সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

স্বার্থপর দৈত্য

 --------------------

 দুপুরের পর ইশকুল ছুটি হয়।

বাইরে হলুদ রঙের রোদ । বেশ কড়া । পথের শেষ মাথায় নীল রঙের বড় একটা বাড়ি। সামনে পেল্লাই সাইজের একটা বাগান।

ইস্কুলের বাচ্চারা বাগানের ভেতরে ঢুকে খেলত।

বাগানটার বর্ণনা না দিয়ে পারছি না। আগেই বলেছি বিশাল। একদম খেলার মাঠের মত। ঘাসগুলো নরম। কার্পেটের মত। খেলতে গিয়ে পড়ে গেলে হাঁটু ছিলে যায় না।

নানা জায়গায় লেবুর ঘ্রানওয়ালা লম্বা ঘাস ছিল। ছিল অনেক আম গাছ। হাজারে বিজারে ফুলের গাছ। সারা মৌসুমে রঙ বে -রঙের ফুল ফুটে থাকতো।

একটা ফুল ছিল হলুদ আর সাদা। পাপড়িগুলো সাদা আর মাঝের অংশ হলুদ।একদম ডিম পোঁচের মত। মনে হয় বাগান ভর্তি একগাদা ডিমপোঁচ করে ফেলে রেখেছে কেউ।

পাকুড় গাছ ছিল এক ডজন। ছিল আরও নানা জাতের ফলের গাছ।

সারা বছরই ফল ঝুলে থাকতো। বেশির ভাগ পাকা ফল।

ব্যাপারটা ভাব একবার !

সেই ফলের লোভে সব গাছেই পাখী এসে বসতো। ওরা খাটুনি বাঁচানোর জন্য গাছেই ওদের বাড়ি বানিয়ে ফেলে। যাতে রোজ খাবারের খোঁজে যেতে না হয়।

ব্যাপারটা ঝামেলার। রোজ আপিসে যাবার মতই।

পাখীদের বাসাগুলো ও দেখার মতই। শুকনো ঘাস আর পাতা দিয়ে এত সুন্দর বাসা বানায় ওরা। সোনালী হলুদ বলের মত বাসাগুলো গাছের ডালে ঝুলে থাকে।

পরিবেশটা এত সুন্দর বলার মত না। পাখীরা খুশি। বাচ্চারাও খুশি। রোজ খেলতে আসে ওরা।

সমস্যা হল বাড়িটার মালিক একটা দৈত্য।

বেশির ভাগ বড় বড় বাড়ির মালিক খারাপ লোকজনই হয়।

এই নীল রঙের বাড়ির মালিক দৈত্যটাও খারাপ। খুব বদমেজাজি । হিংসুটে। আর স্বার্থপর।

দৈত্যটা আসলে বেড়াতে গিয়েছিল । প্রায় সাত বছর পর বাড়ি ফিরল সে।

এই সাত বছর নানান জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে সে। মাঝে আবার ওর এক বন্ধুর বিয়ের নিমন্ত্রণ ছিল। টানা তিন মাস খাওয়া দাওয়া হয়েছে।

ভেড়ার রোষ্ট, গমের রুটি আর পনিরের সালাদ। সাথে বালতি ভর্তি রুহ আফজা।

বেশ জম্পেস খাওয়া দাওয়া।

দৈত্যদের ব্যাপার স্যাপারই আলাদা।

বাড়ি ফেরার আনন্দে মশগুল দৈত্য।

নাহ। কয়েকটা দিন বিশ্রাম নিতে হবে বাসায় বসে থেকে।

বারান্দায় বসে বসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পগুছ পড়বে। চা খাবে এক বালতি করে। আর বিশ্রাম নেবে।

বিশ্রামের চেয়ে দরকারি কিছু নেই।

বাড়ির কাছা কাছি আসতেই চোখ গোল্লা গোল্লা হয়ে গেল দৈত্যটার।

একগাদা পিচ্চি বাচ্চা বাগানে খেলছে।

' ঐ তোরা এখানে কি করছিস ? অ্যা ?' রাগে চিৎকার করে উঠলো দৈত্য।

' ধরতে পারলেই টেঙরি লুলা করে দেব। "

বাচ্চারা দৈত্যকে দেখে ভয় পেয়ে গেল। টেঙরি লুলা শব্দটা শুনে আরও বেশি ভয় পেয়ে গেল।

খিঁচে দৌড়ে ভেগে গেল ওরা।

সবাই।




বাচ্চাগুলো কত ফাজিল। মনে মনে ভাবল দৈত্যটা। কয়েকদিন ছিলাম না তাই এই অবস্থা। আর আমার বাগান তো সরকারী খেলার মাঠ না। ব্যবস্থা নিতেই হবে। এর পরে যে খেলতে আসবে তাকেই ধরে রাম প্যাঁদানি দেব। আরে ভাই বাসায় বসে ভিডিও গেইম খেল। অন্যের বাগানে ঢুকে খেলার দরকার কি ?'

পরদিন ইয়া বড় একটা সাইনবোর্ড বানিয়ে আনল দৈত্যটা।

বড় বড় করে লেখা-

বাগানে প্রবেশ নিষেধ।

বাচ্চারা খেলতে আসলে ধরে শাস্তি দেয়া হবে।

শাস্তি নাম্বার এক - আমগাছের ডালে উল্টো করে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হবে।

শাস্তি নাম্বার দুই - গাছের সাথে হাত পা বেঁধে মৌমাছির চাকের ঢিল দেয়া হবে।

শাস্তি নাম্বার তিন- সারা শরীরে গাব গাছের আঠা মাখিয়ে ডেয়ো পিঁপড়ের বাসা ভেঙ্গে

শরীরে লাগিয়ে দেয়া হবে।

হেন তেন। অমন আরও অনেকগুলো শাস্তির কথা লেখা আছে।

কারন আগেই বলেছি সে স্বার্থপর আর বদমেজাজি দৈত্য।

ইয়া বড় বড় পেরেক ঠুকে সাইনবোর্ডটা বাগানের বাইরে টাঙ্গিয়ে দেয়ার পর মনে মনে বেশ শান্তি পেল সে।

এবার দেখি কে আসে আমার বাগানে । ভাবল সে।

সমস্যা হল বাচ্চাদের খেলার জন্য আর কোন জায়গা রইলো না।

ওরা রাস্তায় খেলা শুরু করলো।

রাস্তার অবস্থা কেরোসিন। ধুলায় ভর্তি। বড় বড় গর্ত। আবার নুড়ি পাথরে ভর্তি।

প্রথম দিনই খেলতে গিয়ে একজনের হাঁটু আর কনুইয়ের চামড়া ছিলে মোরব্বা হয়ে গেল।

আরেক জন উপুর হয়ে পরে কপালে ব্যাথা পেয়ে জায়গাটা হাঁসের ডিমের মত ফুলিয়ে ফেলল।

নাহ।

রাস্তায় খেলা ওরা পছন্দ করছে না।

ধুর।বাগানটাই ভাল ছিল। ওরা বলাবলি করতে লাগলো নিজেদের মধ্যে।

কিন্তু বাগানে গিয়ে খেলবে সেই সাহস নেই কারও।

দিন কেটে যেতে লাগল। যেমন যায় আর কি।

শীত শেষ হয়ে বসন্ত ঋতু চলে এলো। শহরেরে সব কটা গাছে নতুন পাতা গজাল।

আম গাছে হলুদ মুকুল ধরল। সব বুনো ফুলের গাছে রঙ বেরঙের বাহারি ফুল ধরল।

হরেক রকম পাখী এসে কিচির মিচির করে মস্ত কোলাহল শুরু করলো।

কি এক অদ্ভুত কারনে দৈত্যটার বাগানে অমন কিছুই হল না।

ঐ বাগানের সব গাছের পাতা বিবর্ণ। একটাও নতুন ফুল নেই। আজব ব্যাপার পাখী ও

ডাকে না।

' বেশ কাণ্ড তো।' মনে মনে বিরক্ত হল দৈত্য। ' কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না।বাগানে আবার কি সমস্যা হল ? সার টার দিতে হবে নাকি গাছ পালায় ? '

দৈত্যটা কয়েকদিন অপেক্ষা করলো। নাহ কোন পরিবর্তন নেই। নিজেই বড় একটা কোদাল দিয়ে দিয়ে বাগানের মাটি আলগা করে দিল কুপিয়ে কুপিয়ে। মাঠে সারাদিন  গোবর কুড়িয়ে আনল। সেই গোবর সার হিসাবে দিল গাছের গোঁড়ায়।

লাভ হল না।

শেষে এক বাগান বিশেষজ্ঞকে ফোন দিল।

পরদিন দৈত্যটা বাগানে বসে চা খচ্ছিল তখন বাগান বিশেষজ্ঞ সাহেব এসে হাজির হল।

লোকটা বেশ বুড়ো। মাথায় টাক। শুধু কানের দুই পাশে শিমুল তুলার মত দুই খাবলা চুল আছে। চোখে চশমা। চশমার কাচ এত মোটা যে মনে হয় বোতলের তলা দিয়ে বানানো।

ল্যাগ ব্যাগে একটা প্যান্ট পরে আছে। গলায় টাই।

' আপনার বাগানের অবস্থা তো খুব খারাপ।' বাগানটা ভাল করে দেখে বলল বুড়ো বাগান বিশেষজ্ঞ।

'সেই জন্যই তো আপনাকে ডেকে এনেছি।' বিরক্ত হয়ে বলল দৈত্য।

'ডেকে এনে ভুল করেননি।' চালবাজির সুরে বলল বুড়ো। ' আসলে বাগান করার আগে জানা দরকার বাগান কি ? কত প্রকার ও কি কি ? হাবিজাবি গাছ বুনেই যদি ভাবেন খালাস তবেই মুশকিল। এই যেমন এই গাছটার কথাই ধরুন। দেখেই বুঝা যায় আপনি নিয়মিত পানি দেননি গাছটায় । কি ঠিক বলেছি না ?'

দৈত্য কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। মাথা নেড়ে বলল- ' হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন।'

' এক মুঠো সার ও দেননি ? তাই না ? ' ফিচেল মার্কা হাসি হেসে বলল বুড়ো গাছ বিশেষজ্ঞ।

' তাও ঠিক ? ' আমতা আমতা করে স্বীকার করলো দৈত্য।

' তবেই বুঝুন ? এই জন্য এই গাছে একটাও আম ধরেনি । ' উৎসাহের সাথে বলল গাছ বিশেষজ্ঞ।' অথচ আপনি যদি নিয়মিত পানি দিতেন । সার দিতেন। নিড়ানি দিয়ে গাছের গোঁড়ার মাটি আলগা করে দিতেন তবে এই গাছে হাজারে হাজারে আম ধরে থাকতো।'

' হাজারে হাজারে আম ধরত ?' চোখ বড় বড় হয়ে গেল দৈত্যের।

' শুধু হাজারে হাজারে না লাখে লাখে । দুধ দিয়ে আমের ম্যাঙ্গো সেক বানিয়ে খেতে পারতেন। বসে বসে লাল চা খেতে হত না।'

'আপনি নিশ্চিত এমন করলে এই গাছে লক্ষ লক্ষ আম ধরত ?' অবাক হয়ে বলল দৈত্য।

' আমি হানড্রেট পারসেনট নিশ্চিত ।' বুক ঠুকে বলল বুড়ো।

ধীরে ধীরে বালতির চা শেষ করলো দৈত্য।

শান্ত গলায় বলল- 'ভাই লক্ষ লক্ষ না। এই গাছে মাত্র একটা আম হলেই আমি অবাক হব। কারন এটা আম গাছ না। বট গাছ।'   

দৈত্যর কথা শুনে গাছ বিশেষজ্ঞ বুড়ো লোকটার চেহারা কেমন যেন শুকনো হরতকির মত হয়ে গেল।

কিছু না বলে হন হন করে হেঁটে চলে গেল ।

বাগানে একা বসে রইলো দৈত্য। মন খারাপ।

পরের কয়েকটা দিন পড়ার রুমে বসে প্রচুর বই পত্র ঘাঁটল।

সব গাছপালা নিয়ে। যেমন- জানতে হলে গাছ গাছালি।সব গাছ চলে গেছে । এমন কি মাত্র ৩০ দিনে বাগান করবেন কি করে ‘  এই বইটার এক কপিও কিনে আনল সে।

সারা দিন রাত পড়লো। পেন্সিল দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ দাগ দিয়ে রাখল।

কিন্তু বাগানের কি সমস্যা সেটাই বুঝতে পারলো না।

এক সকালে বিছানায় শুয়ে ঘুমাচ্ছিল দৈত্য।

আধো ঘুমের মধ্যেই শুনতে পেল বাগান থেকে অদ্ভুত মিষ্টি একটা সুর ভেসে আসছে।

যেন কোন পাখী ডাকছে। এমন সুন্দর পাখীর ডাক জীবনেও শোনেনি সে।

আহা কত দিন পর পাখী ডাকল বাগানে। ঘুম ঘুম চোখে চেয়ে দেখল জানালার বাইরে ঘুলঘুলিতে গোলগাল কমলা রঙের একটা পাখী বসে আছে।

' এই রে বসন্ত এসে গেছে শেষ পযন্ত। ' মনে মনে খুশি হয়ে উঠলো দৈত্য।

লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নামলো সে।

কমলা রঙের পাখিটা ভয় পেয়ে ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল দৈত্য।



হতাশ হল। বাগানে একটা ফুল ও ফোটেনি। একটা নতুন পাতাও হয়নি গাছে। একটা পাখীও নেই। একটা প্রজাপতি ও দেখা যাচ্ছে না।

 শুধু বাও কুড়ানি হাওয়াতে শুকনো পাতাগুলো খস খস করে গড়িয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে।

মনটা খারাপ হয়ে গেল দৈত্যের।

জামা পড়ে বাইরে চলে এলো।

বাইরে হলুদ রঙের বসন্ত। হাওয়া বইছে ক্যারাবিয়ান দ্বীপের মত। রাংতার মত চকচক করছে চারিদিক।

বাড়ির গেটের বাইরে বুড়ো একটা লোক দাঁড়িয়ে শন পাপড়ি বিক্রি করছে।

বুড়োর মুখ ভর্তি লম্বা চুল আর দাঁড়ি। গায়ে সাদা রঙের ঢোলা আলখেল্লা।

পায়ে কাঠের খড়ম। সামনে পিতলের থালা। ওটা ভর্তি সাদা শন পাপড়ি।

গুন গুন করে গান গাইছে বুড়ো-

বসন্তের এই মাতাল সমীরণে।

আজ জোসনা রাতে সবাই গেছে বনে।

' দুপুর বেলা জোসনার গান ? ' বিরক্ত হল দৈত্য।

' আসলে ভাই মুড এসে গিয়েছিল।' অনাবিল হাসি দিয়ে বলল বুড়ো।' মাত্র সুরটা মাথায় এলো। তাই ভেঁজে নিচ্ছিলাম। পরে লিখে ফেলব।'

'আপনি শন পাপড়ি বিক্রি করেন না গান লিখেন ?' অবাক হল দৈত্য।

' দুটোই ভাই। আমার নাম রবি। পুরো নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জোড়া সাঁকোতে ঠাকুর বাড়িতে থাকি। নাম শুনেছেন ? '

' জীবনের প্রথম শুনলাম।' আরও বিরক্ত হল দৈত্য। ' সাঁকো বার বার ভেঙ্গে যায় বলে জোড়া সাঁকো বানিয়েছেন ? আর এত লম্বা দাঁড়ি রেখে কেউ শন পাপড়ি বিক্রি করে ? আমি তো মিয়া ধরতেই পারছি না কোনটা শনপাপড়ি আর কোনটা আপনার দাঁড়ি ।'

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেমন থতমত খেয়ে গেল।

দৈত্যটা আরও কিছু বলতো।

কিন্তু হঠাৎ তার চোখ চলে গেছে বাড়ির দেয়ালের দিকে। বেশ খানিক দূরে দেয়াল খানিক ভাঙ্গা। ওখান দিয়েই বাগানের একটা আম গাছ তার ডালপালা বের করে দিয়েছে।

ঠিক ঐ গাছেই দুই তিনটে বাচ্চা বসে আছে।

আর কি অদ্ভুত কাণ্ড। এত বড় বাগানের শুধু ঐ গাছটায় বাংলা সংখ্যা ৫ -এর মত ছোট ছোট আম ধরে আছে। গাছটার ডাল আর পাতা বাতাসে নড়ছে। সব পাতা টিয়া পাখীর পালকের মত সবুজ। উজ্জ্বল।

বাচ্চারা সেই কচি আম পেড়ে মুখে দিচ্ছে। খাচ্ছে। হাসছে ওরা। খুশি। এই একটা গাছের ডালে বসে আছে রঙ বেরঙের পাখী। শিস দিচ্ছে।

ঐ গাছের নীচে ঘাসগুলো একদম তাজা। সবুজ।

কি অদ্ভুত !

দেয়ালের বাইরে একটা পিচ্চি বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে। সে দেয়াল উঠতে চায়।

পারছে না। একদম ছোট তো। আম গাছটা তার ডাল পালা ঝাঁকিয়ে সামনে নিয়ে আসছে

বার বার।

ফাল্গুনী বাতাস হাহাকার করে বলছে- গাছে উঠ খোকা। গাছে উঠ...

কিছু বাচ্চাটা পারছে না।

একদম ছোট তো।

মুহূর্তেই দৈত্যটার মন নরম হয়ে গেল।

আহা। আমি কত বড় স্বার্থপর। হিংসুটে। এই জন্যই তো বসন্ত আর আসে না আমার বাগানে।

ভাবল সে।




' আহা, মি বরং দৌড়ে পিচ্চি বাচ্চাটাকে গাছে তুলে দেই। কি খুশিই না হবে।

এখন থেকে আমার বাগান বাচ্চাদের খেলার জায়গা হবে। কোন বাঁধাই নেই।'

মনে মনে ভাবল দৈত্য।

নিজের কাজের জন্য দুঃখিত সে।

দৌড়ে গেল বাচ্চাটাকে সাহায়্য করার জন্য।

বাচ্চাগুলো যখন দেখল দৈত্য তাদের দিকে দৌড়ে আসছে সবাই ভয় পেয়ে গাছ থেকে নেমে দিল দৌড়।

আর কি অদ্ভুত , বাচ্চাগুলো দৌড়ে পালানোর সাথে সাথে আমগাছটা আবার বিবর্ণ হয়ে গেল। পাখী উড়ে গেল।

একদম পিচ্চি বাচ্চাটা দৌড়ে পালাতে পারেনি। ভয়ে ওর হাত পা জমে গেছে।

দুই চোখে আতঙ্ক।



দৈত্যটা ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। হাত বাড়িয়ে পরম মমতায় তুলে নিয়ে বসিয়ে দিল গাছের ডালে।

সাথে সাথেই গাছের ডালে এসে বলল কয়েকটা পাখী। গান গাইতে লাগল।

পিচ্চি বাচ্চাটা দৈত্যের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। ওর দুই চোখে খুশি। ভয় কেটে গেছে।

হাসছে ফোকলা মুখে।

দূর থেকে অন্য বাচ্চারা দেখল দৈত্য কোন ক্ষতি করছে না তখন ওরা ফিরে এলো গুঁটিগুঁটি পায়ে।

জানতে চাইলো গাছে উঠবে নাকি।

দৈত্য নিজেই ওদের গাছে তুলে দিল।

সাথে সাথে বসন্ত চলে এলো বাগানে।

ঠিক আগের মত।



' আজ থেকে এই বাগান তোমাদের। কেউ বাঁধা দেবে না।' বলল দৈত্য।

গট গট করে হেঁটে গিয়ে ধিমাই করে এক ঘুষি মেরে সাইনবোর্ডটা ভেঙ্গে ফেলল সে।

সেই রোদেলা দুপুরে পথচারী যারাই হেঁটে যাচ্ছিল সবাই দেখতে পেল একগাদা বাচ্চা

বাগানে খেলাধুলা করছে।

সাথে দৈত্যটাও।

খুব সুন্দর একটা দৃশ্য।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে গেল।

খেলা শেষ করে দৈত্য অবাক হল- ' আরে সেই পিচ্চি বাচ্চাটা কই ? একদম পিচ্চি যেটা । আমি প্রথম যাকে গাছে তুলে দিলাম।'

' কই দেখিনি তো ।' অন্য সব বাচ্চারা বলল।' বোধ হয় অনেক আগেই চলে গেছে। আমরা খেয়াল করিনি।'

' দেখা হলে কাল ওকে আসতে বলবে।ভয়ের কিছু নেই। '

' কিন্তু আমরা তো জানি না সেই পিচ্চি কোথায় থাকে। বাসা চিনি না পিচ্চির।'

অন্য বাচ্চারা জানালও।

শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল দৈত্যের।

এর পর থেকে রোজ দুপুরেই ইশকুল ছুটির পর বাচ্চারা খেলতে আসতো। কোন ভয় ছিল না। বিকেল গড়িয়ে আকাশ যখন কমলা রঙ হয়ে যেত তখনও খেলত ওরা।

কিন্তু সেই পিচ্চি বাচ্চাটা আর কখনই খেলতে আসত না। দৈত্য রোজই বাগানে গিয়ে খোঁজ নিত। নাহ। আর আসেনি পিচ্চিটা ।

কোথায় গেল ? মনে মনে ভাবতো দৈত্যটা। পিচ্চিটা ছিল তার প্রথম বন্ধু। অন্য সব বাচ্চাদের কাছে খোঁজ নিত। কেউ জানে না।

এইদিকে সময় গড়িয়ে বছর চলে গেল।

দৈত্যটা বুড়ো হয়ে গেল। শরীর দুর্বল। আগের মত বাগানে গিয়ে বাচ্চাদের সাথে খেলতে পারে না।

সারাদিন বারান্দায় বসে বসে পঞ্জিকা পড়ে।

মাঝে মাঝে বাগানের দিকে চেয়ে দেখে সে।

বাচ্চারা খেলছে।

বাগান ভর্তি ফুল।

নিজের বাগান নিয়ে খুশি এখন দৈত্য।

' ছোট ছোট বাচ্চা ছাড়া বাগান ঠিক জমে না।' ভাবল সে।

এক শীতের সকালে বাগানের দিয়ে তাকিয়ে ছিল। এখন সে শীত অপছন্দ করে না। জানে। শীতের পরই বসন্ত আসবে। আর শীতকালে গাছপালা ঘুমায়।

গাছের ও ঘুম দরকার।

বাগানের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে চমকে উঠলো দৈত্য। চোখ কচলে আবার তাকালো।

বাগানের এক কোনে একটা গাছ ফুলে ফুলে ভর্তি। সাদা অদ্ভুত রকমের একটা ফুল ছেয়ে আছে গাছটায়। গাছের পাতাগুলো সোনালী । রুপালী রঙের আপেলের মত ফল ভর্তি।

আর সেই গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছে সেই পিচ্চি বাচ্চাটা। যাকে বছরের পর বছর খুজেছে

দৈত্য।

পাগলের মত দৌড়ে গেল দৈত্য।

পিচ্চি তখনও গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে।

ওর দুই হাতের তালুতে পেরেক ফুটে আছে। দুই পায়েও পেরেকের দাগ। রক্ত বের হচ্ছে।

দেখে দৈত্যটা রাগে চিৎকার করে উঠলো।' তোমার এই অবস্থা কে করেছে ? আমাকে বল। আমার কাছে মস্ত বড় একটা তলোয়ার আছে। ব্যাটাকে এক্ষণই গিয়ে মেরে  আসব।'

' নাহ।' বিষণ্ণ ভাবে মাথা নাড়ল ছোট বাচ্চাটা।' কেউ মারেনি আমাকে। এটা পৃথিবীর

মানুষের ভালবাসা । '

এক লহমায় দৈত্যটা সব বুঝে ফেলল।

' তুমি একদিন আমাকে তোমার বাগানে খেলতে দিয়েছিলে।' বলল ছোট বাচ্চাটা।

' আজ আমি তোমাকে আমার বাগানে খেলতে নিয়ে যাব। বহু দূরের পথ সেটা। স্বর্গে।

চল আমার সাথে। '

পরদিন একগাদা ছোট বাচ্চা খেলতে এসে দেখে বড় ঝাঁকড়া এক গাছের তলায় দৈত্যটা

শুয়ে আছে। মারা গেছে । চেহারায় এখনও হাসি লেগে আছে।

মুঠো মুঠো সাদা রঙের ফুল পরে ঢেকে ফেলেছে দৈত্যটার সারা শরীর।

অমন ফুল আগে ওরা কখনও দেখেনি।

( অস্কার ওয়াইল্ডের THE SELFISH GIANT - এর  অবলম্বনে)

মন্তব্যসমূহ