সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

সাধুবাবার বাঘ

 সাধুবাবার বাঘ

--------------------------

আমার অনেক পছন্দের এই  গল্পটা বিখ্যাত শিকারি কেনেথ অ্যান্ডারসনেরআজ সেটাই বলি-

 

নীলগিরি পাহাড়ের নিচেই ছিল ইয়া বড় এক কলা বাগানবাগানটা কত বড় সেটা বুঝিয়ে বলতে পারব না

জায়গাটার নাম উটাকামণ্ড।  এখানে একটা কলা বাগানের মালিকের নাম কান্ত কলা  বিক্রি করে বেশ ভালই দিন চলে যায়  বেচারার।

এক সন্ধ্যা  বাগানে বসে  আয়েশ করে  হাওয়া খাচ্ছিল  কান্ত  

সেই দিনের আবহাওয়াটা ছিল  বেশ দারুন

তখনই তার সামনে এসে দাঁড়ালো এক সাধু বাবামিহি গলায়  জানাল - দেশে দেশে  নানান জায়গায় ঘুরে বেড়ায় সাধুএই কলাবাগানে তিন দিন থাকতে চায়  সেবাগানের সাথে যে ঘাসের তৈরি কুঁড়ে ঘরটা আছেসেখানেই থাকবে তিন দিন পর নীলগিরির ওখানে চলে যাবেকোন গুহা পেলে গুহার ভেতরে   বসে ধ্যান করবে বাকি জীবন

 

সাধু বাবাকে দেখে খুশি হল কান্তমাখন কলা আর শরবত দিল সাধুর সেবায়

 সাধু রয়ে গেল

সাধু ওখান থেকে চলে যাবার কোন নামই করে নাবেশ আয়েশেই আছে সেবিপদ যে শুরু হতে যাচ্ছে কেউ জানে না

সাধু একদিন কান্তকে ডেকে বলল- এই কলা বাগান জায়গাটা তার বেশ পছন্দ হয়েছেআরও কিছুদিন এখানেই থাকতে চায়কান্ত যদি সাধুকে সেবা করে তবে সাধু খুশি হয়ে তাকে ইচ্ছাপূরণ বর দিবে

কান্ত খুশি  দেখে কে !   আহ্লাদে  আরও লোকজন ডেকে সাধুর জন্য একটা কুঁড়েঘর বানিয়ে দিল

চারিদিকে থিক থিকে সুন্দর কলা গাছের বাগান মাঝে সাধুর ছোট্ট  কুটির

একটা অদ্ভুত ব্যাপার  সন্ধ্যা থেকে সারা রাত কুটিরের ভেতরে একটা প্রদীপ জ্বলেসারা রাত প্রদীপ জ্বেলে সাধু কি করে ?

একদিন এক ফচকে ধরনের  লোক চুপি চুপি গিয়ে উঁকি দিল কুটিরের বেড়ার ফাঁক দিয়েকি কাণ্ড! ভেতরে সাধু নেইকই গেল সে ?

লোকটা অপেক্ষা করতে লাগল

অনেকক্ষণ পর খুব কাছেই  বাঘের বিকট  গর্জন শোনা গেলভয়ে লোকটার পিলে চমকে গেল

উথাল পাথাল হয়ে পালাতে যাবে ঠিক তখনই দেখতে পেল কুটিরের পিছন জংল  থেকে পা টিপে টিপে সাধু বাবাজি আসছে

পরদিন সারা গ্রামের আদিবাসীদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে সাধু রাতের বেলা বাঘের কাছে গিয়ে দেখা করে আসে সে নিশ্চয়ই ভয়াল ক্ষমতাধর কোন সাধুই হবে

আর সেই  থেকে রোজ রাতেই বাঘের গর্জন শোনা যেতে লাগলপুরুষ বাঘের গর্জন আর ঘন  অন্ধকার রাতগুলোতে কি  হয় কে বলবে ? পাগলের মত ডাকে বাঘটা

আরও অবাক কাণ্ডসাধুর কুঁড়ের আশেপাশের নরম মাটিতে রোজই বাঘটার পায়ের ছাপ পাওয়া যেতে লাগলপরিষ্কার ছাপতবে কেউ কিন্তু  কোন দিন বাঘটাকে দেখেনি

সেই কলা বাগানের আশেপাশে নানা জাতের  আদিবাসীরা থাকতোতাদের মধ্যে ইরিলা নামের আদিবাসিরাই বেশিওরা গরু চড়াত, মোষ পালত, ঘন ঘাসের দঙ্গল পার হয়ে জঙ্গলে গিয়ে বাঁশ, কাঠ আর বুনো তেঁতুল সংগ্রহ করে আনত

কিছু জমিদার ছিলতারাও গরু পালত

তাদের রাখালরা ঘাসের বনে গরু চড়াতে গিয়ে রোজই বাঘের ছাপ দেখতে পেতখুব সাবধানে থাকতো সবাইসত্যি যদি বাঘ থাকে,  তবে দিনের বেলাতেই আক্রমণ করে বসবে গবাদি পশুর উপর

 আদিবাসী একজনের নাম বুদিয়াবেশ কয়েকটা গরু আছে ওরগরুর দুধ বিক্রি করে সংসার চলে।  একদিন খেয়াল করলো, আরে  বাদামী রঙের গরুটা খুঁজে পাচ্ছে নাগেল কোথায় ?

ভাল মত খোঁয়াড়টা খোঁজ নিলআদিবাসীদের খোঁয়াড়গুলো পাঁচ ফুট উঁচু মোটা কাঠের গোল গুঁড়ি  দিয়ে বানানোবাইরে আবার   কাটা গাছের লতানো ঝোপ দিয়ে ঘন করে  ঘেরা বুদিয়ার খোঁয়াড়ের  কোন খয়- ক্ষতি হয়নিকিন্তু  খোঁয়াড়ের  চারি দিকের নরম মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ পাওয়া গেল। বেশ কয়েক জায়গায়

অনেক বার চক্কর দেয়ার পর বুদিয়া বুঝতে পারলো, খোঁয়াড়ের যেই দিকের বেড়া সবচেয়ে নিচু সেখান দিয়েই টপকে ভেতরে ঢুকেছে বাঘটা

খবরটা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লো

 সবাই নতুন করে বড় বড়  তক্তা দিয়ে খোঁয়াড়ের দেয়াল উঁচু করতে লাগল

তবে এরই মধ্যে আরও কয়েকটা গরু চুরি হয়ে  গেল ভীষণ রকমের   ভয় পেয়ে গেল আদিবাসীরা 

আর সত্যি কথা বলতে কি, বাঘটার আচরণ কেমন যেনদিনের বেলায় কখনও কেউ বাঘটাকে দেখেনিঅতীতেও এই এলাকায় বাঘ বা চিতা এসে আক্রমণ করেছে কিন্তু এই বাঘটার মত অমন  রহস্যময় আচরণ করেনিএতগুলো গরু হারিয়ে গেল কিন্তু বাঘটার পায়ের ছাপ ছাড়া আর কিছুই কখনই দেখেনি কলাবাগানের আদিবাসীরা

আর এর মাঝে মস্ত এক ঘটনা ঘটে গেল

 প্রায়ই  কোত্থেকে যেন  একটা হাতি এসে এই বাগানগুলো কলা গাছ ভেঙ্গে নষ্ট করে যেতকিন্তু হাতি মারা বেআইনিতাই সবাই বাধ্য হয়ে  সহ্য করতো হাতির যন্ত্রণা

 এইবার কান্ত ওর পুরানো আমলের বেঢপ এক   বন্ধুক নিয়ে রাত জেগে বসে রইল হাতি মারার জন্য

বাগানের এক কোনে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে রইল কান্তআকাশে অর্ধেক চাঁদখেয়ে ফেলা ময়দার বিস্কুটের মতচারিদিকে কলা গাছের ঝাড়দাঁড়িয়ে আছে চুপ চাপ বাতাসে কলাগাছের পাতাগুলো থির থির করে কাঁপছে। যেন ওদের জ্বর হয়েছে।   

কান্ত বসে আছেপাজি হাতিটা এলেই গুলি করে মারবেএমন সময় আচমকা  বাঘের গর্জনে চারিদিক কেঁপে উঠলো

 হায় হায় করে উঠল কান্তএ আবার কি বিপদ

 হঠাৎ   করেই কান্ত দেখতে পেল আবছা অন্ধকারে বাঘটা গুঁটি গুঁটি করে এগিয়ে আসছে  বাগানের দিকেই পুরানো বন্ধুকটা তুলে গুলি করে বসলো কান্তগুলি লাগলো কি না কে জানেকিন্তু  বিকট শব্দে চিৎকার  করে বাঘটা লেজ তুলে পালালকান্ত ও বন্দুক বগলে চেপে ধরে   দৌড়ে নিজের কুঁড়ে ঘরে চলে এলো

এমন ভয়াল রাতে কলা বাগানে বসে থাকার কোন মানেই হয় না গোল্লায় যাক হাতি।  

কান্তর এক ছেলে ছিলনাম জানি নাকেনেথ অ্যান্ডারসন সাহেব ছেলের নাম বলেননিসেই ছেলেটা প্রতেকদিন সকালে সাধু বাবাকে জল খাবার দিতরোজ সকালের মত আজও কান্তর ছেলে সাধু বাবার জন্য জল খাবার নিয়ে গেছে

অনেকক্ষণ ধরে দরজা ধাক্কা দিল ছেলেসাধু দরজা খোলে নাএমন সময় ওর  নজরে পড়লো,  দরজার সামনে কালো কিসের যেন দাগ দেখা যাচ্ছেএকটু পরীক্ষা করেই ছেলে বুঝতে পারলো- শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ এটা

দরজার সামনে রক্তের দাগ দেখে কান্তর ছেলে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল

নিশ্চয়ই খারাপ কিছু হয়েছে সাধুরআরও কয়েকবার ডাকল সাধুকেকুঁড়ে ঘরের ভেতর থেকে সাধু বকা ঝকা করতে লাগল ছেলেকেছুটতে ছুটতে ছেলে হাজির হল বাবার কাছে

সব শুনে কান্ত অবাককেন যেন খামাখাই গত রাতের কথা মনে পড়ে গেল

নিজেই চলে এলো সাধুর কুঁড়ে ঘরের সামনেসত্যি তাইকুঁড়ে ঘরের দরজার সামনে মেরুন রঙা আপেলের খোসার মত রক্তের শুকনো দাগ দেখা যাচ্ছেকয়েকবার দরজায় নক করলো কান্ত

সাধু বাবা দরজা খোলে নাবেড়ার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতে যাবে ঠিক তখনই দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালো সাধুভয়ঙ্কর রেগে আছে

সাধুর বা হাতে একটা পুরানো কাপড় প্যাঁচানোরক্তের দাগ লেগে আছে  তাতে

দেখেই কান্তর মাথা চক্কর দিয়ে উঠলআর সাধু যেন কেমন চোখে যেন চেয়ে আছে কান্তর দিকে

খেঁকিয়ে উঠলো সাধু-  ‘ উঁকি দিয়ে দেখতে চেয়েছিলি আমি কি করছি ? যা ভাগ এখান থেকে

ভয়ে দৌড় দিল কান্ত

কয়েকদিন পর মস্ত এক ঘটনা ঘটে গেল

এক রাখাল মোষ চড়াছিলবেশ বুনো আর নিঝুম পরিবেশচারিদিকে তকতকে সবুজ ঘাসের বন

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছেসূর্যটার রঙ হয়ে গেছে মসুরি ডালের মতপশ্চিম আকাশে চলে গেছে ওটারাখাল ছেলেটা বাড়ির পথ ধরলচারিদিকে লম্বা লম্বা ঘাসের বন  

আচমকা ঘাসের  ভেতর থেকে হঠাৎ করেই বের হয়ে এলো বাঘটাঝাঁপ দিয়ে পড়লো রাখাল ছেলেটার উপর কিভাবে যেন নিজেকে ছাড়িয়ে নিল ছেলেটাদৌড়ে ঢুকে পড়লো মোষগুলোর ঠিক মাঝখানেআর মোষগুলো এক কাণ্ড করলছেলেটাকে গোল করে ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়লোমোষগুলোর সবগুলোর মাথায় এক জোড়া করে   বিশাল  শিঙ আছেসবাই মিলে তেড়ে আক্রমণ করলো বাঘটাকেঅবস্থা ভাল না দেখে চম্পট দিল বাঘটা

মাঠে পড়ে রইলো রাখাল ছেলেসারারাতআর মোষগুলো গোল হয়ে ঘিরে সারা রাত পাহারা দিল ওদের রাখাল বন্ধুকে

পরদিন কয়েকজন রাখাল ছেলেটার খোঁজে গেল

সারারাত বাড়ি ফেরেনিচিন্তার কথামাঠের মধ্যেই পেল ওকেঅবস্থা খুব খারাপ ছেলেটার।   হাসপাতাল নিতেই হবে। কিন্তু হাসপাতাল   মেলা দূরতখনই  রওনা হল সবাইপথের মধ্যেই মারা গেল ছেলেটাদুঃখজনকসারারাত খোলা মাঠে বাঘের ভয়ে কেটেছে ওরমরার আগে না জানি কত কষ্ট পেয়েছে বেচারা

দিন কয়েক সব চুপচাপ

এক সন্ধ্যে বেলা মাথায় ঘাসের বোঝা নিয়ে বাড়ি ফিরছিল এক ইরিলা আদিবাসীঠাৎ দেখতে পেল পথের এক কোনায় ঝোপের আড়াল থেকে দৌড়ে ভাগছে এক ময়ূরনিশ্চয়ই ময়ূরের বাসা আছে ওখানেময়ূরের বাসায়  খুঁজলে ডিম পাওয়া যেতে পারেভেবে ঘাসের বোঝা রেখে সামনে এগিয়ে গেল সে

মাত্র কয়েক কদম গিয়েই দেখে ঝোপের মধ্যে বসে আছে মস্ত এক বাঘচেয়ে আছে সোজা ওর দিকেই

 পাই করে ঘুরে দাঁড়িয়ে দোউ দিল লোকটাকিন্তু

বাঘের সাথে দৌড়ে পারবে কেন ? মাত্র কয়েক গজ দৌড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই বাঘটা ঝাঁপিয়ে পড়লো ওর উপর

মারা গেল লোকটাওর শরীরের সামান্য মাংস খেয়ে চলে গেল বাঘটা

 পরদিন সকালে গ্রামের লোকজন লাশটা খুঁজে পেল

ভয়ে  গলা শুকিয়ে গেল সবার

এতদিন গরু মেরে খাচ্ছিলএইবার মানুষ মারা শুরু হয়েছেবিপদ আর কাকে বলে

গোপনে সবাই আলোচনায় বসলোকি করা যায়আলোচনার মধ্যে কে যেন  ধিমাই  করে বলে বসলো- ' এই বাঘটা আসলে বাঘ নাসেই সাধু বাবাজিসারাদিন সাধু থাকেআর রাতের বেলা বাঘ হয়ে ঘুরে বেড়ায়'

সবাই কিন্তু বিনা প্রতিবাদে  বিশ্বাস করলো কথাটা

আরও কাণ্ড দেখ- যে লোকটা মারা গেছে , সে লোকটা   সময় সুযোগ পেলেই সাধুর কুঁড়ে ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিত

সব আদিবাসীরা এক সাথে জড়ো  হয়ে

ভয়ে ভয়ে  হাজির হল সাধু বাবার কাছে

হাউ মাউ করে কেঁদে কেঁদে সবাই বলল- দয়া করে আমাদের ক্ষমা করে দিনআর  মাংস যদি খেতেই হয় তবে অন্য কোথাও চলে যানদূরে একটা গ্রাম আছে কারুম্বা ওখানে প্রচুর গরু আছেইচ্ছা মত খেতে পারবেন 

সাধু দয়ালু একটা ভঙ্গিতে সবার কথা শুনলশেষে বলল- যদি তাকে তিন বেলা খাবার আর মাসে একশো রুপী করে দেয়া হয় তবে মানুষ বা গরু খাওয়া বন্ধ করতে পারে

আদিবাসীরা গরিবটাকা পয়সা ওদের হাতে থাকে না তেমনতবু সবাই মিলে রাজি হল মাসে একশো রুপী করে সাধু বাবার হাতে তুলে দেবে

এছাড়া উপায় কি ?

 কিন্তু প্রথম কিস্তির টাকা দিতে ব্যর্থ হল

আদিবাসীরাকিছু দিতে পারলোকিন্তু পুরোপুরি একশো রুপী নাআগেই বলেছি ওদের অবস্থা খুব খারাপ

টাকা দিতে না পারায় ভীষণ রেগে গেল সাধুআর কি কাণ্ড ! ঠিক চারদিন পর একজন লোক মারা গেল বাঘের হাতে

ভাবতে অবাক লাগে সেই লোকটা সাধুকে টাকা দেবে বলেও দেয়নি

আতঙ্ক নেমে এলো কলাবাগানে

মারটিন ম্যাটসেল নামে এক ভদ্রলোক এই অদ্ভুত ঘটনার কথা কিভাবে  যেন শুনেছিলেন

তিনি আবার শিকারি কেনেথ অ্যান্ডারসনের বন্ধুতক্ষুনি চিঠি লিখে দিলেন শিকারি বন্ধুকে

আর চিঠি পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে কলাবাগানে চলে এলেন শিকারি কেনেথ

 

গ্রামের কাছাকাছি যখন পৌঁছলেন তখন সূর্য গড়িয়ে রাত নেমে গেছে।  কলাবাগানে পৌঁছা মাত্র এক গাইড পেয়ে গেলেন কেনেথ অ্যান্ডারসননাম-বুরালোকটা বেশ মুরুব্বীশিকারিকে নিয়ে সেই রাতে জঙ্গলের ভেতরেই

বিরাট এক আমগাছের তলায় আগুনের কুণ্ড জ্বালিয়ে বসলো দুইজন।  সাধু বাবার  সব গল্প  কেনেথকে  খুলে বলল বুরা

চারিদিকে ঘন জঙ্গলবেশ শীত পড়েছেবহু দূরে হাতি বাঁশ ঝাড় ভাঙছেবুরা সাধুর গল্প বলছে আর মাঝে মাঝেই চমকে উঠে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে

কারন কি জানতে চাইলেন কেনেথ

বুরা বলল- সাধু নাকি সব শুনতে পায়তার বেশ ক্ষমতা আছেযেখানেই থাকুক এই মুহূর্তে কেনেথ আর বুরার কথা সব শুনতে পাচ্ছে

ঠিক তখনই দূরে একটা বাঘ গর্জন করে উঠল

বাঘের গর্জন শুনে বুরা ভয়ে প্রায় মারাই যায়

কাঁপতে কাঁপতে বলল- ‘ সাহেব ঐ তোসাধু সব শুনে ফেলেছেদেখলেন কেন তর্জন করে বুঝিয়ে দিল !’

বাঘের ডাক আরও শুনেছেন কেনেথকিন্তু এই প্রথমবার গা ছমছম করে উঠলোসারা শরীর ঘেমে উঠল

নিজেকেই তিরস্কার করলেনএইভাবে গভীর মনোযোগ দিয়ে বুরার গল্প শোনা ঠিক হয়নি

মানুষ কখনও বাঘ হতে পারে না

পয়েন্ট ৪০৫ রাইফেলটা তুলে নিলেন বাম হাতে তিন ব্যাটারির টর্চটা জ্বেলে চারিদিকটা  ভাল করে দেখে নিলেন

কোথাও কোন রকম নড়াচড়ার চিহ্ন নেই

আরও কতগুলো শুকনো ডাল পালা ফেলে দিলেন আগুনের মধ্যে

লক লক করে লাফিয়ে উঠলো আগুনের শিখাযে পরিমাণ শুকনো কাঠ আছে তা দিয়ে বেশিক্ষণ চলবে না

কিন্তু রাত শেষ হতে এখনও অনেক অনেক দেরি

আরও একবার ডেকে উঠল বাঘটাঠিক তাদের পিছনে

এত জলদি কি ভাবে পিছনে চলে গেল বাঘটা ভেবে দিশেহারা হয়ে গেলেন কেনেথ

 আগুনের আরও কাছ ঘিরে বসে রইল কেনেথ আর বুরা

চারিদিক নিঝুম কোন শব্দ নেই আগুনের কুণ্ডটা কোন মতে জ্বলছেগাছের পাতার শব্দ শুনলেও ভয়ে চমকে উঠছেন কেনেথমনে হচ্ছে খুব কাছেই বোধ হয় এসে পড়েছে বাঘটাআচমকা লাফিয়ে পড়বে ঘাড়েবুরার অবস্থা আরও খারাপভয়ে শ্বাসও নিচ্ছে নাযেন যত চুপচাপ থাকা যায় ততই ভাল

বহু দূর থেকে শম্বরের ডাক শোনা গেলতারপর হাতি দৌড়ে পালাল আরেক দিক থেকে

 তারমানে , বাঘটা শিকারি আর তার সঙ্গীকে ঘিরে চক্কর খাচ্ছে

মাঝরাতের পর   ময়লা মত চাঁদটা উঠলো আকাশে সেই মরা  আলোতে জঙ্গল কেমন রহস্যময় আর ভৌতিক মনে হতে লাগল

রাত কখনই এত লম্বা মনে হয়নি কেনেথের কাছে এত ক্লান্তিকর রাত জীবনের প্রথম ।

অনেক সময় পর হঠাৎ ময়ূরের ডাক শোনা গেলসকাল হয়ে আসছে

গোলাপি রঙের হয়ে গেল পুবের আকাশজঙ্গলের ভেতরে জেগে উঠলো বনমোরগ আর পাখ পাখালি

সারারাত না ঘুমিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন কেনেথফ্লাক্স থেকে চা ঢেলে নিলেনসাথে স্যান্ডউইচ

বুরার ঘুম ভাংতেই পিটপিট করে শিকারির দিকে তাকাল

'তোমরা অনেক বোকা' প্রথম কথাটা এই  বললেন কেনেথ' সাধু বাবা তোমাদের মিথ্যা ভয় দেখায়'

হেঁটে গিয়ে হাজির হলেন সাধু বাবার কুঁড়ে ঘরেদরজায় ধাক্কা দেয়ার সাথে সাথেই ভেতর থেকে বের হয়ে এলো সাধু

হাসি মুখে কেনেথকে বলল 'কাল রাতে আগুনের পাশে বসে ছিলি তোরা  দুই জনেএকজনকে ধরে রাতের খাওয়ার শেষ করতে পারতামকিন্তু মত বদলে একটা সম্বর দিয়েই খাওয়া শেষ করতে হল'

সাধু বাবার কথা শুনে কেমন যেন তম্বা হয়ে গেলেন কেনেথবুঝতে পারলেন কাল রাতে এই ভণ্ড সাধু দূর থেকে তাদের দেখেছে

' তুমি আসলে একটা ফালতু ধরনের মানুষ।।' বললেন কেনেথ'  গ্রামের  সহজ সরল মানুষদের খামাখাই ভয় দেখাওঅত সহজে আমাকে ভয় দেখাতে পরবে না '

'একটু সাবধানে থেকো শিকারি সাহেব' খ্যাঁকরে গলায় বলল সাধু

'তুমিও সাবধানে থেকে' বিরক্ত হয়ে বললেন কেনেথ' তোমাকে রাইফেলের সামনে পেলেই গুলি করে বসব'

' সে রকম কিছু ঘটার আগেই বাঘের হাতে মারা পড়বে তুমি' বলেই ঝুপ করে দরজা বন্ধ করে দিল সাধু

রাগে কাঁপতে কাঁপতে চলে এলেন শিকারি কেনেথমনে মনে ভাবছেন, এক চড় দিয়ে সাধুর সব গুলো দাঁত ফেলে দিতে পারলে ভাল হত সেটা সম্ভব নাতবে শিকারি কেনেথের জায়গায় আমি হলে তাই করতাম

 

সাধুর কুঁড়ের পাশেই বাঘের পায়ের ছাপ পেলেন কেনেথ ফিরে এলেন সেই আম গাছের তলায়বিছানা করে ঘুমানোর আয়োজন করলেনঘুমের মধ্যে বার বার স্বপ্ন দেখলেন একটা বাঘ হাসতে হাসতে তার দিয়ে গুঁটি গুঁটি পায়ে এগিয়ে আসছেবাঘের মাথাটার জায়গায় সাধুর মুখ

 কি বিচ্ছিরি স্বপ্ন !

 ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছেন কেনেথ

একটা মানুষ কিছুতেই রাতের বেলায় বাঘে রূপান্তর হতে পারে না

কিন্তু সাধুর কথা শুনে মনে হচ্ছে সারা রাত জঙ্গলের আশে পাশে থেকে দূর থেকে ওদের উপর নজর রেখেছিলযদি তাই হয় ব্যাপারটা বিপদজনক সন্দেহ নেই,  বিরাট সাহস ঐ সাধু ব্যাটারএকটা মানুষখেকো বাঘ ধারে কাছে  আছে জানার পরও রাতের বেলা ঘুরে বেড়ায় জঙ্গলে ! শুধু তাই নাভীষণ রকম ধূর্তমানুষদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে সেই আসলে বাঘ

কায়দা করে ঘটনার সুযোগ নিচ্ছে

কেনেথ ঠিক করলেন যেই করেই হোক মানুষখেকো বাঘটাকে মারবেন

আর তাতেই সাধু বাবার ভণ্ডামি ধরা পড়ে যাবেতখন গ্রামের লোক কিলিয়ে গ্রাম থেকে বের করে দেবে সাধুকে

তবে হ্যাঁ , সাবধানে থাকতে হবেকারন সাধু প্রথমেই চেষ্টা করবে কেনেথের ক্ষতি করতে শিকারিই এখন সাধুর সবচেয়ে বড় শত্রু

 অনেক চিন্তা করে কেনেথ অ্যান্ডারসন বুঝতে পারলেন এই মুহূর্তে তার শত্রু দুইটামানুষ খেকো বাঘ আর ভণ্ড সাধুখুব সাবধানে থাকতে হবে তাকে

 

বাঘ মারার জন্য টোপ দরকার

 বুরাকে নিয়ে দুটো বাচ্চা মোষ কিনতে চলে গেলেন এক আদিবাসী মোষ পালকের কাছেএই দিকে সমস্যা হল সাধু বাবাকে সবাইকে বলে দিয়েছে কেনেথের কাছে কেউ যেন মোষ বিক্রি না করেআদিবাসীরা সবাই হাত পা মাথা নেড়ে প্রবল আপত্তির সাথে জানালো , মোষ বিক্রি করতে পারনে নাতাতে সাধু বাবা রেগে যাবেপরে বাঘ হয়ে এসে প্রতিশোধ নেবে

গ্রামের মানুষদের বোঝাতে বোঝাতে গলা ব্যাথা হয়ে গেল কেনেথের

 নাহকেউ রাজি না

পর পর তিনটে গ্রাম ঘুরে হতাশ হয়ে গেলেন শিকারি

শেষে গ্রামের এক মুরুব্বী বুড়ো বলল-মাইল পাঁচেক দূরে একটা গ্রাম আছে ওখানে গেলে তবেই মোষ কিনতে পারবে

কিন্তু এখন যদি  কেনেথ  সেই পাঁচ মাইল দূরের গ্রামে যায়  তবে মোষের বাচ্চা কিনে হেঁটে ফিরতে ফিরতে পথের মধ্যেই রাত নামবেসেটা বেশ  বিপদজনক

মানে আরও একরাত এবং দিন এই সাধু আর বাঘের মধ্যেই থাকতে হবে

বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছেসঙ্গী বুরা আর কেনেথ মিলে প্রচুর শুকনো কাঠের টুকরো আর লাকড়ি যোগার করলেনযাতে সারা রাত বড় করে আগুন জ্বেলে রাখা যায়

  কাকের পালকের মত অন্ধকার নেমে আসছে চারিদিকে

সন্ধ্যা হবার আগেই পুরানো সেই আম গাছের তলায় বসে পড়লেন কেনেথসাথে বুরাবড় করে আগুনের কুণ্ড জ্বেলে রেখেছে

সামনে আম আর তেঁতুল গাছের ঘন জঙ্গলকে জানে হয়তো আড়াল থেকে বাঘটা ওদের উপর নজর রাখছেহাসছে ওদের অবস্থা দেখে

সাধু বাবার উপর রাগে মেজাজ খিচড়ে গেল কেনেথের

ঐ ব্যাটার জন্যই আজ রাতটা মোষের টোপ রাখা গেল না ফালতু একটা রাত নষ্ট হবে আম গাছের তলায়একদম অযথাই।

রাত নেমে গেল ঝুপ করে

রাত মানেই জঙ্গল একদম সুনসান - থমথমে না কিন্তুদূর থেকে রাত জাগা পাখিদের ডাক ভেসে আসছে হঠাৎ হঠাৎআর সেই সাথে ঝিঝি পোকার লাগাতার  চেঁচানি কানে তালা লেগে যাবে যেন

এবং আচমকা  কোন কারন ছাড়াই একদম শুনসান হয়ে গেল পুরা জঙ্গলকার বুঝতে মোটেও বেগ পেতে হল না প্রায় সাথে সাথেই দক্ষিণ দিকের নদীর কাছ থেকে ভেসে এলো  বাঘের গর্জন

চলে এসেছে ওটা

 মাত্র তিন বার ডেকেই থেমে গেল বাঘটা

কয়েক সেকেন্ড পর  রাস্তার পশ্চিম দিকে ডেকে উঠলো আবার

চমকে গেলেন কেনেথএত খানি পথ মাত্র কয়েক মুহূর্তেই চলে এসেছে বাঘটা ?

অসম্ভব আর অবিশ্বাস্য হতেই পারে না।

বুরাকে ওখানেই রেখে টর্চের আলোতে দৌড়ে সাধু বাবাজির কুঁড়ের দিকে  রওনা  দিলেন কেনেথ

কুঁড়েঘর অন্ধকার ভেতরে  সব সময় প্রদীপ জ্বলে আজ জ্বলছে না

দরজা ধাক্কা দিতেই দেখা গেল দরজার সামনে সাধু দাঁড়িয়ে আছে

টর্চের  আলোতে ঝিলিমিলি করে উঠলো সাধুর চোখ

' বাহ, বয়সের তুলনায় ভাল দৌড়াতে পারেন সাহেব' পিশাচের মত হেসে বলল সাধু

'তুমিও ভাল দৌড়াতে পার' রাগি গলায় বললেন কেনেথ'রোজ অমন কর নাএকদিন বাঘের পেটে চলে যাবে'

ঘুরে দাঁড়াতে গিয়েই ধাক্কা খেলেন বুরার সাথেগাছ তলায় একা বসে থাকার সাহস ছিল না বুরারসাহেবের পিছন পিছন চলে এসেছেঠক ঠক করে কাঁপছে ভয়ে

আরও একটা রাত আম গাছের তলায় জেগে কাটিয়ে দিল দুইজনে

বিরক্তকর একটা রাত

 

পরদিন খুব ভোরেই পাশের গ্রামে চলে গেলেন কেনেথ আর বুরা

দুটো মোষের বাচ্চা আর একটা ষাঁড় কিনে টলতে টলতে ফিরে এলেনপর পর দুই রাত না ঘুমানোর জন্য চোখে মুখে অন্ধকার দেখছেন তার উপর এত দূর পথ হেঁটে গিয়ে মোষ- ষাঁড় কিনে এবার হেঁটে ফিরে আসার পরিশ্রম।   

আম গাছ তলায় ষাঁড় আর মোষের বাচ্চা দুটো বেঁধে রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন কেনেথ ক্লান্তি লাগছে।

বিকেল চারটার সময় তড়াৎ করে উঠে দাঁড়ালেন

বেশি সময় নেইঅন্ধকার হয়ে আসবে দুই ঘণ্টা পর সব কাজ গুছিয়ে নিতে হবে

কিন্তু কোথায় টোপ রাখবেন ? কোন পথে আসবে বাঘটা ? কোথায় আস্তানা গেড়েছে ওটা ? আর মাচা বাঁধার সময়ই বা কোথায় ?

মানুষ খেকো প্রাণী রোজ একই পথে চলাচল করে নাশিকার পাওয়া যায় না তাতেমোষের বাচ্চা দুটো বুরার বাড়িতে রেখে ষাঁড়টা নিয়ে চললেন কেনেথ

পশ্চিম দিকের পাহাড়ের দিকে হেঁটে যেতেই শুকনো মত একটা শাখা নদী পেলেন একদম সরু  পানি নেই প্রায়দুই পাশের নরম বালিতে বাঘের পায়ের ছাপ ভর্তি

দেখেই বুঝা যায় এই পথে বাঘটা প্রায়ই আসা যাওয়া করে বড়সড় একটা গাছ দেখে মাচাও বেঁধে ফেললেন

ততক্ষণে সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে মাচায় উঠে বুরাকে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন কেনেথযে কোন সময় বাঘটা বের হতে পারেতখন বুরা বিপদে পড়ে যাবে।

বেশ খানিক দূরে টোপটা মানে ষাঁড়টা বেঁধে রেখে তিন বার ওটাকে প্রনাম করে লম্বা দম নিয়ে  খিঁচে বাড়ির দিকে দৌড় দিল বুরা

ছয়টার পর অন্ধকার হতে লাগল চারিদিকটা সামনেই পাহাড়ঐ দিকেই মুখ করে বসে আছেন কেনেথকেন যেন মনে হচ্ছে, ওখান থেকেই বাঘটা নেমে আসবেনিশ্চয়ই কোন গুহার মধ্যে আস্তানা গেড়েছে ওটা

সামনে একগাদা ময়ূর আর বনমোরগ ডাকাডাকি করেছেসেই সাথে গাছের ডালে ডালে লাফিয়ে  দুষ্ট বাচ্চার  মত একদল বানর হৈ- চৈ করছে

আহাবানরদের জীবন কত ভালভাবলেন কেনেথ

সব বানর হৈ চৈ করলেও একটা বানর চুপচাপ

মুখ তম্বা করে বসে থাকেওটা দলের সর্দারবিপদ দেখলে সঙ্কেত দেয় সে

তাই হল

আচমকা চেঁচিয়ে উঠল সর্দারসঙ্গে সঙ্গে খেলা বন্ধ করে দৌড়ে গায়েব হয়ে গেল বানরের দল

বানরের দল পালিয়ে যেতেই এইবার পুরো পুরি নিঝুম হয়ে গেল জঙ্গলমানে বাঘটা আসছে

সারদিন যতই গরম থাকুকপাহাড়ি এলাকাসূর্য ডোবার সাথে সাথেই ঝুপ করে নেমে এলো বরফের মত ঠাণ্ডা বাতাস

শীতে গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো কেনেথের

ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগলেনআগের দুইরাত আগুনের কুণ্ডের পাশে কাটিয়েছিলেনশীত বুঝতে পারেননি

এদিকে ঘন অন্ধকার হয়ে গেছে চারিদিকআকাশ ভর্তি অনেক অনেক  তারাকালচে নীল আকাশে চুমকির মত ঝিকিমিকি করছে 

হিম হিম বাতাসে গাছের পাতা  খসে  পড়ছে

ঠিক তখনই বাঘের গর্জন শোনা গেলএকদম কেনেথের ঠিক পিছনেতারপর সেই ডাক ধীরে ধীরে চলে গেল দূরেএখন সাধু বাবার কুঁড়ের বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকছে বাঘটা এই প্রথম কেনেথের মনে হল,  বুরা আর কলা বাগানের লোকজন যা বলে,  সত্য

সাধুই আসলে বাঘ হয় রাতের বেলা

গাছ থেকে নেমে দৌড় দিলেন কেনেথভয়ে নাকৌতূহলে সাবধানে সাধু বাবার কুঁড়ে ঘরের বাইরে চলে এলেনকুঁড়ে ঘর অন্ধকারভেতরে কেউ নেই

তখনই সামনে কলাবাগানের ভেতর থেকে বাঘটা ডেকে উঠলো আবার

খুব কাছেই আছে ওটা

আচমকা মাথায় বুদ্ধি এলো কেনেথের

জোরে শ্বাস নিয়ে দুই হাত মুখের সামনে গোল করে তুলে বাঘের মত ডাক দিলেন কেনেথহুবহু বাঘের গর্জন করতে পারেন তিনি

তারপর ঝুপ করে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে রাইফেল  তুলে অপেক্ষা করতে লাগলেন

ডাক শুনে বাঘ এইদিকে আসবেই

অপেক্ষায় রইলেন

একদম সুনসান চারিদিক

আর একদম আচমকা কলা গাছের ভেতর থেকে হুড়মুড় করে বের হয়ে এলো একটা মানুষনেঙটি পরাখালি গাছুটে আসছে সাধু বাবার কুঁড়ে ঘরের দিকে

লোকটাকে চিনতে পেরে ভয়ে গলা শুকিয়ে গেল কেনেথেরলোকটা সাধু বাবাখানিক আগে ঐ দিক থেকেই বাঘের গর্জন শুনেছিলেন কেনেথ

তারমানে- সাধু সত্যি সত্যি রাতের বেলা বাঘ হয়ে যায়মানুষ আর গরু-মোষ মেরে খায়

 জীবনে এমন ভয় আগে পেয়েছেন কি না কেনেথ নিজেও জানেন না

কিন্তু বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল নাভয়ঙ্কর সেই রহস্যের সমাধান হয়ে গেল কয়েক

সেকেন্ড পরই

কলাবাগানের ভেতর থেকে হুঙ্কার দিয়ে বের হয়ে এলো একটা বাঘকয়েকটা লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো সাধুর উপর

ব্যাথা আর ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলো সাধু

দৌড়ে সামনে চলে গেলেন কেনেথসাধু যতই খারাপ মানুষ হোক না কেন বাঘের হাতে মরতে দেয়া ঠিক হবে না

বাঘটার মনোযোগ নষ্ট করার জন্য দূর থেকেই চিৎকার করে উঠলেন কেনেথ

যাতে সাধুর উপর থেকে সরে দাঁড়ায়

রাইফেলের সাথেই টর্চ ফিট করা ছিলচাপতেই আলো জ্বলে উঠলো

সেই আলোতে জ্বলজ্বল  করে উঠলো বাঘের দুই চোখগুলি করলেন কেনেথবাঘের দুই চোখের মাঝখানে লাগলো 

মাটিতে পড়ে থাকা সাধু বাবার শরীরের উপর থেকে উঠে দাঁড়াতে চাইলো বাঘটা আরও দুই গুলিতে ওটাকে ফেলে দিলেনসাধু বাবার শরীর আড়াল করে শুয়ে আছে বাঘটা

ভয় পেয়ে গেলেন কেনেথগুলি সাধুর গায়ে লাগেনি তো

অনেক কষ্টে বাঘের বিশাল শরীরটা সরিয়ে সাধুকে বের করে আনলেন কেনেথনাহ বেচারার গায়ে কোন গুলি লাগেনি

টর্চের আলো চোখে পড়তেই চোখ মেলে তাকাল সাধুপিশাচের মত চেয়ে আছে কেনেথের দিকে

ফিস ফিস করে বলল- ‘আমার ভাগ্য খারাপতাই কিন্তু আজ , কাল বা পরশু অন্য বাঘের হাতে মারা যাবে তুমি

অভিশাপ দেয়া শেষ করেই মারা  গেল সাধু

সাধুবাবা ছিল আসলে ধূর্ত প্রকৃতির লোভী  এক মানুষ

আজকে বাঘটা ডাকতেই চুপিচুপি কুঁড়ে থেকে বের হয়ে গিয়েছিল ভেবেছিল আমগাছের কাছাকাছি গিয়ে কেনেথকে ভয় দেখাবে

কিন্তু সাধু বুঝতে পারেনি মাচা থেকে নেমে কেনেথ চলে আসবে কুঁড়ের কাছেআর কেনেথ যখন বাঘের ডাল নকল করেছে,  সাধু বাবা ভয় পেয়ে গেছেদুই দিকে দুই বাঘ এলো কি করে ?

ভয়ে দৌড়ে চলে আসতে চেয়েছিল নিজের কুঁড়ের ভেতরে

আর নিয়তির মত তার পিছনে  ঝাঁপিয়ে পড়েছে মানুষখেকো বাঘটা

ক্লান্ত ভাবে হেঁটে বুরার বাড়ি চলে এলেন কেনেথডাক শুনেই বাইরে চলে এলো বুরা

' বাঘটা মারা গেছে' বললেন কেনেথ

' আর সাধু বাবা ?' ফিসফিস করে  জানতে চাইলো বুরা

' সে ও মারা গেছে'

' বলেছিলাম না।  এই বার প্রমান হল তো ?'

' আরে নাসাধুকে আগে বাঘ মেরেছেপরে বাঘটাকে আমি মেরেছি'

' তারমানে ওরা দুইজন আলাদা ?' অবাক হয়ে বলল বুরা

' নিশ্চয়ই' হাসলেন কেনেথ

বুরা আরও লোকজনদের ডাকতে চলে গেলখানিক পর একগাদা লোক জমে গেলসবার চেহারায় ভয়ের ছাপ

' আমার সাহেব বাঘ আর সাধু দুইটাকেই মেরে ফেলেছে' বুক চিতিয়ে বলল বুরা

' আরে বেকুব  সাধুকে বাঘে  মেরেছেআমি বাঘটাকে মেরেছি' বিরক্ত হয়ে বললেন  কেনেথ

এক দঙ্গল মানুষ হাজির হল সেই জায়গায়যেখানে বাঘ আর সাধুর মৃতদেহ রয়েছে পাশাপাশি।

সবাই খুশি

দুই ভয়ংকর আতঙ্ক চলে গেছে তাদের জীবন থেকেমানুষখেকো বাঘ আর তারচেয়ে ভয়ঙ্কর  ভণ্ড এক সাধু

 

 (  কেনেথ অ্যান্ডারসন - এর    The Swami of Valaithothu অবলম্বনে )




 

মন্তব্যসমূহ