সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মাছটা বিপদ এনেছিল

 বিপদটা অমন বিচ্ছিরি রকমের হবে ভাবতে পারেনি  নীল।

মাছটা ছোট্ট।

দেখতে বেশ সুন্দর। সেইজন্যই তো  সমুদ্রের পার থেকে তুলে এনেছিল ওটা।

ঠিক দুপুরবেলা,  হেঁটে বাড়ি ফিরছিল।

সাগরে ভাঁটা চলছিল তখন  । জল চলে গেছে বহু দূরে। যেমনটা সব সময়  ভাঁটার টানে হয়।

 শুকনো ডাঙ্গায় পরেছিল কয়েকটা গুগলি  শামুক- ঝিনুক।  ছোট ছোট   কয়েকটা চুনা  পাথরের আড়ালে  সামান্য জলে বন্দি হয়েছিল মাছটা।

অস্বীকার করার উপায় নেই, পিচ্চি মাছটা  দেখতে খুবই সুন্দর । ঠিক যেন এক টুকরো  রামধনু।  দুপুরের জাফরানি রোদে  ঝিলিক দিচ্ছিল ক্ষণে ক্ষণে।

 নীল  একবার ভাবল, মাছটা তুলে সাগরে ছেড়ে দেবে নাকি। আবার মনে হল,   বাসায় যে  খালি কাঁচের  বাউলটা আছে,  ওটায় রেখে দিলে কাজের মত একটা কাজ হবে। বাবা যখন শহর থেকে ফিরবে,  তখন দেখে নিশ্চয় অবাক হয়ে যাবে। চশমার কাচ মুছতে মুছতে বলবে - ওটা আবার কেমন মাছ!

তারপর বিদেশি পত্রিকা ঘেঁটে বের করে ফেলবে মাছটার নাম। কি খায় , কেমন স্রোতে সাঁতার কাটে, দেশান্তরী হয় নাকি হয় না ?  সব ।  

পরিকল্পনা মত  প্লাস্টিকের একটা ব্যাগে করে  মাছটা  বাসায় নিয়ে এলো নীল।

 রান্নাঘর থেকে খুঁজে মুজে   কাঁচের  বাউলটা  যোগাড় করে  সেটায়  জল ভর্তি করে মাছটার জন্য থাকার ব্যবস্থা করে ফেলল। কিছু পাথরের টুকরো আর সুন্দর দেখে একটা প্রবাল দিয়ে সাজিয়ে ফেলল ,  যাতে মাছটা একঘেয়েমিতে  না ভুগে।

মাছটা কি খায় জানে না।

কাল দোকান থেকে মাছের খাবার কিনে আনবে। আপাতত আজ ময়দার বিস্কুট দিল। মাছটার মন খারাপ বা খিদে নেই। খাবার  ছুঁয়েও দেখল না।

দুপুর  গড়াতে না গড়াতে নীল ক্লাস্টার ভাইন ফুলের মত  আকাশটা গহন ঘন  মেঘে ছেয়ে গেল। স্লেট পাথরের মত  কালো কুচকুচে সেই  মেঘের রঙ ।  

  তারপর    কেমন একটা সাঁই সাঁই   ভেজা বাতাস বইতে লাগল। টুন টুন শব্দ হতে লাগল দূর সাগরের বয়াগুলো থেকে ।  

 চটপট করে  বন্দরে ফিরে এলো মাছ ধরার সব নৌকা।

তারপর   নামলো  ধুম  বৃষ্টি।

অমন বৃষ্টি আগে কক্ষনই দেখেনি নীল। এক একটা ফোঁটা ইয়া বড় বড়। টিনের কুচির মত।

  রাত আটটার দিকে  নীলের মা ফোন দিয়ে বাবাকে বলল-  ' শুনছো আমাদের এখানে ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছে। আশ্বিন মাসে অমন বৃষ্টি  আগে কখনও দেখিনি।'  

বাবা বলল ফোনের ওপাশ থেকে - ' সে কি , আমাদের শহরে  তো একফোঁটা বৃষ্টি নেই। একদম পাপঁড় ভাঁজার মত শুকনো। আবহাওয়ার মতিগতি বদলে গেছে  আসলে।'    

আরও কথা বলতো।

দূরে কড়াৎ  করে একটা  বাজ পড়তেই  লাইন কেটে গেল।

সারারাত বৃষ্টি হল। ঝমঝম করে।

জানালা দিয়ে বাইরে কয়েকবার তাকাল নীল। ওর জানালা দিয়ে সাগর দেখা যায়। উনুনে রাখা  চায়ের কেতলির জলের মত সাগরের জল ফুসছে। শো- শো গর্জনের ভেতরে  মনে  হলো ,  উঁচু গলায় কে যেন ডাকছে। মনের ভুল  হতে পারে।  ঝড় বৃষ্টির সময় অমন কান পাতলে মনে হয় নাম ধরে কেউ ডাকছে।

 সকাল  বেলা দুম করে থেমে গেল বৃষ্টি।

ঝলমলে রোদ উঠলো খানিক বাদেই  ।

মনেই হয় না কাল সারাটা রাত অমন বৃষ্টি হয়েছিল।

ইস্কুলে যাওয়ার জন্য বাইরে বের হতেই  কেমন একটা হৈ  চৈ  শুনতে পেল নীল। একগাদা লোক বেশ উত্তেজিত হয়ে কথা বলছে  ।

' কি ব্যাপার, এত  হাউকাউ কিসের ?'    পাশ দিয়ে গট গট করে হেঁটে যাচ্ছিল  মুদিদোকানের ছোকরা নেপাল। ওকে থামিয়ে জানতে  চাইল নীল।

' আর বল না নীলুদাদা।'   উত্তেজিত ভাবে বলল নেপাল।   ' মস্ত একটা কাণ্ড  হয়ে গেছে।'

' কী রকম কাণ্ড শুনি ?'

' বন্দরের   মাছের আড়তে কাল রাতে চোর এসেছিল  ।'  হাত পা নেড়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে বলতে লাগল নেপাল। ' সব মাছ চুরি হয়ে গেছে। একটা মাছ ও নেই। এটা কিভাবে সম্ভব ।  একদম অচিন কাণ্ড ।  অথচ দারোয়ান আত্মারাম বলছে কাল রাতে মানুষ তো দূরের কথা কোন বিড়াল পর্যন্ত আড়তের ভেতরে  ঢোকেনি। আর বিড়াল ঢুকলেও কি কয়েক ডজন ঝুড়ি ভর্তি মাছ খেয়ে ফেলতে পারবে ?  তাছাড়া সব মাছই ছিল বরফের কুচির মধ্যে। কিছু আবার গভীর ফ্রিজ মানে ডিপ ফ্রিজের মধ্যে । তো ?  যুক্তির মধ্যে তো সামান্য হলেও লজিক থাকতে হবে। নাকি ভুল বললাম ?  '

   

কথা শেষ করে নেপাল দৌড় দিল।

ওর নাকি কি কি  সব  কাজ আছে। দরকারি কাজ ।

হাঁটতে হাঁটতে  বন্দরের কাছে মাছের আড়তে চলে গেল নীল।

বিরাট হৈ চৈ।

একগাদা লোক।

 সবাই মিলে হাউ হাউ করে  কথা বলছে। সবাই রেগে আছে।   সবার  একই প্রশ্ন , এত মাছ চুরি হল কিভাবে ?

 দারোয়ান আত্মারাম বনিকের কোমরে দড়ি বেঁধে থানায় নিয়ে গেল পুলিশ। দড়িটা পাটের হলেও বেশ মোটা ।  সবার ধারনা  আত্মারাম চোরদের সাথে সপাৎ করে চুরির কাজটা করেছে।  বড় অঙ্কের ভাগ পাবে সেও ।

ফিকফিক করে কাঁদছে সে। বারবার বলছে- স্যার আমি নির্দোষ। ভগবান  সাক্ষী।

দারোগা কেমন বিটল মার্কা হাসি হেসে বলল- ভগবান আদালতে গিয়ে সাক্ষী দিলেই তোকে ছেড়ে দেব ।

ভ্যারাইটি শপ থেকে একটা জ্যামিতি বক্স আর  মাছের খাবার কিনে বাড়ি ফিরল নীল ।  

কাঁচের বাউলের ভেতরে মাছটা ঘুরে বেরাচ্ছে তখনও। সম্ভবত মন খারাপ। খাবার খেল না।

কি   কাণ্ড !

 সেই  বিকেলবেলা থেকে আবারও  ঝড়ো হাওয়া শুরু হল।

বাতাসের মতিগতি  ভয়ংকর ।

 দূরের গির্জার  পিতলের  ঘণ্টাটা  ঠং ঠং করে শব্দ করতে লাগল। শহরের সবাই জলদি জলদি যার যার  বাড়ি ফিরে গেল। চায়ের দোকান আর খাবারের দোকানের রোজকার আড্ডা বাতিল হয়ে গেল।

 এই বিচ্ছিরি মাছ চুরির ঘটনায় সবাই উত্তেজিত।

রাতের বেলা নীলের মনে হল সাগর থেকে শাঁখ বাজানর মত শব্দ হচ্ছে । খানিক পরপর।

সারারাত পাগলাটে  ঝড়ো হাওয়া  বয়ে গেল  ছোট্ট শহরটার উপর দিয়ে।  সবার বাড়ির শার্শি ঝনঝন করে কেঁপে উঠলো বারবার ।  

পরদিন সকালে বিরাট হৈ চৈ শুনে ঘুম ভাঙল নীলের।

আজ আবার কি হল ?

ঘটনাটা জানতে  দৌড়ে বাইরে   গেল  নীল।

সবজী বিক্রেতা জল্লাদ মিয়া  দাঁত বের করে হাসছিল।

' আজ আবার কি হয়েছে ?'  জানতে চাইল নীল।

' ঘটনা খুব  সিরিয়াস।'  মুখ ভর্তি দাঁত বের করে বলল জল্লাদ মিয়া। ' শহরের সব মাছ ধরার নৌকা  ডুবে গেছে কাল রাতে। সলিল সমাধি না সলিল সেন  কি যেন বলে ,  তাই।  আর এর জন্য দায়ী কাল রাতের ঝড়।'

' কিন্তু আপনি হাসছেন কেন ?'  অবাক হল নীল।

  ' নৌকা না থাকায়  মাছ ধরা হয়নি একটাও । ফলে আমার সবজী সব বিক্রি হয়ে গেছে।'  হাসি মুখে বলল জল্লাদ মিয়া।

খুশি মনে সে তার  ভ্যানের সবজিগুলোর উপরে জলের ছিটা দিয়ে স্নান করাতে লাগল। গোলাপি সাদা মূলা আর ক্যাম্প নাইফের মত শিমগুলো চকচক করে উঠল ।   

সারাটা দিন শহরের পরিস্থিতি রইল  গরম । তন্দুরের মত ।  

এই শহরে আগে কখনও অমন বিচ্ছিরি ঘটনা ঘটেনি। জেলে পাড়ায় কান্নাকাটি হচ্ছে। সবাই ডুব দিয়ে দিয়ে নৌকা তুলে আনছে জলের তলা থেকে।

বাড়ি ফিরে মন খারাপ করে বসে রইল নীল।

কি কাণ্ড,  আজ বিকেলে আবার ঝড় উঠলো।

  খানিক পর পর ফ্ল্যাশ লাইটের  আলো  মত বিদ্যুৎ ঝলসে উঠছে । বিছানায় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে শুয়ে নীলের মনে হতে লাগল কাল সকালেও  কোন বিচ্ছিরি ঘটনা ঘটবে।

ঘুম ঘুম চোখে  ওর  মনে হল,  দূরের সাগর থেকে তিমি মাছের গানের মত  সুর ভেসে আসছে। কি মনে হতে  কাঁচের বাউলের মাছটার দিকে চাইল নীল। মাছটা অস্থির ভাবে  সাঁতার কাটছে।

যা ভেবেছিল নীল।

সকাল বেলা দুধওয়ালা মাখনলালের কাছে অদ্ভুত একটা কথা শুনতে পেল নীল। কাল রাতে সাগর পারের সবগুলো রাস্তার লাইট আর রাস্তার পাশের সবগুলো ক্যাফে  রেস্টুরেন্টের    লাইট কোন দুষ্টুলোক ভেঙ্গে ফেলেছে। আজ দুপুরে মেয়রের আপিসে মীটিং হবে। শহরের সমস্ত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সেখানে  উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

গত কয়েকদিন ধরে ইস্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে।

 শহরের অবস্থা ভাল না।

কি মনে করে বাইরে চলে এলো নীল।

' কোথায় যাচ্ছিস ?'  পিছন থেকে মা জানতে চাইল।

' একটু ঘুরে আসি।'  জবাব দিয়ে বের হয়ে পড়লো  নীল ।

সাগর সৈকতের  একটা জায়গা খুব সুন্দর। ছক্কা ছক্কা    পাথরে  বাঁধানো  লম্বা একটা  পথ চলে গেছে শহরের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। বিকেলে বুড়োরা হাটে এই পথে। খুব ভোরে কেউ কেউ জগিং করে।

দুই পাশে   কতগুলো ল্যাম্পপোস্ট। কমলা রঙের আলো  জ্বলে  সন্ধ্যা থেকে  ভোর পর্যন্ত। আজ অবাক হয়ে নীল দেখল সবগুলো কাঁচের লণ্ঠন ভাঙ্গা। পাশে মাছ ভাঁজার দোকান, কফি শপ , ভ্যারাইটি শপ সবার লাইট ভাঙ্গা।

ভাবতে ভাবতে নীল হেঁটে যেতে লাগল।

শহরের শেষ প্রান্তে   খুবই  নিঃসঙ্গ একটা হলুদ রঙের বাড়ি।

বিচিত্র সব  পাথরের ব্লক দিয়ে বাড়িটা বানানো। টালির ছাদের  উপরে একটা টিনের মোরগ দাড়িয়ে আছে। হাওয়ানিশান।   বাতাস যে দিকে বয় সেইদিকে মুখ দিয়ে দাড়িয়ে থাকে টিনের মোরগ ।

বাড়ির ছাদে অনেকগুলো পিতল  আর অ্যালুমিনিয়ামের  কাঁসর আর ড্রাম ফিট করা। বৃষ্টি হলে  দারুন রকমের টুং টাং শব্দ হয়।  

বাড়ির বাইরে নেমপ্লেটে লেখা-

জাদুকর আলাউদ্দিন   ( আসাম ফেরত )

দরজায় ধাক্কা দিতেই খুলে গেল।

 জাদুকর আলাউদ্দিন  কখন দরজা বন্ধ  করে  না।

দরজার ওপাশে  বিশাল একটা কামরা। দেয়াল ভর্তি তাক। আর সেই তাক ভর্তি কাঁচের শিশি। শিশিতে কাগজ কেটে  দাগ দেয়া। ছোট্ট কাগজের  লেবেলে হাবিজাবি অনেক কথাই  লেখা। সম্ভবত দরকারি কথা ।   ভেতরে লাল -নীল- হলুদ-  সবুজ রঙের তরল ।

 উত্তর দিকের দেয়ালে  মস্ত গোল একটা  আয়না। ঠিক গোল না। পায়রার ডিমের মত।

একটা তেঁতুল কাঠের  টেবিল ,  উপরে তিব্বতি ভাষায় লেখা একটা পুঁথি।

 সবুজ রঙের পেল্লাই এক সোফার উপরে বসে আছে  বুড়ো একজন মানুষ। সবুজ সাদা ছিট  কাপড়ের আলখেল্লা আর পায়জামা পরনের। পায়ে  কাঠের  চপ্পল। মাথায় তিনকোনা কাপড়ের একটা টুপি। বুক পর্যন্ত লম্বা সাদা ধপধপে দাঁড়ি। সিরামিকের মস্ত এক  তশতরি ভর্তি করে  আইসক্রিম নিয়ে মজা করে খাচ্ছে  ।

' তুই আজকেও ইস্কুলে যাসনি ?'  অবাক হয়ে বলল বুড়ো।

' শহরের খবর টবর রাখেন না নাকি  ?'   মেঝে  বিছানো তুদ্রা অঞ্চলের চিতাবাঘের কার্পেটের উপর  বসতে বসতে বলল নীল।

' আমি বাইরে যাই না এক মাস হবে।'  শান্ত গলায় বলল বুড়ো। ' আয়নাতে আগে বাইরের সব কিচছু দেখতে পেতাম। এমনকি  ভবিষ্যৎ পর্যন্ত। আজকাল কিছুই দেখতে পাই না। আয়নায় ভেতরে দেখি ঘুঁটঘুঁটি অন্ধকার।'  

' কেন?'

 ' অভিশাপ। ছোট বেলায় ইস্কুলের স্যার  রেগে  বলেছিল তোর ভবিষৎ অন্ধকার। সেইজন্য বোধহয় । তুই কিছু খাবি   ?'   

' ভাল  পেস্ট্রি আছে ?'

' আমার কাছে খারাপ কিছু নেই।  যা বারান্দাতে একটা কাঠের সিন্দুক আছে। ভেতরে একটা জুতার বাক্সে পাবি।'

বুড়োর কথা মত তাই করল নীল।  

কাঠের সিন্দুকের ভেতরে  কাগজের একটা  জুতার  বাক্স। খুলতেই ভেতরে পেল চনমন করা  তেকোনা  পেল্লাই সাইজের একটা পেস্ট্রি। উপরে তিনপাল্লা ক্রিম দেয়া। তারও  উপরে আবার চকোলেটের মিহি কুঁচি । তারও উপরে আবার মার্বেলের সাইজের লাল টুকটুকে  একটা চেরি ।

বাইরে লেবু গাছে কয়েক বোতল ঠাণ্ডা লেবুর শরবত ঝুলছে।  দুটো বোতল নিয়ে এলো ।

খাওয়া শেষ হতেই গত কয়েকদিনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সব  বলল নীল।

' সাংঘাতিক ব্যাপার।'   আইসক্রিম খাওয়া শেষ করে নরম তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল বুড়ো। ' জাদুর বইটা আনতো টেবিলের উপর  থেকে। ওর ৭৬৪৯ পাতায় অমন একটা ঘটনা লেখা আছে।'

বুড়োর নির্দেশ পালন করলো নীল।

পাতা উল্টে খানিক বিড়বিড় করে পড়লো বুড়ো। তারপর বইটা সোফায় রেখে বলল- ' এই শহরের কারো বাড়িতে পাতালদেশের  রাজার ছেলে বন্দি হয়ে আছে। তাই রেগে গিয়ে  রাজা অমন করছে।'

চমকে গেল নীল।

 সে কি ?

' রামধনুর মত কোন মাছ আছে নাকি তোর  বাসায় ?'  ভুরু কুঁচকে বলল বুড়ো। ' ওটাকে ছেড়ে দে। ওর বাসায় সবার   মন খারাপ  হয়ে আছে  ওর জন্য। তবে রাতের বেলা গোপনে গিয়ে সাগরে ছেড়ে দিবি। যা এখন। আমার ঘুমুতে হবে । আইসক্রিম খাওয়ায় শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। পেটের ভেতরটা মনে হচ্ছে উত্তর মেরু ।  কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুম দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।এক সপ্তাহ ঘুমাব। কেউ বিরক্ত করলে ওকে জাদু দিয়ে কমলা বানিয়ে ফেলব।  '

 

 

রাতের বেলা নিজের কামরায় একা বসে আছে নীল।

বাইরে বৃষ্টি।

অবাক হয়ে কাঁচের বাউলের দিকে চেয়ে আছে। কি কাণ্ড ! অমন হয় নাকি? মাছের রাজার ছেলে এটা?

 

 ধীরে ধীরে রাত গভীর হল।

নীলের মনে হল  দূর থেকে   কে যেন হেঁটে আসছে  ওর বাড়ির দিকে। হালকা পায়ের শব্দ।

  লোকটা এসে দাঁড়ালো ওর জানালার বাইরে।

 নীল দেখল,   কোট টাই পড়া  মোটামত  এক  ভদ্রলোক দাড়িয়ে আছে।

ভয় পেয়ে গেল নীল।

 কে এই লোক?

চোর ডাকাত না তো ?

' এই খোকা তুমি আমার ছেলেকে ছেড়ে দাও। '  ফিসফিস করে বলল লোকটা। ' ওর মা ওর জন্য কাঁদছে। ও মাছ সেজে ঘুরতে গিয়ে বিপদে পড়েছে। সাগরে না ছাড়লে ও মাছ হয়েই বন্দি থাকবে। আমার ছেলেকে ছেড়ে দাও।'  

দৌড়ে গিয়ে কাঁচের বাউলটা লোকটার হাতে তুলে দিল নীল।

সামান্য একটু হেসে হাঁটা ধরল লোকটা।

হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রের দিকে চলে গেল ।

হালকা কুয়াশার মধ্যে মনে হল ভুল দেখছে নীল। দেখল,  লোকটার সাথে বাচ্চা একটা ছেলে  হাত ধরে হাঁটছে। বাচ্চাটার মাথায় হাত বুলিয়ে মাঝে  মাঝে আদর  করছে লোকটা। ঝুপ করে দুইজন নেমে পড়লো সাগরের জলে।

অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রইল নীল।

 

 

পরদিন মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙল নীলের।

 আবারও  ওদের শহরে অদ্ভুত সব  ঘটনা ঘটেছে।

কাল রাতে আড়তের সব মাছ   আবার ফিরে এসেছে।

 ভাঙ্গা লাইট সব , কারা  যেন মেরামত করে দিয়েছে।

হারানো নৌকাও পাওয়া গেছে সবার।

খুশি মনে উঠে পড়লো নীল।

  তবে একটা খারাপ খবর আছে ,   আজ ইস্কুল খোলা।

কাঁচের বাউলটা আর পাওয়া যায়নি।

মনে হয় পাতাল রাজার রাজপ্রাসাদে যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছে কেউ।

হতে পারে  না  অমনটা  ?  


মন্তব্যসমূহ