সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রোবট রোবট খেলা

 রোবট রোবট খেলা

----------------------

বিকেল বেলা হাতেম আলী    হাঁটতে বের হলেন ।

 যদিও বিকেল , কিন্তু  সূর্য  ডুবে গেছে। ঘন  কমলা একটা আভা রয়েছে।   হুর মুড় করে অন্ধকার নেমে যাবে যে কোন সময়।

হাওয়া বইছে বেশ।

বাতাসে লাল বালি উড়ছে। ঝুন ঝুন করে গিয়ে জমা হচ্ছে পথের ধারে।    কেমন পিচ্চি ঢিবির মত হয়ে যায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ।  সরকারি লোক এসে পরদিন সকালে   বালি পরিষ্কার না করলে চলা মুশকিল হয়ে যায়।

কালো পিচের পথ চলে গেছে সামনে।

 দুই পাশে লাল  পাথর ছড়ান।

 নানান সাইজের। বড়, ছোট। গাছপালা বা ঘাস নেই।   নেই লতা গুল্ম ।   বাতিল লোহার টুকরো আর হাবিজাবি ছড়িয়ে আছে। আগে  যারা বসতি গড়েছিল তাদের জিনিস ? নাকি পরে পৃথিবীর মানুষদের ফেলা আবর্জনা , কে জানে ?

হাঁটতে হাঁটতে   মনে হল  খানিক দূরে  স্তূপ হয়ে পরে থাকা লোহার জঞ্জালের মধ্যে কি যেন একটা নড়ছে। হাতেম আলীর  শব্দ শুনে ওটা ঝুপ করে বসে পড়ল।

ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। হায় হায়। ওরা আছে এখনও । যদি আক্রমণ করে বসে ?

দ্রুত হেঁটে গেলেন। দমকা বাতাসে বালি উড়ছে। রাতে ঝড় হবে নাকি ?

রাস্তার শেষ মাথায় একটা ক্যাফে। নিয়ন সাইন জ্বলছে। নইলে বুঝা যেত বন্ধ। কোন খদ্দের নেই। বাইরের  বারান্দায় এক লোক বসে রেডিও শুনছে।  ওটাই  ক্যাফের মালিক  রুস্তম শেখ।

হাতেম আলীকে দেখে হাসল রুস্তম ।  খুশি।  

নতুন এসেছেন নাকি  ? কবে এলেন ?’ জানতে চাইল ক্যাফের মালিক ।

গত পরশু। তবে আজই আপনার দোকানে এলাম।

হ্যাঁ অনেক দিন পর   নতুন   কাউকে দেখলাম। আমি রুস্তম। আপনি বোধ হয় হাতেম ভাই । কৃষিবিদ। ’  

ঠিক ধরেছেন। আপনি কত বছর ?’

বিশ বছর। মঙ্গলের প্রথম দিকের বাসিন্দা।

ভাল লাগে?’

অভ্যাস হয়ে গেছে।

একা ? না পরিবার সহ ?’

গিন্নি ছিল। মারা গেছে। আমি পৃথিবীতে আর ফিরে যাইনি।

মন খারাপ হয় ?’

মোটেই না। এখানে কত নিরিবিলি । ভাল আছি।

ক্যাফে  কেমন চলে ?’

একা মানুষ । হয়ে যায়। কি দেব ? চা ?’

ঘাসের নাকি  কী একটা   শরবত পাওয়া যায়  ?  মঙ্গলের খনিজ জল   মেশান।

হ্যাঁ, চেখে দেখতে পারেন। ভাল চলে।

  বারান্দায় বসে পড়লেন হাতেম আলী।  

ব্যস্ত হয়ে পড়ল রুস্তম শেখ।  ফ্রিজ  থেকে টুথ  পেস্টের  টিউবের  মত লম্বা    একটা টিউব বের করে  ধরিয়ে দিল হাতেম আলীর হাতে।

গ্লাসে দেই না।ব্যাখ্যা করলো  রুস্তম। বরফ দিতে হয় অতিরিক্ত।  আবার কাস্টমার খাওয়া শেষ করলে গ্লাস ধোয়ার জন্য জল  খরচ হয়। খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি ।  

সমস্যা নেই।হাসি মুখে টিউবে মুখ দিল। মুখ ভরে গেল তরল  শীতল পানীয়। দারুন তো ।

আসলেই।

কেমন ঘাস ?’

ঐ আরকি, মঙ্গলে  জন্মায়  । দূরের পাহাড়গুলো দেখছেন না ? ওর উপত্যাকায়  হয় । মঙ্গলের বাসিন্দারা  এর চাষ করতো।’  

আদি বাসিন্দারা কেউ বেঁচে আছে ?’

নাহ। ওরা কেউ নেই। আমরা প্রথম জীবাণু বোমা ফেলেছিলাম।  সবাই মারা যাবার পর পৃথিবীর নভোচারীরা নেমেছিল।  তারপরই তো গ্রহটা দখল করা  হল।  

কিন্তু আমার মনে হয় কেউ কেউ  হয়তো আছে বেঁচে।

অসম্ভব।

এখানে আসার আগেই মনে হল। ঐ লোহার আবর্জনায় দেখেছি কাউকে যেন।  আমাকে দেখে পালিয়ে গেল যেন ।

আরে অহ। আচ্ছা। ওরা মঙ্গলের বাতিল রোবট।

মানে কি ? মঙ্গলবাসীদের রোবট এখনও টিকে আছে ।  

হ্যাঁ। জীবাণু বোমায় সব  মঙ্গলবাসী মারা গিয়েছিল। ওদের সবার বাড়িতেই একটা  দুটো  করে রোবট ছিল। পৃথিবীর নভোচারীরা বোমা ফেলার ৫০ বছর পর এখানে নেমে দেখে  ধ্বংস স্তূপের মধ্যে ভূতের মত হেঁটে বেড়াচ্ছে একদল  রোবট। বৈরী পরিবেশেও ওরা নষ্ট হয়নি। নিজেদের নিজেরাই মেরামত করতো। সূর্যের আলোতে ব্যাটারি চার্জ করতো। পৃথিবীর নভোচারীরা নেমেই ওদের ধ্বংস করতে লাগল। যদিও  ওরা  বিপদজনক না। আমাদের জন্য হুমকি না। তারপরও।

তো,  কুড়ি বছর পরও ওরা টিকে আছে কি ভাবে।খালি টিউবটা টেবিলের উপর নামিয়ে রাখতে রাখতে বললেন হাতেম আলী। আরেকটা নেবেন কি না ভাবছেন।

‘  নিজেদের নিজেরা মেরামত করতে পারে ওরা। সারাদিন রোদে রোদে ঘুরে বেড়ায়। লোহা লক্কড়ের জঞ্জাল থেকে পছন্দসই লোহা  আর ধাতব টুকরো খুঁজে নিজেদের  মেরামত করে। বালি থেকে সিলিকন যোগার করে পজিট্রন ব্রেইন বানায়।   নতুন নতুন রোবট বানায়। দল ভারি করে।

কোন ব্যবস্থা নেয় না  কতৃপক্ষ ?’

‘  ওরা আক্রমণ করে না তো। তারপরও  আমাদের একদল রোবট বাহিনি আছে। ঘুরে বেড়ায়।  ওদের পেলেই আক্রমণ করে টুকরো টুকরো করে ফেলে। চলছেই এই খেলা।

কিন্তু  যন্ত্রপাতির বিবর্তন হতে পারে ।  ওরা যদি আরও চালাক হয়।  ওরা নিজেদের মেরামত করে  প্রমাণ করেছে যথেষ্ট চালাক। যদি সংগঠিত হয়ে আক্রমণ করে ? ’

সেই ভয় নেই।গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল রুস্তম শেখ।   আমাদের একটা পরিকল্পনা আছে। প্রচুর  নীল ভায়োলেট  ফুলের চাষ করা হচ্ছে আজকাল। এই ফুল শেয়ালকাঁটা গাছের মত। রুক্ষ জায়গায় হয়। বেশি অক্সিজেন দেয়।  বাতাস আদ্র বানায়।   কয়েক বছরের মধ্যে  মঙ্গলের  বাতাসে অক্সিজেন বেড়ে যাবে। একদম পৃথিবীর মত।  বৃষ্টি ও হবে  ঘন ঘন।  তখন সহজেই মরচে ধরা শুরু করবে ওদের শরীরে। মরচে মেরামত করতে পারে না বোকাগুলো। সব ক্ষয় হয়ে যাবে একটু একটু করে।।

খ্যাক খ্যাক করে হেসে ফেলল রুস্তম শেখ। যাই, রেডিওটা শুনি । রাতে বালি ঝড় শুরু হবে কয়টায় দেখি।  

বাইরে তাকালেন হাতেম আলী। দূরে বাতিল কয়েকটা স্পেসশিপ পরে আছে।

ভাঙ্গা। বিবর্ণ। ওখানে পা দুলিয়ে বসে আছে একটা রোবট। কেমন বিষণ্ণ হাব ভাব। হাতে  নীল  রঙের অচেনা ফুল।


মন্তব্যসমূহ