১
বৃষ্টিটা আমার দেশেই রূপসী হয়।
কালো মেঘ জমা থেকে শুরু। বাউলা হাওয়া। তারপর কেপিয়ারের কুঁড়ির মত বৃষ্টি। ভেজা হাওয়া। হিম হিম ।
অমন কবিতার মত বৃষ্টি হয় না আর কোথাও। দূরের কোন গ্রহে নাকি হীরার বৃষ্টি হয়। কিন্তু আমি জানি , সেটা বাংলাদেশের বৃষ্টির মত সুন্দর না।
পরের বৃষ্টি পেলাম মারিয়ানা আইল্যান্ডে ।
ইস কী সুন্দর বৃষ্টি। বর্ষার একটা মউসুম আছে ওখানে। আছে ঝড়ের মউসুম।
গারাপান শহর থেকে সান অ্যান্টনি গ্রাম পর্যন্ত টানা কৃষ্ণচুড়া গাছের লাইন। লাল টকটকে কৃষ্ণচুড়া ফুল। গুল মোহর।
বৃষ্টি হলে বেশ ঠাণ্ডা লাগত। নিঝুম হয়ে যেত দ্বীপটা। সাগর হয়ে যেত উত্তাল। সীসের মত রঙ। দূর থেকে ভেসে আসতো তিমি মাছের দীর্ঘশ্বাস। এই বৃষ্টি পাঁচ মিনিট থেকে হয়তো পাঁচদিন পর্যন্ত চলতে পারত। কোন হিসাব নিকাশ নেই।
ফিনল্যান্ডের পুমালা গ্রামে আমি আসি শরীরের কোষগুলো মেরামত করতে।
এই গ্রামের হাওয়া - রোদ- নিরবতা আমাকে কিশোর বানিয়ে ফেলে।
যেমন করে বিদেশি রোমাঞ্চ কাহিনির, এক নায়ক নিজের শরীর সুস্থ করতে গোজো দ্বীপে চলে যায়।
পুমালা গ্রাম মানেই কুমকুমের মত রোদ।
কিন্তু এইবার বৃষ্টি পেলাম। বৃষ্টি হলে আমাদের হোটেল তেমন চলে না।
আর কী ভাগ্য ! এইসব দিনেই আমার ছুটি।
কাল রাতে যখন দেখছি আকাশ ব্লু বেরি ফলের মত নীল, তখনই বুঝেছি সকালে রোদ উঠবে না। মোবাইলে টুং শব্দ। আবহাওয়ার ইশতিহার। তাতেও বুঝলাম। কাল বৃষ্টি হবে।
রাতের আকাশে একফালি বাঁকা চাঁদ। ঘষা। অনেকটা ছোটবেলায় কোন এক বইয়ের প্রচ্ছদে মোমরঙ মানে ক্রেয়নে আঁকা চাঁদের মত।
ঘুম থেকে উঠেই বৃষ্টি পেলাম। কাচ ভাঙ্গা গুঁড়ার মত বৃষ্টির দানা।
দূরের ওক গাছে শিশু ওক ফল হয়েছে।
অদ্ভুত নীল রঙের একটা ফুল হয় বেশুমার। নাম নাকি কর্ণ ফ্লাওয়ার।
অমন নামের কারণ অতীতে এই ফুলগুলো ভুট্টা খেতের আসে পাশে প্রচুর দেখা যেত। সেইজন্য এই নাম।
তবে এই ফুল দিয়ে চা বানানো যায়। ওষধি ফুল। শুকনো ফুল দিয়ে ওষুধ বানায়। কাঁচা ফুলের পাপড়ি সালাদে দেয়।
এই ফুলটা নাকি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে । একদিন নাকি অভিমানে হারিয়ে যাবে পৃথিবী ছেড়ে।
কিন্তু পুমালা গ্রামে এরা এখনও আছে পথ আলো করে।
আমি ওদের দেখি। কথা বলি। অনুরোধ করি- হারিয়ে যেও না। আমাদের সাথে থাকো।
অহ আরেকটা মিষ্টি নীল রঙের ফুল আছে। নাম- লোবেলিয়াস। এত সুন্দরী ! ওকে নিয়ে আরেকদিন বলব। কেমন ?
২
ঘুম ঘুম তন্দ্রার মধ্যে গির্জার টুং টাং ঘণ্টার শব্দ শোনা। আবার কখনও কখনও স্টিমবোটের ভেঁপুর শব্দ শোনা- সে এক অপূর্ব অনুভূতি।
তন্দ্রালু মায়ায় সেই শৈশবের কথা মনে পড়ে যায় ।
শীতলক্ষ্যা নদীর বুক থেকে অমন স্টিমারের শব্দ পেতাম। আর ঘণ্টা ? সম্ভবত সেন্ট পল গির্জার ঘণ্টা। ১৯৪৯ সালে একজন ইটালিয়ান ফাদার কোন এক হিন্দু বাবুর বাড়ি কিনে এই গির্জাটা বানিয়েছিল।
আরেকটা গির্জা পেতাম।
মেট্রো সিনেমা হলের ঐ রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে জমিদারদের ফেলে যাওয়া একটা পেল্লাই দোতলা বাড়ির পাশে মিষ্টি মত সাদা গির্জা। ওটার নাম ভুলে গেছি।
ঘণ্টার শব্দ কোনটা থেকে আসে কে বলবে ?
পুমালা গ্রামের গির্জাটা কাঠের। দূর থেকেই নজরে পড়ে ত্রুুশ আর মোরগের মত বায়ু নিশান।
ওয়েদার কক বলে। পুরানো দিনের জিনিস।
মোরগটা যেই দিকে মুখ দিয়ে রাখবে বুঝে নিতে হবে বাতাস দৌড়ে আসছে ওখান থেকেই।
পুমালা গ্রামে দুইটা কবরস্থান। মানে জীবিত মানুষের চেয়ে এই গ্রামে মৃত মানুষের সংখ্যা বেশি ?
আমার বাড়ির পাশের গোরস্তানের দেয়াল বড় বড় আলগা পাথর দিয়ে বানান।
দেয়াল ভর্তি হাজার রকমের শ্যাওলা আর বুনো ফুল। চার কোণে চারটে গেইট। গেইটের দুই পিলারের মাথা দাবার ঘুঁটির রাজার মাথার মত। দুই পিলারের লেখা- MCMXxxx এটার মানে আমি জানি না।
রোমান সংখ্যা MCMXXXIX হলে বুঝতাম ১৯৩৯ সাল বুঝিয়েছে।
কিন্তু ভেতরে একটা কবর পেয়েছি । মেয়েটার নাম মারিয়া ১৮৮৭ সালে মারা গেছে। মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে।
রাতে ফেরার সময় ওর কবরের সামনে কখনও কখনও দাড়াই। আমার হাতের মোবাইল দেখে নিশ্চয়ই অবাক হয়। কত প্রাচীন আমলে চলে গেছে ও। ওর আমলে দুনিয়াটা না জানি কেমন ছিল !
৩
প্রিয় ঋতু কোনটা ?
যে কোন ফিনিশকে জিজ্ঞেস করলেই জবাব দেবে গরম কাল ।
জুন , জুলাই আগস্ট তিন মাস । দিন বড় হয়ে যায় । কাঁচা হলুদ রঙের রোদ চারিদিকে । স্থানীয় কিছু ফসল জন্মে । তারমধ্যে একটা হচ্ছে বসন্তের আলু । সারা বছর আলু খায় ওরা ।
কিন্তু বসন্তের এই আলু সাইজে পিচ্চি ,ঘন আর মিষ্টি স্বাদ । গ্রীষ্মের খাবার হিসাবে সিদ্ধ বসন্তের আলু, ডিল ( এক ধরনের গুল্ম, সুলুপ পাতা বলে অনেক এলাকায় )
মাখন আর বয়াম ভর্তি টক হেরিং মাছ দিয়ে পরিবেশন করা হয় ।
জনপ্রিয় খাবার । নাম- ইউদেট পেরুনাত জা সিলি ।
ছুটির দিনে শহরতলি থেকে ফেরার সময় দেখি প্রায় পাঁচ একর জায়গা নিয়ে চাষবাস করছে একটা মেয়ে।
বয়স অনেক কম । কিশোরীর এক্কা দোক্কা ছেড়ে মাত্র যুবতী।
খেলনার মত একটা ট্রাক্টর নিয়ে মাটি উথাল পাথাল করে। যেমন করে সুন্দরীরা করে যুবকদের হৃদয়।
সেচ দেয়।
অবাক হয়ে দেখি।
জানলাম শীত শেষে যখন কমলা রোদটা হলুদ হয়ে বসন্ত আসে তখন অনেকেই নাম মাত্র টাকায় জমি লিজ নিয়ে চাষে নামে।
জিজ্ঞেস করলাম - কী চাষ করবে মেয়ে ?
বলল - পেরুনা। Peruna
মানে আলু ।
কয়েকদিন পর ওর চষা জমিতে গাছ হল। আলু গাছে যে অমন সুন্দর ফুল হয় জানতাম না।
দেখি।
হেঁটে বাড়ি ফেরার মত পথে ধারে প্রায়ই মুখমুখি হই পেল্লাই একটা খরগোসের সাথে। এত বড় !
লম্বা ঘাসের রসালো শেকড় খাচ্ছিল। আমাকে দেখলেই পালিয়ে যায়। ধু ধু ঘাসের বনে দাঁড়িয়ে থেকে ভাবি - কোথায় এলাম আমি ? এটা কি সেই খরগোসপুর ?
৪
অমন শীতের হাওয়া বইতে শুরু করলেই মাঠের সব ঘাস শুকিয়ে হলুদ হয়ে যায়। শ্যামাপোকা আর কাঠফড়িঙ ওরা শীতঘুমের জন্য তৈরি হয়।
মাটির তলায় নিঃসঙ্গ বাড়ি। হালকা আধ শুকনো কুমড়া বা অমন ফল রাখে সেলারে।
পুরো শীতটা কাটিয়ে দেয় আরামসে।
কখনও কখনও মোমজ্বেলে বই পড়ে- দীঘল ঘাসের স্বপ্ন বা এই ধরনের বই। অথবা বুনো পশ্চিমের বই।
ওরাই ভাল জানে।
বাঁটুল কিন্তু ঝাঁকড়া গাছটার নাম কেউ আমাকে বলে দেয়নি।
ওর পাতা মেঘের দলার মত। ফিকে গোলাপি ফুল ধরে। পাতা কম। ফুল বেশি। ফুলে মধু ফধু আছে। নইলে মৌমাছির মত সময় নষ্ট না করা পতঙ্গ ঘুর ঘুর করবে কেন ?
গাছের নরম মাটিতে নীল রঙের গুল্ম।
গাছটার শেকড় ক্রাকেনের শূরের মত। অগুনতি।
মাটির নীচে ফোঁপরা। সব সময় বেশ কিছু পিঁপড়ে দেখি। আজ মেঘলা দিন। পিঁপড়েদের বড় কবি পিপ্রেন্দনাথ পিপুই বলেছেন- আজ তরা যাসনে ঘরের বাইরে।
জায়গাটা নির্জন। তারপরও কান পেতে মনে হল শেকড়ের তলায় পিঁপড়েদের বড় সর একটা কলোনি আছে।
মেঘলা দিনে সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছে।
বুড়ি একটা পিঁপড়ে দিদিমণি সবাইকে মোরব্বা আর চিনির দানা পরিবেশন করছে ট্রে ভর্তি করে।
বুড়ো দাদু একটা পিঁপড়ে বলেছে -
একবার তার বন্ধু বান্ধব মিলে কিভাবে যেন একটা হিন্দুদের মিষ্টির দোকানে ঢুকে পড়েছিল । আহা সে লুট পাট করেছিল তারা !
টানা এক সপ্তাহ !
শেষে দোকানের এক কর্মচারী দেখে ফেলে আক্রমণ করলো। অনেক পিঁপড়ে মারা গেলেও দাদু পিঁপড়ে আর কয়েকজন বেঁচে গিয়েছিল। পালানোর আগে সবাই মাথার উপর একটা করে মিষ্টির দানা নিয়ে ভেগে চলে এসেছিল।
সেই বর্ষাকালটা তাদের খাবারের অভাব হয়নি।
পিঁপড়েদের এই বাসাটা সুন্দর। গোল টেবিল আছে। চেয়ার সোফাও। টেবিলে চিনির সিরা ভর্তি কেটলি। মধু ভর্তি পেয়ালা। একটা সুন্দর ফুলদানিতে যত্ন করে রঙিলা গুল্ম সাজিয়ে রেখেছি গিন্নি পিঁপড়ে।
সবাই মনোযোগ দিয়ে দাদু পিঁপড়ের গল্প শুনছে।
একটা খোকা পিঁপড়ে বিছানায় শুয়ে আছে। ওর জ্বর। ডাক্তার ওকে রোজ একটা করে লবণের দানা খেতে বলেছে। খোকার লবণের দানা ভাল লাগে না।
ওদের জীবন যাপন আরও খানিক দেখতাম। কিন্তু আমাকে কাজে যেতে হবে !
চলে গেলাম।
৫
সামার ভিলেজ জিনিসটা আসলে কি ?
সামার মানে গরম আর ভিলেজ মানে সবাই জানে গ্রাম। মানে গরম গ্রাম ?
না।
আসলে , একদম নির্জন সুনসান গ্রাম। সামান্য বাসিন্দা। শীতে একদম জুউবুথুবু হয়ে যায়। চারিদিকে সিল মাছের দাঁতের রঙের মত বরফ আর বরফ।
ঘাস গুল্ম মরে ভূত হয়ে বরফের তলায়। বিচ্ছিন্ন দুই এক বাড়ি। বারান্দায় গাজরের রঙের মত আলো জ্বলে। পুরো বাড়ি অন্ধকার। ভেতরের কোন এক কামরায় গোল্ড ফিসের মত নিঃসঙ্গ একটা বিজলির আলো।
বুঝার উপায় নেই কে বা কাহারা থাকে।
একদম রাক্ষসপুরী।
কিন্তু গরমে এইসব গ্রামের চেহারা যায় বদলে।
বরফ গলে তরল হয়ে পালিয়ে গেছে দিঘির জলে।
মরে থাকা ঘাস আর গুল্ম আবার বেঁচে উঠেছে। হয়েছে সুন্দর সব বুনো ফুল। কাঁচা হলুদ আর আরেকটা ঘন হলুদ মিলিয়ে একটা ফুল ধরে। নাম এগ এন্ড বাটার। ওর নাম শুনেই বুঝা যায় মনে হচ্ছে মাখনের দলার মধ্যে কেউ ডিমের কুসুম অসাবধানে ফেলে দিয়েছে।
এটার ভদ্র নাম মানে ইশকুলের নাম হচ্ছে - ইয়েলো টোডফ্ল্যাক্স।
আরেকটা হলুদ ফুলে চারদিক উজ্জ্বল হয়ে যায়। ওটার নাম ব্রিস্তলি হকস বিয়ারড ! ঝলমলে বাজপাখির দাঁড়ি। এটার কচিপাতা আর কাণ্ড নাকি খাওয়া যায় !
আর ডেনডালিয়ন ফুলের কথা বলার দরকার দেখি না।
চারিদিকে যখন হাজার ফুলের মেলা। তখন দূর দূরান্ত থেকে রাজ্যের মানুষ জন তাদের বোচকা বুচকি নিয়ে ছুটে আসে এইসব গ্রামে। ছুটি কাটায়।
দুই তিনটা হাতে গোনা কফিঘর , রেস্তোরাঁ, শুঁড়িখানা ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
গরম শেষ। হালকা ঠাণ্ডা বাতাস চুপি চুপি আসা শুরু করলেই মানুষগুলো আবার সবাই পালিয়ে যায়।
আবার সেই ভূতুরে গ্রাম হয়ে যায়।
পুমালা তেমন একটা সামার ভিলেজ ।
৬
এই বছর পুমালায় ( Puumala) রোদ আসলো অনেক দেরি করে।
যেই ভাবে বলা শুরু করলাম , মনে হতে পারে জম্পেস একটা রোমাঞ্চ কাহিনি শুরু করলাম। উইলবার স্মিথ লেখা উপন্যাসের শুরুর মত- সেই বছর মাছ ধরার মউসুম এলো অনেক দেরি করে।
তারপরও ধুম ধাম কাহিনি শুরু।
কিন্তু আসলেও সত্যি।
গহন ঘন হলুদ রোদের জন্য পুমালা গ্রাম বিখ্যাত। রোদের রঙ ক্রীট দ্বীপের লেবুর খোসার মত। গাঁদা ফুলের পাপড়িও অমনটা হয়।
রাজ্যের মানুষ ছুটে আসে পুমালা গ্রামে। সামার ভিলেজ। কফিখানা , শুঁড়িখানা আর রেস্তোরাঁর ঝুল বারান্দা , অলিন্দ বাঁ রোয়াক ভর্তি করে মানুষজন বসে থাকে। সারা শরীরে রোদ মেখে নেয়। শীতের সঞ্চয়। দক্ষিণ মহাসাগরের তিমি যেমন মৌসুমে পেট ভর্তি করে ক্রিল খেয়ে নেয়। তেমন এই নর্ডিক দেশের মানুষগুলো রোদ মাখিয়ে নেয়।
রোদটা আমারও ভাল লাগে।
শৈশবে মা দুপুরে ঘুমিয়ে পড়লে আমি চুপটি করে বাসা থেকে বেড়িয়ে যেতাম। বগলে বই। বাইরে তখন অমন রোদ হত। দেশী পাকা খেজুরের রঙের মত। অমৃতের রঙও নাকি অমন সোনালী হলুদ।
ঘুম ভেঙ্গে মা পিছন থেকে চেঁচিয়ে উঠল , ‘ রোদের মধ্যে বের হয়েছিস ? সারা জীবন বাইরে বাইরে ঘুরবি।
হায়। মায়ের অভিশাপ !
সারা জীবন বাইরে থেকেছি।
কিন্তু পুমালা গ্রামে এই বছর রোদ কম কেন ?
গরম আসতে দেরি করছে। আবহাওয়া ওর চক্র মেনে চলে। ওর মেজাজ মর্জি আছে। এই বছর ও দেরিতে আসবে । তোমাদের কোন সমস্যা ?
জুনের পহেলা থেকেই আমাদের রেস্তরা নরকের গলির মত ব্যস্ত থাকে। এই বছর তেমনটা হচ্ছে না। দুই চারজন খদ্দের বসা। ফালি করে ভাঁজা সোনালী আলু। বিচিত্র পানপাত্র। চিনামাটির পেয়ালা ভর্তি কালো কফি। কেউ হয়তো নেয় সাথে যব পিষে বানানো দুধ।
রেস্তোরাঁয় বারান্দা খালি। একটা সী গাল বসে বসে দিঘির ঢেউ গুণে।
এক কামরার একটা কাঠের বাসা দেয়া হল আমাকে। কেবিন হাউজ। জাহাজের ক্যাপ্টেনের রুমের মত। বাইরে থেকে দেখেই দারুন পছন্দ হয়ে গেল।
ভেতরে হিটার । স্টিলের বেসিন। জাহাজি টেবিল । আর দুটো টুল।
পিচ্চি একটা ফ্রিজ। কফি বানানোর যন্ত্রপাতি। খাবার গরম করার জন্য পিচ্চি আভেন। বিছানার পাশে টেবিল আলো। একদম জ্যামিতিক গোল আয়না। ক্যাবিনেটের ভেতরে সবুজ- নীল পেয়ালা। বিচিত্র সাইজের একগাদা তশতরী। চাকু। পিতলের তাওয়া। টিনের খাবার খোলার জন্য অদ্ভুত দেখতে টিন কাটার।
বাসাটার নাম দিলাম- অক্টোপাসের বাগান ।
৭
গরমে এইখানে রোদ থাকে। একদম জলপাই তেলের মত রোদ। তারপরও কখন অকস্মাৎ এক লহমায় আকাশ জোড়া মেঘ জমা হয়।
আকাশের রঙ হয়ে যায় আমার মায়ের চুলের মত কালো। শৈশবে ভেঙ্গে ফেলা অ- আ লেখা স্লেটটার মত কুচকুচে।
আকাশ কালো হলে সায়মা জলাভূমির জলেরা কেমন করে যেন বুঝে যায় । ওরা উত্তাল হয়ে ঢেউ বানায়।
ওরা বুঝতে পারে বৃষ্টি হলে ওদের হারানো জলেরা ফিরে আসবে দিঘির বুকে। সেইজন্য ওরা চেঁচায়- ফিরে এসো... কোথায় ছিলে এতদিন ?
দিঘির পাড়ে আমার রেস্টুরেন্ট।
তখন খদ্দের দৌড়ে ভাগে। ফিনিশরা বৃষ্টি -হাওয়ার সময় বাইরে থাকতে ভয় পায়। অথবা অপছন্দ করে।
পেল্লাই রেস্টুরেন্ট। কিন্তু খালি।
আগে ভাগে বন্ধ করে বাড়ির পথ ধরি।
পুরো গ্রামে বড় বড় দুটো মুদির দোকান। একটা ওষুধের দোকান। একটা ব্যাঙ্ক ছিল ।বন্ধ হয়ে গেছে লেন দেনের অভাবে।
নিঃসঙ্গ একটা লোক পিজ্জার দোকান চালায়। দোকানের নামই- পিজ্জা।
সব সময় টেত্রনের কালো প্যান্ট আর স্পাইডার লিলি ফুলের মত সাদা জামা পরে লোকটা।
মাথায় ফুলকপির মত চুল। দূর থেকে দেখলে মনে হয় জ্যাকসন ফাইভ ভাইদের একজন।
দোকানের দোতলায় লোকটা থাকে। বাড়ির পিছনে দারুণ রকমের একটা সূর্যমুখী ফুলের বাগান। আগে কিছু লোবেলিয়াস ফুলের ঝাড়।
অর্থাৎ লোকটা তার বাসার বারান্দা থেকে দিঘির টলটলে জল দেখতে পায়। চাইলেই আবার উল্টা দিকের বাগান দেখতে পায়।
দোকানের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেই টম্যাটো চাটনির চনমন করা সৌরভ পাই।
এই টম্যাটোর সস পিজ্জায় ব্যবহার করে। আমাকে বলে এটা নাকি তার গুপ্ত আবিস্কার।
মিথ্যা কথা। আমিও বানাতে পারি।
৮
গরম শেষ হয়ে আসছে।
গাছেরা বুঝে গেছে সামনে শীত।
ড্যান্ডেলিয়ন কিসিমের ফুল বা অমন কিছু ঘাসের ফুল মরে যাবার আগে সাদা তুলার বলের মত চেহারা করে ফেলেছে। অচিন স্পেসশিপের মত। ভেতরে বীজগুলো সবাই ভাই ভাই।
সামান্য বাতাস পেলেই এক একটা দানা বাতাসে উড়ে যায়। উড়ে যাবার আগে বিদায় নেয়- ভাই বিদায়। কখনও আর দেখা হবে না।
উড়ে উড়ে অনেক অনেক দূরের দেশেও চলে যাবে। ওখানে মাটিতে পড়ে আবার সামনের বসন্তে নতুন ঘাস হয়ে জন্মাবে।
আবার কেউ পাথরের উপর পড়বে। ও ঘাস হবে না আর। এক সাদা বল থেকে বেড়িয়ে কত জায়গায় চলে যাবে সবাই।
আমাদের পরিবারের মতই।
ছোট্ট একটা বাসায় বড়দা, দিদি , ছটু সহ একগাদা ভাই বোন। কেউ বিদেশ গিয়ে আর ফেরে না। কেউ ভাল চাকরির জন্য চলে যায় অন্য শহরে। দিদির বিয়ে হয়ে যায়। এক সময় যে বাড়িটা গমগম করতো।
সেই বাড়ির দেয়ালে জন্মায় সবুজ গুল্ম। মরচে ধরা টিনের চালের রঙ হয়ে যায় বাটা মসলার মত।
বাইরে ঘন হয়ে জন্মেছে বাসন্তী ঘাস।
কিছু অচেনা গুল্ম। থাইমের মত দেখতে। হয়তো সুগন্ধি আছে।
চিমটি চিমটি ক্ষুদে হলুদ ফুল ধরে এক ঝাঁক। আর আছে বুনো গোলাপ।
কড়ির মত গোলাপ।
নরম ভেজা ঘাসের উপর অলস ভাবে যাচ্ছে নিঃসঙ্গ একটা শামুক। ঘাস খচ্ছিল হয়তো।
পিঠে পেল্লাই দুর্গ, খোলস।
নিজের দুর্গে একা থাকে নরম একটা প্রাণী।
কী অদ্ভুত ভাবে সাথে নিয়ে যেতে পারে নিজের বাসাটা।
সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন।
মানুষগুলোও এক একটা শামুকের মত।
খোলসের মত বয়ে চলে অতীত স্মৃতি। দুঃখ। আশা। হতাশা।
ভেতরে সবাই একা।
ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে হাওয়া ।
৯
রুস্কা মানে শরত কাল। শরত মানে বনভূমি ভর্তি হলুদ বাদামি পাতার স্তূপ অমন না কিন্তু। যদিও উত্তরের বনগুলোকে হলুদ অরন্য বলে ডাকে সবাই।
মাশরুম আর বেরি সংগ্রহের জন্য মাশরুম হান্টারেরা বনে ঘুরতে যায়।
যেই পাবে তার, বনের মাশরুম আর বেরি সবার জন্য।
তাজা পরিষ্কার বাতাস আর লম্বা দিনগুলোতে বাড়িতে থাকা কষ্টকর। সবাই বনে যায়।
দুই হাজারের বেশি মাশরুম থাকলেও মাত্র দশ ধরনের মাশরুম লোকজন খুঁজে আনে। ওগুলো নিরাপদ। বাকিগুলো চেনার জন্য গাইড লাগে। পোর্সিনি মাশরুমটা বেশি পাওয়া যায়। রান্না করলে মাংস বলে বিভ্রম জাগে।
ইটালিতে পোর্সিনি বেশি হয়। দ্বিতীয় ফিনল্যান্ড।
ফিনল্যান্ডের বনাঞ্চলে ভোজ্য মাশরুমের সংখ্যা অনেক। , সবচেয়ে সহজে পাওয়া যায় রুসিলা, মিল্ক ক্যাপ এবং বোলেটাস ।
গাছের গোড়ায় এবং অন্যান্য ছায়াময় এলাকায় হাসিমুখে জন্ম নেয় ওরা ।
১০
খুব পাতা ঝরছে আজকাল। বাদামী হলুদ আর কেমন একটা তামার মত রঙ। কেমন হাওয়া বয় ।
ঘুম ঘুম চোখে মনে হল জানালার বাইরে বসে কারা কথা বলছে।
উঁকি দিয়ে দেখি দুইজন বসে আছে। বেশ গুণ্ডা মার্কা চেহারা । একজনের কেমন মস্তান কাট চুল । মুখে গোঁফ । গায়ে শাল ।
দ্বিতীয় জনেরও গোঁফ আছে। কিন্তু চোখ দুটো বড় বড় । পাঞ্জাবি গায়ে।
শালওয়ালা বলছে , ' না না আপনি ভুল বলছেন ভাঁট ফুল আর ঘোড়া নিম সবচেয়ে সেরা। বাগানে ও দুটো থাকলে খুবই ভাল।
বড় বড় চোখওয়ালা বলছে, ' না দাদা। কাঁঠাল গাছ বাড়িতে রাখবেন । শীতের কুয়াশার মধ্য বসে বসে কমলালেবু খাবেন আর দেখবেন একটার পর একটা কাঁঠাল পাতা কেমন খসে খসে পড়ছে ।
আমি কষে ধমক দিতেই দুইজনেই ভেগে গেল।
মনে হয় চিনি উহাদের। আচ্ছা এরা তবে জীবনানন্দ দাশ আর বিভূতিভূষণ বাবু।
বিচ্ছিরি স্বপ্ন ।
গত কাল স্বপ্নে দেখেছি, আমার আপেল গাছগুলোর তলায় জেমস হেডলি চেইজ বসে বসে পুরানো রেমিংটন টাইপ দিয়ে লিখছে । আমাকে দেখেই বলল , ' লাশটা আপনার বাথরুমে আছে।'
যখন যে বই পড়ি তখন সেই সব স্বপ্ন দেখি। আবার হতে পারে কফির দানা পচানো বিয়ার খাওয়ায় অমন হচ্ছে।
যেমন ভ্যান গঘ সব সময় বেশি হলুদ রঙে ছবি আঁকত , সব ছবিতে প্রচুর হলুদ আর হলুদ।
কারণ কি ?
অনেক বিজ্ঞানী বলে , শিল্পী প্রচুর অ্যাবসিন্থ পান করতো। এই মদের প্রভাবে চোখে সব কিছুতেই হলুদ হলুদ লাগে। যেন সোডিয়াম লাইটের আলোতে চলছে সে।
সেইজন্য মদ্যপান করার আগের সব ছবি ছিল মলিন । ধূসর।
পরের সব ছবি হলুদ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন