১
কাচের বয়ামে কয়েকটা সূর্যমুখী ফুল। দেখেই মনটা ভাল হয়ে গেল ।
আরেকটা বেঁটে- বাঁটুল বয়ামে এক মুঠো ঘাস বিজন । ঘাস, কেউ জল দিয়ে বয়ামে রাখে ? আগে দেখিনি । অচিন শিল্পকলার মত ।
বেশ লাগছে তো !
দোতলায় আমার কামরা ।
একজনের তুলনায় বেশ আয়েশি ।
পেল্লাই এক বারান্দা । কাচা হলুদ রঙের রোদ এসে পড়ছে অকৃপণ ভাবে । প্রকৃতি হাসি মুখেই দিচ্ছে সব । বলছে - এই রোদ এই বাসন্তী হাওয়া, সামনে বেশি দিন পাবে না কিন্তু।
দোতলার বারান্দায় কে যেন টম্যাটোর চারা বুনে রেখেছে । আগের ভাড়াটে ?
বাড়ির পূব দিকের বারান্দায় তিনটে আখরোট মার্কা গাছ । পুবালি হাওয়ায় ওরা পাতা দুলিয়ে বলছে - কতদিন থাকবেন ?
এই তিন বৃক্ষ দেবতা যে আপেল গাছ জানতাম না । দেখিনি আগে । গাছপালা তেমন চিনি না । নারকেল, আম , কলা চিনি । বৃক্ষ তোমার নাম কি, ফলে পরিচয় ।
'চাবি হারালে দশ ইউরো দিতে হবে ।' হাসি মুখে বলল বাড়িওয়ালী আভালিনা ।
মহিলার বয়স কত হবে কে জানে । বুড়ি হতে হতে চেহারায় কেমন খুকি মার্কা একটা ভাব চলে এসেছে । স্বাস্থ্য খানিক পৃথু । হাসিতে স্নেহ । যেন ঘুরিয়ে প্যাচিয়ে আমার দূর কা রিস্তা । মাসি বা পিসি ।
'হারাবে না ।' কথা দিলাম ।
'রাতে কক্ষনো বাইরে থাকলে আমাদের জানিয়ে যাবে ।' ঠিক শর্ত না অনুরোধ জানালো ।
'আচ্ছা ।'
' মদিরা চলবে , কিন্তু মাতাল হলে সমস্যা ।'
'হব না।'
'রাত এগারটার মধ্যে রান্না শেষ করতে হবে। কিন্তু লন্ড্রি সারা রাত চলবে।'
' মঞ্জুর । নীচ তলায় যে বিলিয়ার্ড বোর্ড দেখলাম, ওটা ?' জানতে চাইলাম ।
'আপাতত তোমার । রাত সাড়ে দশটার মধ্যে খেলা শেষ করতে হবে । বল , বিলিয়ার্ড স্টিক , চক , কিউব সব পাবে নীচ তলায় । সারারাত ওখানে বসে বই পড়তে বা গান শুনতে পার। শেষ বাস শহর থেকে আসে সাতটা পনেরতে । ওটা যেন মিস না হয় । জায়গাটা নির্জন কিন্তু বিশ্বাস কর , কিছুদিন পর আর কোথাও ভাল লাগবে না।'
অমন হয় আমিও জানি ।
বিদায় নিল বুড়ি ।
মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে পছন্দ হয়ে গেল । পূর্ব দিকে মিকেলি শহর । বাস যায় আসে । পশ্চিমে পাতলা বন । ঘুরে আবার আমার বাড়ির দিকেই এসেছে । উত্তরে রাস্তা । শেষ হয়েছে আধা মাইল দূরে এক ধনীর বাড়িতে গিয়ে ।
দক্ষিণে পাইনের বন । ঘন ।
উপর তলায় প্রতিবেশী আছে । বুড়ো এক রাশিয়ান । একটা শব্দও ইংরেজিতে বলতে পারে না । বারান্দায় দাড়িয়ে সিগারেট খায় । তখন দেখি । ভাব চক্কর দেখে মনে হয় কেজিবির লোক ছিল । নামটা খুবই খটমট । আমি ওর নাম দিলাম - নিখলাই পাউরুটি ভস্কি । আরেকটা রাশিয়ান ছোকড়া পেলাম । দেখতে কেমন যেন রাসপুটিনের মত । এত অদ্ভুত মিল । কে জানে ওর দাদি রাসপুটিনের খুব অন্তরঙ্গ ছিল কি না ।
রাশিয়ানদের রমরমা, রাদুগা প্রকাশনী বন্ধ হবার সাথে সাথেই শেষ হয়ে গেছে । ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ এখন অর্থহীন । এরা এখন রুটি মাখনের জন্য সারা দুনিয়ায় যায় । সিডনিতে এক ডজন অবৈধ রাশিয়ান পেয়েছি ।
আরও একজন প্রতিবেশী পেলাম । আফগানিস্থানের । লোকটা দেখতে চাইনিজ মুভির ভিলেনের মত । জ্যাকি চ্যানের মুভিতে অমন অনেক লোক পাওয়া যায় । বেশির ভাগ সময় যখন চাইনিজ মুভির নায়ক একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে মিস্টার হং বা মিস্টার বং বা মিস্টার চঙের খোঁজ করে তখন এই রকম চেহারার একজন লোক ভেলভেটের পর্দা সরিয়ে ভেতরে গিয়ে বলে - বস, জ্যাকি আর ওর বন্ধু মেলন্দা আপনার খোঁজ করছে ।
তারপর সেইরকম একটা পেল্লাই মারামারি হয় ।
ডেসমন্ড বাগলে-এর দ্যা ফ্রিডম ট্র্যাপ' উপন্যাস পড়ার সময় ভিলেনের সুযোগ্য সহকারীর যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন হুবহু এই লোকটার মত ।
আমার সাথে তেমন কথা বলতো না । জানিও না নাম ধাম কি । সারাক্ষণ বগলে ক্রাচ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ।
সবচেয়ে বড় আপেল চোর এই ব্যাটা । ওর গল্প পরে বলব ।
বাড়ি থেকে হেঁটে দুইশত গজ গেলেই বাসস্টপ । কাঠের খটখটে একটা তক্তা । পাশে হলুদ সাইনবোর্ড । ওখানে এক পাউন্ড সাইজের একটা পাউরুটির ছবি দেয়া । ভাল করে চেয়ে দেখি আসলে বাসের ছবি । মানে বাস থামে এইখানেই ।
টিনের খেলনার মত একটা বাস এলো সময় মত । যাত্রী আমি একা । ড্রাইভারের বয়স কত কেউ জানে না। একশো বা দুইশত হলেও হতে পারে ।
ভাড়ার পয়সা নেয়ার সময় দেখি থরথর করে হাত কাপছে ।
হে ভগবান । এ ক্যায়া জুলুম হ্যায় !
বাস নিয়ে পুকুরে পড়বে না তো ?
হায় হায় । কি বিপদেই না পড়লাম ।
মাত্র কয়েকদিন আগে জিনসের জ্যাকেট কিনেছি একটা । বিছানার তলায় ক্রাকেনের বোতল আছে। কি হবে অইগুলোর ?
যে কোন শহরের মূল জায়গাটাকে এরা বলে সিটি সেন্টার । যেমন গুলিস্থান হচ্ছে সিটি সেন্টার ।
ভাড়া মেটাতে গিয়ে ড্রাইভারকে বললাম , সিটি সেন্টারে যাব ।
দুই পাশে ঘন পাইনের বন । বাতাস তাজা । কি সব গুল্ম হয়ে আছে । ফিকে গোলাপি ফুলে ভর্তি ।
সেন্টারে থামতেই নেমে গেলাম ।
'পরের বাস কখন ?' জানতে চাইলাম ।
' নতুন নাকি ?'
'একদম ।'
' মিকেলিতে স্বাগতম । এই নাও ক্যাটালগ । টাইম টেবিল আর কি ।' বলেই বুড়ো পিচ্চি একটা পুস্তিকা ধরিয়ে দিল । বাস নাম্বার । সময় সুচি । শহর , সুন্দর করে ছাপা ।
' শেষ বাস মিস করবে না কিন্তু ।' সাবধান করে দিল বুড়ো ।
' হবে না । কেবি বারে বসে থাকব ।'
' বিয়ার - ককটেল দুটোই দাম ওখানে । কিন্তু বসার জন্য সেরা ।' বলেই বাস ছেড়ে দিল বুড়ো ।
বাসস্টপের উল্টা দিকেই বারটা । আরমিন যদি থাকতো , ওকে নিয়ে বসতাম । জিন , ক্লাব সোডা , ডালিমের রস আর গোলাপ জল দিয়ে বানানো পার্সিয়ান রোজ অর্ডার দিতাম ওর জন্য ।
গ্লাসের ভেতরে জামার বোতামের সাইজের গোলাপ ফুল দেয়া হয় গারনিস হিসাবে ।
দারুন রোমান্টিক একটা জিনিস ।
ভালবাসার মানুষকে অমন পানীয় দেয়া দরকার ।
২
আস্ত স্যামনের দাম অবিশ্বাস্য রকমের সস্তা ।
পেল্লাই সাইজের মাছের দাম বেশ কম । ফালি করাটার দাম বেশি । পেট কেটে ভেতরের নাড়ি ভূরি ফেলে সুন্দর প্ল্যাস্টিকে মুড়ে রাখে ।উপরে কাগজের লেবেলে মাছের ওজন আর দাম লেখা । কয় দিনের মধ্যে খেয়ে ফেলতে হবে সেটাও লেখা ।
দেড় বা দুই কেজির ছোট মাছ তেমন দেখিনি ।
দামে সস্তা হওয়ায় ঘন ঘন খাওয়া হচ্ছে । সার্ডিন পাওয়া যায় প্রচুর। কম পক্ষে এক ডজন বিভিন্ন ধরনের কৌটায় দেখেছি।বেশির ভাগ সার্ডিনের কৌটা আসে পর্তুগাল বা ইটালি থেকে।
কাল দেখি এক বুড়ি রাস্তায় দাড়িয়ে সবজি বিক্রি করছে । কুমড়া , পেয়াজ , লিক (leek) আর গাজর।নিজের বাগানে ফলিয়েছে বুড়ি। লিক হচ্ছে পেঁয়াজ পাতার মত একটা সবজি। পেঁয়াজ পাতার চেয়ে ঘন। হালকা মিষ্টি।
হাতে বানানো উলের মোজা আছে বেশ কয়েক জোড়া । দাম দোকানের মোজার চেয়ে বেশি । কিন্তু একদম আসল উল । অনেক দিন নাকি টেকে । লোকজন বেশ পছন্দ করে অমন মোজা। ফিনিশ ভাষায় বলে সুকাত।
ফলের জ্যাম আর ঘরোয়া ওয়াইন বানিয়েছে বুড়ি ।
অনেক দিন বেঁচে থাকুক বুড়ি মা ।
মুইকো নামে পিচ্চি একটা মাছ পাওয়া যায় । সার্ডিনের মত দেখতে । স্বাদেও তেমন কোন উনিশ বিশ পেলাম না। মাখন দিয়ে ভেঁজে খুব খায় এই দেশের লোকজন ।
৩
এমন রাতগুলোতে বড্ড বিভ্রম জাগে মনে । আচমকা ঘুম ভাংলে হদিস পাই না কোথায় আছি ।
মনে হয়, সিডনী শহরের ক্লিভল্যান্ড স্ট্রীটে মাইকেলের বাসায় ?
আবার মনে হয়, না , মারিয়ানা আইল্যান্ডে গোল্ড বিচ হোটেলের তিন তলায় ।
বাইরে কি চলছে ঠিক বুঝে উঠতে পারি না প্রাংশু সময় ধরে ।
বারান্দায় দাড়িয়ে থাকি ক্ষণিক । হিম হাওয়ায় শরীর বরফ হয়ে যায় । কামরায় বিজলির হিটার থাকায় বুঝি না বাইরে মেরু অঞ্চলের বসতি কেমন ।
খুব রহস্যময়, শো শো শব্দ শোনা যায় অমন নিথর রাতগুলোতে । মনে হয় দূরে কোথায়, অচেনা দানব শাসাচ্ছে । কি সব বলছে বুঝি না।
এক রাতে ভারি জ্যাকেট চাপিয়ে বের হয়ে পড়লাম । কুয়াশা পাক খেয়ে খেয়ে উঠছে । হয় ভোরের দিকে বৃষ্টি হবে নয় বরফ পড়বে ।
ডজন দুই পাইন গাছ আছে বাইরে । বাড়ির পিছন দিকে টানা দুই মাইল পথ চলে গেছে । কাঁচা মাটি । দুই পাশে পাইনের জঙ্গল । আজ বিকেলে হেঁটে এসেছি । কিচ্ছু নেই । বড় বড় পাথরের চাঙ্গরে শ্যাওলা পরে গেছে কার্পেটের মত ।
পথটা আবার বাঁকা হয়ে ফিরে এসেছে আমার বাড়ির দিকেই ।
শব্দটা কিসের ?
আবিস্কার করলাম- হাওয়া । সেই বিরান প্রান্তর দিয়ে বয়ে যায় হিম হিম হাওয়া । আর রাতের মধ্য প্রহরে কেমন অচেনা দানবের চিৎকারের মত শোনায় ।
কেমন রোমাঞ্চ জাগে । ভাবতে ইচ্ছা করে শুধু হাওয়া না, কেউ কিছু বলতে চাইছে ।
হতে পারে না অমন ?
৪
আজ মার্কেটে গিয়ে দেখি অবিশ্বাস্য কম দামে স্যামন বিক্রি হচ্ছে ।
থতমত খেয়ে গেলাম ।
বিক্রেতা বুড়িকে জিজ্ঞেস করলাম, সস্তার কারন ?
জানালো , নরওয়ে থেকে পেল্লাই সব জাহাজ ভর্তি করে মাছ আসছে ।
জলদি কিনে ফেললাম । স্যামন রান্না সহজ । এত অল্প আঁচে দুনিয়ার আর কোন মাছ রান্না হয় কি না কে জানে । মাছের পরতে পরতে থাকে তেল ।
দোকানী মাছের পেট কেটে নাড়ি ভুরি ফেলে সাদা প্ল্যাস্টিকে ভরে রেখেছে । কোন রকম ফিসি গন্ধ নেই । বিশাল ঝিলের পাড় দিয়ে নির্জন পথে ফিরছিলাম । ঝিলটার নাম সায়মা (saimaa) । দুই ধারে জঙ্গল । ভূত এসে মাছ চাইল না দেখে খুশি হলাম ।
ফেরার পথে KB বারে একটা ঢু মেরে এলাম । মিকেলি শহরে আমার প্রিয় বার । কেমন একটা ক্লাসিক মার্কা ভাব আছে । থাকবেই । ১৯৬৫ সালের ব্যবসা । ভেতরের সব আসবার কালো কুচকুচে । কল্কে ফুলের মত মায়াবী ঝাড় বাতি । বাদামের খোসার মত নরম আলো ।
রাজ্যের সব পেইন্টিং দিয়ে বারটা সাজিয়েছে । বাজারের পুরানো দোকানে গেলে দারুন সব পেইন্টিং পাওয়া যায় । সস্তা । মন ভাল করা ছবি । কবে কোন শিল্পী এঁকেছিল রঙ তুলি দিয়ে। শিল্পী নাম করতে পারেনি। ছবি এখন বাতিল জিনিসের দোকানে।
বাইরে যত শীত বা বরফ থাকুক কেবি বারের ভেতরে গুহার মত আরামদায়ক উষ্ণতা । ওদের কাছে এলপি রেকর্ড আর সিডি মিলিয়ে আনুমানিক হাজার খানেকের বেশি অ্যালবাম আছে । মিউজিক সিস্টেমটা দারুন ।
এক গ্লাস ড্রাফ্ট বিয়ার নিয়ে ঘণ্টা খানেক বসে থাকা যায় অনায়াসে । কেউ আপত্তি করবে না।
শেষ বাস সাতটা পনেরতে । দৌড়ে গিয়ে উঠি ।
বাড়ি ফেরা ।
কাল সারারাত তুমুল বাতাস ছিল । বারান্দায় দাড়িয়ে সেই অলৌকিক গর্জন শুনে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছে বারবার।
বাড়ির পিছনের জঙ্গলের গাছ কেটে নিচ্ছে লোকজন । তারমানে সামনেই বরফ পড়া শুরু হবে । ফায়ারপ্লেসের খোরাক হিসাবে লাকড়ি দরকার ।
শীত আসছে ।
৫
রোজ গভীর রাতে একবার বারান্দায় গিয়ে দাড়াই । সন্দেহ নেই নিচতলার দারোয়ান আমাকে মানসিক বিকারগ্রস্থ একজন সাইকো টাইপের লোক হিসাবে মনে করে ।
আবার স্বাভাবিক ভাবেও নিতে পারে । আমি জানব কেমন করে ?
দীঘল একটা সময় ধরে দাড়িয়ে থাকি । আজ থমথমে । হাওয়ার রাত না।
গত দুই রাত আতর দানির মত বৃষ্টি হয়েছে । থ্রিলার মুভিগুলোতে যখন খুন খারাবি হয় তখন এইরকম বৃষ্টি পড়ে ।
এই জায়গার ভয়াল জিনিস হচ্ছে গভীর রাতে বাতাসের গর্জন। মিকেলি শহর থেকে টানা সাড়ে তিন মাইল দূরে আমার বাসা। এই সাড়ে তিন মাইল জায়গায় ছন্নছাড়া এক আধ ডজন লাল কাঠের বাড়ি ছাড়া কিছু নেই । গভীর জঙ্গল । মহাভুজ আকৃতির পাইন গাছ দিয়ে ভর্তি ।
আমার বাড়ির পিছনের রহস্যময় রাস্তাটা চলে গেছে দূরে ।
এক রোদেলা দিনে কম্পাস, ফ্ল্যাক্স ভর্তি কফি আর জঙ্গল নাইফ নিয়ে হেঁটে গেছি । টানা দুই মাইল গিয়ে পথটা চাঁদা আকৃতি নিয়ে আমার বাড়িতেই ফিরে এসেছে ।
তাহলে রাতে গাড়ি যায় কোথায় ?
খোলা বিরান প্রান্তরে হা হা করে ডাকাতের মত বয়ে যায় লুটেরা হাওয়া । ওদের গর্জন যে অমন ছমছমে কে জানত ?
শব্দ রেকর্ড করে দেখেছি । সেটা শুনে রোমাঞ্চ জাগে না । যান্ত্রিক গোলযোগের মত লাগে ।
অন্য সময় হলে ভাবতাম এই শব্দ তিমিঙ্গিলের চিৎকার ।
তিমিঙ্গিল চিনতে পারলে না ?
হিন্দুদের পুরাণে বলে সাগরদানো । যে কি না এক গ্রাসে একটা তিমি গিলে খেতে পারে ।
আমার মনে হয় মেগালোডনের কথা বলেছে ।
গভীর রাতে এই বাতাসের চিৎকার শোনা কেমন একটা নেশার মত হয়ে গেছে ।
আজ রাতে সেটা নেই। তারপরও রাত কক্ষনই নিঝুম হয় না। রাতের আলাদা শব্দ আছে । পাতা ঝরার শব্দ পাচ্ছি । টুপটাপ শিশির ঝরছে । মট করে গাছের ডাল ভাঙছে নরম মাখন হাওয়ায় ।
তারপরও আমি বাতাসের চিৎকার শুনতে চাইছিলাম । নেশা হয়ে গেছে আমার । রাজ পরিবারের সদস্যরা যেমন সাপের ছোবল খেয়ে নেশা করতো , তেমন ।
৬
সারাদিন ঘামচি পাউডারের মত তুষায় ঝরেছে । জানালার পাশে পেপারব্যাক আর কফির পেয়ালা নিয়ে বসে ছিলাম ।
পেপারব্যাকের জগত এক মায়াবী জগত।
কত শয়ে শয়ে লেখক তাদের মগজ থেকে নামিয়ে আমাদের জন্য বিচিত্র , রক্তহিম করা কাহিনি লিখে রেখে গেছেন । সারাজীবনে সেইসব শেষ করতে পারব না আমরা ।
যেমন, ডেসমণ্ড ব্যাগলি সাহেবের ' দ্যা গোল্ডেন কীল ' বইটার কথা । নায়ক পিটার হরল্যান সুন্দর ছিমছাম জীবন চালাচ্ছে । পেশায় নৌ- যান মেরামতকারি এবং ডিজাইনার । সুন্দরী স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে ভালই চলছে তার দিনকাল ।
বন্দরে ইয়ট ক্লাবের বারে এক মাতালের দেখা পায় । মাতাল অয়াকার প্রাক্তন সৈনিক । গল্পছলে জানায়, ইটালির অমুক জায়গায় প্রচুর সোনার বার লুকানো আছে । যার পরিমাণ এক টন । সাথে আছে সোনার অলঙ্কার আর রত্নপাথর ।
চাইলে গিয়ে উদ্ধার করে আনতে পারে।
প্রথমে রাজি হয় না পিটার ।
কয়েক বছর পর পিটারের স্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় । জীবনের প্রতি হতাশ হয়ে যায় পিটার । খানিক পরিবর্তন দরকার । তখন ঘটনাচক্রে আবার দেখা হয় মাতাল অয়াকারের সাথে।
এইবার রাজি হয় সে ।
কিন্তু জানত না কি বিপদ দাড়িয়ে আছে পদে পদে ।
আরও অনেকেই চায় ওই গুপ্তধন ।
এই ভদ্রলোকের আরেকটা ফাটাফাটি বই - দ্যা ফ্রিডম ট্র্যাপ । এই কাহিনি ভেঙ্গে দুনিয়ায় কত মুভি যে বানানো হয়েছে ।
নায়ক জোসেফ রেডেন একজন ঘাগু অপরাধী । মাত্র জেল থেকে বের হয়েছে । তাকে ধরে নিয়ে গেল ব্রিটিশ সরকারের একজন এজেন্টে । যাকে ম্যাকিনটোস নামে ডাকা হয় ।
স্কার্পিয়ার্স নামের একটা দল দীর্ঘমেয়াদী সাজা পাওয়া বন্দীদের জেল থেকে পালাতে সাহায়্য করে । সেইসব কয়েদীদের , যাদের কাছে প্রচুর টাকা পয়সা আছে ।
তো ম্যাকিনটোস চান আরেকটা অপরাধ করে জোসেফ জেলে যাক । এবং সেই দল জোসেফকে ছাড়িয়ে নিতে গেলেই দলটাকে ধরতে পারেন তিনি ।
কিন্তু কাজটা কি এতই সহজ ?
বললাম তো, হাজার কাহিনিতে এই ছক ব্যবহার করা হয়েছে ।
যেমন হয়েছে জেমস হেডলি চেইজের ' স্টিকলি ফর ক্যাশ' বইয়ের চরম মুহূর্তটা ।
যেখানে নায়ক জনি ফারার গাড়ি করে পালাচ্ছে । ওর সাথে ব্রিফকেস ভর্তি টাকা । পিছনে পুলিশ । জনি গাড়ি চালাতে চালাতে ব্রিফকেস খুলে উড়িয়ে দেয় সেই টাকা । পথের সবাই হুমড়ি খেয়ে পরে টাকা কুড়ানোর জন্য ।
পাবলিকের জন্য পুলিশের গাড়ি আসতে পারে না সেই ফাঁকে জনি পালায় ।
অথচ কত কষ্টের এই টাকা !
মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমার ।
সস্তায় কিনে আনা স্যামন আর অচেনা চালের ভাত দিয়ে খেয়ে দিনটা বেশ বাবুয়ানা করে গেছে ।
রাতে বরাবরের মত বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম । টম্যাটো চারাগুলো শীতে মরে ভূত হয়ে গেছে । মায়া লাগে দেখলে । মার্বেল টম্যাটো । বাচ্চারা কাচের মার্বেল খেলে না ? সেইরকম সাইজ । পেকে গেলে পরে যায় গাছ থেকে । অকাল পক্ক মানুষের মত ।
চারিদিকে বরফের চাদর । থমথমে ভৌতিক । ল্যাম্পপোস্ট আলো দিচ্ছে । এত বিজনপুরিতেও খানিক পরপর এক একটা ল্যাম্পপোস্ট দাড়িয়ে আছে সাইক্লপের মত । ওদের আলো উজ্জ্বল । উপরে বাউলের মত । যাতে বরফ জমে না থাকে ।
গত কয়েক রাত পরাগের মত বৃষ্টি হয়েছিল । আজ আকাশ পরিষ্কার । অনেক দিন পর কালপুরুষকে দেখলাম । অন্ধকার আকাশে উল্কা শিকারের জন্য দাড়িয়ে আছে ।কালপুরুষের কোমরের বেল্ট থেকে খানিক দূরে গেলে আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল যে তারাটা দেখা যায় সেটাই লুব্বক তারা । ডগ স্টার ও বলে । খুব বিখ্যাত ।
আফ্রিকান আদিম জাতি ডোগানদের সাথে এই তারার অনেক গল্প আছে ।
ডোগানদের বাসভূমি আফ্রিকার দেশ মালিতে । ডোগনদের মতে কালপুরুষের কোমরের বেল্টের ওখানে আছে আরেক তারা। জলে ভর্তি। সেই তারার দেশ থেকে এসেছে নম। ওখানের সবাই দেখতে অর্ধেক মাছ। অর্ধেক মানুষ।
আগুনের রথে চেপে ওদের দেবতা নম পৃথিবীতে এসেছিল । শিখিয়ে গেছে ওদের অনেক বিদ্যা ।
আকাশের দূরের সব তারাদের গল্প ডোগানরা জানে । যা মাত্র কয়েক বছর আগে আমাদের বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করেছে । যেমন - লুব্বক তারার পিছে আরেকটা তারা আছে, খালি চোখে দেখা যায় না । সেটা আবার পঞ্চাশ বছরে লুব্বক তারাকে প্রদক্ষিণ করে ।
এই তথ্যগুলো আমরা আবিস্কার করেছি ১৯২৬ সালে । ডোগানদের পুঁথিতে চারশো বছর আগেই লেখা আছে এই তথ্যগুলো । ওরা নাকি জেনেছে নম (Nommo) দেবতার কাছ থেকে ।
আদিম জাতি আর গোত্রগুলো নিয়ে আমার রয়েছে অসীম কৌতূহল ।
কালাহারি মরুভূমির বুশম্যানদের কথাই ধরা যাক । সামান মানে জ্ঞানি ওঝা । রাতের বেলা সামান আগুনের কুণ্ডের পাশে দাড়িয়ে খিচুনির মত বিচ্ছিরি ভঙ্গিতে নাচে । এই নাচের কারনে সামানের শরীরে অচেনা রকমের এনার্জি তৈরি হয় । ফলে সামান আধ্যাত্মিক জগতে চলে যেতে পারে। বহু দুরের কোন ঘটনা সে আগুনের কুণ্ডের পাশে বসে দেখতে পারে ।
চিকিৎসার সময় এই এনার্জি ব্যবহার করে রোগীর শরীরের ভেতরের রোগ ব্যাধি ধরে ফেলে ।
বুশম্যানেরা বিশ্বাস করে ঈশ্বর আদিম পৃথিবীতে প্রথম গোত্র হিসাবে ওদের বানিয়েছিল।
ডিএনএ পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা বলেন - ডিএনএর তথ্য মতে বিশ্বাস করা যায় , ওরাই পৃথিবীর আদিম মানব । ওদের কাছ থেকেই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে গিয়েছিল মানব জাতি।
যাই হোক বিচিত্র পৃথিবীতে সবই সম্ভব । সবই রোমাঞ্চকর ।
সামনে শীত আসছে । শীতের মোকাবেলা করার জন্য কফির গুড়া ভর্তি পেল্লাই এক বাক্স কিনে আনলাম । গোত্রহীন নতুন কোম্পানি , তাই দাম বেশ সস্তা । বেশি কড়ি ফেলতে হল না ।
৭
তুষার ।
চোখে দেখার মত একটা জিনিস বটে । আদিম দেবতা শিব হিমালয়ের উপর বাস করেন । গিন্নি পার্বতীকে নিয়ে অবসর সময়ে নিশ্চয়ই বসে বসে তুষার ঝরে পড়ার দৃশ্য উপভোগ করেন ?
মাঝরাতে বারান্দায় গিয়ে দেখি হিম হিম করে ঝরে পড়ছে বরফ কুচি । দমকা বাতাস নেই ।
বরফের মধ্যে কারও পায়ের ছাপ । দেখে রোমাঞ্চ জাগে । মনে হয় বিগফুট হেঁটে গেছে । কিন্তু জুতা পড়া ছাপ দেখে মনে হল এত রাতে কি কেউ বাড়ি ফিরল ?
আফগানিস্তানের একটা ছেলে থাকে । প্রায় রাতে শহর থেকে মাতাল হয়ে ফিরে , হোক বৃষ্টি বা তুষার । কিচ্ছু যায় আসে না ।
ল্যাম্পপোস্টের কমলা আলোর বৃত্তের মধ্যে তুষার কণায় ঢুকে পড়ায় কেমন মায়াবী দেখাচ্ছে । প্যালেট নাইফ দিয়ে শিল্পীরা প্রচুর তেল রঙ মাখিয়ে ছবি আঁকলে অমন দেখায় ।
বিকেল চারটায় ঘুটঘুটটি অন্ধকার হয়ে যায় । আগের মত বাড়ির পিছন দিকের জঙ্গলে হাঁটতে যাওয়া হয় না । শহর থেকে যখন বাড়ি ফিরি তখন এক তাল ঘন অন্ধকার ঘিরে ফেলে চারিদিক । কুয়াশা পড়ে অনেক । মনে হয় এইচ, পি , লাভক্রাফট সাহেবের কোন গল্পের নাট্যরুপ দেয়া হয়েছে । খানিক পর ঘটতে শুরু হবে অপার্থিব সব ঘটনা ।
গত সপ্তাহে হাঁটতে গিয়েছিলাম ।
কিচ্ছু নেই । কেউ নেই। বন আর অরন্য । বড় বড় পাথরের চাইয়ের উপর পারস্যের কার্পেটের মত শেওলা জন্মে আছে । তৃষ্ণার্ত স্বপ্নের মত ।
এই জায়গাটা কেমন ছিল কুড়ি বছর আগে ? কখনও কি মানুষের পা পড়েছিল ?
গভীর ঘাসের বনের মধ্যে একতলা কাঠের একটা বাড়ি পেলাম একদিন । লাল টালির ছাদ । রঙ জ্বলে দুনিয়ার হিসাব নিকেস চুকিয়ে ফেলেছে ।
কে বা কারা থাকতো ? কেন চলে গেছে ?
বাড়িটা অযত্নে থেকে নষ্ট হয়ে গেছে ।
কিছু জিনিস দেখলে কখনই বোঝা যায় না অতীতে কি ছিল । কাল একটা ফিচারে পড়লাম সোনালী সাহারা মরুভূমিতে নাকি অতীতে দীঘল ঘাসের দঙ্গল ছিল। ছিল জলাভূমি , গবাদি পশু । মানুষের বসতি ।
ভাবা যায় ?
মাত্র ছয় হাজার বছর আগে । সাড়ে তিন লক্ষ স্কয়ার মাইল জুড়ে ছিল এই ঘাসের বন । ছিল প্রাচীন হারানো নদী তামানরসেট । সবুজ সাহারার বুকে টন টন মিষ্টি জল নিয়ে বয়ে গিয়ে লাফ দিয়ে পড়েছিল অ্যাটলান্টিকের বুকে । ওটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নদী । আজ নেই । ২০১৫ সালে স্যাটেলাইটের সাহায়্য ওটার ছাপ ধরা পড়েছিল ।
ওটা ছাড়া কোন প্রমান নেই । তামানরসেট নদী আছে শুধু মরুর কিংবদন্তী গল্পে ।
মধ্য আফ্রিকার জলাভূমি মেগা- চাদ আজ মৃত একটা ঘোস্ট লেক । কিন্তু এক সময় ওটা ছিল ক্যাস্পিয়ান সাগরের চেয়ে বড় ছিল !
যদি ও বেঁচে থাকতো , যদি সাহারা মরুভূমি হয়ে না যেত তবে লেক মেগা- চাদ হত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলাভূমি ।
কিন্তু তারপর ? কি হয়েছিল যার জন্য সবুজ সাহারা অমন সোনালী বালি ভর্তি মরু হয়ে গেল ?
অনেক থিউরি আছে ।
পরিবেশ প্রত্নতাত্ত্বিক ডেভিড রাইড দাবি করেন - গবাদি পশু ভেড়া , গরু আর ছাগল অধিক বিচরণ করতো এই এলাকায় । ওরা ঘাসের শেকড় সহ খেয়ে ফেলে । শিকড় না থাকায় জলশূন্য হয়ে যায় মাটি । সেই খোলা মাটিতে সূর্যের কড়া আলো আরও শুকনো করে ফেলে সব । বায়ুমণ্ডল আরও গরম করে ফেলে ।
বৃষ্টি কমে যায় ।
রাক্ষসের মত বাড়তে থাকে মরুভূমি ।
অবশ্য এটাই একমাত্র যুক্তি না।
পৃথিবী তার অক্ষরেখার উপর নাকি বেশ নড়াচড়া করে । দুরন্ত শিশুর মত । এর ফলেই প্রতি বিশ বছর পর পর আফ্রিকার সাহারার এলাকায় তাপমাত্র বদলে যায় নাটকীয় ভাবে ।
১৯০২ সালে মিসরের মরুভূমিতে পাওয়া যায় তিমি মাছের পেল্লাই এক কঙ্কাল । চমকে যাবার মত জিনিস ।
কি ভাবে এলো ?
পরে আরও অনেক অনেক কঙ্কাল পায় । জায়গাটার নাম রাখে ওয়াদি এল হিটান । আরবি শব্দ। তিমির উপত্যাকা ।
তবে এই তিমি আজকের দিনের আধুনিক তিমি না। প্রাচীন তিমি । বাসিলোসরাস । অর্ধেক তিমি আর অর্ধেক ডাইনোসর মার্কা বিচ্ছিরি জিনিস । সাগর দানব । ২১ ফুট লম্বা দানবটা সেই সময়ে বেশ সাগরের সরদার ছিল ।
ধূসর মরুর বুকে যখন এইসব আবিস্কার হল তখন বিজ্ঞানীদের কাল ঘাম ছুটে গিয়েছিল ।
কোত্থেকে এলো ওরা ?
সাথে ছিল মাছ , কচ্ছপ আর কুমিরের ফসিল ।
প্রথমে ভেবেছিল কেউ কি এনেছে এইসব জিনিস ।
কোন কারনে ?
কালো জাদুর জাদুকরেরা। বা হারিয়ে যাওয়া আদিম শয়তানেরা ?
অনেকগুলো বছর সেটা ছিল সাহারার গোপন রহস্য ।
আজ আমরা জানি সেইসময় ওখানে সাগর ছিল । মহাদেশগুলো ছিল এক সাথে । তারপর আলাদা হয়ে যায় মহাদেশের প্লেটগুলো । আটকে পরে সেই জলদাবনগুলো । মারা যায় । যাদের কঙ্কাল রয়ে গেছে তিমির উপত্যাকায় ।
সাহারার সবচেয়ে রহস্যময় জিনিসটার নাম - আই অভ দ্যা সাহারা । সাহারার চোখ । মৌউরিতানিয়ায় এর অবস্থান ।
জিনিসটা একগাদা বৃত্তাকার কাঠামো । পুরানো দিনের কলের গানের রেকর্ডের মত । ৩১ মাইল ব্যসের ।
১৯৬৫ সালে এটা আবিস্কারের পর বিখ্যাত হয়ে যায় বেশ। নাসার স্পেসফ্লাইট জেমিনি -৪, মহাশূন্য থেকে ছবি তুলেছিল এটার ।
মনে হয় মরুভূমির রহস্যময় চোখ ।
আজও রহস্য কিভাবে এই চোখের মত জিনিসটা তৈরি হয়েছিল ।
উল্কার আঘাতে ?
তাহলে সেই রকম খাদ নেই কেন ? উল্কাপিণ্ডের কোন টুকরো নেই কেন ?
যদি পুরানো আগ্নেয়গিরি হয় তবে আগ্নেয়শিলা নেই কেন একটা টুকরো ?
রহস্য ।
কল্পনার পাখা উড়াতে যারা পছন্দ করে তারা বলে এক সময় ভিন গ্রহের স্পেসসিপ এসে নামত এই জায়গায় ।
আরও কেউ বলে - হারানো শহর আটলান্টিস এটাই । আটলান্টিস শহর নাকি অমন বৃত্তাকার ছিল । প্লেটোর বর্ণনার সাথে বেশ মিলে ঝুলে ।
মহাশূন্য থেকে দেখলে মনে হয় পৃথিবী এক চোখে চেয়ে আছে অন্ধকার মহাকাশের দিকে ।
মরুভূমি আমাদের কিছু বলে না।
আচমকা পাওয়া যায় লুপ্ত শহর । বিচিত্র রহস্যময় জিনিস , চিত্রকলা পাওয়া যায় সেইসব মরুশহরে ।
সাহারা সেইসব নিয়েও মুখ খোলা না আমাদের কাছে ।
কে জানে তপ্ত বালির নিচে আজও কি সব রহস্য লুকিয়ে আছে । যেসব রহস্য মরুভূমি গোপনে রক্ষা করছে মানুষের চোখের আড়ালে !
৮
বাইরে কতক্ষণ ধরে বৃষ্টি হচ্ছে সেটা বলা সম্ভব না।
বাড়ির জানালা দুইপাল্লা কাচের । শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য এই ব্যবস্থা । কিন্তু এর ফলে বৃষ্টির শব্দ পাই না।
গভীর রাতে যদি জানালায় বিড়ালের খামচির মত শব্দ পাই তবে বুঝি তুষার ঝড় হচ্ছে । বা দমকা হাওয়া ।
এখন বারান্দায় গিয়ে দেখি সারা দুনিয়া ভেসে যাচ্ছে বৃষ্টিতে ।
দেশের মত গহন ঘন বৃষ্টি হয় না এখানে । মেঘ ও ডাকতে শুনিনি । নরম বৃষ্টি । সারা রাত তুমুল বৃষ্টি হলেও কফির পেয়ালা ভরে না ।
মনে হয় একটা পেল্লাই দৈত্য মুখ ভর্তি জল নিয়ে গড়গড়া করে ফু দিয়ে জল ফেলছে ।
অমন ।
দেশের বৃষ্টি অনেক রূপসী ।
কাল পুরানো তামার পয়সার মত চাঁদ উঠেছিল । দোল পূর্ণিমা ছিল । চারিদিকে বরফ । সেই বরফে গলা সোনার মত জোছনা পরে দেখার মত একটা দৃশ্য । দূরের বাসস্টপ কেমন রহস্যময় লাগছিল । বাস আসবে না যাবে না তাও গোলাকার ল্যাম্পশেডে আলো জ্বলে সারারাত ।
অনেক দিন পর আবার সেই বাতাসের গর্জন ।
আজ দুপুরে ফেরার সময় দেখি লেকের ঠিক মধ্য খানে একটা লোক টুল নিয়ে বসে আছে । শরীর ভর্তি গরম পোশাক ।
সব লেক জমে এক একটা বাউল ভর্তি ক্রিম ছাড়া আইসক্রিম হয়ে গেছে ।
বিকেলে দেখি বুড়ো বুড়ি সেই লেকের জমাট বাঁধা বরফের উপর দিয়ে হাঁটে । ওদের প্রাণের ভয় নেই ? যদি বরফে ফাটল ধরে ? পরে যায় ।
সব কটা বুড়ি বাহারি মাফলার গলায় দেয় । রঙের কি বাহার । লাল হলুদ ছক ছক ।
এই লোকটা টুলে বসে আছে কেন ?' জানতে চাইলাম ।
'মাছ ধরছে ।' সংক্ষেপে জবাব দিল বাস ড্রাইভার ।
এক কথায় উত্তর দাও প্রশ্ন করেছি নাকি ? কিন্তু ও ব্যস্ত ।
বাসায় ফিরে বাড়িওয়ালী আভালিনাকে জিজ্ঞেস করতেই ব্যাখ্যা পেলাম ।
আইসফিশিং বলে ।
খুব সহজ । লেকের মধ্যখানে জায়গা পছন্দ করে পেল্লাই একটা কর্ক স্ক্রু-র মত জিনিস দিয়ে সামান্য বরফের চ্যাঙর টুলে ফেলে । অমন স্ক্রু না থাকলে শাবল বেলচা দিয়ে গর্ত করে ওখানেই পিচ্চি ছিপ ধরে বসে থাকলেই হল । মাছ নিজের গরজেই এসে কামড় দেবে ।
আইসফিশিং খুব ঐতিহ্যবাহি জিনিস ।
শীতের প্রস্তুতি হিসাবে মোজা কিনে আনলাম ।
রাস্তার সেই বুড়ির কাছ থেকে । নরডিক দেশগুলোতে হাতে বানানো মোজার বেশ কদর।
দাম খানিক বেশি ।
কিন্তু কল্পনায় দেখতে পেলাম, কত সন্ধ্যায় ফায়ারপ্লেসের পাশে নিভু নিভু আগুনের পাশে বসে বুড়ি এই মোজা বানিয়েছে, কোন এক হাটের দিনে গিয়ে বিক্রি করবে এই আশায় ।
তাছাড়া জিনিসগুলো নাকি টেকে ভাল । ভাল মালমসলা দিয়ে বানিয়েছে । দোকানের পাঁচ জোড়া মোজার ওজনের সমান বুড়ির এক জোড়া মোজা ।
এই প্রচণ্ড দমকা বাতাসে সে দাড়িয়ে আছে । বিক্রি হলে নিশ্চয় খুশি হবে ?
সব দেশে এইসব বুড়ো বুড়ি বিক্রেতাদের কেমন যেন অসহায় লাগে আমার কাছে ।
দেশে থাকতে প্রায়ই দেখতাম । মন খারাপ হত । আমার মা এইসব বুড়ো বুড়ির কাছ থেকে সওদাই করত খুব ।
লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরে একবার মায়ের সাথে গিয়ে দেখি বুড়ো এক লোক গীতা বিক্রি করছে । পকেট গীতা । দুই টাকা করে । তেমন বিক্রি হচ্ছে না। বুড়ো বসছে একদম কোনে । সেখানে নিমকি আর জিলিপি দোকান ভর্তি । সবাই ঠেসে কিনছে । গীতা বা সীতা কিনে কি হবে ?
সেই পাকা চুলের সন্ন্যাসীর মত বুড়োর কাছ থেকে মা এক গাদা গীতা কিনে নিল । বিলিয়ে দেবে । গীতা বিলিয়ে দিলে নাকি পুন্য হয় ।
কই ? কোন মাজেজা তো দেখলাম না।
অবশ্য ঈশ্বর বেশির ভাগ সময় ঘুমায় । কাজেই দেখা যাক ।
আরেকটা মেয়ে অমন রাস্তার বুড়ো বুড়ির কাছ থেকে জিনিস পত্র কিনত । তার কথা বলব না । কারন সে আমাকে অচেনা নীল বিষ পান করে হারিয়ে গেছে । সেই বিষে নীল হয়ে আমি বিষ্ণুর মত কোটি বছর ধরে অনন্ত শয্যার শুয়ে আছি ।
আজও ।
তার কথা বাদ।
বরফ পড়া শুরু হয়েছে , এখন তো সামারের মোজার কাজ চলবে না । স্নো সুয ও লাগবে । বরফে যাতে পা পিছলে না যায় ।
কাল সন্ধ্যায় বরফকুঁচির উপর দিয়ে হেঁটে দেখেছি কেমন মুচমুচে শব্দ হয় হরর মুভির মত । কর্নফ্লেক্সর উপর দিয়ে হাঁটছি যেন ।
ব্লু বেরি ফলের মত নীল অন্ধকার বাইরে ।
ঈশান কোনে জংলের মধ্য দিয়ে রাস্তা আছে । অনেক গভীর রাতে সেটা দিয়ে দুই একটা গাড়ি যায় । শহরে যাবার এটা একটা রাস্তা । খুব বেশি ব্যবহার হয় না ।
এই সাঝবেলাতে স্নো কাটার চলছে । বরফ কেটে পরিষ্কার করে দিয়ে যাচ্ছে কমলা রঙের রোবটের মত গাড়িটা ।
কামরার ভেতরে বসে দৃশ্যটা দেখে কারন ছাড়াই মন ভাল হয়ে গেল । কেউ যদি চলে আসে তবে দিশা হারিয়ে জঙ্গলের ভেতরে চলে যাবে না ।
' ভারতীয় চা বানাতে পার না কি ?' কিচেনে যেতেই বাড়িওয়ালার সাথে দেখা । রান্নাঘরের পিছনে জমে থাকা বরফ পরিষ্কার করছে । তুষার ভাল্লুকের মত লাগছে ওকে ।
'ভারতীয় চা জিনিসটা কি ?' জানতে চাইলাম ।
' আরে সেটা তো তোমার জানার কথা ।'
'জানি না । আমি তো বাঙালি ।'
'তা বটে । অনেক আগে হেলসিঙ্কিতে খেয়েছিলাম । চায়ের পাতা , সাথে বে লিফ আর হাজার পদের মসলা দেয়া । দুধ দিয়ে প্রায় বাদামি করে ফেলেছে । আর ভীষণ মিষ্টি । গরম কোন দই যেন । '
' বানাতে পারি না । এত জিনিস দিয়ে চা বানায় শুধু আলকেমিস্টরা ।'
'বিকেলে দেখি জঙ্গলে ঘুরতে যাও । খুব ভাল জিনিস । এই এলাকার জংলে পথ হারানোর ভয় নেই । তারপরও উজ্জ্বল কাপড় পরে যাবে । কমলা , লাল , হলুদ হলে ভাল হয় । শাদা , সবুজ , ধূসর কালো না হলেই ভাল । কেমোফ্লেজ । ছুটির দিনে পড়ে পড়ে না ঘুমিয়ে মাছ ধরতে পার । বাড়ির পাশেই তো লেক সায়মা । এইদেশের সবচেয়ে বড় জলাভূমি । আজ থেকে ছয় হাজার বছর আগের লেক । সেই বরফযুগের আমলের । প্রচুর মাছ পাবে ওখানে । থাইম্যালাস থাইম্যালাস, বিম , আর্কটিক চার, স্যামন, আর আছে ব্রাউন ট্রাউট ।'
'মাছ ধরার লাইসেন্স নেই ।'
'নিতে কতক্ষণ । শোন ছোকরা , কেনা মাছের চেয়ে নিজের হাতের ধরা মাছের স্বাদ মিলিয়ন গুণ বেশি । জিনিসটা যখন হলুদ বাদামি রঙ্গে ভাঁজা হয়ে টেবিলে আসবে তখন টের পাবে ।'
'আমার মাছ ধরার রাশি নেই ।'
'সেটা আবার কি ?'
' লাক। ভাগ্য ।'
' আরে হ্যাত । মাছ ধরার আসল জিনিস হচ্ছে জায়গা নির্বাচন আর চার । আমি যখন ধরতাম চার হিসাবে ঝিঝি পোকা , গঙ্গা ফড়িঙ , জোঁক , মৌমাছি , বাসি রুটি , মাছের চোখ আর ঘাস চিংড়ি ব্যবহার করতাম ।'
' ঘাস চিংড়ি ?'
'হ্যাঁ , জলাভূমিতেই পাবে । গ্লাস চিংড়ি বা ঘোস্ট চিংড়ি ও বলে । এক দম পিচ্চি পিচ্চি । স্বচ্ছ । জলের সাথে মিশে থাকে । খাওয়া যায় না কিন্তু মেরিন বায়োলজির অংশ । মাদার ন্যাচার বানিয়েছে । ঝাঁঝি জাল ফেলেই ধরা যায় ।'
মনে পড়লো সেই শৈশবে সস্তাপুরের ওখানে চানমারি টিলার পিছনে দারুন একটা জলাভূমি ছিল । খেলতে গিয়ে অনেকবার দেখেছিলাম । ওই চিংড়ি জীবনেও বড় হয় না । স্বচ্ছ শরীরের ওর পরিপাক তন্ত্র মগজ সব দেখা যেত ।
আমি ভাবতাম এই জলার চিংড়ি কখন বড় হয় না কেন ?
কি রহস্য ?
এটার নাম তবে -ঘাস চিংড়ি । বা ভূত চিংড়ি ?
দারুন তো !
রাতে লন্ড্রি করে ফেরার পর দেখি সামারের মোজার একটার জোড়া হারিয়ে গেছে ।
ওটা আবার গেল কোথায় ? আঁতিপাঁতি করে খুঁজলাম । নেই । যাহ্ ।
কিছু হারালে খারাপ লাগে । ছেলেবেলার মতই ।
তবে প্রকৃতির একটা নিয়ম আছে যা চলে যায় তা ভালর জন্যই নাকি চলে যায় । আর প্রিয় জিনিসটা আবার ফিরে আসে । অনেক কাল পরে হলেও ।
এই নিয়ে দারুন সব প্যারানরমাল ব্যাখ্যা ও আছে । আপনার চিন্তা চেতনা এই মহাবিশ্বের অংশ । আপনি নিজেও মহাবিশ্বের অংশ । সে আপনাকে ভালবাসে।
তাই প্রিয় জিনিসটা ফিরিয়ে দেবে আপনাকে ।
কিছুই হারায় না এই নিখিল বিশ্বে । অজানা এক হিসাবে পবিত্র জ্যামিতিতে চলছে সবকিছু ।
আজ বিকেলে লন্ড্রি রুমে গিয়ে দেখি আমার সেই নিঃসঙ্গ মোজা । লন্ড্রি মেশিনের উপর রেখে গেছে কেউ !
মজার একটা কাহিনি মনে পড়লো ।
মেরি গ্রামস নামে এক ভদ্রমহিলা ২০০৪ সালে তার হিরের আঙটিটা হারিয়ে ফেলেছিলেন । ওটা ছিল বিয়ের আঙটি ।
বাগানে আগাছা পরিষ্কার করতে গিয়ে আবিস্কার করলেন জিনিসটা কখন যেন আঙুল গলে পরে গেছে ঝোপে ভরা বাগানে ।
ভয়ে তিনি কাউকেই বলেননি । তবে অনেক কেঁদেছেন তিনি । অনেক । মেয়েরা যেমন হয় !
দিনের পর দিন বাগান আঁতিপাঁতি করে খুজেছেন তিনি । পাওয়া যায়নি । শেষে কাউকে না জানিয়ে অমন আরেকটা বানিয়ে নিয়েছিলেন ।
মেরি এই ঘটনা কাউকে বলেননি । দীর্ঘ ১৩ বছর পর এক কাণ্ড হল ।
মেরির পুত্রবধূ বাগানে গাজর চাষ করেছিল সেই মউসুমে । পুত্রবধূ, ক্যালেন ডেলি বাগান থেকে একটি বেঢপ ধরনের গাজর তুলে আনে। ফেলে দেবে ভেবেও কি মনে করে যখন গাজরটা ধুয়ে ফেলল তখন বুঝতে পারলো , গাজরটা কেন অমন আশ্চর্য আর বিতিকিচ্ছিরি হয়েছে ।
গাজরটা হীরের আংটি পরে ছিল!
ডেলি পরে খবরের কাগজের লোকদের বলেছিল , “ আমার স্বামীকে জিজ্ঞাসা করলাম, সে রিংটি চিনে কিনা?
' ও বলল , হ্যাঁ। ওর মা বাগদানের আংটিটি হারিয়েছিলেন বাগানে। আর কখনও খুঁজে পায়নি । আঙটিটা এই গাজরের সাথেই বেড়ে উঠেছে ।'
মেরি গ্রামসের বয়স তখন ৮৪ । গাজর কেটে আঙটিটা আঙুলে পরে দেখলেন সুন্দর ভাবে ফিট হল উনার হাতে ।
সুন্দর না ?
প্রকৃতি কিছুই হারিয়ে যেতে দেয় না।
নিয়ম ।
৯
বাড়ি ফেরা একটা আদিম অনুভুতি ।
সেই সেই সময়ে , গুহাতে যখন আমাদের পূর্বপুরুষেরা থাকতো তারা যখন শিকার শেষ করে কাধে বাইসন নিয়ে বাড়ি ফিরত তখন কেমন অচেনা বোধ জন্ম নিত ।
সেটাই আমাদের কোষ যত্ন করে রেখে দিয়েছে । তাই বাড়ি ফিরতে ভাল লাগে ।
শহরের শেষ বাস সাতটা পনেরোতে । কাটায় কাটায় সাতটার সময় বাসস্টপে বসে থাকি ।
বাসস্টপ খোলা । মাথার উপর কাচের একটা ছাউনি ছাড়া কিচ্ছু নেই । তিন দিক খোলা । হু হু হাওয়ায় শামুকের মত লাগে ।
বেশির ভাগ সময় কাগজের কাপ ভর্তি কফি নিয়ে বসে থাকি ।
বাসটা লাল টুকটুকে । দেখলেই মন ভাল হয়ে যায় । বেশির ভাগ ড্রাইভারের চেহারা চেনা হয়ে গেছে ।
হ্যালো- হাই মার্কা সম্পর্ক । একবার বাসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম । আমার দোষ কি ? ভেতরে হিটার উষ্ণ আদর দিচ্ছিল ।
শেষ বাসস্টপে আমার বাসা।
ড্রাইভার নরম গলায় ডেকে দিল , ' ম্যান তোমার বাসা ।'
কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নেমে পড়লাম । লোকটা দেখতে টারমিনেটর টু মুভির পুলিশ অফিসারটার মত ।
মানুষে মানুষের এই চেহারার মিল কি আমি একাই দেখি ? যেমন একবার লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দিরের বাইরে দেখি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঝালমুড়ি বিক্রি করছে । উনার ঝালমুড়ির নাম রাখা উচিৎ ছিল - মৃন্ময়ীর ঝালমুড়ি । বা মীরার ঝালমুড়ি ।
আরেকবার দেখি কবি নজরুল গামছা বিক্রি করছে কালিবাজারের মোড়ে । অবাক হয়ে চেয়ে ছিলাম । সেই চুল । স্বপ্নিল চোখ । আমাকে চেয়ে থাকতে দেখে
কবি বললেন , ' রঙ পাকা গামছা । লইয়া যান ।'
আমি ম্যাকবেথ হয়ে চলে এলাম ।
আজ বাসে উঠা মাত্র তিব্বত ঘামাচি পাউডারের মত তুষার পরা শুরু হল ।
কেমন ঘোর লাগা দৃশ্য ।
একদম পিচ্চি বেলায় বন্ধু পিঙ্কুর বাড়িতে আজব একটা জিনিস দেখেছিলাম । কাচের বল । ভেতরে একটা রাজ প্রাসাদ । বলটা ওষুধের শিশির মত ঝাঁকি দিয়ে রেখে দিলে দেখা যায় প্রচুর তুষার ঝড়ে পড়ছে সেই রাজপ্রাসাদের উপর ।
জিনিসটার নাম স্নো গ্লোব ।
তখন থেকেই মনে হয়েছিল , এমন দিন আসবে ?
আমি কাজ শেষে বাড়ি ফিরব । কর্কশিটের গুড়োর মত নেমে আসবে সফেদ তুষার কুঁচি !
রাত দশটা গহন রাত এখানে ।
গত দুইদিন ধরে সারাদিন সারারাত তুষার ঝরেছে । উষ্ণ কামরায় থাকলে কিছুটি টের পাওয়া যায় না।
রাতে বারান্দায় ছিলাম । বাস স্টপের ওখানে কিসের শব্দে চমকে ফিরে দেখি কমলা রঙের কিম্ভুত একটা বাহন । আচমকা মনে হল কোন স্পেসশিপ না তো ? আধো নীল অন্ধকারে বেশ লাগছিল । ওর মাথায় এক চোখের মত উজ্জল আলো ।
চিনতে পারলাম ।
স্নো কাটার ।
রাস্তায় বরফ জমে ডাই হয়ে থাকে । মুফতে আইসক্রিম যেন । পথ আর আপথের দিশা খুঁজে পাওয়া যায় না। গাড়ির চালকরা দিশেহারা হয়ে যায় । সরকারী লোক এসে স্নো কাটার চালিয়ে পথের বরফ পরিষ্কার করে রাস্তা মেরামত করে দিয়ে যায় কয়েক প্রহর পর পর ।
অথচ শহর থেকে সাড়ে তিন মাইল দূরে আছি । রাতে তেমন গাড়ি আসবে যাবে না। চাইলেই কাল সকালে করতে পারে । কিন্তু যদি কেউ আসে ? এই চিন্তায় কাজ করে সারারাত ।
' ডু ইউ মিস ইয়োর লিটল টাউন ?'
একটা গানের লাইন । বিখ্যাত কোন অ্যালবাম না । রাস্তার ধারের এক ভিক্ষুকের গান । পশমি কোট গায়ে চাপিয়ে সস্তা স্প্যানিশ গীটার ঝাঙ যহাং করে বাজিয়ে গান গাইছে । কয়েকটা মুদ্রা পেলেই ঢুকে যাবে পাবে । পান করবে এক পাত্র রাই পচানো ফেনিল বিয়ার ।
গানের লিরিকগুলো নতুন কিছু নেই । পল সাইমনের , মাই লিটল টাউন' গানের কথা সামান্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেছে এই ভিক্ষুক গায়েন ।
ভাবছে কেউ ধরতে পারবে না। আবার এটাও ঠিক বাড়ি ফেরার অনুভূতি সবার এক ।
বাড়ি নিয়ে হাজার কোট আছে । বিখ্যাত সব কোট ।
''বাড়িতে থাকার মত আরামের কিছু নেই''' - যেন অস্টিন ।
''যদি তুমি জান বাড়ি ফিরছ তবে পথের যাত্রার কষ্ট কিছুই না'' - আঙ্গেলা উড ।
হাজার হাজার বাক্য । লাইন । তবে একদম মনের কথা ।
মারিয়ানা আইল্যান্ডে কাজ শেষ করে গভীর রাতে বাড়ি ফেরা মিস করি । দুই ধারে নারকেল গাছ । একটা দুটো দোকান তখনও খোলা । আদিবাসিদের গান ।
আবার আফ্রিকায় রাতে বাড়ি ফেরা কত শিহরণ জাগানো । বাড়ি ফেরার সময় একজন বন্দুকধারি আস্কারি ভাড়া করতাম ।
সিডনিতে রাত দশটায় কুয়াশায় ভিজে বাড়ি ফেরা । আলবার্ট পার্কের সামনে আসলেই দূরের ক্লিভল্যান্ড ষ্ট্রীটের সেই বাড়ি । ভেতরে হিটারের উষ্ণ আমন্ত্রণ । বারান্দায় কমলার খোসার মত আলো ।
সবচেয়ে সেরা ছোট্ট বেলার বাড়ি ফেরা ।
শীতের মায়াবী বিকেল । গুলশান সিনেমা হলের বাইরে পুরানো বইয়ের দোকান । পেপারব্যাক বই - রানা সাবধান ! ক্ষ্যাপা নর্তক।
দোতলায় গানের রেকর্ডের দোকান সুরবিতান । বাজছে চলতি হিন্দি গান । তখনও ডিজে বা রিমিক্স আসেনি । বিনাকা ঝঙ্কার ।
ফুটপাথে মাফলার বিক্রেতা । পিঠা বুড়ি । দাউদের মলম । বাঁধাকপির বাঁধান ভালবাসা । ঠগিদের মত চেহারার ঘুগনিঅয়ালা।
সব আছে আগের মত ?
না বদলে গেছে ?
১০
ইনস্ট্যান্ট কফি এমনিতে ভালই ।
রণে বনে জঙ্গলে যেখানে দরকার খানিক গরম জলে গুলিয়ে নিলেই হল । আমেরিকান সিভিল অয়্যারের সময় ইউনিয়ন আর্মিদের জন্য জিনিসটা বানানো হয়েছিল । সৈনিকদের মাঝে জিনিসটা বেশ জনপ্রিয় হয়ে যায় । ঐ যে বললাম , টিনের মগে এক চামচ কফি নিয়ে ঘুঁটা দিলেই তৈরি । প্রথম আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এর জনপ্রিয়তা হু হু করে বেড়ে উঠে । সঙ্গত কারনেই বাজারে টিনের কৌটা ভর্তি করে ছাড়া হয় আম জনতার জন্য ।
ক্যাম্প কফিও বলে । সম্ভবত ক্যাম্পিঙে নিয়ে যেত তাই । খনিতে কাজ করা শ্রমিক হতে দূরপাল্লার যাত্রীরাও এই কফিটা পছন্দ করতো ।
কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি ব্রিউ করা মানে চোলাই করা কফির তুলনা একদম হয় না। হতে পারে না।
চোলাই করা কফির স্বাদ পেতে হলে অবশ্যই কফির মেশিন আর কাগজের ফিল্টার লাগবে ।
কফির দানা, যেটাকে আদর করে কফির মটরশুটি বলা যায় সেটার গুড়া কাগজের ফিল্টারের উপর রেখে পেয়ালা মেপে জল দিয়ে মেশিন চালু করে দিলেই গরম জল ফোঁটা ফোঁটা হয়ে পড়তে থাকে কফির গুঁড়ার উপর ।
কাচের কেটলিতে চোলাই হয়ে জমতে থাকে তরল কফি।
এই সময় যে সৌরভটা জন্ম নেয় সেটার দামই কোটি টাকা ।
তারপর চিনি বা ক্রিম মিশিয়ে ইচ্ছা মত ...হেন তেন ।
দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি কফি খাওয়া হয় ফিনল্যান্ডে । হিসাবে দিনে আট থেকে দশ পেয়ালা কফি গিলে এরা । আর পেয়ালার সাইজ দেখলে যে কারও পিলে চমকে যাবে ।
সব জায়গায় কফির দোকান পাওয়া যায় কয়েক কদম পর পর । মুদির দোকানে পর্যন্ত কফির মেশিন রাখে । নিদেন পক্ষে একটা কেতলি থাকে । পাশে চিনির কিউব , দুধ , ক্রিম । সাথে একগাদা কাগজের কাপ ।
ক্যাফেগুলোতে সিরামিক বা কাচের পেয়ালা রাখে । বাতাস ভর্তি মিষ্টি চনমন করা সৌরভ । এক পেয়ালা এক ইউরো থেকে শুরু ।
বেশির ভাগ দোকানে প্রথম পেয়ালা শেষ হলে দ্বিতীয় পেয়ালা বিশ সেন্ট । কেউ কেউ মুফতে দেয় ।
শীত আসার আগেই যে ভাবে বরফ পড়ছে তাতে মনে হচ্ছে এই বছর বরফ যুগ শুরু হতে পারে ।
কি কাণ্ড, দোকানে দেখি এক কোম্পানি ব্রিউ কফি সস্তায় দিচ্ছে ।
বিশাল এক প্যাকেট কিনে ফেললাম ।
আরোও একটা ব্যাপার, এইদেশে বলে গরম কফির চেয়ে একটু ঠাণ্ডা কফি নাকি বেশি মজার । শক্তিশালী ।
কথাটা মিথ্যা নয় ।
পিটার টনকিনের লেখা ' কিলার' উপন্যাসে বেশ খানিক পরপর লেখা ' কফি বানাতে বসলো ওরা ।'
চারিদিকে বরফ । সাদা হয়ে গেছে প্রান্তর । সাগরে ভাসছে বরফের চাই । পড়তে গিয়ে মনে হয়েছিল লেখক বোধ হয় কফি লাভার ।
পড়ার সময় বিরক্ত লেগেছিল। এখন বুঝি কত স্বাভাবিক ব্যাপার ওটা ।
মারিয়ানা আইল্যান্ডে কফি চা দুটোই ঠাণ্ডা চলত । টিনে ভর্তি বরফ শীতল আইস কফির অন্য একটা মাজেজা ছিল । ড্রাগ অ্যাডিক্টের মত আইস কফি অ্যাডিক্ট হয়ে গিয়েছিলাম ।
সিডনীতে দিনে দুই পেয়ালা লাগত ।অনেক বাঙালি হালকা পাতলা ঠেস দিয়ে কথা বলতো - উনারা তিন ডলারে কফি কেনাটা বিলাসিতা এবং অপচয় মনে করতো । বেঁচে থাকুক উনারা ।
স্ক্যান্ডিনেভিয়া দেশগুলোতে কফি না হলেই নয় ।
স্ক্যান্ডিনেভিয়া মানে বিপদজনক দ্বীপ ।
আমি শুধু চিন্তা করি, আজ থেকে কুড়ি বছর আগে এরা টিকতো কি ভাবে ?
বোধহয় সেইজন্যই আদিম নরওয়ের ভাইকিংরা কাঠের পেল্লাই সব নৌকা বানিয়ে সাগর পারি দিত ?
স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ফিনল্যান্ডের লোকজন কফি গেলে ভ্যাম্পায়ারেরা ঠিক যে ভাবে রক্তপান করে সেইভাবে ।
ফিনিশরা মাথাপিছু ১২.২ কেজি কফি ব্যবহার করে । মাসে এক কেজি কফি । বাপরে ।
উপায় নেই গোলাম হোসেন । উত্তর ফিনল্যান্ডে মাইনাস ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত শীত পরে ।
ঘুম থেকে উঠেই দেখবেন বাইরে ঘুটঘুটটি অন্ধকার । অথচ সকাল সাড়ে আটটা বেজে গেছে । চাঙ্গা করার জন্য কফি লাগবেই ।
আমি তো জম্বির মত টলতে টলতে ফিল্টারে কফির গুড়ো দিয়ে মেশিন চালু করি । সেই সময় যে কেউ আমাকে দেখলেই ভয় পেয়ে যাবে । পৈশাচিক চেহারা ।
পরপর দুই পেয়ালা খতম করার পর নিজেকেই জিজ্ঞেস করি - কি হয়েছিল আমার ?
১১
কোন এক কমলা রঙের গরমের বিকেলে হাঁটতে গিয়ে দেখি এক বাড়ির সামনে পিচ্চি সাইজের কাঠের একটা আলমারি । এবং সেটা ভর্তি হরেক পদের বই । পুরানো । আজকাল আর যেসব বই বাজারে পাওয়া যায় না ।
সেই আলমারির উপর আবার কাগজে সেঁটে লিখে রেখেছে - মুফতে বই, আপনার জন্য ।
তখন কি অবস্থা হয় ?
ভাষায় প্রকাশ করা মুশকিল ।
এইসব ক্ষেত্রে আমার অবস্থা হয় আলীবাবার মত । চিনলেন না ? আরে মর্জিনা যার বাসায় কাজ করতো । চল্লিশ জন মন্ত্রী ...সরি ডাকাত নিয়ে কেমন গা ছমছমে একটা কাহিনি আছে না ?
সেই আলীবাবা ডাকাতদের গুহায় ঢুকে যেমন কয়েছিল তেমন হয় আমার দশা । আসলে আরও খারাপ হয় । আলিবাবার ভাই কাসেমের মত সব নিতে চাই ।
প্রথম বার যখন অমন বইয়ের আলমারি দেখলাম, বাড়ির বারান্দায় বুড়ো মত এক লোক বসে অখ্যাত কোম্পানির বিয়ার গিলছিল । দুটো বই নিয়ে বললাম - দুটো নেয়া যাবে ?
উনি কেমন হাসি দিলেন । পুরানো জামানার লেখকরা যেটাকে ' স্মিত হাস্য ' বলে সেটাই দিয়ে বললেন , ' সব নিয়ে যাও , না করল কে ?'
বেহায়ার মত হেসে বললাম , ' বড় পলিথিন ব্যাগ আছে আপনার কাছে । ?'
মানুষ মাত্রই লোভী । ম্যান ইন অন লোভ ।
১২
ঘুম ভাঙ্গার পর কয়েক মুহূর্ত কেটে যায় । বুঝে উঠতে - আমি কোথায় ?
মারিয়ানা আইল্যান্ডের গোল্ড বীচ হোটেল ? সিডনি শহরে মাইকেলের বাসা ? আফ্রিকার নিঝুম গ্রাম বোকোটোর নিঃসঙ্গ বাড়িটা ?
লন্ডনের কেন্টের সিলোটি ভদ্রলোকের সেই পুরানো দোতলা বাড়ি ? সেসেলি দ্বীপের টিনের বিচ্ছিন্ন বাড়ি ? নাকি নিজের বাসায় ?
গত ছাব্বিশ বছরের বেশি সময় পাখির মত দেশান্তরী হবার ফলে এই দশা ।
তবে নিজের বাড়ির একটা ঘ্রান আছে । মায়ের শরীরের মতই । ঘুমঘুম চোখে রান্নাঘরের শব্দ পাই । মা কাজ করছে । চায়ের সৌরভ । যেটা শুধু আমার বাড়িতে আমার মা বানায় । আর কোথাও না । কোথায়ও না ।
এখানে ঘুম ভাঙলে বোঝা মুশকিল আরও । বাইরে বেশির ভাগ সময় অন্ধকার । ঝড়ো বাতাস আর তুষারের ভয়ে জানালার শার্শি দোকর , দুইবার দেয়া ।
সারারাত তুষার পড়লেও টের পাই না। মাঝরাতে বাথরুমে যাবার সময় বারান্দার দিকে চোখ গেলে দেখি চারিদিকে শুভ্র কারাগার ।
কেন এমন হয় ?
কেন স্মৃতি এমন আশ্চর্য বিভ্রম জাগায় মনে ?
যদি মনে করতে না পারি কে আমি ? যদি ঘুম ভেঙ্গে বাইরে এসে দেখি সবাই অচেনা । যদি এমন হয় , ওরা আমাকে চেনে না ? পরিচিত কিছু নেই , তখন ?
মগজ খেলা করে না আমাদের সাথে ? করে তো ।
কাল বাড়ি ফেরার সময় বাসে উঠছিল এক ললিতা । পোড়া ইটের মত লাল চুল । হাতে কফির তরল ভর্তি কাগজের পানপাত্র । কি এক সৌরভ মেখেছে তার কায়াতে কে জানে । মিষ্টি সেই সৌরভ কেমন যেন চেনা চেনা ।
আচমকা মনে পড়লো ।
অনেক আগের কেউ মাখত এমন সৌরভ , যে ছিল খুব কাছের কেউ ।
পঞ্চ ইন্দ্রিয় আমাদের বৃত্তে বন্দি করে রাখে । মগজ চালায় আমাদের ?
একটা পরীক্ষা করে দেখুন । নিজের জিভ মুখের বাইরে এনে প্যাচিয়ে ওটায় আঙুল বুলিয়ে দেখুন ডান অংশে হাত দিলে মনে হবে বামে দিয়েছেন । বামে দিলে মনে হবে ডানে ।
ব্রেইন বুঝতে পারছে না। জিভ উল্টে যাবার স্মৃতি নেই ওর ।
প্লেটো বলেছিলেন - আমরা সেইসব জিনিস চিনি যেগুলো সত্যি আছে , বা বিশ্বাস করি সেইসব সত্য । অথবা কেউ আমাদের বিশ্বাস করায় সেইসব জিনিস সত্য !
খুব সাংঘাতিক !
শীতকালে ফুলকপি পাওয়া যায় । সত্য । বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করার দরকার নেই । গ্রামে গিয়ে ফসলের মাঠ দেখার দরকার নেই । পিরামিড মিসরে । এটাও সত্য । নিজের চোখে না দেখলেও । মিসরে না গেলেও । জানি ওটা আছে । জানলাম কিভাবে ?
পড়ে । লোকের মুখে শুনে । তথ্য মগজে রয়ে গেছে । মিসর বললেই পিরামিড । ইয়েতি বললেই হিমালয় । খোঁজ নিয়ে দেখুন কোন কোন শব্দ শোনা মাত্রই মগজ অমন আরও কিছু তুলে ধরছে আপনার মনের পর্দায় ।
এখন এই স্মৃতি জিনিসটা একা কোন জিনিস না। মগজের ভেতরের কোটি কোটি কোষ, নিউরন এই সব মিলিয়ে স্মৃতি । এরা সব জমিয়ে রাখে মগজের সিন্দুকে । সেই সব নিউরনে ছোঁয়া দিলেই পুরানো স্মৃতি বের করে আনতে পারে বিজ্ঞানীরা ।
ভাল কথা ।
মগজে কত স্মৃতি থাকতে পারে ? কত ? কি পরিমাণ সুখ - দুঃখ বা হাবিজাবি স্মৃতি ধরে রাখতে পারে আপনার মগজের নিউরন আর কোষেরা ?
কাটায় কাটায় বলা মুশকিল ।
তবে নর্থ ওয়েস্ট ইউনিভারসিটির প্রফেসর পল রেবার বলেন - ২.৫ পেটাবাইট ক্ষমতা আমাদের মগজের ।
কত ?
উমম সোজা করে বললে টিভি চালু রেখে ওর সব অনুষ্ঠান রেকড করতে থাকুন । টানা তিনশো বছর ধরে রেকর্ড করলে যে পরিমাণ সিডি বা পেনড্রাইভ লাগবে সেই পরিমাণ স্মৃতি আপনার মগজ ধরে রাখতে পারে ।
খারাপ না, কি বলেন ?
সব মনে রাখে ও । গত মাসে পড়া রোমাঞ্চপন্যাস , ছোট বেলায় হারিয়ে যাওয়া ফুটবল , যেই সব মানুষ আপনি পেয়েছেন , বাস্তব দুনিয়ার হাজার হাজার তথ্য ।
সব মাথায় থাকে ।
বাস্তব দুনিয়া !
এখন বাস্তব দুনিয়া সেটা কি ?
বাস্তব কোনটা ? হাজার বছর ধরে জানতাম সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘোরে সেটাই বাস্তব ছিল তখন । নাকি ?
তারপর প্রমান হল উল্টো । মানে সূর্য না পৃথিবী ঘোরে ।
আসলে আমরা পুরোপুরি বাস্তবে থাকি না। অর্ধেক বাস্তব আর অর্ধেক অন্ধকারে থাকি । প্রতিদিন নতুন নতুন জিনিস আবিস্কার হচ্ছে , নতুন জিনিস জানছি । সেইভাবে অল্প অল্প করে বাস্তবতা জানছি , শিখছি ।
দেশলাই জ্বালানো হতে কম্পিটর চালানো শিখছি আমরা , মগজ মনে রাখছে শেখার সময় । পরে নিজে নিজেই পারছি ।
সারা পৃথিবী সম্পর্কে আমরা যা জানছি আমাদের মগজ সেইসব আমাদের জানাচ্ছে ।
কে জানে আসলে কি হচ্ছে ! হয়তো এই বিশ্বজগত তৈরি হয়েছে মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে ! আমরা বাস করছি সাজানো কোন জগতে । সব তথ্য আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে কেউ । সেই হিসাবে জীবন যাপন করছি আমরা ।
যেমনটা প্রাচীন ঋষিগণ বলে গেছেন - এই জগত সব মায়া । বাস্তব কিছু নয় । অলীক । চোখের মোহ ।
কেন এইসব গাজাখুরি থিউরি বানিয়েছিলেন তারা ?
আসলেও কি আমরা জানি কি হচ্ছে চারিদিকে ?
২০০২ সালে তনডা লিন আন্সেলি নামে এক যুবতী গুলি করে তার বাড়িওয়ালীকে খুন করেছিল ।
বিচারের সময় সে বলেছিল - আমি ভেবেছি চারিপাশে যা কিছু হচ্ছে বাস্তব কিছু না। সাজানো ঘটনা । অলীক ।
কি যুক্তি !
বিচারে কি রায় হয়েছিল সেটা আপাতত থাকুক ।
বাস্তবতা অন্য কিছু ।
ওটা আপনি না থাকলেও চলবে । আপনি না থাকলেও বৃষ্টি নামবে । দুধের সরের মত জোছনা গলে গলে পড়বে । বাওকুড়ানি হাওয়া বয়ে যাবে ।
কিন্তু আপনি জানবেন কি করে সব সত্য ? আপনি না থাকলে ও সব চলবে । বাস্তবতা আসলেও সত্য ? নাকি শুধু বিশ্বাস করতে হবে বাস্তবতা সত্য ?
মারটিন গার্ডনার সাহেব দুটো দারুন রকমের বই লিখেছেন । বইতে উনি ব্যাখ্যায় গেছেন - মায়া জগত বা বিভ্রম নিয়ে উনি কথা বলতে চান না। কারন বাস্তবতা অনেক সহজ , সুস্থ এবং এটাই কাজ করছে চারিদিকে ।
বাস্তবতা আসলেও সত্যি কি না উনি জানেন না। উনি বলেছেন - প্রকৃতি আসলে কি সেটা আমি জানব কি ভাবে ?
প্রকৃতিতে কত রহস্য আছে । আমার বাসার বিড়ালটা কি ভাবে জানবে ল্যাবটবের সামনে বসে আমি কি করি ?
কিবোর্ড কি জিনিস বিড়াল জানে না । তবে ওর কাছে ওটা মজার জিনিস । খেলা করে । জিনিসটা গরম , শব্দ করে চলে । আর স্কিনে আলো দেখা যায় । ঐ বিড়ালটার চেয়ে আমরা আলাদা কিছু না। ল্যাবটব কিবোর্ডের বদলে আমাদের সামনে রয়েছে রহস্যে ভরা এই বিশ্ব জগত ।
আমরা সারা জীবনেও এইসব রহস্যের কূল কিনারা পাব না ।
প্রত্যেকটা প্রশ্নের সঠিক জবাবও আমরা পাব না ।
কখনই না ।
কিন্তু এইসব আদিম রহস্য আর প্রশ্ন আমাদের সব সময় ভাবাবে । চিন্তা করাবে ।
কিন্তু বিশ্বজগত তার রহস্য কখনই শেষ করবে না ।
রেখে দেবে তার কাছেই ।
১৩
ব্লু বেরি ফলের মত নীল অন্ধকার বাইরে ।
ঈশান কোনে জংলের মধ্য দিয়ে রাস্তা আছে । অনেক গভীর রাতে সেটা দিয়ে দুই একটা গাড়ি যায় । শহরে যাবার এটা একটা রাস্তা । খুব বেশি ব্যবহার হয় না ।
এই সাঝবেলাতে স্নো কাটার চলছে । বরফ কেটে পরিষ্কার করে দিয়ে যাচ্ছে কমলা রঙের রোবটের মত গাড়িটা ।
কামরার ভেতরে বসে দৃশ্যটা দেখে কারন ছাড়াই মন ভাল হয়ে গেল । কেউ যদি চলে আসে তবে দিশা হারিয়ে জঙ্গলের ভেতরে চলে যাবে না ।
' ভারতীয় চা বানাতে পার না কি ?' কিচেনে যেতেই বাড়িওয়ালার সাথে দেখা । রান্নাঘরের পিছনে জমে থাকা বরফ পরিষ্কার করছে । তুষার ভাল্লুকের মত লাগছে ওকে ।
'ভারতীয় চা জিনিসটা কি ?' জানতে চাইলাম ।
' আরে সেটা তো তোমার জানার কথা ।'
'জানি না । আমি তো বাঙালি ।'
'তা বটে । অনেক আগে হেলসিঙ্কিতে খেয়েছিলাম । চায়ের পাতা , সাথে বে লিফ আর হাজার পদের মসলা দেয়া । দুধ দিয়ে প্রায় বাদামি করে ফেলেছে । আর ভীষণ মিষ্টি । গরম কোন দই যেন । '
' বানাতে পারি না । এত জিনিস দিয়ে চা বানায় শুধু আলকেমিস্টরা ।'
'বিকেলে দেখি জঙ্গলে ঘুরতে যাও । খুব ভাল জিনিস । এই এলাকার জংলে পথ হারানোর ভয় নেই । তারপরও উজ্জ্বল কাপড় পরে যাবে । কমলা , লাল , হলুদ হলে ভাল হয় । শাদা , সবুজ , ধূসর কালো না হলেই ভাল । কেমোফ্লেজ । ছুটির দিনে পড়ে পড়ে না ঘুমিয়ে মাছ ধরতে পার । বাড়ির পাশেই তো লেক সায়মা । এইদেশের সবচেয়ে বড় জলাভূমি । আজ থেকে ছয় হাজার বছর আগের লেক । সেই বরফযুগের আমলের । প্রচুর মাছ পাবে ওখানে । থাইম্যালাস থাইম্যালাস, বিম , আর্কটিক চার, স্যামন, আর আছে ব্রাউন ট্রাউট ।'
'মাছ ধরার লাইসেন্স নেই ।'
'নিতে কতক্ষণ । শোন ছোকরা , কেনা মাছের চেয়ে নিজের হাতের ধরা মাছের স্বাদ মিলিয়ন গুণ বেশি । জিনিসটা যখন হলুদ বাদামি রঙ্গে ভাঁজা হয়ে টেবিলে আসবে তখন টের পাবে ।'
'আমার মাছ ধরার রাশি নেই ।'
'সেটা আবার কি ?'
' লাক। ভাগ্য ।'
' আরে হ্যাত । মাছ ধরার আসল জিনিস হচ্ছে জায়গা নির্বাচন আর চার । আমি যখন ধরতাম চার হিসাবে ঝিঝি পোকা , গঙ্গা ফড়িঙ , জোঁক , মৌমাছি , বাসি রুটি , মাছের চোখ আর ঘাস চিংড়ি ব্যবহার করতাম ।'
' ঘাস চিংড়ি ?'
'হ্যাঁ , জলাভূমিতেই পাবে । গ্লাস চিংড়ি বা ঘোস্ট চিংড়ি ও বলে । এক দম পিচ্চি পিচ্চি । স্বচ্ছ । জলের সাথে মিশে থাকে । খাওয়া যায় না কিন্তু মেরিন বায়োলজির অংশ । মাদার ন্যাচার বানিয়েছে । ঝাঁঝি জাল ফেলেই ধরা যায় ।'
মনে পড়লো সেই শৈশবে সস্তাপুরের ওখানে চানমারি টিলার পিছনে দারুন একটা জলাভূমি ছিল । খেলতে গিয়ে অনেকবার দেখেছিলাম । ওই চিংড়ি জীবনেও বড় হয় না । স্বচ্ছ শরীরের ওর পরিপাক তন্ত্র মগজ সব দেখা যেত ।
আমি ভাবতাম এই জলার চিংড়ি কখন বড় হয় না কেন ?
কি রহস্য ?
এটার নাম তবে -ঘাস চিংড়ি । বা ভূত চিংড়ি ?
দারুন তো !
ব্রিউ করা কফির ভাল বাংলা কি হবে জানা নেই । আমি চোলাই করা কফি লিখি । শুনতে যাই হোক এই জিনিসের তুলনা আর কিছু হয় না।
আমাকে জম্বি থেকে মানুষে রূপান্তর করে পর পর দুই পেয়ালা চোলাই কফি ।
এখানে শীতকালে সকাল সাড়ে আটটায় ব্লু- বেরি ফলের মত অন্ধকার থাকে । মনে হয় মধ্যরাত । বিকেল চারটায় আবার পাকা জামের মত অন্ধকার চলে আসে ।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বাসায় ফিরি । কিন্তু মনে হয় গভীর রাতে ফিরছি ।
কোন ভ্যাম্পায়ার এইদেশে থাকলে মনের আনন্দে দিন কাটাচ্ছে সন্দেহ নেই ।
বাসস্টপে খানিক দাঁড়াতে হয় । এইসময়টা কষ্টের । মনে হয় আন্দেজের পাহাড়ে বন্দি হয়ে আছি ।
দৌড়ে বাসে উঠে দেখি কার্ড পাঞ্চ করতে পারছি না। আঙুল সব কাঠ হয়ে গেছে ঠাণ্ডায় ।
বাসের ভেতরে হিটার আমাকে আবার নতুন জন্ম দেয় । যেমন বরফযুগ শেষে জমাট বাঁধা বরফের ভেতর থেকে বের হয়ে আসছে আদিম কোন প্রাণী । যার ফসিল আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি । ঘুমিয়ে আছে মাটির কোন এক স্তরে ।
মারিয়ানা আইল্যান্ডে কোরিয়ান এক ক্যাফে অ্যান্ড বারে মাছের ফসিল দেখেছিলাম । পিরানহা মাছের পূর্বপুরুষ । আতংকের, কিন্তু সুন্দর ।
সেই দোকানে গোপনে বিক্রি করতো গ্রিল করা পিরানহা । দেখে কিন্তু মনে হয় রূপচাঁদা মাছ । চিনামাটির শাদা তশতরি করে পরিবেশন করা হত সেটা । সাথে টুকটুকে লাল গ্লোব টম্যাটোর চাক আর হলুদ লেবুর অর্ধেক । পেটমোটা আর্কোরোক মগ ভর্তি সোনালী বিয়ার । ফেনিল ।
আর্কোরোক মগটা ক্লাসিক । আনারসের মত খাঁজকাটা শরীর । যেখান থেকেই আলো পড়ুক দেখতে বড্ড মায়াবী লাগে ।
বাস থেকে নেমে প্রায়ই দেখি, টাক মাথার এক লোক ধোঁয়ায় ঝলসানো স্যামন বিক্রি করছে । রাস্তায় ।
স্মোকড স্যামন লোভনীয় জিনিস ।
মাছের ফালিতে সামান্য লবণ মাখিয়ে কমপক্ষে তিন ঘণ্টা ধোঁয়ায় রাখা হয় । হিকরি কাঠের ধোঁয়া । সাথে তেজপাতা আর দূর্বাফুলের ডাটার মত রোজমারি গুল্ম ।
পোড়া পোড়া এই ঘ্রাণটা অনেকেই বেশ পছন্দ করে । চারশো গ্রাম মাছের ফালি সাত ইউরো রাখে, দোষের কিছু দেখি না।
টাক মাথার ঘুম ঘুম চোখের এই মাছ বিক্রেতাকে কেমন শেক্সপিয়রের মত লাগে । আবার সেইরকম সূচালো দাড়ি । যদিও কোন প্রমান নেই শেক্সপিয়র দেখতে কেমন ছিলেন । তবে খুব সহজ লোক ছিলেন না প্রাচীন এই নাট্যকার ।
উনার লেখা ভর্তি খুন , আত্নহত্যা আর লড়াই ।
সেই সব দিয়েই দর্শক টানতেন উনি । মঞ্চের উপরে ঘটে যাওয়া এই সব দেখতে পছন্দ করতো লোকজন ।
আজকাল উনার নাটকগুলোর উপর ক্রাইম ফিকশন লেবেল সেঁটে দিয়েছেন কোন কোন সমালোচক ।
'সত্য শেষ পর্যন্ত আলোতে আসবেই । খুন বেশিদিন লুকিয়ে রাখা যায় না - দ্যা মার্চেন্ট অভ ভেনিস ।'
জুলিয়াস সিজার হতে অ্যান্টনি অ্যান্ড কিউপেকট্রা - সব নাটকে মোট তেরো বার আত্নহত্যা আছে ।
ভূতের কথা আছে পাঁচটা নাটকে ।
এক ডজনের মত খুন আছে । সব মিলিয়ে চুয়াত্তর মৃত্যু ।
বাংলাভাষায় শেক্সপিয়রের নাটকের প্রথম অনুবাদক হচ্ছেন নাট্যকার হরচন্দ্র ঘোষ (১৮১৭-১৮৮৪)। ‘দি মার্চেন্ট অব ভেনিস’ অবলম্বনে ‘ভানুমতী-চিত্তবিলাস’ (১৮৫৩) আর ‘রোমিও এ্যান্ড জুলিয়েট’ অবলম্বনে ‘চারুমুখ-চিত্তহরা’ (১৮৬৪)।
এইগুলো ঠিক অনুবাদ নয় । ছায়া অবলম্বন বলা যায় ।
আজকালের মধ্যে রাস্তার এই শেক্সপিয়রের কাছ থেকে এক ফালি স্যামন কিনব ।
আমি যখন ফিরি তখন সে দোকান বন্ধ করে চলে যায় ।
১৩
ইক্কুনাসা অন ইয়াকুক্কা ।
শব্দের অর্থ জানালায় বরফের ফুল ।
মাইনাস বিশ - পচিশ ডিগ্রি শীত আসলে ডাল ভাত । সাথে আচার বা লবণ ছাড়াই ।
কামরায় হিটার থাকায় শীতের কামড় বুঝা যায় না । কিন্তু শেষ রাতের দিকে বা ভোরে জানালার কাচে যখন বরফের কুচি জমে কেমন বিচিত্র অচেনা ফুলের নকশা হয়ে থাকে তখন বুঝি এটাই ইক্কুনাসা অন ইয়াকুক্কা । মানে আজ খবর আছে ।
এই দেশে হাজার হাজার জলাভুমি । চারিদিকে জল । গ্রামের বাড়িতে যাদের বাসা তারা প্রায় সবাই ভাগে একটা করে দিঘি পেয়েছে । কাঠের বাংলো কিসিমের বাড়ি । প্রকৃতির একদম কাছে থাকে এরা । জঙ্গল থেকে বছরে পঞ্চাশ মিলিয়ন কিলো বুনো বেরি জোগাড় হয় । মাথাপিছু দশ কেজি ।
ভোর রাতে অবাক হয়ে দেখি বাগানের শাদা বরফের মধ্যে কিসের যেন পায়ের ছাপ । কয়েকদিন পর আলাদা আলাদা করে চিনতে পারলাম ।
খরগোশ । তুষার শেয়াল । আরেকটা হরিণ ।
প্রথম দুইজনের দেখা পেয়েছি ।
হরিণের দেখা আজও পাইনি ।
গভীর রাতে ওরা হাঁটাহাঁটি করে আমার বাড়ির বারান্দার কাছেই । ভাবতেই কেমন রোমাঞ্চ জাগে ।
দেশের উত্তর অঞ্চলে ভাল্লুক আছে । ওরা মানুষজন এড়িয়ে থাকতেই পছন্দ করে । শীতকালে বের হয় না। বরফ পড়ার আগেই মাটির মধ্যে গর্ত করে পেট ভরে খাওয়াদাওয়া করে ঢুকে যায় ভেতরে ।
পুরো শীতকালটা ঘুমিয়ে কাটায় । বসন্তের প্রথম সপ্তাহেই ঘুম ঘুম চোখে বাইরে চলে আসে ।
কি খায় তখন ?
ডাক্তারনি মেয়েটার নাম তিয়া । লাল চুল ।
চেহারাটা বেশ চেনে চেনা লাগে । মনে হয় কোথায় যেন দেখেছি । পরে মনে পড়লো আরে , স্পাইডারম্যান মুভির সেই মেয়েটার মত না ?
সাড়ে তিন মাইল সাইকেল চালিয়ে আসে রোগী দেখতে । প্রায়ই দেখি রোগী দেখা শেষ করে সাইকেল চালিয়ে ফিরে যাচ্ছে ।
সাই সাই করে চলছে সাইকেল । গায়ে শাদা এপ্রন । পায়ে ক্যামবিসের জুতা । পিঠে কাপড়ের পিচ্চি একটা ব্যাগ । ইংরেজি ভালই পারে ।
দুই পাশে ঘন পাইনের বন । কালো পিচের রাস্তা দিয়ে যখন তিয়া সাইকেল চালিয়ে যায় তখন ওকে দেখে লিল্যান্ড বারডওয়েলের উপন্যাস ' গার্ল অন এ সাইকেল' বইটার প্রচ্ছদের কথা মনে পড়ে । খুব স্বাভাবিক ভঙ্গি । কোন জড়তা নেই । মেয়েদের এই সহজ ছন্দ অন্য রকম ভাবে আকর্ষণীয় করে তোলে ।
শৈশবে সস্তাপুরের চানমারি টিলার ওখানে গিয়ে দেখি রাইফেল ক্লাবের শুটিং হচ্ছে । মেশিনে করে মাটির চাতকি ছুড়ে দেয়া হচ্ছে শূন্যে । ডেনিম জিন্সের প্যান্ট আর চামড়ার জ্যাকেট পড়া একটা মেয়ে রাইফেল তুলে ঠাস ঠাস গুলি করে একটার পর একটা চাতকি ভেঙে ফেলছে অবলীলায় ।
রাইফেলটা ওর হাতে বেশ মানিয়েছে । পরীর কাঁধে যেমন ডানা মানায় ।
আরও একবার মারিয়ানা আইল্যান্ডে দেখলাম - রাতের বেলা বার থেকে বের হচ্ছে চাইনিজ একটা মেয়ে । সিল্কের লাল কেমন একটা পোশাক পড়নের । ওতে ড্রাগনের ছাপ ।
খানিক দূরে দাড়িয়ে ছিল তিন মাতাল আদিবাসি । ওদের একজন শিষ দিয়ে উঠতেই মেয়েটা হেঁটে গিয়ে ক্যারাটি মার্কা কেমন একটা মার দিয়ে আসলো ।
দেখার মত জিনিস । আমার চোখে চোখ পড়তেই মুচকি হেসে বললাম , ' আমার তরফ থেকে একটা ককটেল হয়ে যাক ? ব্ল্যাক রাশিয়ান নাকি কিউবা লিবরা ?’
কি সব দিন গেছে ।
আজ আমার মেডিক্যাল রিপোর্ট আসলো কাগজের খামে । ডেকে নিয়ে ধরিয়ে দিল তিয়া । বলল , ' সব ঠিক আছে । ওজন কমাতে হবে। দুই কেজি কমেছে । দেখ তো তোমাকে বেশ সুন্দর লাগছে ।'
শুনে আমি মেরুর বরফের মত গলে গেলাম ।
'কফি বাদ দেয়ার দরকার নেই ।' আরও বলল সে । ' জীবন থেকে সব আনন্দ নষ্ট করার দরকার নেই।'
কথাটা বেশ ভাল লাগল । তাই তো । আনন্দ নষ্ট করার দরকার নেই ।
' আর খামটা মাটিতে পুতে ফেলবে।' আরও বলল লাল চুল ।
'কেন জাদুর খাম নাকি ?' কিছু বলার দরকার , বললাম । ওর সামনে নার্ভাস ফিল করি । আমার মনে হয় ব্যাপারটা ও নিজেও জানে ।
মেয়েদের কি আর ফাঁকি দেয়া যায় ? দেবীর অংশ যে ।
'আরে নাহ । এটা সিড পেপার দিয়ে বানানো ।' হাসল তিয়া ।
'দানার কাগজ । কি জিনিস ?'
' রিসাইকেল কাগজ । বাতিল খবরের কাগজ পাল্প করে বানিয়েছে খামটা । সাথে সবজি , ফুল আর গুল্মের দানা দেয়া থাকে । বাগানে পুঁতে সামান্য জল দেবে । সামনের মউসুমে টম্যাটো গাছ হবে ।'
ভাল লাগলো ।
প্রকৃতিকে রক্ষা করার জন্য এরা কত কিছু করে ।
আমি চেষ্টা করছি অপ্রয়োজনীয় আলো নিভিয়ে রাখার জন্য । একটা পেল্লাই কড়ই গাছ পুড়িয়ে যে শক্তি পাওয়া যায় সেটা দিয়ে নাকি একশো পাওয়ারের একটা বাল্ব মাত্র এক দিন জ্বালানো যায় ।
১৪
হ্যান্ড ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের , ' নববর্ষের মৃত কিশোরী' গল্পটা পড়েছিলেন ?
সেই যে কিশোরী মেয়েটা দেশলাই বিক্রি করতে বের হয়েছিল । নববর্ষের আগের রাত ।
শীতে জমে যাচ্ছিল বেচারি।
পায়ের স্যান্ডেল হারিয়ে ফেলেছিল । স্যান্ডেল ছিল ওর মায়ের । রাস্তা পাড় হবার সময় একটা হারিয়ে গেছে । অন্যটা রাস্তার ফাজিল এক ছেলে নিয়ে দৌড়ে ভেগে গেছে । দেশলাই বিক্রি হয়নি । কেউ এক বাক্স দেশলাই কেনেনি ওর কাছ থেকে ।
তুষারের হাত থেকে বাঁচতে কোন এক বাড়ির কোনে আশ্রয় নিয়েছিল ।
মনে নেই ?
নিজেকে গরম করার জন্য এক একটা কাঠি জ্বেলে মায়াবী অপার্থিব দৃশ্য দেখেছিল । টেবিল ভর্তি খাবার । পেয়ালা তশতরি । রোষ্ট করা হাঁস । পিতলের গরম স্টোভ , ক্রিসমাস ট্রি । এমন সময় তার মৃত দাদীকে দেখতে পেল । বলল , আমাকে নিয়ে যাও তোমার সাথে ।'
মনে নেই সেই গল্প ?
কি ভাবে এইসব গল্প হাতে পড়ত । মন খারাপ হয়ে থাকতো অনেক দিন।
অস্কার ওয়াইল্ড আর হ্যান্ড ক্রিশ্চিয়ানের গল্পে শীতের কথা থাকতো অনেক । খানিক পরে হাতে এলো ফরেস্ট ওয়েবের লেখা - স্নো বয়েজ । রোমাঞ্চপন্যাস ।
ঘটনার পটভূমি গ্রিনল্যান্ড ।
আটজন পুরুষ আর এক মেয়ে গ্রেসিয়ারের উপরে বানানো ক্যাম্পে কাজ করছে । বরফের গভীরতা আর উপাদান নিয়ে গবেষণার কাজ ।
এই সময় বরফের ধস নামে । আর দুর্ঘটনায় দলের কয়েকজনের স্মৃতি নষ্ট হয়ে যায় । নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে সবাইকে । বিপদের উপর বিপদ। ওদের খুন করার জন্য পিছনে লেগে গেছে এক খুনে এস্কিমো ।
বেঁচে থাকার লড়াই কি জিনিস এই বই না পড়লে বোঝা যাবে না । টানটান কাহিনি । সাথে নরকের মত শীত ।
সেইসময় আন্দেজের বন্দি বইটা পড়া হয়েছিল কোন এক শীতের রাতেই । পাইয়ার্স পল রিড সাহেবের ' অ্যালাইভ' বইটার ছায়া অবলম্বনে লেখা । সত্য ঘটনা । বিমান দুর্ঘটনার পরে মৃত সঙ্গীদের মাংস খেয়ে বেঁচে থাকে বাকি সবাই ।
পরবর্তীতে অমন অনেক বই পড়েছি - তুষার ঝড়ে পাহাড়ের চুড়ায় বন্দি হয়ে থাকার কাহিনি । শুকনো বেকন গরম করে খাওয়া । চকোলেট আর শ্যাম্পেন খেয়ে দিন পাড় করা । টাকা পুড়িয়ে কফি গরম করা ।
আরও সব শীতল আতঙ্কের কাহিনি ।
পড়ার সময় শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যেত ।
মারিয়ানা আইল্যান্ডের সৈকতে বারমুডা হাফপ্যান্ট আর আনারসের পাতার সুতা দিয়ে বানানো হাওয়াইয়ান জামা পরে জলপাই দেয়া মারটিনি গিলে ভাবতাম সারা জীবন এই চীর বসন্তের দ্বীপেই থাকব ।
কিন্তু ঈশ্বর তো চারশো বত্রিশ কোটি বছর আগেই আমার ভাগ্য মেরামত করে রেখেছেন ।
নিয়তিকে কে খণ্ডায় ?
১৪
প্রথম তুষার দেখার অনুভূতি কেমন ?
মনে হয় না গুছিয়ে লিখতে পারব । অতখানি শৈলী আমার কলমে দেয়নি ঈশ্বর । উপমা আর রূপের বর্ণনা দেয়ার ক্ষমতা আমার হাস্যকর রকমের । তাইতো দুপুরের রোদকে আমি লিখি জলপাই তেলের মত রোদ । শীতের রোদ আমার কাছে কাচের পেয়ালা ভর্তি লাল চায়ের মত । জোছনা যেন ইতালিয়ান পনীর ।
আমি তো অন্ধ কবি হোমার না , না দেখেই হেলেনের রূপের কথা বর্ণনা করব ক্রীট আইল্যান্ডের রাস্তায় দাড়িয়ে ।
তবে সেইরাতে মন ছিল বিষাদে ভর্তি । বিছানায় শুয়ে ভাবছিলাম ফেলে আসা সোনালী দিনগুলোর কথা । রাতে দুটোর সময় জানালায় শার্শিতে বিড়ালের নখের আঁচড় শুনে উঠে রান্নাঘরে গেলাম ।
তখন দেখি বাইরের শহর একদম সাদা হয়ে গেছে, কোন এক দুষ্টু জাদুকরের কারসাজিতে ।
আর আকাশ থেকে বিষণ্ণ মনে নামছে বরফের কুঁচি ।ওদের মন খারাপ । ওরা মেঘ হতে চেয়েছিল সারাজীবনের জন্য ।
ছবি তোলার কথা ভুলে গেলাম । ভুলে গেলাম সব অভিমান । যত্ন করে এক পেয়ালা চোলাই কফি নিয়ে বসলাম জানালার পাশে ।
ভাল লাগার অনুভূতি কেমন তরল করে ফেলছে আমাকে ।
১৫
নর্ডিক দেশগুলোতে গরুর মাংস বেশ দাম । তারপর ভেড়া আর শূয়র । মাছ সেই তুলনায় সস্তা ।
খাওয়ার এই একটা ব্যাপার মজার । সিডনিতে আভকাডো বেশ দাম পড়তো । আড়াই থেকে তিন ডলার একটা । আবার আফ্রিকায় উগান্ডায় বাজারে পেল্লাই সাইজের আভকাডো পাঁচশো সিলিং করে কিনতাম ।
কত সকাল দুপুর গোলাপি পেঁয়াজ দিয়ে আভোকাডোর সালাদ আর হাতে বানানো রুটি খেয়ে ছিলাম ।
মারিয়ানা আইল্যান্ডে একটা ফুলকপি কেনার পয়সা দিয়ে দেড় পাউনড মাংস কেনা যেত । সেইজন্য দেশে আসলে আস্ত ফুকপির বড়া বানিয়ে একা আমাকে খেত দিত মা ।
এইখানে মনে হচ্ছে বাকি জীবন মাছ খেতে হবে ।
'এমন মাছ খেলে তো এস্কিমো হয়ে যাব ?' বললাম বাড়িওয়ালীকে ।
'ফুড হ্যাবিট বদলানো খুব কঠিন ।' সায় দিল ভদ্রমহিলা । ' বেশ কষ্টকর । কিন্তু জানো এস্কিমোরা পর্যন্ত ফুড হ্যাবিট বদলে ফেলছে ।'
'জানব কেমন করে ?'
' তেমনই । ওরা তো জীবন পাড় করে দিল মাছ , তিমি , সিল , মেরু ভাল্লুক আর মাস্কঅক্সেনের মাংস খেয়ে ।'
' মাক্সঅক্সেন কি ?'
' এন্টিলোপ আর গরু টাইপের জিনিস । মনে হয় গায়ে ভারি পশমি কম্বল চাপিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।'
' এস্কিমোদের খাবারের অভাব হল কেন ?'
' বরফ কমে গেছে তাই।'
'মানে ?'
'আক্ষরিক অর্থেই গ্রিনল্যান্ড বরফের সীট দিয়ে ঢাকা ছিল । তলায় ঘুরে বেড়াত মাছ , সিল আর সব শিকার । পঞ্চাশ বছর আগেও প্রচুর মাছ ধরতো । এখন গ্লোবাল ওয়ার্মিং -এর জন্য বরফ গলছে । মাছ কমে গেছে । শিকার ধরাই মুস্কিল । বেশ কয়েকদিন আগে ন্যাশনাল জিওগ্রাফী পত্রিকায় একটা ছবি দেখলাম খাবারের অভাবে মেরুভাল্লুক শুকিয়ে রোগা হয়ে মারা যাচ্ছে ।'
'খারাপ অবস্থা ।'
' এস্কিমো মেয়েরা চাকরি আর উপার্জনের জন্য শহরে আসছে । শিকার প্রথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে । মুদি দোকান থেকে খাবার কিনছে ওরা । ভাবতে পার ? ওরা বিশ্বাস করে দুষ্ট আত্মা নজর দিয়েছে বরফের দিকে ।'
' আধুনিক সভ্যতাই সেই দুষ্ট আত্মা ।’
‘শোন আমরা প্ল্যাস্টিক কম ব্যবহার করতে পারি । বাজারে গেলে বাড়ি থেকে ব্যাগ নিয়ে যাবে । দোকানে ব্যাগ প্রতি ত্রিশ সেন্ট রাখে সেইজন্যই ।'
১৬
ওল্ড ফ্যাশন গ্লাস আমার খুব প্রিয় । আইস কফি বা আইস টির মত হাবাগোবা নিরপরাধ পানীয়গুলো ও এই গ্লাসে রেখে পান করি ।
গ্লাসের শরীরে কাঁচি গেইট বা আনারসের মত খাঁজকাটা নকশা । কামরার নরম আলো পড়ে সদ্যকাটা ' ব্রিলিয়ানট কাট' হীরক খণ্ডের অনুভূতি দেয় । সেটার দাম কোটি টাকা ।
দেখতে বেশ লাগে ।
যখন তুষারের মধ্যে হেঁটে বাড়ি ফিরি তখনও তেমন লাগে । অ্যালিস্টার ম্যাকলিনের লেখা উপন্যাসের চরিত্রগুলোর কথা মনে পড়ে । আইস স্টেশন জেব্রা । নাইট উইথআউট অ্যান্ড ।
একটা সায়েন্স ম্যাগাজিনে পড়েছিলাম - শনি আর বৃহস্পতি গ্রহে প্রায়ই হীরার বৃষ্টি হয় । ওখানের ব্জ্রপাত মিথেন গ্যাসকে কার্বন বানিয়ে ফেলে প্রকৃতির নিয়মে । সেই কার্বন হীরা হয়ে ঝরে পড়ে গ্রহের বুকে । বছরে মোট এক হাজার টন ।
মাত্র ।
বিরান প্রান্তরে হীরা নিয়ে বসে থাকার চেয়ে প্রিয় মানুষের উষ্ণ আমন্ত্রণ কত লোভনীয় কেউ কি জানে ?
প্রিয় মানুষটাই আস্ত এক হীরার খনি ।
১৭
বাড়ি ফিরে আবিস্কার করলাম - আমার জন্য একটা বাইবেল আর কাঠের ক্রুশের মধ্যে পিতলের যীশু রেখে গেচ্ছে বাড়িওয়ালা । লোকটা দেখতে শক্তি কাপুরের মত । এত বয়সেও বেশ নক্ষত্রের মত চলাফেরা । আমি বুড়ো হলে যদি অমন প্রানবন্ত থাকি তবে ব্যাপারটা বেশ ভাল হবে ।
' সময় পেলে একটু ঈশ্বরকে ডাকবে ।' বিনয়ের সাথে বলল ।
' ডাকব ।'
' কাউকে ধর্ম চাপিয়ে দেই না। সেটা উচিৎ না । অন্যের ধর্মনাশ করা একটা অপরাধ । ঠিক যেন এক ক্লাব থেকে আরেক ক্লাবে লোভ দেখিয়ে ঢুকানোর চেষ্টা করা ।'
যুক্তি ভাল লাগল ।
আরও ভাল লাগল কামরায় আমি একা না । পবিত্র চিহ্ন আছে ।
দুপুরে ঘুমাতে গিয়ে কেমন হল্লামল্লা শুনে বারান্দায় গিয়ে দেখি কোত্থেকে এক গাদা বাচ্চা এসে বাইরে খেলছে । ওরা কারা ?
'কারা তোমরা ?' নিচে নেমে এলাম । একগাদা দেবশিশু ।
সবাই ফুটফুটে । অদ্ভুত একটা মিল আছে সবার মধ্যে । সবার নাক আর হাঁটুর চামড়া কালশিটে । আমসত্বের প্রলেপের মত । পরে জেনেছি, শক্ত পিচের রাস্তায় ঘষা খেয়ে খেয়ে অমন হয়েছে ।
'ইংরেজি বলতে পার ? না সুয়ামি ?' প্রথমেই নক আউট করে দিল এক পিচ্চি । এটার নাম লাউরি । পরে জেনেছি ।
আর ফিনল্যান্ডের ভাষাকে সুয়ামি (suomi) বলে।
মোটামুটি পারি । হাসি মুখে জানালাম ।
'ইস্কুলে যাও ?'
' না।'
' পাল্লো ( ফুটবল ) আছে তোমার কাছে ?'
'না নেই।'
' খেলবে আমাদের সাথে ?'
'পাল্লো নেই তো ।'
' যোগার করে আনতে পারব । নাম কি তোমার ?' আরেকটা পাকনা বলল । পরে জেনেছি ওর নাম খাঁইদুল্লা । মুখের অর্ধেক দাঁত নেই । পোকায় খাওয়া ।
'মিলন।'
' কিন্তু আভালিনা অ্যান্টি তো বলল, তোমার নাম মেলন ।'
'হ্যাঁ- হ্যাঁ মেলন ।'
'শুধু মেলন না ওয়াটার মেলন ।'
' শুধু মেলন ।'
'বাজে নাম । নাম বদলে আইসক্রিম রেখে দাও । তরমুজের চেয়ে আইসক্রিম অনেক ভাল ।'
জীবনে অনেক রকম বিচ্ছিরি পরিস্থিতি সামাল দিয়েছি । কিন্তু অমন ঈগল গ্যাং আগে দেখিনি ।
আমি জানতাম না ওরা আমার দিনরাত্রি অমন কাহিল বানিয়ে ফেলবে ।
কোত্থেকে একটা বল যোগার করে আনল একজন ।
'আমি খেলতে পারব না ।' সাফ মানা করে দিলাম ।
' ভূরির জন্য ?' দুম করে বলে বসল এক শয়তান ।
বাচ্চারা মিথ্যা বলে না। ওরাই বলতে পারে রাজা তোমার কাপড় কই ? এই প্রথম নিজের ভূরিটার উপর ক্রোধ জন্ম নিল । আসলেও তাই । কোন নরখাদকের দেশে গেলে ওরা আমাকে দেখে কত খুশি হবে কল্পনা করলাম ।
দল বাটা হল ।
একদলে আমি আর লাউরি ।
বাকি দলে আটজন ।
সে এক ধুন্ধুমার ব্যাপার । আমার পায়ে ছাড়া সবার পায়ে বল যাচ্ছে ।
মাঠ ভর্তি শুকনো পাইন পাতা । খসখস করছে । বনরুটির মত মাশরুম হয়ে আছে এখানে সেখানে ।
খেলা শেষ হল । ড্র । কেউ গোল করতে পারেনি । একজন হিজাবি মহিলা এসে আরবি ভাষায় কিছু বলতেই খেলা শেষ ।
' ওরা কারা ?' বাড়ি ফিরে জানতে চাইলাম । ' থাকে কোথায় ?'
' রিফিউজি ।' জবাব দিল সামি । ' ইরাক থেকে এসেছে । কেউ কেউ চেচেনিয়ার ।দূরে রিফিউজি ক্যাম্প আছে । সরকার ওদের খরচ চালায় ।'
১৮
পরের দিনগুলো একটা কেমন ছন্দময় হয়ে গেল । বাইরে রোদ উঠে । এখানে গরমের মওসুমে রাত এগারোটায় সূর্য ডুবে । মহাবিরক্তকর একটা ব্যাপার । বসন্ত চলছে । কাজেই রাত নয়টা পর্যন্ত আলো থাকে । তারপর পশ্চিম আকাশের রঙ পাকা পেঁপের ফালির মত হয়ে যায় ।
পিচ্চিদের গ্রুপটা দুপুর চারটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত খেলে । বিশাল কেওয়াজ । হই চই । নীচ থেকে হাঁক দেয় - তরমুজ আছ নাকি ? এই আইসক্রিম কই তুমি ?
আমি মটকা মেরে বিছানায় শুয়ে থাকি ।
এতদিনে বুঝতে পারলাম আগের দিনের তান্ত্রিকেরা কেন শিশু বলি দিত ।
ছুটির দিনে পায়ে স্পোর্ট সু আর গায়ে নেভি জ্যাকেট চাপিয়ে হাঁটতে বের হই । বসন্তেও জ্যাকেট লাগে ।
জুলাইয়ের মাঝাঁমাঝি সময়ে আপেলগাছগুলোতে সাদার মধ্যে ফিকে গোলাপি রঙের কেমন অচিন ধরনের ফুল ফুটলো । তখনও জানি না এই তিনটে আপেল গাছ । আমি শুধু উত্তরের আর দক্ষিণের বনভূমিতে হেঁটে অর্কিড আর ফার্ন দেখে বেড়াতাম । বাগানের তিনটে গাছের দিকে খেয়াল রাখতাম না ।
তবে বারান্দায় টম্যাটো গাছে হলুদ ফুল শেষ হয়ে লাল মার্বেলের মত চেরি টম্যাটো হয়েছিল লটারি লাগার মতই ।
পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল কিন্তু বিধাতার সহজ সুত্রে ফুল থেকে ফল হয় ।
ফিকে গোলাপি আর সাদা ফুল মিলিয়ে গিয়ে সবুজ রঙের কেমন একটা ফল ধরল । বাড়িওয়ালী জানাল ওটা আপেল গাছ । মাত্র আট বছর আগে গাছ তিনটে বাগানে বসতি গেড়েছে । গত দুই বছর আগে থেকে ফল দিচ্ছে । তিনটে বোনার কারন
হচ্ছে আপেল গাছ একা থাকতে পারে না। বন্ধু দরকার ওদের ।
আর কে না জানে গাছেরা নিজেদের মধে কথা বলে , সুখ দুখের । ওদের অনেক গল্প । আমরা জানি না ।
প্রথম দেখলাম ।
কুল বরই ভেবেছিলাম ।
একদম শৈশবে যখন লেখাপড়ার মত ফালতু জিনিস ধরিনি , তখন বাড়ির পাশেই একটা বরই গাছ ছিল । শীতের রাতে টুপ টাপ শব্দ করে চালের উপর খসে পড়তো বরই ।
পরের সকালে কণকণে ঠাণ্ডায় বাইরে গিয়ে দেখি লাল টুকটুকে পেল্লাই সাইজের বরই পরে আছে । খানিক খাওয়া ।
কে খেল আমার বরই ? মা বলতো - বুলবুলি ।
কিন্তু বুলবুলি তো ধান খায় । তখন খাজনা দেয়া মুশকিল হয়ে যায় ।
বড় হয়ে জেরাল্ড ডুয়েলের বই পড়েই জানলাম - আসলে বাদুর খায় অই সব ।
'কয়েকটা দিন অপেক্ষা কর । হাজারে বিজারে আপেল ধরবে । খেয়ে শেষ করতে পারবে না।' বলল বাড়িওয়ালী ।
' কেমন ধরে ?'
'গাছ প্রতি পাঁচশত আপেল ।'
'মানে তিন গাছে দের হাজার আপেল ?' মনে মনে খুশি হলাম । কল্পনার আপেল পাই বানিয়ে ফেললাম ।
আপেল দিয়ে আরও কি কি বানানো যায় হিসাব করে ফেললাম -
আপেল চিপস ( আলুর চিপসের মতই )
আপেল জুস ( মেশিন আছে আমার কাছে )
আপেল বিস্কিট ( এটা লাগবেই)
আপেল কেক ( রেসিপি জানি। সমস্যা হবে না ) ।
ইহুদি আপেল কেক ( এটা সাবধানে খেতে হবে । নইলে সবাই আমাকে ইহুদিদের দালাল ভাববে)
আপেলের ক্যান্ডি ( এটা একটা চখাম জিনিস , আগেও খেয়েছি )
আবিস্কার করলাম তালিকাটা পুরা গ্রিক বা হিন্দুদের দেবদেবীর মত । অসংখ্য ।
আরও আবিস্কার করলাম আপেল দিয়ে হরেক পদের ককটেল বানানো যায় । নিউটন আপেল এর মধ্যে একটা । গালা আপেল , পিঙ্ক লেডি আপেল । কি সব নাম । যেন নিক কাটার সিরিজের বই ।
ঠিক করলাম পুরো শরৎ কালটা গাছের তলায় বসে থাকব ভদকা আর গ্লাস নিয়ে । গাছ থেকে আপেল পড়বে আর আমি বানিয়ে খাব ।
আজ মরলে কাল এক দিন ।
' প্রতিদিন একটা করে আপেল খাও আর বাড়ির বাইরে ডাক্তারকে পিটিয়ে খেদাও' অমন একটা কথা কোথায় যেন পড়েছিলাম । কল্পনায় দেখতে পেলাম আপেল খেয়ে আমার শরীর অমন তাগড়া হয়ে গেছে যে পরিচিত ডাক্তাররা হাউমাউ করে কাঁদছে ।
আরও একবার আবিস্কার করলাম অন্যের বিপদে মনটা ভাল হয়ে যায় ।
একদিন কাজ থেকে ফিরে কফির পেয়ালা হাতে বারান্দায় গিয়ে দেখি বাগান ভর্তি সেই পিচ্চির দল ।
এরা সংখ্যায় কত কে বলবে ?
দূর থেকে মনে হচ্ছিল একগাদা গোলাপি জেলিফিস দেশান্তরী হচ্ছে ।
কতক্ষণ ধরে বাগানে খেলছে কে বলবে । বাগানের ঘাস ভর্তি গাছের পাতা আর ভাঙ্গা কচি ডালাপালা । নুড়ি পাথরের মত পরে আছে অগুনতিক মার্বেলের সাইজের আপেল ।
আক্ষরিক অর্থেই লণ্ডভণ্ড করে ফেলেছে । কাঁচা কড়া আপেল নিয়ে খেলছে আর খাচ্ছে ।
'এই তোমরা আমার বাগানে কি করছ ?' চেঁচিয়ে উঠলাম উপর থেকেই । ' নিচে এলেই কিন্তু টেঙরি ভেঙে দেব ।'
পুরো দলটা থমকে গেল ।
' আমার কাছে কামান আছে কিন্তু । দাড়া আমি পকেট থেকে বাজুকা বের করছি । ' চেঁচিয়ে উঠলাম । বলেই পকেটে হাত দিলাম ।
এইবার ভয়ে দৌড় দিল ওরা। অর্ধেক পালিয়ে গিয়ে ফিরে তাকাল । দেখার চেষ্টা করছে কি বের করলাম পকেট থেকে । কিছু নেই দেখে ওরা সাহস ফিরে পেল ।
আবার ফিরে এলো ।
কিছু একটা করতে হবে ।
' দাড়া আমার সানেকোপটা নিয়ে আসছি ।' বললাম । ইচ্ছা করেই অচেনা বিচ্ছিরি শব্দ ব্যবহার করলাম । উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সেই গল্পের মত - ঝপাংটা দে তো ভতাং করি ।
দৌড়ে কামরার ভেতরে গিয়ে বিচ্ছিরি দেখতে মোমদানীটা নিয়ে ফিরে এলাম । দেখার মত জিনিস । তিনটে মোম রাখা যায় । প্রাচীন অ্যানটিক । পুরানো দোকান থেকে কেনা ।
এইবার সাহস হারিয়ে ফেলল আপেল তস্কর বাহিনী । প্রাণের ভয়ে চিৎকার করতে করতে পালিয়ে গেল সবাই ।
বাগানে নেমে মনটা খারাপ হয়ে গেল ।
নরম ঘাসের উপর কচি আপেল , গাছের পাতা আর ডাল ভর্তি । গাছ তিনটে দুর্বল হয়ে গেছে ওদের অত্যাচারে ।
কোত্থেকে একটা গাড়ির টায়ার যোগার করে বেঁধেছে গাছের ডালে । দোল দোল দুলুনি রাঙ্গা মাথার চিরুনি করার জন্য ।
গাছের উপর উঠার সুবিধের জন্য হালকা লোহার ফ্রেমের একটা চেয়ার পর্যন্ত যোগাড় করেছে ।
এত কিছু করলো কিভাবে ? কখন ?
পরের দুই দিন চলল দেবতা আর অসুরদের স্বর্গের দখল নিয়ে লড়াইয়ের মত ।
ওরা আসে হলুদ বিকেলে । আমি ধাওয়ানি দেই । পালিয়ে যায় চিৎকার করতে করতে ।
এই দৌড়ে পালানোটা মজা পায় ওরা । ফিরে ফিরে আসে । গাছ তিনটের অবস্থা প্রায় ভুত গাছ ।
একবার পালাতে গিয়ে সবচেয়ে পিচ্চিটা পরে গেল ঘাসের উপর । বাকি সব ভেগে গেছে দেখে এটা ভ্যা করে কেঁদে ফেলল ।
আমি ওকে পালানোর সুযোগ দিতে হাঁটু গড়ে বসে জুতার ফিতে বাঁধার ভান করে বলতে লাগলাম , ' দাড়া জুতার ফিতেটা বেঁধেই আসছি । আজ ধরবই তোকে । ধরতে পারলেই জলপাই তেল দিয়ে ভেঁজে খেয়ে ফেলব । '
পিচ্চি কান্না ভুলে তড়াৎ করে উঠে দাড়িয়ে দুর্দান্ত স্পাইয়ের মত দৌড় দিল । ব্যারাকুডা মাছের মত হাসছে ।
ব্যর্থ হয়েছি অমন একটা ভান করে ফিরে এলাম ।
তবে আপেল গ্যাঙের সাথে বিরোধে যাওয়া উচিৎ হয়নি আমার ।
ওরা সংখ্যায় বেশি , ওদের পক্ষে শয়তান আছে ।
পরদিন কাজ থেকে ফিরে দেখি - দরজার বাইরে রঙ দিয়ে হাতের ছাপ মেরে গেছে কারা যেন। কচি হাতের ছাপ । যেই ভাবে গুহাযুগে গুহার দেয়ালে হাতের পাঞ্জার ছাপ দিত সেই রকম ।
পরের দিন দেখলাম জুতার ফিতে খুলে নিয়ে গেছে ।
তারও পরদিন দেখি বিলিয়ার্ড বোর্ডে চক দিয়ে আঁকিবুঁকি কেটে রেখেছে । বোর্ডের উপরের কাপড় প্রায় নষ্ট করে ফেলেছে । মেরামত করতে দুইশত ইউরোর মত লাগবে।
' বাড়ির ভেতরে আসে কি ভাবে ?' অবাক হয়ে বলল বাড়িওয়ালী ।
'সেটা আমি জানব কি ভাবে ?' হতাশ হয়ে বললাম ।'
পুরো বাড়িটা এক চক্কর ঘুরে দেখলাম । প্রায় চব্বিশ বছর আগে একটা সিকিউরিটি কোম্পানিতে গার্ডের কাজ করেছিলাম । ট্রেনিঙের একটা অংশ ছিল যে কোন বাড়ি বা স্থাপত্যের দুর্বল দিক বের করা । যেখান দিয়ে অপরাধী বা তস্কর সহজেই প্রবেশ করতে পারে । দুর্বল করে ফেলতে পারে রক্ষা ব্যবস্থা ।
পেয়ে গেলাম ।
কিচেনের পিছনের দরজা । যেটা দিয়ে বাড়ির পিছনে গিয়ে বিনে ময়লা ফেলা হয় । সেই দরজা খুললে বন্ধ হতে খানিক সময় নেয় । দরজাটা মৃগী রোগীর মত কাঁপতে কাঁপতে ধীরে ধীরে বন্ধ হয় ।
সেই ফাঁকে আপেল তস্করদের একজন ঢুকে পরে ভেতরে । পাপোষ দিয়ে আঁটকে দেয় দরজা। তারপর পুরো বাড়ি ওদের ।
তিনশো গজ হেঁটে রিফিউজি ক্যাম্পে গেলাম ।
খুঁজে পেলাম লাউরির বাবাকে । বললাম , আপনার ছেলে এবং তার বাহিনী আমার বাগানে খেলে সমস্যা নেই । গাছপালার ক্ষতি না করলেই হবে । আর বিলিয়ার্ড বোর্ডটা আমার প্রিয় । ওটা যেন নষ্ট না করে ।
ভদ্রলোক খুব অমায়িক । অনেকবার ক্ষমা চাইলেন । চার বছর ধরে আছেন রিফিউজি ক্যাম্পে । ইরাক থেকে সিরিয়া । সেখান থেকে বর্ডার পাড়ি দিয়ে এইদেশে এসেছেন । জীবন গরল ।
ফিরে এসে বিলিয়ার্ড বোর্ড মেরামতের কাজ ধরলাম । যতগুলো দেশে গেছি পয়সা দিয়ে বিলিয়ার্ড খেলতে হত । এই জীবনের প্রথম একা একটা বোর্ড খেলছি ।
সঙ্গী থাকলে ভাল হত । নেই । কল্পনায় আরমিনের সাথে খেলি । বলি - তুমি জিতলে দারুন একটা শাড়ি কিনে দেব । আর আমি জিতলে সবার সামনে জড়িয়ে ধরবে আমাকে । রাজি ?
ও রাজি হয় ।
প্রতিবার আমি জিতি ।
১৯
সেই বিকেলে ওরা এলো । কমলার জুস খেতে দিলাম জগ ভর্তি করে । ওরা জানালো এই মৌসুমের আপেল সব ওরা খাবে । সামনের মউসুমে অর্ধেক আমি খাব , বাকি অর্ধেক ওদের । পরের মউসুমে নতুন করে আমার চুক্তি করতে হবে।
রাজি হলাম ।
ওরা চলে গেল বাগান ধ্বংস করতে ।
আমি একা খেলতে লাগলাম পুল । এইট বল ।
বাইরে কি সুন্দর রোদ ।
বাড়িওয়ালী বলল , ' এমন বিকেলে বাইরে হেঁটে আসো না কেন ? রোদ আছে তো । বেশিদিন পাবে না এমন রোদ । আমি শীতকাল ভয় পাই। কেমন অন্ধকার । তোমার দেশে শীত আছে ? '
আমি হাঁটতে বের হই ।
টো টো করে হেঁটে আসি দূরের বনজঙ্গলের ভেতর দিয়ে । কি শান্ত । বনরুটির মত দেখতে মাশরুমগুলো কি খাওয়া যায় ? কারা যেন যব বুনেছে পথের ধারের মাঠে । সুন্দর ।
রোজ এসে বাগান ধ্বংস করে যায় ওরা ।
গালে হাত দিয়ে বসে দেখি । লাউরি আর খাইদুল্লাহ একদিন চারটে আপেল নিয়ে ধরিয়ে দিল আমার হাতে। গম্ভীর গলায় বলল , ' তোমার ভাগ ।'
সারা দুনিয়ায় নাকি ৭৫০০ ধরনের আপেল আছে । সবার আবার আলাদা নাম !
এটা ফিকে গোলাপি আর হলুদ মেশানো । বাবুর্চি লাইফের অভিজ্ঞতা বলে এটার নাম পিঙ্ক লেডি আপেল । গোলাপি রমণী ।
পুষ্ট হয়নি ফলগুলো । তারপরও ওইগুলোর গোলাপি আর হলদে আভা মুগ্ধ করে ফেলল ।
মুখে দিতেই বেহেস্তি মেওয়া শব্দটার মাজেজা টের পেলাম ।
দোকানের চেয়ে ভাল মনে হল ।
আসলে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার । এটা আমার বাগানের । চোখের সামনে দেখেছি । বিশ্ব সুন্দরীর চেয়ে পাশের বাড়ির মেয়েটা যেমন বেশি মায়াবী হয় তেমন ।
মুখ ভরে গেল মিষ্টি স্বাদে । অপূর্ব ।
বাচ্চাদের ভেতরে ঈশ্বর বাস করেন । ওরা অপাপবিদ্ধ ।
জীবনের কোন জটিলতা জানে না । খেলার সরঞ্জাম সবচেয়ে দামি । খেলার সঙ্গী সবচেয়ে প্রিয় পাত্র ।
আর ওরা বিশ্বাস করে পৃথিবীর সব লৌকিক অলৌকিক সমীকরণ । ওরা বিশ্বাস করে বাড়ির পিছনের জঙ্গলে পেল্লাই এক দৈত্য থাকে । যে গভীর রাতে আমার বাড়িতে কফি খাবার জন্য আসে । আমার দূর সম্পর্কের এক পিসি ডাইনি । যার বাসা ড্রাগনের তেলের শিশি দিয়ে ভর্তি । বাচ্চা পেলেই সে কুমড়ার ছক্কা দিয়ে রান্না করে খায় । টিফিন বাক্সে করে আমার জন্য পাঠিয়ে দেয় ।
এইসব কাহিনি শুরু হয়েছিল যখন ওরা দেখল ছুটির দিনে আমি দূরের জঙ্গল থেকে হেঁটে বাসায় ফিরি ।
আপেল চোরদের দলের সর্দারের নাম লাউরি । আমি বলি কৃষ্ণ । মথুরাতে হুবহু এমন চেহারার ছোকরাটাই মাখন চুরি করতো । যার মাথায় থাকতো ময়ূরের পালক । আমি সিউর ।
ওরা বল খেলছিল । বলকে বলে পাল্লো ।
লাউরি অবাক হয়ে বলল , ' তুমি কি দোতলায় থাক না ?'
'না ।' ডাহা মিথ্যা বললাম ।
'থাক কোথায় ?' জানতে চাইল লাউরির বড় বোন । নাম জানি না । বলি সুভদ্রা ।
বাসস্টপের ওখানে ভাঙ্গা পড়ো বাড়িটা দেখিয়ে বলি , ' ওখানে থাকি ।'
আট জোড়া গোল্লা গোল্লা চোখ অবাক হয়ে চেয়ে রইল ।
'ভয় করে না ?' একজন জানতে চাইল । ' ওখানে তো আলো নেই । হিটারও নেই । শীত করে না তোমার ?'
'না। জ্যাকেট পরে ঘুমাই । মোম জ্বালাই ।'
'একা লাগে না ?' আরেকজনের প্রশ্ন ।
' আমার সাথে তিনতে বাচ্চা ভূত থাকে ।'
সবাই আরও জড়োসরো হয়ে আমার সামনে বৃত্ত বানিয়ে চলে এলো ।
' ভূত না , বোধহয় মনস্টার হবে । কারন ইস্কুলে বলেছে ভূত বলে কিছু নেই ।' ঢোক গিলে বলল একজন ।
'হ্যাঁ হ্যাঁ ।' মনে পরেছে এমন ভঙ্গি করে বললাম । 'মনস্টার । কিন্তু খুব ভদ্র ।'
'কামড় দেয় না ?'
‘কখনই না।'
‘কি খায় ওরা ?'
‘পাউরুটি আর মাখন । জ্যাম থাকলে তাও খায় । '
'আচ্ছা সেইজন্য তোমাকে দেখি ঘন ঘন পাউরুটি আর মাখন কিনে আনো ।'
'একদম বরাবর ।'
'ঘটনা সত্যি ।' সাফ জানিয়ে দিল একজন । ' আমি রাতের বেলা অই বাড়িতে ছায়া ছায়া তিনতে মনস্টার টাইপের কি যেন দেখেছি । ভাল মত দেখতে পাইনি । ঘুম পাচ্ছিল আমার । '
দলটা বেশ জড়সড় হয়ে গেল ।
' বাড়ির মনস্টারের মধ্যে জম্বি নেই ?' জানতে চাইল লাউরির বোন । চকলেট খেয়ে ওর দাঁতগুলোর অবস্থা কাহিল । হাসলে মনে হয় মুখের ভেতরে একগাদা পায়রার খোপ ।
'আছে তো ।'
‘জম্বি কি ভয়ংকর ?'
‘মোটেও না ।'
‘মানুষ খায়। মুভিতে দেখেছি ।'
‘বড়দের খায় । বাচ্চাদের না।'
‘কেন ?'
‘জম্বি খুব স্লো হাঁটে তো । মুভিতে দেখনি । নড়তে চড়তে দিন শেষ করে ফেলে । বাচ্চারা দৌড়ে চলে যেতে পারে । বড়রা পারে না । তাই বড়দের খায় ।'
'তোমাকে কিছু করছে না যে !
‘বাথরুমে আটকে তালা দিয়ে রেখেছি ।'
'এমনিতে ব্যবহার কেমন ?'
' কথা বলে না । ছেড়া জামা কাপড় পরে । ইস্কুলে যেতে চায় না । শাওয়ার করে না। সব মিলিয়ে বিচ্ছিরি ব্যাপার ।'
' কি খায় ?'
' গুড়া সাবান আর টয়লেট ক্লিনার ।'
'খুব ঝামেলার ব্যাপার।'
'খুব।'
ডিমের বাক্স আর ব্রকলি নিয়ে ফেরার পথে ওদের খপ্পড় পরে গেলাম ।
সাফাই গাইলাম , ' আজ ওদের জন্য ডিমের অমলেট বানাব । মুখের স্বাদের পরিবর্তন দরকার । সপ্তাহে একদিন ডিমের অমলেট দেই । '
'আর ব্রকলী ?'
'দৈত্যটার শরীর ম্যাজ ম্যাজ করছে । ব্রকলীর সুপ বানাব ।'
সেই থেকে রোজ দেখা হলেই বাচ্চা মনস্টারদের কথা জিজ্ঞেস করে ওরা । ওদের চোখে রোমাঞ্চ । ভয় ভয় ।
আমিও বানিয়ে বানিয়ে একগাদা মিথ্যা বলি । খোসা ছাড়ানো সেদ্ধ ডিমের মত বড় বড় হয়ে যায় ওদের চোখ । নতুন বন্ধু এলেই আমার কথা বলে ।
একদিন ওরা বড় হবে । জানবে আমি মিথ্যা বলেছি ওদের ।
কেন যেন মনে হয় ওরা আমাকে ঘৃণা করবে না ।
আপনাদের কি মনে হয় ?
২০
পুরো আগস্ট মাস চলল আপেলের বাম্পার ফলন । প্রকৃতির সহজ নিয়মে দিনে দিনে আকার আকৃতি বড় হচ্ছে । সারাক্ষণ থ্যাপ থ্যাপ করে খসে পড়ছে গাছ থেকে । যেটা দেখে আইজাক নিউটন বের করেছিলেন মহাজাগতিক অপূর্ব এক সুত্র ।
আমি ওদের আর বাধা দেই না। দোতলার বারান্দায় বসে দেখি । তারপর ক্যানভাসের স্পোর্ট সু , জিনস আর সেইলার জ্যাকেট পরে হাঁটতে বের হয়ে যাই ।
দূরে কোথাও ।
মাইলের পর মাইল ফাঁকা । বেগুনি রঙের অচেনা ফুল পথের ধারের দুইপাশ ভর্তি ।
কখন ও শহরে যাই । একটা বাতিল লাইট হাউজ আছে উপকূলের কাছে টিলার উপর । অতীতে গহন রাতে পথ দেখাত দিশেহারা নাবিকদের । এখন সেটার ভেতরে কফি শপ খুলেছে । বেশ খানি চড়াই উৎরাই পাড় হয়ে আসতে হয় এখানে । কিন্তু উপরে উঠলে ক্লান্তি দূর হয়ে যায় ।
জীবনের মতই । সাফল্যে পৌঁছে ফেলে আসা দিনের কথা মনে করলে যেমন লাগে ।
ফেরার পথে খানিক বাজার করে নিয়ে আসি ।
একদম খালি হাতে কখনই বাড়ি ফিরি না । রাস্তার দোকান আমার প্রিয় । কত বিচিত্র জিনিস না বিক্রি করে । বাগানের ছোট ছোট শসা লবণ জলে ভিজিয়ে প্রায় আচার বানিয়ে ফেলে , গেরকিন বলে । কখনো চিনি আর ভিনেগারে ভিজিয়ে রাখে । ফালি করা বীট । পেয়াজ খোসা ছাড়িয়ে সাদা মরিচ , লবঙ্গ আর তেজপাতা মাখিয়ে ভিনেগার আর চিনিতে মাখিয়ে কেমন একটা আচার । বাঁধাকপি কুঁচিয়ে বয়াম বন্দি করে । বুনো মাশরুম কুঁচি করে লবণ জলে দিয়ে ।
জলপাই পাওয়া যায় দুইরকম । গ্রিক কায়দায় বয়াম বন্দি , আর স্প্যানিশ কায়দায় বয়াম বন্দি । কেপারস পাওয়া যায় প্রচুর । মেডিটেরিয়ান বুনো ঝোপের কুঁড়ি । ফুল হবার আগেই কুঁড়ি ছিঁড়ে নোনা জলে ভিজিয়ে রাখে প্রাচীন কায়দায়।
অদ্ভুত জিনিস । যীশুর জন্মের দুই হাজার বছর আগে থেকে জলপাইয়ের বিকল্প হিসাবে খাওয়া শুরু করেছিল মেডিটেরিয়ান দ্বীপের মানুষজন । আজ সারা দুনিয়ায় চলে ।
ফুটপাথে যেমন বাতের মলম বিক্রি হয় তেমনি কৌটায় করে ক্যাভিয়ার বিক্রি করে ।
সারা দুনিয়ার লোভনীয় এই জিনিসটা আমার মুখে তেমন আবেদন জাগায় না । বিরক্তকর একটা জিনিস। এর চেয়ে মায়ের রান্না করা ইলিশ মাছের ডিম ট্রিলিয়ন গুণ স্বাদের ।
কলেজ লাইফে দ্যা লানচন বা অমন নামে একটা গল্পে এই ক্যাভিয়ারের কথা পড়েছিলাম । পরে ক্লাইভ কাসলারের ' ট্রেজার' বইতে পড়লাম ভিলেনের প্রিয় খাবার এই ক্যাভিয়ার ।
সিডনী শহরে বিজ্ঞাপন দেখতাম ' প্রিয়জনকে ক্যাভিয়ার উপহার দিন ।'
ঢং আর কাকে বলে ।
ক্যাস্পিয়ান সাগরের স্টার্জন মাছের ডিম এই ক্যাভিয়ার । দামের কারনে দেদারসে ধরা হয় ।
বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে স্টার্জন ফিস ।
চোরা মাছ শিকারিরা যাদের পোচার নামেও ডাকা হয় তারা এক জোট হয়ে মাফিয়া দলের মত কাজ করছে । মাছ ধরার ডিঙ্গি পেলে রেঞ্জাররা তাদের ডিঙ্গি তল্লাশি করে - অবৈধ মাছ আছে কিনা দেখার জন্য ।
তখন নাকি সুযোগ বুঝে পোচাররা ও আক্রমণ করে বসে । যেন ডেসমন্ড বাগলের লেখা রোমাঞ্চপন্যাস ।
ভাবতে অবাক লাগে টেবিলের উপর যে খাবার আসে তার সাথে জড়িয়ে থাকে কত কাহিনি ।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে গাছ থেকে যে ভাবে আপেল পতন শুরু হল সেটার বর্ণনা বলে শেষ করা যাবে না। গাছের তলায় নিউটন বসে থাকলে নিঃসন্দেহে উঠে দৌড় দিত ।
সারাক্ষণ টুপ টাপ করে খসে পড়ছে ওরা রিমিক্স গানের মত ।
প্রথম কয়েক দিন আপেল গ্যাং এলো । পকেট ভর্তি করে নিয়ে যেতে লাগল ।
এক সপ্তাহ না যেতেই ওদের আসা একদম বন্ধ হয়ে গেল ।
একজনও আসে না।
বিকেলে বাগানে যাই ।
লোহার একটা পাত্র ভর্তি করে ডজন খানেক পাকা আপেল কুড়িয়ে আনি ।
প্রতিবেশী রাশিয়ান বুড়োটা দেখি তিন বেলা আপেল কুড়ায় । সবচেয়ে বেশি নেয় আফগানিস্তানের ল্যাংড়া লোকটা । যে কি না দেখতে চাইনিজ মুভির ভিলেনের মত ।
আমাকে দেখলেই কেমন মিহি একটা হাসি দেয় ।
একদিন বেইজমেনটের বারোয়ারী কিচেনে গিয়ে দেখি প্রায় সের দশেক আপেল নিয়ে চাকু দিয়ে ফালি ফালি করে কাটছে । আপেলের মেরুদণ্ডটা ফেলে দিয়ে বাকি আপেল ছক্কা করে পাতিলে রেখে চিনি আর জল দিয়ে জ্বাল দিয়ে কেমন থকথকে সিরা বানিয়ে ফেলল ।
বয়ামে রেখে রোজ পাউরুটির উপর প্রলেপ দিয়ে খাবে ।
আমাকে দেখে মুখটা কেমন কাচুমাচু করে ফেলল ।
দূরের কয়েকটা টিনের বাড়িতে জর্জিয়ার কিছু ছেলে পিলে থাকে । ওরা তিন মাসের ওয়ার্ক ভিসা নিয়ে এসেছে । ফ্রুট পিকার ভিসা। কৃষাণের জমিতে বেরি টাইপের ফল তুলে দেয় । প্রতি বছর আসে । মউসুম শেষ হলে আবার দেশে চলে যায় ।
সেই দলটা কেমন বস্তা নিয়ে এসে আপেল কুড়িয়ে নিয়ে যায়। শুধু আসে না আপেল গ্যাঙের সদস্যারা ।
কোথায় গেল ওরা ?
পুরো সেপ্টেম্বর আপেল পেলাম ।
ক্রিকেটের বলের সাইজ । সারারাত হিমে থেকে বরফের টুকরোর মত শীতল হয়ে থাকে ।
অপূর্ব স্বাদ ।
কিন্তু তস্কর বাহিনী কেউ এলো না।
নিজেকে অস্কার ওয়াইলডের সেই স্বার্থপর দৈত্যের গল্পের দৈত্যের মত মনে হচ্ছিল ।
শেষে একদিন চলে গেলাম রিফিউজি ক্যাম্পের দিকে ।
ওরা সবাই আছে।
খেলছে । ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ওদের খুব খেয়াল রাখে । নতুন বল আর প্ল্যাস্টিকের অগুনতি গাড়ি দিয়েছে । প্রচুর রঙ পেন্সিল আর কাগজ দেয় মুফতে।
স্কেটিং বোর্ডের উপর দাড়িয়ে রোল করছে একজন । খানিক দূর গড়িয়ে গিয়ে ধপাস করে পরে যাচ্ছে শক্ত ধারাল পিচের রাস্তায় । নাক , হাঁটু সব ছিলে গেছে ।
'যাও না কেন তোমরা ?' জানতে চাইলাম ।
'আপেল খুব বোরিং ফল ।' জবাব দিল এক তস্কর ।
'বাগানটাও খুব বোরিং ।' আরেক পাকনার জবাব ।
হেমন্ত শেষ হয়ে যাচ্ছে । সারা উঠোন হলুদ হয়ে গেছে ।
দিনরাত পাতা খসে পরে পাইন গাছ থেকে । হাঁটতে গেলে খসখস করে শব্দ হয় ।
আপেল কমে আসছে আজকাল । সারা বাগান খুঁজে মাত্র পাঁচটা পেলাম । মউসুম শেষ ?
রোজ বিকেলে হাঁটতে যাই । কারন শুনছি, রোদ কমে যাবে সামনের সপ্তাহ থেকে । আসবে ষোল ঘণ্টার রাত । সাথে শীত ।
বিকেলের রোদটা কেমন যেন গহন কমলা হয় আজকাল ।
মধ্য অক্টোবরের এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আগের রাতে বরফ পরে সব কাহিল হয়ে গেছে ।
জুবুথুবু হয়ে দাড়িয়ে আছে তিনটে আপেল গাছ । শীতঘুমে চলে গেছে ওরা । জুনে আবার নতুন করে ঘুম ভাংবে ওদের । আবার আগের চক্র ।
আবিস্কার করলাম পুরো জীবনটাই এই আপেল বাগানের মত । নতুন সব কিছুতেই আগ্রহ থাকে আমাদের । পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে যাই । সামান্য সময় পর সেটা হারিয়েও যায় । অন্য কেউ নিয়ে গেলে আর খারাপ লাগে না। উদাসীন বোধ করি ।
কিছুতেই কিছু যায় আসে না অমন ।দখলদারিত্ব রাখতে চাই না কিছুতেই ।
অথবা ব্যস্ত হয়ে পড়ি অন্য কিছুতে ।
জীবনটাই মায়া ।
সামান্য প্রলোভন । মিথ্যা সব আয়োজন ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন