সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

জাদুকরের বাসা

 নোটন যখন এই শহরে নতুন এলো , তখনই সবাই ওকে সাবধান করে দিয়েছিল

বলেছে , বিশেষ করে ভরা জোসনার ঘন হলুদ রঙের রাতগুলোতে , কোন রকম বিচিত্র শব্দ শুনলে যেন ঘর থেকে বাইরে বের না হয়

সাবধান !

নোটন সেইসব মোটেও বিশ্বাস করেনি

অবশ্য ,  কয়েক রাত পরেই সে শব্দটা শুনতে পেয়েছিল

অনেক দূর থেকে আসছিল শব্দটা টুংটাং ধরনের শব্দ মনে হচ্ছে টিনের বা পুঁতির চাইম বাজছে বা দূরের নদীতে ভেসে থাকা বয়ার শব্দ আবার ধর, শহরের শেষ মাথায় লাল টালির যে গির্জাটা আছে , সেটার ঘণ্টাও হতে পারে

সবই সম্ভব

তাই না ?

গির্জাটা  অবশ্য  বেশ দূরে

রাতের বেলা বাতাসের মতিগতি বদলে, কেমন মাতাল মানুষের মত এলো মেলো বয়ে যায়তখন কি শব্দটা অমন চাপা আর রহস্যময় শোনাতে পারে না ?

নোটন নিজে হেঁটে গিয়ে দূরের গির্জার ঘণ্টাটা দেখে এসেছে  পর্তুগীজদের আমলের।  

পেল্লাই সাইজের পিতলের ঘণ্টা ! ঘণ্টার জিহ্বাটা ভীষণ রকমের ভারী বাতাসে ঘণ্টা নড়লে শব্দ বেশ ভালই হবেআর নিঝুম রাতে সেটা অনেক দূর পর্যন্তই যাবে

কিন্তু সমস্যা অন্যরকম

রাতের বেলা কান পেতে মনে হয়েছে টুং টাং শব্দের সাথে যেন চাপা যান্ত্রিক শব্দ আছেকলকব্জা চলছে অমন সাথে কেমন বাষ্পীয় হুস হাঁস শব্দ কেটলির জল ফুটে গেলে বাস্পের চাপে কেটলির ঢাকনা অমন শব্দ করে নাচানাচি করেহ্যাঁ, ঠিক অমন শব্দ।

ব্যাপারটা ওখানেই শেষ কারণ অনেক ভেবেও নোটন কোন দিশা খুঁজে পায়নি

নোটনদের শহরটা একদম নিঝুম

ইষ্টিশনের পর থেকেই শুধু ঘাসের বন মটরশুটির দানার রঙের দীঘল ঘাসলাল কাঁকর বিছানো পথ চলে গেছে দূরে দূরে কাঁকর তো নয় , যেন একগাদা রুবি গুড়ো করে পথের মধ্যে অযত্নে ফেলে রেখেছে কেউ

আর আছে ঢাউস সাইজের সব শিশু গাছ

অত বড় গাছের নাম শিশু হল কেন ? কে রাখল অমন নাম ?

দানব বা দৈত্য  গাছ রাখলেই হতইংরেজিতে হত জায়ান্ট ট্রি

শহরের যারা বুড়ো হাবড়া তারা বিশ্বাস করে ঐ শব্দ অপয়া অমন রাতে বাইরে বের হলেই লোকে মারা যাবেঅন্ধ হয়ে যাবে বা পাগল হয়ে ইষ্টিশনের বাইরে বসে গান গাইবে

বুড়োরা চায়ের দোকানে বসে কফ জড়ানো গলায় এইসব নিয়ে আড্ডা দেয় চায়ের পেয়ালায় আদা তেজপাতা কম হলে চিল্লা ফাল্লা করে অভিযোগ করে তারপর আবার আড্ডা দেয় আর কোন অভিযোগ নেই তাদের  শুধু আদা আর তেজপাতা ঠিক থাকলে ওদের জীবনের সব কিছু ঠিক ।  

তারমানে এই শহরের লোকেরা,বিচিত্র এই শব্দ শুনে আসছে বছরের পর বছর যুগের পর যুগ

তাহলে কোন খবরের কাগজে ছাপা হয়নি কেন ?

নোটন ভাবে

একা একা শব্দ রহস্য নিয়ে ভেবেছে নোটন জ্যামিতি বক্স আর বীজগণিতের হিসাব মিলিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিল, সবই ডাকাতিয়া বাতাসের গর্জন মেঘের দেশান্তরী হবার শব্দ নিঝুম রাতের শব্দ।

নিজেই গোয়েন্দাগিরি করে শব্দের রহস্য বের করতে চেয়েছিল

রহস্যের খোঁজ করতে গিয়ে শুনেছে অদ্ভুত একটা গল্প  সব শহরেই অমন একটা দুটো গল্প থাকে। কে না জানে ?

শহরের উল্টা দিকে আছে আমলকীর ঘন বন বিশাল সেই বনে দুপুরের রোদ পড়লে আমলকীগুলো কেমন দামি রত্নের মত লাগে দুর্লভ কোন পান্না ।

অনেক বছর আগে, সেখানে সেই নিরালা  বনের ধারে কেমন একটা বিদঘুটে বাড়িতে থাকতো বুড়ো একটা লোক

একতলা বাড়ি

সাথে মাত্র কয়েকজন চাকর বাকর নিয়ে কয়েকজন মানে দুই তিনজন একজন বাজার করতো আরেকজন রান্না করতো রান্নার হাত ভালই ছিল নাকি  বিশেষ করে চিতল মাছের কোপ্তা , স্বর্ণরেণুর মত মুগের ডাল আর গোল আলুর দম যারা খেয়েছে চিল্লা ফাল্লা করে সবাই স্বীকার করেছে, সেই খাবার রান্নায় রাস্কার টাইপের পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য

রাস্কার মানে অস্কারের মতই

শেষের জন ধোয়া পাকলা মাজা ঘষা করতো

তো সেই বুড়ো নাকি কারও সাথে মেলামেশা করতো নাবাসার মধ্যে থেকে দিনরাত কী   সব করতো কে জানে ?

লোকে সন্দেহ করতো , বুড়ো লোকটা মনে হয় জাদুকর দুষ্ট জাদুকর হবে

ভাল জাদুকর হলে তো অমন করে থাকে না কেউ

আর আজকাল কি ভাল জাদুকর চাইলেই পাওয়া যায় ?

মাঝে মাঝে সেই রহস্যময় বাড়ির চিমনি দিয়ে কেমন বেগুনী ধোঁয়া বের হয়ে আসতো

কাজের লোকেরা তখন বাড়ির পিছনের কুয়া থেকে বালতি বালতি জল নিয়ে দৌড়ে ভেতরে যেত

সে এক মস্ত কাণ্ড সব মিলিয়ে হুলুস্থুল

শহরের লোকজন শান্তিপ্রিয় তারা বেশ বিরক্ত হয় কিন্তু কিছু বলে না ভয়ে

দুষ্ট জাদুকরকে ঘাটিয়ে কি লাভ ?

এক রাতে ভীষণ শব্দে সবার ঘুম ভেঙ্গে গেল

ভয়ানক সেই শব্দ যেন নরকের সব দরজা ভেঙ্গে পড়ছে পম্পেই নগরীর আগ্নেয়গিরি জেগে উঠেছে আবার এক সাথে বাজছে কয়েক ডজন টিনের ক্যানেস্তারা

অনেকে মিলে  লম্বা টর্চ আর কমলা উজ্জ্বল আলো দেয়া হারিকেন হাতে  নিয়ে আমলকী বনের কাছে এসে হাজির হয় দরকার মনে করলে বুড়ো জাদুকরকে শক্ত পিটুনি দেবে  শিক্ষা দিয়ে দেবে তারা।  

এটা ভাল মানুষের জায়গা কোন ফাজিল জাদুকরের জায়গা হবে না এই শহরে  সাবধান।  

ওখানে গিয়ে সবাই বেশ ধাক্কা খায়

দেখে বাড়িটা নেইনেই মানে নেই

একদম নেই

কিচ্ছু নেই ওখানেখা খা করছে শূন্য জায়গা

বেশ ভয় পেয়ে গেল লোকজন ভয় পাবারই কথা সবাই দৌড়ে যার যার বাড়ি ফিরে বাসার দরজার খিল শক্ত করে এঁটে শুয়ে পড়লো

তারপর আর কখনই দেখা যায়নি বুড়ো আর তার তিন কামলাকে

আর বাড়ি তো হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে কর্পূরের মত আগেই বলেছি সেটা

রহস্য

শহরের একমাত্র মুদির দোকানদার দাবি করলো , বুড়ো তার কাছ থেকে বাকিতে তিন পোয়া আটা আর ছটাক তিলের তেল কিনেছিল টাকা না দেয়ার জন্য ভেগে গেছে

কিন্তু কেউ আমলে নেয়নি তার কথা  কারণ বুড়ো কখনও ধারে জিনিস কিনত না।

রহস্য রহস্যই রয়ে গেছে

অনেক ভেবেছে সবাই লাভ হয়নি এখন রাতের বেলা আকাশে অমন শব্দ শুনে সবাই ভয় পায়

গল্প গাঁথা ছড়ায় তেহরানী গোলাপ গাছের ডালাপালার মত

 

ঘটনা এখানেই শেষ হলেই ভাল হত। হয়নি।

কেমন এক পূবালী হাওয়া  নক্ষত্র ভরা রাতে ঘুম ঘুম তন্দ্রায় বিচিত্র  শব্দ শুনে জেগে বাইরে চলে এলো নোটন

ভীষণ জোছনা   পিতলের  বাটির মত চাঁদ আকাশে

টুংটাং শব্দ সাথে কেমন গুম গুম

উপরে চেয়ে অবাক নোটন

মেঘের উপর চার চাক্কার উপর গড়িয়ে চলছে ওটা কি ?

ওটা কী ?

ওটা কেমন বাড়ি ?

বড় বড় কামরা বিশাল সব জানালা জানালা শার্সি দিয়ে কাঁচা হলুদ রঙের আলো ছিটকে আসছে বাইরে

বাড়ির টিনের চালের উপর বড় গোল চিমনি চিমনীর মাথা রাজমুকুটের মত খাঁজকাটা সেখান থেকে হু হু করে বের হচ্ছে ধোঁয়া অনেক অনেক যন্ত্রপাতি    কলকব্জা চাকা গিয়ার পিস্টন সব নড়ছে চলছে শব্দ করছে, ঝুঁকঝাঁক করে

বড় রান্নাঘর সেখানে  তামা আর পিতল দিয়ে বানানো বিচিত্র  ইঞ্জিন রুম তিনটে গাঁট্টাগোঁটটা লোক বালতি ভর্তি করে জল ঢেলে দিচ্ছে বয়লারে বয়লারের ভেতরে কয়লা জ্বলছে কৃষ্ণচুড়া ফুলের মত টকটকে লাল হয়ে

বাড়ির ছাদে তাপ্পি মারা লোহার বিশাল ট্যাঙ্ক বৃষ্টির জল কায়দা করে ধরে রাখা হয় ওখানে বাড়ির বাইরের দেয়ালে এখানে ওখানে কাচের ত্রিভুজ লণ্ঠন ঝিকিমিকি আলো জ্বলছে বাড়ির সামনে গ্রামোফোনের চোঙের মত টিনের এক গোল চোঙ হু হু করে বাতাস চলে যাচ্ছে বাড়ির ভেতরে

বাড়ির পিছনের দিকে ছোট্ট একটা চিমনি পোস্ট আপিসের বাতিল টিনের বাক্স দিয়ে বানানো হয়েছে যেন সেই চিমনীর উপর ঝলসানো হচ্ছে বড় বড় আস্ত কয়েকটা সামুদ্রিক মাছ, রাতের খাবার

বাড়ির বাইরে টব ভর্তি শাক সবজির চাষ করছে কেউ আরও আছে একটা সুন্দর আমলকী গাছ

এত সুন্দর !

এত সুন্দর ?

বুড়ো একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির বারান্দায় নিচের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলছে , ' হতচ্ছাড়া হনুমানগুলো বলতো আমার ইঞ্জিন বাড়ি কাজ করবে নাদেখ এবারচেয়ে চেয়ে দেখ ...'

মেঘের উপর যান্ত্রিক শব্দ করতে করতে বাড়িটা চলে যায় বহু দূরে আরও দূরে সাগর পাড়ের দূরের কোন দেশে।

পরদিন অবশ্য নোটনের কথা কেউ বিশ্বাস করেনি

কেউ না

অমন হয় নাকি !

 

 


মন্তব্যসমূহ