সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আবার বারমুডা ট্রায়াঙ্গল - ৪

 চার

 

 

১৯৬৪ থেকে ১৯৭৪,   এই দশ বছরে  সাইত্রিশটা    বিমান হারিয়েছিল বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভেতরে 

 

১৯৭৪  থেকে  ১৯৮৪ 

 এই  দশকে  বছরে রহস্যময়ভাবে হারিয়ে গেছে একচল্লিশটা বিমান  

 

সেই   বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের  ভেতরেরই 

 

  আর  ১৯৮৫  থেকে  ১৯৯৪  সময়টাতে হারিয়েছে   একচল্লিশটা 

 কিছু    বিমান   হারানোর আগে অদ্ভুত সব মেসেজ পাঠিয়েছিল সেই আগের মতোই - সমুদ্র  অচেনা লাগছে  নীচে ওটা  মাটি না সমুদ্র কি না বুঝতে পারছে না আকাশে সূর্য দেখা যাচ্ছে না যদিও ঘটনার সময় আকাশ ছিল একদম পরিষ্কার 

 

সবগুলো ঘটনার আর বর্ণনার মধ্যে  মিল ছিল কাকতালীয় ভাবে  কিন্তু  পটোরিকোর     উপকূলের   পয়ত্রিশ    মাইল দূরে,  পাইলট জস  টরেট   যখন  ফ্লাই  করেছিলেন  অদ্ভুত  রকমের  মেসেজ পাঠিয়ে ছিলেন তিনি 

 

 তাঁর বিমানের পিছনে নাকি  অচেনা অদ্ভুত বস্তু  উড়ে আসছে    সেই উড়ন্ত বস্তুটা তাঁকে নিজের কোর্স  থেকে বাইরের দিকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইছে আর বিমানের যন্ত্রপাতি একটাও কাজ করছে না 

১৯৮০  সালের  ২৮  জুনের কথায় এটা

 পাইলট  জস টরেট আর ফিরে  আসেননি তাঁর বিমান নিয়ে  চিৎকার করে -  মে ডে মে ডে  বলে সঙ্কেত পাঠিয়েছিলেন জীবন নিয়ে যখন সংশয় দেখা দেয়   তখনই  May Day   সঙ্কেত পাঠায়  বিমান আর নৌ  বাহিনীর লোকজন 

 

কন্ট্রোল টাওয়ারের লোকজন দেখতে পায়, রাডার  থেকে  জস টরেটের     বিমানের  চিহ্ন  মুছে গেছে তৎক্ষণাৎ অনুসন্ধান বাহিনী পাঠানো হল 

সিভিল   এয়ার  পেট্রোল বাহিনীর শক্তিশালী  আলোর সাহায্যে অন্ধকার সমুদ্রের বুকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুসন্ধান চালানো হয়  কোনও রকম চিহ্ন পাওয়া গেল না  

 

অসংখ্য বিমান হারিয়ে গেছে মুহূর্তের মধ্যে এরা   হয়তো  বন্দরে  ফিরে আসছিল ল্যান্ড  করার জন্য বা  মাত্র কয়েক মিনিট  আগে  ফ্লাই  করেছে 

সঙ্কেত পাঠানোর পর মাত্র  চল্লিশ  সেকেন্ডের জন্য রাডারে দেখা যাচ্ছে বিমানগুলো তারপর একদম নেই হয়ে গেছে

 সংকেতগুলি প্রথমে বেশ জোরালো ভাবে এসেছে পরে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে  বিলীন হয়ে গেছে , যেন  শেষ হয়ে গেছে  রেডিয়োর   ব্যাটারি  রেডিও মেসেজ গুলো কেমন অদ্ভুত 

 যেমন -  এখান থেকে বের হবার কি কোনও উপায় আছে? আমরা  মস্ত বড়  কোন  সমস্যায় পড়তে যাচ্ছি হায় জেসাস ক্রাইস্ট  কি হচ্ছে এখানে ?

 

 আর কম্পাসের  কথা তো সব রিপোর্টেই  বলা হয়েছে

 

 জাহাজগুলো হারানোর আগে তত বেশি রেডিও মেসেজ দিতে যেতে  পারেনি  তবে ভয়ঙ্কর ব্যাপার যেটা তা হলো কিছু জাহাজ   পরে অগভীর সমুদ্র বন্দরের কাছাকাছি ভাসতে দেখা গেছে কিন্তু ভেতরে কোনও যাত্রী বা নাবিক  ছিল না 

 

বিমানগুলো হারানোর আগেও   সবাই  কম্পাসের   পাগলামির কথা রিপোর্ট দিয়েছে তারপর হারিয়ে গেছে বিখ্যাত ফ্লাইট - 19  ,  যাত্রীবাহী ডি সি -3  এবং ডি সি  4  বিমান   চার ইঞ্জিনের বড়  কয়েকটি বিমান  মিলিটারি বিমান  আট  ইঞ্জিনের  B- 52  বোমারু বিমান

 

 

 

বিশাল আকৃতির যে  জাহাজগুলো  হারিয়ে  গেছে বেশির ভাগ জাহাজই সাদামাটা পণ্য বহন করছিল যেমন লোহা, কয়লা এমনকী ভুট্টা  আর  নুড়ি  পাথর  

 

 রেডিও মেসেজ না দিয়ে যে সব বিমান আর  জাহাজ  হারিয়ে গিয়েছিল   সেগুলি যে বারমুডা   ট্রায়াঙ্গলের  কারসাজি  এমনটা অনেকে বিশ্বাস করে না  সেই ঘটনাগুলো   জাহাজের নাবিক বা পাইলট ভুলের কারণেও হতে পারে

 

 পাইলট বা নাবিকের  অসুস্থতার কারণে জাহাজ ,   বিমান দুর্ঘটনায় পড়তে পারে হঠাৎ করে জ্বালানি শেষ হয়ে যেতে পারে খোলা আকাশে বা   সমুদ্রের বুকে পথ   হারিয়ে ফেলতে পারে নাবিক বা  পাইলট দৃষ্টিভ্রমের শিকার হয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে  সামুদ্রিক ঝড়ে বা জলোচ্ছ্বাসে পড়ে তলিয়ে যেতে পারে

 

 সবই সম্ভব মহাশূন্যে বা সমুদ্রে

 

 

 মজার  একটা  ব্যাপার বলি 

 

 জাহাজে  EPIRB  প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়  পুরো নাম  Emergency Position Indicating Radio Beacon আমরা সংক্ষেপে বীকন বলি এই প্রযুক্তির ফলে,  একটা  জাহাজ ডুবে যাওয়ার পরও  সেখান থেকে সঙ্কেত পাঠাতে পারবে এই বীকন নামের যন্ত্রটা  কিন্তু বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে  ডুবে যাওয়া একশো বিশটা   জাহাজে  বীকন  থাকার পরও কোনওরকম সংকেত আসেনি !

 

 বারমুডা  ট্রায়াঙ্গলে  ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলির  ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে লোকজন সম্ভব অসম্ভব সব কিছু টেনে এনেছে কেউ টেনে আনছে অতীন্দ্রিয় প্যারালাল জগৎ  কেউ বলছে,  এসব ঘটনার জন্য দায়ী UFO ,    সেই উড়ন্ত  সসার   যেগুলিতে চেপে ভিন গ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীরা আসে  বারমুডা  ট্রায়াঙ্গল   থেকে মানুষ সংগ্রহ করে নিয়ে যায় ওরা

 

 অথবা ওখানে হঠাৎ হঠাৎ করে  তৈরি হয় ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক ফিল্ড  ওই বলয়ে  জাহাজ, বিমান,  সাবমেরিন ঢুকে পড়লে মুহূর্তে ওরা চলে যায় প্যারালাল  জগতে

 

 আর একদল দাবি করে,  অতীতের সেই রহস্যময় সভ্যতা আটলান্টিস  যেটা কিনা  জলোচ্ছ্বাসে সাগরের  গহীন অতলে হারিয়ে গিয়েছিল সেই আটলান্টিসের অবস্থান ছিল আজকে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে অসম্ভব ধরনের উন্নত ছিল সেই সভ্যতার লোকজন  অ্যাটম  বোমার  ব্যবহার জানত  গোলাকার উড়ন্ত যান ব্যবহার করত চলাফেরার জন্য

 

 

 সমুদ্রের তলায় ডুবে গেলেও  একদম হারিয়ে যায়নি  আটলান্টিসের  বাসিন্দারা বিজ্ঞান  আর প্রযুক্তির ব্যবহার করে  ওরা  টিকে  আছে  গভীর সমুদ্রের  তলায়  ওরাই ফাঁদ পেতে ধরে নিয়ে যায় জাহাজ আর বিমান

 

 যেহেতু প্রমাণ দিতে হচ্ছে না যার যা খুশি ব্যাখ্যা দিচ্ছে যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে কোনও  তত্ত্ব   প্রমাণিত হচ্ছে না 

 রাজনৈতিক ব্যাপার টেনে এনেছে অনেক 

 

দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা রাশিয়ার মধ্যে  ঠান্ডা যুদ্ধ চলছিল  একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার জন্য বানাচ্ছিল বিচিত্র সব যুদ্ধাস্ত্র আর প্রযুক্তি তাদের কোনও গোপন গবেষণা  অংশ  হতে পারে  এই বারমুডা  ট্রায়াঙ্গল  

 হতে পারে সাম্রাজ্যবাদী কোনও দেশ কৃত্রিম ইলেকট্রো ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করেছিল যাতে জাহাজ-  বিমান আর সাবমেরিন গায়েব হয়ে যায় এটাও হয়তো ব্যবহার করতে চেয়েছিল যুদ্ধের হাতিয়ার হিসাবে 

পরে হয়তো সে প্রজেক্ট বাতিল করা হয়েছে  কোন কারণে 

 আজ প্রতি সপ্তাহে  হাজার  বিমান আর জাহাজে উড়ে   যাচ্ছে বারমুডায়   কই কোনও রকম ক্ষতি তো হচ্ছে না  তো !

 

 তবে  কি  সেই রহস্যময় শক্তির  বলয় আর কাজ করে না ?  সময়ের  আবর্তে দুর্বল হয়ে গেছে  ?

 

নাকি বারমুডা  ট্রায়াঙ্গলের সেই জায়গাতে  আশ্চর্য কোনও  প্রাকৃতিক  শক্তি কাজ করত যারা আসল রূপ আমাদের জানা নেই জ্ঞানবিজ্ঞানে আরও উন্নত হলে আমাদের কাছে ধরা পড়বে শক্তির রহস্য 

 

কি  এমন শক্তি  সেটা,  যেটা সমুদ্রের দিগন্ত ছড়িয়ে আকাশে পর্যন্ত ছুঁয়ে থাকে 

 

 

 

সমুদ্র নিজেই মস্ত বড় রহস্যের আঁধার সেই জন্মলগ্ন থেকে সমুদ্রে এক  দুর্জয়  রহস্য কত কিছুই না ঘটে অতল সমুদ্র হিমালয়ের পর্বতের চেয়ে  বহু গুণ   বড় পর্বত   ডুবে আছে সমুদ্রের  তলায় পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর খাদ সেটাও রয়েছে সমুদ্রের তলায়   মারিয়ানা ট্রেঞ্চ  নামে চিনি আমরা

 

 কত বিচিত্র আর  রহস্যময় প্রাণী আছে সাগরের গহীনে  এমন  এক ধরনের কাঁকড়া পাওয়া গেছে সমুদ্রের তলায় যেগুলি ডুবন্ত আগ্নেয়গিরির  ফুটন্ত জলে জন্মায় এবং বেঁচে থাকে সমুদ্রের গভীরতার স্তরে স্তরের তাপমাত্রা বদলে যায় আর বিচিত্র সব প্রাণ দেখা যায় প্রতি স্তরে

 

 কত টন টন ধাতু খনি রয়ে গেছে সমুদ্রের তলায়  এমন কোনও ধাতব খনির কারণে রেডিও সিগন্যাল বা ক্যাম্পাসে আচরণ নষ্ট হতে পারে ?

 

 

 প্রাকৃতিক কারণে ,  সমুদ্র  আর আকাশের মাঝে কি কোনও রকম রহস্যময়  শক্তি  তৈরি   হতে পারে ?

 

 বিজ্ঞানীদের মতে,  হতে পারে 

 ১৯৫০ সালে আমেরিকার কোস্টগার্ড আর আমেরিকার নেভি মিলে,   লো ফ্রিকোয়েন্সি রেডিও টেস্ট করেছিল নিজেদের মধ্যে    এবং  আবিষ্কার করল , রহস্যময়  এক ধরনের  রেডিও সংকেত ভেসে বেড়াচ্ছে সমুদ্রের বুকে সে শব্দের গভীরতা বর্ণনা করা যায় না তবে কিছুটা যেন বাঁশি বাজানোর  মতো  

 

অথবা অচেনা কোনও সামুদ্রিক প্রাণীর চিৎকারের মত

 

  

 আজকাল অবশ্য অমন দুই চারটে রেডিও সঙ্কেত ধরা পড়ে সমুদ্রের বুকে তবে সেগুলো  সবই ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত বৈধ VLF  রেডিও স্টেশন 

 

সমুদ্রে জাহাজ চালানোয়    ঝুঁকি আছে  অনেক জায়গায়ই বেশ বিপদ সংকুল   নিউ ইংল্যান্ডের কাছাকাছি এসে বহু জাহাজ ডুবে গেছে  প্রতি বছর কিন্তু সেগুলি প্রত্যেকটি হয়েছে প্রতিকূল আবহাওয়া আর  ঝড়ের কারনে  কিন্তু বারমুডায়    প্রত্যেকটা ঘটনা ঘটেছে ভাল  আবহাওয়ায়     অন্য জায়গাতে জাহাজের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে  বারমুডার মত একদম   ভ্যানিস হয়ে যায়নি 

 

 

 নেভির  কর্মকর্তারা  ১৯৮৬  সালে  বড় একটা প্রজেক্ট হাতে নেয়   ষোল  বিলিয়ন ডলার এই প্রজেক্টের নাম ছিল SOSUS ( Sound  Surveillance System)  

 

 অত্যাধুনিক রাডার আর  আন্ডার ওয়াটার ক্যামেরা সাহায্যে  গ্লফ অভ  মেক্সিকো থেকে নর্থ ক্যারোলিনা ,  যেটা কিনা  বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের   বিরাট একটা  অংশ,  চষে ফেলা হয়েছে 

 

ডুবে যাওয়া জাহাজ বা বিমানের  হদিশ পাওয়া দূরের কথা   এক টুকরো  লোহাও পাওয়া যায়নি   হাজার হাজার  ছবি তোলা হয়েছে জাহাজ বা   বিমানে ধ্বংসের কাঠামোর সাথে  সামান্য  মেলে এমন কোন  প্রবালপ্রাচীর পাওয়া  গেলেও  আন্তরিক ভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে

 কোনো রকম ফল পাওয়া যায়নি 

 আর এতে  অবাক হওয়ার কিছু নেই

 

সমুদ্রের শক্তিশালী একটা উষ্ণ স্রোত হচ্ছে গলফ স্ট্রিমঅসম্ভব শক্তিশালী এই স্রোতটা ঘুরে বেড়ায় কানাডা, আমেরিকা আর নিউফাউন্ডল্যান্ডের সমুদ্রেবারমুডার এখানে এসে প্রচণ্ড রকমের পাগলাটে হয়ে যায় গলফ স্ট্রিম এর জোর

 

 

এখানে যদি কোনও বিমান বা জাহাজ ডুবে ও থাকে, স্রোতের কারণেই সেই ডুবন্ত জাহাজ বা বিমান চলে যাবে বহু বহু দূরখুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে যাবে ডুবন্ত বিমান বা জাহাজ সমুদ্রের জলের স্তরে স্তরে চাপ খেয়ে ভেঙে কয়েকশো টুকরো ও হতে পারেআর সেই টুকরোগুলো গলফ স্ট্রিমের কারণে আক্ষরিক অর্থেই ভ্যানিশ হয়ে যাবে

 

মোটামুটি আমরা ধরে নিতে পারি জাহাজ হারানোর ঘটনাগুলো সাদামাটা দুর্ঘটনা হতে পারেজলদস্যুর কবলে পড়েছিল ওরাবা নিজেদের ভুলে পথ হারিয়ে দিশাহারা হয়ে ডুবে গেছে

হয়তো মাতাল ছিল নাবিকেরা

 

বা অন্য কিছু

 

কিন্তু বিমান হারানো - সহজ দুর্ঘটনা মনে করে না অনেকেএকজন বৈমানিক, আর যাই হোক সামান্য কারণে মেডে সঙ্কেত পাঠায় না বা একই রুটে চলাচল করছে অমন বৈমানিক কুয়াশা বা দিগন্ত জুড়ে থাকা সমুদ্র দেখে সহজেই ভয় কাতুরে হয়ে যায় না

 

তার চেয়ে বড় কথা একসাথে পাঁচটা বিমান হারিয়ে যেতে পারে না এবং ওদের খুঁজতে গিয়ে উদ্ধারকারী বিমান হারিয়ে যাবে ? - এটা বড্ড বেশী অসম্ভব

 


মন্তব্যসমূহ