এক
দুপুরের পর রোদটা আরও হলুদ হয়ে যায়।
আকাশ হয় শিম ফুলের মত ঘন নীল। চারিদিকে অলস পরিবেশ। ঘুম ঘুম ভাব। হলুদ কালো মৌমাছি বিং বিং শব্দ করে ফুলে ফুলে উড়ে মধু যোগারের চেষ্টা করছে।
ওরা অবসর নিতে চায় না।
রোদের ঝাঁঝে নিম গাছ থেকে নিম ফুলের অদ্ভুত রকম ঘ্রান বের হচ্ছে।
গরমের দুপুরে অনেক পথ হেঁটে বাড়িতে ভাত খেতে আসে বাসন্তী পিসীর বাবা।উনি নদীর পারে কোন এক কারখানায় হিসাব রাখার কাজ করেন।
দুপুরে এক ঘণ্টার ছুটি।
নৌকা পাড়ি দিয়ে অনেক পথ হেঁটে বিশাল বাংলোর মাঠ পাড়ি দিয়ে বাসায় আসেন ভাত খেতে। খাওয়ার আয়োজন খারাপ। আলু ভাঁজা, উচ্ছে ভাঁজা,ডাল, পিচ্চি মাছ। সপ্তাহে একদিন ইলিশ মাছ আনেন। একটা ইলিশ দশ টাকা।
খাওয়া শেষ করে মুখে মৌরির দানা চিবুতে চিবুতে গরমের মধ্যে বের হয়ে পড়েন ।
বাসন্তী পিসীর বাবা যাকে আমি দাদু বলি।
একদিন আচমকাই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন , "বড় হয়ে কি হবি ?"
বড় হয়ে কি হব ?আজব তো। ব্যাপারটা নিয়ে কখনই ভাবিনি। বড় যে হব তা জানি। কিন্তু সেটা তো অনেক লম্বা সময়ের ব্যাপার। অনেক গুলো বছর লাগে বড় হতে। আমি তো বাঁকসা ঘাস, রাংচিতার দঙ্গল না, যে এক সপ্তাহ পরেই বড় হয়ে যাব।
সময় লাগে।
আর কি হব সেটা নিয়েও কখনই ভাবিনি।
আমাদের প্রতিবেশী কয়েক ঘর। ওরা সবাই চাকরি করে।
চাকরি করে ব্যাপারটা ঠিক পরিষ্কার না আমার কাছে। কেমন যেন ইস্কুলে যাবার মতই।
সকালে উঠতে হয়। উঠেই রেডিও ছেড়ে দেয়। রান্না ঘরে রুটি আর আলু ভাঁজার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কলতলায় গিয়ে হাপুস হুপুস করে স্নান করে। তারপর বগলে কিসের ফাইল নিয়ে দৌড় দেয়। যেন দেরি হলে কেউ মারধর করবে। যারা চাকরি করে তারা বিকেলে বা সন্ধ্যের কিছু আগে বাসায় ফেরে।
হাতে থাকে বাজারের ব্যাগ। লাউ, পুঁইশাক বা ডাটা উঁকি দেয় ব্যাগের ভেতর থেকে।
আরেক হাতে হয়তো সূতলিতে বাঁধা মাছ ঝুলে। মাছের কানকোর ভেতরে পাটের বা ঘাসের সূতলি ঢোকানো থাকে।তেলের শিশি থাকে কখনও কখনও।
চাকরিজীবীদের চেহারায় তখন ক্লান্তি মাখানো থাকে । মনে হয় দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের বেঁচে যাওয়া কোন সৈনিক। হাত পা ধুয়ে চা খেতে বসে। হাতে খবরের কাগজ।
এমন ভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খবরের কাগজ পড়ে যেন কাল পরীক্ষা দিতে হবে।
তারপর হয়তো রেডিও নিয়ে বসে যাবে।ঘণ্টা খানেক ধরে নানান স্টেশন মুচড়ে মুচড়ে পছন্দের কোন স্টেশন পেয়ে দাঁত বের করে হাসবে।
যারা চাকরি করে তারা বাসায় আসার পর আর কোন কাজ করতে চায় না। অলস হয়ে যায়।
দুই চারজনকে দেখি তাসের আড্ডা বসায়।তাদের বউ রোজই বকাঝকা করে এই বিচ্ছিরি খেলার জন্য। তাস খেলা অবশ্যই বিচ্ছিরি খেলা। কতগুলো কাগজের টুকরো কায়দা করে হাতের তালুতে লুকিয়ে রাখতে হয়। তারপর গায়ের জোড়ে সামনে ছুড়ে বলতে হয়- টেক্কা।কি সব শব্দ শুনি- চিড়া, রুইতন, হরতন, বিবি, গোলাম, সাহেব।
মানে কি তাই বা কে জানে!
সামান্য এই খেলা নিয়ে বেশ ঝগড়া ও করে। একবার পুলিশ এসে তরফদার সাহেবের বাসা থেকে ছয় সাত জনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। উনারা নাকি টাকা দিয়ে তাসখেলে। ওটা নাকি জুয়া।
জুয়া খেলা খুব খারাপ । এর চেয়ে রাম সাম যদু মধু খেলা অনেক ভাল।
পড়শিদের মধ্যে একজন গগন হাজরা। উনি রেডিয়ো আপিসে চাকরি করেন।সবাই তাকে বেশ সমজে চলে।রেডিওতে চাকরি ! সহজ কথা নাকি!
খুব সকাল সকাল আপিসে চলে যান।
ফেরে সেই রাতে।
সবাই তার কাছে দেশের খবর জানতে চান। আর উনি এমন ভাব করেন যেন রাজ্যের সব ঘটনা তার রেডিওর আপিসের মধ্যেই ঘটে।ভিয়েৎনামের লড়াই, জাপানের হিরোশিমায় বোমা ফেলার কথা, রাশিয়ায় তুষার ঝড় , সাইবেরিয়ায় উল্কা পড়ে বিশাল বনভূমি পুড়ে যাওয়া সব ব্যাপারেই উনি বেশ কথা বলতে পারেন।
উনার বসার রুমটাও বেশ মজার। টেবিলের উপর ইয়া বড় একটা কাঁচের মার্বেল।তবে খানিক চ্যাপ্টা। ভেতরে রঙিন ফুল আর মাছ। বেশ ওজনের। মাছ আর ফুল ভেতরে ঢুকল কি করে কে জানে ? পরে জেনেছি ওটার নাম নাকি পেপারওয়েট । কাগজ- পত্র যাতে বাতাসে উড়ে না যায় সেই জন্য এই পেপার ওয়েট দিয়ে চাপা দিয়ে রাখে লোকজন।
খামাখাই। আমি তো আমার দরকারি কাগজ ওষুধের খালি শিশি বা রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া লোহার বল্টু দিয়ে চাপা দিয়ে রাখি। কাজ হয় তো বেশ।
ওহ গগন হাজরার বাড়িতে আরও অদ্ভুত একটা জিনিস দেখেছি, কাঁচের ইয়া বড় একটা বোতলের ভেতরে কাঠের এক আস্ত পিচ্চি জাহাজ। পাল টাল মাস্তুুল ফাস্তুুল সহ।মস্ত বড় কোন কারিগর না হলে এমন জিনিস বানানো সম্ভব না।
কি ভাবে জাহাজটা কাঁচের বোতলে ঢোকানো হয়েছিল কেউ যদি বলতো!!!!
আরেক জন হচ্ছেন সদানন্দ বাবু। উনি নাকি পোস্ট আপিসে কাজ করেন।
বিকেল পাঁচটার সময় বাসায় ফিরে বাংলোর মাঠে চলে যান। সরু দেখে একটা কচুর ডগা খুঁজে দিতে বলেন আমাকে। সেই কচুর ডগা চিপে খানিক রস বের করেন।
তারপর অনেক সময় ধরে কান খোঁচান। আবেশে তার চোখ বন্ধ হয়ে যায়।
সদানন্দ বাবু লোক ভাল। শুধু আমাকে দেখলেই ইংরেজি শব্দের অর্থ জিজ্ঞেস করেন। ইংরেজি কিন্তু সোজা। যেমন A তে আপেল। আর অ্যাপেল ইংরেজি আপেলই।B তে বল। বল ইংরেজি কিন্তু বল ই। C তে বিড়াল। বিড়াল ইংরেজি বিড়াল হওয়া উচিৎ। কিন্তু ইংরেজরা ভুলে ওটা ক্যাঁট বলে।
কি আর করা।
আর সদানন্দ বাবুর হাতে ইয়া বড় একটা ঘড়ি আছে। খানিক পরপরই উনি সেই ঘড়ি ঝাঁকি দিয়ে সময় দেখেন।
শ্বশুর বাড়ি থেকে নাকি এই ঘড়িটা উনাকে দিয়েছে।বড় হলে আমিও বিয়ে করব। আর আমাকেও নিশ্চয়ই আমার বউয়ের বাবা মানে শ্বশুর এমন ঘড়ি দেবে।তবে ঘড়ির প্রতি আমার তেমন লোভ নেই। আমার ভাল লাগে বাসন্তী পিসীর বাবার কাছে থাকা একটা আতসি কাঁচ ।
জিনিসটা অদ্ভুত।
আগে নাকি বাসন্তী পিসীর দাদু মানুষের হাত দেখে ভাগ্য বলে দিতে পারতেন ।অনেক লোক আসতো হাত দেখাতে। বাসন্তী পিসির বাবা হাত দেখতে পারেন না।কাঠের একটা বাক্সে আতসি কাচটা রেখে দিয়েছে।
মাঝে মাঝে খুব অল্প সময়ের জন্য আমাকে ধার দেয় জিনিসটা।
দারুন কাজের জিনিস।কাগজের টুকরা বা শুকনো পাতার উপর ওটা ধরে সূর্যের আলো ঘন করে ফেললেই দপ করে আগুন জ্বলে যায়।ওটার নীচে পিঁপড়ে থাকলে হাতির মত বড় দেখায়। গাছের পাতা রেখে দেখলে মনে হয় ইটের তৈরি দেয়াল।পিচ্চি পিচ্চি নরম দূর্বা ঘাসগুলো আতসি কাঁচের নীচে মনে হয় আমাজনের রেইন ফরেস্ট। ডোবার ব্যাঙ্গাচি গুলো দেখলে মনে হয় নীল তিমি।
মোদ্দা কথা একটা আতসি কাঁচ দিয়ে সারা দিন পার করা যায়।
আমাদের চোখের দেখার বাইরে যে কত কিছু আছে।
যাক সেই সব কথা।
সদানন্দ বাবু হলুদ রঙের এক তলা এক দালানে কাজ করেন। ওটাই পোস্ট আপিস। বাইরে ইয়া বড় একটা কাঠ বাদাম গাছ। কোন এক মৌসুমে ক্রিকেটের বলের মত ফল হয়। কাঁচা অবস্থায় পান্নার মত সবুজ। পাকলে রুবির মত লাল।কাটলে ভেতরে দেশি খেজুরের মত বা অক্টোপাসের ডিমের মত বাদাম ভর্তি থাকে।
দারুন দুধেল স্বাদ।
আপিসের বাইরে টিনের বড় একটা ডিব্বা ঝুলে সব সময়। বাসায় চিঁড়া, মুড়ি বা মোয়া রাখার ডিব্বার মত। তবে চারকোণা না। গোল।বালতির হুকের মত একটা হুকে ঝুলে সেটা। জমাট বাঁধা মোষের রক্তের মত লাল রঙের। চার কোনা ফাঁক আছে। ওখানে নাকি লোকজন চিঠি ফেলে দেয়।তার আগে অবশ্য শুকনো কাঁঠাল পাতা রঙের পোস্ট কার্ডের উপর লিখতে হয় । বা মিষ্টির দোকানের দৈয়ের রঙের খাম কিনে ভেতরে চিঠি ভরতে হয়।
ও হ্যাঁ, ডাক মাসুল হিসাবে টিকিট কিনে উপরে সেঁটে দিতে হয়।তারপর সেই চিঠি চলে যাবে বহু দূরের দেশে। যার যার প্রিয় জনের কাছে। ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক না ?
এই হচ্ছে মোটামুটি চাকরিজীবী প্রতিবেশী।
আরও একজন আছেন। উনার নাম ওয়ালী।ইয়া মোটা নাদুস নুদুস এক লোক। হাতের আঙ্গুলগুলো সাগর কলার মত মোটা।ছুটির দিনে উনি বারান্দায় লুঙ্গি পড়ে খালি গায়ে বসে থাকেন। উনার পিচ্চি কাজের ছেলে ওয়ালী সাহেবের সারা শরীরে তেল মেখে দেয়। উনি আরামে উ আ করতে থাকেন।
ওয়ালী সাহেব সবচেয়ে ভাল চাকরি করেন।
এয়ারপোর্টে। মানে উড়োজাহাজ বন্দর।ওখান থেকে বড় বড় বিমানগুলো উড়ে উড়ে সারা দুনিয়ায় যায়। বরফ ঢাকা রাশিয়া। ধূসর মরুভূমিওয়ালা টেক্সাস, সমুদ্র ঝিলিমিলি ক্রিসমাস আইল্যান্ড। সব জায়গায়।
বিমানগুলো যেই দেশেই যাক আমাদের বাসার উপর দিয়ে উড়ে যায়। ভীষণ রকম শব্দ পেলেই আমি দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসি।
হাত নাড়াই। বিমানের পাইলট আর যাত্রীরা নিশ্চয় আমাকে দেখতে পায় ? সেই জন্য ভাল জামা আর হাফ প্যান্ট পড়ে থাকি।
তো, ওয়ালী সাহেবকে কেউ পছন্দ করে না। উনি নাকি ঘুষ খায়। সাথে মদ ও।দুটোই নাকি খারাপ মানুষেরা খায়।
ঘুষ কি ভাবে খায় আর জিনিসটা কি জানি না। মদের ব্যাপারটা সিনেমায় দেখেছি। ধরমেন্দ্র সাহেব সোলে সিনেমায় প্রচুর মদ খেয়ে অনেক চিল্লা ফাল্লা করেছিলেন।
ওয়ালী সাহেব মদ খান কি না জানি না। তবে ছুটির দিনে কেমন একটা বোতল নিয়ে বসেন। হতে পারে ওটা কেরসিন তেলের বোতল। মানুষকে বাজে সন্দেহ করা খারাপ মনের লক্ষণ। সাথে একটা ছোট গ্লাস থাকে। হতে পারে ওটা কাশির সিরাপ খাওয়ার গ্লাস। পাশে চীনেমাটির তসতরি ভর্তি কতগুলো বাদাম থাকে। বাদাম তো থাকতেই পারে। কাঠ বিড়ালীর মত প্রাণী বাদাম পছন্দ করে। মানুষ আরও বেশি করবে সন্দেহ কি।
ওয়ালী সাহেব ধীরে ধীরে সেই বাদাম খেতে থাকেন।
আর কি আশ্চর্য ...বোতলটা ধীরে ধীরে খালি হতে থাকে। তখন তাকে বেশ সুখী মানুষ মনে হয়। তিনি গান গাইতে থাকেন- ‘ ইনহি লোগনে লে গ্যায়া দো পাট্টা মেরা।’
কাজের ছেলেটাকে এই সময় খামাখাই বকা বকি করেন। তাও আবার বিচিত্র ভাষায়।যেমন- কমিনে, কুত্তে কি আওলাদ, টাং তোর দুংগা।এই ধরনের ভাষার মাথা মুণ্ডু কে বুঝে ?
তবে অমিতাভ বচ্চন সাহেব রেগে গেলে খারাপ লোকদের এই রকম কথা বলেন।সিনেমায় দেখেছি।
তো বুঝতে পারলাম চাকরি করা খারাপ জিনিস।
আর মোটামুটি বিরক্তকর।
চাকরি করলে মাথায় টাক পড়ে যায়। আর চোখে চশমা দিতে হয়। সবচেয়ে খারাপ হচ্ছে সারাদিন চেয়ার টেবিলে বসে থাকতে হয়।বিশ্বাস করবে না চেয়ার টেবিলে বসে থাকা কিন্তু আসলেও খুব কষ্টের কাজ। কিছুক্ষণ বসলেই মনটা যেন কেমন কেমন করে। জানালার বাইরে দুনিয়াটা অদ্ভুত রকম সুন্দর লাগে। আকাশটা কেমন শিম ফুলের মত নীল। দুপুরের রোদসূর্যমুখী ফুলের মত হলুদ। বাইরে কেমন উদাস করা হাওয়া। বাড়ির উঠানে টাকা পাতা ভর্তি।
দিনের পর দিন চেয়ার টেবিলে বসে ইয়া বড় বড় ফাইল দেখা বা পাতার পর পাতা লেখা খুব কষ্টের কাজ। এদের জীবনটা খুব পানসে হয়ে যায়।
কোন ধরনের পেশা ভাল তাও ঠিক বুঝতে পারছি না।
ডাকপিয়নের কাজটা ভাল। সারাদিন ঘুরে বেড়ানো যায়। বা সিনেমা হলে যে লোকটা টিকিট চেক করে সেটাও ভাল কাজ। প্রত্যেকটা সিনেমা মাগনা দেখতে পারে চেকার লোকটা।
এমনিতে পেশা হিসাবে অভিযাত্রী অনেক ভাল পেশা। জাহাজে করে বের হয়ে যাও। নতুন দেশে নেমে পড়। ওখানে সব কিছুই অচেনা আর নতুন।জঙ্গল ভর্তি তেজপাতা আর জলপাই গাছ। ঝর্ণার জল ভর্তি মাছ। ঐ সব দেশে শীতে আবার বরফ পড়ে ঝুর ঝুর করে। গরমে যেমন করে ঘামাচি পাউডার ব্যবহার করি তেমনই।
অভিযাত্রীরা অনেকেই ক্যারাবিয়ান দ্বীপগুলোতে গিয়ে হাঙর শিকার করে।পেশা হিসাবে হাঙর শিকার বেশ ভালই। সারা বছরই করা যায়। হাতের তালুর মত বড় হুকে করে হাঙর বিঁধিয়ে জাহাজের ডেকে তুলতে হয়।তারপর কাঠের মুগুর দিয়ে পিটিয়ে মারতে হয়।
বেশ কঠিন কাজ।
ক্যারাবিয়ান দ্বীপগুলোতে যে সবাই হাঙর শিকার করতে যায় অমন না কিন্তু। অনেকেই যায় গুপ্তধন খুঁজতে। সারা পৃথিবী থেকে মানুষ ওখানে যায় গুপ্তধন খুঁজতে। সেই পুরানো দিন থেকে কত জাহাজ যে এই এলাকায় ডুবে গেছে তার কোন হিসাব নেই। আর কত জলদস্যু যে তাদের লুট করা সম্পদ আর ধন রত্ন এখানের দ্বীপের বালির তলায় পুঁতে রেখে মরে গেছে তারও কোন হিসাব নেই।
আসলে সব পেশাই ভাল। যদি পেশাটা তোমার ভাল লাগে।কোন পেশায় কত টাকা কামাবে সেটা বড় কথা না।
কাজটা করে কেমন মজা পাবে সেটাই বড় কথা। দেখা যেতে পারে একজন কৃষক যে কিনা শীতের মৌসুমে শালগমের চাষ করে সেও অনেক সুখী হতে পারে। আবার যারা ঝালমুড়ি বিক্রি করে সেও বেশ সুখী হতে পারে। কোটি কোটি টাকা থাকার পরও সে সুখী নাও হতে পারে। তারপরও মানুষ টাকা উপার্জন করতে চায়। টাকা দিয়ে দরকারি সব জিনিস কেনা যায় এই জন্য।
টাকা থাকলে রোজ আমি কয়েক সের শনপাপড়ি কিনতে পারি। যেগুলো দেখতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাঁড়ির মত।টাকা থাকলে রোজ আমি বস্তা ভর্তি তিলের খাজা কিনতে পারি। এই বেশি টাকা উপার্জনের জন্য ১৮৪৮ সালের দিকে মানুষ জন সবাই বাড়ি থেকে বের হয়ে যেত। সবাই ছুটত নতুন নতুন স্বর্ণখনি আবিস্কারে জন্য।
যে খুঁজে পাবে খনি তার। সেই সময়টাকে বলা হয় গোল্ড রাশ। অদ্ভুত এক সময়।
কল্পনা কর, ঘোড়ার ওয়াগনে চেপে এক দল মানুষ নতুন নতুন খনি খোঁজার জন্য বিরান সব ভূমি পাড়ি দিচ্ছে।মাথার উপর গনগনে রোদ। খাঁ খাঁ রক্ষ ভূমি সামনে। ক্ষুধা তেষ্টায় কাতর সবাই।
বেশির ভাগ স্বর্ণ-সন্ধানী কিন্তু ব্যর্থ হত।মারা যেত। রোদে পুড়ে। খিদে তৃষ্ণায় কাতর হয়ে। ম্যালেরিয়া বা অন্য কোন বিচ্ছিরি রোগে ভুগে। খনি টনিও পেত না সবাই।পেলেও লড়াই বেঁধে যেত নিজেদের মধ্যে।
স্বর্ণ হচ্ছে এক মাত্র ধাতু, মরচে পরে না। অনেক দিন ব্যাবহার করলেও চামড়ায় জ্বালা করে না।স্বর্ণ পিটিয়ে পিটিয়ে অনেক লম্বা করা যায়। মাত্র ১ আউন্স স্বর্ণ পিটিয়ে ৫০ মাইল লম্বা তার বানানো যায়। পৃথিবীর ৮০ থেকে ৯৫ ভাগ স্বর্ণ আজও আমরা তুলতে পারিনি খনি থেকে।
আর এর মানেই না আমি স্বর্ণ সন্ধানী হতে চাই।
কারন খুব পরিশ্রমের কাজ। দিনের পর দিন বেকন ভাঁজা , মানে শূয়রের মাংস পাতলা ফালি করে ভাঁজা আর কফি খেয়ে কাটাতে হয়।মাঝে মাঝে ঝর্ণার জলে ধরা পরে বড় কাইক্কা মাছ। যেটাকে গার ফিস বলে।ওটাই খায়।কৌটা ভর্তি হেরিং মাছ নিয়ে যায়। নোনা সেই হেরিং মাছ খায় দিনের পর দিন। সবজী বলতে শুধু আলু।সকালে আলু। দুপুরে আলু। আবার রাতেও আলু।
যারা মাঝে মধ্যে মটরের দানার মত একটু আধটু সোনা পায় তারা একটু ভাল খাবার খায়।সকালে - ভুট্টার রুটি,সিদ্ধ ডিম,সসেজ, আলু ভাঁজা। দুপুরে - শুধু কফি।
আর রাতে-সবজী সিদ্ধ, স্যুপ, হ্যাম, রোষ্ট করা টার্কি, বাছুরের লিভার সিদ্ধ,মাছ, ঝিনুকের পিঠা, ঝলসানো শূয়রের মাংস, গরুর মাংসের ফালি ।এত পদের খাবার থেকে বেছে মাত্র দুই পদ রান্না করা হবে।কখন কখনও রাতে পুডিং দেয়া হবে।বা আপেলের পিঠা।
কফি কিন্তু তিন বেলা চলবে। যত খুশি। মাঝে মাঝে পেঁয়াজ বা ফুলকপি সিদ্ধ চলে। মোট কথা খাওয়ার কোন ছাতা মাথা নেই।
খাটুনির ভয়ে যে আমি স্বর্ণ সন্ধানী হতে চাই না ব্যাপারটা তা না।খুবই এক ঘেয়ে কাজ। সারা দিন গাইতি মেরে পাথর ভেঙ্গে ঝর্ণার জলে ছাঁকনি দিয়ে চেলে নিতে হয়। লাগাতার এমন করার পর মটরের দানার সমান একটা সোনার টুকরা পাওয়া যায়।আর মাত্র অল্প দিনের মধ্যেই স্বর্ণ সন্ধানী জটিল সব রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
শেষে মারা যায়।
খুব কম স্বর্ণ সন্ধানী কিন্তু কোটিপতি হয়েছে। কিন্তু একটা সময় সবাই স্বর্ণ সন্ধানী হতে চাইতো। আমেরিকার ইতিহাসে সেই সময়টাই গোল্ড রাশ হিসাবে চেনে ।আজ আর দল বেঁধে কেউ স্বর্ণ সন্ধানী হয় না।
তবে পুরানো দিনের অনেক পেশা খুব মজা লাগে আমার কাছে।
যেমন- খুব সকালে তোমার ঘুম থেকে উঠা দরকার ?ভাল কথা। তবে এক জন লোককে পয়সা দিয়ে ভাড়া করতে হবে। সেই লোক রোজ সকাল বেলা তোমার দরজা বা জানালায় নক করে বলবেন-কানুদা উঠে পড়ুন। আপিস যেতে হবে না?
আরেকটা পেশার কথা শুনেছি। নিজে অবশ্য দেখিনি। সেটা হল রাস্তার মোড়ে মোড়ে যে লাম্প পোস্ট আছে সে গুলোতে নাকি আগে গ্যাসের আলো জ্বলত।তারও আগে রেডির তেলের আলো।
ঠিক সন্ধ্যা বেলা এক জন লোক আসতো। কাধে একটা মই।মই চেপে জ্যাকি চ্যানের মত উপরে উঠে যেত লোকটা।পকেট থেকে স্ক্রু ড্রাইভার বের করে খানিক খোঁচা দিলেই গ্যাসের আলো জ্বলে উঠত।ঝকঝকে হয়ে যেত পথ। আর যখন রেডির তেলের আলো জ্বলত তখন মাটির বাউলে রেডির তেল রেখে সলতে জ্বালিয়ে দিত সেই লোকটা। মানে লাইট ম্যান।পেশা হিসাবে এটাই আমার পছন্দের। সন্ধ্যার পর বাইরে টো টো করে ঘোরা যাবে।কিন্তু সমস্যা হল আজ কাল লাইট ম্যানের চাকরি নেই। পৌর কর্মকর্তাদের আপিসে সুইচে চাপ দিলে শহরের সারা রাস্তার আলো জ্বলে উঠে।
খুব খারাপ ব্যাপারটা।
আরেকটা পেশার কথা শুনেছি। সেটা হল ভিস্তিওয়ালা।
ভিস্তি একটা আরবি শব্দ। যার মানে হচ্ছে চামড়ার থলে। আর ভিস্তিওয়ালা হচ্ছে একজন মানুষ যে ছাগলের চামড়ার থলের ভেতরে জল ভর্তি করে শহরের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেয়। সামান্য মজুরির বিনিময়ে। তখন তো আর কল খুললেই খ্যাক খ্যাক করে জল পড়তো না।বহু দূর দূর থেকে জল আনতে হত।আগে আমাদের পুরানো ঢাকায় ও ভিস্তিওয়ালা ছিল।তোমরা যারা বাদশাহ হুমায়ূনের নাম জানো তারা এমন এক ভিস্তিওয়ালার কাহিনি নিশ্চয় শুনেছ ?
একবার বাদশাহ হুমায়ূন শত্রুপক্ষের তাড়া খেয়ে পালাচ্ছিলেন। পালাতে গিয়ে নদীতে পড়ে গিয়েছিলেন। প্রায় যখন মারা যাবেন তখন এক ভিস্তিওয়ালা তার প্রাণ বাঁচিয়েছিলে।বাদশাহ ভিস্তিওয়ালাকে কথা দিয়েছিলেন তিনি যদি সিংহাসনে আবার বসতে পারেন তবে ভিস্তিওয়ালা যেন তার সাথে দেখা করে।
সত্যি হুমায়ূন লড়াই শেষে সিংহাসনে বসেন।আর ওমা, ভিস্তিওয়ালাও এক দিন গিয়ে হাজির হয় রাজপ্রসাদে।বাদশাহ হুমায়ূন তখন দরবারে বসে ছিলেন। প্রহরী গিয়ে বলল- স্যার এক জন লোক মানে ভিস্তিওয়ালা আপনার সাথে দেখাঁ করতে চায়।
প্রহরী অবশ্য স্যার বলেনি। বলেছিল জাঁহাপনা।
ভিস্তিওয়ালাকে দেখে বাদশাহ হুমায়ূনের আগের সব কথা মনে পড়ে গেল। তখন সেই ভিস্তিওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলেন- বলুন আপনি কি পুরস্কার চান ?
ভিস্তিওয়ালা বললেন মাত্র একদিনের জন্য আমি সিংহাসনে বসে বাদশাহ হতে চাই।
সবার পিলে চমকে গেল।
হায় হায়। ব্যাটা ভিস্তিওয়ালা কি বলে এই সব! অ্যাঁ ?
সবাইকে অবাক করে দিয়ে হুমায়ূন ভিস্তিওয়ালাকে সিংহাসনে বসিয়ে ঘোষণা করলেন- আজ থেকে এই হচ্ছে নতুন বাদশাহ।
নিজেই সেই ভিস্তিওয়ালার মাথায় মুকুট পড়িয়ে দিলেন।সকাল থেকে সন্ধ্যা পযন্ত সিংহাসনে বসে রাজ্য পরিচালনা করলো সেই ভিস্তিওয়ালা।এমন কি কয়েকটা বিচারও করেছিল।
আর এই মারাত্নক ঘটনা স্মরণ করে রাখার জন্য নতুন মুদ্রা চালু করা হল সেই মুহূর্তেই।মুদ্রা কিন্তু সোনা বা রুপা দিয়ে বানানো হয়নি।ভিস্তিওয়ালার সেই ছাগলের চামড়ার থলি কেটে গোল গোল করে ছাপ দিয়ে বানানো হয়েছিল অদ্ভুত মুদ্রা।একদিনের আজব বাদশাহের জন্য আজব মুদ্রা।
বেশির ভাগ রাজা বাদশাহদের আচরণ অমন পাগলাটে। অবাক হবার কিছু নেই।বড় হয়ে যখন ইতিহাসের বই পড়বে তখন অবাক হয়ে যাবে।ইতিহাস জিনিসটাই মজার।
তো বলছিলাম ভিস্তিওয়ালার কথা।
আগে পুরানো ঢাকায় ভিস্তিওয়ালা ছিল।পুরানও ঢাকার দারুন বর্ণনা নিয়ে একটা বই আছে। নাম ,টপোগ্রাফি অব ঢাকা।বইটার লেখক জেমস টেলর।উনি ইষ্ট ইনডিয়া কোম্পানিতে চাকরি করতেন।১৯৩৪ সালে লিখেন বইটা।
ওহ আরেকটা পেশা আমার দারুন পছন্দের।সেটা হল পেপার বয় (paperboy ) । শুনতে যাই হোক, খুব সহজ একটা কাজ।সাধারণত আমার মত পিচ্চি বাচ্চা কাচ্চারাই করে এই কাজ।রোজ পত্রিকা অফিস থেকে খবরের কাগজ বের হয়। আর এই পিচ্চিরা মহল্লার বাড়ি ঘুরে ঘুরে গ্রাহকদের কাছে খবরের কাগজ পৌঁছে দেয়।
পেশাটা আমার পছন্দ, কারন লাগাতার টই টই করার সুযোগ আছে।আর কে না জানে ভ্রমণকারি ব্যক্তিরাই সেরা ব্যক্তি।আর এই পেপারবয় পেশাটা বেশ পুরানো। প্রথম লন্ডনে শুরু হয়েছিল।সেটা তোমার ১৮৩৩ সালের কথা।পরে সারা দুনিয়ায় এই পেপারবয়ের কাজ ছড়িয়ে পরে। আমেরিকা, ক্যানাডা, অস্ট্রেলিয়া,জাপান সব বড় বড় দেশেই পিচ্চি বাচ্চারা এই পেশায় জড়িয়ে পরে।
বেশির ভাগ সময় ওরা সাইকেল চালিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খবরের কাগজ দিয়ে আসতো।
আহা কি রোমাঞ্চকর কাজ।
পিচ্চি পেপারবয়রা ক্রিসমাসের সময় গ্রাহকদের বাড়ি বাড়ি থেকে দুই চার পেনি বকশিস পেত। বা একটা লাল পাকা আপেল বা চকলেট।প্রায় ডাকপিয়ন বা গোয়ালার মতই পেশাটা।
১৯৫২ সালে আমেরিকা এই পেপারবয়দের স্মরণে একটা ডাকটিকিট বের করেছিল।
দুই
তো চাইলেই তো আর পেপার বয় হওয়া যায় না।
কারন মা বলে আমাদের পরিবারে কেউ কখনও পেপার বয় ছিল না।
এটা কোন যুক্তি হল ?
সব পেশাই কেউ না কেউ তো প্রথম শুরু করে !
যেমন ধর কামার। এক সময় তো মানুষ গুহায় থাকতো। পাথরের হাতিয়ার ব্যবহার করতো তখন তো কামার ছিল না। মানুষ যখন লোহার ব্যবহার শুরু করলো তখনই কামার পেশাটা শুরু হয়।
আইসক্রিম বিক্রেতা হলেও ভাল হয়।
গরমের দুপুরে গোঁফওয়ালা এক লোক আসে। সে অবশ্য আইসক্রিম বিক্রি করে না। কুলফি মালাই বিক্রি করে। ঠেলা গাড়িতে করে মাটির কালো একটা জালা নিয়ে আসে। জালা ভর্তি বরফের টুকরো। সেখানে ডুব সাঁতার দিচ্ছে টিনের বড় বড় ত্রিভুজাকৃতি চোঙ।
একটা কুলফি মালাইয়ের দাম চার আনা। মানে পঁচিশ পয়সা। মানে এক টাকার চার ভাগের এক ভাগ। অনেকে সিকি বলতো। রুই মাছের আঁশের মত চকচকে একটা মুদ্রা।তো, সেই চার আনা দিলেই লোকটা টিনের একটা চুঙ্গি তুলে নিত হিম শীতল বরফ ভর্তি জালা থেকে । সরু একটা কাঠি চুঙ্গির ভেতরে গেঁথে টান দিলেই ত্রিভুজাকৃতি মিষ্টি দুধেল বরফের টুকরো চলে আসতো। ওটাই কুলফি মালাই।
কাঠের পেটিতে করে ও অনেকে আইসক্রিম বেচত। দুটো কোম্পানি বেশ চলত আমার শহরে। জনি আর রনি। কে জানে ওরা কারা। দুই ভাই নাকি ? ওদের পেটির রঙ হত কমলা।
গরমের দুপুরে ওদের হাঁক শোনা যেত গলির মোড়ে। এই আইস......স্কিম্মম্মম্মম্ম...।।
মনটা উসকো খুসকো হয়ে যেত আমার। গরমের দুপুরে আইসক্রিম খাওয়া দোষের নাকি ? দোষের যদি হবে তবে সেই পুরান দিনের রোমান সম্রাটরা আইসক্রিম পছন্দ করতো কেন ?
তাদের আইসক্রিম খেতে ইচ্ছা করলে রানারদের পাঠানো হত দূরের পাহাড়গুলোতে।
রানার মানে যারা খুব দ্রুত দৌড়ে যেতে আর আসতে পারে এমন কিছু দৌড়বাজ লোক।
সেই রানাররা দৌড়ে গিয়ে পাহাড়ের উপর থেকে নরম বরফের কুঁচি মানে তুষার নিয়ে আসতো চামড়ার ব্যাগে ভর্তি করে। আনার পর সেই নরম মিহি তুষারের কুঁচিতে হরেক রকম ফলের রস মিশিয়ে সম্রাটের সামনে পরিবেশন করা হত। সম্রাট সাহেব তোফা কবুল করতেন। মানে মজা করে সেই আইসক্রিম খেতেন। কত হ্যাপা। আমি তো রোজ দুপুরে মোড়ের সামনেই পাই। খাব না
কেন ? অ্যাঁ ?
মার্কো পোলো সারা দুনিয়া ঘুরেছেন। উনার ভ্রমণ কাহিনিতে লিখেছেন চিনে গিয়ে তিনি আইসক্রিম দেখেছিলেন। আমেরিকানরা নাকি সবচেয়ে বেশি আইসক্রিম খায়। এক এক জন বছরে প্রায় ১৯ লিটার করে । সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ভ্যানিলা ফ্লেভার আইসক্রিম। প্রায় ৩৩%। তারপর হচ্ছে চকলেট। আজকাল হরেক ফ্লেভারের আইসক্রিম বাজারে বের হয়েছে। এমন কি মরিচের ফ্লেভার আর বিয়ারের ফ্লেভার ও নাকি পাওয়া যায়।
কি কাণ্ড!
সারা পৃথিবীতে নাকি জুন মাসে সবচেয়ে বেশি আইসক্রিম বানানো হয়। ৮৭% আমেরিকানদের ফ্রিজে সব সময় আইসক্রিম থাকে।
আহা!
অবশ্য আমেরিকাতেই সব চেয়ে বেশি আইসক্রিম বানায়। জরিপে দেখা গেছে ছুটির দিনে আইসক্রিম বেশি বিক্রি হয়। বাইরের দেশে রবিবারে, আমাদের দেশে শুক্র বারে হবার কথা। কিন্তু ঠিক জানি না। চাঁদে যাবার সময় এপোলো -৭ এর নভোচারীরা সাথে করে আইসক্রিম নিয়ে গিয়েছিল। ইসস।
শীতের দিনে আইসক্রিম খেতে চাইলে মা হয়তো রাগ করবে।
কিন্তু কানাডাতে শীত কালে গরমের দিনের চেয়ে বেশি আইসক্রিম বিক্রি হয়।
আইসক্রিম বিক্রি পেশা হিসাবে খারাপ না। কাজেই ধরে নেয়া যায় বড় হলে আমি আইসক্রিম বিক্রি করব।
বেশ ঝামেলা বিহীন পেশা। গরমের দুপুরে আইসক্রিমের ভ্যান নিয়ে মহল্লার মোড়ে গিয়ে দাঁড়ালেই চলবে। ভ্যানের সাথে একটা পেতলের ঘণ্টা বাঁধা থাকবে। ভ্যানটা নড়লেই টুং টাং করে শব্দ হবে। ঘণ্টার শব্দ শুনে পিচ্চি খদ্দের সবাই দৌড়ে আসবে।আর আমি সবাইকে হাসি মুখে আইসক্রিম দিয়ে যাব।
বাঙলার মাঠে বিকেলে খেলতে যেতাম।
আমার সাথে পিচ্চি কয়েকজন খেলত। ওদের দুই জনের নাম ছিল ফটিক। একই নামের দুই জন। একজন অবশ্য হিন্দু। আরেক জন মুসলমান।যাতে গোলমাল না হয় সেই জন্য হিন্দু ফটিক কে বলতাম ফটিক জল আর মুসলমান ফটিককে বলতাম ফটিক পানি । সমস্যার শেষ।
ফটিক পানি বলতো ও বড় হয়ে দর্জি হবে।
দর্জিদের নাকি অনেক টাকা। সবাই সম্মান করে খলিফা বলে। অনেকে আবার মাস্টার ও বলে। আর ফটিক জল নাকি বড় হয়ে নাপিত হবে। নাপিতদের নাকি অনেক টাকা। কারন মানুষদের চুল দাঁড়ি বড় হবেই। আর বাধ্য হয়ে নাপিতের কাছেই আসবে।
এত পিচ্চি বয়সে টাকার প্রতি ওদের লোভ দেখে আমি যার পর নাই ভীষণ রকম বিরক্ত।
বাড়ির সামনে যেখান পুরানো একটা মন্দির আছে ওখানেই একটা নাপিতের দোকান।সামনে পিছনে এক গাদা আয়না দেয়া। ভেতরে যেই ঢুকে অবাক হয়ে নিজেকে অনেক গুলো দেখতে পায়। গোল এক ধরনের চেয়ার আছে। বসে নিজেকে ইচ্ছা মত ঘোরানো যায়।সাদা চাদর দিয়ে খদ্দেরকে মুড়িয়ে রেখে যত্ন করে চুল কেটে দেয় নাপিত।
দেয়ালে একটা ফ্রেমে বাঁধাই করা ছবি । বিভিন্ন রকমের চুলের ছাঁট দেয়া মানুষের মাথার ছবি ওখানে।
দেয়ালের এক কোনায় দেখি চামড়ার একটা বেল্ট ঝোলান। নাপির মশাই তার ক্ষুরটা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ওখানে ঘষে। ওতে নাকি ক্ষুরটা ভীষণ রকম ধার হয়ে যায়।
বড় একটা মিশ্রীর টুকরো দেখি। সাদা ফকফকে। দাঁড়ি কামানর পর ওটা গালে অনেক সময় নিয়ে ঘষতে হয়। অনেক পরে জেনেছি ওটা আসলে মিশ্রী না। ফিটকিরি।
এক গাদা বেঁটে কাঁচের শিশি আছে। চার কোনা শিশি। ভেতরে কমলা রঙের মিষ্টি ঘ্রানওয়ালা তরল। দাঁড়ি গোঁফ কামানোর পর সেই শিশি থেকে মিষ্টি তরল নিয়ে মুখে মেখে দেয় নাপিত। দুই এক জন তখন চিৎকার করে উঠে।ওটা নাকি আফটার সেভ লোশন।
বড় হলে আমিও দাঁড়ি গোঁফ কামিয়ে ফিটকিরি ঘষবো বা কমলা রঙের আফটার সেভ লোশন মেখে চিৎকার করে উঠব।
নাপিতের দোকানের পাশে দর্জির দোকান। মানিক দর্জি। খলিফা মানিক বলতো কেউ কেউ। মাস্টার মানিক ও বলতো অনেকে ।
আহা কত নাম। সারাক্ষণ একটা ক্যাসেট প্লেয়ার বাজে দর্জির দোকানে । আজগুবি ধরনের গান।যেমন- লেকে পেহেলা পেহেলা পেয়ার ।ভড়কে আঁখ মে খোমার। জাদু নগরে সে আয়া হ্যাঁয় কৌই জাদুগর।
মানিক দর্জি হাতে কাঁচি আর ফিতা নিয়ে যত্ন করে কাপড় কাটে। সব সময় তার কাপড় দুই গীরা এক বিঘৎ ছোট বা বড় হয়।মুখে পান। পাশে এক সাগরেদ খ্যাঁট খ্যাঁট করে সেলাই মেশিন চালায়। দোকানের বাইরে রঙ বেরঙের কাপড়ের টুকরো পড়ে থাকে।এক গাদা গরিব বাচ্চা ওগুলো কুড়িয়ে নিয়ে যায়। পুতুলের বিয়ের কাপড় চোপড় বানাবে ওরা। নতুন কাপড় ছাড়া পুতুলের বিয়ে হয় কি করে ?
কানু নাপিত আর মানিক দর্জি দুইজনেই পান খেত ডাইনোসরের মত। আর সারাক্ষণ কথা বলতো । কি বলতো কিছু বুঝতাম না। কারন পানে মুখ ভর্তি। মানিক দর্জিকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনার ছেলেটা কত বড় ? উনি বলেছিলেন- বড়
ছেলেটা তোমার চেয়ে এক বিঘৎ দুই গীরা বড়।
হায়রে মানুষ !
যাই হউক নাপিত পেশাটা পৃথিবীর পুরানো পেশা।৬০০০ বছর পুরানো একটা ছবি পাওয়া গেছে পিরামিডের ভেতরে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে একজন নাপিত ক্ষুর দিয়ে খদ্দেরের দাঁড়ি গোঁফ কেটে দিচ্ছে।নাপিতকে ইংরেজিতে বলে বারবার। ল্যাতিন শব্দ বারবার মানে রুটি। সেই আদিকালে রুটি ছিল জ্ঞান, শক্তি, এবং সাহসের চিহ্ন।
সবচেয়ে পুরানো নাপিতদের ক্ষুর সেটাও পাওয়া গেছে মিসরে। যীশুর জন্মের ৩৫০০ বছর আগের।
পুরানো দিনে নাপিতেরা ডাক্তার হিসাবে কাজ করতো। মানে শরীরে ফোঁড়া হলে কেটে দিত আবার দাঁত ও তুলে দিত।অবশ্যই ভাল দাঁত না। নষ্ট দাঁত। বাইবেলে পযন্ত নাপিত পেশাটার কথা আছে।
যীশুর জন্মের ২৯৬ বছর আগে ইটালির সিসিলি দ্বীপে সাধারন লোকদের কাছ নাপিতদের দোকান আড্ডা আর গুল তাপ্পি মারার জন্য একটা জনপ্রিয় জায়গা হয়ে যায়। লোকজন কাজ শেষেই নাপিতের দোকানে চলে আসতো। সারা শহরের খবর নাপিতের দোকানেই পেত। ওই আরকি- শুনেছিস, অমুক নাকি তমুক করেছে। হেন তেন।
সেই সময় নাপিতদের বেশ একটা ভাব ছিল সমাজে।
দর্জি যে ফেলনা ছিল তা নয়।দর্জিদের ইংরেজিতে বলে টেইলর।দোকানে লেখা থাকে মানিক টেইলর বা হারুন টেইলরস ।বেশির ভাগ ইংরেজি শব্দের মত এটাও ল্যাটিন শব্দ থেকে এসেছে যার মানে হচ্ছে কাঁটা বা টুকরো করা। ১২৯৭ সালে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে প্রথম টেইলর শব্দটা যোগ করা হয়েছিল।
সারা দুনিয়ায় দর্জি পাওয়া যাবে। কিন্তু ইংল্যান্ডের দর্জিরা খুব বিখ্যাত।এমন কি রাতের বেলা দাওয়াত খেতে যাবার সময় যে বিখ্যাত জ্যাকেট টক্সিডো ব্যবহার করে লোকজন বা মুভিস্টাররা সেটাও ইংল্যান্ডের দর্জিদের আবিষ্কার ।এক এক জন দর্জির কাছে পিচ্চি নতুন দর্জি কমপক্ষে ৭ বছর কাজ শিখে ।গলা কাঁটা হাত কাঁটা পা কাঁটা মানে জামা প্যান্টের আর কি, শেখা শেষ হলে পিচ্চিও একজন দর্জি হয়ে যায়।
আরব্য রজনীর গল্পে প্রায়ই গল্পের নায়ক দর্জি থাকে ।
আবার আমাদের দেশের রূপকথা গল্পের নায়ক প্রায়ই নাপিত থাকে। যেমন নাপিত আর সাত ভূত।
কাজেই আমরা বুঝতে পারলাম কোন পেশাই ছোট না।
কবি তো বলেই গেছেন , সবই উপরওয়ালার মর্জি, কেউ হয় নাপিত আর কেউ হয় দর্জি।
অহ একটা ভাল কথা মনে পড়েছে, আমরা যে টুনটুনি পাখী চিনি ইংরেজিতে ওটাকে টেইলর বার্ড বলে। মানে কিনা দর্জি পাখী।কারন আর কিছুই না টুনটুনি পাখী গাছের বড় পাতা ঠোঁট দিয়ে সেলাই করে দারুন বাসা বানাতে পারে। দেখলে অবাক হয়ে যাবে।
আমি তখনও ঠিক করিনি বড় হয়ে কি হব ।
ভাবছি।
ঠিক তখনই আমাদের সবুজ মোটা টিনের তোরঙ্গের ভেতরে দারুন রকমের একটা বই পেয়ে গেলাম। বইটার নাম হচ্ছে রবিনসন ক্রুসো। লেখক- ড্যানিয়েল ডিফো নামের এক ভদ্রলোক।
বইয়ের প্রচ্ছদটা দারুন। ইয়া বড় বড় পাকা দাঁড়িওয়ালা এক বুড়ো । একটা দ্বীপের ছবি। টালমাতাল সমুদ্র। আর একটা পাল তোলা জাহাজ।
মেঘলা এক দিনে জানালার পাশে বসে বইটা পড়া শুরু করলাম।
রবিনসন ক্রুসো বইটা ছাপা হয়েছিল ১৭১৯ সালের ২৫ এপ্রিল। মানে ২৯৭ বছর আগের। তারমানে এই বইটা ক্লাসিক। ক্লাসিক বই মানে লেখক মারা যাবার অনেকগুলো বছর পরও যে বই লোকজন পড়ে বা পড়তে পছন্দ করে।
তার মানে ক্লাসিক বই বা লেখক অনেক বড় ব্যাপার।
আজকাল তেজপাতার মত প্রচুর বই বের হয়- যেমন, 'পাঁচ কেজি ভালবাসা শুধু তোমার জন্য' বা এমন বিদঘুটে সব নামের। এই সব বই ক্লাসিক বই হবার সম্ভবনা খুবই কম। বড় জোড় কয়েক বছর চলে। পরে পাঠক আর পড়তে চায় না।আর একটা কথা , ক্লাসিক বইটই না পড়লে ভাল পাঠক হওয়া যায় না।
রবিনসন বইটা যে কতবার ছাপা হয়েছে আর কত ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে বলা মুশকিল।
এটা হচ্ছে প্রথম ইংরেজি উপন্যাস যেখানে কাহিনির নায়ক জাহাজ ডুবির পর সাঁতার কেটে নির্জন একটা দ্বীপে গিয়ে উঠে । এবং নিজের মেধা দিয়ে টিকে যায়।পরে কিন্তু অমন কাহিনি আরও লেখা হয়েছিল। যেমন সুইস ফ্যামিলি রবিনসন।
রবিনসন বইটায় কাহিনি মোটামুটি অমন রবিন বাবু একজন তরুণ। এবং সে নাবিক হতে চায়। সমুদ্র ভ্রমণ করতে চায়। নানান বন্দরে যেতে চায়। কিন্তু রবিনের বাবা চায় না।
ফলে একদিন রবিন বাসা ছেড়ে পালায়। মাত্র ১৯ বছর বয়সে রবিন প্রথম সমুদ্র যাত্রায় অংশ নেয়।ভাগ্য খারাপ জাহাজ ডুবে যায়। সবাই বেঁচে যায়। রবিন ব্রাজিলে গিয়ে ব্যবসা শুরু করে। অনেক টাকা বানায়। কিন্তু মাথার ভেতরে আবার সমুদ্রের পোকা কিলবিল করতে থাকে।আবার সমুদ্র যাত্রায় অংশ নেয়।
কিন্তু এই বার খুব খারাপ দশা হয়।
জাহাজ ডুবে যায়। বেচারা মাত্র একা বেঁচে থাকে আর একদম নিঝুম এক দ্বীপে গিয়ে উঠে।টানা ২৬ বছর সে একা কাঁটায় সেই দ্বীপে। যা যা দরকার নিজেই বানায়। ফসল ফলায়। রুটি বানায় নিজের ফলানো যব দিয়ে । কাঠের জিনিস আর মাটির তৈরি হাড়ি পাতিল সহ নিজেই বানিয়ে নেয়।
একটা গুহার ভেতরে আশ্রয় নেয় রবিন। প্রথমেই সে একটা মজবুত বেড়া বানিয়ে নেয় যাতে বন্য পশু তাকে আক্রমণ করতে না পারে।
একটা বড় কাঠের তক্তার মধ্যে চাকু দিয়ে দাগ দিয়ে দিন তারিখের হিসাব রাখে সে।যাতে ক্যালেন্ডারের কাজ হয়।
বর্ষার মৌসুমে রবিন আবিষ্কার করে নরম কচি সবুজ কিসের চারা হয়েছে গুহার বাইরে। ওটা আসলে যবের চারা। প্রথমে অবাক হলেও পরে বুঝতে পারে জাহাজ থেকে কাপড়ের একটা ব্যাগ এনেছিল ওটার মধ্যে কিছু মুরগীর জন্য রাখা খুদ কুড়া ছিল। ওখানেই ব্যাগ ঝেড়ে ফেলেছিল।যবের চাষ করে রবিন। ভেড়া পালে।ভেড়ার চামড়া দিয়ে নিজের জন্য জামা কাপড় বানায়।
ভেড়ার চর্বি দিয়ে প্রদীপ জ্বালায়। যাতে অন্ধকারে থাকতে না হয়। দ্বীপে অনেক আঙুর হয়। সেগুলো শুকিয়ে কিসমিস বানায়।
মোট কথা দারুন জীবন।
এত মজার বই আগে পড়িনি আমি।
বারবার মনে হচ্ছিল সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে আমিও চলে যাই অমন নিঝুম একটা দ্বীপে। বাকি জীবন একা কাঁটাই। একটা তোতা পাখী আর একটা কুকুর থাকবে।আমিও ভেড়ার মাংস আগুনে ঝলসে খাব। আঙুর শুকিয়ে কিসমিস খাব।এই বই পড়ার পর আজও কিসমিস খাওয়ার সময় রবিনসন ক্রুশোর কথা মনে হয় ।
নিজের জন্য একটা দ্বীপ । আর কি চাই ?
পাঠক সমাজ বহু বছর পযন্ত এই কাহিনি সত্য ভেবেছিল।
কিন্তু আসলে সত্য না। তবে সবাই বলে অ্যালেকজান্ডার সেল ক্লাক নামে একজন নাবিক নাকি ১৭০৪ সাল থেকে ১৭০৯ পযন্ত জুন ফারন্দাজ নামে নির্জন একটা দ্বীপে একা কাটিয়েছিল। আর সেই ঘটনা শুনেই ড্যানিয়েল ডিফো সাহেব এই বিখ্যাত বইটা লিখেন।
একটা মজার কথা অনেকে বলে, বইটার লেখক ড্যানিয়েল ডিফো নাকি প্রথম জীবনে গুপ্তচর ছিলেন।হলে হতে ও পারে।
আর রবিনসন ক্রুসো বইটা হিট হবার পর রবিনকে নিয়ে আরেকটা বই লিখেন তিনি। মানে পরের পর্ব। বইটার নাম- দ্যা ফারদার অ্যাডভেঞ্চার অব রবিনসন ক্রুসো।
কিন্তু দুঃখের বিষয় পরের বইটা পাঠক তত বেশি পছন্দ করে না।সুপার ফ্লপ না কি যেন বলে না ? সেটাই।
আর নাবিক অ্যালেকজান্ডার সেলক্লাক যে দ্বীপে কাটিয়েছিল সেই দ্বীপটাকে সবাই আজকাল রবিনসন ক্রুসোর দ্বীপ বলে ।প্রচুর টুরিস্ট দ্বীপটাকে দেখার জন্য যায় আজকাল।সময় আর সুযোগ হলে আমি ও যাব সেটা বলার কোন দরকার আছে বলে মনে করি না।
সব কথার শেষ কথা হল , রবিনসন ক্রুসো বইটা পড়ার পর আমার মনটা কেমন যেন উসকো খসকো হয়ে গেল। সারাক্ষণ নিজেকে নির্জন দ্বীপে কল্পনা করি।যেখানে সৈকতের বালিগুলো লাল চিনির মত, (রেশন শপে যে চিনি পাওয়া যায় )দূরে একটা পাহাড়। নানান অচেনা গাছ। বাতাসে সমুদ্রের ঘ্রান।
বাড়ি থেকে পালিয়ে জাহাজে চাকরি নেয়ার চিন্তা দিন দিন ঘন হচ্ছে। এক বার ক্লাসে পড়া শিখে না যাওয়ায় স্যার বললেন, বড় হয়ে তুই জাহাজের খালাসি হবি।
আহা, মনটা ভরে গেল আমার। তাহলে আমাকে দেখতে সত্যি সত্যি জাহাজের খালাসিদের মত মনে হয় ?
অনেক বার ভাবলাম , নিজের নাম পাল্টে রবিন রাখব। সাহসে কুলাল ন।
ইশকুলে রবিন নামে কেউ নেই।
রাম বাবুর পুকুরে সাঁতার কাঁটা শেখা শুরু করলাম। জাহাজ ডুবির পর যাতে সাঁতার কেটে বাঁচতে পারি । সয়াবিন তেলের খালি একটা গ্যালন বুকে চেপে অনেক দূর যেতে পারি। বাড়িতে ঘ্যান ঘ্যান শুরু করলাম- বাবা যাতে একটা টিউব কিনে দেয়। দেয়া হল।
অদ্ভুত হলেও সত্যি সাঁতার শিখতে গিয়ে রবিন নামে এক ছেলের সাথে পরিচয় হল। নিশ্চয় ও রবিনসন ক্রুশোর ফ্যান মানে ভক্ত।কথা বলে জানলাম- নাহ, আসলে ছোট বেলায় ওর নাকি ঘন ঘন জ্বর হত।তখন অতিরিক্ত রবিনসন বার্লি খাওয়ানো হত ওকে। ওর জ্যাঠা মশায় ওর নাম রবিন রেখেছিল।রবিনসন বার্লিটা চিনি। ছোট লাল কৌটায় করে বিক্রি হয়।
কি কাণ্ড।
ব্যাপারটা খারাপ।
মানে তোমাদের হয়তো নিজেদেরই ধারনা আছে। কোন একটা কাজ তোমরা করতে চাও কিন্তু পারছ না। কেমনটা লাগে তখন ?
জাহাজ ঘাঁটে খোঁজ নিয়ে দেখেছি। কোন জাহাজ ই ব্রাজিল বা কেপ টাউনে যাবে না। বড় জোড় কয়েকটা লঞ্চ মুন্সিগঞ্জ যাবে। সদরঘাট। গোয়ালন্দ ঘাট । বা চাঁদপুর।
তারপরও তক্কে তক্কে রইলাম। সময় আর সুযোগ মত বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে জাহাজে উঠতে হবে।
তবে কিছুটা চর্চা করলাম।যেমন বাড়ির সামনে এক চিলতে ফাঁকা জায়গায় মরিচ আর ধনিয়া বুনে ফেললাম। এক দম সহজ। রান্না ঘর থেকে শুকনো মরিচ ভেঙ্গে দানা ছড়িয়ে দিলেই কাজ শেষ। আর একই ভাবে মুঠো খানিক ধনিয়া ছড়াতেই কাজ হয়ে গেল।
কিছু দিনের মধ্যে সবুজ মিহি চারা গজালো।বিছানার চাদর দিয়ে তাবু খাটানোর অভ্যাস করলাম। আর বাজার করা হলেই ওখান থেকে কয়েক টুকরো খাসির মাংস গায়েব করতাম। ভাল করে লবণ, মরিচ আর হলুদ মেখে একটা শিকে গেঁথে গ্যাসের চুলার উপর রেখে পুড়িয়ে খেতাম।ভাল একটা শিক ছিল না। তাই রিক্সার স্পোকে গেঁথে কাজ চালাতাম।
এক সময় মনে হল এবার আমি তৈরি ।
একদম।
রবিনসন ক্রুসো হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
আর এর মধ্যেই ঘটনাটা ঘটে গেল।
তিন - শেষ পর্ব
শ্রাবণ মাসের এক দুপুরে মা বলল, বাবা তুই বাসায় একা থাকতে পারবি ? আমি তর বকুল মাসিকে দেখে আসি। ওর শরীর খারাপ।
বকুল মাসি মায়ের দূরের বোন। মা চলে গেল পিচ্চি ভাই বোনকে নিয়ে।
যাক একা থেকে রবিনসন ক্রুসো হবার ক্লাস নেয়া যাবে।
জানালার পাশে গিয়ে বসলাম। হাতে বই। মন তখন দূরের এক দ্বীপে।কল্পনায় দেখছি এক গাদা জংলি ক্যানো করে আসছে তীরের দিকে। ওদের হাতে তীর ধনুক। তীরের ফলা পাথর ঘষে বানানো। ওতে আবার বিষ মাখানো।
আমিও গাদা বন্দুক নিয়ে তৈরি রইলাম।
এক ফাঁকে রান্না ঘরে গিয়ে পাউরুটি আর কমলার জেলি নিয়ে আসলাম। এক টুকরো পাউরুটিতে যত খুশি জেলি মাখাও। বাঁধা দেয়ার কেউ নেই।পুরো বয়াম খালি করে পরে মাকে বললেই চলবে -আমি ওটা মোটেও ধরিনি।
বিড়ালের উপর দোষ দিলেও বেশ বিশ্বাসযোগ্য হবে। তবে ঠিক জানি না বিড়াল জেলি খায় কিনা।
বিকেল বেলা হঠাৎ করেই পাকা ভুট্টার দানার রঙের রোদটা হারিয়ে গেল।
আকাশের এক কোনে মেঘের দলা জমে ছিল। ওরা আরও অনেক মেঘের দলা ডেকে নিয়ে আকাশ ভর্তি করে ফেলল।আকাশের রঙ হয়ে গেল ইস্কুলের ব্ল্যাক বোর্ডের মত। দমকা হাওয়া বইতে লাগল।
তারপরই নেমে গেল ঝুম বৃষ্টি।
সেই সাথে শয়তানের নিঃশ্বাসের মত বাতাস।
বাড়ির সব জানালা দরজা বন্ধ করে একা বসে রইলাম। সন্ধ্যা নেমে গেল কিছু বুঝে উঠার আগেই।
পিলে চমকে দিয়ে বিকট শব্দে ট্রান্সমিটার নষ্ট হল দূরে। কালি গোলা অন্ধকারে ডুবে গেলাম।
রান্না ঘর আঁতিপাঁতি করে খুজেও মোমবাতি পেলাম না।
হ্যারিকেন পেলাম। বাদুর মার্কা চিমনি বেলজিয়ামের কাঁচের মত ঝকঝক করছে।
হারিকেন কি ভাবে জ্বালাতে হয় জানা দরকার ছিল। অনেক চেষ্টার পর বুঝতে পারলাম সলতে ফেলে দিয়েছি। আমার শরীর ভর্তি কেরসিনের ঘ্রান।কেরোসিন দিয়ে গঙ্গা স্নান করে ফেলেছি ।
দেশলাই পযন্ত ভিজে জবজবে । আধ খোলা দেশলাই দাঁত বের করে হাসছে আমার অবস্থা দেখে ।
বাতাসের বেগ আরও বেড়ে গেছে। কর কড়াত শব্দ করে বাজ পড়লো। রূপার কাঁটা চমচের মত বিদ্যুতের ঝলসানি দেখলাম আকাশে।
পুরা মহল্লা একদম শুনসান। প্রতিবেশীরা সবাই মারা গেছে কি না কে জানে।
কোন সারা শব্দ নেই।
বারান্দায় ঘুগলিতে কান্নার মত করুন একটা সুর ভেসে এলো। বিলাপ করে কাঁদছে যেন কেউ। আসলে দমকা বাতাস সরু হয়ে ওখান দিয়ে ঢুকছিল তাই অমন শব্দ । কিন্তু সে সময় কে বলবে আমাকে সেই সব ?
হানাদারের মত বাতাস এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে দরজা আর জানালায়। খট মট করে অদ্ভুত রকম শব্দ হচ্ছে কব্জাগুলোতে । গত
সপ্তাহে ফাঁসি দিয়ে মরা দফাদার সাহেবের কথা মনে হয়ে গেল। মনে হচ্ছে লোকটা যেন আমাদের রান্না ঘরে বসে চা বানাচ্ছে।
শেষ পযন্ত টিকতে না পেরে ঘর থেকে বের হয়ে এলাম।
রাস্তা ভর্তি জল। জপজপ করছে। মহল্লার মোড়ের বাড়ির রকে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওখান থেকে সামনের রাস্তাটা ভাল দেখা যায়। পাশে এক গাদা চালতা গাছ বিব্রত ভঙ্গিতে ভিজছে। প্রতিবাদ করার ভঙ্গিতে ওরা মাথা নাড়ছে ডানে বামে। রাম বাবুর পুকুরটা বৃষ্টির জলে ফুলে ফেপে দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
কত ক্ষণ হবে জানি না বৃষ্টির বেগ কমে গেল। স্যামন মাছের ডিমের মত দানা দানা বৃষ্টি ঝরতে লাগল অলস ভাবে। তক্ষুনি রিক্সাটা দেখলাম।
নীল রঙের পলিথিনে মুড়ে বিদেশী খেলনার মত মা আর ভাই বোন আসছে।
দৌড়ে গেলাম।
পরের ঘটনা সামান্য।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই মা হারিকেন জ্বেলে ঘর দোর পরিষ্কার করে ফেলল।
তুমুল বৃষ্টি হওয়াতে বকুল মাসির বাসায় আটকা পড়েছিল মা। রিক্সা ও পাওয়া যায়নি।
আরও খানিক পর চা আর নিমকি ভাঁজা নিয়ে জানালার পাশে গিয়ে বসলাম।
কারেন্ট এসে গেছে ততক্ষণে।
প্রতিবেশীদের বাড়ি র জানালা গুলোতে হলুদ কমলা রঙের মায়াবী আলো জ্বলছে ।
বৃষ্টি থেমে গেছে।
মনে মনে ভাবলাম- বাকিটা জীবন সবাইকে নিয়ে সারডিন মাছে মত ঝাঁক বেঁধে থাকব।
দূরে কোথাও যাব না। কখনই না।
রবিনসন ক্রুসো বইটা লুকিয়ে রাখলাম আলমারির পিছনে।
রবিনসন ক্রুসো হতে চাই না।
(শেষ)

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন