ভোরের অনেক আগে পালাল ইয়াকুব ।
সময়টা বেছে নিয়েছিল ভাল ।
জেলের মিয়া সাবেরা এই সময় খানিক ঝিমোয় । সবার মধ্যে আলগা ঢিলে ঢালা ভাব চলে আসে ।
বড় বড় কয়েক রাউনড টহল দেয়ার পর একটু কোনা খামচি পেয়ে টুল নিয়ে বসে পড়ে । মাইক্রো স্লিপ বলে একটা শব্দ আছে । এই ঘুম মাত্র দুই বা তিন সেকেন্ড ও হতে পারে ।
বিকেলের দিকে হাঁটতে গিয়ে দেয়ালগুলো রেকি করে রেখেছিল ইয়াকুব ।
তিন মানুষ সমান উঁচু দেয়াল , মসৃণ । কয়েক মাস পর পর সুবেদার সাহেব নিজে পরীক্ষা করেন, দেয়ালে কোন চলটা উঠে গেছে কি না । সন্দেহ হলেই আবার নতুন সিমেন্টের প্রলেপ লাগায়।
যতটা দায়িত্বের জন্য তারচেয়ে বেশি আগ্রহ মেরামতের বাজেট থেকে বারো আনা পয়সা গায়েব করার জন্য ।
এক মিয়াসাবের সাথে টাকা পয়সা লেনদেন করে কথা পাকা করে রেখেছিল ইয়াকুব ।
দেখা গেল আজ বিকেলেই বাথরুমের কল মেরামত করতে এক ওস্তাগার এসে হাজির হল । ঠিক ইয়াকুবের বিছানার তলায় একটা চাবি রেখে চলে গেল অন্যমনস্ক ভাবে ।
আর কি কাণ্ড !
একটা মই রেখে গেল ময়লার ভাগাড়ের ওখানে । ভুলে !
বাকি কাজ তো সহজ ।
চাবি দিয়ে লোহার গেইট খুলে বের হয়ে অন্ধকারে কাঠ বাদাম গাছের ছায়ায় ছায়ায় চলে গেল ময়লার ভাগাড়ের ওখানে । রাজ্যের বাসি পচা খাবার আর পলিথিনের তলায় পেয়ে গেল মই !
দেয়াল বেয়ে নেমে গায়েব হতে কতক্ষণ ?
দেয়ালের ওই পাশে নেমেই ঝেড়ে দৌড় দিল সে ।
যত দ্রুত সম্ভব এই এলাকার বাইরে যেতে হবে । হিসাব অনুসারে কয়েক মিনিট পর সেলের ভেতরে আসামি গণনা করতে আসবে সুবেদার সাহেব । গণায় একজন কম হলেই সাজ সাজ রব পড়ে যাবে জেলের ভেতরে ।
দেয়ালের এই দিকে চব্বিশ ঘণ্টা একটা পুলিশের ভ্যান মজুদ থাকে । এক হালি পুলিশ বসে বসে ষোল গুটি খেলে আর মোবাইল টিপে । আজ নেই ।
ইয়াকুব ভেবে অবাক হল - কত নিখুঁত কাজ করে এরা । ভাগের টাকা কত জায়গা পর্যন্ত যায় !
এত ভোরে বড় রাস্তায় উঠে গেলে বিপদে পড়বে । অনেক দূর থেকে চোখে পড়ে যাবে কারও ।
সরু গলির পথ ধরে বিড়ালের মত সতর্ক পায়ে এগিয়ে গেল সে ।
অনেক দিন ধরে মনে মনে সব কল্পনা করে রেখেছিল । কোন সমস্যাই হচ্ছে না ।
খানিক পর পেয়ে গেল একটা চায়ের দোকান । এই ভোর রাতেও সেটা চলছে । ঘুম ঘুম ফোলা চেহারায় একজন গরম কেতলি নিয়ে বসে আছে । মাথার উপর কলা পাউরুটি । সামনের বয়ামে বাসি বিস্কুট । প্ল্যাস্টিকে এক ব্যাগে মিষ্টিও রাখা । ওই জিনিস খেলে ডায়রিয়া না হলে নিজের কান কেটে ফেলবে ইয়াকুব ।
দোকানের খানিক দূরে বড় বড় কয়েকটা ট্রাক আর সিএনজি পার্ক করে ড্রাইভারেরা খাচ্ছে ।
ট্রাক বাদ দিল ইয়াকুব । ওদের সাথে সাগরেদ থাকে। রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ ঘনঘন ট্রাক থামিয়ে চা -খাবার পয়সা চায় ।
একটা সিএনজি টার্গেট করলো ।
লোকটা খেয়ে দেয়ে সামনে আসা মাত্র পথ রোধ করে দাঁড়ালো ইয়াকুব । জানতে চাইলো - যাবে কি না । হাসপাতালের কথা বলল ।
ইয়াকুবের চেহারা দেখে অপরাধী মনে করার কোন কারণই নেই ।
দেখতে ভাল । লম্বা ফর্সা । কিছুটা রুক্ষ ভাব আছে । যেই জন্য অনেক মেয়ে ওকে পছন্দ করে ।
জেলের ভেতরে প্রিজনার কার্ড ব্যবহার করে কেনাকাটা করতো ইয়াকুব ।
সাথে নগদ ছিল সামান্য । কাজেই সিএনজিওয়ালাকে আঘাত করে ভাগতে হল।
কোথায় যাবে জানে না।
পলাতক খুনে আসামি ধরতে পারলে প্রমোশন পাওয়া যাবে - সেটার লোভে খুব জলদি ওর খোঁজ পড়বে ।
পরের যাত্রা অনেক কঠিন হয়ে পড়লো ।
একটার পর একটা গাড়ি চুরি করে অনেক পথ পাড়ি দিল ।
খেয়ে না খেয়ে শেষে তৃতীয় রাতে হাজির হল পাহাড়ি নির্জন মত একটা জায়গায় । শহর থেকে অনেক দূরে । যতদূর মনে হয় বিবিয়ানাগঞ্জ চলে এসেছে । সামনেই বর্ডার । গাড়িটা নষ্ট হল সময় বুঝে ।
কুছ পরোয়া নেই ।
চুরি করা গাড়িটা ঠেলে একটা পচা ডোবার মধ্যে ফেলে দিয়ে সামনে হাঁটা ধরল ।
গাড়ি খুঁজে পেতে কয়েক বছর চলে যাবে ।
অন্ধকারের মধ্যে খানিক হেঁটে আলোর দিশা পেল । আর এখানেই পেল একতলা একটা বাড়ি । দেখেই বুঝা যাচ্ছে ধনীর বাড়ি । চারিদিকে উঁচু দেয়াল । টপকে ভেতরে ঢুকে পড়লো ।ইচ্ছা - কিচেনে গিয়ে কিছু খাবার চুরি করবে । পরে বাড়ির বাসিন্দা কাউকে জিম্মি করে কোন সহজ কিছু হাসিল করবে ।
দেয়াল টপকে সহজেই ভেতরে ঢুকে গেল । কি কাণ্ড বাড়ির পিছনের একটা দরজা খোলা ! ঢুকে গেল ।
কিচেনে গিয়ে অবাক - ফ্রিজ নেই । কোন খাবার নেই ।
তখনই দেখল ড্রয়িং রুমে বসে কয়েকজন জন মানুষ । সম্ভবত আড্ডা দিচ্ছে ।
অন্য কেউ হলে ভয়ে ভেগে যেত ।
ইয়াকুব সেই রকম বান্দা না মোটেও । কিচেন থেকে যে চাকু জোগাড় করেছিল সেটা নিয়ে আক্রমণ করে বসলো ।
ক্ষতি করার ইচ্ছা ছিল না ।
ভেবেছিল চাকু সামনে রেখে ভয় ভীতি দেখিয়ে জিম্মি করবে ।
সেই রকম কিছুই করতে পারলো না ।
কয়েক কদম সামনে এগিয়ে যেতেই কেমন বিচ্ছিরি রকমের অনুভুতি হল । মাথা ঘুরে উঠলো পাই করে। চোখে অন্ধকার দেখতে লাগল ।
তারপর কোন রকম আপত্তি না করেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল ।
বুঝল, সারাদিনের ক্লান্তি - খিদে আর উত্তেজনা সব মিলিয়ে শরীর কাহিল হয়ে পড়েছে ।
জ্ঞান যখন ফিরল তখন আবিস্কার করলো সোফার মধ্যে বসে আছে । গায়ে আগের পুরানো কাপড় চোপড় নেই । ওকে ঢোলা কেমন একটা আলখেল্লা মার্কা পোশাক পড়িয়ে দিয়েছে ওরা । মাথার চুল আর শরীরের ত্বকের আদ্রতা অনুভব করে বুঝল গোসলও করানো হয়েছে ।
সেটা কি সম্ভব ?
কামরার মধ্যে দুই জন লোক বসা । কেমন অচেনা এক ভাষায় কথা বলছে দুইজন ।
বাড়ির বাইরে লোহার পেল্লাই ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশের গাড়ি । ইউনিফর্ম পরা মোটা সোটা কালো কুচকুচে এক অফিসার কথা বলছে এই বাড়ির এক বাসিন্দার সাথে। কি সব হু হ্যাঁ টাইপের কথা বলে গাড়িতে উঠে বিদায় নিল পুলিশের গাড়িটা ।
লোকটা লোহার ফটক বন্ধ করে গটগট করে ফিরে আসতে লাগলো বাড়ির দিকে ।
মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না ।
এই বাড়ির বাসিন্দারা ওকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারতো । কিন্তু সেই রকম কিছু করলো না। কারণ কি ?
এরাও বড় কোন অপরাধী ?
ইয়াকুবকে ব্যবহার করতে চায় ?
নড়াচড়ার শব্দ শুনে ওরা ফিরে চাইলো ইয়াকুবের দিকে । দলের নেতামত একজন মুচকি হেসে বলল , ' তা আপনার জ্ঞান ফিরল ? টানা চব্বিশ ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন । কেমন লাগছে এখন ?'
'আপনারা কারা ?' সোজা কাজের কথায় চলে গেল সে । ফালতু আলাপের মুডে নেই ।
লোকটা রহস্যময় একটা হাসি হাসল ।
এবং জানাল তাদের গল্প ।
ওরা নক্ষত্র বিহারী ।
দূরে অনেক দূরে ওরা থাকে ।
বিচিত্র ছায়াপথের ধোঁয়া ধোঁয়া দূরের এক নক্ষত্র সভ্যতায় ওদের জন্ম । বেড়ে ওঠা ।
কোটি কোটি বছর আগে সেইখানে গড়ে উঠেছিল প্রাণ । বিবর্তনের সুত্র মেনে সভ্য হয়েছে ওরা । তৈরি করেছে নিজেদের সুমহান -বিচিত্র- মায়াবী সভ্যতা । মহাকাশ জাহাজে চেপে ওরা ঘুরে বেড়ায় মহাবিশ্বের নানান জায়গায় । কোন গ্রহ পছন্দ হলে নামে সেখানে । থাকে কয়েকদিন । সেই গ্রহের প্রাণী , গাছপালা , পাথর , গুল্ম সংগ্রহ করে । আরও সংগ্রহ করে সেখানের সঙ্গীত , চিত্রকলা । জ্ঞান , বিশ্বাস ।
এইসব সংগ্রহ করে আনন্দ পায় ওরা ।
শেষে ফিরে যায় নিজের বাসভূমে । সংগ্রহ দিয়ে বানায় নিজেদের গ্যালাক্সি লাইব্রেরী ।
অবাক হয়ে ইয়াকুব শুনছিল এই সব আষাঢ়ে গল্প ।
অন্য সময় হলে হেসে ফেলত ।
কিন্তু এখন হাসি পাচ্ছে না।
ওর সামনে যে লোকটা বসে আছে তার চেহারা আর শরীরের কিছু ব্যাপার নজর এড়িয়ে যায়নি ।
লোকটার শরীরে কোন লোম নেই । চোখের পলক পড়ে না । ফর্সা , ভেতরের নীলচে শিরা দেখা যাচ্ছে । খালি পায়ে বসে আছে । পায়ে কোন আঙুল নেই । নখ নেই । শরীরে হাড় গোড় আছে কিনা সন্দেহ হল ইয়াকুবের । মোমের পুতুল যেন ।
লোকটার কথা শেষ করলো এই বলে , ' আমাদের কথা আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে অমন কোন দাবী নেই আমাদের । চাইলে এখনই বাইরে ফেরত দিতে পারি আপনাকে । আমাদের সাথে পরিচয় পর্বের কোন কিছুই আপনার মনে থাকবে না ।'
কথা শেষ করে আবার হাসলো গৃহকর্তা ।
খানিক নীরবতা ।
'কত দিন ধরে আপনারা পৃথিবীতে ?' আচমকা বলে বসলো ইয়াকুব ।
'বছর খানেক ।'হাসলো লোকটা । ' তারমানে আপনি আমাদের সব কথা বিশ্বাস করছেন ? গপ্পো মনে করেননি ?'
'সেইরকম মনে করার কোন কারণই নেই ।' ইয়াকুব গম্ভীর । ' আপনার কপালে একটা চোখ আছে । লম্বা চুল দিয়ে ঢেকে রেখেছেন । শুধু আপনার না। আপনাদের সবার আছে ।'
'বেশ চালু মাল আপনি ।'
' সবাই তাই বলে। যদিও চালু শব্দটাতে আমার আপত্তি আছে । ভাল কথা , আমরা ছোট বেলায় যে ফ্লাইং সসার দেখতাম ওগুলো আপনাদের ?'
'নাহ ওই সব তো অনেক পুরানো আমলের জিনিস । আপনাদের সেই মুড়ির টিন বাসের মত । তখন অন্য কোন লোকজন আসতো । আমরা না।'
' সেইসব সসার দেখি না কেন আজকাল ?'
'কে জানে । মনে হয় সেই সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে । আমাদের আসা যাওয়া করতে অমন পেল্লাই সব বাহন লাগে না । অন্য কায়দা করে আসা যাওয়া করি । কেউ জানেও না।'
'আমাকে কি আপনাদের সাথে নিয়ে যেতে পারেন ?' অনুরোধ করলো ইয়াকুব । অমন সুযোগ ছাড়তে রাজি না । ভাগতে হবে । একদম দুনিয়ার বাইরে ।
'আমরা আপনাকে নিতে পারব না সাহেব ।'
'কেন ?'
' নিয়ম নেই । গাছ পাথর আর অবলা জীব জন্তু নেয়া এক কথা । কিন্তু কোন মানুষ নেয়া সম্ভব না ।'
'কে বানিয়েছে এই নিয়ম ?'
'আমরা সবাই মিলে এই মহাজাগতিক আইন বানিয়েছি । ঝামেলা চাই না আমরা । আপনাকে সাথে নিলে আমাদের লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে । পরের বার এই নক্ষত্র বিহারী সংঘ থেকে বাদ পড়ে যাব ।'
'মুশকিল হল দেখছি । ' বিরক্ত হল ইয়াকুব । ' কিন্তু আমি তো নিজের ইচ্ছায় যেতে চাইছি ।
'সেটাও সম্ভব না ।'
মনে মনে হতাশ হল ইয়াকুব । ভেবেছিল ওদের সাথে পালিয়ে দূর কোন গ্রহে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারবে ।
দুনিয়া আর ভাল লাগে না ।
‘ তো আমি এখন কি করব ?' অসহায় ভাবে জানতে চাইল ইয়াকুব । ' মানে বলতে চাইছি আমাকে নিয়ে কি করবেন আপনারা ? সব জেনে ফেললাম আপনাদের । মেরে ফেলবেন ? '
'আসলে কাউকে মারা বা খুন করা জিনিসটা আমরা জানি না ।' মুখ চুলকে বলল লোকটা । ' খুন জিনিসটা কি সেটা পৃথিবীতে এসে জানলাম আমরা । আর কোথাও দেখিনি । আজব কাণ্ড ! কেউ কিভাবে অন্য আরেকজনের প্রাণ নেয় সেটাই মাথায় আসে না আমাদের । এটাও তো প্রকৃতির আইন ভাঙ্গা হয় । কি ভাবে যে আপনারা করেন কে জানে । আমরা আপনাকে রেখেই চলে যাব । সামনের সপ্তাহে পৃথিবীর কাজ শেষ হবে আমাদের । ততদিন আমাদের সাথেই থাকুন । তারপর আলাদা ।'
'আলাদা মানে ?'
'মানে বাড়ির বাইরে আপনাকে রেখে আমরা চলে যাব । আমাদের সাথে করে নিতে পারব না । একদম অসহায় এই ব্যাপারে । '
'কিন্তু বাইরে গেলেই পুলিশ আমাকে ধরবে । জেল থেকে পালিয়েছি । মানুষ খুনের দায়ে বাকি জীবন পালিয়ে থাকতে হবে । খুব কঠিন সেটা । ধরা পড়লে হয়তো ফাঁসি হবে । আর সেই ক্ষেত্রে ঘুরে ফিরে আমার মৃত্যুর জন্য আপনারা দায়ী হবেন কিন্তু । '
কায়দা করে কথা চাল দিল ইয়াকুব ।
লোকটা কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল ।
ওর চেহারায় কোন ভাব নেই । তারপরও মনে হচ্ছে গভীর ভাবে ভাবছে যেন ।
' একটা উপায় অবশ্য আছে ।' খানিক পর বলল সে ।
'কি সেটা ? আশার আলো দেখতে পেয়ে মনে মনে খুশি হয়ে গেল ইয়াকুব ।
'আগে কথা দিতে হবে ।'
'দিলাম কথা ।'
' শর্ত না শুনেই ?' হাসির মত ভঙ্গি করলো লোকটা । ' দেখুন কাউকে কথা দেয়ার মত সহজ কাজ আর নেই আপনাদের পৃথিবীতে । কিন্তু সেটা পালন করার মত কঠিন কিছুই আর হয় না সেটা জানেন তো ?'
'আপনার শর্ত কি ?'
'প্রথম হচ্ছে আমাদের ব্যাপারে কাউকে কিছু বলবেন না। বললে অবশ্য কেউ বিশ্বাস করবে ও না। আর দ্বিতীয় হচ্ছে আমরা জানি আপনি খুনের আসামি , কিন্তু বাকি জীবন আর কাউকেই আঘাত করতে পারবেন না । রাজি ?'
'আমি যদি খুনখারাবি করি আপনাদের কি সমস্যা ?'
'কারণ আজকের পর থেকে পৃথিবীতে আপনি যা করবেন সব কিছুই দায় চাপবে আমাদের উপর । কারণ আমরাই আপনার জীবন পাল্টে দিচ্ছি । আপনি যা অপরাধ করবেন সেই অপরাধের সমান ভাগি হব আমরা ।'
শয়তানের মত একটা হাসি হাসল ইয়াকুব । ' কিন্তু পুলিশ ?
' ওরা সবাই ভুলে যাবে আপনাকে । অতীতের কোন ক্রাইম রিপোর্ট থাকবে না কোন থানায় । রাজি ?’
'কিন্তু একজনকে আমার মারতেই হবে ।' জবাব দিল ইয়াকুব । সারা দুনিয়ার ঘৃণা ওর চেহারায় ।
'এই একজনটা কে ? আপনি কি উনাকে ভয় পান ?'
' ভয় ? ' বিচ্ছিরি ভাবে হেসে ফেলল ইয়াকুব । ' নাহ । ওকে আমি ভয় পাই না । ঘৃণা করি । দুটো আলাদা জিনিস । ওকে খুন করার জন্যই জেল থেকে পালিয়েছি আমি । '
' কে সে ?'
' ওর নাম সৈয়দ কবির । এমন ভাব করছেন যেন নাম বললেই চিনবেন ।'
'তা চিনব না।' লজ্জিত ভাবে স্বীকার করলো লোকটা । ' কিন্তু এত ঘৃণা করার কারণ ?
' কবির একটা হারামজাদা ।' ক্ষোভের সাথে বলল ইয়াকুব । ' ও আমার ছোট বেলার বন্ধু ।'
'বন্ধুকে ঘৃণা ? অদ্ভুত ব্যাপার ।'
'মোটেও না। বন্ধুরাই ভাল শত্রু হয় ।' ধূর্ত হাসি হাসল ইয়াকুব । ' আমরা পাশাপাশি বড় হয়েছি । ও একদম গরীব ঘরের ছেলে । যাকে বলে ফকিন্নির ছেলে তাই । অথচ শহরে ধনী ব্যবসায়ী বাবার এক মাত্র ছেলে আমি । সবাই আমাকে তেল দিত । তোয়াজ করে চলত । ইস্কুল জীবন থেকেই টিফিনের ভাগ পাবার জন্য চারিদিকে মৌমাছির মত ঘুর ঘুর করতো ছেলে পিলে । কবির ফকিন্নির ছেলেটা তেমন কিছু করতো না। বড় হবার পর বাপের ব্যবসার হাল ধরলাম আমি । ভেবেছিলাম ব্যাটা আমার কাছেই চাকরি বাকরি চাইতে আসবে । কি কাণ্ড নিজেই একটা কফি শপ খুলে কয়েক বছরের মধ্যে বেশ নাম আর টাকা করে ফেলল । হারামজাদা ।'
' শুধু এইজন্য মারবেন ওকে ?' লোকটা অবাক ।
'আরও ক্ষতি করেছে আমার ।'
' সেটাও শুনি না হয় ।'
‘ লীনা নামে একটা মেয়ে আছে আমাদের শহরে । নামি ব্র্যান্ডের কাপড়ের দোকানে কাজ করতো । আমি ওকে পছন্দ করতাম । কোন এক অদ্ভুত কারনে মেয়েটা আমাকে পাত্তা দিত না। কবির হারামজাদার সাথে মাক্ষি মারত । আর শেষে কি না ওই কফির দোকানদারটাকেই বিয়ে করে ফেলল । অথচ লীনার বাপকে আমি টাকা পয়সা দিয়ে হাত করে ফেলেছিলাম । কিন্তু বুড়ো ঠিকই জানত মেয়ে ওই কবিরের সাথে লেপ্তা লেপ্তি করে । সেই রাগে বুড়োটার মাথায় লোহার ডাণ্ডা মেরে খুন করে ফেলেছিলাম । কোন ভাবেই ধরা পড়তাম না আমি । কিন্তু তখনই সেখানে এসে পরেছিল সেই কবির । মনে হয় ওই ব্যাটাই পুলিশে ফোন করে আমাকে ধরিয়ে দিয়েছিল ।'
'এ তো বিরাট কাহিনি দেখছি ।' হাসি হাসি মুখ লোকটার । শান্ত চোখে চেয়ে আছে ইয়াকুবের দিকে । যেন ওর মনের ভেতরের সব খবর দেখতে পাচ্ছে দিনের আলোর মত ।
'ঠিক আছে, তো আপনি কি চান আমাদের কাছ থেকে ।'
'লীনা । ওকে পছন্দ করতাম । কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে তো ।'
'আমরা ওকে আপনার জীবনে এনে দিতে পারব ।‘
অ্যাঁ ?’
‘ অনেক আপাতত অসম্ভব কাজ করতে পারি আমরা । '
'তাহলে দেখান আপনাদের নমুনা ।
'আপনার নতুন জীবন শুরু করতে হলে আর কি কি দরকার হবে সেটা জানান । সবই আপনার হাতে তুলে দেব । কিন্তু আপনি কথা রাখবেন । একদম নতুন মানুষ হয়ে ভদ্র সুন্দর জীবন যাপন করবেন । ঠিক আছে ?'
'কতবার বলব এক কথা । ঠিক আছে ।' ঝাঁঝিয়ে উঠলো ইয়াকুব ।
' পৃথিবী ছেড়ে আমরাও চলে যাব কয়েকদিন পরে । ততদিন আপনি আমাদের মেহমান ।'
ইয়াকুবকে একটা বন্ধ কামরায় রাখা হল ।
বাইরে দিন না রাত সেটা বোঝার কোন উপায় নেই । টিভি , রেডিও , ঘড়ি কিছু নেই । ফ্রিজে খাবার দেয়া আছে । দরজা বাইরে থেকে বন্ধ । ভেতরে বাথরুম আর টয়লেট আছে ।
বাইরে কেউ আছে কি না সেটাও বোঝার উপায় নেই । আলপিন পড়লে শব্দ শোনা যাবে অমন নীরবতা ।
মনে হয় অনন্ত কাল পর একদিন দরজা খুলে লোকটা হাজির হল । মুখে হাসি । হাতে ক্যাম্বিসের কাপড়ের ব্যাগ ।
'এই নিন আপনি যা যা চেয়েছিলেন সব ।' ব্যাগটা ইয়াকুবের হাতে ধরিয়ে দিল সে ।
'কতদিন লাগল ?'
'সেটা জানতে হবে না । কারণ সময় একটু আটকে ছিল এখানে ।
দ্রুত ব্যাগ খুলল ইয়াকুব । দামী সুন্দর রুচিশীল পোশাক কয়েক জোড়া । একটা গাড়ির চাবি । বড় বড় কতগুলো টাকার বাণ্ডিল । পুলিশ ক্লিয়ারেন্স !
'পিস্তল চেয়েছিলাম কিন্তু ।' রাগি গলায় বলল ইয়াকুব ।
'আপনি নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছেন, ওই সব জিনিস লাগবে না।' লোকটার জবাব ।
'কিন্তু আপনি বলেছিলেন সব দেবেন ।'
'এটা বাদ দিন ।'
মনে মনে হাসল ইয়াকুব । অবৈধ পিস্তল কেনা এমন কি আর কঠিন !
' কিন্তু কেউ যদি আমাকে আক্রমণ করে বসে তখন ?' ভালমানুষের মত মুখ করে বলল ইয়াকুব ।
'তেমন কিছুই হবে না। ' জোড় গলায় বলল লোকটা । ' চলুন যাওয়া যাক । সময় হয়ে গেছে ।'
কামরার বাইরে চলে এলো দুইজন ।
তারপর চলে এলো বাড়ির বাইরে ।
অবাক হয়ে ইয়াকুব দেখতে পেল বাড়ির পিছন দিকে বিচিত্র ধরনের ধাতব একটা স্পেসশিপ দাঁড়িয়ে আছে । এক গাদা লোক বাক্স ধরনের কি যেন তুলছে । একে একে সবাই চলে গেল স্পেসশিপের ভেতরে ।
এক পাশে পেল্লাই এক কৃষ্ণচুড়া গাছের তলায় নতুন মডেলের একটা গাড়ি ঝকঝক করছে ।
' গাড়িটা আপনার জন্য । আমাদের কাজ শেষ । চলে যাচ্ছি ।‘ বলল সে ।
'আপনার নামটা জানা হল না ।' বলল ইয়াকুব ।
' আমার নাম নেই । তারপরও পৃথিবীতে শ্যামসুন্দর সিকদার নামটা ব্যবহার করতাম । উঠে পড়ুন গাড়িতে । ভোরের আলো না ফোটা পর্যন্ত গাড়ির হেড লাইট জ্বালাবেন না । সোজা যেতে থাকবেন এক ঘণ্টা । কোন শহর আপনার পছন্দ ?'
'নারায়ণগঞ্জ ।'
ওখানেই যাবেন । সব ঠিক মত পাবেন । কোন রকম ঝামেলা না করলে আর আমাদের দেয়া কথার বরখেলাপ না করলে বাকি জীবন সুখে থাকতে পারবেন । কোন সমস্যা হবে না ।'
' কোন ঝামেলা করব না । ' মুচকি হাসল ইয়াকুব ।
ভাবল - তোমরা থাকবে কত কোটি মাইল দূরে । জানবে কি করে কি করছি আমি ?
গাড়ির ভেতরে উঠে বসলো ইয়াকুব । একদম নতুন জিনিস । ইঞ্জিন আর চামড়ার চনমন করা ঘ্রাণ । চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট দিতেই চালু হল ইঞ্জিন ।
' বিদায়।' হাত নেড়ে চলে গেল শ্যামসুন্দর সিকদার । উঠে পড়লো স্পেসশিপে । জ্বলে উঠলো উজ্জ্বল লাল -নীল আলো ।
অবাক হয়ে দেখতে লাগলো ইয়াকুব ।
যেমন ভেবেছিল তেমন কিছু হল না ।
চোখের সামনে কেমন ঝাপসা হতে হতে মিলিয়ে গেল আস্ত স্পেসশিপটা । সেই সাথে বাড়িটাও ।
একদম ভোজবাজির মত !
কিচ্ছু নেই এখন ।
কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগল ওর । চারিদিকে বালিয়াড়ি । পাথর । আর পাহাড় । মাটিও কেমন রুক্ষ । ঝামা পাথরের মত । এটা কি পৃথিবী ?
নাকি ওকে অন্য কোথায়ও নামিয়ে দিয়ে গেছে ?
গাড়ি চালাতে লাগল ।
সব কিছু তো স্বাভাবিকই লাগছে ।
ঘণ্টাখানেক যাবার পর দিগন্তের কাছে শহরের আলো দেখতে পেল । সেই সাথে শীতলক্ষ্যা নদীর উপরে চলা নৌকার কমলা হলদে আলোও চোখে পড়লো ।
চারদিকটা অনেক বেশি সুনসান । আগের চেয়ে কত পরিষ্কার ।
মিনিট দশেক গাড়ি চালাতেই নিউ মেট্রো সিনেমা হল পেয়ে গেল । আরও খানিক দূরে কবিরের কফিশপ ।
এত সকালে দোকান খোলে না ।
ওকে দেখে যদি কেউ পুলিশ ডাকে ?
কি মনে করে গাড়ির ড্যাশ বোর্ড খুলতেই চোখ লাড্ডু লাড্ডু হয়ে গেল ।
ভেতরে আর্জেন্টিনার একটা ব্যালেস্টার – মোলিনা পিস্তল । একদম নতুন । অতিরিক্ত গুলি ভর্তি একটা ম্যাগাজিন ।
ওরা পিস্তল দিয়েছে ?
আসল তো ?
পথের উপরে একটা কুকুর ঘুমাচ্ছিল । ওটার মাথা লক্ষ্য করে গুলি করলো । খুলি ফেটে ঘিনঘিনে রঙের মগজ- রক্ত বের হয়ে আসতেই বেশ খুশি হল ।
আবার গাড়ি চালাল ।
কফিশপের বাইরে দারোয়ান বসে কান খোঁচাচ্ছিল একটা কাঠি দিয়ে । ইয়াকুবের গাড়ি থামতেই হেঁড়ে গলায় বলল , ' আরে ইয়াকুব ভাই আপনে ? জানতাম আপনি আসবেন ।'
দোকানের কাচ ভেঙ্গে ফেলেছিল ইয়াকুব । মেরামত করা হয়েছে । নতুন রঙ করা হয়েছে ।
'কবির কোথায় ?' কোন রকম বাঁধা না পেয়ে খারাপ লাগলো ইয়াকুবের ।
' কবির ভাই তো আরও পরে আসেন । আপনে জানেন না ? 'দারোয়ান অবাক । ' দুফুরের পর দুকান খুলেন ।'
ইয়াকুব জানে ।
'তয় কবির ভাই আপনের কথা অনেক কইত । লীনা আপার আব্বারে আপনি খুন করেন নাই সেটা আমরা জানি । পুলিশ প্রমান পাইছে হেয় সিঁড়ি দীয়া পিছলাইয়া পইড়া মারা গেছেন ।'
'আমি পরে আসব ।' আবার গাড়ি চালু করলো ।
' চৌধুরী লেনের শাদা একতলা বাড়িটায় কবির ভাই থাকে জানেন তো ?' বলল দরোয়ান ।
'জানি ।' ততক্ষণে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে ইয়াকুব ।
বিরক্ত ।
সব কিছু বেশি সহজ হয়ে গেছে না ?
দারোয়ান ওকে দেখে চমকে উঠলে ভাল হত । বাঁধা দিলে বা তর্ক করলে ভাল হত । সব কেমন পানসে । দামী গাড়ি করে এসেছে সেটাও কি ব্যাটা দেখেনি ?
চৌধুরী লেনের সেই বাড়িটা চেনে ।
গাড়ি পার্ক করে নামলো । পিস্তলটা গুঁজে নিল কোমরের কাছে । ওকে দেখে কবির অবাক হবে ?
দরজা খটখট করতেই খুলে গেল । ভেবেছিল কবির দরজা খুলবে । কিন্তু লীনা । ওর চোখে মুখে ঘুমের ছাপ ।
'তুমি ? কখন এসেছ ?' খুশি হয়ে গেল লীনা । ' ভেতরে এসো । এত সকাল সকাল । '
আরও বেশি থতমত খেয়ে গেল ইয়াকুব । লীনার বাবাকে ও খুন করেছিল । কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ওর ফাঁসির জন্য আবেদন করেছিল মেয়েটা । আর এখন কি না ...।
‘ কবির কোথায় ?' কর্কশ গলায় প্রশ্ন করলো ইয়াকুব ।
'ও আমার সাথে থাকে না তো ।' বলল লীনা । ' আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে । ওকে বললাম আমি তোমাকেই ভালবাসি । ও মেনে নিল । আর পুলিশ প্রমান পেয়েছে বাবা সিঁড়ি দিয়ে পা পিছলে পরে মারা গেছেন । একদম নির্জলা দুর্ঘটনা । সেই সময় তুমি শহরেও ছিলে না। শুনে কত খারাপ লেগেছিল আমার । এসো ভেতরে । চা বানাচ্ছি । নাস্তা কি খাবে বল ?'
বিরক্তির সীমা রইল না।
শ্যামসুন্দর সিকদার আর তার দল সব কিছু বড্ড বেশি নিখুঁত করে সাজিয়েছেন ।
এমন হলে কি ভাল লাগে ?
এমন পানসে জীবন ইয়াকুব চায় না । একটু বাঁধা চেয়েছিল । সহজে কিছু পেলে কারই ভাল লাগে ?
লীনা ওকে ঘৃণা করলে বা বাঁধা দিলে ব্যাপারটা বেশ ফাটাফাটি হতো । টাকার গরম বা নিজের প্রভাব দেখিয়ে বশ করতে পারলে জমতো ।
কিন্তু সব কেমন নিরামিষ নিরামিষ লাগছে ।
' কবির এখন কোথায় ?' খেঁকিয়ে উঠলো ইয়াকুব ।
'ওর বাসায় ।'
' চলো ওর সাথে দেখা করি ।'
'আরে খামাখাই তুমি ওর কথা ভেবে উত্তেজিত হচ্ছ । ও আমাদের জীবন থেকে চলে গেছে ।' শান্ত করানোর চেষ্টা করলো লীনা । ' আর নাস্তা খেয়ে নাও আগে ।'
'উহু, নাস্তা ওর বাসায় খাব ।' শয়তানি হাসি হাসল ইয়াকুব । ' দেখি পুরানো বন্ধুকে কেমন ভাবে আপ্যায়ন করে ।'
লীনার হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তুলল । পিস্তলটায় আবারও হাত বুলিয়ে নিল । এমন না হলে কি বাপের ব্যাটা হওয়া যায় ?
কবিরের মুখোমুখি দাঁড়াবে লীনাকে নিয়ে । পাকনা পাকনা কয়েকটা সংলাপ দেবে । হাতে থাকবে পিস্তল ।
একদম সিনেমার মত ।
কারও দয়া নিয়ে জীবনের ছক বদলাতে চায় না । চুলায় যাক শ্যামসুন্দর সিকদার আর তার দলবল ।
মাত্র সকাল ।
রাস্তা ঘাট ফাঁকা ।
কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা চলে গেল কবিরের বাড়ির সামনে । বেশি দূরে না। শীতলক্ষ্যার কাছেই ফাঁকা মত জায়গায় থাকে । ভাড়া সস্তা ।
বাড়ির কাছে আসতেই লীনা বলে উঠলো , ' ওই তো কবির ।'
এত সকালে উঠে পড়েছে কবির ।
বাইরে কয়েকটা পোড়া মাটির টবে হাবিজাবি কি সব গাছে । কেতলির মত কেমন একটা পাত্র দিয়ে গাছে জল ঢালছে ।
ওকে দেখেই মেজাজে খিঁচ ধরে গেল ইয়াকুবের ।
বাড়িয়ে দিল গাড়ির গতি ।
'না ।' চিৎকার করে উঠলো লীনা ।
বুঝতে পেরেছে ইয়াকুব কি করতে যাচ্ছে ।
চিৎকার করে স্টিয়ারিঙটা ঘুরিয়ে দিল লীনা ।
আর ওতেই বেঁচে গেল কবির ।
অন্য দিকে চলে গেল গাড়ি । টায়ারের তীব্র শব্দ শুনে লাফ দিয়ে নিরাপদ জায়গায় চলে গেল কবির । টাল সামলাতে না পেরে পরে গেল মাটিতে । কেটলি ফেটলি কোথায় গেছে কে বলবে ?
উঠে গা থেকে মাটি ঝেড়ে সামনে এগিয়ে এলো কবির ।
কয়েক কদম সামনে আসতেই ওদের চিনে ফেলল । হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে গেল চেহারা , ' আরে ইয়াকুব । কেমন আছ । আহ তোমাদের দুইজনকে এক সাথে দেখে কি যে ভাল লাগছে ।'
মোটেও মাখন গলল না ইয়াকুবের ।
ঝট করে পিস্তলটা বের করে আনল ।
'এই সব কি ?' ভড়কে গেল কবির ।
অস্ফুট চিৎকার করে উঠলো লীনা ।
'তোকে আমি খুন করব হারামজাদা ?' হিসিয়ে উঠলো ইয়াকুব ।
'কিন্তু কেন ?' বোকার মত চেয়ে আছে কবির ।
'তুই আমার শত্রু ।'
' কিন্তু আমি তো তোমার পথ থেকে চলে গেছি ।' বেদনা মাখা গলায় বলল কবির । ' যখন জানতে পারলাম তুমি লীনাকে পছন্দ কর তখনই ।'
'কারণ তুই একটা কাপুরুষ । সব সময় তুই আমার সাথে পাল্লা দিয়েছিস ।'
' সেটা তোমার মনের ভুল । খামাখাই আমাকে তোমার ছায়াশত্রু মনে করে অদৃশ্য প্রতিযোগিতা করে নিজের শান্তি নষ্ট করেছ ।' হাহাকার ভরা গলায় বলল কবির । ' কিন্তু এখন তো আমরা বন্ধু ।'
'জীবনেও না । একবার শত্রু মানে সারা জীবনের শত্রু । ' ট্রিগারে চাপ দিতে গেল ইয়াকুব ।
'না ।' ওর পিস্তল ধরা হাতের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো লীনা ।
ঝটকা দিতেই ছিটকে গাড়ির ড্যাশ বোর্ডের উপর মাথা ঠুকে নিঃশব্দে জ্ঞান হারাল মেয়েটা ।
অজান্তেই এক কদম সামনে চলে এলো কবির ।
'আহ দরদ এখনও কমেনি ।' শেয়ালের মত খ্যাক খ্যাক করে হেসে ফেলল ইয়াকুব ।
তারপর হাসি মুখেই গুলি করলো । কবিরের বুকে গিয়ে লাগল গুলিটা । ব্যাথার চিহ্ন ফুটল না ওর চেহারায় । একটুও টলে উঠলো না।
পর পর আরও গুলি করলো ইয়াকুব । পুরো ম্যাগাজিন শেষ করে ফেলল ।
একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে কবির । ব্যাথা নেই । রক্ত নেই । শরীরের ক্ষতস্থান থেকে বের হয়ে এলো সোনালী কয়েক ফোঁটা তেল ।
পিলে চমকে গেল ইয়াকুবের ।
কবিরের ক্ষতস্থানে দেখা যাচ্ছে ধাতব যন্ত্রের টুকরো ।
' কে তুমি ?' শূন্য পিস্তলটা ছুড়ে দিল কবিরের দিকে ।
শূন্যেই সেটা খপ করে ধরে ফেলল কবির ।
'তুমি কবির না। মানুষ না তুমি !' হাঁপাতে হাঁপাতে বলল ইয়াকুব ।
'কিন্তু প্রায় নিখুঁত করেই বানিয়েছি আমরা তাই না ?' মুচকি হেসে বলল লীনা ।
চমকে লীনার দিকে ফিরে চাইল ইয়াকুব । লীনার কণ্ঠ হুবহু শ্যাম সুন্দর শিকদারের মত !
ওর চোখের সামনেই নানা রকম পরিবর্তনের মধ্যে লীনা পাল্টে হয়ে গেল শ্যামসুন্দর সিকদার । চেহারার দুঃখী মানুষের মত ভাব ।
'আপনি এত বোকা ! অথচ আপনাকে ভাল জীবন দেয়ার সব রকম চেষ্টা আমরা করেছি । শুনেছি মানুষ নাকি সহজে পাল্টায় না । সেইজন্য অমন একটা পরীক্ষা করলাম । আপনি ফেল । অথচ আপনি চাইলে নতুন সুন্দর একটা জীবন পেতে পারতেন । জীবন সবাইকে সেই রকম সুযোগ দেয় না । আপনি ছিলেন ভাগ্যবান। '
' আমাকে ক্ষমা করে দিন ।' হাঁটু গড়ে বসে পড়লো ইয়াকুব । ঘামছে দরদর করে । ' আমি বুঝতে পারিনি আপনারা ফাঁদ পেতে আমাকে পরীক্ষা করছেন ।'
'ফাঁদ ?' অবাক গলায় বললেন শ্যামসুন্দর শিকদার । 'এই মহাবিশ্বটাই একটা ফাঁদ খোকা । সেই ফাঁদকে আপনারা নিয়তি বলেন । যেমন কর্ম তেমন ফল । আপনি আমাদের বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন । '
' আমাকে মারবেন না প্লিজ ।' ককিয়ে উঠলো ইয়াকুব ।
'হত্যা জিনিসটা আমাদের মধ্যে নেই । আপনাকে আমাদের সাথে নিয়ে গিয়েও লাভ নেই । এখানেই রেখে যাব আপনাকে । নিয়তি আপনার পাওনা বুঝিয়ে দেবে । '
গাড়ি থেকে বের হয়ে হাঁটতে লাগল শ্যামসুন্দর শিকদার ।
পিছনে পিছনে ওদের তৈরি করা কবির । লোহার মানুষটা ।
চলে যাচ্ছে ওরা ।
দপ করে মাথার উপরের সূর্যটা নিভে গেল ।
ইয়াকুব আবিস্কার করলো ওটা আসলে সূর্যই না ।
উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক আলো । এইবার বুঝতে পারলো চারিদিকের সব কিছু কৃত্রিম । বানানো । হলিউড মুভির আধুনিক মঞ্চের মত । দুই পাশের বাড়ি ঘর সব কাগজের । এইজন্য রাস্তাঘাট এত পরিষ্কার ?
একটা পৃথিবীর কোন জায়গা ?
আকাশটা একটা নীল রেশমি কাপড়ের পর্দা । অদৃশ্য কেউ গুটিয়ে নিল সেটা । দেখা গেল অন্ধকার আকাশ ।
চারিদিকের বাড়ি ঘর দালান বাড়ি সব মিলিয়ে গেল দুপদাপ করে ।
আরেকটা ফাঁদ ?
কি করবে ইয়াকুব ?
প্রথমেই মনে হল পালাতে হবে ।
দ্রুত গাড়িতে বসে চাবি মোচড় দিল । ভেবেছিল চালু হবে না ।
কিন্তু ইঞ্জিন চালু হয়ে চলতে লাগল গাড়ি ।
পালাতে হবে যত দূর সম্ভব ।
পিছন ফিরে দেখল ওরা কেউ নেই ।
সামনে ফাঁকা রাস্তা । কিন্তু ঘুঁট ঘুঁটে অন্ধকার । গাড়ির হেড লাইটেও অন্ধকার কাটছে না।
আরও সামনে বিরাট একটা খাদ । ব্রেক কষলো । কিন্তু সামাল দিতে পারলো না। খাদের বাইরে লাফ দিয়ে পরে গেল গাড়িটা ।
যেই কোন মুহূর্তে নীচের শক্ত পাথরে পড়বে গাড়িটা । গুড়িয়ে যাবে । মারা যাবে সে।
কিন্তু ওরা বলেছিল ওরা খুন করে না কাউকে ।
গাড়িটা শূন্যেই রইল । মাটিতে পড়ছে না।
অবাক হয়ে ইয়াকুব আবিস্কার করলো বাইরে ঘুঁট ঘুঁটে অন্ধকার । হাজার হাজার তারা চারিদিকে । হুউউস করে ওর গাড়ির খানিক দূর দিয়ে চলে গেল একটা বিচিত্র রঙিন উল্কা ।
কোন লক্ষ্য নেই । কোথায় যাচ্ছে সে ?
লোকগুলো ওকে মহাশূন্যে ছেড়ে দিয়েছে ! সেইজন্য আলো নেই ?
আর বাতাস ?
আবিস্কার করলো গাড়ির ভেতরে বাতাস নেই ।
(বিদেশি গল্প অবলম্বনে )

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন