় তুলে সবাইকে প্রণাম করে তাঁবুটা এক পাক ঘুরে এলো হাতিটা। শেষে জাদুকরের সামনে এসে আবার কেতলি হয়ে গেল।
কেতলিটা হাতে তুলে নিয়ে কোত্থেকে একটা পেয়ালা এনে, এক পেয়ালা গরম চা ঢেলে ম্যানেজার সেনাপতি লস্করের হাতে তুলে দিল জাদুকর ফুস মন্তর ।
‘কেমন দেখলেন ?’ বিনয়ের সাথে জানতে চাইল ফুস মন্তর । মুখে হাসি ।
‘ছোকড়াকে রেখে দিন বাবু।‘ চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে ফিসফিস করে বলল ম্যানেজার সেনাপতি লস্কর । ‘ নাইরোবি অথবা মোমবাসার চা। আসল জিনিস। চনমন করা ঘ্রানেই টের পেয়েছি । চিনি আর দুধ পর্যন্ত দিয়েছে আমার মুখের স্বাদ মত । রেখে দিন বাবু ।‘
‘এইসব সস্তা হাত সাফাই অনেকেই জানে।‘ তোম্বা চেহারা করে বলল ঠনঠনিয়া। ‘ ভাল যাদু শিখতে পারলে, তবে এসো । ফুটপাথের জাদুকর আমার লাগবে না ।‘
ফুস মন্তরের চেহারা ঘেমে গেল।
থাবা মেরে ঠনঠনিয়ার টেবিলের উপর থেকে কাচের পেপারওয়েটটা হাতে তুলে নিল । রাগি চোখে একবার ওদের দিকে চেয়ে হনহন করে বের হয়ে গেল তাবুর ভেতর থেকে।
সাথে সাথেই কোত্থেকে যেন এক মুঠো দমকা হাওয়া এসে টেবিলের উপরে রাখা সব কাগজ বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে গেল। নানান জায়গায় ।
পিছন থেকে হা হা করে উঠলো ঠনঠনিয়া। পেপারওয়েটটা ওর প্রিয় জিনিস। কোন এক বিলাতি সাহেব সার্কাস দেখে খুশি হয়ে দিয়েছিল ।
ফুস মন্তরকে বাঁধা দেয়ার আগেই চলে গেছে।
‘ছেলেটাকে রাখলে ভাল করতেন বাবু।‘ মন খারাপ করা গলায় বলল সেনাপতি লস্কর ।
‘ আরও ভাল লোক চাই আমার।‘ খেঁকিয়ে উঠলো ঠনঠনিয়া। ‘ এ রকম হাত সাফাই সবাই পারে। যাও ওকে ধরে, আমার পেপারওয়েট ফেরত নিয়ে এসো ।‘
দ্রুত চলে গেল সেনাপতি লস্কর ।
খানিক পর চিৎকার দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ফেরত এলো ।
আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল সেনাপতির চোখ। ঘামছে ।
চেঁচিয়ে বলল , ‘ বাবু। ছোকরা আসলেও যাদু জানে। আমাদের সবাইকে, পুরো সার্কাসের দলটাকে কাচের পেপারওয়েটের ভেতরে আঁটকে রেখেছে। কেউ বাইরে যেতে পারছে না তাবু ছেড়ে। চারিদিকে কাচের দেয়াল। মাথার ছাদ কাচের। বাতাস , ওই দেখুন ছোট ছোট বুদ্বুদ হয়ে ভাসছে। আমরা সবাই পেপারওয়েটের ভেতরে বন্দি। আসল জাদুকর ছিল ছেলেটা । ‘
বাচ্চা মেয়েটা বসে বসে কাঁদছে। কুড়ে ঘরের সামনে ফুটপাথের উপর ।
ওর মা, মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে। বাবা…বাবা নেই।
ও হাঁটতে পারে না। ছোট বেলায় পোলিও হয়েছিল । পা নষ্ট একটা।
বসে কাঁদছে।
ওর খেলনা বিবর্ণ বাতিল পুতুল , নিয়ে দৌড়ে ভেগে গেছে ভীন পাড়ার এক দুষ্টু ধেড়ে ছেলে।
হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে দেখে, লম্বা মত অচেনা একটা লোক দাঁড়িয়েছে সামনে ।
কেমন রঙ বেরঙের জামা লোকটার গায়ে। মাথায় তেকোনা টুপি। ওখানে পিতলের ঘণ্টা। কেমন টুং টাং শব্দ করছে ।
কাচের একটা গোল্লা বল ওর হাতে দিয়ে বলল , ‘ নে তোর খেলনা। দেখিস হারাস না যেন।‘
লোকটা চলে গেল হেঁটে। মোড়ের শেষে ল্যাম্পপোস্টের আড়ালে হারিয়ে গেল নীল অন্ধকারে ।
কাচের গোল্লাটা সুন্দর।
ওর পছন্দ হয়েছে। কান্না ভুলে হাসি হাসি মুখে দেখছে ।
কাচের গোল্লাটা চোখের সামনে নিলে দেখা যায় , ভেতরে কেমন ছায়া ছায়া জলছাপের মত মানুষ, সিংহ , ঘোড়া। একটা পেল্লাই মাঠের মত। রঙ্গিন ছাতা না তাবু যেন ।
কত কী ।
সব রঙের খেলা।
শেষ কথা – স্টার সার্কাসের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। শালগমপুরের মাঠে ওরা তাবু ফেলেছিল শোনা গেছে। তারপর ওদের খবর আর কেউ জানে না।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন