সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গগন বাবুর ডায়েরি

 এক

পিনটুরা   বিদেশ  চলে যাবার আগে ওদের সব আসবাবপত্র আর বাতিল করা জিনিসপত্র বিক্রি করে দিল ।  পুরানো দিনের অমন গোবদা গোবদা জিনিস কোন কাজে লাগবে না। বেশ সস্তায় বিক্রি করলো।খবর শুনে  হাজির হলাম ।  

 পুজার নাড়ু খাবার লোভে বা আড্ডা দিতে পিনটুদের বাড়িতে অনেকবার গিয়েছি।  স্কুল  পর্যন্ত   একসাথে পড়েছি আমরা। তারপর আলাদা হয়ে গেছি। বন্ধুত্বে ফাটল ধরেনি তাতে ।  এখনও  মাসে একবার ওদের বাসায় আড্ডা - চা । তেলেভাঁজা আর ছাপা  সন্দেশ চলে।   বারান্দায় বসে আড্ডা চলত। রেডপনি আর বাটারকাপ ফুলে  ভর্তি  জায়গাটা।     ভাল কাটে সময়টা । বাড়ির পরিবেশ ভাল। ঘরোয়া। আন্তরিক।

আমি যখন গেলাম  পড়ার একটা টেবিল আর কাঠের আলমারি ছিল বাকি। টেবিলটা কিনতে চাইলাম। পিনটু  জানালো সামান্য দামে কাঠের আলমারিটা ছেড়ে দেবে। আলমারি ভর্তি বই ,  ফ্রি । আলমারির প্রতি আগ্রহ তেমন ছিল না। পুরানো দিনের কালো বার্নিশ করা জিনিস। সামনে কাচ।  সময়ের আঁচড়ে        পদ্মার ঘোলা জলের মত হয়ে গেছে । কিনে ফেললাম।  পরিচিত এক ভ্যানওয়ালার  সাহায়্যে টেবিল, আলমারি আর তিন বস্তা বই নিয়ে বাসায় ফিরলাম।  হিসাব কষে দেখলাম বেশ জিতে গেছি।

 স্টাডিরুমে নিয়ে রাখলাম জিনিসগুলো। বই পড়ে রইল বস্তা বন্দি। আর এর মধ্যে পিনটু,    ওর  বাবা, মা    ফ্লাই  করলো  ডেনমার্কে।  ফ্যামিলি মাইগ্রেশন ।  ওর দাদা বৌদি ওখানেই থাকেন। খুব সুন্দর দেশ নাকি। ছবি দেখেছি অনেক বার । ছবির মতই সুন্দর দেশ।শহরের নাম কোপেনহেগেন। কোন এক নদীর  তীরে  ব্রোঞ্জের একটা  মৎস্যকুমারীর মূর্তি আছে। কারন রূপকথার জাদুকর হ্যান্ড  ক্রিস্তিয়ান  আন্ডারসন ডেনমার্কের মানুষ ছিলেন।  ওখানের   বাড়িগুলো সব লাল , হলুদ আর নীল রঙ করা ।   ডিসেম্বরে কড়া শীত পরে। বরফ পরে গোল্লা আইসক্রিমের মত।     কখনও সুযোগ পেলে আমিও যেন যাই - অমন কথা বারবার বলল পিনটু।

 শেষ দিন বেশ পেল্লায় এক নিমন্ত্রণ খাওয়াল । ইলিশ মাছের পাতুরি, সোনামুগের ডাল , পটলের ভেতরে মাংসের পুর দিয়ে ভাঁজা,  পালং শাকের সাথে পনীরের কুঁচি, আমড়া দিয়ে ট্যাংরা মাছের টক। শেষ  পাতে দৈ। সব মিলিয়ে কেলেঙ্কারি অবস্থা।

এবং সুন্দর করেই বিদায় নিল আমার বন্ধু। ওদের বাড়িটা  এক সপ্তাহ খালি রইল। নতুন ভাড়াটে চলে এলো। কখন ও কখনও ওদের মহল্লায় ওদিক দিয়ে যাওয়া হয়। বাড়িটার দিকে চেয়ে ফোঁস করে একটা  দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে আসি।

 

সেই ক্লাস টু -তে পড়ার সময় আমাদের বন্ধুত্ব। কত স্মৃতি !  শীতের কুয়াশার মত হারিয়ে গেল।  বিষণ্ণ   বিকেলে বারান্দায়  বসলে দূরের   ইসটিশন দেখতে পেতাম। ছোট একটা ডোবা। শনঘাসের দঙ্গল। মধুমঞ্জুরি ফুলের সুবাস। সব শেষ।

বইগুলো বস্তা থেকে বের করে আলমারিতে তুলে রাখতে বেশ সময় লাগল। নানা কারনে দেরি হয়েছিল। হরেক কিসিমের বই। ঠিক করলাম বিষয়বস্তু অনুসারে   ভাগ করে রেখে একটা সুন্দর ক্যাটালগ বানাব।

 

পরে আস্তে ধীরে পড়ব। যেমন- বাদলার রাতে ভৌতিক। শীতের রাতে শিকার কাহিনি। গরমের দুপুরে রোমাঞ্চ উপন্যাস। বর্ষার দুপুরে যে কোন একটা বই।    বর্ষার দুপুরে যে কোন বই পড়া যায়। কোন নিষেধ নেই।

বই গুছাতে গিয়ে পুরানো দিনের মরক্কোর চামড়ায় বাঁধাই করা  একটা বই পেলাম।  বেশ কিছু বই অমন বাঁধাই করা ছিল। নইলে হয়তো আরও আগেই ধরতে পারতাম। বা চোখে পড়তো। অথবা জিনিসটা কখনই আমার হাতে এসে পড়তো না। বেশি মোটা না।আবার পাতলাও না। তুলতুলে হয়ে গেছে বাঁধাই।  তেজপাতার মত রঙ  হয়ে গেছে ভেতরের পাতাগুলো  ।

 

 

উল্টে অবাক। হাতে লেখা। প্যাঁচানো কিন্তু পরিষ্কার হরফে পাতার পর পাতা লেখা। দামি ঝর্ণা কলম আর  বিদেশী  কালি দিয়ে। পাণ্ডুলিপি ? নাহ !  ডায়েরি ! কেউ একজন সুন্দর দিন তারিখ সব  রোজকার জীবনের কিছু কথা বার্তা লিখে রেখেছে। অন্যের ডায়েরি পড়া ঠিক হবে না। নিজেকে শাসন করলাম।

ধুলা ময়লা  পরিষ্কার করে ডায়েরিটা রেখে দিলাম টেবিলের ড্রয়ারে। ব্যস্ত হয়ে পড়লাম বই গুছিয়ে ক্যাটালগ বানানোর কাজে। ভুলে ই গেলাম ওটার কথা।  আর এর মধ্যে মাস দুই কেটে গেল।পিনটুর  সাথে স্কাইপিতে  কথা হয়। ওরা ভাল আছে। সব ঠিক ঠাক। গিয়ে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় কয়েকদিন ইয়েতিদের মত মোটা জামা কাপড় পরে ঘুরতে হয়েছে। বাসায় নাকি ফায়ারপ্লেস আছে। কি সুন্দর !  

মার্চের এক গরমের রাতে   হঠাৎ করে বৃষ্টি নামলো। কলেজ থেকে ফিরে দুপুরে  ঘুম দিয়েছিলাম। ঘুম ভাঙতেই দেখি বাইরে রুমঝুম বৃষ্টি। জানালা দিয়ে দেখি সারা দুনিয়া যেন ভেসে যাবে। মা রাতের খাবার টেবিলে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।

 

    ড্রয়ার থেকে  কলম বের করতে গিয়ে চোখে পড়লো ডায়েরিটা  । আরে যাহ্। ভুলেই গিয়েছিলাম ওটার কথা। হাত বাড়িয়ে তুলে নিলাম। টেবিল ল্যাম্পের আলোতে পাতা  উল্টে পাল্টে দেখলাম। কোন এক গগনবাবুর ডায়েরি। কে লোকটা ? নামটা শুনেছি। পিনটুর মুখেই যেন । কবে - কখন ভুলে গেছি। লোভ হল। দেখি না পড়ে।

বেশি ফেনা করে এক কাপ কফি  আর ডায়েরিটা নিয়ে  বিছানায় উঠে পড়লাম। বাইরে স্যামন মাছের ডিমের মত বৃষ্টির ফোঁটা  পড়ছেই। কাল  সকালের আগে থামবে কি না সন্দেহ।

মাত্র কয়েক পাতা পড়তেই ভেতরে ভেতরে চঞ্চল হয়ে উঠলাম। প্রথম থেকে আবার পড়া শুরু করলাম। ডায়েরিতে কি কেউ গল্প লেখে নাকি ? তাও আবার দিন তারিখ দিয়ে। নাকি গগন বাবু গঞ্জিকা সেবন করতেন ?  ঠাণ্ডা দুধের সাথে  গাঁজার পাতা দিয়ে কেমন একটা মিকচার আছে না ?   ভাং না কি ?  ওটা খেয়ে লিখেছেন না তো ?  কিন্তু সাধারন  দিনপঞ্জি আচমকা অমন   অদ্ভুত   কাহিনি দিয়ে ভরে যাবে কেন ?

আবার প্রথম থেকেই পড়া শুরু করলাম। বাংলা ভাষাটা তখন কেমন ছিল। ভদ্রলোক সাধু ভাষায় লিখেছেন। প্রথম  কয়েক পাতা পড়ে   মনে হল উনি বেশ আয়েশি আর মস্তিবাজ মানুষ।  শৌখিন তো বটেই। গাছপালা পছন্দ করেন। প্রকৃতি পছন্দ করেন। লেখার মধ্যে অনেকবার শরতের নীল আকাশ, ঘাসের বন, শিশিরের ঘ্রান, পানাপুকুর এমন কিছু শব্দ ঘুরে ফিরে এসেছে।

 

 ডায়েরিটা  মোটামুটি অমন-

১০ আশ্বিন

ডায়েরি লিখলে  মন ভাল থাকে। মগজের চাপ কমে ,  তাই লেখা শুরু করলাম। চাপ কমছে  কি না বুঝতে পারছি না। ডায়েরির পাতায় চন্দনের মিষ্টি একটা ঘ্রান আছে। সেটা ভাল লাগছে। কলমটা জার্মানির। ওটার নিবে নাকি দামি পাথর বসান আছে। জলের মত লেখা হয়। লিখতে মোটেও কষ্ট হচ্ছে না। যা ভাবছি কলমের ডগায় এসে যাচ্ছে। এমন  হলে সময় পেলেই লিখব।  

 

 পরশু দিন দিঘিতে মাছ ধরতে বসেছিলাম। রুই মাছের পোনা ছাড়া হয়েছিল। বেশ বড় হয়েছে। ছিপ ফেলার পর দেখি টোপ গেলে না। চুরি করে কেউ মাছ ধরে নাকি ? কার এত সাহস ? চাকর গোঁসাই দাসকে ভাল মত কচলে দিলাম। ব্যাটা নিশ্চয়ই পড়ে পড়ে ঘুমায়। বা কেউ ওকে ঘুষের প্রলোভন দেখিয়ে  মাছ চুরি করে নিয়ে যায় না তো ?

 

 

১৩ আশ্বিন  

 

 

মাছ  ধরার জন্য ভাল চার বানাতে হবে। নিতাই মহলানবীশ  বলেছে আমি নাকি ভুল চার  বানাই। পচা মেথি, গুড় আর  পাঁঠার নাড়িভুরি মিশিয়ে চার বানালে ভাল ভল পাওয়া যাবে।   মৃগেল মাছ ধরার জন্য জুরি নেই। কাল কলকাতা থেকে কানন বালার  রেকর্ড   আনা হয়েছে। বিকেল বেলা শুনি। রেঙ্গুন থেকে এক পোঁটলা চা পাতা পাঠিয়েছে প্রতিমা পিসীর  মেয়ের জামাই  ।

জিনিসটা হাতে পাইনি। চা পানের অভ্যাস খুব খারাপ। তাও ভাল। বাবার মত আমি আফিমে মৌতাত করি না। ভাল জিনিস  বেশি হলে খারাপ হয়ে যায়।

 

১৫ আশ্বিন

আজ সন্ধ্যায়   দীঘির  পাশে  বসেছিলাম। মৌসুমটা দারুন। শীত আসতে অনেক দেরি।

 তারপরও কেমন মিষ্টি লাগছে। বাতাসে বুনোফুলের ঘ্রান। পাঞ্জাবির উপর শাল জড়িয়ে বসব কিনা ভাবছি। আবার ভাবলাম  দোতলায় গিয়ে দাবা খেলি। উঠব উঠব করছি তখন দেখতে পেলাম ওটাকে। দিঘির কিনারে। সাঁতার কাটছে। লম্বায়  মাত্র তিন বা চার ফুট। মনে হয় বাচ্চা একটা ছেলে। মাথার চুল শ্যাওলার মত। মাছের মত চোখ। দুই হাতের আঙুলগুলো পাতলা চামড়া দিয়ে জোড়া দেয়া। হাঁসের পায়ের মত। নিজের মনে সাঁতার কাটছে।

এত কাছে আমি বসা কিন্তু কোন বিকার নেই। যেন দেখতেই পায়নি।  চোখাচোখি হতেই ডুব দিয়ে হারিয়ে গেল। অমন প্রাণী ছিল তাহলে ? বিজ্ঞানীরা কেন জানে না ?  

 

৬ আশ্বিন

কালকের ব্যাপারটা কাউকে বলিনি।

কেউ বিশ্বাস করবে না।

চাকর গোঁসাই দাস করবে। অমন কিছু ব্যাটা নিজেও দেখেছে। এই জন্য দিঘিতে ভুলেও নামতে চাইত না। আমাদের বাড়ির দীঘিটা ভাল না। ছোট বেলা থেকে জানি। অনেক বিচ্ছিরি ধরনের মাছ ধরা  পরে। অমন মাছ সারা বাজার খুঁজেও  পাওয়া যাবে  না।

 

খুব ছোট বেলায় দেখেছিলাম জেলেরা  জাল ফেলতেই বিচ্ছিরি কৈ মাছের মত কেমন একটা মাছ ধরা পড়েছিল। ভয়ে কেউ খায়নি। মনে হয় হাজার বছর আগের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া কোন মাছ।   আবার   অমন হয় মাছের পোনা ছাড়ার  পর সেই বছর কোন মাছ  ধরা পরে না।    শুধু যে দীঘিতে সমস্যা তা না। পুরো  বাড়িতেই সমস্যা ।  

 

  পিছনের সবজি বাগানে শখ করে দিদা যেখানে  বিলাতি ধনেপাতা আর মুলা বুনত ওখানেও  গণ্ডার   দেখেছি গত বছর।  লম্বা ঘাস খাচ্ছিল   ।  আয়েস করে । বাবার জন্য এই ঘটনা শুরু হয়েছিল।  বাবাকে আগেই বলেছিলাম দরজা খুলতে হয় না। মজা করার জন্য সব কিছু  করা ভাল না।  দরজা খুললে বাইরের জিনিস চলে আসে। ।       

১৭ আশ্বিন

কাল বেশি লিখতে পারিনি। আজ হাতে সময় পেতেই  বসে পরলাম। মৌরি দেয়া একটা পান দরকার ছিল। চিবুতে চিবুতে লিখতাম।  লিখতে থাকি।  দেখি পান দেয় কি না কেউ।

 একদম ছোট বেলায় বাবা এক সাধুর দেখা পেয়েছিল।

পাথর বাবা বলতো সবাই । সাধু নাকি সারাদিন না খেয়ে থাকতো।  বড় একটা পাথর এক ঘটি জলে ভিজিয়ে রাখতো সারাদিন। সন্ধ্যাবেলায় সেই জল টুক করে গিলে ফেলত। এতেই হয়ে যেত। কখনই কিছু খেত না। কেউ দেখেনি।

 

 বাবা সাধু ভক্ত মানুষ ছিলেন। একদিন আমাকে নিয়েই সাধুর আশ্রমে গেলেন। বেশ লোকজনের ভিড়। সাধু  কাউকে সাগরেদ হিসাবে গ্রহণ করেনি। অনেকেই হতে চেয়েছিল। লোকজন যারা সাধুর চারিদিকে বসে আছে ওরা এসেছে  নানান কারনে।  মোক্ষ লাভ করতে বা পার্থিব কোন লোভ লালসা পূর্ণ করতে।

সাধুকে দেখে তেমন মস্ত কিছু মনে হল না। বুড়ো একজন মানুষ। মুখ ভর্তি দাড়ি, গোঁফ আর মাথা ভর্তি চুল। সব কাশ ফুলের মত সাদা।  উনার  গায়ের রঙটাও কাটা আলুর মত ফর্সা । মস্ত বড় একটা বট গাছের তলায় বসে আছেন।   

 

একটা জিনিসই ভাল , সাধু গাঁজা সেবন করে না। গাঁজা ছাড়া সাধু পাওয়া আর দুধ ভাত খাওয়া বাঘ পাওয়া সমান কথা।   উনার সামনে  চার পাঁচটা হরেক সাইজের পাথর । এই পাথর  সারাদিন  রোদে রেখে  দেন। সন্ধ্যার  পর সেই পাথর  চেটে চেটে  খান। আবার একটা পাথর দেখি এক ঘটি জলে  ডুবিয়ে রেখেছেন।

পাথর বাবা আপনি নাকি অন্য কোন খাবার দাবার গ্রহণ করেন না ?’  আগ্রহের সাথে  জানতে চাইলেন  বাবা।

মোক্ষ লাভ করলে লাগে না। অনেক সাধক  শুধু বায়ু  আর জল সেবন করে বেঁচে থাকে। আমি নিজের চোখে দেখেছি। আমি পাপী তাই অমন সাধনার স্তরে যাইনি। পাথর থেকেই আমার খাবার পাই। পাথরে সব থাকে।

পাথরে সব থাকে   কথাটা বোধগম্য হল না  ?’

একদম সহজ।  আমারা যা খাই সব পশু বা  গাছপালা থেকেই পাই। পশু পায়  উদ্ভিদ থেকে। উদ্ভিদ পায় মাটি থেকে। পাথরে সব  ধাতব আর খনিজ পদার্থ  আছে যা আমাদের শরীরে লাগে। লোহা, ফসফরাস, পটাশিয়াম যাই বলুন সব । আমরা যারা পাথরের সাধনা করি তারা পাথর থেকেই দরকারি জিনিস সরাসরি নিতে পারি। তাই খাওয়ার দরকার হয় না।

অদ্ভুত তো।

‘  এই  ব্রহ্মানডে অদ্ভুত বলতে কিছু নেই বৎস্য । সব সত্য। সবই অলীক। আচ্ছা বলতো এই যে বট গাছটা  এটা তোমার কোন দিকে।

আজ্ঞে ডান দিকে।

এখন আমি যদি বলি এটা আমার বাম দিকে ?’

কথাটা সত্য। কারন দুই জন মুখোমুখি বসে আছি তাই ।

‘  কাজেই মনে রাখবে সত্য সব সময় এক রকম হয় না। পাথর সাধনা সবচেয়ে প্রাচীন সাধনা। মাটি তৈরির আগে পাথর হয়েছে। মানুষ যখন গুহায় থাকতো তখন থেকেই সে পাথরের শক্তি বুঝতে পারত। পাথর শুধু তার অস্ত্র ছিল না। ছিল আরাধনার জিনিস।

সত্য কথা বলতে কি আজ এত বছর পর ডায়েরি লিখতে গিয়ে অবাক হচ্ছি সাধুর কথা মনে করে। কত আধুনিক চিন্তা ভাবনা। বৈদিক যুগের সাধুরা অমন কত বিদঘুটে জিনিস জানতো। অবাক  করার মত। ত্রিকালদর্শী ছিলেন তারা। কি  কি ভাবে ?

আমাদের কি তবে শুধু পাথর উপাসনা করা উচিৎ ?’ বাবা প্রশ্ন করলেন ?

অমন কিছু আমি কখনই বলি না বৎস্য ।অমায়িক হেসে বললেন সাধু।জগতের সব কিছুই শক্তি। শক্তিকে সুন্দর ভাবে ব্যবহার করলে সব  দরজাই খোলা যায়। সাহেবরা   দেখ না আকাশের  বজ্র বন্দি করে  আলো জ্বালায়।

‘   ভুত ভবিষ্যৎ দর্শন করার কোন উপায় আছে ?’

আছে। তবে অনেক সাধনার দরকার। অনেক সময় দরকার।

কম সাধনায় কোন ফল হবে ?’

সাধনা শব্দটাই সময়  আর শ্রমের সাথে যুক্ত। তবে পাথরের একটা গুন আছে। নিদিষ্ট ছকে পাথর সাজিয়ে রাখলে  প্রকৃতির  নকশা  বদলে দেয়া যায়। তখন দরজা খুলে যায়।

কিসের দরজা গুরুদেব ?’

সময়ের দরজা। সময় তো আসলে শূন্য। কোথাও কিছু হচ্ছে না। আমরা ভাবছি হচ্ছে। অথবা একই ঘটনা সৃষ্টির  আদি  থেকে আজ পর্যন্ত ঘটেই যাচ্ছে।

খুব কঠিন মনে হচ্ছে গুরুদেব।

মোটেই না। আমি বালিতে ছক কেটে দেখাচ্ছি। পাঁচটা পাথর দিচ্ছি। নিয়ম মত সাজিয়ে রাখ। রোজ সকালে পাথরে জল ঢালবে।  তারপর অপেক্ষা করবে। একদিন মাঝের দরজা খুলে যাবে।

দরজা  খুললে কোন রকম লাভবান হতে পারব গুরুদেব ?’

সব সময় লাভ ক্ষতির বিবেচনা করে চলার  নাম মূর্খতা। তবে অদ্ভুত রকম যোগ দর্শন হবে সেটা কি বড় রকম লাভ না ?’ উদাস গলায় বললেন  গুরুদেব।

 

 

১৮ আশ্বিন

কাল প্রচুর লিখেছি। আজ সারাদিন ব্যস্ত ছিলাম। বিকেলে টক দৈ দিয়ে পদ্মার ইলিশ রান্না করেছিল পিসিমা। আচ্ছা করে খেলুম। ঘৃতকুমারীর চারাগুলোতে কেমন মরচে পড়ার মত দাগ দেখা যাচ্ছে। প্রতিকার কি ?

পাথর বাবার কাছ থেকে পাঁচটা চ্যাপ্টা পাথর নিয়ে এসেছিলেন বাবা। আহামরি তেমন কিছু না।  বাড়ির পিছনে নানান জায়গায় পাঁচটা পাথর রেখে দিলেন বাবা। মোটামুটি একই দুরে। সবগুলো পাথরের সাথে কাল্পনিক একটা রেখা টানলে পঞ্চভুজ একটা তারকা চিহ্ন হয়।

 

 একদম সকালবেলা সূর্য উঠার আগে  এক ঘটি করে জল  সেই পাথরের উপর ঢালে আমার পিতাজি। বিরক্তকর। টানা বছর দশেক অমন করে গেলেন। লাভের বেলা ঘণ্টা। পাথর বাবার কোন খবর নেই। আসাম না নইনিতাল চলে গেছেন । বাবা হতাশ হয়ে উনার কাজ বন্ধ করে দিলেন।

এবং সেই বছর  পনেরই আশ্বিন এক মজার কাণ্ড হল।

এই বছর বর্ষায় তেমন বৃষ্টি হয়নি। কিন্তু আশ্বিনে ভাল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। আসলে বলা যায় গত তিন দিন ধরে লাগাতার বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। আকাশের  রঙ  স্লেট পাথরের মত কালো। ঝুম বৃষ্টি। দীঘির জল টলমল করছে। মনে হয়  সাগর হয়ে গেছে।

 

 রাত আটটার দিকে থামল বৃষ্টি। চারিদিকে ব্যাঙের ডাক। কোলাহল। আকাশ পরিষ্কার হয়ে দেখা গেল আজ পূর্ণিমা। কোজাগরী পূর্ণিমা ।   দোতলার বারান্দায় বসে ছিলেন বাবা। এই শ্বেত পাথরের টেবিলের সামনে।  ছাতুর  শরবত খাচ্ছিলেন। এমন সময় চিৎকার করে উঠলেন তিনি। দৌড়ে সবাই চলে এলো। আমি ও। সামনের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখচ্ছিলেন বাবা। চোখ পড়তেই আমাদের পিলে চমকে গেল। আচ্ছা প্রস্রাব করে এসে বাকিটা লিখছি......

হ্যাঁ, একটা জিনিস জানি চোখের ভুল। চোখ আমাদের ভুল দেখায়। কান অনেক সময় ভুল শোনায়। বিজ্ঞান এইসব ভাল ব্যাখ্যা দিতে পারে। এক সাথে অনেক লোকজন যখন ভুল দেখে দৃষ্টি বিভ্রমের শিকার হয় ? তখন ?

আমরা সবাই পরিষ্কার দেখলাম , বাগানের পিছনে যেখানে মাটি কুপিয়ে নরম করে গাঁদা ফুল বা শীতের সবজি বুনে দিদা সেই জায়গায় একটা শহর দেখা যাচ্ছে। শহরটা বেশ দুরে । দোতলা মাটির বড় বড় বাড়ি।  পোড়া মাটির দেয়াল।

 

একদল নারী পুরুষ হেঁটে হাচ্ছে।  মনে হল কোন উৎসব । আকাশে ফানুস উড়িয়ে দিচ্ছে কেউ কেউ।  দুরে একটা নদী। বিচিত্র আকারের নৌকা  ভেসে আছে। নদীর বুকে  আলোর মেলা   ।  কাঁপা  কাঁপা দৃশ্য। গরম কালে দাবদাহের সময় দূরের দৃশ্য যেমন কাঁপে তেমনই। এক সময় ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে গেল।

আমরা সবাই ভুল দেখেছি। কারন খানিক পরেই   বাগানের  সেই জায়গা আগের মত হয়ে গেল। অনেক দিন  চাপা উত্তেজনা রইল পরিবারের মধ্যে।

 

সারা বছর কেটে গেল।

 

 পরের বছর ঘটলো আবার। ওটা আসলে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা রাতে হয়।  এইবার আমি   প্রথম দেখলাম। সেই রাতে  জোসনা ছিল হলুদ রঙের। আচমকা কেমন যেন কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেল বাগানের পিছনটা ।    ছোট ছোট অদ্ভুত  কয়েকটা  মুরগির  মত প্রাণী চলে এলো বাগানের ভেতরে  । খুঁটে  খেতে  লাগল বাগানের সবজি। ভয় পেলাম না। চেয়ে রইলাম। আকাশে ঘুড়ির মত পেল্লায় বাদুড় দেখলাম, আগে বা পরে কখনই দেখনি অমনটা।

কতক্ষণ ছিল এইসব ? সব মিলিয়ে দশ মিনিট। পরদিন দীঘিতে বাইম মাছের মত কেমন একটা মাছ ধরলাম। মাছের মুখটা আবার কাইক্কা মাছের মত সরু ।

 

  ফালতু স্বাদের।

 

২২ আশ্বিন

 

ডায়েরি ধরতে পারিনি। ব্যস্ত ছিলাম।  বার্মা থেকে কাঠ এনে বিক্রি করলে কেমন ফলপ্রসূ হবে সেটা নিয়ে কথা হচ্ছিল  মুস্তাফা সাহেবের সাথে। করতে পারলে ভাল।

সেই দিনের পর থেকে  ব্যাপারটা সহজ হয়ে গেল।  প্রতি বছর কোজাগরী পূর্ণিমা রাতে অমন হতে লাগল ।  বছর , বছর। কিছুক্ষণের  জন্য  বিচিত্র আর রহস্যময় ঘটনা ঘটে। অতীতের দৃশ্য দেখা যায় বাগানের পিছনে।  সেই সময়টা আমরা  বাড়ির বাইরে যেতাম না।   আমাদের বাড়িটা ভুতুরে বাড়ি হিসাবে নাম করলো। কাজের লোক চাকর বাকর থাকতে চাইত না। আত্মীয় স্বজনরাও বাড়ি নিয়ে আজে বাজে কথা বলতো।

পাথর বাবার সাথে দেখা হয়েছিল বছর দশেক পর। সব শুনে স্মিত হেসে বললেন, ভয়ের কিছু নেই। তবে দরজা আর বন্ধ করা যাবে না। একটা সময়  পর্যন্ত দরজা ক্রিয়াশীল থাকবে । অনেক বছর পর ওর ক্ষমতা দুর্বল হতে হতে  বিলুপ্ত হয়ে যাবে। প্রাচীন সাধু আর জ্ঞানীরা এটাকেই বলতো-  সময়ের  দরজা।

আমার মনে হয় প্রকৃতির কোন আইন নিয়ে খেলা করা ঠিক না। আবার এমনও হতে পারে প্রকৃতির আইনের মধ্যেই  রয়ে গেছে গোপন কোন  সুত্র। সারা দুনিয়ায় অমন  অনেক প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া গেছে যাতে মনে হয় পুরানো দিনের অনেকেই সময়ের দরজার ব্যাপারটা জানতো।

 

লেখা শেষ করি। আজ    চিংড়ি , পেঁয়াজ আর মসলা   মাখিয়ে নারকেলের ভেতরে পুরে    কয়লার মধ্যে রাখা হয়েছে। খুললেই লোভনীয় খাবার। গরম ভাতের সাথে দারুন। সাথে  মহেশ ঘোষের ঘি এক চামচ।

 

 

 

 

ডাইরিটা শেষ। এর পর   খালি কয়েক পাতা জুড়ে গাছের গুনাগুন আর রান্নার কিছু বর্ণনা আছে।  আর আছে অদ্ভুত কিছু জীবজন্তুর ছবি। হাতে আঁকা স্কেচ।  চেনা চেনা লাগল। একটা মাছ চিনলাম। সিলাকান্থ ।  কোটি কোটি বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এই মাছটা। বাদুরের মত পাখি আর যেই গাছ লতার ছবি  তাও পাওয়া যায় না আজকাল।

  অদ্ভুত লোক এই গগন বাবু।

বৃষ্টি থেমে গেছে অনেক আগেই। বারান্দায় গিয়ে বসলাম। ভাবছি। গগন বাবুর ডায়েরি  ভুয়া জিনিস মনে হচ্ছে। ভদ্রলোক বারান্দায় শ্বেত পাথরের  টেবিলে বসে আজগুবি সব  আখ্যান লিখে রেখে গেছেন। হাতে প্রচুর সময় ছিল। চাকর গোঁসাই দাস ছাড়া তেমন আড্ডা দেয়ার মানুষ ছিল না। মনের মাধুরী দিয়ে যা মনে এসেছে তাই লিখেছেন।

ল্যাপটব অন করে খুঁজতে লাগলাম। এইসব ব্যাপারে নির্জলা  তথ্য পাওয়া মুশকিল।

এনডরু টমাস নামে এক ভদ্রলোক এইসব ব্যাপার নিয়ে কয়েকটা  বই লিখেছিলেন। বাজারে পাওয়া যায় না। ছাপা শেষ। অনলাইনেও পাওয়া যায় না। পাথরের বড় নির্মাণ হচ্ছে পিরামিড। সবাই চেনে।

অমন রাজ্যের জিনিস আছে পাথরের। যেটা চোখে পড়লো সেটা হচ্ছে- ইংল্যান্ডের স্টোনহেঞ্জ। প্রতি বছর অনেক পর্যটক ওটা দেখতে যায়। যীশুর জন্মের  তিন হাজার বছর আগের তৈরি। কেন , কারা বানিয়েছিল আজও রহস্য।  পেল্লাই সাইজের পাথরগুলো দাঁড়িয়ে আছে  জ্যামিতিক এক নিয়মে। ওখানে মাটি খুঁড়ে মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গেছে । হাড়ের বয়স যীশুর জন্মের তিন হাজার বছরের বেশি।

 আদিম  কবরস্থান না এটা। কিংবদন্তী বলে এটা নাকি  মৃত্যু আর জন্মের মাঝের দরজা। এত উঁচু পাথরের দরজার উপরে চ্যাপ্টা পাথরগুলো তুলল কেমন করে ? কোন রকম কপিকল দিয়ে তোলাও প্রায়  অসম্ভব একটা কাজ।

আমেরিকান রেড ইনডিয়ানদের মধ্যে  কিম্ভুত সব গল্প কাহিনি আর উপকথা চালু আছে। যেমন- কোন এক তারার দেশ থেকে পাঁচ পা ওয়ালা আগুনের ঘোড়ায় চেপে এক আগন্তুক এসেছিল ওদের বিরানভূমিতে।

 

 সেই আগন্তুক দেখিয়েছিল , রাতের বেলা কতগুলো পাথর গোল করে সাজিয়ে রাখলে অদৃশ্য এক দরজা খুলে যায়। সেই দরজা দিয়ে যাওয়া যায় অন্য এক জগতে। যেখানে খাবারের কষ্ট নেই। সারা বছর শিকার পাওয়া যায়।

পেরুর একটা শহর লিমা।   টিটিকাকা জলাভূমির পাশে।  ওখানেরই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক  পাহাড় । খোদাই করে কেটে   পাহাড়ের গায়ে   দরজা   বানানো হয়েছে , কি কায়দায় কে জানে !  স্থানীয় সাধুরা প্রতি বছর একটা নিদিষ্ট দিনে এখানে আসে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।  ধূপ ধুনা দেয়। প্রাথনা করে।

 

ওরা বলে এটা ঈশ্বরের দরজা। কঠিন শক্ত পাথর কেটে অমন পেল্লাই সাইজের দরজার মত আকৃতি বানানোর মধ্যে কোন যুক্তি খুঁজে পান না বিজ্ঞানীরা।  পাহাড় কেটে দরজার চিহ্ন বানানোর দরকার কি ?  ভেতর দিয়ে যাবার কোন উপায় নেই তো ।

ইনকাদের কিংবদন্তী বলে ওদের প্রথম ধর্মপ্রচারক মারোমুরু এই দরজা দিয়ে এসেছিল। তবে দরজা খোলার জন্য  স্বর্ণের একটা গোল চাকতি লাগে। সেই স্বর্ণের গোল প্লেট আকাশ থেকে পড়েছিল। মারোমুরু তার কাজ শেষ করে স্বর্ণের প্লেট পাহাদের দরজায় গায়ে বসাতেই দরজা খুলে গিয়েছিল। সেই পথ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল সে।

 

 আর কখনই ফিরে আসেনি। পুরো ঘটনা ঘটার সময়  ইনকা সাধুরা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল । সব দেখেছে তারা। লিখে রেখেছে পুঁথিতে। বলেছে পরে    শিষ্যদের কাছে।  যুগের পর যুগ ধরে  সেই সাধুদের দলটাই নিদিষ্ট দিনে এই দরজার কাছে আসে । প্রাথনা  করে।  আশা করে ফিরে আসবে মারোমুরু।

হয়তো  সম্পূর্ণ   ভুয়া গাল গল্প। কিন্তু সত্যি কি কিছু হয়েছিল সেই সময় ?

পাথরের পেল্লাই সাইজের গোল বল পাওয়া গেছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে । নানা সময়ে। যদিও কোস্টারিকা  গোলক  নামে পরিচিত। কারন  এই  ধরনের  পাথর সবচেয়ে বেশি  কোস্টারিকায় পাওয়া গেছে। ব্যাসল্ট পাথরের বলগুলো ওজনে ১৫ টনের মত। ব্যস ৬,৬ ফিট। কারা কবে কোন উদ্দেশ্যে বানিয়েছিল আজও রহস্য।

 

পাথরগুলো আবিষ্কার হয়েছিল গহীন জঙ্গলের ভেতরে । ১৯৩০ সালে ইউনাইটেড ফ্রুট  কোম্পানি কোস্টারিকার জঙ্গল পরিষ্কার করছিল। কলার চাষ করবে। তখন শ্রমিকরা পাথরের বলগুলো আবিষ্কার করে। শ্রমিকদের ধারনা হয়েছিল পাথরের বলের ভেতরে সোনা দানা লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ওরা কয়েকটা ভেঙ্গে ফেলে।  কতৃপক্ষের হস্তক্ষেপের কারনে ব্যাপারটা থামে।  স্থানীয় আদিবাসিরা কিন্ত কখনই জঙ্গলের ভেতরে আসতো না।

 

এমন কি পাথরের এই বলগুলো ছুঁয়েও দেখতে চাইত না। ওদের কাছে এইগুলো ট্যাবু । হরেক গুজব ছড়িয়ে আছে এই পাথরের বলগুলো নিয়ে। আদিবাসিদের মতে অনেক আগে জঙ্গলের ভেতরে এই পাথরের বলগুলো থেকে মিহি ধাতব শব্দ হত। বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ বলে অতীতে জঙ্গলের ভেতরে কোন সভ্যতা ছিল ওরা হারিয়ে গেছে। জ্যোতিষ  চর্চার জন্য এই বল ব্যবহার করতো। নিদিষ্ট প্যাটানে সাজানো ছিল। তবে হারিয়ে যাওয়া জাতি সম্পর্কে কোন  রকম প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ঘণ্টা দুইয়েক পর চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। ইন্টারনেট হচ্ছে খোলা জানালা। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় লাইব্রেরী।  হুড়মুড় করে তথ্য আসছে ওর নিজস্ব গতিতে।

  ভাবছি। নাহ। গগন বাবুর কথা বিশ্বাস হচ্ছে না ।  কিন্তু তীব্র কৌতূহল পেয়ে বসেছে। নতুন এক পেয়ালা কফি নিয়ে বসলাম। আজ রাতে আর ঘুম আসবে না। আবোল তাবোল ভাবছি।

 

দুই

 

ডেনমার্কের সময় চার ঘণ্টা পিছিয়ে। পরদিন দুপুর বারোটায় যখন ফোন দিলাম তখন  পিনটুর ওখানে সকাল আটটা মাত্র। সম্ভবত  নাস্তার টেবিলে বসে পাউরুটির মধ্যে জেলি বা চেদার চিজের পেস্ট মাখাচ্ছিল। মুখ ভর্তি খাবার নিয়ে আউ আউ করে পিনটু জানতে চাইল-   ‘ কি  ব্যাপার  বাদল ?  এত সকাল ?’

এমনিতেই , অনেক দিন কোন যোগাযোগ নেই তাই ভাবছি একটু কথা বলে নেই।

ভাল করেছ। আজ রোববার ছুটি। আমিই ফোন দিতাম।তা খবর কি  তোমাদের ?’

আমাদের আর খবর !’ দায়সারা ভাবে বললাম। তারপর নানান খেজুরে কথা বলে সতর্কতার সাথে প্রশ্ন করলাম - আচ্ছা গগনবাবু তোমার কি হন ? খুব ছোট বেলায় উনার নাম শুনেছিলাম  তোমার মুখে ।’  

অহ দাদু , মায়ের আপন মামা হয়। কেন বল তো ?’    

একটা বইতে উনার নাম লেখা দেখলাম।ডাহা মিথ্যা কথা বললাম। দেশে থাকেন নাকি ?’

কাঞ্চনপুরে থাকতেন। অনেক আগে। ছেলেবেলায় যেতাম উনাদের বাড়ি। সবাই বলতো  উনাদের বাড়িটা ভূতুরে তাই যাওয়া হত না। দাদুর মাথায় ও নাকি  সামান্য গোলমাল ছিল। আশ্বিন মাসে  মাথা গরম হয়ে যেত ।

বাড়িটা আছে এখনও ?’ উত্তেজনায় বুক ধুকপুক করছে বুঝতে পারলাম।

বাড়ি কোথায় যাবে ?’ ফোনের ওপাশে হাসল পিনটু  । বাড়ির জায়গায় বাড়ি আছে। তবে কেউ থাকে না। খালি। একজন কেয়ার টেকার দেখাশোনা করে ।

বাদবাকি সবাই ?’

কোলকাতা চলে গেছে একাত্তরে।

ইয়ে গগন দাদু ?’

উনি ভাবুক আর সাধক  প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। সংসার ছেড়ে কোন এক  জঙ্গলে  চলে গিয়েছিলেন। কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। কি ব্যাপার বল তো বাদল।  

আরে নাহ, পুরানো বাড়ি নিয়ে একটা ফিচার লেখার কাজে হাত দিয়েছি। তাই খোঁজ নিচ্ছিলাম।

লেখা ধরলে কবে থেকে ?’

এই তো মাত্র  ফরমায়েশ পেলাম। এই ধরণের বই নাকি ভাল চলে। প্রকাশক সাহেব তো বলল । তোমাদের সেই কাঞ্চনপুরের বাড়িটা একটু ঘুরে দেখে এলে কেমন হয় ? যদি তোমার আপত্তি না থাকে।

আপত্তি থাকবে কেন ?’ ফোনের ওপাশে হাসল পিনটু । ‘  তবে সাবধান।  বাড়িটা এমনিতেই পড়ে আছে মেলা দিন ধরে। সাপ খোপের খামার হয়ে গেছে। কারেন্ট নেই। দমকা বাতাস এলেই চুন সুরকি ঝুরঝুর করে মাথায় পরে।   । কেয়ার টেকার কিন্তু সারাদিন উঁকি মারে না। ওর কাছে শুধু চাবি আছে মেইন গেইটের । বছরে একবার গিয়ে ঘূর্ণা দিয়ে আসে কি না সন্দেহ। বেতন নিচ্ছে এমনিতেই। আবার কেয়ার টেকার না থাকলে বাড়ি দখল হয়ে যাবে। রাত কাটাতে  পারবে না , কোন  আসবাবপত্র নেই।   

রাতে থাকব না।মিথ্যা কথা বললাম।

কবে যাবে ?’

সামনের মাসে। ক্যালেন্ডার দেখে দিনটা বের করেই জানাব।হাসলাম।

 

তিন

বাংলাদেশে বেশ সুন্দর  সুন্দর জায়গা আছে। আমরা যারা  শহরে  থাকি   জানতেও পারি না। সাধারণত বহুজাতিক কোন কোম্পানি বেশ খরচ করে যখন ক্যালেন্ডার ছাপায়  তখন কিছু দৃশ্য দেখে অবাক হতে হয়, দেশে এত সুন্দর জায়গা আছে ?  

 

টিভিতে বিজ্ঞাপনেও অমন সুন্দর সব জায়গা দেখা যায়। কাঞ্চনপুর জায়গাটা ভাল  লেগে গেল  ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখেই।  সারি সারি কড়ই গাছের  দঙ্গল ।  সবুজ  আর মায়াবী। বাতাসটা কি টাটকা। রেলগাড়ির সেই আদি আর অকৃত্রিম  ঝেং ঝেং শব্দ। সব মিলিয়ে মনটা ভাল হয়ে গেল।

  খুন কম লোক নামলো।  ইষ্টিশনের বাইরেই  সিরিঙ্গে চেহারার একজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। রঙ জ্বলা ট্রেটনের প্যান্ট আর ভেজা বালি রঙের একটা জামা পরে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটা মাকড় আলী। কেয়ার টেকার।  বয়স পঞ্চাশ হতে পারে।  মাথায় টাক। পান  খাওয়া লাল মুখ।   

 

 

পিনটুর কাছ থেকে ওর ফোন নাম্বার পেয়ে আগেই কথা বলে সব পাকা করে রেখেছি।  বলে রেখেছিলাম  জিন্স আর  কালো টি শার্ট পরা থাকবে।    আমাকে দেখে সালামের মত ভঙ্গি করলো।  চেহারায় কোন ভাব নেই। কেন এই ভাঙ্গা বাড়ি দেখতে এসেছি বুঝে উঠতে পারছে না।

মাকড় আলী না ?’

জে সাব ।বিনয়ের সাথে মিহি গলায়  জবাব দিল।   

 তখন  দুপুর। চারিদিকে রোদ। আশ্বিন মাসের বেলা উজ্জ্বল হলুদ। মাত্র একটা চায়ের দোকান। অল্প কিছু রিক্সা। আমার সাথে মালসামান তেমন নেই। পিঠে  একটা    ট্র্যাভেল  ব্যাগ। দরকারি সব জিনিসে ঠাসা। কম্পাস হতে শুরু করে ক্যাম্পিং লাইট আর চাকু পর্যন্ত আছে।

হাত বাড়িয়ে  ব্যাগটা নিতে চাইল মাকড় আলী। না করলাম। ততক্ষণে আমাদের দেখে রিক্সাওয়ালারা হাঁক ডাক শুরু করেছে।

বাড়িটা কতদূর ?’ জানতে চাইলাম।

রিকসায় পুনর মিনিট ।

উঠে পড়লাম রিক্সায়। রাস্তার অবস্থা কেরসিন। শেরশাহের  আমলে বোধহয় বানানো হয়েছিল। কোন সরকারের আমলে মেরামত করা হয়নি। ঝাঁকি খেতে খেতে চলছে। যে কোন মুহূর্তে ছিটকে পরে যেতে পারি।

আপনি থাকেন কোথায় ?’ আলাপ চালানর চেষ্টা করলাম।

উনাদের বাড়ি থেইক্কা সামান্য দূরে।

‘  সারা বছর তালা ঝুলে ?’

কেডায় জাইব বাড়ির বীতরে ?’

ভুতুরে বাড়ি ?’

কেমতে কমু। বীতরে গেলে তো  ?  খামাখা।  হুনছি  বাড়ি ভাল না  । বীতরে যাই না। গত বছর মাছ ধরতে বীতরে গেছিল হারান  জাউলা। ধিঘিতে ডুইব্বা  মরছে। মাছে ওর সইলের গোস্ত খাইয়া ফালাইছে।

বাপরে,  রোমাঞ্চকর বর্ণনা।  আরও খানিক আলাপ চালালাম।  নতুন কোন তথ্য জানতে পারলাম না। মাকড় আলী   বাচাল মানুষ না। কিংবা আমাকে বুঝে উঠতে পারছে না। বেশি কথা বলে পাতলা হতে চাইছে না।  আলাপ চালিয়ে কিছু বের করতে পারলাম না।

 

 

 রিক্সার ঝাঁকি খেয়ে যখন  শরীরের  হাড়গোড় সবগুলো আলাদা আলাদা  করে  চিনতে পেরেছি   তখনই বিশাল বাড়িটা দেখতে পেলাম। দেয়াল ঘেড়া । বাইরে মরিচা পরা লোহার পেল্লায় একটা গেইট। ওটাই সিংহদরজা। ভাঙ্গা  সিংহ ও দেখলাম।  বলের মত কি যেন থাবায় ধরে   দাঁত মুখ খিঁচিয়ে চেয়ে আছে আমার দিকে। জমিদারদের বাড়িতে দরজায় সিংহ দিত কেন ?  বিষ্ণুর নৃসিংহ  অবতার মাথায় রেখে ? কোথায় যেন পড়েছিল  বেশির ভাগ জমিদার নৃসিংহের পূজা করতেন। আর যেইসব জমিদার ডাকাতি করতেন উনারা কালি পূজা করতেন।

ভাড়া নিয়ে রিক্সাওয়ালা চ্যাংগর ম্যাংগর করে চলে গেল। ফটকের  তালা খুলে গেল ঝনঝন করে।

আপনি যাবেন না ভেতরে ?’ লোকটাকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে  দেখে বললাম।

নাহ।মুখটা তম্বা করে বলল মাকড় আলী।

সে কি ?’ সত্যি সত্যি অবাক হলাম।

‘  দুফুরে বাত নিয়া আসমু আপনার লিজ্ঞা।

‘  লাগবে না। আমি খাবার নিয়ে এসেছি সাথে।

পাগল অইছিন নি ? পিন্তুু  দাদা মাইরালাইব আমারে। হুদা ডাইল বাত । ইস্পিসাল কিছু না ।  

ঠিক আছে।হাসলাম মাকড় আলীর  ভাব ভঙ্গী দেখে।

চলে গেল লোকটা। ঘড়ি দেখলাম দুপুর দেড়টা। চারিদিকে চোখ ফেরালাম,  বিশাল  জায়গা  জুড়ে  ঝোপ আর গাছপালার মাঝে দোতলা বাড়িটা দেখে  চোখ কপালে উঠে গেল। একদম জমিদার বাড়ি রে। নতুন অবস্থায় নিশ্চয়ই দেখার মত জিনিস ছিল।  চওড়া সিঁড়ি নীচতলার সামনে। ক্ষয়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। দোতলার বারান্দার লোহার গ্রিল  প্যাচিয়ে আছে  স্বর্ণলতা।   এক তলার সব জানালা  কাঠের  তক্তায় পেরেক ঠুকে বন্ধ করা। দোতলার  একটা জানালার কাচ   এত কিছুর মধ্যেও   টিকে আছে। ছোট বট গাছের চারা  দেয়ালের এখানে ওখানে।  ছাদে ঘাস জন্মেছে। বাড়ির  সামনেই  খানিক দূরে দিঘিটা। গগন বাবুর ডায়েরি পরে মনে মনে কল্পনায় যেমন ছবি বানিয়ে নিয়েছিলাম তেমনই। একটু ও  আশাহত হলাম না।  এমনই হওয়া দরকার ছিল ।  

দিঘিটার সামনে দাঁড়িয়ে শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে গেল। গগন বাবুর কথা  অনুয়ায়ী   এই দিঘিতে বিদঘুটে সব জলজ মাছ আর প্রাণী সাঁতার কাটে। যারা ইতিহাসের অতলে হারিয়ে গেছে। দীঘির থিরথিরে কালো জলের দিকে চেয়ে অচেনা অনুভুতি হল। বুদবুদ দেখে মনে হল গহীনে মাছ আছে অনেক। দুপুরের  কড়া আলোয় আবার মনে হল বেকুব না হলে অমন এক ডায়েরি পড়ে কেউ ছুটে আসে অমন পাড়া গায়ে ? লজ্জা পেলাম। সারা দুনিয়ার কেউ জানে না ? শুধু এক পরিবারের প্রাচীন সদস্যরা জানে তাদের বাড়ি ভৌতিক। কোজাগরী পূর্ণিমা রাতে কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে যাওয়া সময়ের দৃশ্য ভেসে উঠে !  

বাংলাদেশে অমন অনেক বাড়ি আছে। খুঁজলেই পাওয়া যাবে যেগুলো নিয়ে গাল গল্প ছড়িয়ে আছে। তারপরও গগন বাবুর বাড়ির প্রতি আগ্রহ হবার কারন উনার ডায়েরি। অলস সময় গুলোতে বসে বসে বানিয়ে গল্প যদি লিখেই থাকেন তবে মাকড় আলী বলল কেন বাড়িটা ভাল না ?

পিঠের ব্যাগটা বাড়ির সিঁড়ির সামনে রেখে ভেতর থেকে পানির বোতল বের করে এক ঢোক খেয়ে নিলাম ।   ব্যাগটা ওখানে রেখেই সারা বাড়ি টহল দিতে বের হলাম। ঝোপ ঝাড় এত ঘন হয়ে জন্মেছে  রোদের  আলোতে সবুজ আভা বের হচ্ছে। পায়ের শব্দে সরসর করে দৌড়ে পালালো  সোনালী রঙের গুইসাপ। গাছ ভর্তি নারকেল দেখে অবাক হলাম- চুরি করতেও   লোকজন  ভেতরে আসে না ?  বাড়ির সীমানা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা দেয়াল মাত্র এক মানুষ সমান উঁচু। ফাটল ধরেছে জায়গায় জায়গায়। ফার্ন আর শ্যাওলা কার্পেটের মত। পিসীর বাগান কোথায় ছিল অনুমান করতে পারলাম। সেখানেও জবাফুলের দঙ্গল।

সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় গেলাম। সিঁড়ি  ক্ষয়ে গেছে । লোহার রেলিঙে বাটা  মসলার মত মরিচা লেপটে আছে। দোতলার বারান্দায় আমাকে চমকে দিয়ে শ্বেত পাথরের টেবিলটা  হেসে উঠলো রোদের আলোয়। জিনিসটা আছে আজও ?  সম্ভবত ভারি। ওজনে বেশি তাই চুরি হয়নি বা নড়াচড়া করা হয়নি। ওটার সামনে  সিনেমার সেট সাজানর মত কাঠের আরাম কেদারা। কাপড়ের আসন ইদূরে খেয়ে ফালি ফালি করে দিয়েছে।

  সব কামরায় বাইরে কায়দা করে  কাঠের তক্তা মেরে বন্ধ করা। জানলার পাল্লা খোলা কয়েকটা। ভেতরে উঁকি দিলাম। হাওয়াই মেঠাইয়ের মত মাকড়সার জাল। বাদুরের প্রস্রাবের তীব্র ঘ্রান। ভাঙ্গা কিছু আসবাব আছ। কোন কাজেই লাগবে না ।  লাকড়ি হিসাবে ব্যবহার করা যাবে ভেঙ্গে। সব হারিয়ে গেছে কালের থাবায়। মগ্ন হয়ে দেখছিলাম , বাইরে লোহার গেইটে ঠন ঠন শব্দ পেলাম। বারান্দায় দাঁড়িয়ে উঁকি মারতেই দেখলাম মাকড় আলী  দাঁড়িয়ে আছে গেইটের বাইরে। হাতে টিফিন ক্যারিয়ার।

কৃতজ্ঞচিত্তে মাকড় আলীর হাত থেকে টিফিন ক্যারিয়ারটা নিলাম। দুই লিটারের বোতল ভর্তি করে পানি ও এনেছে। বোতলটা হলদে হয়ে গেছে  বহু ব্যবহারে।  মনে হচ্ছে বোতল ভর্তি প্রস্রাব।

খামাখা কষ্ট করতে গেলেন।কথার  কথা না,  অন্তর থেকেই বললাম।

 সমুইসা নাই। হাইঞ্জা বেলায় আস্মু।  রাইত আটটার  পর  কিন্তুত  ট্রেন নাই।

আমি কাল সকালে যাব।

গোল্লা গোল্লা চোখে চেয়ে রইল মাকড় আলী। মনে হয় না কথা বুঝেছে। রাইতে কই থাকবেন ?’

এই দিঘির পাড়ে বসে জোসনা দেখব।

ক্যান ?’

আমি  বই লিখব ।

জোসনা দেইখা বই লিখবেন ?’

পকেট থেকে পাঁচশো টাকার নোট বের করে  মাকড় আলীর হাতে  গুঁজে দিলাম। এত দ্রুত নোটটা পকেটে ভরল মনে হল হাত সাফাইয়ের জাদু দেখলাম।

কাল সকালে এসে নিয়ে যাবেন আমাকে। স্টেশনের বাইরের দোকানে চা খেয়ে ট্রেনে তুলে দেবেন। ঠিক আছে ?’

সমঝদারের মত মাথা ঝাঁকাল  মাকড় আলী।কিছু লাগলে ফুন দিয়েন। আমার বাসা বেশি দূরে না। দৌড়াইয়া আমু নে।

মাকড় আলী চলে যেতেই  নিজেকে হঠাৎ নিঃসঙ্গ মনে হতে লাগল।

দিঘির পাড়ে বাঁধান ঘাটলায় খেতে বসলাম। মোটা চালের ভাত। ঝাল মুরগি মাংস কয়েক টুকরো। ডাল। অদ্ভুত স্বাদ। খাওয়া শেষ করে  ফ্লাক্স  খুলে চা নিলাম। এখনও গরম আছে। পরপর দুই পেয়ালা চা খেতে খেতে চারিদিকটা ভাল করে দেখলাম।  বাতাসে দিঘির জল  থির থির করে কেঁপে উঠছিল কখনও কখনও। দূরের গাছপালা থেকে পাখির ডাক, সব মিলিয়ে সুন্দর।লতা পাতার সতেজ  বুনো ঘ্রান ।

বিকেল থেকে সন্ধ্যা হয়ে গেল আচমকা।

রাত জাগার আয়োজন করতে লাগলাম। দোতলার বারান্দায় বসে  এক বসায় সকাল করে ফেলব। ব্যাগ খুলে চার্জ করা লাইট বের করলাম । আট ঘণ্টা জ্বলে। ফুল চার্জ দিয়ে এনেছি ।  কোমরের বেল্টের সাথে ক্যাম্পিং নাইফ গুজে নিলাম। কার্বলিক অ্যাসিডের বোতল বের করে শ্বেত পাথরের টেবিলের পাশেই রাখলাম। সাপ আসবেই । ওদের না ডাকলেও আসবে  । কি ভাবে জানবে ,  আগন্তুক এসে বসে আছে ওদের চলার পথে  ?  টেবিলের চারিদিকে সব সাজিয়ে বসে রইলাম।

আগাম কোন নোটিশ না দিয়েই  সূর্য হারিয়ে গেল পশ্চিম দিকের গাছপালার আড়ালে। পাখিগুলো প্রচুর হল্লা করে  ওদের বাসায় ফিরে গেল। কয়েক কোটি ঝি ঝি পোকা  বিরাট কেওয়াজ শুরু করল। হালকা বাতাস বইতে শুরু করল  আচমকা  । যতটা ভয়ংকর ভেবেছিলাম তেমন কিছু না। পরিবেশটা বেশ রোমান্টিক। বহু দূর দূর পর্যন্ত আলো নেই। পাকা জামের মত অন্ধকার । চার্জ লাইট খরচ না করে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিলাম। বাতাসের জন্য তরল  নাচুনে  আলো দিচ্ছিল মোম। ঘড়ি দেখলাম , মাত্র সাড়ে সাতটা। হায় হায়। ভেবেছি  মধ্যরাত।

বিচিত্র শব্দ হচ্ছে চারিদিকে। রাতের নিজস্ব শব্দ। বাদুরের ডাক। রাত জাগা পাখির ডানার শব্দ। তক্ষক। বাতাসে কেঁপে যাচ্ছে আলগা কোন খড়খড়ি বা জানালার পাল্লা।

আমাকে পাগল করে দিয়ে চাঁদ উঠলো। এত বড় হয় আশ্বিনের চাঁদ ?  চারিদিকে হলুদ  আলো। একেবারে কাক জোসনা। এমন চাঁদের আলো দেখে কাক মনে করে ভোর হয়ে গেছে । মাঝ রাতে কা কা করে ডেকে উঠে ভুলে।  আবার চা নিলাম। এখন তেমন স্বাদ পেলাম না। থিতিয়ে গেছে। প্রস্রাবও এরচেয়ে বেশি গরম হয়। সেলফেনের মোড়ক খুলে স্যান্ডউইচ বের করলাম। খেতে খেতে দেখতে লাগলাম  উথাল পাথাল জোসনা।  ঝোপ ঝাড়ের আড়ালে লক্ষ লক্ষ জোনাকি। ওরা পাল্লা দিচ্ছে নক্ষত্রের সাথে।

ঘড়ি যেন স্লো হয়ে গেছে। রাত   দশটায় মোবাইলের রেডিও চালু করলাম। বকোয়াজ  সব  স্টেশন বাদ দিয়ে  মন পছন্দ একটা স্টেশন পেয়ে গেলাম।  হারানো দিনের স্বর্ণরেনুর মত মায়াবী গান বাজতে লাগল।  বসে রইলাম শ্বেত পাথরের টেবিলের পাশে। যেখানে বসে  ডায়েরি লিখত গগন বাবু। আরও কে কবে বসতো কে জানে ?  

চারিদিকের নির্জনতা ছেকে ধরল ।কাল রাতে ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছিলাম। ট্রেনের দুলুনিতে ঘুমাতে পারিনি সারা রাত।   নির্জন এই  পরিবেশে ঘুম চেপে ধরছিল। তার  উপরে রয়েছে দিঘির ভেজা হাওয়া। বসে থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম খেয়াল নেই। অথচ সারা রাত জাগার প্ল্যান করে বসেছিলাম ।

ঘুম ভাংতেই কয়েক মুহূর্ত বুঝতে পারিনি কোথায় আছি ।  বরাবর অমন হয়। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না , কিন্তু  বুঝতে পারলাম  অজান্তেই কিছু হয়ে গেছে। বদলে গেছে পরিবেশ। প্রথম যেটা  খেয়াল করলাম  ,  ঝি ঝি পোকার ডাক বন্ধ। বাতাস থেমে গেছে। কিন্তু বাতাসে কেমন ঠাণ্ডা ভাব। শীতের দিনে পুরানো ঢাকার  গলিতে এমন কুয়াশা ভেজা  ঘ্রান পাওয়া যায়। বা নারায়ণগঞ্জের পুরানো পালপাড়ায়।   মোবাইলের রেডিও  বিচ্ছিরি ফটফট শব্দ করছে। নেটওয়ার্ক নেই। দিঘিতে ছপছপ করে কেমন যেন শব্দ হচ্ছে।

কি মনে হতে উঁকি দিলাম । পিছনে একটা জায়গা যেখানে অনেক বছর আগে পিসীর বাগান ছিল সেই জায়গায়  পাক খেয়ে উঠছে সবুজ কুয়াশা।  চাঁদের আলোয় পরিষ্কার দেখতে পেলাম পশুর ছাল পরা কতগুলো নরনারী বসে আছে। আগুন জ্বলছে  ওদের  সামনে।  হাতে পাথরের অস্ত্র। বিশাল এক বাইসন টেনে হেঁচড়ে নিয়ে আসছে আরেকজন পোক্ত ধরণের মানুষ। কাঠের শক্ত গোঁজ ঠুকে  সেটা  ধরে আগুনের উপর তুলে দিচ্ছে সবাই মিলে।

শ্বাস বন্ধ করে দেখছি হারিয়ে যাওয়া পুরানো দিনের নাটক। সবই বাস্তব। চোখের সামনে ঘটছে এই সব। কিন্তু ভিন্ন এক সময়ের । দ্রুত হাত বাড়ালাম ক্যামেরার দিকে। গগন বাবু মিথ্যা কিছু লিখেনি ডায়েরিতে। বছরের একদিন এখানে পৃথিবীর উইন্ডো এরিয়া খুলে যায়। কিছু ছবি তোলা দরকার। প্রমাণ দরকার আমার।

দৌড়ে নেমে এলাম সিঁড়ি বেয়ে। নীচে নামতেই আরও পরিষ্কার দেখতে পেলাম। সামনে , আমার কয়েক হাত সামনে  মঞ্চস্থ হয়েছে প্রাচীন কাহিনি। ছবি তুলতে লাগলাম। চলে গেলাম আরও সামনে। বুক ভরে শ্বাস নিলাম। বাতাসটা  পর্যন্ত পুরানো দিনের গন্ধমাখা। অমন মিষ্টি টাটকা বাতাস জীবনেও পাইনি আগে।  সামনে আগুনের আলোতে বাইসন  পুড়িয়ে রাতের খাবারের আয়োজন করছে প্রাচীন এক পরিবার। আরও সামনে আগিয়ে গেলাম। ফার্ন গাছের  দঙ্গলের চারিদিকে পরে আছে বিচিত্র সব পাথর। কয়েকটা তুলে নিলাম মুঠো ভর্তি করে। কর্কশ পাথর হাতের মুঠোয় নিতে আরও একবার   বুঝলাম এ সবই  বাস্তব।   পকেটে পুরে নিলাম। এইসব দৃশ্য বেশিক্ষণ  থাকবে না । হারিয়ে যাবে। আমি আমার প্রমাণ রেখে দিলাম।

জুতার সাথে এক টুকরো পাথর লেগে শব্দ হতেই গুহামানবগুলো ফিরে তাকাল আমার দিকে।  ওরা অবাক  বিস্ময়ে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর তড়াৎ করে উঠে দৌড়ে এলো আমার দিকে । পিছন ফিরে   দৌড় দিতে গিয়েই   পিলে চমকে গেল। গগনবাবুর দোতলা বাড়িটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে।ঘোলা হয়ে যাচ্ছে সামনের সব দৃশ্য।

সময় শেষ।

 খিঁচে দৌড় দিলাম। অচেনা জাদুকরের জাদুর কায়দার মত মিলিয়ে গেল সব। চোখের সামনে আদিগন্ত মাঠ। দীঘল ঘাসের দঙ্গল।  আর আকাশ ভর্তি পুরানো দিনের নক্ষত্র। আর কিছু নেই। গগন বাবুর বাড়ি দূরের কথা এক টুকরো ইট নেই। লোহার গেইট নেই। মানুষ লোহার ব্যবহার শিখবে আরও হাজার বছর পরে।

হাহাকার করে উঠলাম। গগন বাবুর নিখোঁজ রহস্য পরিষ্কার হল।

প্রতিবছর কত মানুষ হারিয়ে যায়  পৃথিবীর নানান জায়গা থেকে ।

আরও কাছে এসে গেছে আদিম মানুষগুলো।

( শেষ )   


মন্তব্যসমূহ