গল্পটা এক বুড়ো আর এক বুড়িকে নিয়ে।
ওরা থাকত নিঝুম এক পাহাড়ি উপত্যকায় ।
ওদের বাড়িটা ছিল কাঠের তৈরি। একেবারে সাদামাটা। রঙ চং হীন।বাড়ির পাশে ছোটট একটা পুকুর ছিল। ওখানে ছিপ ফেলে মাছ ধরত বুড়ো।বুড়ি রান্না বান্না করত। বিকাল বেলা হাটতে বেরুত দুজন।
রাতে বারান্দায় বসে জোসনা দেখত আর বকবক করত ।
দারুন কাটছিল ওদের জীবন।
এক ছুটির দিনে এক বন্ধুর বাড়িতে দাওয়াত খেতে গেল বুড়োবুড়ি।বন্ধুর বাড়ি দেখে তো ওরা অবাক।কী সুন্দর বাড়ি। হাতির দাঁতের মত ধবধবে সাদা রঙের দেয়াল। পাকা টম্যাটোর মত টুকটুকে লাল টালির ছাদ।
পাশে একটা সবুজ নিম গাছ। বাতাসে চিরকি মিরকি নিমপাতা উড়ে এসে ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। বাড়ির পাশে সুন্দর বাগান।নানান রকম ফুল ফুটে আছে বাগানে। হলুদ, লাল, নীল, বেগুনি আরও হরেক রঙের।এই অসময়ে ও এত্তোগুলো শালগম হয়ে আছে।....
বন্ধুর বাড়িটা দেখে নিজেদের বাড়িটা বড্ড বিচ্ছিরি লাগতে শুরু করল । কি ম্যাটম্যাটে কাঠের তৈরি। একেবারে ফালতু।আশেপাশের মাটিগুলো যা রুক্ষ। বাগান তো দূরের কথা এক টুকরো সবুজ ঘাস পযন্ত নেই।নাহ। কেউ বাড়িটা পছন্দ করবে না। একেবারেই পচা।
বাড়ি ফিরে বুড়ি বকবক করতে লাগল। করতেই লাগল। বুড়ো তোম্বা মুখে বসে রইল।
‘আমরা বরং এক কাজ করি ।’ পরামশ দিল বুড়ি। ‘আমাদের এই বাড়িটা বিক্রি করে তোমার ঐ বন্ধুর বাড়ির মত সুন্দর একটা বাড়ি কিনি । কী বল?’
বুড়ো আর কি বলবে? সে ও তো তাই চায়।
পরদিন বুড়ো একটা নোটিশ টাঙ্গিয়ে দিল--
এই বাড়ি বিক্রয় হইবেক। যোগাযোগ করুন।(নিচে বুড়োর ফোন নাম্বার)
এই এক লাইন লিখতে গিয়ে দুটো বানান ভুল করল বুড়ো। যাকগে ,আমাদের কি ?
পরদিন সকালেই এক লোক এসে হাজির। ইয়া লম্বা ,আর শুকনো। ঠিক যেন লাঠি বিস্কুট ।গায়ের রঙ ফর্সা।ঠিক যেন খোসা ছাড়ানো গোল আলুর মত।
বাড়ি দেখে প্যাঁকাটি লোকটা বলল, ‘বাড়ি তো ভালই। কিন্তু এই রকম ফ্যাকাসে রঙ তো চলবে না ভায়া । রঙ হচ্ছে এক রকম এনার্জি। মনকে চাঙ্গা করে ফেলে। আমার প্রিয় হচ্ছে টকটকে রং।এই ধরুন গিয়ে, লাল হলে ভাল হত। এক জ্যোতিষী বাবু আমাকে এই রকম পরামশ দিয়েছিলেন। বলেছে, সব সময় যেন টকটকে রঙের আশেপাশে থাকি। বাড়িটায় ভাল করে রঙ চোঙ্গ করলে আমি কিনতে পারি।’ ‘
এই বলে চলে গেল শুকনো লোকটা। যিনি দেখতে লাঠি বিস্কুটের মত লম্বা।আর প্যাঁকাটি।
পরদিনই বুড়ো দৌড়ে পাকরাশি ভেরাইটি শপ থেকে কয়েক কৌটা লাল রঙ কিনে আনল।তারপর হপ্তাখানেক কষ্ট করে পুরো বাড়িটা লাল রঙ করে ফেলল।বাড়িটাকে তখন চেরি ফলের মত লাল দেখাছিল।
এমন সময় কোথথেকে ইয়া মোটা এক মহিলা এসে হাজির হল। ঠিক যেন বাঁধাকপির মত মোটা।সারাক্ষন ডাইনোসরের মত পান চিবুছে।আর পিচিক পিচিক করে এখানে ওখানে পিচকি ফেলছে। বাড়ি দেখে পচ্ছন্দ হল মহিলার।
তবে দরজা জানালার রঙ পচ্ছন্দ হল না ।বলল, দরজা জানালার রঙ যদি সাদা হত তবে বাড়িটা আরও সুন্দর লাগত। তিমি মাছের মত ঘন নীল রঙের যদি জানালা আর দরজার পর্দা দেয়া হত তবে ভাল হত। বাথরুমে যদি সুন্দর একটা আয়না আর পিতলের একটা বাথটাব দেয়া হত তবে দারুন হত।
বাঁধাকপির মত মোটা মহিলা চলে গেল।
ভদ্রমহিলার কথা মত বুড়ো বাড়ির দরজা জানালা সব সাদা রঙ করল। দরজা জানালাতে পর্দা দিল আবার বাথরুমের আয়না আর বাথটাব বসাল।
ছোট্ট একটা তাকে কিছু ঝিনুক আর সমুদ্রের প্রবাল সাজিয়ে রাখল।এখন অবশ্য বাড়িটা দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে।
পুরো বাড়িটা চেরি ফলের মত লাল আর দরজা গুলো মূলার মত সাদা।
দারুন।
টাক মাথা আর ভূরিওয়ালা এক লোক এসে হাজির হল বুড়োর বাড়িতে।
বলল,' আপনার বাড়ি আমিই কিনব ভাইসাব। চিন্তা করবেন না।তবে তার আগে বাড়ির দেয়াল গুলো নীল রঙ করাতে হবে ব্রাদার। যাকে বলে ব্লু।আমার লাকি রঙ।
‘জানালাতে হলুদ রঙ দিতে হবে ব্রাদার। যাকে বলে ইয়েলো।অনেকের কাছে রঙটা গু কালার মনে হলে ও আমার দারুন লাগে। লাইফ ইস ইয়েলো। দেয়ালে কয়েকটা দামি পেইন্টিং ঝোলাতে হবে ব্রাদার। তেলরঙের পেইন্টিং ।যাকে বলে অয়েল পেইন্টিং।ফিদা হুসেন বা পিকাসো চাচচুর হলে ভাল হত। যাক যা হয় যোগার করুন আর ঝুলিয়ে দিন। একটা মহিলার ছবি আছে না?সবার বাড়িতেই থাকে দেখি। আরে ওই যে গারমেনসের গাউনের মত একটা ড্রেস পরে হাত দুটো এই ভাবে করে বারান্দায় দাড়িয়ে থাকে...কি বললেন? মুতাহার ?ময়নালিসা ?ও মোনালিসা? হ্যাঁ। ঐ ভদ্রমহিলাকেও ঝুলিয়ে রাখবেন। মানে ভদ্রমহিলার একটা পেইন্টিং ও।টাকা পয়সা নিয়ে ভাববেন না। সব খরচ আমার। আরে ভাই আজ মরলে কাল দুই দিন ।মানে হল টুমরো নেভার ডাই।’
ভুরিওয়ালা চলে গেলেন।
ভুড়িওয়ালা লোকটার কথা মত বুড়ো তাই করতে লাগল।
একদিন হাজির হল এক লেখক। সে পাহাড়ি এলাকালয় বাড়ি কিনে নিরিবিলিতে লেখালেখি করবে।লেখক লোকটা বাঁটুল ধরনের। কালো আর চোখ দুটো গোল্লা গোল্লা । ঠিক যেন দইবড়ার মত।সে নাকি দারুন সব হরর গল্প লেখে। নিঝুম পরিবেশে বসলে আরও বেশি হরর গল্প লিখতে পারবে।
বুড়োর বাড়ি দেখে লেখক সাহেব বলল, ‘আপনার বাড়িটা ভালই। কিন্তুু আর ও একটু সম্পাদনা করতে হবে।’
‘সম্পাদনা ?’ খানিকটা হকচকিয়ে যায় বুড়ো।
‘মানে একটু মেরামত।’ বলল লেখক।
‘কিন্তু এই বাড়ি ত...।’ব্যাখা করতে গেল বুড়ো।
‘কোন কিন্তু নয়। বাধা দিল লেখক। ‘ দাম আমি বেশি দেব। কিন্তু বাড়িতে একটা ধুতরা গাছ ও তো নেই বুড়ো মিয়া। ব্যাপারটা কি ? গাছপালা যে আমাদের জন্য কত দরকারি তা জানেন? কবি কি বলেছেন জানেন?’
‘না জানি না।’ সত্য কথাই বলল বুড়ো।
‘কবি বলেছেন যত গাছ তত শ্বাস।’
‘কোন কবি বলেছেন ?’
‘বলেছেন কোন এক কবি।আপনি আমার লেখা আর সম্পাদনা করা বই গুলো পড়লে বুঝতে পারতেন গাছ আমদের জন্য কত দরকারি। গাছ আমাদের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দেয়।ছায়া দেয়।খাবার দেয়। আর কে দিতে পারবে এমন? আপনার প্রতিবেশি নেপাল বাবু দিতে পারবেন? একদম না।কাজেই এক কাজ করুন। বাড়ির আশেপাশে কিছু গাছ পালা লাগিয়ে ফেলুন।’
‘কি গাছ? ধুতরা?’ হতভম্ব ভাবে জানতে চাইল বুড়ো।
‘একটা হলেই হল। ‘উদাস ভাবে বলল লেখক। ‘বেদে আছে বিষবৃক্ষ ও মঙ্গলময়।আপনি নিশ্চয় বেওইব্যাব, পাইন, বা ক্যারাবিয়ান ম্যাপেল ট্রি পাবেন না? যা পাবেন তাই বুনে ফেলুন।নাকি? তো ঐ কথাই রইল?’
পরদিন বুড়ো আর বুড়ি মিলে বাড়ির আশেপাশের বেশ খানিকটা জায়গা কোদাল দিয়ে কুপিয়ে নরম করে ফেলল।তারপর নাসারি থেকে অনেক গুলো ফুলের চারা এনে পুঁতে ফেলল। ভুইচাঁপা, নয়নতারা,গোলাপ,টগর এই রকম হাবিজাবি নানান ফুলের গাছ।নিয়মিত পানি আর হরেক পদের সার দিতে লাগল।কয়েক দিনের মধ্যে সুন্দর বাগান তৈরি হয়ে গেল। রঙ্গিন ফুল ফুটল। কোথেকে কয়েকটা নাম না জানা রঙ বেরঙের পাখি এসে খড় কুটো দিয়ে নিজেদের জন্য দারুন সব বাসা বানিয়ে ফেলল।
বাড়িটা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল বুড়ো - বুড়ি। কী সুন্দর ই না লাগছে বাড়িটা।
তারপর একদিন ছুটির দিনে ,ঈদের আগের সকালে হাজির হল সেই লেখক, বাঁধাকপির মত মোটা মহিলা।শুকনো প্যাঁকাটির মত লম্বা লোকটা আর টাক মাথার সেই বিচ্ছিরি লোকটা যে কিনা পেইন্টিং পচ্ছন্দ করে।
‘কি ব্যাপার?’ থতমত খেয়ে গেল বুড়ো।
‘কি ব্যাপার মানে? ‘বিরক্ত হল প্যাঁকাটির মত লম্বা লোকটা।’ আমার বাড়ি আমি বুঝে নিতে এসেছি। এই নিন টাকা। নগদ আর ক্যাশ।’
লেখক বলল,’ আরে ভাই লেখালেখির জন্য বাড়িটা আমার দরকার। আপনারা আমার কাছ থেকে অনেক ভাল ভাল হরর গল্প পাবেন। নইলে সারা জীবন ছায়া অবলম্বনে লিখতে হবে।প্লিজ হরর সাহিত্যের কথা ভাবুন।’
টাক মাথার সেই বিচ্ছিরি লোকটা বলল, ‘আমার মত রুচিশীল মানুষের জন্যই এমন বাড়ি ।ওরা কি বুঝবে?ওরা তো সব পিচ্চিসরাসের বাচ্চা।’
বাঁধাকপির মত মোটা মহিলা মুখ ভর্তি পান নিয়ে কি বলছেন কে জানে।শুধু পানের পিচকি ছিটিয়ে সবার জামাকাপড় নষ্ট করছে।
মোট কথা সে এক বিতিকিছিরি অবস্থা।
‘দুত্তোরি ছাই।’ রেগে গেল বুড়ো। ‘বাড়িই বেচব না আমি।’
এই বলে নোটিশটা টেনে ছিড়ে ফেলে গটগট করে বাড়ির ভেতরে চলে গেল বুড়ো আর বুড়ি।
বুড়ো -বুড়ি এখন ও তাদের পুরনো বাড়িতেই থাকে।
জোসনা রাত গুলোতে চা আর বিস্কুট খেতে খেতে সারাক্ষণ বকবক করে ।ইশ কত কথা যে বলে।অযত্ন আর অবহেলা করলে কত সুন্দর জিনিস ও যে কুৎসিত আর বিদঘুঁটে হয়ে যায় কে না জানে।
আর এই বাড়িটা ওরা জীবনেও বিক্রি করবে না।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন